অবুঝ বলেই জঙ্গিবাদের সমর্থক হয়েছিলাম: শামীমা

অবুঝ বলেই জঙ্গিবাদের সমর্থক হয়েছিলাম: শামীমা

প্রামাণ্যচিত্রে আইএসে যোগ দেয়া ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণী শামীমা বেগম। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে ২১ বছর বয়সী এই নারী বলেন, ‘২০১৫ সালে যখন আমি যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে সরাসরি যোগ দিয়েছিলাম, তখন আমি ছোট ও সরল ছিলাম। আইএস ধর্মের নামে যে সহিংসতা চালিয়েছিল, সেসব জানলে আমি কখনোই তাদের সমর্থন দিতাম না।’

‘ছয় বছর আগে অবুঝ ছিলাম বলেই জঙ্গিবাদের সমর্থক হয়ে গিয়েছিলাম।’ এমনটি জানিয়েছেন আইএস-বধূ শামীমা বেগম।

বর্তমানে ২১ বছর বয়সী এই নারী বলেন, ‘২০১৫ সালে যখন আমি যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে সরাসরি যোগ দিয়েছিলাম, তখন আমি ছোট ও সরল ছিলাম। তখন যা বিশ্বাস করেছিলাম, এখন আর সেসব জঙ্গিবাদে আমার আস্থা নেই। আইএস ধর্মের নামে যে সহিংসতা চালিয়েছিল, সেসব জানলে আমি কখনোই তাদের সমর্থন দিতাম না।’

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে শনিবার এমনটি উঠে এসেছে।

শামীমা আরও জানান, তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় গিয়েছিলেন মানবতার সেবা করতে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ঘনিষ্ঠ দুই বান্ধবী সিরিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করে। আমি তখন একা হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাদের সঙ্গে সিরিয়ায় পাড়ি দিই। মানুষ ভাবে যে আমি আইএসের সব অপরাধ জেনেশুনে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, তাদের সমর্থন দিয়েছি। কিন্তু এটা ঠিক নয়।’

তিনি জানান, জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অপরাধের জন্য তাকে দায়ী করাটা মানুষের আরেকটি বড় ভুল।

শামীমা আরও বলেন, ‘যখন ছোট ছিলাম, ভাবতাম আমিই সব বুঝি। এখন বুঝতে পেরেছি যে কতখানি ভুল করেছিলাম। তখন আমার মাকেও আমি ঘৃণা করতাম। এখন বুঝি যে তার কাছেই আমি সবচেয়ে নিরাপদ ছিলাম, তিনিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, আর এখন আমিও তাকে ভালোবাসি।’

সিরিয়ায় তিন শিশুসন্তানের মৃত্যুর পর আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন এই আইএস-বধূ শামীমা বেগম। এখন যুক্তরাজ্যে ফিরতে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন তিনি। চাইছেন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আরেকটা সুযোগ।

সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরে এই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণী শামীমার জীবনের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণচিত্রে উঠে এসেছে তার এ আবেদন।

ডেইলি মেইল জানিয়েছে, ২০১৯ সালে ধারণ করা প্রামাণ্যচিত্রে শামীমা বাঁচার জন্য ‘দ্বিতীয় সুযোগ’ চেয়েছেন। ‘তার সম্পর্কে আগে যা কিছুই জানা গেছে, সেসব ভুলে যাওয়ার’ অনুরোধ করেছেন তার দেশের মানুষকে।

২০১৫ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসে যোগ দিতে দুই বান্ধবীকে নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে পালিয়ে তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় যান শামীমা। সেখানে গিয়ে বিয়ে করেন আইএসে যোগ দেয়া ধর্মান্তরিত এক ডাচ যুবককে।

তখন শামীমার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। এখন তিনি ২১ বছরের তরুণী। গত ছয় বছরে জীবনের নানা কদর্য রূপ দেখেছেন। যাদের সঙ্গে দেশ ছেড়েছিলেন তিনি, সেই দুই বান্ধবী আমিরা আবাসি ও খাদিজা সুলতানার মৃত্যুর সাক্ষী হয়েছেন।

জঙ্গিদের পরাজয় আর ইরাক-সিরিয়ায় আইএসের স্বঘোষিত খেলাফতের পতনের পর থেকেই দেশে ফেরার অনুমতি চাইছিলেন শামীমা।

২০১৯ সালে প্রথম সিরিয়ার এক আশ্রয়কেন্দ্রে শামীমার খোঁজ পান দ্য টাইমসের এক সাংবাদিক। আইএসের বর্বরতার মধ্যে থেকেও জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হওয়ার জন্য কোনো অনুতাপ নেই বলে জানিয়েছিলেন ১৯ বছরের শামীমা।

