নেতানিয়াহুর পতনে বাকি এক ধাপ

নেতানিয়াহুর পতনে বাকি এক ধাপ

জোট সরকার গঠনে সমঝোতার চুক্তিতে সই করছেন নাফতালি বেনেট, ইয়ার ল্যাপিড ও মনসুর আব্বাস (বাম থেকে ডানে)। ছবি: জেরুজালেম পোস্ট

জোট সরকার গঠনে বুধবার সমঝোতায় পৌঁছেছে বিরোধী দলগুলো। মধ্যপন্থি ইয়েশ আতিদ পার্টির প্রধান ও সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ার ল্যাপিড আটটি দলের জোট ঘোষণা করেছেন। জোটে আছে আরব-ইসরায়েলি রা’ম পার্টিও।

বিরোধী দলগুলো বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতায় পৌঁছানোর ফলে ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন ডানপন্থি ইয়ামিনা পার্টির প্রধান নাফতালি বেনেট।

এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটছে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শাসনকাল।

তবে ক্ষমতার চূড়ান্ত পালাবদলের জন্য পার্লামেন্ট নেসেটে আস্থা ভোটে জয় নিশ্চিত করতে হবে নতুন জোট সরকারকে।

বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়, জোট সরকার গঠনে বুধবার সমঝোতায় পৌঁছেছে বিরোধী দলগুলো। মধ্যপন্থি ইয়েশ আতিদ পার্টির প্রধান ও সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ার ল্যাপিড আটটি দলের জোট ঘোষণা করেছেন।

জোটে আছে আরব-ইসরায়েলি রা’ম পার্টিও।

জোটের বাকি দলগুলো হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনি গানৎজের মধ্যপন্থি ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট, মধ্য-ডানপন্থি ও ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী ইসরায়েল বেইতেইনু, সমাজতান্ত্রিক ও গণতন্ত্রপন্থি লেবার পার্টি, মধ্য-ডানপন্থি ও ডানপন্থি নিউ হোপ এবং বামপন্থি ও সমাজতান্ত্রিক-গণতান্ত্রিক মেরেৎজ।

সবগুলো দল মিলে সরকার গঠনে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে ন্যূনতম ৬১টি আসন নিশ্চিত করেছে।

এ জোটের মাধ্যমে ইসরায়েলের ডান, বাম ও মধ্যপন্থিরা এককাতারে আসবেন। আদর্শগত অবস্থান থেকে এক না হলেও নেতানিয়াহুকে উৎখাত করার লক্ষ্যে জোটবদ্ধ হতে মরিয়া ছিল দলগুলো।

চুক্তি অনুযায়ী, পালাক্রমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বেনেট ও ল্যাপিড।

নেতানিয়াহুর পতনে বাকি এক ধাপ
ইসরায়েলে নেতানিয়াহুকে উৎখাতের লক্ষ্যে জোট বেঁধেছেন ভিন্ন মতাদর্শী দুই রাজনীতিবিদ ইয়ার ল্যাপিড ও নাফতালি বেনেট। ছবি: সংগৃহীত

নতুন সরকারের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট ল্যাপিডের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন বেনেট।

ল্যাপিড বলেন, ‘যারাই আমাদের ভোট দিয়েছেন বা দেননি, তাদের সবার জন্য, ইসরায়েলের প্রতিটি নাগরিকের সেবায় কাজ করবে আমাদের সরকার।

‘বিরোধীদের আমরা সম্মান করব এবং ঐক্যবদ্ধ ও ইসরায়েলের সব শ্রেণির মানুষকে এককাতারে আনতে সাধ্যের বাইরে চেষ্টা করব।’

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত একটি ছবিতে দেখা যায়, ল্যাপিড, বেনেট ও রা’ম পার্টির প্রধান মনসুর আব্বাস চুক্তিপত্রে সই করছেন।

