সৌরজগতের উৎপত্তি জানতে মহাকাশযান পাঠাল নাসা

সৌরজগতের উৎপত্তি জানতে মহাকাশযান পাঠাল নাসা

বৃহস্পতির একটি ট্রোজান গ্রহাণুর পাশ দিয়ে যাচ্ছে লুসি। ইলাসট্রেশন: সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট

নাসার এই অভিযানের মূল বিজ্ঞানী হাল লেভিসন বলেন, ‘ট্রোজান গ্রহাণুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় যেটি আমরা জানতে পারি তা হলো, এরা পরস্পরের থেকে অনেক ভিন্ন। বিশেষ করে এদের রং একে অপরের থেকে একদম আলাদা।’

বৃহস্পতি গ্রহের ট্রোজান গ্রহাণু সম্পর্কে জানতে ১২ বছর দীর্ঘ উচ্চাভিলাষী অভিযানের অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো মহাকাশযান পাঠিয়েছে নাসা।

প্রাক-মানব পূর্ব পুরুষের প্রাচীন এক জীবাশ্ম লুসির নাম দেয়া ওই মহাকাশযানটি সৌরজগতের গঠন ও উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন ধারণা দেবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেইপ ক্যানাভেরাল থেকে ওই মহাকাশযান পাঠানো হয়।

লুসি হচ্ছে প্রথম সৌরশক্তিচালিত মহাকাশযান, যেটি সূর্য থেকে এত দূরে পাড়ি দিয়েছে। অন্যান্য মহাকাশযানের চেয়ে এটি আরো বেশি গ্রহাণু সম্পর্কে তথ্য দেবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

নাসার সায়েন্স মিশনের সহযোগী প্রশাসক টমাস জারবুচেন বলেন, ‘বৃহস্পতি গ্রহের ট্রোজান গ্রহাণুর প্রতিটি সৌরজগতের পাশাপাশি পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে তথ্য দেবে।’

২০২৫ সালে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যবর্তী গ্রহাণু ডোনাল্ড জোহানসনের সঙ্গে প্রথম দেখা হবে লুসির। লুসি ফসিল আবিষ্কারকের নাম অনুযায়ী ওই গ্রহাণুর নাম রাখা হয়।

২০২৭ থেকে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত সাতটি ট্রোজান গ্রহাণুর সামনাসামনি হবে লুসি।

ওই সব গ্রহাণুর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ব্যাস প্রায় ৬০ মাইল।

গ্রহাণুগুলোর পৃষ্ঠের আড়াই শ মাইলের মধ্যে অবস্থান করবে লুসি। ওই সব গ্রহাণুর গঠন, ভর, ঘনত্ব, আয়তনসহ ভূ-তত্ত্ব বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও লম্বা অ্যান্টেনার সাহায্যে অনুসন্ধান করবে লুসি।

ধারণা করা হয়, বৃহস্পতির ট্রোজান গ্রহাণুর সংখ্যা সাত হাজারের বেশি। আমাদের সৌরজগতের বিশাল গ্রহ বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন গঠনের সময় অবশিষ্ট কাঁচামাল থেকে ওই সব গ্রহাণু সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীসহ সব গ্রহের গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেবে বৃহস্পতির ট্রোজান গ্রহাণু।

নাসার এই অভিযানের মূল বিজ্ঞানী হাল লেভিসন বলেন, ‘ট্রোজান গ্রহাণুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় যেটি আমরা জানতে পারি তা হলো এরা পরস্পরের থেকে অনেক ভিন্ন। বিশেষ করে এদের রং একে অপরের থেকে একদম আলাদা।’

আরও পড়ুন:
মঙ্গল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করল রোবট
নাসার প্রধান বিল নেলসন
মঙ্গলের আকাশে উড়ল নাসার হেলিকপ্টার

শেয়ার করুন

মন্তব্য

‘শি’-কে ভয়, তাই এলো ‘ওমিক্রন’!

‘শি’-কে ভয়, তাই এলো ‘ওমিক্রন’!

গ্রিক বর্ণমালার অক্ষরগুলো দিয়ে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের নামকরণ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

গ্রিক বর্ণমালার ক্রমানুসারে ১২টি অক্ষরের নামে করোনার ১২টি ভ্যারিয়েন্টের নামকরণের পর হঠাৎ করেই দুটি অক্ষর বাদ দিয়ে পঞ্চদশ অক্ষর ‘ওমিক্রন’ বেছে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আর এতেই তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

কোভিড ১৯ এর জন্য দায়ী করোনাভাইরাসের সবশেষ ধরন ‘ওমিক্রন’ নিয়ে উদ্বেগ এখন সারা বিশ্বে।

আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণের দেশ বতসোয়ানায় প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ভ্যারিয়েন্টের শুরুতে নাম ছিল ‘বি.১.১.৫২৯’, তবে শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম দেয় ‘ওমিক্রন’।

ভাইরাসটির গতি-প্রকৃতি এবং এটি কতটুকু ক্ষতির কারণ হতে পারে- তা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নতুন ধরনটির নাম নিয়েও চলছে হৈ চৈ।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে করোনাভাইরাসটি শনাক্ত হওয়ার প্রথম দিকে এটি ‘২০১৯ নোবেল করোনাভাইরাস’ হিসেবে পরিচিতি পায়। মানবদেহে সংক্রমিত যে কোনো নতুন করোনাভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নামকরণের আগে ‘নোবেল (নতুন) করোনাভাইরাস’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটির নাম দেয় সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম করোনাভাইরাস টু (সার্স-কভ-২)। এর পর একের পর এক ভাইরাসটির নতুন ধরন তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর নতুন বৈজ্ঞানিক নামও দিতে থাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

তবে এসব নাম বেশ জটিল হওয়ায় ভাইরাসের পরবর্তী ধরনগুলো এদের পরিচিতি পেতে থাকে প্রথম শনাক্ত হওয়া দেশের নামে। যেমন বি.১.৬১৭.২ ভ্যারিয়েন্টটি ভারতীয় ধরন হিসেবে সংবাদ মাধ্যমে পরিচিত পায়। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের সহজ নামকরণের উদ্যোগ নেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এই নামকরণে একটি পদ্ধতিও ঠিক করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এক্ষেত্রে গ্রিক বর্ণমালার অক্ষরগুলো দিয়ে শুরু হয় নামকরণ।

২৪ অক্ষরের গ্রিক বর্ণমালার প্রথম অক্ষর ‘আলফা’। সে অনুযায়ী, গত বছর যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া একাধিক মিউটেশনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া করোনার ‘বি.১.১.৭’ ধরনটির নাম দেয়া হয় ‘আলফা’। এরপরে ২০২০ সালেই সাউথ আফ্রিকায় শনাক্ত হওয়া আরেকটি উচ্চ মিউটেশনের ধরনের (বি.১.৩৫১) নামকরণ হয় গ্রিক বর্ণমালার দ্বিতীয় অক্ষর ‘বেটা’ নামে।

