করোনাভাইরাসে ভারতের আরও এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবনাবসান ঘটল। সোমবার অসমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ মারা গেছেন। সোমবার ভারতীয় সময় বিকেল পাঁচটা ৩৩ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
২৬ আগস্ট কোভিড আক্রান্ত হয়ে গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন গগৈ। পরে সুস্থ হয়ে তিনি বাড়িও ফিরেছিলেন। কিন্তু শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়ায় তাকে ১ নভেম্বর আবার জিএমসি-তেই ভর্তি করা হয়।
শনিবার থেকেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ গগৈয়ের আরোগ্য কামনায় মন্দিরে ও মসজিদে দোয়া করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।
চিকিৎসকদের সব চেষ্টাকে হার মানিয়ে সোমবার তরুণ গগৈ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। উত্তর পূর্ব ভারতের বর্ষীয়াণ এই কংগ্রেস নেতার মৃত্যুতে অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে দল। নেমে আসে শোকের ছায়া।
অসমের তাই-অহম জনগোষ্ঠীর এই প্রবীণ নেতা স্ত্রী ডলি, ছেলে গৌরব ও মেয়ে চন্দ্রীমাকে রেখে গেছেন। গৌরব ভারতের জাতীয় সংসদের সদস্য।
২০০১ সালে তরুণ গগৈর নেতৃত্বেই অসমে ক্ষমতায় ফেরে কংগ্রেস। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। টানা ১৫ বছর তিনিই ছিলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। ২০১৬ সালে পরাস্ত হলেও ২০২১-এ ফের কংগ্রেসকে ক্ষমতায় আনার বিষয়ে ছিলেন আত্মবিশ্বাসী।
আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর মুখ্যমন্ত্রী হতে চান না তিনি। চেয়েছিলেন কংগ্রেসকে ক্ষমতায় আনতে। আমৃত্যু কংগ্রেস-ই করেছেন তিনি। কখনও দল ছাড়েননি।
বহুদিন ধরেই সর্বভারতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ তরুণ গগৈ। প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধি থেকে রাজীব গান্ধি, দুই জনই গগৈকে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমা রাওয়ের আমলে তিনি ছিলেন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মন্ত্রণালয়ের স্বাধীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রমন্ত্রী। ছয়বার তিনি নির্বাচিত হয়েছেন লোকসভা সদস্য।
২০০১ সাল থেকে রাজ্য বিধানসভার সদস্য। টানা ১৫ বছর অসমের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে রেকর্ড করেছেন তিনি। এত দীর্ঘ সময় অসমে কেউ মুখ্যমন্ত্রী থাকেননি।
তার মৃত্যুতে অসমে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল, বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া থেকে শুরু করে দলমত নির্বিশেষে সমাজের সব স্তরের মানুষ শোক ব্যক্ত করেছেন।
তরুণ গগৈয়ের মৃত্যুতে অসম-সহ গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চলের এক বর্ণময় রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
ফাইল ছবি
সংযুক্ত আরব আমিরাত ভ্রমণে আগ্রহী পর্যটকদের জন্য এসেছে নতুন সুযোগ। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশটি এখন ট্যুরিস্ট ভিসা ইস্যুর বিশেষ সুবিধা চালু করেছে, যা সাধারণ মানুষের ভ্রমণ প্রক্রিয়াকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত, সাশ্রয়ী ও সহজ করে তুলেছে।
শনিবার (২০ জুন) মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নতুন এই দ্রুত ভিসা সুবিধার পাশাপাশি বর্তমানে দেশটিতে হোটেল বুকিং, ডেজার্ট সাফারি, জেট স্কি এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় পর্যটন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে অত্যন্ত কম খরচে দুবাইসহ আরব আমিরাতের অন্যান্য আকর্ষণীয় গন্তব্য ভ্রমণের এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্টদের মতে, ভিসা প্রক্রিয়া রেকর্ড সময়ে সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি হোটেল ও আউটডোর অ্যাক্টিভিটিতে বড় ধরনের ডিসকাউন্ট বা বিশেষ ছাড় থাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন পর্যটকদের জন্য আরও সাশ্রয়ী একটি গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। অনেক নামী হোটেলেই বর্তমান গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে রুম ভাড়া মাত্র প্রায় ১৩৯ দিরহাম থেকে শুরু হচ্ছে।
দুবাইয়ের অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় অভিজ্ঞতা হলো ডেজার্ট সাফারি, যা সাধারণত শীতকালে প্রায় ১৫০ দিরহামের কাছাকাছি থাকলেও এই অফারের কারণে গ্রীষ্মে মাত্র ৫০ দিরহামের মধ্যে উপভোগ করা যাচ্ছে। একইভাবে জেট স্কি ও বাগি রাইডসহ রোমাঞ্চকর সব আউটডোর অ্যাক্টিভিটিতে এখন প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছেন স্থানীয় অপারেটররা।
বিশেষ করে বুর্জ আল আরব এবং আটলান্টিসের মতো বিশ্ববিখ্যাত স্থাপনাগুলো কাছ থেকে দেখার জন্য জেট স্কি রাইডও এখন পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
