তালেবানের সমর্থনে আপাদমস্তক কালো কাপড়ে মোড়ানো নারীদের সমাবেশের কিছু ছবি ভাইরাল হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শতাধিক নারীর অংশগ্রহণে ওই সমাবেশ কাবুলের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় গত ১১ সেপ্টেম্বর।
সে সময় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, তালেবানের জেন্ডার বৈষম্যমূলক কট্টর নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওই সমাবেশে অংশ নেন প্রায় ৩০০ নারী। কথিত ইসলামপন্থিদের সমর্থনে এবং পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে সমাবেশে কথা বলেছিলেন নারী বক্তারা; শ্রোতার আসনে থাকা নারীরা উড়িয়েছিলেন তালেবানের পতাকা।
তালেবানের আরোপিত নিয়ম মেনে কঠিন রক্ষণশীল পোশাকে শিক্ষা গ্রহণের বার্তা দিয়েছিলেন তারা। হাতে গোনা কয়েকজন নীল রঙের বোরকা পরলেও বেশির ভাগই ছিলেন কালো নিকাবে। চোখ বাদে পুরো শরীর ঢাকা ছিল তাদের, চোখেও ছিল পাতলা কাপড়ের আবরণ, হাতে ছিল গ্লাভস।
সমাবেশে অংশ নেয়া কয়েকজন নারীর বরাত দিয়ে টার্কিশ রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশনের (টিআরটি) প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবানের প্রতি নারীদের সমর্থন দেখানোর ওই আয়োজন পুরোটাই ছিল সাজানো।
তালেবান নারীদের অধিকার হরণ করছে বলে বিশ্বজুড়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা মিথ্যা প্রমাণে নারীদের বাধ্য করা হয়েছিল ওই সমাবেশে অংশ নিতে। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বকে দেখানো যে, আফগান নারীরা তালেবানের শাসনে, নতুন কঠোর জীবনবিধানে সন্তুষ্ট।
সমাবেশে অংশ নেয়া নারী মারজানা (ছদ্মনাম)। আয়োজনে নিজের অংশ নেয়ার নেপথ্যের ঘটনা তিনি জানিয়েছেন নিজ বাড়িতে বসেই। তাও শোনা যায় না এমন কণ্ঠে, রীতিমতো ফিসফিস করে কথা বলছিলেন তিনি। সে কণ্ঠেও স্পষ্ট ছিল আতঙ্ক।
তিনি বলেন, ‘অনেকে বোরকা পরেই উপস্থিত হয়েছিলেন। আমিসহ বাকিদের কালো বোরকা পরতে দেয়া হয়েছিল। আমাদের পুরো মুখ ঢেকে ছিল ওই পোশাকে।’
সেদিন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের শহীদ রাব্বানি এডুকেশন ইউনিভার্সিটির লেকচার থিয়েটারে সমবেত হয়েছিলেন ওই নারীরা। তালেবানের সমর্থনে লেখা প্ল্যাকার্ড ছিল তাদের হাতে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির অধ্যাপক মারজানা আরও জানান, এক শিক্ষার্থীকে আগে লিখে রাখা একটি বক্তব্য লেকচার হলে পড়ে শোনাতে বলা হয়। ইংরেজি ভাষায় লেখা ছিল বক্তব্যটি।
অনুষ্ঠানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অনেক মানুষ তালেবানের প্রতি নারীদের সমর্থনের সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এর একটি কারণ ছিল, লেকচার থিয়েটারের অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার আগে বা পরে কাবুলের রাস্তায় একই পোশাক আর প্ল্যাকার্ড হাতে নারীদের সারি বেঁধে হেঁটে যাওয়ার ছবি।
সেসব ছবিতে নারীদের পাহারায় অস্ত্র হাতে তালেবান যোদ্ধাদেরও উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছিল।
ওই সমাবেশের আগে ও পরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন তালেবানবিরোধী বিক্ষোভে চড়াও হতে দেখা গিয়েছে সশস্ত্র এই তালেবান যোদ্ধাদের। বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করায় আফগান সংবাদকর্মীদেরও নির্মমভাবে পিটিয়েছিল তালেবান যোদ্ধারা।
সেই তালেবান যোদ্ধারাই আবার তাদের সমর্থনে হওয়া সমাবেশের খবর প্রচারে সাংবাদিকদের ডেকে পাঠিয়েছিল।
প্রশ্ন উঠেছিল সমাবেশে অংশ নেয়া নারীদের পরনে থাকা বোরকার ধরন নিয়েও। বেশির ভাগ নারীই হাত গ্লাভসে আর চোখ-মুখ নিকাবে ঢেকে রেখেছিলেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরা ছিলেন কালো বোরকা।
অর্থাৎ বহির্বিশ্ব, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে আফগান নারীদের বোরকা পরা নিয়ে যে ধারণা প্রচলিত, সেটাই স্পষ্ট ছিল সমাবেশে অংশ নেয়া নারীদের পোশাকে।
আরব বিশ্বে প্রচলিত কালো রঙের বোরকার তিনটি অংশ আলাদা- গলা থেকে পা পর্যন্ত একটি ঢোলা আলখাল্লা, মাথা ঢাকার কাপড় ও মুখ ঢাকার নিকাব। এ ধরনের পোশাকই পরেছিলেন সমাবেশে অংশ নেয়া বেশির ভাগ নারী।
অথচ আফগান নারীরা সাধারণত নীল রঙের বোরকা পরেন। আফগানিস্তানের প্রচলিত বোরকা মানে বিশাল একখণ্ড নীল রঙের কাপড়, যা দিয়ে নারীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত, এমনকি চোখও ঢাকা থাকে।
তালেবানের সমর্থনে সমাবেশে অংশ নেয়া আরেক নারী নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মুখসহ সারা শরীর ঢেকে নিতে কালো রঙের বোরকাগুলো আমাদের তালেবান যোদ্ধারা দিয়েছিল। আমি পরতে চাইনি ওই পোশাক।