ব্রাজিলে প্রথমবার শনাক্ত হওয়া আরেকটি ধরনের (পি.১) নাম রাখা হয় ‘গামা’। এটি গ্রিক বর্ণমালার তৃতীয় অক্ষর। চতুর্থ অক্ষর ‘ডেল্টা’ নামকরণ করা হয় ভারতে শনাক্ত হওয়া ধরনটির (বি.১.৬১৭.২)।

এভাবে ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শনাক্ত হওয়া ধরনগুলোর নাম রাখা হয়েছে- এপসাইলন, জেটা, এটা, থেটা, আইওটা, কাপা, ল্যাম্বডা, মিউ। এগুলোর মধ্যে ল্যাম্বডা ছাড়া বাকিগুলোর সংক্রমণ ক্ষমতা কম হওয়ায় খুব বেশি আলোচনায় আসেনি।

এভাবে গ্রিক বর্ণমালার ক্রমানুসারে ১২টি অক্ষরের নামে করোনার ১২টি ভ্যারিয়েন্টের নামকরণের পর হঠাৎ করেই দুটি অক্ষর বাদ দিয়ে পঞ্চদশ অক্ষর ‘ওমিক্রন’ বেছে নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আর এতেই তৈরি হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

ওমিক্রনের আগে পাশ কাটিয়ে যাওয়া গ্রিক অক্ষর দুটি হলো- নু এবং শি।

অনেকের অভিযোগ, চীনা প্রেসিডেন্ট চিনপিং-এর পারিবারিক উপাধি শি হওয়ার কারণেই এই অক্ষরটিকে এড়িয়ে গেছে সংস্থাটি।

এক বিবৃতিতে বিষয়টি স্বীকারও করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের বক্তব্য হলো, ‘শি’ শব্দটি পারিবারিক উপাধি হিসেবে অনেকেই ব্যবহার করেন, তাই এটি বাদ দেয়া হয়েছে। আর ‘নু’ এর উচ্চারণ ইংরেজি শব্দ ‘নিউ’ এর সঙ্গে মিলে যায় বলে, বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য অক্ষরটি বাদ দেয়া হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তাদের দাবি, যে কোনো নতুন রোগের নাম নির্ধারণে তারা খুবই সতর্ক থাকেন, যাতে এই নাম কোনো সংস্কৃতি, সমাজ, জাতি, অঞ্চল বা গোষ্ঠীর জন্য বিব্রতকর না হয়।

তবে ‘শি’ এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে রাজনীতি রয়েছে বলে তীর্যক মন্তব্য ছুড়ছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান সিনেটর এক টুইটে লিখেছেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের কম্যুনিস্ট পার্টিকে এতটাই ভয় পেলে তারা পরে কীভাবে বিশ্বাস করবে যে, দেশটি একটি মহামারিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে।’

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ট্রাম্প জুনিয়র টুইটে লিখেছেন, ‘আমি যতদূর জানি, শি ভ্যারিয়েন্টই হলো করোনার আসল ভ্যারিয়েন্ট।’

প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেণী নামে এক ভারতীয় রাজনীতিক লিখেছেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের নাম নিতে ভয় পায়। কিন্তু তারা ভারত আর সাউথ আফ্রিকাকে দোষারোপ করতে এক পা সবসময় বাড়িয়ে রাখে।’

আরও পড়ুন:
মঙ্গল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করল রোবট
নাসার প্রধান বিল নেলসন
মঙ্গলের আকাশে উড়ল নাসার হেলিকপ্টার

শেয়ার করুন

ভাঙা প্রেমে কেন ভেঙে যায় বুক?

ভাঙা প্রেমে কেন ভেঙে যায় বুক?

ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস/নিউজবাংলা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। বিরহ এমন এক আসক্তি জন্ম দিতে পারে, যার মাত্রা কোকেইনে আসক্তির মতোই।  

প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার দুদিনের মাথায় নতুন প্রেমে জড়ানোর উদাহরণ আজকাল অফুরন্ত।

বিচ্ছেদের পর অনেকে খুব সহজে সব ভুলে যেতে পারেন। কেউ কেউ আবার নিয়মিত বিরতিতে সঙ্গী বদলকে গৌরবজনকও মনে করেন।

তবে সবাই তো আর এমন ‘পেশাদার’ প্রেমিক বা প্রেমিকা নন, কেউ কেউ এখনও আছেন ভীষণ আটপৌঢ়ে। তাদের কাছে প্রেম ভেঙে যাওয়া মানে সব কিছু ‘শেষ হয়ে’ যাওয়া।

শুধু পুরোনো দিনের ঢাকাই সিনেমার বিবাগি প্রেমিক নয়, বাস্তব জীবনেও ব্যর্থ প্রেমের হাহাকারের নজির অসংখ্য।

ভালোবাসা হারানোকে সহজে মেনে নিতে পারেন না অনেকেই। বুকে একরাশ ব্যথা নিয়ে বিষাদে কাতর কেউ কেউ বুক পকেটে আগলে রাখেন প্রাক্তনের ছবি। কেউ কেউ নানান উপলক্ষ্য ধরে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। আবার কারও কাছে একেবারেই তুচ্ছ মনে হয় জীবন।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভেঙে যাওয়া প্রেমকে ভুলে যাওয়া কারও কারও জন্য সত্যিই খুব কঠিন। বিরহ এমন এক আসক্তি জন্ম দিতে পারে, যার মাত্রা কোকেইনে আসক্তির মতোই।

বিচ্ছেদের পরেও প্রাক্তন প্রেমিক/প্রেমিকার প্রতি কেনো মানুষের তীব্র আকর্ষণ- সেটি জানতে গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের রুটগার্স ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যানথ্রপলজির অধ্যাপক হেলেন ই. ফিশার ও তার কয়েক সহকর্মী।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সবারই ছিল ব্রেক আপের অভিজ্ঞতা। তাদের একটি লিফলেট দেয়া হয়, যেখানে প্রশ্ন ছিল, ‘প্রেমে বিচ্ছেদের পর কি প্রাক্তনকে ভুলতে পারছেন?’