দুবাইয়ের অন্যতম ট্রাভেল এজেন্সি প্লুটো ট্রাভেলসের ম্যানেজিং পার্টনার ভরত আইদাসানি এই প্রসঙ্গে বলেন, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত ভিসা পাওয়ার এই অনন্য সুবিধার কারণে সাধারণ পর্যটকদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভ্রমণের আগ্রহ আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং খুব দ্রুততম সময়ে ভিসা অনুমোদন পাওয়া গেলে যেকোনো শেষ মুহূর্তের ভ্রমণ পরিকল্পনা করাও অনেক সহজ হবে।
ট্রাভেল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রীষ্মকালে হোটেল ও পর্যটন সেবায় এই ধরনের আকর্ষনীয় ছাড় বেশি থাকায় এটি এখন বাজেট-বান্ধব বা স্বল্প খরচের একটি চমৎকার ভ্রমণ গন্তব্যে রূপান্তরিত হয়েছে।
তবে ভ্রমণের আগে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, পর্যটকদের উচিত বিভিন্ন এজেন্সির অফারগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে বুকিং করা এবং কোথায় কী ধরনের বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে তা নিশ্চিত হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া। সব মিলিয়ে, কম খরচে বিলাসবহুল দুবাই ভ্রমণ এখন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অনেক বেশি সহজ ও মোহনীয় হয়ে উঠছে।
ছবি: সংগৃহীত
সন্তান হারানোর অসহনীয় বেদনাকে জয় করে এক অনন্য মহানুভবতার পরিচয় দিলেন সৌদি আরবের নাগরিক শেখ ইয়াহিয়া বিন কানস আল-বুশরি। নিজের ছেলের খুনিকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি স্থাপন করেছেন মানবিকতার এক বিরল নজির। দণ্ড কার্যকরের মাত্র ১৫ ঘণ্টা বাকি থাকতে কোনো প্রকার আর্থিক সুবিধা ছাড়াই ঘাতককে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা করে দেন তিনি। এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনার একটি ভিডিও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
জানা গেছে, নিহত যুবকের নাম বন্দর এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামির নাম ইয়াসের। শেখ ইয়াহিয়া একসময় অত্যন্ত বিত্তশালী থাকলেও বর্তমানে বেশ সাধারণ জীবন অতিবাহিত করছেন। তা সত্ত্বেও পুত্রের জীবনের বিনিময়ে প্রস্তাবিত কয়েক মিলিয়ন রিয়ালের ‘ব্লাড মানি’ বা রক্তপণ নিতে তিনি সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। ইয়াহিয়া স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো পার্থিব লাভের আশায় নয়, বরং কেবল মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই তিনি ঘাতককে ক্ষমা করেছেন। এই ক্ষমার সংবাদটি দিতে তিনি নিজেই উপস্থিত হন ঘাতক ইয়াসেরের মায়ের গৃহে।
সেখানে এক অবর্ণনীয় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিজ সন্তানের জীবন ফিরে পাওয়ার সংবাদে বিচলিত ও কৃতজ্ঞ মা শ্রদ্ধাবনত হয়ে ইয়াহিয়ার পায়ে চুমু খেতে চাইলে তিনি তাকে বিনয়ের সঙ্গে বাধা দেন। পরিবর্তে তিনি নিজেই সেই শোকাতুর মায়ের কপালে পরম মমতায় চুম্বন করে তাকে শান্ত করেন। কিছুক্ষণ পর ঘাতকের ভাইয়েরাও সেখানে উপস্থিত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লে এই শোকাতুর পিতা তাদের বুকে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দেন। প্রিয় সন্তানকে হারানোর ক্ষত বয়ে নিয়েও একজন মানুষের এমন অকল্পনীয় ক্ষমাশীল আচরণে বিশ্বজুড়ে বইছে প্রশংসার জোয়ার।
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্য বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধ, সংঘাত আর অনিশ্চয়তার এক চিরচেনা ছবি। কিন্তু এই অশান্তির দায় যতটা না ওখানকার সাধারণ মানুষের, তার চেয়ে অনেক বেশি ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে থাকা কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং পরাশক্তিদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের। গত এক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলে শান্তি ফেরানোর নামে যতগুলো বড় বড় চুক্তি হয়েছে, সেগুলোর প্রায় প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে যা ছিল ‘শান্তির উদ্যোগ’, ভেতরের দিক থেকে তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ভূখণ্ডকে চূর্ণবিচূর্ণ করার সুনিপুণ হাতিয়ার।
ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৬ সালের জুনে এসে আজও এক চরম নাটকীয়তার সাক্ষী হলো বিশ্ব। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে শুক্রবার (১৯ জুন)যে বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তা শেষ মুহূর্তে আকস্মিকভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফর বাতিলের পর এই অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ শান্তিকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে চার মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে এই ‘শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ’ কোন দিকে যাবে তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে পুরো লেবানন ছারখার করে দেওয়ার উগ্র হুংকার—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আবার এক নতুন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানে গত বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্বারক সই হলেও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা হয়েছে।
