প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীরা নন, ভারতে ভোটের সময় নির্বাচন কমিশনই শেষ কথা বলে। পাঁচ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন সে কথাই আবার প্রমাণ করছে। সমালোচনা হলেও কমিশন অটল তাদের ভাবমূর্তি রক্ষায়।
২৭ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও অসম, কেরালা, তামিলনাডু ও পুদুচেরিতে ভোট শুরু হচ্ছে। ভোট গণনা হবে ২ মে। পাঁচ রাজ্যের ৮২৪টি কেন্দ্রে ভোট দেবেন ১১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৯ হাজার ৬০ জন।
ভারতে ভোটের দিন ঘোষণার পরই আচরণবিধি মেনে চলা শুরু হয়। নির্বাচিত সরকারের তখন আর নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ঘোষণার সুযোগ থাকে না। এমনকি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন সিদ্ধান্তও নেয়া যায় না।
তাই ভোট ঘোষণার দিনটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আর এটি পুরোপুরি নির্ভর করে কমিশনের মর্জির ওপর। গোপন রাখা হয় ভোট ঘোষণার সময়সূচি। ফলে আগে থেকে কেউ জানতে পারেন না। রাজনৈতিক দলগুলোকে আন্দাজের ওপরেই নির্ভর করতে হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এবার জানতে পারেননি ভোটের সময়সূচি ঘোষণার দিন। তাই অসম সফরের সময় বলেছিলেন, মার্চের প্রথম সপ্তাহে ভোট ঘোষণা হতে পারে।
কিন্তু খোদ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ভুল প্রমাণ করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সময়সূচি ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন। চালু হয় আচরণবিধি। পাঁচ রাজ্যের প্রশাসন পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের কাছেই দায়বদ্ধ। মন্ত্রীরা সরকারি কাজ ছাড়া কোনো প্রোটোকল পাবেন না।
নিরাপত্তার কারণে অনেকটাই ছাড় পান প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী। তবে তাদের যাতায়াতের খরচ দলকেই দিতে হয়। ভোটের সময় সবাই সমান। রাজনৈতিক দলগুলো সর্বোচ্চ কত টাকা খরচ করতে পারবে সেটিও ঠিক করে দেয় নির্বাচন কমিশন। এটি তদারক করেন কমিশনের পর্যবেক্ষকরা।
ভোটের সময়সূচিও হয় কমিশনের মর্জিতেই। যেমন পশ্চিমবঙ্গে ৮ দফায় ভোট হবে। অসমে হচ্ছে ৩ দফায়। কিন্তু তামিলনাডু, কেরালা ও পুদুচেরিতে এক দিনেই ভোট শেষ। এ ক্ষেত্রে কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটারের সংখ্যা ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৭ হাজার ৮৩২ জন। তামিলনাডুতে ৬ কোটি ২৮ লাখ ২৩ হাজার ৭৪৯ জন। অসমের ভোটার ২ কোটি ৩২ লাখ ৪৪ হাজার ৪৫৪ জন। কিন্তু অসমে ভোট হচ্ছে ৩ দফায়। তামিলনাডুতে ১ দফায়।
নির্বাচনি সময়সূচি অনুযায়ী ২৭ মার্চ বেশির ভাগ আসনেরই ভোট নেয়া শেষ হবে। কিন্তু গণনা হবে ২ মে।
এ সময়ে তিন স্তরের নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে রাখা হবে জনগণের মত। এই পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি নেই রাজনৈতিক দলগুলোরও।
২০০৪ সাল থেকে ভারতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট নেয়া হয়।
২০১৭ সালে ইভিএমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটার ভেরিফাইড পেপার অডিট ট্রেইল (ভিভিপ্যাট)। এর সাহায্যে নিজের দেয়া ভোট যাচাই করে নিতে পারেন ভোটাররা। এতে সহজ হয়েছে ভোটগণনা। সুবিধা বেড়েছে ভোট গ্রহণেও।
ইভিএম নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন ইভিএমে ভোট বদলে ফেলা যায়। এ নিয়ে মামলাও হয়েছে। পরে কমিশনও চ্যালেঞ্জ জানায় প্রযুক্তিবিদদের। কিন্তু কেউই প্রমাণ করতে পারেনি ইভিএমে জালিয়াতি করা যায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দেখিয়েছে, ইভিএমে নেয়া ভোটে ২০০৪ সাল থেকে বিভিন্ন নির্বাচনে জয় পেয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কোনো একটি বিশেষ জাতীয় বা আঞ্চলিক দল নয়, বহুদলীয় ব্যবস্থায় বিজেপি, কংগ্রেস, বাম, তৃণমূলসহ সব দলই জিতেছে। আবার হেরেছেও।
নির্বাচন কমিশনের দাবি, ইভিএম জালিয়াতি হলে ভোটের ফলে হেরফের হতে পারে না। বিধানসভা ভোটের পাশাপাশি লোকসভাতেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। জিতেছে কংগ্রেস বা বিজেপি উভয় দলই। হেরেছেও। তাই আত্মবিশ্বাসী নির্বাচন কমিশন।
নিরপেক্ষতার প্রশ্নে বেশ সক্রিয় ভারতের নির্বাচন কমিশন। তৃণমূল স্তর থেকে রাজ্যস্তর পর্যন্ত পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেন তারা। অন্য রাজ্য থেকে আসা পর্যবেক্ষকদের হাতে থাকে প্রচুর ক্ষমতা।
এই পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। এখন কমিশন প্রতি রাজ্যেই পুলিশের নিরপেক্ষতা দেখতে পুলিশ পর্যবেক্ষক, কালো টাকা রোধে আর্থিক পর্যবেক্ষক এবং সামগ্রিক বিষয় দেখতে সাধারণ পর্যবেক্ষকরা থাকেন।
পুলিশ ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ দেখা দিলেই কড়া ব্যবস্থা নেয় কমিশন। একদম নিচুতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত সবাই কমিশনের ভয়ে তটস্থ থাকেন। ভোটের সময় বদলি ও বরখাস্ত হওয়া ভারতে খুব সাধারণ ঘটনা।
এবারও একই পরম্পরা চলছে। ভারতে পুলিশের প্রধান পদের নাম ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ বা ডিজিপি। তিনি আইজিপির চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান। পশ্চিমবঙ্গের ডিজিপিকেও বদলি করেছে কমিশন।