সে বছরই জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে শামীমার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করেন যুক্তরাজ্যের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি সে সিদ্ধান্ত বহাল রেখে শামীমার দেশে ফেরার সুযোগ পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেয় দেশটির সর্বোচ্চ আদালতও।

আরও পড়ুন:
একটু উদার হোন, ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিন: আইএসবধূ শামীমা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

অন্তঃসত্ত্বা-স্তন্যদায়ী মায়েদের টিকার সুপারিশ

অন্তঃসত্ত্বা-স্তন্যদায়ী মায়েদের টিকার সুপারিশ

বে-নজির আহমেদ সোমবার দুপুরে নিউজবাংলাকে জানান, নাইটেগের সুপারিশের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের মতো করে সময়-সুযোগ বুঝে অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী মায়েদের টিকাদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী মায়েদের করোনাভাইরাস প্রতিরোধী টিকা দেয়ার সুপারিশ করেছে দেশের টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ পরামর্শক কমিটি বা ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন অ্যাডভাইজারি গ্রুপ (নাইটেগ)।

এই কমিটির সদস্য ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ বে-নজির আহমেদ সোমবার দুপুরে নিউজবাংলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

নাইটেগের সুপারিশের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের মতো করে সময়-সুযোগ বুঝে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘আমরা আমাদের দিক থেকে পর্যালোচনা করে দেখেছি, গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের টিকা দিলে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের মধ্যে টিকা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। আমরাও সেই সুপারিশ করেছি।’

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল বাশার খুরশীদ আলম বলেন, ‘কবে থেকে টিকা দেয়া শুরু হবে এ বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা হয়নি। কিছুক্ষণ আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ভার্চুয়াল একটি সভায় জানিয়েছেন, নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।

‘টিকাবিষয়ক সর্বোচ্চ পরামর্শক কমিটি বা ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন অ্যাডভাইজারি গ্রুপের (নাইটেগ) কাছে সুপারিশে চাওয়া হয়েছে। এখান থেকে লিখিত কোনো সুপারিশ আমরা পাইনি। এ কারণে এখনও নির্দিষ্ট তারিখ বলা সম্ভব হচ্ছে না।’

এর আগে দুপুরে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করোনার টিকা দেওয়ার বিষয়ে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সুনির্দিষ্ট একটা সিদ্ধান্ত চায় হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিনকে পদক্ষেপ নিতে বলে উচ্চ আদালত।

আরও পড়ুন:
একটু উদার হোন, ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিন: আইএসবধূ শামীমা

শেয়ার করুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইহুদিবিদ্বেষের আখড়া: প্রতিবেদন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইহুদিবিদ্বেষের আখড়া: প্রতিবেদন

ইহুদিবিদ্বেষী পোস্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যর্থ হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইহুদিবিদ্বেষ ও তাদের নিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো ৮৪ শতাংশ পোস্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারেনি ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ও টিকটক।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গুরুতর ও কাঠামোগতভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ওই মাধ্যমগুলো ‘বর্ণবাদীদের নিরাপদ আখড়ায়’ পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়, ইহুদিবিদ্বেষ ও তাদের নিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো ৮৪ শতাংশ পোস্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারেনি ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ও টিকটক।

চলতি বছরের শুরুর দিকে দেড় মাস সময় নিয়ে কয়েক শ ইহুদিবিদ্বেষী পোস্ট চিহ্নিত করেন যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের সংস্থা সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেইটের (সিসিডিএইচ) গবেষকরা।

নাৎসি, নব্য নাৎসি, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদসহ অন্যান্য বিদ্বেষী বক্তব্য সংবলিত ওইসব পোস্টে ৭৩ লাখের মতো মন্তব্য পড়ে।

এসব পোস্টের মধ্যে ৭১৪টি পরিষ্কারভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর নীতি ভঙ্গ করে।

তবে ছয়টির মধ্যে একটিরও কম পোস্ট পরে সরানো হয় বা মডারেটরকে জানানোর পর মুছে ফেলা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ইহুদিবিদ্বেষী ষড়যন্ত্র তত্ত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সামাজিক মাধ্যমগুলো বেশ দুর্বল।