শুক্রবার (১৯ জুন)লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া কয়েকজন আহত ও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (এনএনএ)। খবর-আলজাজিরার।
এনএনএ জানায়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর শুরু হওয়া এই হামলা সাম্প্রতিক সময়ে এলাকাটিতে চালানো সবচেয়ে তীব্র ইসরায়েলি আক্রমণগুলোর একটি। একাধিক আবাসিক বাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে, গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি সই হলেও গাজায় থামেনি ইসরায়েলি নৃশংসতা। হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনসের গাজা পরিচালক ফিকর শালতুত বলেন, গাজা আরও একটি মর্মান্তিক মাইলফলকে পৌঁছানোয় আমরা শোকাহত। যে হাজার হাজার মানুষকে বলা হয়েছিল সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি শেষ হয়ে গেছে, তারা এখনো তাদের প্রিয়জনকে দাফন করছেন। এই ‘যুদ্ধবিরতি’ বড় ধরনের যুদ্ধ বন্ধ করলেও, চুক্তির দ্বিতীয় ও অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়টি বাস্তবায়নের জন্য কোনো সমঝোতা হয়নি। এই পর্যায়ে গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্যদের প্রত্যাহার এবং হামাসের অস্ত্র সমর্পণের কথা ছিল।
অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাদের উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে। চুক্তির আওতায় গাজা উপত্যকার ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা থাকলেও, বর্তমানে তারা ৬৪ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
জাতিসংঘ মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী অফিস (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, পূর্ব গাজা সিটির ডজনখানেক পরিবারকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। কারণ, ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে হলুদ রঙের সিমেন্টের ব্লক স্থাপন করেছে, যা তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখাকে পশ্চিম দিকে আরও সম্প্রসারিত করার ইঙ্গিত দেয়।
এদিকে, ইসরায়েল ও ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আলোচনার মাধ্যমে এই চুক্তি চূড়ান্ত করেছে, যেখানে সহযোগিতা করেছে ইরান।
এসব আলোচনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা ইরান চুক্তি (সমঝোতা স্মারক) মেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
একই সঙ্গে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র হিসেবে অবশিষ্ট আছে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক ব্রিফিংয়ের শেষভাগে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র যে শক্তিশালী মিত্রটি টিকে আছে, অন্তত তাকে আক্রমণ করতাম না।’
জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দেন যে ইসরায়েলের ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা অস্ত্রের তিন-চতুর্থাংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এবং এর খরচও তারাই জুগিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সমস্যাটি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প নন’।
কলমের খোঁচায় কৃত্রিম ক্ষত, ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি: মধ্যপ্রাচ্যের আজকের যত সীমান্ত বিরোধ ও জাতিগত সংঘাত, তার সিংহভাগের শুরু হয়েছিল মূলত পশ্চিমা পরাশক্তিদের নিজেদের স্বার্থ, আধিপত্য এবং তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার আদিম খেলায়।
সাইকস-পিকট চুক্তি (১৯১৬): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্স অত্যন্ত গোপনে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে আরবের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি বা জাতিগত পরিচয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শিয়া, সুন্নি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়গুলোকে জোর করে কৃত্রিম সীমান্তের ভেতর আটকে দেওয়া হয়। ফলে সিরিয়া ও ইরাকে স্থায়ী অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি হয়। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বড় জাতিগোষ্ঠী ‘কুর্দি’দের কোনো নিজস্ব রাষ্ট্র না দিয়ে তাদের সীমানা ভেঙে চার টুকরো করে দেওয়া হয়।
বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭): ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমিতে ইহুদিদের জন্য ‘জাতীয় আবাসভূমি’ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। শতভাগ ফিলিস্তিনি আরবদের মতামত না নিয়ে চাপিয়ে দেওয়া এই সিদ্ধান্তের সূত্র ধরেই ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হয় এবং লাখ লাখ ফিলিস্তিনি নিজ ভূখণ্ড হারিয়ে শরণার্থী হন।
ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি (১৯৭৮) ও আব্রাহাম অ্যাকর্ডস (২০২০): ১৯৭৮ সালে মিসর এবং ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোর মতো দেশগুলো ফিলিস্তিন সংকটকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পশ্চিমা বিশ্বের চোখে এটি সাফল্য হলেও, এর ফলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরব বিশ্বের সম্মিলিত ঐক্য ভেঙে যায় এবং ফিলিস্তিনিরা চরমভাবে একাকী ও অসহায় হয়ে পড়ে।
অসলো চুক্তি (১৯৯৩): ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রাবিনের ঐতিহাসিক চুক্তি বিশ্বকে ‘দুই-রাষ্ট্র সমাধান’-এর স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবে তা ফিলিস্তিনকে প্রকৃত স্বাধীনতা দেয়নি। উল্টো ফিলিস্তিনকে অঞ্চল ‘এ’ (ইসরায়েলি সামরিক বেষ্টনীতে ঘেরা মূল শহর), অঞ্চল ‘বি’ (যৌথ নিয়ন্ত্রণ) এবং অঞ্চল ‘সি’ (পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ এলাকা যা সম্পূর্ণ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এবং যেখানে অবৈধ ইহুদি বসতি গড়া হচ্ছে)—এই তিন ভাগে ভাগ করে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে থমকে গেল আলোচনা: ইতিহাসের সেই কৃত্রিম সংকটের জের ধরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এক বিধ্বংসী সংঘাত শুরু হয়। চার মাসের এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে অন্তত ৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।
এই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে আয়োজিত বৈঠকটি স্থগিত হওয়ার পর হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ‘এ আলোচনার সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ ছিল না।’ সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ না জানালেও, ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরান কঠোর শর্ত দিয়েছিল যে আলোচনার টেবিলে বসার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি তথা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে হবে।
‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বনাম ট্রাম্পের হতাশা ও কৌশলগত পিছুটান: ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত কঠোর অবস্থান এবং তেহরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার’ হুংকার থেকে তিনি নাটকীয়ভাবে পিছু হটেছেন বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। সম্প্রতি তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পাদিত ১৪ দফার প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যগুলোর প্রায় সব কটিই তিনি শিথিল করেছেন অথবা পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন।
গত ৬ মার্চ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছিলেন, ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া ইরানের সঙ্গে আর কোনো চুক্তি হবে না।’ কিন্তু বর্তমান চুক্তির বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। চুক্তিতে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তোলা, প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি আটকে থাকা বৈশ্বিক সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং ৩ হাজার কোটি ডলারের পুনর্গঠন তহবিলের কথা বলা হয়েছে।
এই কারণে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছেন। অন্যদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প চরম ‘হতাশা’ থেকে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন লক্ষ্য বনাম চুক্তির বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ: কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ এড়াতে মার্কিন প্রশাসন তেহরনাকে ব্যাপক নীতিগত ও কৌশলগত ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংসের হুমকি: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। এটি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’ তবে গত বুধবার ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ সম্মেলন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পকে একেবারে ভিন্ন সুরে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র থাকা স্বাভাবিক। ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের কাছে কিছু থাকতেই হবে। কারণ, অন্যদের কাছেও তা রয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র কোনো সমস্যা নয়। কারণ, এগুলো পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দেয় না।’ বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে কোনো উল্লেখই নেই, যা ইরানের একটি বড় কৌশলগত বিজয়।