অংশগ্রহণকারীদের প্রায় সবাই জানান, তারা প্রাক্তনের কাছে ফিরে যেতে চান এবং ব্রেক আপের চাপ সামাল দিতে পারছেন না। এদের অনেকেই মানসিক বিষাদের মাত্রা সামলাতে না পেরে মদ্যপান বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, মন খারাপ এবং ডুকরে কান্না ছিল নিয়মিত ঘটনা। অনেকে প্রাক্তনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছিলেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রেমে প্রত্যাখ্যানের ঘটনা কোনো কিছু হারিয়ে ফেলার মতো গভীর আবেগ জন্ম দিতে পারে মনের মাঝে। অনেক ক্ষেত্রে এটি তীব্র মানসিক হতাশার জন্ম দেয়, যেটি হত্যা বা আত্মহত্যার মতো ঘটনাতেও গড়াতে পারে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তাদের প্রাক্তন প্রেমিক বা প্রেমিকার ছবি দেখানো হয়। পাশাপাশি দেখানো হয়েছে, তাদের পরিচিত কোনো মানুষের ছবি।

দেখা গেছে, দুই ধরনের ছবি দেখার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের মনোসংযোগের মাত্রা ছিল আলাদা।

অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা প্রেমকে একটি ‘লক্ষ্য অর্জনভিত্তিক আবেগ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের বাকি সব আবেগের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক এতটা নিবিষ্টভাবে কাজ করে না।

ফিশার ও তার সহকর্মীরা দেখেছেন, সাবেক প্রেমিক/প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে থাকা এবং কোকেইন সেবনের তীব্র ইচ্ছার মধ্যে একটি স্নায়বিক সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে একটি হাইপোথিসিস হলো, প্রেমে প্রত্যাখ্যানও এক ধরনের প্রবল আসক্তির জন্ম দিয়ে থাকে।

তীব্র আসক্তি কি ‘অসুস্থতা’?

প্রেমের ক্ষত কী করে দূর করা হয়, সে বিষয়ে গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ডাকোটা স্কুল অফ মেডিসিনের ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিয়রাল সায়েন্সের অধ্যাপক এম. সানচেস। তার সঙ্গে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস হেলথ সায়েন্স সেন্টারের ডিপার্টমেন্ট অফ সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড বিহেভিয়রাল সায়েন্সের অধ্যাপক ভি.পি জন।

‘ট্রিটমেন্ট অফ লাভ অ্যাডিকশন: কারেন্ট স্ট্যাটাস অ্যান্ড পারসপেক্টিভ’ শিরোনামে ২০১৯ সালে প্রকাশিত তাদের গবেষণাপত্রে প্রাক্তনের প্রতি মাত্রাছাড়া আসক্তিকে এক ধরনের ‘মানসিক ব্যাধি’ বলা হয়েছে।

সানচেস ও জন ‘অসুস্থ ভালোবাসা’র ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, এ ধরনের ক্ষেত্রে মানুষের আচরণের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন থাকে, যেখানে সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট, মাত্রাছাড়া ও তীব্র আগ্রহ দেখা যায়। এর ফলে মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান এবং অন্য আর সব কিছুতে তার আগ্রহ শূন্যে নেমে আসে। আচরণগত বিভিন্ন পরিবর্তনও আসে অতি বিরহীর জীবনে।

এই গবেষকেরা বলছেন, অনেকেই বিচ্ছেদ পরবর্তী জীবন ও মানসিক তীব্র দহনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না।

বিচ্ছেদ ব্যথা সামলাবেন কী করে

ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করা যখন এত কঠিন তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগতে পারে, হৃদয়ে ক্ষত সারানোর উপায় কী?

মন গবেষকদের মতে, বিচ্ছেদ যন্ত্রণাদায়ক হলেও এটি হৃদয়কে অন্যান্য সম্পর্ককে বিবেচনায় নেয়ার পথ খুলে দিতে পারে। ফলে বিচ্ছেদ শুধু হতাশাই তৈরি করে না, উন্মোচন করে সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়।

তাই প্রাক্তনের পেছনে অযথা ঘুরঘুর না করে নিজেকে সামলাতে শিখুন। এছাড়া অন্য উপায়ের মধ্যে রয়েছে ব্যস্ত থাকা, বন্ধু- পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো এবং সারাক্ষণ দুঃখের গান না শুনে মন চনমনে রাখা কাজে নিজেকে জড়িত করা।

সবচেয়ে ভালো ওষুধ হচ্ছে সময়। সময়ের সঙ্গে মানুষের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়, ধারণা বদলায় এবং আবেগের মাত্রা হালকা হতে থাকে। সেই সময়কে আসতে দিন, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবুন এবং নতুন কোনো সম্পর্কের জন্য তৈরি করে নিন।

আরও পড়ুন:
মঙ্গল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করল রোবট
নাসার প্রধান বিল নেলসন
মঙ্গলের আকাশে উড়ল নাসার হেলিকপ্টার

শেয়ার করুন

চুমু খেলে কমে কোলেস্টেরল

চুমু খেলে কমে কোলেস্টেরল

গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো মানের চুমু মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কোনো যুগল ডিনারে প্রচুর পরিমাণে হাই-কোলেস্টেরল খাবার খেলেও উদ্বেগের খুব একটি কারণ নেই। ডিনার শেষে একান্তে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরকে চুম্বনে আবদ্ধ রাখলে সেই হাই-কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের বারোটা নাও বাজাতে পারে।

ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করতে চুমুর বিকল্প নেই। শিল্প, চলচ্চিত্র বা সাহিত্যে তাই বারবারই এসেছে চুমুর জয়গান।

বিভিন্ন গবেষণাতেও এসেছে, সুখী জুটির পেছনে চুমুর সঙ্গোপন ভূমিকা। বলা হয়ে থাকে, দাম্পত্য সম্পর্ক ফিকে হয়ে যাওয়া ঠেকাতে চাইলে নিয়মিত চুমু খাওয়া ভুলে গেলে চলবে না।

এটা তো গেল সম্পর্কের আকর্ষণ ধরে রাখতে চুমুর টোটকা; বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্যও দীর্ঘ ও নিয়মিত চুমু খাওয়া প্রয়োজন। এটি সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা বজায় রাখার পাশাপাশি আপনাকে সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে।

বিষয়টি ঘেঁটে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোন স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিকেশনসের অধ্যাপক কোরি ফ্লয়েড ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণা চালিয়েছেন। ৫২ জোড়া বিবাহিত ও অবিবাহিত জুটিকে বেছে নিয়ে তারা যাচাই করেছেন চুমু খাওয়ার দৃশ্যমান বা পরিমাপযোগ্য কোনো সুবিধা আছে কিনা।

ফ্লয়েডের দল আগে থেকেই জানতেন, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে চুমুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ফলে তারা সম্পর্ক জোরদারে চুমুর প্রয়োজনীতা নিয়ে মাথা ঘামাননি; গবেষণায় দেখা হয়েছে, সুস্বাস্থ্যের উন্নতিতে চুমুর অবদান কী।