৯ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের ডিজিপি বীরেন্দ্রকে হঠিয়ে নতুন ডিজিপি হিসাবে পি নিরঞ্জনকে দায়িত্ব দেয় কমিশন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি চোট পাওয়ার ঘটনায় তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিনিয়র পুলিশ অফিসার বিবেক সহায়কে বরখাস্ত করা হয়।
বিবেক সহায় অতিরিক্ত ডিজিপি পদমর্যাদার অফিসার ছিলেন। তাকে বরখাস্ত করে জ্ঞানবন্ত সিংকে দেয়া হয় মমতার নিরাপত্তার দায়িত্ব। সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক বিভু গোয়েল ও পুলিশ সুপার (এসপি) প্রবীণ কুমারকেও বদলি করেছে কমিশন।
ভোটের দায়িত্বে থাকেন রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের কর্মীরা। কিন্তু তাদের ওপর সব সময়ই নজরদারি থাকে কমিশনের। পান থেকে চুন খসলেই কড়া দাওয়াই। পশ্চিমবঙ্গের ভোটে ৫৫ জন পুলিশ ও ২০৯ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক থাকবেন।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সাবেক চেয়ারম্যান বা মেয়রদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন মমতা। কিন্তু কমিশন সরকারি অফিসারদের সেই পদে নিয়োগ করেছে।
শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, সব রাজ্যেই নির্বাচন কমিশন এ ধরনের কড়া পদক্ষেপ নিতে অভ্যস্ত। ভারতের সাবেক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার প্রয়াত টি এন শেষণের আমল থেকেই বেশ সক্রিয় কমিশন।
তবে এখন নির্বাচন কমিশনও বেশ চাপে থাকে। তাদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল বহুদিন ধরেই কমিশনের সমালোচক। এবারও ৮ দফায় ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরোধী তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটাও চাপের রাজনীতি। কমিশনকে চাপে রাখতে চান নেতারা। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন কমিশনকে মানতে বাধ্য সব দলই। মানছেনও নেতারাও।
বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন আজ ভোট পরিচালনায় অনেকটাই দক্ষ। তাই ভোটের ফলাফলে এতটা বদল ধরা পড়ে। ভারতীয় গণতন্ত্রের এই সুস্বাস্থ্যের জন্য নির্বাচন কমিশন অবশ্যই প্রশংসা পেতে পারে।
বিজেপি ও কংগ্রেসের মতো সর্বভারতীয় দল কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো গুরুতর প্রশ্ন তোলেনি। অপছন্দের সিদ্ধান্ত নিয়ে মৃদু সমালোচনা হতেই পারে। কিন্তু আস্থা বিন্দুমাত্র টোল খায়নি আজও। বরং বেড়েছে।
তাই ২৭ মার্চ ভোট গ্রহণের পর ২ মে ভোট গণনা নিয়ে কারও কোনো আপত্তি নেই। রাজ্য পুলিশের বদলে কেন্দ্রীয় আধা সেনা ব্যবহার করে ইভিএম রাখার ঘরগুলোকে নিশ্ছিদ্র রাখার ঐতিহ্যই সকলকে আস্থাশীল করে তুলেছে।
পাঁচ রাজ্যের ভোটপর্ব আবার প্রমাণ করবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথ নয়। অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে তারা দক্ষ ও নিরপেক্ষ। ফের প্রমাণিত হবে। এটি আবারও প্রমাণিত হবে ২ মে।
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারকটি আজ রোববার (১৪ জুন) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
এই চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। তারা জানিয়েছে যে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে এবং বর্তমানে উভয় দেশ ‘ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের’ জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ট্রাম্প তার বার্তায় আরও উল্লেখ করেছেন যে, পরিস্থিতি শান্ত হলে তারা ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তথা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ সংগ্রহ করবেন এবং পরবর্তীতে তা ধ্বংস করা হবে।
তবে ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসী ঘোষণার বিপরীতে ইরানের পক্ষ থেকে কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা গেছে। শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই চুক্তি স্বাক্ষরের সময়সূচি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সমঝোতা স্মারকটি রোববারই স্বাক্ষরিত হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং সুনির্দিষ্ট তারিখ জানতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তার মতে, রোববার এই চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বিবিসি-র বরাতে জানা গেছে, যদিও ট্রাম্প রোববারকেই চুক্তির দিন হিসেবে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তবে ইরানের এমন দোদুল্যমান অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াটিকে শেষ মুহূর্তে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয় কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যদি চুক্তিটি আজ স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা বৈশ্বিক রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। মূলত অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়গুলোই এই আলোচনার প্রধান আকর্ষণ।
