একা কথা বলা সারায় তোতলামি: গবেষণা

একা কথা বলা সারায় তোতলামি: গবেষণা

শ্রোতা না থাকলে তোতলামি বন্ধ হয়ে যায় বলে সম্প্রতি এক গবেষণায় বলা হয়। ছবি: সায়েন্স এলার্ট

গবেষক জ্যাকসন বলেন, ‘ওই পরিবেশে অংশগ্রহণকারীরা একা রয়েছেন, এটা তাদের বিশ্বাস করাতে আমরা অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নিই। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীরা ওই পরিবেশে তোতলান না।’

বিশ্বের সাত কোটির বেশি মানুষ তোতলায় বলে ধারণা করা হয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও মাঝেমধ্যে ভাষণে তোতলান। কেন মানুষ তোতলায় এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তোতলামির সম্ভাব্য কারণ খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। এর মাধ্যমে তোতলামির চিকিৎসা করা যাবে বলেও মনে করছেন তারা।

সাম্প্রতিক ওই গবেষণায় বিশেষজ্ঞরা জানতে পারেন, প্রাপ্তবয়স্করা যদি মনে করেন, তাদের কথা কেউ শুনছে না, তাহলে তাদের তোতলামি আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যায়।

সায়েন্স এলার্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এতে অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বাস করেন, কথা বলার সময় তাদের চারপাশে কেউ ছিল না। তারা কী বলছেন, তা কেউ শোনেনি। ভিন্ন এই পরিস্থিতি সৃষ্টির ফলে তোতলামো থাকা ব্যক্তিদের কথাবার্তায় পরিবর্তন এ গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়।

নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট ও গবেষক এরিক জ্যাকসন বলেন, ‘বলা হয়, একা থাকলে তোতলামি থাকা ব্যক্তিরা তোতলান না।

‘তবে ল্যাবে পরীক্ষার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ তোতলানো ব্যক্তিরা ল্যাবে একা রয়েছেন, চারপাশে কেউ নেই, এটি তাদের আশ্বস্ত করা বেশ কঠিন।’

গবেষকরা ২৩ জন অংশগ্রহণকারীকে এ গবেষণায় যুক্ত করেন। পাঁচটি ভিন্ন পরিবেশে তাদের কথা বলা পরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষার অংশ হিসেবে ভলান্টিয়ারদের জোরে জোরে পড়তে বলা হয়। কখনো বা তাদের নিজে নিজে কথা বলতে বলা হয়, যেখানে তাদের বোঝানো হয় তাদের কথা কেউ শুনছে না। দুজন শ্রোতাকে একা একা বলা ওই কথাগুলো শোনানোর পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের গবেষকদের সঙ্গে আলাদা দুটি বাক্যালাপ করতে বলা হয়।

নিজে নিজে কথা বলার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের তিনটি কম্পিউটার কোডিং টাস্ক সম্পূর্ণ করতে বলা হয়।

অংশগ্রহণকারীদের গবেষকরা মিথ্যা বলেন যে কম্পিউটার টাস্ক করার সময় তাদের কথা কেউ শুনছে না। তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পাশাপাশি সেসব রেকর্ডও করেন গবেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, একমাত্র ওই পরিবেশেই সব অংশগ্রহণকারীর তোতলামো একেবারে ছিল না বললেই চলে।

গবেষক জ্যাকসন বলেন, ‘ওই পরিবেশে অংশগ্রহণকারীরা একা রয়েছেন, এটা তাদের বিশ্বাস করাতে আমরা অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নিই। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীরা ওই পরিবেশে তোতলান না।’

পরীক্ষা চলাকালে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে যে মিথ্যা বলা হয়, তা পরে তাদের জানানো হয়। জানার পর সব অংশগ্রহণকারী ওইভাবে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে সম্মত হন।

কোনো শ্রোতা না থাকায় কেন অংশগ্রহণকারীদের তোতলামি বন্ধ হয়ে যায়, এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি গবেষকরা।

তবে গবেষকরা মনে করছেন, কথা বলার সময় মানুষজন থাকলে তারা তাদের মূল্যায়ন করবে- এমন অনুভূতি অংশগ্রহণকারীদের কথাবার্তার সাবলীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

জেনেটিক্স ও নিউরোফিজিক্স মিলে তোতলামিতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে সামাজিক কোনো বাস্তবতায় শিশুরাও তোতলায়, তা এখনো জানতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।

জ্যাকসন বলেন, ‘আমি মনে করি, তোতলামি শুধু স্পিচ সমস্যা নয়। শক্তিশালী সামাজিক কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমার ধারণা।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

চুমু খেলে কমে কোলেস্টেরল

চুমু খেলে কমে কোলেস্টেরল

গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো মানের চুমু মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কোনো যুগল ডিনারে প্রচুর পরিমাণে হাই-কোলেস্টেরল খাবার খেলেও উদ্বেগের খুব একটি কারণ নেই। ডিনার শেষে একান্তে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরকে চুম্বনে আবদ্ধ রাখলে সেই হাই-কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের বারোটা নাও বাজাতে পারে।

ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করতে চুমুর বিকল্প নেই। শিল্প, চলচ্চিত্র বা সাহিত্যে তাই বারবারই এসেছে চুমুর জয়গান।

বিভিন্ন গবেষণাতেও এসেছে, সুখী জুটির পেছনে চুমুর সঙ্গোপন ভূমিকা। বলা হয়ে থাকে, দাম্পত্য সম্পর্ক ফিকে হয়ে যাওয়া ঠেকাতে চাইলে নিয়মিত চুমু খাওয়া ভুলে গেলে চলবে না।

এটা তো গেল সম্পর্কের আকর্ষণ ধরে রাখতে চুমুর টোটকা; বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্যও দীর্ঘ ও নিয়মিত চুমু খাওয়া প্রয়োজন। এটি সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা বজায় রাখার পাশাপাশি আপনাকে সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে।

বিষয়টি ঘেঁটে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোন স্টেট ইউনিভার্সিটির কমিউনিকেশনসের অধ্যাপক কোরি ফ্লয়েড ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণা চালিয়েছেন। ৫২ জোড়া বিবাহিত ও অবিবাহিত জুটিকে বেছে নিয়ে তারা যাচাই করেছেন চুমু খাওয়ার দৃশ্যমান বা পরিমাপযোগ্য কোনো সুবিধা আছে কিনা।

ফ্লয়েডের দল আগে থেকেই জানতেন, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ক্ষেত্রে চুমুর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ফলে তারা সম্পর্ক জোরদারে চুমুর প্রয়োজনীতা নিয়ে মাথা ঘামাননি; গবেষণায় দেখা হয়েছে, সুস্বাস্থ্যের উন্নতিতে চুমুর অবদান কী।

বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চুমুর সময়ে লালা বা থুতু বিনিময়ে মনোনিউক্লিওসিস (কিসিং ডিজিজ) ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। তবে ফ্লয়েড ও তার সহকর্মীরা চুম্বনের এই ঝুঁকির বাইরে উপকারিতাই বেশি খুঁজে পেয়েছেন।