‘যখন বলেছিলাম যে আমি পরব না এই বোরকা, ওরা চিৎকার শুরু করল। মোট কথা, ওই পোশাক পরতে তারা আমাদের বাধ্য করেছে। তারপর চুপচাপ থিয়েটারে গিয়ে বসে থাকতে বলেছে।
‘বোরকার ভেতরে ঢোকার পর আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। তারা বক্তৃতা দিচ্ছিল। আমি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু শুনেছি।’
ছবি ও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বিশ্লেষণেও এটা স্পষ্ট হয়েছে যে ওই সমাবেশ শুধু যে তালেবানের অনুমতিতে হয়েছিল তা-ই নয়, আয়োজনও করেছিল খোদ তালেবানই।
তালেবানের সমর্থনে ওই সমাবেশের এক বক্তা বলেছিলেন, তালেবানবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয়া নারীরা ‘প্রকৃত আফগান নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেন না এবং তারা আফগানিস্তানের মুখ নন। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে আফগান নারীদের মিথ্যা ভাবমূর্তি তুলে ধরছেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদেরও সাক্ষাৎকার নেয়ার চেষ্টা করেছিল টিআরটি। কিন্তু সাড়া পায়নি। তালেবানের সমর্থনে ওই অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছায় অংশ নেয়া নারী শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকার নেয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল। সাড়া দেননি তারাও।
সমাবেশের ছবি ভাইরাল হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। কয়েক শ আফগান নারী টুইটারে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক পরা ছবি প্রকাশ করেন। ‘ডু নট টাচ মাই ক্লোথস’ হ্যাশট্যাগে টুইটারে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন তারা।
টুইটারে বিবিসির সাংবাদিক সোদাবা হায়দারে বলেন, ‘এটাই আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক। আমাদের তো ভাত খাওয়ার চালটাও রঙিন। একই রকম রঙিন আমাদের জাতীয় পতাকাও।’
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রথম দফায় প্রায় ছয় বছর আফগানিস্তান শাসন করেছিল ধর্মভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন তালেবান। নব্বইয়ের দশকের শাসনামলে মেয়েশিশু, কিশোরী ও নারীদের শিক্ষা গ্রহণ, জীবিকা উপার্জন, বেড়ানোসহ সব ধরনের মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল গোষ্ঠীটি। পরিবারের পুরুষ সদস্য ছাড়া বাড়ির বাইরে পা রাখারও অনুমতি ছিল না নারীদের।
২০ বছরের ব্যবধানে গত ১৫ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান। শুরুতে নব্বইয়ের দশকের মতো কঠোর নিয়ম চালু না করার আশ্বাস দিলেও সে কথা রাখেনি গোষ্ঠীটি।
এরই মধ্যে আফগানিস্তানের নারী মন্ত্রণালয় স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে নতুন শাসক গোষ্ঠী। রাজধানী কাবুলে নগর প্রশাসনের নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়িতে থাকার আদেশ দিয়েছে। ছাত্র-শিক্ষকদের নিয়ে সব স্কুল চালু হলেও স্কুলে যাচ্ছে না ছাত্রী ও শিক্ষিকারা।
ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে শিক্ষা গ্রহণে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে বলে রোববার নিশ্চিত করেছেন তালেবানশাসিত সরকারের উচ্চশিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল বাকি হাক্কানি। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হলে নারীদের হিজাব পরতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মারজানা বলেন, ‘আমরা পড়াশোনা করার কিংবা কাজে ফেরার অনুমতি পাব কি না জানি না। স্পষ্ট করে কিছুই বলা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, কে জানে।’
A female student of Kabul University: "The Taliban pressured us to gather in the university hall for an hour with the black robes they had distributed, and they told us that if you do not attend, you will be expelled from university And you will never go to university anywhere." pic.twitter.com/aRlVqpxA4C
— Natiq Malikzada (@natiqmalikzada) September 11, 2021
ছবি: সংগৃহীত
রাজনৈতিক দল হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে আওয়ামী লীগের বিচার দলটির করা আইনেই করা সম্ভব বলে জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, টানা শাসনামলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নানান অপরাধ সংঘটন করেছে। সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির দায় থেকেও দলটির শীর্ষ নেতারা বহু কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছেন এবং আইন অনুযায়ী এসবের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে নিজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এসব কথা বলেন।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছিল। আর এই দুটি আইনেই এ ধরনের অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে।
