আলু মমি করে ২০ বছর সংরক্ষণ

আলু মমি করে ২০ বছর সংরক্ষণ

বলিভিয়ায় কয়েক দশক পর্যন্ত চুনো প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা যায় আলু। ছবি: এএফপি

নিজেদের ঐতিহ্যগত আলু সংরক্ষণ প্রক্রিয়া (চুনো) সম্পর্কে হুয়াঙ্কা বলেন, ‘এভাবেই আমরা চুনো তৈরি করি। চুনো একবার শুকিয়ে গেলে তা কুড়ি বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়’

বলিভিয়ার রাজধানী লা পাজের দক্ষিণে ছোট্ট গ্রাম মাচাকামারকা। পুষ্টিগুণ অটুট রেখে বহুদিন পর্যন্ত আলু সংরক্ষণ করতে জানে এ গ্রামের মানুষ।

৫২ বছর বয়সী প্রুদেনসিয়া হুয়াঙ্কা ও তার ৫৬ বছর বয়সী স্বামী এগবারতো মামানি আলু থেকে চুনো উৎপাদন করেন, যা সংরক্ষণ করা যায় কয়েক দশক।

আদিবাসী শব্দ ‘চুনু’ থেকে এসেছে চুনো। পেরুতেও এভাবে আলু সংরক্ষণ করা হয়। তবে এ প্রক্রিয়ার উৎস সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি।

করোনা মহামারির আগে হুয়াঙ্কা-মামানি দম্পতি লা পাজে পর্যটকদের গাইড ছিলেন। বলিভিয়ায় ভাইরাস মোকাবিলায় কড়াকড়ির কারণে তাদের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

গ্রামে ফিরে তারা আলু সংরক্ষণের পারিবারিক ঐতিহ্যে হাত দেন।

মামানি বলেন, ‘আমার মা-বাবার চুনো এখনও আমার কাছে রয়েছে। ২০ বছর আগে তাদের মৃত্যু হয়। তবে তাদের চুনো এখনও সংরক্ষিত রয়েছে।’

প্রত্নতত্ত্ববিদ জেদু সাগারনাগা মনে করেন, আলু সংরক্ষণের এ প্রক্রিয়া সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ২০০ সালের দিকের।

তবে এ প্রক্রিয়া তার আগেরও হতে পারে। কারণ ২০১৭ সালে পেরুতে পাওয়া চুনো পাঁচ হাজার বছরের বেশি পুরোনো ছিল।

মাচাকামারকা গ্রামে সূর্য ওঠার পর কুয়াশা কমতে শুরু করলে হুয়াঙ্কা ও মামানি বস্তার ওপর কমপক্ষে ১০ ধরনের আলু ছড়িয়ে রাখেন।

শীতকালে এ প্রক্রিয়ায় আলু সংরক্ষণ একটু কঠিন।

মামানির অভিযোগ, ‘তুষারপাত মাঝেমধ্যে সব নষ্ট করে ফেলে।’

বলিভিয়ায় শীত আসার আগ মুহূর্তেই তাপমাত্রা জিরো ডিগ্রির নিচে নামতে শুরু করে।

দীর্ঘমেয়াদে কোন কোন আলু সংরক্ষণ করতে হবে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ওই দম্পতি প্রথমে তাৎক্ষণিক খাদ্য হিসেবে বা পরের মৌসুমে বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য কিছু আলু আলাদা করে রাখেন।

আলু মমি করে ২০ বছর সংরক্ষণ

চুনোর জন্য আলু বাছাই শেষ হলে হুয়াঙ্কা ও মামানি আলুগুলোকে পাহাড়ের নিচের মাঠে তিন দিন ফেলে রাখেন। ওই সময় রাতে আলুগুলো জমে হিম হয় আর দিনে সেগুলো শুকায়।

এভাবেই ওই আলু আর্দ্রতাশূন্য ও কুঁচকে যায়। আলু দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের এটাই মূলমন্ত্র।

তবে তিন দিন পরও আলুগুলোর মধ্যে কিছু পানি থেকে যায়। তাই তারা পা দিয়ে আলুগুলো পিষে ফেলেন। আঙুর পায়ের নিচে পিষ্ট করে যেভাবে ওয়াইন বানানো হয়, অনেকটা সেভাবে।

এটি এক ধরনের গোষ্ঠীগত কাজ। কারণ ওই সময় প্রতিবেশীরা ওই দম্পতির সাহায্যে এগিয়ে আসে। পা দিয়ে আলু ডলতে ডলতে তারা আয়মারা ভাষায় আড্ডা জুড়ে দেয়।

কেউ কেউ তখন চুনোর জন্য আলু মাড়ায় আবার কয়েকজন আলু ছিলতে শুরু করে।

পরের ধাপে আলুগুলো দুই সপ্তাহের জন্য ফের মাঠে আনা হয়। মমিকরণ ওই সময়ই সম্পন্ন হয়।

চুনো প্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হতে তিন সপ্তাহের মতো লাগে। মমিকরণ শেষে আলু গাঢ় বাদামি আবার অনেক সময় কালো বর্ণ ধারণ করে।

নিজেদের ঐতিহ্যগত আলু সংরক্ষণ প্রক্রিয়া (চুনো) সম্পর্কে হুয়াঙ্কা বলেন, ‘এভাবেই আমরা চুনো তৈরি করি। চুনো একবার শুকিয়ে গেলে তা কুড়ি বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়’

হুয়াঙ্কা বলেন, ‘ভালো চুনোর গোপন রেসিপি হলো, আলুগুলো মিষ্টি ও এগুলোর গায়ে বালু থাকতে হবে।’

তিনি জানান, প্রপিতামহের কাছ থেকে এই কৌশল শেখেন তিনি।

আলু মমি করে ২০ বছর সংরক্ষণ

জুন-জুলাই মাসে চুনো চাষ করা হয়। ওই সময় শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাস পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। খোলা বাতাসে আলু হিমায়িত হওয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।

বলিভিয়ার আল্টিপ্লানো মালভূমি ৩ হাজার ৯০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত, যেখানে দিন ও রাতের তাপমাত্রার মধ্যে পার্থক্য অনেক।

চুনো প্রক্রিয়ার জন্য আলু হিমায়িত করা প্রয়োজন। আর বলিভিয়ার মাঠে হিমাগারের মতো আলু হিমায়িত করতে সেখানকার প্রকৃতিই অনেকটা সাহায্য করে।

এ প্রক্রিয়া আলুর মূল আকারের ২০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। ফলে গুদামজাত ও পরিবহনে সহজ হয়।

আলু মমি করে ২০ বছর সংরক্ষণ

খাওয়ার আগ পর্যন্ত চুনো শুকনো জায়গায় রাখতে হয়। কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে পাঁচ মিনিট সেদ্ধ করার পর এই আলু খেতে হয়।

মামানি বলেন, ‘১০ বছরের নরম, বাদামি, তেতো চুনো খেতে সুস্বাদ না। তা সত্ত্বেও আমরা চুনো তৈরি করি যেন আমাদের খাবারের অভাব না হয়।’

আরও পড়ুন:
বলিভিয়ায় জয়ের পথে মোরালেসের মিত্র আরসি

শেয়ার করুন

মন্তব্য