তারা দেখেছেন, নিয়মিত চুমু খাওয়ার অভ্যাস অ্যালার্জির বিরুদ্ধে দেহের ইমিউন সিস্টেমকে তাতিয়ে তোলে। তার চেয়েও বড় কথা, মানসিক চাপ এক নিমিষে কমিয়ে দেয় গভীর ও দীর্ঘ চুমু।

স্নায়ুতন্ত্রের প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেমকেও চাঙা করে তোলে চুম্বন। সহজ কথায় প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম হলো স্নায়ুতন্ত্রের এমন কার্যকলাপ, যা আরামদায়ী বা নিশ্চিন্ত থাকার সময়ে দেহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় থাকা মানেই হলো বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ কমে যাওয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে, ত্বকে বিদ্যমান সিবাম নামের বিশেষ একটি পদার্থ চুমু খাওয়ার সময় সঙ্গীর দেহে পরিবাহিত হতে পারে। আর এই সিবাম মস্তিষ্ককে বন্ধন ও ভালোবাসার সঙ্গে সম্পর্কিত বিশেষ রাসায়নিক সিগন্যাল দেয়।

চুমুর আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বেরিয়ে এসেছে গবেষণায়। দেখা গেছে, ভালো মানের চুমু মানুষের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। কোনো যুগল ডিনারে প্রচুর পরিমাণে হাই-কোলেস্টেরল খাবার খেলেও উদ্বেগের খুব একটি কারণ নেই। ডিনার শেষে একান্তে দীর্ঘক্ষণ পরস্পরকে চুম্বনে আবদ্ধ রাখলে সেই হাই-কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের বারোটা নাও বাজাতে পারে।

গবেষণার সময় চুমু খাওয়ার অনুমতি পাওয়া যুগলেরা জানিয়েছেন তারা কম চাপ অনুভব করছেন ও নিজেদের শরীরও বেশ ঝরঝরে লাগছে। এমনকি পরিমাপ করে দেখা গেছে তাদের দেহে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমেছে।
চুমু খেতে পারা গ্রুপের যুগলেরা গবেষণা চলার সময়ে বেশি ব্যায়াম করেছেন, কম ঝগড়া করেছেন, তর্ক করে সময় অপচয়ের আগ্রহও ছিল কম। একে অপরকে আরও ভালো বুঝতে পেরেছেন এই যুগলেরা।

আর বলাই বাহুল্য, চুমুবঞ্চিত যুগলদের ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল একদম উল্টো।

শেয়ার করুন

কষ্ট পেলেও বিভা কেন হাসেন?

কষ্ট পেলেও বিভা কেন হাসেন?

মানুষ সব সময় আনন্দের কারণে হাসে না, শোক বা কষ্টের সময়েও হাসির ছাপ পড়তে পারে মুখে। ছবি: নিউজবাংলা

যতই লোকনিন্দা হোক, কঠিন চাপের মুহূর্তে হেসে ফেলা সব সময় কিন্তু খারাপ নয়। বরং কখনও কখনও এটি আমাদের ভালো থাকার জন্যই প্রয়োজন। কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার কাইনসিওলজি, স্পোর্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অনুষদের অধ্যাপক বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘আমার মনে হয় এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে হালকা হওয়ার জন্য বেশি বেশি হাসা প্রয়োজন। এসব পরিস্থিতিতে হাসি এক ধরনের ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে।’

কথায় কথায় হাসিতে ভেঙে পড়া নুসরাত জাবীন বিভাকে নিয়ে অফিসের সহকর্মীদের রসিকতার কোনো শেষ নেই। কাজের মাঝে বিভার এই হাসির দমক মাতিয়ে রাখে সবাইকে।

বিভাও চান আজীবন এভাবে হেসে যেতে, তবে এত হাসি নিয়ে খানিকটা দুঃখবোধও আছে এই তরুণীর। একবার পরিচিত এক নারী তার কষ্টের কথা বলছিলেন, সেই কথা কানে পৌঁছানোর আগেই বিভার মুখে ছড়িয়ে পড়ে স্বভাবসুলভ হাসি। কয়েক বছর আগের সেই ঘটনা মনে করে এখনও বিব্রত হন বিভা।

বিজ্ঞান বলছে, মানুষ সব সময় আনন্দের কারণেই হাসে না। তীব্র শোক বা কষ্টের সময়েও অট্টহাস্যে ফেটে পড়েন অনেকে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, বিভ্রান্তি, এমনকি বিব্রতবোধের অনুভূতি থেকেও হাসির ছাপ পড়তে পারে মুখে।

মৃত মানুষের দাফনের সময় শোকাবহ পরিবেশেও কেউ হেসে ফেলেছেন, এমন নজির অসংখ্য। তবে এই হাসি মোটেই আনন্দের নয়, বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুঃখের হাসিও মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এবং এ ধরনের ঘটনা হরহামেশা ঘটে আশপাশে।

হাসিকে সাধারণভাবে একটি মানসিক প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। মানুষ জন্মের তিন মাস বয়সেই হাসতে শেখে। এমনকি কোনো কোনো গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, গর্ভের শিশুর মুখমণ্ডলেও হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।

নবজাতকের মুখে কথা ফুটতে শুরুর আগেই হাসির রেখা দেখা যায় কেন- তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, হাসি সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কথার চেয়েও বড় ভূমিকা রাখে। এটি এক জনের সঙ্গে আরেক জনের সম্পর্কের প্রাথমিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। গোমড়ামুখো মানুষের চেয়ে তাই হাস্যোজ্জ্বল ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা সমাজে অনেক বেশি।

তবে হাসি অনেক সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। শোকাবহ বা কষ্টের মুহূর্তেও কেন অনেকে হাসেন তা নিয়ে ১৯৬০ এর দশকে একটি গবেষণা করেছিলেন মনোবিজ্ঞানী স্ট্যানলি মিলগ্রাম। মিলগ্রাম অর্থের বিনিময়ে কিছু স্বেচ্ছাসেবক বেছে নিয়ে তাদেরকে ‘শিক্ষক’ মনোনীত করেছিলেন। এই শিক্ষকদের দায়িত্ব ছিল কিছু ‘শিক্ষার্থীকে’ প্রশ্ন করা। তবে শিক্ষার্থীরা আসলে ছিলেন একেকজন অভিনেতা, যা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত স্বেচ্ছাসেবকদের অজানা ছিল।

গবেষণার সময় বলা হয়েছিল, শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের ভুল উত্তর দিলে তাদের ১৫ থেকে ৪৫০ ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক দেয়া হবে। তবে বাস্তবে বিদ্যুতের তারে কোনো বিদ্যুৎপ্রবাহ ছিল না। স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষকেরা প্রশ্ন শুরুর পর একের পর এক ভুল উত্তর দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা (অভিনেতা)। এসব ভুলের জন্য তাদের দেহে শিক্ষকেরা বিদ্যুতের তার স্পর্শ করলে তারস্বরে অভিনেতারা চিৎকার শুরু করেন। এটি যে অভিনয় সেটি মোটেই বুঝতে পারেননি স্বেচ্ছাসেবকেরা।