জামায়াতকে নিষিদ্ধের উদাহরণ টেনে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ এর ১৮ ধারা ব্যবহার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এসব কিছুই দলটি প্রণয়ন করে রেখেছিল। অন্য কোনো সরকার এমন আইন প্রণয়ন করেনি। অর্থাৎ দল নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াসহ সব ধরনের আইনই বিভিন্ন সময় শাসনব্যবস্থায় এসে সংশোধন বা প্রণয়ন করেছিল আওয়ামী লীগ। সংবিধানও সংযোজন করেছে দলটি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। তাদের আইনটিই ব্যবহার করা হচ্ছে। অতএব দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারও এসব আইনে হবে।
জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে। নির্বিচারে ছাত্র-জনতার ওপর তাদের সরকারের বিভিন্ন বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগটি যথাযথভাবে তদন্ত করছে আমাদের তদন্ত সংস্থা। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপরাধও আলাদাভাবে তদন্ত করার সুযোগ রয়েছে। এসব তদন্তের পর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগের প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।
ফাইল ছবি
ঢাকাকে ঘিরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং এক ভয়াবহ বাস্তবতা। নগরবিদ ও ভূ-তাত্ত্বিকরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে কেবল বহুতল ভবন ধসে পড়ার দৃশ্যই দেখা যাবে না, বরং শহরের বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এক নিয়ন্ত্রহীন অগ্নিকাণ্ড। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে ঢাকা মহানগর। জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে, নিচু এলাকায় স্থাপনা গড়ে উঠেছে এবং এমন সব বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলো হয়তো বড় ভূমিকম্প সামলাতে পারবে না।
তারা বলেছেন, গ্যাসলাইন বিস্ফোরণ, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছাতে না পারার অক্ষমতা মিলে ঢাকাকে এক মরণফাঁদে পরিণত করতে পারে।
কেন অগ্নিকাণ্ডই হবে বড় বিপর্যয়: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতির চেয়েও এর গৌণ প্রভাব অনেক বেশি ভয়াবহ হতে পারে। ১৯০৬ সালের সান ফ্রান্সিসকো ভূমিকম্পের ঐতিহাসিক তথ্য এর প্রমাণ-সেখানে ৮০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল অগ্নিকাণ্ডের কারণে, মাত্র ২০ শতাংশ হয়েছিল সরাসরি ভবন ধসের কারণে।
ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে ঝুঁকিগুলো হলো গ্যাসের পাইপলাইন: ঢাকার মাটির নিচে গ্যাসের যে নেটওয়ার্ক, তা অত্যন্ত নাজুক। ভূকম্পনে এই পাইপলাইন ছিঁড়ে গিয়ে পুরো শহরে গ্যাস ছড়িয়ে পড়বে। যে কোনো স্ফুলিঙ্গ থেকেই তা হয়ে উঠবে আগুনের গোলা।
বিদ্যুৎ সরবরাহ: ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ ভূমিকম্পের সময় শর্ট সার্কিটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে বস্তি ও পুরনো শহরের সরু অলিগলিতে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেশি।
পানির সংকট: ভয়াবহ এই পরিস্থিতির সময় পানির লাইনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে আগুন নেভানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাবে না। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন পানি খুঁজবেন, তখন সব উৎসই অকেজো হয়ে থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন: বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ আবু সাদেক এবং বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, এই ঝুঁকি মোকাবিলার প্রযুক্তি আমাদের হাতের নাগালেই রয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ধীরগতি উদ্বেগজনক।
প্রস্তাবিত সুরক্ষাব্যবস্থা: কম্পন শনাক্তকারী সেন্সর (Seismic Sensors) বসানো। এটি ভূমিকম্পের প্রথম তরঙ্গ বা ‘পি-ওয়েভ’ শনাক্ত করে বড় কম্পন আসার আগেই বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।
