করোনা আর দূষণের কবলে ভারতীয় আম

করোনা আর দূষণের কবলে ভারতীয় আম

লকডাউন ও দূষণের অভিযোগে বিপাকে পড়েছেন ভারতের আম চাষীরা। ছবি: অসিত পুরকায়স্থ

মালদহের আম ত্রিপুরা, অসম ও ওড়িশায় যায়। লকডাউনের কারণে ব্যবসায়ীরা আম কিনতে আসছেন না। এলসির কারণে এখন বাংলাদেশে পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ। অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের আলফানসো আমের রাসায়নিক দূষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ও অন্যান্য কারণে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ধাক্কা খেয়েছে ভারতের আম বাণিজ্য।

কয়েক বছর পর এবার পশ্চিমবঙ্গে আমের ফলন ভালো হয়েছে। তাই চাষিরা খুশি। কিন্তু যে সময়ে আম বিক্রি শুরু সে সময়েই চলছে লকডাউন। করোনার প্রভাবে অচলাবস্থা চারদিকে। এ অবস্থায় চাষিরা পাকা আম নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। কী করবেন তারা, বুঝতে পারছেন না।

শুধু বাঙালি নয় সমস্ত ভারতীয়দের কাছে আমের কদর রয়েছে। প্রতিবছর মৌসুমে আমের বাজার থাকে সরগরম। কিন্তু এ বছর করোনা ভাইরাস সংক্রমণ সামাল দিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার লকডাউনের মতো কড়া বিধিনিষেধ জারি করেছে। চলবে ১৫ জুন পর্যন্ত। জরুরি পরিষেবা ছাড়া, সরকারি-বেসরকারি বাস-ট্রাম, লোকাল ট্রেনের মতো সব গণপরিবহন বন্ধ। তাই বাগানের আম বাজারজাত করায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। আমচাষিরা পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।

পশ্চিমবঙ্গের মালদহে আমের চাষ সবচেয়ে বেশি হয়। ৩৩ হাজার হেক্টর জায়গাজুড়ে এখানে আমের বাগান আছে। মুর্শিদাবাদে ২১ হাজার এবং নদীয়ায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের আমের চাষ হয়। বাঁকুড়া, শিলিগুড়ি, মেদিনীপুরেও আমের চাষ হয়। আম চাষ থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে জড়িত লাখ লাখ মানুষ।

মালদহের আম ব্যবসায়ী বুলবুল হালদার বলেন, ‘রাজ্যে লকডাউনের কারণে ব্যবসায়ীরা কাজ করতে পারছেন না। আম কেনার জন্য বাগানে আসতে পারছেন না। ভালো ফলন হলেও এবার খরিদ্দারের অভাবে চাষিরা গাছ থেকে আম ভাঙতে পারছেন না।’

আমচাষি অমূল্য প্রধান বলেন, হিমসাগর, ফজলি ও ল্যাংড়া জাতের আম মালদহে বেশি চাষ হয়। কিন্তু এবার তো করোনায় বাগান কেনাবেচা হচ্ছে না।

ব্যবসায়ী বুলবুল বলেন, আমের ফড়িয়ারা আসছে না। বিহারে কিছুটা যাচ্ছে কিন্তু লোকাল মার্কেটে মেদিনীপুর থেকে আলিপুরদুয়ার, লকডাউনের জন্য দশটার পর থেকে বাজার বন্ধ থাকার কারণে, আম যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা আম বিক্রি করতে পারছেন না। বাজারের মাল বাজারে থেকে যাচ্ছে। গোলাপভোগ ও ল্যাংড়া এ সময় পেকে যায়। বাজার বন্ধের কারণে আম ভাঙতে পারছেন না চাষিরা।

মালদহের আম ত্রিপুরা, অসম ও ওড়িশায় যায়। লকডাউনের কারণে ব্যবসায়ীরা আম কিনতে আসছেন না। এলসির কারণে এখন বাংলাদেশে পাঠানো পুরোপুরি বন্ধ।

ব্যবসায়ীরা জানান, আম মালদহের বাইরে না পাঠাতে পারলে চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়বেন। কেননা, পাকা আম বেশি দিন গাছে রাখা যাবে না। ১৫ দিনের মধ্যে পরিবহনব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন ধরনের আমের চাষ হয়। সারা দেশে, খাদ্য রসিকদের মধ্যে ফলের রাজা আম নিয়ে গ্রীষ্মের মরশুমে রীতিমতো উন্মাদনা দেখা যায় ।