রেজিম পরিবর্তন বা শাসনব্যবস্থা বদল: যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনগুলোতে ট্রাম্প ইরানের জনগণকে তাদের সরকার পতনের ডাক দিয়েছিলেন। পরে ইরানিদের পক্ষ থেকে এমন কোনো গণঅভ্যুত্থানের লক্ষণ না পাওয়ায় হোয়াইট হাউস এই অবস্থান থেকে সরে আসে। যদিও মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনাকে ট্রাম্প প্রশাসন একধরনের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ হিসেবে দাবি করতে চেয়েছিল, কিন্তু ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক নেতার ছেলে মোজতবা খামেনি, যা তেহরানের শাসনকাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। গত বুধবার ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ‘আমি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য এটি করিনি।’
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মজুত জব্দ: গত এপ্রিল মাসেও ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘ইরানের কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সহ্য করা হবে না।’ তবে বর্তমানে ট্রাম্প বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কাজের জন্য ইরানকে স্বল্পমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দিতে সম্মতি জানিয়েছেন। একইভাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত প্রসঙ্গে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সেই মজুত আইএইএর (IAEA) তত্ত্বাবধানে ইরানের মাটিতেই নিষ্ক্রিয় বা মিশ্রিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রক্সি গোষ্ঠী ও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ: মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোতে ইরানের অর্থায়ন চিরতরে বন্ধ করা। কিন্তু বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধের বিষয়ে সরাসরি কোনো আইনি বাধ্যবাকতা রাখা হয়নি। অন্যদিকে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ‘স্থায়ীভাবে টোলমুক্ত’ রাখার দাবি জানালেও, চুক্তিতে মাত্র ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবেই আমরা পরিষেবার জন্য ফি আদায় করব।’
লেবাননে ইসরায়েলের উগ্র অবস্থান ও মার্কিন-ইসরায়েল ফাটল: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই শান্তি আলোচনা ও চুক্তি নিয়ে যখন তীব্র টানাপোড়েন চলছে, তখন এই প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়া ইসরায়েল নিজেদের এই চুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। তারা লেবাননে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। লেবাননে ইসরায়েলের নতুন বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাষ্টুচ্যুত হয়েছেন। চুক্তিতে লেবাননে যুদ্ধের ‘স্থায়ী অবসান’–এর কথা বলা হলেও ইসরায়েল সাফ জানিয়েছে, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই; উল্টো তারা দখলকৃত অঞ্চলের পরিধি বাড়াতে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এই নিয়ে ট্রাম্প এখন প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের সমালোচনা শুরু করায় গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশ দুটির সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ফাটল তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় ৪ ইসরায়েলি সেনা নিহত হন, যার মধ্যে ছিলেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ৪১ নম্বর ব্রিগেডের অধীনস্থ ৫২ নম্বর ব্যাটালিয়নের কমান্ডার ৩২ বছর বয়সি লেফটেন্যান্ট ডর গেদালিয়া বেন সিমহন। এই ঘটনার পরপরই চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন ইসরায়েলের অতি ডানপন্থী নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, আমেরিকানদের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, ইসরায়েলকে পুরো বিশ্বের কাছে এটি স্পষ্ট করে দিতে হবে—আমাদের সন্তানদের রক্ত এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনো হেলাফেলার বস্তু নয়। পুরো লেবানন পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। একজন ইসরায়েলি মায়ের প্রতি ফোঁটা চোখের জলের বদলে এক হাজার লেবাননি মাকে কাঁদতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে টিকে থাকতে হলে ‘উন্মাদের মতো আচরণ করতে হবে, সবকিছু নিশ্চিহ্ন ও গুঁড়িয়ে দিতে হবে’।
ইতিহাস এবং বর্তমানের এই দুই চিত্র মেলালে একটি সত্যই বারবার সামনে আসে—মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার নামে যতবার স্থানীয় মানুষের আবেগ, অধিকার ও ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারকে পাশ কাটিয়ে পরাশক্তিদের স্বার্থে কোনো চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, ততবারই তা নতুন কোনো যুদ্ধের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।