গ্যাস ও পানির পাইপলাইনের প্রতিটি বাঁক বা জয়েন্টে নমনীয় (flexible) প্রযুক্তি ব্যবহার করা, যাতে মাটির কম্পনে পাইপ ফেটে না যায়। তিতাস গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে ‘সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন’ (SCADA) সিস্টেম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা, যাতে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে দূরবর্তীভাবে ভালভ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, ২০১৫ সালের দিকে এ ধরনের সিস্টেমের প্রস্তাব দেওয়া হলেও মাত্র ১৫ দিনের মাথায় সব কার্যক্রম থমকে যায়। তার মতে, ভূমিকম্পের পর মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করতে না পারলে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো অসম্ভব।
এদিকে, দুর্যোগের সময় উন্মুক্ত স্থান শুধু নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবেই নয়, উদ্ধারকাজ ও অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির স্থাপনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাজধানীর অধিকাংশ এলাকাতেই এমন জায়গার ঘাটতি রয়েছে।
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী, দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ১২৯টি ওয়ার্ডের অন্তত ৪১টিতে কোনো পার্ক বা খেলার মাঠ নেই। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৩১টি এবং ঢাকা উত্তর সিটিতে ১০টি ওয়ার্ড রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার প্রাকৃতিক ও সবুজ এলাকা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। শহরের কেন্দ্রীয় অংশে জলাশয়ের পরিমাণ ১৯৯৫ সালে ছিল ২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৯ শতাংশে। একই সময়ে সবুজ এলাকার পরিমাণ ২২ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘পার্ক, খেলার মাঠ এমনকি অনানুষ্ঠানিক উন্মুক্ত স্থানগুলোকেও জরুরি আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘এসব স্থানকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় ব্যবহারের জন্য নিকটবর্তী জায়গাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এটিই মূল উদ্দেশ্য।’
নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি বাসস্থান থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে একটি উন্মুক্ত স্থানে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আদিল বলেন, ‘ঢাকার প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই মানদণ্ড প্রয়োগ করলে জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে প্রায় ৬০০টি উন্মুক্ত স্থানের প্রয়োজন হবে। তবে এটুকুও যথেষ্ট নয়। একটি খেলার মাঠ পুরো ওয়ার্ডের মানুষের আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কোনো কোনো ওয়ার্ডে এক লাখের বেশি মানুষ বাস করলেও সেখানে একটি মাঠও নেই। এমনকি এক হাজার মানুষ একটি মাঠে জড়ো হলেও সেটি দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির উদাহরণ টেনে আদিল বলেন, উদ্ধারকাজ ও অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল হিসেবে সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ ব্যবহার করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, এ কারণেই প্রতিটি মহল্লায় হাঁটা দূরত্বের মধ্যে একটি উন্মুক্ত স্থান থাকা প্রয়োজন। সরকারের উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে উন্মুক্ত স্থান বাড়ানো এবং বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটারে অন্তত একটি খেলার মাঠ রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।
ফাইল ছবি
২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আরও ৭৮ জন বঞ্চিত প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। রোববার (৫ জুলাই) সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশে তাদের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
নিয়োগপ্রাপ্তদের ১৪ জুলাইয়ের মধ্যে ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে। ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে পরবর্তী কোনো নির্দেশনা না পেলে ওই তারিখেই যোগদান করতে হবে। কেউ নির্ধারিত তারিখে যোগদান না করলে তিনি চাকরিতে যোগ দিতে সম্মত নন বলে ধরে নিয়ে নিয়োগপত্র বাতিল করা হবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে তাদের ব্যাচের নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রথম যে তারিখে নিয়োগ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, সেই তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষভাবে নিয়োগ আদেশ কার্যকর হবে। ব্যাচের প্রথম নিয়োগ প্রজ্ঞাপনের যোগদানের তারিখ থেকে তাদের ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা বজায় থাকবে। তবে এর ফলে তারা কোনো বকেয়া আর্থিক সুবিধা পাবেন না।