রসালো সুমিষ্ট ফল আম আর গ্রীষ্ম যেন সমার্থক। ভারতের জাতীয় ফল আমের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাগনিফেরা ইন্ডিকা। পশ্চিমবঙ্গে গোলাপভোগ, ল্যাংড়া, ফজলি, মধু কুলকুলি, অরুনা, আম্রপালি, গোলাপখাস, হিমসাগরসহ বিভিন্ন ধরনের আম চাষ হয়।

কেরলের ‘মুভান্দন’ ডাঁসা অবস্থায় নুন মসলা দিয়ে মেখে খেতে ভালোবাসেন কেরালিয়ানরা। কর্নাটকের রসালো ‘মুলগুয়া’ আম ভারতের ওজনে ভারী আমগুলোর অন্যতম। একেকটার ওজন তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি হয় ।

অন্ধ্রের ‘হিমায়াত’ আম ‘ইমাম পসন্দ’ নামেও পরিচিত। মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বাগান থেকে বাজারে আসে। অন্ধ্র ও কর্নাটকে ‘পোদ্দারসুপুলু’ নামে এক ধরনের রসালো আম পাওয়া যায়। সেখানকার মানুষ আদর করে ‘রসাপুরি’ বলে ডাকেন। এছাড়া নিলম, নাদন, থাম্বুর, চন্দ্রকরণ আমগুলো খুবই জনপ্রিয় ।

উত্তরপ্রদেশের বেনারসি ল্যাংড়ার খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। পাতি লেবুর মত আভা সারা গায়ে। যেমন গন্ধ তেমন অতুলনীয় এর স্বাদ। দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশে এর ফলন হয় প্রচুর।

উত্তরপ্রদেশের দশেরি, চৌসা আমও বেশ জনপ্রিয়। চৌসা আম এর মুখটা দাঁত দিয়ে কেটে চুষে খাওয়ার রীতি। সেখান থেকেই বোধহয় এর নাম চৌষা। গোলাপখাস লালচে রঙের, গোলাপ ফুলের গন্ধের মতো এই আম দিয়ে বাহারি সব পদ বানানো হয়।

গোয়া ও গুজরাতে বিখ্যাত ‘পইরি’ আম দিয়ে বোতন ও কোটায় আমরস ব্যবসা বেশ প্রসিদ্ধ। ঘন, রসালো এই আমরস দুধে, শরবতে, পুডিং, কাস্টার্ড, ডেজার্ট বা অন্য খাবারের মিশিয়ে সুস্বাদু খাবার বানানো হয়।

মহারাষ্ট্রের রাজকীয় আম আলফানসো। গোয়ার আবিষ্কারক স্যার আলফানসো আলবুকার্ক এর নাম থেকে এই আমের নামকরণ। স্থানীয় কোঙ্কনি ভাষায় আলফানসো থেকে ‘অহপস’ পরে মহারাষ্ট্র ভাষায় ‘হাপুস’ নামে বদলে যায়।

আলফানসোর খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। বাক্সবন্দি করে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বিদেশী মুদ্রা আসে দেশে। কিন্তু বিদেশের বিভিন্ন বাজারে, আলফানসো বাতিল হয়েছে। আলফানসো আমের রাসায়নিক দূষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে ও অন্যান্য কারণে রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ধাক্কা খেয়েছে ভারতের আম বাণিজ্য।

এসব ব্যবসায়ী লাভ-ক্ষতির বাইরে যুগে যুগে দেশে-বিদেশে খাদ্য রসিকদের মধ্যে, আম নিয়ে মাতামাতি চোখে পড়ার মতো। মুঘল সম্রাট আকবর থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেউ বাদ যাননি।

বিহারের দারভাঙা জেলায় সম্রাট আকবর এক লাখ আমগাছ রোপন করিয়েছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লিখেছেন ‘আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলি দলি, সন্দেশ মাখিয়ে তাতে, হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিঃশব্দ পিপিরা কাঁদিয়া যায় পাতে..’

ভারতীয় খাদ্য এবং সংস্কৃতিতে আম রাজকীয়ভাবে বিরাজ করে। আমগাছ, গাছের পাতা, মুকুল, ফল সবই মঙ্গলের প্রতীক।

আরও পড়ুন:
খলিলের আঙিনায় আমের বাহার
জমছে না চাঁপাইয়ের আমের বাজার
ঢাকার পথে আমের ট্রেন

শেয়ার করুন

মন্তব্য