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চুমুর সময়ে লালা বা থুতু বিনিময়ে মনোনিউক্লিওসিস (কিসিং ডিজিজ) ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তবে ফ্লয়েড ও তার সহকর্মীরা চুম্বনের এই ঝুঁকির বাইরে উপকারিতাই বেশি খুঁজে পেয়েছেন।

তারা দেখেছেন, নিয়মিত চুমু খাওয়ার অভ্যাস অ্যালার্জির বিরুদ্ধে দেহের ইমিউন সিস্টেমকে তাতিয়ে তোলে। তার চেয়েও বড় কথা, মানসিক চাপ এক নিমিষে কমিয়ে দেয় গভীর ও দীর্ঘ চুমু।

স্নায়ুতন্ত্রের প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেমকেও চাঙা করে তোলে চুম্বন। সহজ কথায় প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম হলো স্নায়ুতন্ত্রের এমন কার্যকলাপ, যা আরামদায়ী বা নিশ্চিন্ত থাকার সময়ে দেহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় থাকা মানেই হলো বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ কমে যাওয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে বিদ্যমান সিবাম নামের বিশেষ একটি পদার্থ চুমু খাওয়ার সময় সঙ্গীর দেহে পরিবাহিত হতে পারে। আর এই সিবাম মস্তিষ্ককে বন্ধন ও ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ রাসায়নিক সিগন্যাল দেয়।

চুমুর আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বেরিয়ে এসেছে গবেষণায়। দেখা গেছে, ভালো মানের চুমু মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কোনো যুগল ডিনারে প্রচুর পরিমাণে হাই-কোলেস্টেরল খাবার খেলেও উদ্বেগের খুব একটি কারণ নেই। ডিনার শেষে একান্তে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরকে চুম্বনে আবদ্ধ রাখলে সেই হাই-কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের বারোটা নাও বাজাতে পারে।

গবেষণার সময় চুমু খাওয়ার অনুমতি পাওয়া যুগলেরা জানিয়েছেন তারা কম চাপ অনুভব করছেন ও নিজেদের শরীরও বেশ ঝরঝরে লাগছে। এমনকি পরিমাপ করে দেখা গেছে তাদের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমেছে।
চুমু খেতে পারা গ্রুপের যুগলেরা গবেষণা চলার সময়ে বেশি ব্যায়াম করেছেন, কম ঝগড়া করেছেন, তর্ক করে সময় অপচয়ের আগ্রহও ছিল কম। একে অপরকে আরও ভালো বুঝতে পেরেছেন এই যুগলেরা।

আর বলাই বাহুল্য, চুমুবঞ্চিত যুগলদের ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল একদম উল্টো।

আরও পড়ুন:
মঙ্গল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করল রোবট
নাসার প্রধান বিল নেলসন
মঙ্গলের আকাশে উড়ল নাসার হেলিকপ্টার

শেয়ার করুন

কষ্ট পেলেও বিভা কেন হাসেন?

কষ্ট পেলেও বিভা কেন হাসেন?

মানুষ সব সময় আনন্দের কারণে হাসে না, শোক বা কষ্টের সময়েও হাসির ছাপ পড়তে পারে মুখে। ছবি: নিউজবাংলা

যতই লোকনিন্দা হোক, কঠিন চাপের মুহূর্তে হেসে ফেলা সব সময় কিন্তু খারাপ নয়। বরং কখনও কখনও এটি আমাদের ভালো থাকার জন্যই প্রয়োজন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার কাইনসিওলজি, স্পোর্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অনুষদের অধ্যাপক বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘আমার মনে হয় এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে হালকা হওয়ার জন্য বেশি বেশি হাসা প্রয়োজন। এসব পরিস্থিতিতে হাসি এক ধরনের ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে।’

কথায় কথায় হাসিতে ভেঙে পড়া নুসরাত জাবীন বিভাকে নিয়ে অফিসের সহকর্মীদের রসিকতার কোনো শেষ নেই। কাজের মাঝে বিভার এই হাসির দমক মাতিয়ে রাখে সবাইকে।

বিভাও চান আজীবন এভাবে হেসে যেতে, তবে এত হাসি নিয়ে খানিকটা দুঃখবোধও আছে এই তরুণীর। একবার পরিচিত এক নারী তার কষ্টের কথা বলছিলেন, সেই কথা কানে পৌঁছানোর আগেই বিভার মুখে ছড়িয়ে পড়ে স্বভাবসুলভ হাসি। কয়েক বছর আগের সেই ঘটনা মনে করে এখনও বিব্রত হন বিভা।

বিজ্ঞান বলছে, মানুষ সব সময় আনন্দের কারণেই হাসে না। তীব্র শোক বা কষ্টের সময়েও অট্টহাস্যে ফেটে পড়েন অনেকে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, বিভ্রান্তি, এমনকি বিব্রতবোধের অনুভূতি থেকেও হাসির ছাপ পড়তে পারে মুখে।

মৃত মানুষের দাফনের সময় শোকাবহ পরিবেশেও কেউ হেসে ফেলেছেন, এমন নজির অসংখ্য। তবে এই হাসি মোটেই আনন্দের নয়, বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুঃখের হাসিও মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং এ ধরনের ঘটনা হরহামেশা ঘটে আশপাশে।

হাসিকে সাধারণভাবে একটি মানসিক প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। মানুষ জন্মের তিন মাস বয়সেই হাসতে শেখে। এমনকি কোনো কোনো গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, গর্ভের শিশুর মুখমণ্ডলেও হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

নবজাতকের মুখে কথা ফুটতে শুরুর আগেই হাসির রেখা দেখা যায় কেন- তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, হাসি সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কথার চেয়েও বড় ভূমিকা রাখে। এটি এক জনের সঙ্গে আরেক জনের সম্পর্কের প্রাথমিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। গোমড়ামুখো মানুষের চেয়ে তাই হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা সমাজে অনেক বেশি।

তবে হাসি অনেক সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। শোকাবহ বা কষ্টের মুহূর্তেও কেন অনেকে হাসেন তা নিয়ে ১৯৬০ এর দশকে একটি গবেষণা করেছিলেন মনোবিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলগ্রাম। মিলগ্রাম অর্থের বিনিময়ে কিছু স্বেচ্ছাসেবক বেছে নিয়ে তাদেরকে ‘শিক্ষক’ মনোনীত করেছিলেন। এই শিক্ষকদের দায়িত্ব ছিল কিছু ‘শিক্ষার্থীকে’ প্রশ্ন করা। তবে শিক্ষার্থীরা আসলে ছিলেন একেকজন অভিনেতা, যা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত স্বেচ্ছাসেবকদের অজানা ছিল।