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ বন্ধ এবং অর্থনীতি সচল করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজকালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার (১৩ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আর চুক্তি সই হতে পারে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, চুক্তিটি যদি সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটাতে এমন একটি চুক্তি সত্যিই ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে গণ্য হবে। এটি একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ সুগম করবে, অন্যদিকে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেল ও অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। দুই দেশের এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে নেপথ্যের নায়ক ও প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক সব চুক্তির দেশ হিসাবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ভেন্যু হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
নেপথ্যের নায়ক পাকিস্তান: দুই চিরবৈরী দেশের এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে।
প্রস্তুত জেনেভা: সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক চুক্তির শহর হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকে ভেন্যু হিসেবে প্রস্তুত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন সমীকরণ: এই চুক্তির ফলে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ‘লেবানন’ নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
ইসরায়েলে তোলপাড়: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য চুক্তির খবরে ইসরায়েলি শিবিরে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ডিজিটাল স্বাক্ষর ও দুই ধাপের শান্তি প্রক্রিয়া: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ জানিয়েছেন, চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এতে ‘ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর’ বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সই করবেন। এরপর আগামী সপ্তাহ থেকেই শুরু হবে কারিগরি ও কৌশলগত পর্যায়ের দীর্ঘ আলোচনা। এই শান্তি আলোচনা সফল করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আন্তরিকতার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে শাহবাজ শরিফ বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এই সম্ভাব্য চুক্তির পুরো কাঠামো ও ব্লুপ্রিন্ট বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
আরাগচি জানান, পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটি মূলত দুটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। এই প্রাথমিক চুক্তি সই হওয়ার সাথে সাথেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা ইরানের সমস্ত আর্থিক সম্পদ একযোগে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ, যা প্রায় ৬০ দিন স্থায়ী হবে এবং এই সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উভয় পক্ষ টেবিলে বসবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং সামগ্রিক পারমাণবিক ইস্যুটিকে কৌশলেই প্রথম ধাপ থেকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনার জন্য তোলা রাখা হয়েছে। আমেরিকা চেয়েছিল ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিক, কিন্তু ইরান তাদের অবস্থানে অনড়। আরাগচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো হবে না, বরং তা ইরানের ভেতরেই তরল করা হবে এবং এটাই একমাত্র উপায়। দ্বিতীয় ধাপের ৬০ দিনের আলোচনায় আমেরিকার আরোপিত সব অবৈধ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চিরতরে প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে থাকবে। যদি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্ভব না হয়, তবে পুরো পরিস্থিতি আবার আগের যুদ্ধকালীন অবস্থায় ফিরে যাবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
রণাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে আরাগচি বলেন, আমেরিকা-ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও এই অন্যায় যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের কূটনীতি মূলত রণাঙ্গনের এই বিজয়কে চুক্তির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে মাত্র। এই চুক্তির প্রথম শর্তই হচ্ছে ইরানের ওপর আমেরিকার দেওয়া অবৈধ নৌঅবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। এছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একটি বিশাল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্যাকেজ এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত, যার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিতে বিপুল আন্তর্জাতিক তহবিলের জোগান আসবে। ইতিহাসের এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাপ্তরিকভাবে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানাতে বাধ্য হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী ও লেবানন নিয়ে নতুন সমীকরণ: চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে একযোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং কোনো পক্ষই আর শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। ওমানের সাথে যৌথভাবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনার জন্য আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি নতুন আইনি ও পরিচালন কাঠামো ঘোষণা করবে ইরান। তবে মার্কিন ব্লক বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সেখানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে।