২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারি ২৭তম বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ৩ হাজার ৫৬৭ জন উত্তীর্ণ হন। পরে ওই বছরের ৩০ জুন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিল করে। দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে ২০০৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ৩ হাজার ২২৯ জনকে উত্তীর্ণ করা হয়।
আগের মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট রিট করেন উত্তীর্ণরা। ২০০৮ সালের ৩ জুলাই সরকারের ওই সিদ্ধান্ত বৈধ বলে রায় দেন হাইকোর্ট। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন রিটকারীরা। গত বছরের ৭ নভেম্বর রিভিউ আবেদন মঞ্জুর করে শুনানির জন্য গ্রহণের আদেশ দেন আপিল বিভাগ। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি ২৭তম বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিত ১ হাজার ১৩৭ জনের চাকরি ফেরত দেওয়ার রায় দেন আপিল বিভাগ।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই দশক পর গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ২৭তম বিসিএসের ৬৭৩ জনকে ও গত ১৩ মে আরও ৯৬ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
ফাইল ছবি
দেশে গত জুন মাসে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ৫৬১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৪৪ জন নারী ও ৫৬ জন শিশু। নিহতদের মধ্যে ১৩৪ জন মোটরসাইকেলের আরোহী বা চালক, যা মোট প্রাণহানির ৩০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। একই সময়ে ৯টি নৌদুর্ঘটনায় ৭ জন এবং ২১টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত হয়েছেন। রোববার (৫ জুলাই) রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রকাশিত জুন মাসের সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ৩০ দশমিক ৭২ শতাংশ। এছাড়া ৯১ জন পথচারী (২০.৭৭ শতাংশ) এবং ৫৭ জন চালক ও সহকারী (১৩ শতাংশ) নিহত হয়েছেন।
যানবাহনভিত্তিক নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৪ জন, বাসের যাত্রী ২৭ জন, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ ও ট্রলির আরোহী ৩৭ জন, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের আরোহী ১৪ জন, থ্রি-হুইলারের যাত্রী ১১২ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৫ জন এবং রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী ৮ জন।
দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫১টি জাতীয় মহাসড়কে, ১৯৪টি আঞ্চলিক সড়কে, ৬৪টি গ্রামীণ সড়কে, ৫৭টি শহরের সড়কে এবং ৬টি অন্যান্য স্থানে ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০৯টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২০৬টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৯৭টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দিয়ে, ৫৩টি যানবাহনের পেছনে আঘাত করার কারণে এবং ৭টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
মোট ৭১৩টি যানবাহন এসব দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৫৭টি মোটরসাইকেল, ১৪১টি থ্রি-হুইলার, ১১৬টি বাস, ১০৭টি ট্রাক, ২৪টি কাভার্ডভ্যান, ২৮টি পিকআপ, ১৬টি মাইক্রোবাস, ১৩টি প্রাইভেটকার, ৪টি অ্যাম্বুলেন্স, ৪২টি স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন, ৭টি রিকশা, ৪টি বাইসাইকেল এবং ৩০টি অজ্ঞাত যানবাহন রয়েছে।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে। এছাড়া ভোরে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ, দুপুরে ১৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ, বিকালে ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং রাতে ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১১৬টি দুর্ঘটনায় ১১৮ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, যেখানে ১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬ জন। রাজধানী ঢাকায় ৩২টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের পেশাগত পরিচয়ের মধ্যে রয়েছেন একজন পুলিশ সদস্য, চারজন শিক্ষক, দুইজন সাংবাদিক, একজন চিকিৎসক, তিনজন প্রকৌশলী, চারজন আইনজীবী, একজন চীনা নাগরিক, ১৩ জন ব্যাংক ও বিমা কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১৭ জন এনজিও কর্মী, ২১ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ২৪ জন ব্যবসায়ী, ১৯ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, চারজন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, ছয়জন পোশাক শ্রমিক, পাঁচজন নির্মাণ শ্রমিক, দুইজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও বেপরোয়া মানসিকতা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও বেতনের অভাব, মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