গবেষণার সময় বলা হয়েছিল, শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের ভুল উত্তর দিলে তাদের ১৫ থেকে ৪৫০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক দেয়া হবে। তবে বাস্তবে বিদ্যুতের তারে কোনো বিদ্যুৎপ্রবাহ ছিল না। স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষকেরা প্রশ্ন শুরুর পর একের পর এক ভুল উত্তর দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা (অভিনেতা)। এসব ভুলের জন্য তাদের দেহে শিক্ষকেরা বিদ্যুতের তার স্পর্শ করলে তারস্বরে অভিনেতারা চিৎকার শুরু করেন। এটি যে অভিনয় সেটি মোটেই বুঝতে পারেননি স্বেচ্ছাসেবকেরা।

এই গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৫ ভাগ স্বেচ্ছাসেবক কিছুক্ষণ পরেই শিক্ষার্থীদের ‘বৈদ্যুতিক শক’ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে ৬৫ ভাগ শকের মাত্রা বাড়াতে আগ্রহী ছিলেন। শিক্ষার্থীরা যখন আর্ত চিৎকারের অভিনয় করছিলেন, তখন অনেক স্বেচ্ছাসেবক ভয়ঙ্কর মানসিক চাপে ভুগলেও তাদের মুখ জুড়ে ছিল বিব্রতকর হাসি।

মজার বিষয় হল, কথিত শিক্ষার্থীদেরকে ‘শক’ দেয়ার মাত্রা যত বাড়ছিল শিক্ষকদের মানসিক চাপজনিত হাসিও তত বাড়ছিল। এই গবেষণার ভিত্তিতে স্ট্যানলি মিলগ্রাম সিদ্ধান্তে পৌঁছান, অপ্রতিরোধ্য আবেগ মানুষকে একটি বিশেষ শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ার দিকে পরিচালিত করে, আর সেই প্রতিক্রিয়া হলো- ‘হাসি’।

হাসি যতটা সহজ, ততটাই জটিল

হাসতে দেখলেই মানুষ আনন্দে আছেন, এমন ভাবনা মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলাই ভালো। একই ভাবে কান্নার ক্ষেত্রেও দুঃখের ধারণাও সব সময় ঠিক নয়। এ কারণেই প্রিয় মানুষকে কাছে পেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলার উদাহরণ অসংখ্য, আবার প্রিয়জনকে হারিয়ে হাহাকারের ভুলে অট্টহাসির ঘটনাও বিরল নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক কষ্টের মাঝে হাসির কারণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স জার্নালে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাদের নিবন্ধ

এই গবেষক দলটির দাবি, মানবীয় আবেগের সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ‘নাটকীয় বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া’র জন্ম দেয় অথবা শরীরে যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়ামূলক সংকেতকে (হাসি-কান্না) উসকে দিতে পারে। যেমন লটারিতে লাখ টাকা জয়ের আনন্দে যেখানে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কথা সেখানে আপনি কখনও কখনও চোখ পানিতে ভাসিয়ে ফেলতে পারেন, আবার প্রেমিকার চলে যাওয়ার কষ্টের মাঝেও আপনি হো হো করে হেসে উঠতে পারেন।

ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষক দল বলছেন, দৃশ্যত এই ‘অস্বাভাবিক’ প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ হলো, অতিশক্তিশালী কিছু মানসিক উদ্দীপনা, যার প্রকাশ ঘটে অনিয়ন্ত্রিত ভঙ্গীতে।

স্নায়ুবিজ্ঞানী ভি.এস. রামচন্দ্রন তার ‘আ ব্রিফ ট্যুর অফ হিউম্যান কনসাসনেস’ এ দাবি করেছেন, সাধারণ হাসি আর মানসিক চাপ-যন্ত্রণার মধ্যে হাসির মধ্যে শারীরবৃত্তীয় কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তার মতে, কষ্টের মধ্যে আমরা যে হাসি দিয়ে থাকি সেটি বেরিয়ে আসে গলার ভেতর থেকে, আর সাধারণ হাসির দমক আসে পেট থেকে। যে কারণে আনন্দের হাসির তোড়ে পেটে ব্যথা অনুভব করেন অনেকে।

রামচন্দ্রন বলছেন, কষ্টের মধ্যে হাসিরও বেশ কিছু উপযোগিতা আছে। চাপের মধ্যে থেকেও এই এ ধরনের মৃদু বা অট্টহাসিতে আমরা অপরকে আশ্বস্ত হতে সংকেত দেই। আমরা অন্যকে জানাতে চাই- ‘ঘাবড়াবেন না, আমি ভালো আছি। নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছি।’

হাসি কি ভালো ওষুধ?


কঠিন পরিস্থিতিতে হাসিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে মনে করার সামাজিক প্রবণতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসি আটকানোর চেষ্টাও যথেষ্ট বিব্রতকর। এ অবস্থা দূর করতে মেডিটেশনের মাধ্যমে মন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যেতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মনকে চাপমুক্ত রাখা সম্ভব। এর ফলে অনিয়ন্ত্রিত হাসির বিড়ম্বনাও এড়ানো যায়।

তবে যতই লোকনিন্দা হোক, কঠিন চাপের মুহূর্তে হেসে ফেলা সব সময় কিন্তু খারাপ নয়। বরং কখনও কখনও এটি আমাদের ভালো থাকার জন্যই প্রয়োজন।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার কাইনসিওলজি, স্পোর্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অনুষদের অধ্যাপক বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘আমার মনে হয় এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে হালকা হওয়ার জন্য বেশি বেশি হাসা প্রয়োজন। এসব পরিস্থিতিতে হাসি এক ধরনের ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাসি প্রাকৃতিক চাপমুক্তকরণ উপায় হিসেবে কাজ করে। হাসির মনোজাগতিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে এটি উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং চাপ কমায়।’

আমেরিকান জার্নাল অফ লাইফস্টাইল মেডিসিন জার্নালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে দাবি করা হয়, হাসি বেশ কিছু শারীরবৃত্তীয় সুবিধাও দিয়ে থাকে। চিকিত্সকরা হাসিকে কীভাবে একটি প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে কাজে লাগাতে পারেন, সে বিষয়ে পরামর্শও দেয়া হয়েছে ওই নিবন্ধে। গবেষণায় বলা হয়, হাসির সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম, পেশীর প্রশান্তি এবং বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি।