এই গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৫ ভাগ স্বেচ্ছাসেবক কিছুক্ষণ পরেই শিক্ষার্থীদের ‘বৈদ্যুতিক শক’ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে ৬৫ ভাগ শকের মাত্রা বাড়াতে আগ্রহী ছিলেন। শিক্ষার্থীরা যখন আর্ত চিৎকারের অভিনয় করছিলেন, তখন অনেক স্বেচ্ছাসেবক ভয়ঙ্কর মানসিক চাপে ভুগলেও তাদের মুখ জুড়ে ছিল বিব্রতকর হাসি।

মজার বিষয় হল, কথিত শিক্ষার্থীদেরকে ‘শক’ দেয়ার মাত্রা যত বাড়ছিল শিক্ষকদের মানসিক চাপজনিত হাসিও তত বাড়ছিল। এই গবেষণার ভিত্তিতে স্ট্যানলি মিলগ্রাম সিদ্ধান্তে পৌঁছান, অপ্রতিরোধ্য আবেগ মানুষকে একটি বিশেষ শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়ার দিকে পরিচালিত করে, আর সেই প্রতিক্রিয়া হলো- ‘হাসি’।

হাসি যতটা সহজ, ততটাই জটিল

হাসতে দেখলেই মানুষ আনন্দে আছেন, এমন ভাবনা মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলাই ভালো। একই ভাবে কান্নার ক্ষেত্রেও দুঃখের ধারণাও সব সময় ঠিক নয়। এ কারণেই প্রিয় মানুষকে কাছে পেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলার উদাহরণ অসংখ্য, আবার প্রিয়জনকে হারিয়ে হাহাকারের ভুলে অট্টহাসির ঘটনাও বিরল নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক কষ্টের মাঝে হাসির কারণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স জার্নালে ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাদের নিবন্ধ

এই গবেষক দলটির দাবি, মানবীয় আবেগের সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ‘নাটকীয় বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া’র জন্ম দেয় অথবা শরীরে যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়ামূলক সংকেতকে (হাসি-কান্না) উসকে দিতে পারে। যেমন লটারিতে লাখ টাকা জয়ের আনন্দে যেখানে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কথা সেখানে আপনি কখনও কখনও চোখ পানিতে ভাসিয়ে ফেলতে পারেন, আবার প্রেমিকার চলে যাওয়ার কষ্টের মাঝেও আপনি হো হো করে হেসে উঠতে পারেন।

ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষক দল বলছেন, দৃশ্যত এই ‘অস্বাভাবিক’ প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ হলো, অতিশক্তিশালী কিছু মানসিক উদ্দীপনা, যার প্রকাশ ঘটে অনিয়ন্ত্রিত ভঙ্গীতে।

স্নায়ুবিজ্ঞানী ভি.এস. রামচন্দ্রন তার ‘আ ব্রিফ ট্যুর অফ হিউম্যান কনসাসনেস’ এ দাবি করেছেন, সাধারণ হাসি আর মানসিক চাপ-যন্ত্রণার মধ্যে হাসির মধ্যে শারীরবৃত্তীয় কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তার মতে, কষ্টের মধ্যে আমরা যে হাসি দিয়ে থাকি সেটি বেরিয়ে আসে গলার ভেতর থেকে, আর সাধারণ হাসির দমক আসে পেট থেকে। যে কারণে আনন্দের হাসির তোড়ে পেটে ব্যথা অনুভব করেন অনেকে।

রামচন্দ্রন বলছেন, কষ্টের মধ্যে হাসিরও বেশ কিছু উপযোগিতা আছে। চাপের মধ্যে থেকেও এই এ ধরনের মৃদু বা অট্টহাসিতে আমরা অপরকে আশ্বস্ত হতে সংকেত দেই। আমরা অন্যকে জানাতে চাই- ‘ঘাবড়াবেন না, আমি ভালো আছি। নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করছি।’

হাসি কি ভালো ওষুধ?


কঠিন পরিস্থিতিতে হাসিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে মনে করার সামাজিক প্রবণতা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হাসি আটকানোর চেষ্টাও যথেষ্ট বিব্রতকর। এ অবস্থা দূর করতে মেডিটেশনের মাধ্যমে মন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা যেতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মনকে চাপমুক্ত রাখা সম্ভব। এর ফলে অনিয়ন্ত্রিত হাসির বিড়ম্বনাও এড়ানো যায়।

তবে যতই লোকনিন্দা হোক, কঠিন চাপের মুহূর্তে হেসে ফেলা সব সময় কিন্তু খারাপ নয়। বরং কখনও কখনও এটি আমাদের ভালো থাকার জন্যই প্রয়োজন।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ আলবার্টার কাইনসিওলজি, স্পোর্ট অ্যান্ড রিক্রিয়েশন অনুষদের অধ্যাপক বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘আমার মনে হয় এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে হালকা হওয়ার জন্য বেশি বেশি হাসা প্রয়োজন। এসব পরিস্থিতিতে হাসি এক ধরনের ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে।

‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাসি প্রাকৃতিক চাপমুক্তকরণ উপায় হিসেবে কাজ করে। হাসির মনোজাগতিক সুবিধার মধ্যে রয়েছে এটি উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং চাপ কমায়।’

আমেরিকান জার্নাল অফ লাইফস্টাইল মেডিসিন জার্নালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে দাবি করা হয়, হাসি বেশ কিছু শারীরবৃত্তীয় সুবিধাও দিয়ে থাকে। চিকিত্সকরা হাসিকে কীভাবে একটি প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে কাজে লাগাতে পারেন, সে বিষয়ে পরামর্শও দেয়া হয়েছে ওই নিবন্ধে। গবেষণায় বলা হয়, হাসির সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম, পেশীর প্রশান্তি এবং বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি।

হাসি আমাদের শরীরে অক্সিজেন প্রবাহ বাড়ায় এবং এর ফলে প্রাকৃতিকভাবে মস্তিষ্কে এন্ডোরফিনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। এই প্রক্রিয়াটি হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের মতো অঙ্গগুলোকে উদ্দীপ্ত করে। মানসিক চাপের সঙ্গে দেহের দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। হাসি উদ্বেগ কমিয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করে। গবেষণায় দেখা গেছে, অট্টহাসি রক্তের মধ্যে অ্যান্টিবডি এবং টি-কোষের সংখ্যা বাড়াতেও সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বব্যাপী বেড়েছে বিষণ্নতা, এ অবস্থা কাটাতে বে-হিসাবী হাসির উপযোগিতাও বেড়েছে অনেক। বিলি স্ট্রিয়ান বলছেন, ‘বিষণ্ন সময়ে আমরা যত বেশি জীবনের হালকা দিক খুঁজে পেতে পারি এবং হাসির সুযোগ তৈরি করতে পারি, তত আমরা ভালো থাকব। আপনি যদি হাসির সমস্ত সুবিধাগুলো একটি ট্যাবলেটে পুরে ফেলতে পারতেন, তবে নিঃসন্দেহে সেটি বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ওষুধের তালিকায় সবার ওপরে থাকত।’

শেয়ার করুন

ধরা দিল মিল্কি ওয়ের প্রথম ‘পালক’