এসব দুর্ঘটনা কমাতে সংস্থাটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশন, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বৃদ্ধি, মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন সমন্বয়ে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের সুপারিশ করেছে।
ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারে আছে এমন এক আধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা, যেখানে পরিত্যক্ত পলিথিন বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে টেকসই আসবাবসহ নানা মূল্যবান পণ্য। যা পরিবেশ দূষণ রোধের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন বাজার। এটি এই সেক্টরের প্রথম কারখানা। কারখানাটি এরই মধ্যে সর্বমহলে সাড়া ফেলেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক পলিথিন–প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এ উদ্যোগ পরিবেশ সুরক্ষার জন্য একটি মাইলফলক।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পর্যটক ও বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপে কক্সবাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এক সমীক্ষার তথ্য মতে, কক্সবাজার শহরে দিনে প্রায় সাড়ে ৩৪ টন প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা হয়। এর মধ্যে একবার ব্যবহারের পরই ফেলে দেয়া প্লাস্টিক বা পলিথিন, পণ্যের মোড়ক, পলিপ্রোপিলিন এবং পাতলা পলিথিন ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এগুলো পুনঃপ্রক্রিয়া করা খুবই কঠিন এবং এর কোনো বাজার মূল্য নেই। কক্সবাজারের এই রিসাইক্লিং কারখানায় এমন বর্জ্য থেকেই তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও দৃষ্টিনন্দন সোফা, বেঞ্চসহ মজবুত খুঁটি।
ইউনাইটেড নেশনস অফিস অর প্রজেক্ট সার্ভিসেজের বাংলাদেশের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর মেইসন সালাম বলেন, এটি এমন একটি দৃষ্টান্ত, যেখানে সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোকে সম্ভাবনায় রূপান্তরিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশকে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে এবং নারীদের ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংক–ইউএনওপিএস প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী বলেন, প্লাস্টিক ফ্রি রিভারস অ্যান্ড সিজ ফর সাউথ এশিয়া (প্লিজ) প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘদিন ধরেই ব্র্যাক কক্সবাজারকে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এরই অংশ হিসেবে কক্সবাজার পৌরসভার সহযোগিতায় এই রি–সাইক্লিং কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহকারী, এসব বর্জ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত মানুষ এবং কারখানার কর্মী থেকে শুরু করে এখানে উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়কারী মিলে বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইবনে মায়াজ প্রামাণিক বলেন, এই রিসাইক্লিং কারখানার পাশাপাশি এখানে কঠিন বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানাটি ‘প্লাস্টিক ফ্রি রিভারস অ্যান্ড সিজ ফর সাউথ এশিয়া’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও ইউএনওপিএস’র সহায়তায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সাউথ এশিয়া কোঅপারেটিভ এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম। কক্সবাজার পৌরসভার সহযোগিতায় এই জেলায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে ব্র্যাক। প্লিজ প্রকল্পটি দক্ষিণ এশিয়ায় প্লাস্টিক দূষণের গুরুতর সমস্যা মোকাবিলায় আঞ্চলিক উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে।
৫ হাজার ২৮০ বর্গফুট আয়তনের এই কারখানায় প্রতি ঘণ্টায় ২০০ কেজি পর্যন্ত প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করতে এখানে রয়েছে দৈনিক ২ হাজার লিটার তরল বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা (ইটিপি), সোলার পাওয়ার জেনারেশন সিস্টেম, ফায়ার সেফটি সিস্টেম, একটি ইলেকট্রিক সাবস্টেশন এবং ২৪ ঘণ্টার সিসিটিভি নজরদারির ব্যবস্থা।