হাসি আমাদের শরীরে অক্সিজেন প্রবাহ বাড়ায় এবং এর ফলে প্রাকৃতিকভাবে মস্তিষ্কে এন্ডোরফিনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এই প্রক্রিয়াটি হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের মতো অঙ্গগুলোকে উদ্দীপ্ত করে। মানসিক চাপের সঙ্গে দেহের দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। হাসি উদ্বেগ কমিয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অট্টহাসি রক্তের মধ্যে অ্যান্টিবডি এবং টি-কোষের সংখ্যা বাড়াতেও সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বব্যাপী বেড়েছে বিষণ্নতা, এ অবস্থা কাটাতে বে-হিসাবী হাসির উপযোগিতাও বেড়েছে অনেক। বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘বিষণ্ন সময়ে আমরা যত বেশি জীবনের হালকা দিক খুঁজে পেতে পারি এবং হাসির সুযোগ তৈরি করতে পারি, তত আমরা ভালো থাকব। আপনি যদি হাসির সমস্ত সুবিধাগুলো একটি ট্যাবলেটে পুরে ফেলতে পারতেন, তবে নিঃসন্দেহে সেটি বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ওষুধের তালিকায় সবার ওপরে থাকত।’

আরও পড়ুন:
মঙ্গল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করল রোবট
নাসার প্রধান বিল নেলসন
মঙ্গলের আকাশে উড়ল নাসার হেলিকপ্টার

শেয়ার করুন

ধরা দিল মিল্কি ওয়ের প্রথম ‘পালক’

ধরা দিল মিল্কি ওয়ের প্রথম ‘পালক’

মিল্কি ওয়ের মাঝখানে পালক সদৃশ অংশটি ছয় হাজার থেকে ১৩ হাজার আলোকবর্ষ দূরের দুটি অংশকে যুক্ত করেছে। ছবি: সায়েন্স নিউজ

মানবজাতির ধারক এ ছায়াপথে পালক সদৃশ অংশটি আবিষ্কারের পর একে ‘গঙ্গোত্রী তরঙ্গ’ নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের দীর্ঘতম গঙ্গা নদীর উৎস যে হিমবাহ, সেটির নামে এ নামকরণ করা হয়েছে।

মনুষ্যজাতির গ্রহ এ পৃথিবীকে ঘিরে থাকা সৌর জগৎ যে ছায়াপথটির সদস্য, সেই মিল্কি ওয়ের প্রথম পরিচিত ‘পালক’ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গ্যাসে পরিপূর্ণ সেতুর মতো এই অংশটির মাধ্যমে বৃত্তাকার প্যাঁচবহুল ছায়াপথটির দুটি অংশ দৃশ্যত এক হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কি ওয়ের উপরিভাগের এই অংশটি দেখতে পাখির পালকের মতো। কেন্দ্র থেকে নির্গত ঠাণ্ডা ও ঘন গ্যাসের লম্বা আস্তর এ অংশটি ছায়াপথের দুটি প্রান্তের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে।

সায়েন্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়. চলতি মাসে বিজ্ঞান সাময়িকী অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্সে মূল গবেষণা প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে। মিল্কি ওয়েতে এবারই প্রথম এ ধরনের কোনো কাঠামো শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

মানবজাতির ধারক এ ছায়াপথে পালক সদৃশ অংশটি আবিষ্কারের পর একে ‘গঙ্গোত্রী তরঙ্গ’ নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের দীর্ঘতম গঙ্গা নদীর উৎস যে হিমবাহ, সেটির নামে এ নামকরণ করা হয়েছে।

জার্মানির কোলোনে ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট বীণা ভি.এস. জানান, হিন্দিসহ ভারতে প্রচলিত আরও কিছু ভাষায় মিল্কি ওয়েকে বলা হয় ‘আকাশা গঙ্গা’, যার অর্থ হলো ‘আকাশে বহমান গঙ্গা নদী’।

বীণা ভি.এস. ও তার সহকর্মীরা গঙ্গোত্রী তরঙ্গের আবিষ্কারক। চিলির স্যান পেদ্রো ডি আতাকামায় অবস্থিত অ্যাপেক্স টেলিস্কোপের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন তারা। ঘন ও সহজে শনাক্তযোগ্য বলে শীতল কার্বন মনোঅক্সাইডের খোঁজ করছিলেন তারা, পেয়ে গিয়েছেন গঙ্গোত্রী তরঙ্গের সন্ধান।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, এই কাঠামোটি মিল্কি ওয়ের ছয় হাজার থেকে ১৩ হাজার আলোকবর্ষ দূরের দুটি অংশকে যুক্ত করেছে। কার্বন মনোঅক্সাইড ছাড়াও এ অংশকে ঘিরে রয়েছে আরও অনেক ধরনের গ্যাস।

ছায়াপথের গঙ্গোত্রী তরঙ্গ অঞ্চলের আরেকটি ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য হলো ঢেউয়ের সঙ্গে সাদৃশ্য। হাজারো আলোকবর্ষ দীর্ঘ অংশটিতে সারাক্ষণই ঢেউ খেলে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞানীরা, যদিও এর কারণ অস্পষ্ট।

বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কি ওয়ের মতো অন্য ছায়াপথগুলোতেও গ্যাসে পূর্ণ অংশ আছে। কিন্তু মিল্কি ওয়ের ভেতরে থেকে এই ছায়াপথটির মানচিত্র তৈরি করা খুব কঠিন।

তবে ধীরে ধীরে মিল্কি ওয়ের ভেতরে এমন পালক সদৃশ আরও অনেক কাঠামো ও ছায়াপথের অংশ আবিষ্কার হবে বলে মনে করেন তারা। একটি একটি করে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো পুরো ছায়াপথটির মানচিত্র এঁকে ফেলাও সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন:
মঙ্গল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করল রোবট
নাসার প্রধান বিল নেলসন
মঙ্গলের আকাশে উড়ল নাসার হেলিকপ্টার

শেয়ার করুন

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন কতটা বিপজ্জনক

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন কতটা বিপজ্জনক

সার্স কভ টু-এর নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’ প্রথম শনাক্ত হয় বতসোয়ানায়। ছবি: সংগৃহীত

অত্যন্ত সংক্রামক ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের চেয়েও ওমিক্রনের মিউটেশন হয়েছে চার গুণ বেশি। ফলে এটি দ্রুত মানুষকে আক্রান্ত করতে সক্ষম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হওয়া মানেই সেটি অন্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় বেশি প্রাণঘাতী- এমনটি বলার সময় এখনও আসেনি।

কোভিডের জন্য দায়ী করোনাভাইরাস সার্স কভ টু-এর নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’ নিয়ে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে।

আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণের দেশ বতসোয়ানায় প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ভ্যারিয়েন্টের শুরুতে নাম ছিল ‘বি.১.১.৫২৯’, তবে শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম দেয় ‘ওমিক্রন’।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পাইক প্রোটিনে ৩০ বারের বেশি মিউটেশনের মধ্যে দিয়ে সার্স কভ টু ভাইরাসের নতুন ধরনটি তৈরি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই ধরনটির মিউটেশন হয়েছে ৫০ বারের বেশি।

অত্যন্ত সংক্রামক ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের চেয়েও ওমিক্রনের মিউটেশন হয়েছে চার গুণ বেশি। ফলে এটি দ্রুত মানুষকে আক্রান্ত করতে সক্ষম বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, ভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হওয়া মানেই সেটি অন্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় বেশি প্রাণঘাতী- এমনটি বলার সময় এখনও আসেনি। ‘ওমিক্রন’ নিয়ে গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

নতুন ধরনটি নিয়ে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। এর ভিত্তিতে ওমিক্রন নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে নিউজবাংলা।

নতুন ধরনটি কোথায়, কীভাবে প্রথম শনাক্ত হলো?

আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানায় ১১ নভেম্বর প্রথম ‘বি.১.১.৫২৯’ ভ্যারিয়েন্টটি শনাক্ত হয়, যাকে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওমিক্রন’ বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনার নতুন এই ধরনটি এরই মধ্যে সাউথ আফ্রিকাতেও শনাক্ত হয়েছে। দেশটির জোহানেসবার্গ ও প্রিটোরিয়াতে এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১২০০।

মিশর থেকে বেলজিয়াম ভ্রমণে যাওয়া একজনের দেহেও করোনার এই ধরনটি শনাক্ত হয়েছে। ইউরোপে বেলজিয়ামই প্রথম দেশ, যেখানে ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।

সাউথ আফ্রিকা থেকে হংকং ভ্রমণে আসা এক ব্যক্তির দেহেও শনাক্ত হয়েছে ওমিক্রন। এ ছাড়া মালাউয়ি থেকে ইসরায়েলে যাওয়া একজনের দেহে পাওয়া গেছে এই ভ্যারিয়েন্টের ভাইরাস। আরও দুজনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

ডাচ সরকার শুক্রবার সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে বিমান যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর দেশটি থেকে দুটি ফ্লাইটে আমস্টারডাম পৌঁছানো কয়েক শ যাত্রী করোনা পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় বিমানবন্দরে আটকে পড়েছেন।

নতুন ধরনটি কতটা বিপজ্জনক?

সার্স কভ টু ভাইরাসের নতুন ধরনটি নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগের মূল কারণ, এর অনেকবারের মিউটেশন। মিউটেশন হলো এমন এক অভিযোজন কৌশল যার মাধ্যমে ভাইরাস বিরূপ বা নতুন পরিস্থিতিতেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে।

বিজ্ঞানীরা ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনে ৩২টি মিউটেশন খুঁজে পেয়েছেন। অন্যদিকে অত্যন্ত সংক্রামক হিসেবে বিবেচিত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে মিউটেশন হয়েছে মাত্র আটবার।

স্পাইক প্রোটিনের বেশি মিউটেশন মানেই ভাইরাসটি বেশি প্রাণঘাতী, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বহুবার মিউটেশনের কারণে ওমিক্রনের সঙ্গে মানুষের দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার (ইমিউনিটি সিস্টেম) লড়াই করা কঠিন হতে পারে।

ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিন প্রচলিত করোনা ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের তুলনায় অনেকটা বদলে যাওয়ায় দেহের ইমিউনিটি সিস্টেম দ্রুত একে শনাক্ত করতে পারে না, ফলে এটি সংক্রমণের হার বাড়াতে পারে। যেকোনো করোনাভাইরাস এদের স্পাইকের সাহায্যেই শ্বাসতন্ত্রের কোষে যুক্ত হয়ে কোষের ভেতরে প্রবেশ করে।

প্রাথমিক গবেষণা অনুসারে, নতুন ভ্যারিয়েন্টটি টিকার কার্যক্ষমতা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে সক্ষম।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ভ্যারিয়েন্টের দুটি মিউটেশন- আর ২০৩কে এবং জি ২০৪আর ভাইরাসটির দ্রুত প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম। এ ছাড়া তিনটি মিউটেশন- এইচ৬৫৫ওয়াই, এন ৬৭৯কে এবং পি ৬৮১এইচ ভাইরাসটিকে আরও সহজে মানব কোষে প্রবেশে সাহায্য করে। তারা বলছেন, শেষ দুটি মিউটেশনের একসঙ্গে উপস্থিতি বিরল ঘটনা এবং এর ফলে ওমিক্রন টিকা প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার ইনস্টিটিউট অফ মলিকুলার বায়োটেকনোলজির আণবিক জীববিজ্ঞানী ডা. উলরিচ এলিংয়ের মতে, প্রাথমিক লক্ষণ থেকে মনে হচ্ছে করোনার নতুন রূপটি ডেল্টার চেয়ে ৫০০ শতাংশ বেশি সংক্রামক হতে পারে।

অবশ্য নতুন ভ্যারিয়েন্টটি সার্স কভ টুর আগের ধরনগুলোর তুলনায় বেশি প্রাণঘাতী- এমন কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি। তবে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে চাপে ফেলতে পারে।

নতুন ধরনটি কীভাবে তৈরি হলো?

ওমিক্রনের একসঙ্গে এত বেশি মিউটেশন নিয়ে বিস্মিত বিজ্ঞানীরা। কেউ কেউ বলছেন, কোভিড আক্রান্ত কোনো রোগীর বিশেষ শারীরিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভাইরাসটির একসঙ্গে এত মিউটেশন ঘটতে পারে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের কম্পিউটেশনাল বায়োলজি সিস্টেম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফ্রাঁসোয়া ব্যালোক্স মনে করেন, এমনটি হতে পারে, ভাইরাসটি বিশেষ কোনো ব্যক্তির দেহে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের সুযোগ পেয়েছিল। ওই ব্যক্তি হয়তো এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত ছিলেন এবং চিকিৎসা না করানোর কারণে তার ইমিউন সিস্টেম বেশ দুর্বল ছিল। তবে বিষয়টি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিশেষজ্ঞদের হাতে নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিক্রিয়া কী?

সার্স কভ টু-এর নতুন ধরনটি কতটা সংক্রামক বা বিপজ্জনক, সেটি সুনিশ্চিতভাবে বলার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার জরুরি বৈঠক করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

ওই বৈঠকে ‘বি.১.১.৫২৯’ ভ্যারিয়েন্টকে ‘উদ্বেগজনক ধরন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে ডাব্লিউএইচও। এ ছাড়া গ্রিক বর্ণমালার ওপর ভিত্তি করে এর নাম দেয়া হয় ‘ওমিক্রন’, যেমন এর আগে ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট’ নামকরণ হয়েছিল।

বেটা ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে নতুন ধরনটির কি কোনো সংযোগ আছে?