ধরা দিল মিল্কি ওয়ের প্রথম ‘পালক’

মিল্কি ওয়ের মাঝখানে পালক সদৃশ অংশটি ছয় হাজার থেকে ১৩ হাজার আলোকবর্ষ দূরের দুটি অংশকে যুক্ত করেছে। ছবি: সায়েন্স নিউজ

মানবজাতির ধারক এ ছায়াপথে পালক সদৃশ অংশটি আবিষ্কারের পর একে ‘গঙ্গোত্রী তরঙ্গ’ নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের দীর্ঘতম গঙ্গা নদীর উৎস যে হিমবাহ, সেটির নামে এ নামকরণ করা হয়েছে।

মনুষ্যজাতির গ্রহ এ পৃথিবীকে ঘিরে থাকা সৌর জগৎ যে ছায়াপথটির সদস্য, সেই মিল্কি ওয়ের প্রথম পরিচিত ‘পালক’ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গ্যাসে পরিপূর্ণ সেতুর মতো এই অংশটির মাধ্যমে বৃত্তাকার প্যাঁচবহুল ছায়াপথটির দুটি অংশ দৃশ্যত এক হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কি ওয়ের উপরিভাগের এই অংশটি দেখতে পাখির পালকের মতো। কেন্দ্র থেকে নির্গত ঠাণ্ডা ও ঘন গ্যাসের লম্বা আস্তর এ অংশটি ছায়াপথের দুটি প্রান্তের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে।

সায়েন্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়. চলতি মাসে বিজ্ঞান সাময়িকী অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্সে মূল গবেষণা প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে। মিল্কি ওয়েতে এবারই প্রথম এ ধরনের কোনো কাঠামো শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

মানবজাতির ধারক এ ছায়াপথে পালক সদৃশ অংশটি আবিষ্কারের পর একে ‘গঙ্গোত্রী তরঙ্গ’ নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ভারতের দীর্ঘতম গঙ্গা নদীর উৎস যে হিমবাহ, সেটির নামে এ নামকরণ করা হয়েছে।

জার্মানির কোলোনে ইউনিভার্সিটির অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট বীণা ভি.এস. জানান, হিন্দিসহ ভারতে প্রচলিত আরও কিছু ভাষায় মিল্কি ওয়েকে বলা হয় ‘আকাশা গঙ্গা’, যার অর্থ হলো ‘আকাশে বহমান গঙ্গা নদী’।

বীণা ভি.এস. ও তার সহকর্মীরা গঙ্গোত্রী তরঙ্গের আবিষ্কারক। চিলির স্যান পেদ্রো ডি আতাকামায় অবস্থিত অ্যাপেক্স টেলিস্কোপের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন তারা। ঘন ও সহজে শনাক্তযোগ্য বলে শীতল কার্বন মনোঅক্সাইডের খোঁজ করছিলেন তারা, পেয়ে গিয়েছেন গঙ্গোত্রী তরঙ্গের সন্ধান।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, এই কাঠামোটি মিল্কি ওয়ের ছয় হাজার থেকে ১৩ হাজার আলোকবর্ষ দূরের দুটি অংশকে যুক্ত করেছে। কার্বন মনোঅক্সাইড ছাড়াও এ অংশকে ঘিরে রয়েছে আরও অনেক ধরনের গ্যাস।

ছায়াপথের গঙ্গোত্রী তরঙ্গ অঞ্চলের আরেকটি ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য হলো ঢেউয়ের সঙ্গে সাদৃশ্য। হাজারো আলোকবর্ষ দীর্ঘ অংশটিতে সারাক্ষণই ঢেউ খেলে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞানীরা, যদিও এর কারণ অস্পষ্ট।

বিজ্ঞানীদের মতে, মিল্কি ওয়ের মতো অন্য ছায়াপথগুলোতেও গ্যাসে পূর্ণ অংশ আছে। কিন্তু মিল্কি ওয়ের ভেতরে থেকে এই ছায়াপথটির মানচিত্র তৈরি করা খুব কঠিন।

তবে ধীরে ধীরে মিল্কি ওয়ের ভেতরে এমন পালক সদৃশ আরও অনেক কাঠামো ও ছায়াপথের অংশ আবিষ্কার হবে বলে মনে করেন তারা। একটি একটি করে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো পুরো ছায়াপথটির মানচিত্র এঁকে ফেলাও সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন কতটা বিপজ্জনক

করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন কতটা বিপজ্জনক

সার্স কভ টু-এর নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’ প্রথম শনাক্ত হয় বতসোয়ানায়। ছবি: সংগৃহীত

অত্যন্ত সংক্রামক ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের চেয়েও ওমিক্রনের মিউটেশন হয়েছে চার গুণ বেশি। ফলে এটি দ্রুত মানুষকে আক্রান্ত করতে সক্ষম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হওয়া মানেই সেটি অন্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় বেশি প্রাণঘাতী- এমনটি বলার সময় এখনও আসেনি।

কোভিডের জন্য দায়ী করোনাভাইরাস সার্স কভ টু-এর নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’ নিয়ে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে।

আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণের দেশ বতসোয়ানায় প্রথম শনাক্ত হওয়া এই ভ্যারিয়েন্টের শুরুতে নাম ছিল ‘বি.১.১.৫২৯’, তবে শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর নাম দেয় ‘ওমিক্রন’।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পাইক প্রোটিনে ৩০ বারের বেশি মিউটেশনের মধ্যে দিয়ে সার্স কভ টু ভাইরাসের নতুন ধরনটি তৈরি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই ধরনটির মিউটেশন হয়েছে ৫০ বারের বেশি।

অত্যন্ত সংক্রামক ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের চেয়েও ওমিক্রনের মিউটেশন হয়েছে চার গুণ বেশি। ফলে এটি দ্রুত মানুষকে আক্রান্ত করতে সক্ষম বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, ভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হওয়া মানেই সেটি অন্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় বেশি প্রাণঘাতী- এমনটি বলার সময় এখনও আসেনি। ‘ওমিক্রন’ নিয়ে গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

নতুন ধরনটি নিয়ে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। এর ভিত্তিতে ওমিক্রন নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব খুঁজেছে নিউজবাংলা।

নতুন ধরনটি কোথায়, কীভাবে প্রথম শনাক্ত হলো?

আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানায় ১১ নভেম্বর প্রথম ‘বি.১.১.৫২৯’ ভ্যারিয়েন্টটি শনাক্ত হয়, যাকে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওমিক্রন’ বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। করোনার নতুন এই ধরনটি এরই মধ্যে সাউথ আফ্রিকাতেও শনাক্ত হয়েছে। দেশটির জোহানেসবার্গ ও প্রিটোরিয়াতে এই ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১২০০।

মিশর থেকে বেলজিয়াম ভ্রমণে যাওয়া একজনের দেহেও করোনার এই ধরনটি শনাক্ত হয়েছে। ইউরোপে বেলজিয়ামই প্রথম দেশ, যেখানে ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।

সাউথ আফ্রিকা থেকে হংকং ভ্রমণে আসা এক ব্যক্তির দেহেও শনাক্ত হয়েছে ওমিক্রন। এ ছাড়া মালাউয়ি থেকে ইসরায়েলে যাওয়া একজনের দেহে পাওয়া গেছে এই ভ্যারিয়েন্টের ভাইরাস। আরও দুজনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

ডাচ সরকার শুক্রবার সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে বিমান যোগাযোগে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর দেশটি থেকে দুটি ফ্লাইটে আমস্টারডাম পৌঁছানো কয়েক শ যাত্রী করোনা পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় বিমানবন্দরে আটকে পড়েছেন।

নতুন ধরনটি কতটা বিপজ্জনক?