ইসরায়েলি শিবিরে চরম উদ্বেগ, নেতানিয়াহুর ক্ষোভ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই আসন্ন শান্তি চুক্তিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেল আবিব কোনোভাবেই এই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের জনগণের সামনে যে রণকৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তা ছিল ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলা।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বর্তমান ব্যবস্থার সাথেই চুক্তি করে ফেলায় ইসরাইলি প্রশাসন ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে, কারণ লেবানন সীমান্ত সুরক্ষিত না হলে উত্তর ইসরায়েলের বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ নাগরিক ঘরে ফিরতে পারবে না, যা আগামী ইসরায়েলি নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পরাজয় নিশ্চিত করতে পারে। তাই চুক্তি সইয়ের আগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়ে যতটা সম্ভব সুবিধা আদায়ের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরাইল। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-রয়টার্স
ছবি: সংগৃহীত
রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরুর পরপরই বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ বা লাখ কোটিপতি হওয়ার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছেন ইলন মাস্ক। গত শুক্রবারের আগপর্যন্ত ‘ট্রিলিয়ন’ সংখ্যাটি কেবল গুটিকয় বড় অর্থনীতির জিডিপি কিংবা বিশাল ঋণের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতে দেখা যেত, তবে এখন তা একজন ব্যক্তির একক সম্পদে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের এই মহাতারকার সম্পদ যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, তা আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, স্পেসএক্সের দুর্দান্ত অভিষেকের পর মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ১ লাখ ১০ হাজার কোটি (১.১ ট্রিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের জুনের বিনিময় হার অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১২৩ লাখ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায়, প্রথম কোনো ব্যক্তির ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার এই ঘটনাকে অনেকে বৈষম্যের চরম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
এক লাখ কোটি বা এক ট্রিলিয়ন সংখ্যাটি কল্পনা করাও সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন। ১ ট্রিলিয়ন লিখতে ১-এর পর ১২টি শূন্য দিতে হয়। যদি এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাগজের নোট একটার পর একটা লম্বালম্বিভাবে সাজানো হয়, তবে তা প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এটি পৃথিবী থেকে চাঁদে ২০০ বারের বেশি যাতায়াতের সমান দূরত্ব এবং পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্বকেও ছাড়িয়ে যাবে।
ইউএস সেনসাস ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৮২০ কোটি মানুষ বাস করছে। এই এক ট্রিলিয়ন ডলার যদি বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে প্রত্যেকে প্রায় ১২২ ডলার বা ১৫ হাজার টাকা করে পাবেন। এছাড়া এই বিশাল সম্পদ মাস্কের জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকার বার্ষিক জিডিপির দ্বিগুণেরও বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ২১টি দেশ এক ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপির গণ্ডি পার করতে পেরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন বাজারের চিত্র অনুযায়ী, মাস্কের এই সম্পদ দিয়ে বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ২৫ লাখ মাঝারি মানের বাড়ি একবারে কেনা সম্ভব। জ্বালানি তেলের বাজারেও এর প্রভাব ব্যাপক। বর্তমান চড়া দামেও এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ২৪ হাজার ৩০০ কোটি গ্যালন তেল কেনা যাবে, যা দিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সব গাড়ি প্রায় দুই বছর চালানো সম্ভব। উল্লেখ্য, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
সম্পদের দৌড়ে মাস্ক তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে গেছেন। ফোর্বসের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজের চেয়ে মাস্ক এখন প্রায় ৭০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার এগিয়ে। এমনকি তালিকার পরবর্তী চারজন শীর্ষ ধনীর—ল্যারি পেজ, সের্গেই ব্রিন, জেফ বেজোস ও ল্যারি এলিসন—মোট সম্পদ একত্রে যোগ করলেও তা মাস্কের একক সম্পদের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