করোনাভাইরাস সংক্রমণ পুরো আফ্রিকা মহাদেশ, বিশেষ করে সাউথ আফ্রিকাকে বিপর্যস্ত করেছে। দেশটিতে এরই মধ্যে ৩০ লাখ মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন, এর মধ্যে মারা গেছেন প্রায় ৯০ হাজার মানুষ।

সাউথ আফ্রিকায় কোভিডে মৃত্যুর উচ্চ সংখ্যার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয় সি.১.২ বা বেটা ভ্যারিয়েন্টকে। সি.১.২ ভ্যারিয়েন্ট অত্যন্ত সংক্রামক এবং টিকাকে অনেকটা অকার্যকর করতে সক্ষম বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে ‘উদ্বেগজনক ধরন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।

তবে এরপর বেটার চেয়েও বেশি সংক্রামক হিসেবে এসেছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এটি সারা বিশ্বের পাশাপাশি সাউথ আফ্রিকাতেও বেটার চেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটিয়েছে।

ওমিক্রনের বিস্তার কি রোধ করা সম্ভব?

বাস্তবে সীমান্ত আটকে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। তবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারের গতি ধীর করা যেতে পারে। হংকং ও ইসরায়েলে যে দুজনের দেহে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে তারা সাউথ আফ্রিকা থেকে এসেছিলেন। এ কারণে অনেক দেশ সাউথ আফ্রিকাসহ আফ্রিকার বেশ কিছু অঞ্চলের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্য দেশ শুক্রবার সাউথ আফ্রিকাসহ আফ্রিকার দক্ষিণের সাতটি দেশ থেকে ইউরোপে সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সোমবার থেকে সাউথ আফ্রিকা এবং অন্য সাতটি দেশ থেকে আমেরিকান নন, এমন নাগরিকদের ভ্রমণ সীমিত করেছে।

এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ভাইরাসের নতুন ধরনটির বিস্তার ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার, বতসোয়ানায় ওমিক্রনের সংক্রমণ ধরা পড়ে নভেম্বরের মাঝামাঝিতে। এরপর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। ফলে এখন ফ্লাইট বন্ধ করলেও ধরে নেয়া যায়, ওমিক্রন এতদিনে আর আফ্রিকার সীমানায় আটকে নেই।

আরও পড়ুন:
মঙ্গল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করল রোবট
নাসার প্রধান বিল নেলসন
মঙ্গলের আকাশে উড়ল নাসার হেলিকপ্টার

শেয়ার করুন

অক্টোপাস, কাঁকড়ারও আছে আনন্দ-বেদনা

অক্টোপাস, কাঁকড়ারও আছে আনন্দ-বেদনা

যুক্তরাজ্যের গবেষকেরা বলছেন, অক্টোপাস, কাঁকড়া ও লবস্টারের মতো প্রাণী মানুষের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন উপায়ে বিশ্বকে অনুভব করে। গবেষণায় যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে, এই প্রাণীগুলো আনন্দ ও বেদনা অনুভব করে।

অক্টোপাস, কাঁকড়া ও লবস্টারকে ‘সংবেদনশীল প্রাণী’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে যুক্তরাজ্য। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে এসব প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা বৈজ্ঞানিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার মন্ত্রী লর্ড জ্যাক গোল্ডস্মিথ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বৈজ্ঞানিকভাবে এখন পরিষ্কার, ডেকাপড (খোলসে ঢাকা কাঁকড়া, লবস্টার চিংড়িজাতীয় প্রাণী) এবং সেফালোপড (শুঁড়ওয়ালা অক্টোপাস স্কুইডজাতীয় প্রাণী) ব্যথা অনুভব করতে পারে এবং এ কারণেই তাদের এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষার আওতায় আসা দরকার।’

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের তিনশরও বেশি গবেষণা ফলাফল পর্যালোচনা শেষে অক্টোপাস, কাঁকড়া ও লবস্টারের মতো প্রাণীদের ‘সংবেদনশীল প্রাণী’র স্বীকৃতি দিচ্ছে যুক্তরাজ্য। এ জন্য শিগগিরই দেশটির অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার সেন্টিয়েন্স বিল সংশোধন করা হবে।

নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রিয়ার মতো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে প্রাণিকল্যাণ আইনের অধীনে রয়েছে এসব প্রাণী।

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের গবেষক দল তাদের প্রতিবেদনে সংবেদনশীলতার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি হলো ব্যথা, আনন্দ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, উষ্ণতা, আনন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য ও উত্তেজনার মতো অনুভূতির ক্ষমতা।

গবেষণায় এসব অমেরুদণ্ডী প্রাণীর অনুভূতির আটটি পরিমাপ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিখন ক্ষমতা, ব্যথা অনুভবের স্নায়বিক উপস্থিতি এবং মস্তিষ্কের সঙ্গে এর সংযোগ, চেতনানাশক প্রতিক্রিয়া এবং এমন আচরণ যা আঘাতের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

গবেষণা প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ক্রাস্টেসিয়ান (খোলসে ঢাকা প্রাণী) এবং সেফালোপড নিঃসন্দেহে মানুষের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন উপায়ে বিশ্বকে অনুভব করে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাদের সেই অভিজ্ঞতা কি আনন্দ এবং বেদনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত?

‘আমরা বিশ্বাস করি, গবেষণায় যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে, এই প্রাণীগুলো আনন্দ ও বেদনা অনুভব করে।’

প্রতিবেদনে এসব প্রাণীর কল্যাণে ‘যৌক্তিক ও ব্যাপক’ পরিসরে পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে জীবন্ত অবস্থায় কাঁকড়া বা লবস্টারের খোলস উপড়ে না ফেলা অথবা আগুনে না পোড়ানো। শুধু প্রশিক্ষিত লোকজনকে এসব প্রাণী বিক্রির অনুমতি দেয়ার সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

কগনিটিভ সায়েন্স ফিলসফার জোনাথন বার্চ বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের আইনে সংশোধন এলে বড় ধরনের একটি দ্বিচারিতারও অবসান ঘটাবে। এতদিন ধরে অক্টোপাস ও অন্যান্য সেফালোপড প্রাণীরা কেবল বিজ্ঞান গবেষণায় সুরক্ষা পেয়েছে, এর বাইরে কোনো সুরক্ষা পায়নি।’

আরও পড়ুন:
মঙ্গল থেকে শিলার নমুনা সংগ্রহ করল রোবট
নাসার প্রধান বিল নেলসন
মঙ্গলের আকাশে উড়ল নাসার হেলিকপ্টার

শেয়ার করুন