সার্স কভ টু ভাইরাসের নতুন ধরনটি নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগের মূল কারণ, এর অনেকবারের মিউটেশন। মিউটেশন হলো এমন এক অভিযোজন কৌশল যার মাধ্যমে ভাইরাস বিরূপ বা নতুন পরিস্থিতিতেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে।

বিজ্ঞানীরা ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনে ৩২টি মিউটেশন খুঁজে পেয়েছেন। অন্যদিকে অত্যন্ত সংক্রামক হিসেবে বিবেচিত ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে মিউটেশন হয়েছে মাত্র আটবার।

স্পাইক প্রোটিনের বেশি মিউটেশন মানেই ভাইরাসটি বেশি প্রাণঘাতী, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বহুবার মিউটেশনের কারণে ওমিক্রনের সঙ্গে মানুষের দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার (ইমিউনিটি সিস্টেম) লড়াই করা কঠিন হতে পারে।

ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিন প্রচলিত করোনা ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের তুলনায় অনেকটা বদলে যাওয়ায় দেহের ইমিউনিটি সিস্টেম দ্রুত একে শনাক্ত করতে পারে না, ফলে এটি সংক্রমণের হার বাড়াতে পারে। যেকোনো করোনাভাইরাস এদের স্পাইকের সাহায্যেই শ্বাসতন্ত্রের কোষে যুক্ত হয়ে কোষের ভেতরে প্রবেশ করে।

প্রাথমিক গবেষণা অনুসারে, নতুন ভ্যারিয়েন্টটি টিকার কার্যক্ষমতা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে সক্ষম।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন ভ্যারিয়েন্টের দুটি মিউটেশন- আর ২০৩কে এবং জি ২০৪আর ভাইরাসটির দ্রুত প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম। এ ছাড়া তিনটি মিউটেশন- এইচ৬৫৫ওয়াই, এন ৬৭৯কে এবং পি ৬৮১এইচ ভাইরাসটিকে আরও সহজে মানব কোষে প্রবেশে সাহায্য করে। তারা বলছেন, শেষ দুটি মিউটেশনের একসঙ্গে উপস্থিতি বিরল ঘটনা এবং এর ফলে ওমিক্রন টিকা প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার ইনস্টিটিউট অফ মলিকুলার বায়োটেকনোলজির আণবিক জীববিজ্ঞানী ডা. উলরিচ এলিংয়ের মতে, প্রাথমিক লক্ষণ থেকে মনে হচ্ছে করোনার নতুন রূপটি ডেল্টার চেয়ে ৫০০ শতাংশ বেশি সংক্রামক হতে পারে।

অবশ্য নতুন ভ্যারিয়েন্টটি সার্স কভ টুর আগের ধরনগুলোর তুলনায় বেশি প্রাণঘাতী- এমন কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি। তবে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে চাপে ফেলতে পারে।

নতুন ধরনটি কীভাবে তৈরি হলো?

ওমিক্রনের একসঙ্গে এত বেশি মিউটেশন নিয়ে বিস্মিত বিজ্ঞানীরা। কেউ কেউ বলছেন, কোভিড আক্রান্ত কোনো রোগীর বিশেষ শারীরিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভাইরাসটির একসঙ্গে এত মিউটেশন ঘটতে পারে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের কম্পিউটেশনাল বায়োলজি সিস্টেম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফ্রাঁসোয়া ব্যালোক্স মনে করেন, এমনটি হতে পারে, ভাইরাসটি বিশেষ কোনো ব্যক্তির দেহে দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের সুযোগ পেয়েছিল। ওই ব্যক্তি হয়তো এইচআইভি/এইডসে আক্রান্ত ছিলেন এবং চিকিৎসা না করানোর কারণে তার ইমিউন সিস্টেম বেশ দুর্বল ছিল। তবে বিষয়টি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বিশেষজ্ঞদের হাতে নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিক্রিয়া কী?

সার্স কভ টু-এর নতুন ধরনটি কতটা সংক্রামক বা বিপজ্জনক, সেটি সুনিশ্চিতভাবে বলার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে নেই। বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার জরুরি বৈঠক করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

ওই বৈঠকে ‘বি.১.১.৫২৯’ ভ্যারিয়েন্টকে ‘উদ্বেগজনক ধরন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে ডাব্লিউএইচও। এ ছাড়া গ্রিক বর্ণমালার ওপর ভিত্তি করে এর নাম দেয়া হয় ‘ওমিক্রন’, যেমন এর আগে ‘ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট’ নামকরণ হয়েছিল।

বেটা ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে নতুন ধরনটির কি কোনো সংযোগ আছে?

করোনাভাইরাস সংক্রমণ পুরো আফ্রিকা মহাদেশ, বিশেষ করে সাউথ আফ্রিকাকে বিপর্যস্ত করেছে। দেশটিতে এরই মধ্যে ৩০ লাখ মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন, এর মধ্যে মারা গেছেন প্রায় ৯০ হাজার মানুষ।

সাউথ আফ্রিকায় কোভিডে মৃত্যুর উচ্চ সংখ্যার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয় সি.১.২ বা বেটা ভ্যারিয়েন্টকে। সি.১.২ ভ্যারিয়েন্ট অত্যন্ত সংক্রামক এবং টিকাকে অনেকটা অকার্যকর করতে সক্ষম বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে ‘উদ্বেগজনক ধরন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে।

তবে এরপর বেটার চেয়েও বেশি সংক্রামক হিসেবে এসেছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এটি সারা বিশ্বের পাশাপাশি সাউথ আফ্রিকাতেও বেটার চেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটিয়েছে।

ওমিক্রনের বিস্তার কি রোধ করা সম্ভব?