শেয়ারবাজারের ওঠানামার কারণে এই সম্পদের পরিমাণ যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। ২০২৪ সালে মাস্কের সম্পত্তি যেখানে ছিল মাত্র ১৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, স্পেসএক্সের আইপিও আসার সুবাদে তা এখন রকেটের গতিতে বেড়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যক্তিগত এই বিশাল প্রাচুর্য একদিকে যেমন প্রযুক্তির জয়জয়কার ঘোষণা করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত রাষ্ট্র-সমর্থিত সাইবার অনুপ্রবেশের প্রায় অর্ধেক ঘটনার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা জড়িত। পিয়ংইয়ং-সমর্থিত এই সাইবার গোষ্ঠীগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রাউডস্ট্রাইকের বার্ষিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার ‘ফেমাস চোল্লিমা’ নামক একটি হ্যাকার গোষ্ঠী ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রযুক্তি খাতের ওপর পরিচালিত রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত সাইবার তৎপরতার ৪৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। এই গোষ্ঠীটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অন্যতম প্রধান সাইবার হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তারা ভুয়া দূরবর্তী কর্মী বা রিমোট ওয়ার্কার সেজে চাকরি নেওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ডিপফেক ছবি ব্যবহার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির মতো অভিনব সব পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছে।
ক্রাউডস্ট্রাইক জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সাইবার অপারেটিভরা প্রায়ই নিজেদের সফটওয়্যার ডেভেলপার, প্রোগ্রামার বা আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে দূরবর্তী চাকরি লাভের চেষ্টা করে। তাদের এই জালিয়াতিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর ডিপফেক ছবি এবং চুরি করা পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে তারা বৈধ চাকরিপ্রার্থীর ছদ্মবেশে প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে প্রবেশের সুযোগ পায়।
এই কৌশলী অনুপ্রবেশের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া মূলত দ্বিমুখী সুবিধা লাভ করছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছদ্মবেশী এসব কর্মীরা যে বেতন পায়, তা সরাসরি দেশটির সরকারের তহবিলে জমা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তারা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ মেধাস্বত্ব, গোপন ব্যবসায়িক তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে স্থায়ী প্রবেশাধিকার লাভ করে। অনেক ক্ষেত্রে হ্যাকাররা এই সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের হুমকি দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বড় অঙ্কের মুক্তিপণও দাবি করে থাকে।
প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের বিশেষ নজর রয়েছে ব্লকচেইন ডেভেলপার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানিগুলোর ওপর। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে যেতে দেশটি এখন সাইবার চুরির মাধ্যমে ডিজিটাল সম্পদ অর্জনের ওপর ক্রমবর্ধমান হারে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই উত্তর কোরিয়া-সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধীরা প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নিয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সাইবার অপরাধের মাধ্যমে তারা আরও কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে বলে ধারণা করা হয়।
ক্রাউডস্ট্রাইকের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, এই হ্যাকাররা সাধারণত ‘হ্যান্ডস-অন-কিবোর্ড’ পদ্ধতিতে হামলা চালায়। এসব হামলায় স্বয়ংক্রিয় ম্যালওয়্যারের পরিবর্তে প্রকৃত ব্যক্তিরা সরাসরি ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে কাজ করে। সাধারণত চুরি করা লগইন তথ্য ব্যবহার করে হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বৈধ সফটওয়্যার ও টুলসের অপব্যবহার করে। ফলে তারা দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অবস্থান করতে পারে এবং প্রচলিত নিরাপত্তা সফটওয়্যারের নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জব্দকৃত প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ সম্পদ ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ইরানের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা। তবে এই বিষয়ে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা সরাসরি নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়নি। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির বরাতে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি শুক্রবার এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি প্রকাশ করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সিনিয়র উপদেষ্টা মহসেন রেজায়ি দক্ষিণ-পশ্চিমের শহর দেজফুলে এক জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় এই দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতগুলো বিশ্ব দরবারে ইরানের সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। রেজায়ি আরও মন্তব্য করেন যে, ‘জুয়াড়ি ট্রাম্প’ এখন তেহরানের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসতেও দ্বিধাবোধ করছেন। তার মতে, ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধ ব্যবস্থার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের জব্দকৃত অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছে।