এই কারখানাটি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নারী বর্জ্য সংগ্রাহকদের ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি খাল–বিল ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্লাস্টিক বর্জ্যের দূষণ কমিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জেলা থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। রোগী ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত স্যালাইন মজুত, মোবাইল হাসপাতাল প্রস্তুত এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রোববার (৫ জুলাই) রাজধানীর জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের নতুন ভবন উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভায় এ কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সবার সহযোগিতায় আমাদের ডাক্তার নার্সদের সহযোগিতায় হামকে আমরা চতুর্দিক থেকে একটা পেরিফেরির ভেতরে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছি। একেবারে নির্মূল কোনও পৃথিবী করতে পারে নাই, লন্ডনের উদাহরণ দিলাম।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত দুই মাস ধরেই ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রস্তুতি চলছে। জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে প্রতিটি জেলায় সমন্বিত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে। মশার লার্ভা ধ্বংসে প্রয়োজনীয় ট্যাবলেট সরবরাহ এবং উড়ন্ত মশা নিধনে স্প্রে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গুরোগীদের চিকিৎসায় ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পর্যাপ্ত স্যালাইন সংগ্রহ করা হয়েছে, যাতে কোনও রোগী স্যালাইনের সংকটে না পড়েন এবং গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয়।
চিকিৎসকদের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গুরোগীর চিকিৎসা-প্রোটোকল বিষয়ে চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিভিল সার্জনদের কার্যালয় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোগী পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়েই চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সভায় এক পর্যায়ে শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়েও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন শিশুদের পুষ্টি কর্মসূচি, ভিটামিন ট্যাবলেট বিতরণ এবং টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি ছিল। বর্তমান সরকার এসব কর্মসূচি আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত
হামের টিকা প্রদানে ব্যর্থতায় ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে আদেশ দিতে ১২ জুলাই দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। রোববার (৫ জুলাই) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই আদেশ দিয়েছেন।
এদিন আদালতে হামে মারা যাওয়া ৯ মাস বয়সি সাউদা মুসকানের বাবা সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলার আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদেশ অপেক্ষমাণ রাখেন। পরে বিকেলে মামলার বিষয়ে আদেশের জন্য ১২ জুলাই দিন নির্ধারণ করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী তাছলিমা জাহান পপি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলার আবেদনে আরও যাদের আসামি করার আবেদন করা হয়েছে তারা হলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
নথি থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক ও মার্চের শুরুর সময়ে শরীয়তপুর সদরের নয় মাস বয়সি সাউদা মুসকান হঠাৎ মারাত্মক জ্বরে আক্রান্ত হয়। স্থানীয় চিকিৎসায় ফল না দেওয়ায় মার্চের প্রথম সপ্তাহে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে হামের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেয়ে শিশুটিকে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২২ মার্চ স্থানান্তর করা হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অসহযোগিতা ও অবহেলার অভিযোগ তুলে আবেদনে বলা হয়, বাদীর স্ত্রীর হাতে ২৬ মার্চ অক্সিজেন সিলিন্ডার ধরিয়ে দিয়ে বাচ্চার মুখে লাগাতে বলা হয়। তবে শিশুর মা ব্যর্থ হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সুইপারকে দিয়ে শিশুর মুখে তা লাগিয়ে দেয়। এর ঘণ্টা দুয়েক পরে শিশুটি মারা যায়।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, শিশুদের টিকার যোগান সময়মতো না থাকা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া এবং টিকা কেনা ও তা দেওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মারাত্মক খামখেয়ালিপনা এবং অবহেলাজনিত কারণে দেশে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সাউদা মুসকান অন্যতম।
মন্তব্য