বাস্তবে সীমান্ত আটকে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। তবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারের গতি ধীর করা যেতে পারে। হংকং ও ইসরায়েলে যে দুজনের দেহে ওমিক্রন শনাক্ত হয়েছে তারা সাউথ আফ্রিকা থেকে এসেছিলেন। এ কারণে অনেক দেশ সাউথ আফ্রিকাসহ আফ্রিকার বেশ কিছু অঞ্চলের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ সদস্য দেশ শুক্রবার সাউথ আফ্রিকাসহ আফ্রিকার দক্ষিণের সাতটি দেশ থেকে ইউরোপে সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সোমবার থেকে সাউথ আফ্রিকা এবং অন্য সাতটি দেশ থেকে আমেরিকান নন, এমন নাগরিকদের ভ্রমণ সীমিত করেছে।

এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ভাইরাসের নতুন ধরনটির বিস্তার ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার, বতসোয়ানায় ওমিক্রনের সংক্রমণ ধরা পড়ে নভেম্বরের মাঝামাঝিতে। এরপর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। ফলে এখন ফ্লাইট বন্ধ করলেও ধরে নেয়া যায়, ওমিক্রন এতদিনে আর আফ্রিকার সীমানায় আটকে নেই।

শেয়ার করুন

অক্টোপাস, কাঁকড়ারও আছে আনন্দ-বেদনা

অক্টোপাস, কাঁকড়ারও আছে আনন্দ-বেদনা

যুক্তরাজ্যের গবেষকেরা বলছেন, অক্টোপাস, কাঁকড়া ও লবস্টারের মতো প্রাণী মানুষের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন উপায়ে বিশ্বকে অনুভব করে। গবেষণায় যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে, এই প্রাণীগুলো আনন্দ ও বেদনা অনুভব করে।

অক্টোপাস, কাঁকড়া ও লবস্টারকে ‘সংবেদনশীল প্রাণী’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে যুক্তরাজ্য। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে এসব প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা বৈজ্ঞানিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার মন্ত্রী লর্ড জ্যাক গোল্ডস্মিথ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বৈজ্ঞানিকভাবে এখন পরিষ্কার, ডেকাপড (খোলসে ঢাকা কাঁকড়া, লবস্টার চিংড়িজাতীয় প্রাণী) এবং সেফালোপড (শুঁড়ওয়ালা অক্টোপাস স্কুইডজাতীয় প্রাণী) ব্যথা অনুভব করতে পারে এবং এ কারণেই তাদের এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষার আওতায় আসা দরকার।’

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের তিনশরও বেশি গবেষণা ফলাফল পর্যালোচনা শেষে অক্টোপাস, কাঁকড়া ও লবস্টারের মতো প্রাণীদের ‘সংবেদনশীল প্রাণী’র স্বীকৃতি দিচ্ছে যুক্তরাজ্য। এ জন্য শিগগিরই দেশটির অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার সেন্টিয়েন্স বিল সংশোধন করা হবে।

নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রিয়ার মতো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে প্রাণিকল্যাণ আইনের অধীনে রয়েছে এসব প্রাণী।

লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের গবেষক দল তাদের প্রতিবেদনে সংবেদনশীলতার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি হলো ব্যথা, আনন্দ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, উষ্ণতা, আনন্দ, স্বাচ্ছন্দ্য ও উত্তেজনার মতো অনুভূতির ক্ষমতা।

গবেষণায় এসব অমেরুদণ্ডী প্রাণীর অনুভূতির আটটি পরিমাপ মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিখন ক্ষমতা, ব্যথা অনুভবের স্নায়বিক উপস্থিতি এবং মস্তিষ্কের সঙ্গে এর সংযোগ, চেতনানাশক প্রতিক্রিয়া এবং এমন আচরণ যা আঘাতের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

গবেষণা প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ক্রাস্টেসিয়ান (খোলসে ঢাকা প্রাণী) এবং সেফালোপড নিঃসন্দেহে মানুষের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন উপায়ে বিশ্বকে অনুভব করে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তাদের সেই অভিজ্ঞতা কি আনন্দ এবং বেদনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত?

‘আমরা বিশ্বাস করি, গবেষণায় যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে, এই প্রাণীগুলো আনন্দ ও বেদনা অনুভব করে।’

প্রতিবেদনে এসব প্রাণীর কল্যাণে ‘যৌক্তিক ও ব্যাপক’ পরিসরে পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে জীবন্ত অবস্থায় কাঁকড়া বা লবস্টারের খোলস উপড়ে না ফেলা অথবা আগুনে না পোড়ানো। শুধু প্রশিক্ষিত লোকজনকে এসব প্রাণী বিক্রির অনুমতি দেয়ার সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

কগনিটিভ সায়েন্স ফিলসফার জোনাথন বার্চ বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের আইনে সংশোধন এলে বড় ধরনের একটি দ্বিচারিতারও অবসান ঘটাবে। এতদিন ধরে অক্টোপাস ও অন্যান্য সেফালোপড প্রাণীরা কেবল বিজ্ঞান গবেষণায় সুরক্ষা পেয়েছে, এর বাইরে কোনো সুরক্ষা পায়নি।’

শেয়ার করুন

মিথ্যা বললে রক্ষা নেই

মিথ্যা বললে রক্ষা নেই

মিথ্যা বলার সময় মানুষের অজান্তেই সক্রিয় হয় মুখের বেশ কিছু পেশি। ছবি: নিউজবাংলা

মিথ্যাবাদীর চেহারায় তার মনের ভাবের ছাপ পড়ে এমন ধারণা নতুন নয়। চার্লস ডারউইনের আমল থেকে এ ধারণা চলে এসেছে। তিনি নিজেও বেশ কিছু মনোবিদ্যার পরীক্ষা করেছিলেন। ১৮৭২ সালে এক গবেষণায় তিনি দেখেন, ‘মুখের যে সব পেশি আমাদের ইচ্ছার অধীনে নেই সেগুলো কখনও কখনও নিজে থেকে কোনো অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারে।’

কিছু মানুষ অবলীলায় বলে যান একের পর এক মিথ্যা। তাদের ভাবলেশহীন চোখ-মুখ দেখে মিথ্যা ধরা কঠিন। তবে এসব চতুর মিথ্যাবাদীর সামনে আসছে দুঃসময়। বিজ্ঞানীরা এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন, যাতে মিথ্যা বলে পার পাওয়া হবে কঠিন।

এই প্রযুক্তির বিশেষ সেন্সর মুখের পেশির অতি ক্ষুদ্র কম্পনকেও ঠিক ধরে ফেলতে সক্ষম। আর এর মাধ্যমে বোঝা যাবে, মনের ভেতরে কথা লুকিয়ে রেখে বাইরে আপনি কতটা মিথ্যা বলছেন। বিজ্ঞান বিষয়ক সাইট সায়েন্স অ্যালার্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রযুক্তি গড়পড়তা যে কোনো ব্যক্তির চেয়ে মিথ্যা কথা শনাক্তে অনেক ভালো কাজ করে।

ইসরায়েলের তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি এই সিস্টেম ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ঠিকঠাক মিথ্যা ধরতে পেরেছে। এই প্রক্রিয়ায় দুই ধরনের মিথ্যাবাদীকে ধরা গেছে।
বিহেভিওরাল নিওরোসায়েন্টিস্ট ডিনো লিভি বলেন, ‘এটি পুরোপুরি নিঁখুত নয়, কিন্তু অন্য অনেক ফেশিয়াল রেকগনিশন প্রযুক্তির চেয়ে বেশ ভালো।’

সত্যি ও মিথ্যা কথা বলা ৪০ জন স্বেচ্ছাসেবকের শরীরে লাগানো ইলেক্ট্রোড মুখের পেশির নড়াচড়া মেপে মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমকে তথ্য দিয়েছে। এতে করে ওই অ্যালগরিদমে মানুষের মুখের ভাবভঙ্গী থেকে ইঙ্গিতগুলো চিনতে শিখেছে আর্টিফিসিয়াল প্রযুক্তি।