আজ ২০২৬ সালের জুনে দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিন ও লেবাননের মূল সংকটকে আড়ালে রেখে এবং ইসরায়েলকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে মার্কিন-ইরান যে শান্তিপ্রক্রিয়া সাজানো হয়েছিল, তা শুরুতেই থমকে যাওয়া প্রমাণ করে এর ভবিষ্যৎ কতটা অন্ধকার। কারণ, যতক্ষণ না বাহ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা ও ভূখণ্ড নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততক্ষণ শান্তির মোড়কে তৈরি এই ভঙ্গুর চুক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যকে আরও দীর্ঘকাল ধরে চূর্ণবিচূর্ণ করতেই থাকবে। পরাশক্তিদের পিছুটান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অনড় অবস্থান এটাই স্পষ্ট করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে শান্তির সূর্য এখনো বহু দূরে।
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) রেলওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগে নতুন গতি এসেছে। এ লক্ষ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রীদের সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রকল্পটির অগ্রগতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, গালফ রেলওয়ে শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও লজিস্টিক সংযোগের নতুন যুগের সূচনা করবে।
জিসিসি রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সম্পন্ন হলে কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ওমান একক রেলপথে যুক্ত হবে। প্রায় ২ হাজার ১১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নেটওয়ার্ক কুয়েত সিটি থেকে শুরু হয়ে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও ইউএই হয়ে ওমানের রাজধানী মাসকাট পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
জিসিসি পরিবহন মন্ত্রীদের বৈঠকে বলা হয়, রেলপথ চালু হলে সড়কপথে পণ্য পরিবহনের ওপর নির্ভরতা কমবে, পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো নেটওয়ার্ক চালু করা।
কুয়েত এ প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটি শাদাদিয়া থেকে সৌদি সীমান্তবর্তী নুয়াইসিব পর্যন্ত ১১১ কিলোমিটার রেলপথের নকশা প্রণয়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এছাড়া কুয়েত পৌর কাউন্সিল সৌদি আরবের সঙ্গে রেল সংযোগের রুট ও করিডর অনুমোদন করেছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরবও কুয়েত-সৌদি রেল সংযোগ প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুয়েত সীমান্ত থেকে ইউএই সীমান্ত পর্যন্ত সৌদি অংশের রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হবে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যাত্রীবাহী ট্রেন ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কুয়েত সিটি থেকে সৌদি রাজধানী রিয়াদ পর্যন্ত যাত্রা দুই ঘণ্টারও কম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। এছাড়া পণ্যবাহী ট্রেনের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুত ও কম খরচে পণ্য পরিবহন করা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গালফ রেলওয়ে প্রকল্প চালু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক একীকরণ আরও শক্তিশালী হবে। এটি শুধু বাণিজ্য নয়, পর্যটন, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং আন্তঃদেশীয় যোগাযোগেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একইসঙ্গে সমুদ্রপথে সম্ভাব্য বিঘ্ন বা সংকটের সময় বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবেও রেল নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বহু বছর ধরে পরিকল্পনাধীন গালফ রেলওয়ে প্রকল্প এখন বাস্তবায়নের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়মতো কাজ শেষ হলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ আন্তঃদেশীয় অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক গড়বে।
ছবি: সংগৃহীত
ভারত ও রাশিয়ার যৌথ প্রযুক্তিতে নির্মিত ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ও পরিধি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে। এবার এই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষুদ্রাকৃতি (স্মলার) ও হাইপারসনিক সংস্করণ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ। এই নতুন সংস্করণগুলো ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বহুমুখী আঘাত হানার সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গত বুধবার বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনে আয়োজিত ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে রুশ রাষ্ট্রদূত এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। রাষ্ট্রদূত আলিপভ তাঁর বক্তব্যে বলেন যে, ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার আধুনিকায়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। স্থলপথ, নৌবাহিনী, সাবমেরিন এবং আকাশপথে উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে এই প্রকল্প একটি দীর্ঘ ও সফল পথ পাড়ি দিয়েছে। ২০১৭ সালের ঐতিহাসিক পরীক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এর মাধ্যমেই ভারত কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের এক শক্তিশালী ত্রিভুজ বা ‘ট্রায়াড’ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম এবং নির্ভরযোগ্য প্রিসিশন স্ট্রাইক সিস্টেম হিসেবে স্বীকৃত।