মনসুর আব্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেক বিষয়ে দ্বিমতের কারণে এ ঐক্য কঠিন ছিল। কিন্তু সমঝোতায় পৌঁছাতে এর বিকল্পও ছিল না। এই চুক্তিতে এমন অনেক কিছুই আছে, যা ইসরায়েলের আরব সমাজের জন্য কল্যাণকর হবে।’

জোট গঠনে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিনকে অবহিত করেছেন বলে বিবৃতিতে জানিয়েছেন ল্যাপিড।

অবশ্য নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আগে পার্লামেন্টে আস্থা ভোটের মুখে পড়তে হবে তাদের। এ জন্য দ্রুততম সময়ে অধিবেশন বসানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।

নেসেটে আস্থা ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট নিশ্চিতে ল্যাপিড-বেনেট জোট ব্যর্থ হলে দুই বছরের মধ্যে পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনের দিকে ধাবিত হতে পারে ইসরায়েল।

তেল আবিবে ম্যারাথন আলোচনায় দলগুলোকে গাঁজা বৈধ করা থেকে শুরু করে অবৈধ বসতি নির্মাণে জরিমানা, বিচার বিভাগেও পালাক্রমে কর্মকর্তা নিয়োগ পর্যন্ত বেশ কিছু বিষয়ে সম্মত হতে হয়েছে।

কিছু গণমাধ্যম বলছে, এখনও সব বিতর্কের চূড়ান্ত অবসান হয়নি বলে পার্লামেন্টে আস্থা ভোটে জোট সরকার উৎরাতে পারবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

গত দুই বছরে ইসরায়েলে চারটি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। কোনোবারই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনো দল। জোট সরকার গঠনেও কোনো দল সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বলে প্রতিবার নতুন সাধারণ নির্বাচনের দিকে ধাবিত হয়েছে দেশটি।

নেতানিয়াহুর শাসনকাল

২০০৯ সাল থেকে টানা প্রধানমন্ত্রী পদে আছেন নেতানিয়াহু। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্তও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

সব মিলিয়ে ইসরায়েলের ৭৩ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী ৭১ বছর বয়সী নেতানিয়াহু। আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলছে তার বিরুদ্ধে।

সবশেষ চলতি বছরের মার্চে সাধারণ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য পার্লামেন্টে ন্যূনতম আসন নিশ্চিতে ব্যর্থ হয় নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি।

দ্বিতীয় সর্বাধিক ১৭টি আসন পায় ল্যাপিডের ইয়াশ আতিদ পার্টি। আর কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি আসনে জয় পেয়ে শক্ত অবস্থানে বেনেটের দল।

এ অবস্থায় নেতানিয়াহু জোট গঠনে ব্যর্থ হলে সরকার গঠনে ২৮ দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয় ল্যাপিডকে, যা শেষ হয়েছে বুধবার। এ সময়ের মধ্যেই রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে ভিন্ন অবস্থানের দলগুলোকে একছাতার নিচে আনেন ল্যাপিড।

এই জোটকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রতারণা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন নেতানিয়াহু। বলেছেন, এর মাধ্যমে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ হুমকির দিকে ঠেলে দেয়া হলো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বামপন্থি বিরোধীরা নয়, কট্টর ডানপন্থি নেতা নেতানিয়াহুর পতন নিশ্চিত করেছেন তার একসময়ের অনুসারীরাই যাদের দমনে নিষ্ঠুর ও কঠোর কৌশল নিয়েছিলেন তিনি।

এ অবস্থায় অলস বসে না থেকে আবারও পূর্ণ শক্তিতে ক্ষমতায় ফেরা নিশ্চিতে ৭২ বছর বয়সী নেতানিয়াহু কাজ করবেন বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। নতুন জোট সরকারের কাছ থেকে খুব বেশি প্রত্যাশা নেই বলেও জানান অনেকে।

আরও পড়ুন:
নেতানিয়াহুর ভাগ্য জানা যাবে আজ
নিশ্চিত হয়ে গেল নেতানিয়াহুর পতন
ইসরায়েলে শেষ হচ্ছে নেতানিয়াহুর শাসন?

শেয়ার করুন

মন্তব্য