গবেষকেরা বলছেন, পলিগ্রাফের মতো প্রচলিত সাধারণ মিথ্যা ধরার যন্ত্রগুলো হৃৎকম্পন, রক্তচাপ ও নিঃশ্বাসের মাত্রার হেরফেরের মতো শরীরিক বৈশিষ্ট্যগুলোর ওপর নির্ভর করে। তবে যে কেউ এ বৈশিষ্ট্যগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পলিগ্রাফ মেশিন ব্যবহার করলেও এ থেকে পাওয়া ফলকে নিঁখুত বলার উপায় নেই।

মিথ্যাবাদীর চেহারায় তার মনের ভাবের ছাপ পড়ে এমন ধারণা নতুন নয়। চার্লস ডারউইনের আমল থেকে এ ধারণা চলে এসেছে। তিনি নিজেও বেশ কিছু মনোবিদ্যার পরীক্ষা করেছিলেন। ১৮৭২ সালে এক গবেষণায় তিনি দেখেন, ‘মুখের যে সব পেশি আমাদের ইচ্ছার অধীনে নেই সেগুলো কখনও কখনও নিজে থেকে কোনো অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারে।’

তবে এসব পেশির পরিমাপ, নিয়ন্ত্রণ বা চিহ্নিত করা সহজ নয়। অনিচ্ছাকৃত, অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুদ্র-অভিব্যক্তিগুলো শুধু এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য দেখা যায়। ৪০ থেকে ৬০ মিলিসেকেন্ডের পরে অভিব্যক্তিগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়।

অভিব্যক্তি তৈরি করে মুখের এমন নির্দিষ্ট পেশি শনাক্ত করার জন্য বেশিরভাগ গবেষণায় ফেসিয়াল সারফেস ইলেক্ট্রোমাইয়োগ্রাফি বা এসইএমজি নামের একটি কৌশল ব্যবহার করা হয়। এটি মুখের পেশির বৈদ্যুতিক কর্মকাণ্ড পরিমাপ করে এবং মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন এমন সব সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি চিহ্নিত করতে পারে।

ইসরায়েলি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় একটি নতুন ধরনের পরিধানযোগ্য ইলেক্ট্রোড পরীক্ষা করা হয়েছে। এটি এসইএমজি ডিভাইসের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল ও আরামদায়ক। ভিডিও ফুটেজে মুখের অভিব্যক্তি পড়ার জন্য প্রশিক্ষিত একটি মেশিন লার্নিং টুলকেও গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে।

লিভি ব্যাখ্যা করেন, ‘এটা শুরুর দিককার একটা গবেষণা ছিল, যে কারণে খুব সাধারণ মিথ্যা কথা দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে।’

পরীক্ষায় দুই জন ব্যক্তিকে সামনাসামনি ইলেক্ট্রোড লাগিয়ে বসানো হয়। একজন হেডফোন লাগিয়ে কানে যা শুনছেন সেটা বলেন বা ভিন্ন কিছু বলেন। আর তার সামনে বসা ব্যক্তি ধরার চেষ্টা করেন কখন তিনি সঠিক কথা বলছেন।

দুই অংশগ্রহণকারী যখন অডিও শুনছে, কথা বলছে ও প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে সে সময় গবেষকেরা তাদের দুই ভ্রুর মাঝের পেশি (যাকে করুগেটর সুপারসিলিয়া বলা হয়) ও গালের পেশির (জাইগোম্যাটিকাস মেজর) কার্যকলাপ রেকর্ড করেন।

গবেষণায় ৪৮ জন অংশগ্রহণকারীর মিথ্যা বলার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন নিদর্শন বা ‘সূত্র’ পাওয়া গেছে। কিছু লোক মিথ্যা বলার সময় তাদের গালের পেশিগুলিকে সক্রিয় করে, কেউ বা তাদের ভ্রুর কাছে পেশি কুঁচকে ফেলে।

লিভি ও তার সহকর্মীরা গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘আমরা সব অংশগ্রহণকারীর মিথ্যা সফলভাবে ধরতে পেরেছি। মানুষের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া যন্ত্রের চেয়ে এর সফলতা অনেক বেশি।’
মিথ্যা কথা ধরার অ্যালগরিদমটি দিয়ে লিভি ও তার দল ২২ থেকে ৭৩ শতাংশ সময় যথাযথভাবে মিথ্যা কথা ধরতে পেরেছে।
গবেষকেরা বলছেন, পরীক্ষামূলক অ্যালগরিদমটির আরও উন্নতি দরকার। কারণ দেখা গেছে, মানুষের যেসব পেশি তথ্য প্রকাশ করে সেগুলো বদলাতে থাকে।

তবে দুর্ভাবনার বিষয় হলো, যেসব ব্যক্তি সফলভাবে তাদের পার্টনারকে প্রতারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাদেরকে মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদমও খুব একটা শনাক্ত করতে পারেনি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তব জীবনে বা জটিল পরিস্থিতিতে মিথ্যা শনাক্ত করা আরও চ্যালেঞ্জিং। মিথ্যাবাদীরা সাধারণত মিথ্যা ও অর্ধ-সত্য মেশানো দীর্ঘ গল্প শোনান। এছাড়া মিথ্যা বলার সময় অনেকে শব্দ বাদ দিয়ে দেন, এড়িয়ে যান বা সত্য ঢাকতে দুর্বোধ্যভাবে কথা বলেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

দ্য টাইমস অফ ইসরায়েলকে লিভি বলেন, ‘ আমরা আশা অরি আরও উন্নতি ও সফল পরীক্ষার পর এটি পলিগ্রাফের শক্ত বিকল্প হিসেবে দাঁড়াবে।’

লিভি ও তার সহকর্মীদের ধারণা, ইমেজ প্রসেস করার যে যন্ত্র সেটিকে আরও উন্নত করে কণ্ঠের পরিবর্তন নিয়ে যে সব প্রযুক্তি কাজ করে সেগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা যাবে।

শেয়ার করুন

তারাদের বয়স গণনা কীভাবে

তারাদের বয়স গণনা কীভাবে

মহাবিশ্বে একেকটি ছায়াপথ মানে নানা বয়সী বিপুলসংখ্যক তারার সমাহার। ছবি: সংগৃহীত

বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর তথ্য সংগ্রহের পরও সুপরিচিত তারারা বিজ্ঞানীদের নিত্যনতুন চমক দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৯ সালে রেড সুপারজায়ান্ট হিসেবে পরিচিত বেটেলজিউস তারার আলো ম্লান হয়ে যেতে শুরু করে। সে সময় বিজ্ঞানীরা বুঝে উঠতে পারেননি সেখানে ঠিক কী ঘটছে। অনেকে ভেবেছিলেন যে তারাটি সুপারনোভা হিসেবে মহাজাগতিক বিস্ফোরণের শিকার হতে যাচ্ছে। পরে জানা যায় যে মানুষের মন খারাপের মতোই তারাদেরও মাঝে মাঝে নিভু নিভু দিন যেতে পারে।