রুশ রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ আরও উল্লেখ করেন যে, ব্রহ্মস প্রকল্পটি মূলত ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি অনন্য ও আদর্শ মডেলে পরিণত হয়েছে। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা দর্শনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে—যেখানে প্রথাগত ‘ক্রেতা-বিক্রেতা’ সম্পর্কের পরিবর্তে উন্নত প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ উন্নয়ন এবং উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দূরদর্শী ধারণাই পরবর্তীতে ভারতের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা সম্পর্কের কথা স্মরণ করে বলেন যে, ব্রহ্মস প্রকল্পের সফলতার পথ ধরেই ভারতে সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান, টি-৯০ যুদ্ধ ট্যাংক এবং অতি সম্প্রতি একে-২০৩ রাইফেল তৈরির মতো বৃহৎ ও সফল প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আলিপভ জানান, সুখোই-৫৭ প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি এবং এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যৌথ উৎপাদন এই সফল দ্বিপাক্ষিক যাত্রাকে আরও অর্থবহ করে তুলবে। এটি মূলত ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান গভীর আস্থা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের বিপুল চাহিদা তৈরি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে ‘অপারেশন সিন্দূর’-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন যে, সেখানে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র তার অসাধারণ দক্ষতা, চরম নির্ভরযোগ্যতা এবং নিখুঁত লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করেছে। ‘দি ইকোনমিক টাইমস’-এর সূত্রে এই প্রতিরক্ষা বিষয়ক তথ্যগুলো সামনে এসেছে।
ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে চার ইসরাইলি সেনা নিহতের ঘটনায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার পর ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির অত্যন্ত বিতর্কিত ও উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। শুক্রবার (১৯ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন ইসরাইলি মায়ের প্রতিটি অশ্রুর বদলে হাজারো লেবাননি মায়ের চোখে পানি ঝরতে হবে।’ মধ্যপ্রাচ্যে কোনো প্রকার নমনীয়তা না দেখিয়ে কঠোর শক্তি প্রয়োগের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমেরিকানদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, ইসরাইলকে পুরো বিশ্বকে পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে যে আমাদের সন্তানদের রক্ত এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনো দরকষাকষির বিষয় নয়। পুরো লেবানন পুড়ে যাক।’ বেন গভিরের মতে, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতে হলে কোনো প্রকার দরকষাকষি না করে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।
এদিকে কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের এমন অবস্থান এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কূটনৈতিক নীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ। তিনি এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের তলানিতে ঠ্যাকা সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। লাপিদ উল্লেখ করেন যে, সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইসরাইলি প্রশাসনের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পও নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেছেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে লাপিদ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘এই সরকারকে দ্রুত পরিবর্তন করা না গেলে ইসরায়েলের বৈদেশিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজনৈতিক এই বাগযুদ্ধের মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ভয়াবহ তান্ডব চালিয়েছে ইসরাইলি বিমান বাহিনী। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এনএনএ-এর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোররাত থেকে নাবাতিয়েহ অঞ্চলসহ বিভিন্ন জনপদে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভারী বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবে এই হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হয়েছেন, তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ চাপা পড়ে থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কঠোর জবাব হিসেবে অভিহিত করেছে এবং দাবি করেছে তারা কেবল হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে অভিযান চালিয়েছে।