রেজায়ি তার বক্তব্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন যে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইসরায়েলি লবিস্টদের প্রভাব এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, দেশটি বর্তমানে কার্যত ‘জায়নবাদী শাসনের’ একটি ‘উপনিবেশে’ পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে একই দিনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের খুব কাছে অবস্থান করছে। এই চুক্তিটি আলোর মুখ দেখলে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটবে এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারবে।
এদিকে হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের সাথে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই চুক্তির বিনিময়ে ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচি স্থায়ীভাবে ভেঙে দেওয়ার কঠোর শর্ত আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে রেজায়ির দাবি অত্যন্ত জোরালো, তবে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত কোন শর্তে স্বাক্ষরিত হয়, সেদিকেই এখন বিশ্ববাসীর নজর।
ছবি: সংগৃহীত
প্রতিবেশী দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা সংক্রমণের জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ উগান্ডার ওপর বিমান ভ্রমণের যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তার তীব্র সমালোচনা করেছে কাম্পালা। উগান্ডা সরকার এই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাকে ‘অন্যায্য’ হিসেবে অভিহিত করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রাণঘাতী ও রক্তক্ষরণজনিত এই ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় উগান্ডার গৃহীত তড়িৎ পদক্ষেপগুলো বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে কঙ্গোতে প্রথম সতর্কতা জারির পর থেকে উগান্ডায় এখন পর্যন্ত ১৯ জন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে মাত্র দুজনের মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখ্য, আক্রান্তদের প্রায় সবাই ছিলেন কঙ্গোর নাগরিক, যারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে উগান্ডায় প্রবেশ করেছিলেন। অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ১৫ মে থেকে এ পর্যন্ত ৬৭৬ জনেরও বেশি সংক্রমিত হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৩৬ জনের।
উগান্ডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব ডায়ানা আতউইন শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, উগান্ডার বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিমান চলাচলে এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, ‘সতর্কতার প্রয়োজন আমরা বুঝি। তবে সার্বিক নিষেধাজ্ঞা সেই দেশগুলোর ওপর আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে, যারা সংক্রমণের তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করে এবং এটি বাস্তব ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস গত সোমবার উগান্ডা সফরকালে দেশটির প্রতিরোধমূলক কৌশলের প্রশংসা করেছিলেন। তবে শুক্রবার জাতিসংঘের এই স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়েছে যে, প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের নতুন নতুন এলাকায় এই প্রাদুর্ভাব ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। উগান্ডা মনে করছে, তাদের স্বচ্ছতা এবং কার্যকর পদক্ষেপের পরও এ ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র যাতে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করতে না পারে, সেই লক্ষ্যে তেহরান তাদের ইসফাহান পরমাণু কেন্দ্রের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা হিসেবে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলোতে মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুদ্ধের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের পরমাণু মজুত জব্দে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছিলেন, সেই সময়ের তুলনায় বর্তমানে ইসফাহান থেকে ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা যেকোনো পক্ষের জন্যই অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এমনকি খোদ ইরানিদের জন্যও এই ধ্বংসস্তূপ থেকে ইউরেনিয়াম বের করা এখন প্রায় অসম্ভব।
পরমাণু খাতের একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইরানের এই কৌশলগত পদক্ষেপ এক নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে তেহরান হয়তো দাবি করবে, ধ্বংসপ্রাপ্ত সুড়ঙ্গগুলো থেকে পরমাণু উপাদান উদ্ধার করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। অথচ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে যে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, সেখানে এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মার্কিন ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সংশ্লিষ্ট শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা স্কট রোকার জানান, যদি সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী ইরানকে তাদের মজুতকৃত ইউরেনিয়াম অপসারণ বা রূপান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে তার পূর্ণ তালিকা প্রদান ও উদ্ধারের দায়ভার তেহরানের ওপরই থাকবে।
রোকার আশঙ্কা করছেন, ইরান এই সুযোগে কিছু উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে দাবি করতে পারে। তার মতে, ফলে ভবিষ্যতে ইরান যেকোনো সময় গোপনে সেই ইউরেনিয়ামের নাগাল পাবে না—এমন নিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে থাকবে না।
মন্তব্য