দূর আকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্র বা তারারা আজও অধরা রয়ে গেলেও তাদের রহস্যভেদ হয়েছে আগেই। তারাদের বিষয়ে বহুকালের অনেক অজানা তথ্যই আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন জানা।

কয়েক শ বছর ধরে রাতের আকাশে তারাদের দিকে টেলিস্কোপ ধরে রাখার পর জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর সাধারণ নক্ষত্রপ্রেমীরাও আজ যেকোনো তারার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো বলে দিতে পারে সহজেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে তারার ভর, গঠন ইত্যাদির কথা।

তারার ভর হিসাব করার প্রক্রিয়া তেমন কঠিন নয়। কোনো সঙ্গী তারা থাকলে সেটিকে প্রদক্ষিণরত তারাটি ঘুরে আসতে কত সময় নেয়, তা জানা এবং এরপর খানিকটা বীজগণিতের সূত্র প্রয়োগ করলেই জানা যাবে দ্বিতীয় তারাটির ভর। তারাটি কিসে তৈরি, তা জানতে হলে পরীক্ষা করতে হবে সেটি থেকে বিচ্ছুরিত আলোর বর্ণচ্ছটা।

সায়েন্স নিউজ ফর স্টুডেন্টসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আজও তারাদের বিষয়ে যে রহস্য পুরোপুরি ভেদ করে উঠতে পারেননি বিজ্ঞানীরা, সেটি হলো তারাদের বয়স যাচাই।

বাল্টিমোরের স্পেস টেলিস্কোপ সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডেভিড সোডারব্লোম বলেন, ‘একমাত্র সূর্যের বয়সই জানি আমরা। অন্য তারাদের সম্ভাব্য বয়স জানতে সেগুলোর বিষয়ে হাতে থাকা তথ্য আর অন্য তারাদের সঙ্গে সেগুলোর তুলনামূলক একটি সম্পর্ক দাঁড় করাই আমরা।’

বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর তথ্য সংগ্রহের পরও সুপরিচিত তারারা বিজ্ঞানীদের নিত্যনতুন চমক দিয়ে যাচ্ছে।

২০১৯ সালে রেড সুপারজায়ান্ট হিসেবে পরিচিত বেটেলজিউস তারার আলো ম্লান হয়ে যেতে শুরু করে। সে সময় বিজ্ঞানীরা বুঝে উঠতে পারেননি সেখানে ঠিক কী ঘটছে। অনেকে ভেবেছিলেন যে তারাটি সুপারনোভা হিসেবে মহাজাগতিক বিস্ফোরণের শিকার হতে যাচ্ছে। পরে জানা যায় যে মানুষের মন খারাপের মতোই তারাদেরও মাঝে মাঝে নিভু নিভু দিন যেতে পারে।

আমাদের সৌরজগতের একমাত্র নক্ষত্র সূর্যের আচরণ অন্য মধ্যবয়সী নক্ষত্রের মতো নয় বলে যেদিন বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করলেন, সেদিনও অনেক নতুন হিসাবের সামনে দাঁড়াতে হয়েছিল তাদের।

বিজ্ঞানীরা জেনেছেন যে সমবয়সী ও সমভরের অন্য নক্ষত্রদের মতো সূর্যের চৌম্বকক্ষেত্র সমান সক্রিয় নয়। এর অর্থ হলো, মধ্যবয়সী তারাদের আচরণও এখন পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্ধারণ করতে পারেননি গবেষকরা।

পদার্থবিদ্যার সূত্র ব্যবহার করে এবং পরোক্ষ বিভিন্ন পরিমাপের সঙ্গে তুলনা করে একটি তারার বয়স কেবল ধারণা করে নিতে পারেন বিজ্ঞানীরা। রকমভেদ অনুযায়ী একেক ধরনের তারার ক্ষেত্রে একেকটি পদ্ধতি অধিক কার্যকর বলে বিভিন্ন সময়ে জানা গেছে।

তারার বয়স নির্ণয় জরুরি কেন

মহাবিশ্বে একেকটি ছায়াপথ মানে নানা বয়সী বিপুলসংখ্যক তারার সমাহার। তারাদের বয়স জানা গেলে সংশ্লিষ্ট ছায়াপথের সৃষ্টি-বিবর্তন, কীভাবে সেটিতে বিভিন্ন গ্রহের জন্ম ইত্যাদি বিষয়ে বিশদ তথ্য জানা সম্ভব হতে পারে। তারার বয়স নির্ণয়ের মাধ্যমে অন্য সৌর জগৎগুলোতে প্রাণ সন্ধানের কাজও সহজ হয়ে যেতে পারে।

তারাদের জন্ম কীভাবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের ভালোই ধারণা আছে। তারাদের জীবনের গতি-প্রকৃতি, মৃত্যুর তথ্যও আর রহস্যে আটকে নেই। যেমন কম বয়সী তারায় হাইড্রোজেনের আধিক্য থাকে। দীর্ঘ সময় সেই হাইড্রোজেন জ্বালানির অনেকটা পুড়ে যাওয়ার পর তারারা নিভু নিভু হয়ে যায়। একপর্যায়ে এসব তারার মাধ্যমে মহাবিশ্বে গ্যাস ছড়িয়ে যায়- কখনও বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে, কখনও সামান্য গোঙানির পরই সেগুলো জড় পদার্থে রূপ নেয়।

এই একেকটি ধাপ একেকটি তারার জীবনে কখন আসে, সেটি সঠিকভাবে নির্ণয় করতে গিয়েই ধাঁধায় পড়ে যান বিজ্ঞানীরা। ভরের ওপর নির্ভর করে অনেক তারাই বয়সের মাইলফলক ছোঁয়ার পরেও বহু পথ পাড়ি দেয়, অনেক তারা তার আগেই নিভে যায়।

বিশাল নক্ষত্রের অনেকগুলোরই মৃত্যু ঘটেছে তুলনামূলক কম বয়সে। শত-কোটি বছর ধরে স্থিরভাবে জ্বলজ্বলে থেকে যাওয়া বিশাল আকৃতির তারার সংখ্যা হাতে গোনা।

বিংশ শতাব্দীতে ইজনার হারৎজস্প্রাং ও হেনরি নরিস রাসেল নামের দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী বয়সভেদে নক্ষত্রের তালিকা তৈরির নতুন একটি ধারণার প্রচলন করেন। তারা প্রতিটি তারার তাপমাত্রার সঙ্গে এর উজ্জ্বলতার তুলনামূলক ছক তৈরি করেছেন। সব তথ্য এক জায়গায় এনে বয়স অনুযায়ী তারাদের শ্রেণিবিভাগের এই ডায়াগ্রামটি হারৎজস্প্রাং-রাসেল ডায়াগ্রামস নামে পরিচিত।

বর্তমানে ওই নমুনাগুলো ব্যবহার করেই গুচ্ছ তারা, অর্থাৎ একই সময়ে জন্মেছে বলে মনে করা হয়- এমন তারাদের বয়সের একটি সাধারণ হিসাব বের করেন বিজ্ঞানীরা।

শেয়ার করুন