অন্যদিকে হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননের আলি আল-তাহের পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় তারা ইসরাইলি বাহিনীর একটি অগ্রসরমান দলকে অতর্কিত আক্রমণ করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করেছে। গোষ্ঠীটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা গাইডেড মিসাইলের সাহায্যে ইসরাইলের তিনটি মারকাভা ট্যাংক সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে এবং ভারী রকেট ও গোলন্দাজ হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি সামরিক কর্তৃপক্ষও তাদের চার সেনার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে, যা এই সংঘাতের অন্যতম প্রাণঘাতী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে কূটনৈতিক তৎপরতায়ও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা চুক্তি বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনার জন্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি সেই সফর বাতিল করেছেন। ‘এক্সপ্রেস ট্রিবিউন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সংঘাত বন্ধের প্রচেষ্টা চললেও মাঠপর্যায়ে হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলি বাহিনীর পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর বৈশ্বিক রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অঙ্গনে নিজের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বহুগুণ বেড়েছে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের অপরাজেয় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন, এই যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি তাঁর ক্ষমতার প্রকৃত ব্যাপ্তি অনুভব করতে পেরেছেন। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁর এই মনোভাব ব্যক্ত করেন।
সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, ইরানের সাথে এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার প্রয়োগ ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নতুন কী শিক্ষা লাভ করেছেন। জবাবে ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, “তেমন কোনো ধারণা এখনও পাইনি। তবে আমি অনুভব করতে পারছি যে আমার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। হ্যাঁ, আমি জানি যে সীমা আছে, কিন্তু এখানে কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা সামরিকভাবে তাদের সম্পূর্ণ পরাজিত করেছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “আর সত্যি বলতে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আমাদের আছে। এমন অবরোধ আর কে করতে পারত? আমি যখন নৌ অবরোধের নির্দেশ দিয়েছিলাম, ইরানের একটি জাহাজও বন্দর থেকে বেরোতে পারেনি। কয়েক বার তারা চেষ্টা করেছিল, কিন্তু (তাদের) প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, আপনি জানেন।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত টানা ৪০ দিন চলার পর একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি দেখা দেয়। অবশেষে দীর্ঘ উত্তেজনা শেষে গত ১৭ জুন প্যারিসে আয়োজিত জি-৭ সম্মেলনে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান কার্যত নতি স্বীকার করেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন, “বেশ, আমি মনে করি এটি সম্ভবত নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।” এই চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্পের পাশে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ উপস্থিত ছিলেন এবং এর পরপরই তেহরান থেকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানও এতে স্বাক্ষর করেন।
ট্রাম্প এই সমঝোতাকে নিজের বিশাল বিজয় হিসেবে দেখলেও ইরানের পক্ষ থেকে এসেছে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। চুক্তির পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন যে, নীতিগতভাবে তিনি ওয়াশিংটনের সাথে কোনো ধরনের আপস বা চুক্তির পক্ষে ছিলেন না। খামেনির দাবি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চরম হঠকারিতা, বিভিন্নমুখী চাপ এবং প্রভাব খাটানোর কারণেই শেষ পর্যন্ত ইরান এই চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়েছে। মূলত ট্রাম্পের ‘মরিয়া প্রচেষ্টা’র কারণেই এই সমঝোতা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন ইরানি নেতা।
এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলেও ট্রাম্পের দাবি, তাঁর কঠোর অবস্থানের কারণেই একটি চূড়ান্ত ফয়সালা সম্ভব হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, নৌ অবরোধ এবং সামরিক চাপের মুখে ইরান তাদের কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তির ধারাগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হলেও, খামেনির মন্তব্য এবং ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ তত্ত্ব এই অঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা নিয়ে ট্রাম্পের এই বিতর্কিত মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মন্তব্য