ধনী ইহুদি পরিবার রথশিল্ড, ইহুদি ধনকুবের জর্জ সরসকে ঘিরে কটূক্তি থেকে শুরু করে করোনা মহামারিকালে ইহুদিদের নিয়ে ভুল তথ্য ওইসব পোস্টে ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের ওপর যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, সেই ঘটনার অস্বীকৃতি জানানো পোস্টও বহাল রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে।

ওই বিশ্বযুদ্ধের সময় ৬০ লাখ ইহুদি হত্যার ঘটনা চেপে যায় ৮০ শতাংশ পোস্ট। সে ক্ষেত্রেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

গবেষণা করা পাঁচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মধ্যে ফেসবুকের অবস্থা সবচেয়ে বাজে।

ইহুদিবিদ্বেষী পোস্টের মধ্যে কেবল ১০.৯ শতাংশের বিরুদ্ধে তারা ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে।

যদিও গত বছর ইহুদিবিদ্বেষী কন্টেন্টের বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা প্রবর্তন করে ফেসবুক।

গত বছরের নভেম্বরে ইহুদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অস্বীকার বা বিকৃত করা কন্টেন্ট বন্ধ সংক্রান্ত নীতি হালনাগাদ করেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি।

আরও পড়ুন:
একটু উদার হোন, ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিন: আইএসবধূ শামীমা

শেয়ার করুন

‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’

‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’

করোনায় ময়মনসিংহের তনুর মতো দেশের অসংখ্য ট্রান্সজেন্ডার কোনো রকমে খেয়ে না-খেয়ে দিন পার করছেন। তারা বলছেন, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সহায়তা মেলেনি। বেসরকারি সংগঠন থেকে কিছু সাহায্য পেলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম।

‘ভাইরে বিষ খেয়ে মরা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। তাই ভাবছি, একেকজন করে বিষ খাব, আর একেকজন করে মরব। কী করব বলেন, পেটের যন্ত্রণা এমন যন্ত্রণা, তা আপনি বুঝবেন না। পেটের যন্ত্রণার চেয়ে বিষ খেয়ে মরার যন্ত্রণা অনেক কম। মৃত্যু ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি নাই, ভাই।’

হতাশা আর আক্ষেপ নিয়ে নিউজবাংলাকে এসব কথা বলছিলেন ময়মনসিংহ শহরের কাচারিঘাট এলাকার ‘হিজড়া সম্প্রদায়ের’ গুরুমা (গোষ্ঠীপ্রধান) আনিসুর রহমান তনু, যিনি সবার কাছে ‘তনু হিজড়া’ নামে পরিচিত।

তিনি জানান, করোনা মহামারির প্রকোপ প্রতিরোধে একের পর এক লকডাউনে ট্রান্সজেন্ডারদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তারা কেমন আছেন, তা মুখের ভাষায় বলে বোঝানো সম্ভব না।

তনু বলেন, ‘এককথায় আমরা খুবই খারাপ আছি, ভাই। এই দেড়টা বছর আমরা যে কীভাবে বেঁচে আছি, তা মুখে বলে বোঝাতে পারব না। আমরা একটা বিয়ে হলে নাচগান করি, বাচ্চা নাচাই, বাজারে তরিতরকারি, টাকা-পয়সা তুলি। এখন করোনার কারণে সবকিছুই বন্ধ। তাই আমাদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’

করোনায় ময়মনসিংহের তনুর মতো দেশের অসংখ্য ট্রান্সজেন্ডার কোনো রকমে খেয়ে না-খেয়ে দিন পার করছেন বলে নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তেমন সহায়তা মেলেনি। বেসরকারি সংগঠন থেকে কিছু সাহায্য পেলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, হটলাইন নম্বরে ফোন করে সাধারণ মানুষের মতো ট্রান্সজেন্ডাররাও খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন।

গুরুমা তনুর অভিযোগ, এবার সরকারি-বেসরকারিভাবে তারা ওইভাবে সাহায্য-সহযোগিতাও পাননি।

তিনি বলেন, ‘গত বছর আমরা ডিসির কাছ থেকে ১০ কেজি চাল, ১০ কেজি আলু ও ১ কেজি তেল পাইছিলাম। এবার পাইছি শুধু ১০ কেজি চাল। আর বেসরকারিভাবে কিছু সাহায্য পেয়েছি। এখন আপনিই বলেন, এই দেড় বছরে এসব সাহায্যে কি পেট চলে?’

তনু জানান, তার সঙ্গে প্রায় আড়াই শ ট্রান্সজেন্ডার আছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। কিন্তু সেখানেও সমস্যা।

তিনি বলেন, ‘বাড়ির লোকজন বা আশপাশের মানুষ বলে হিজড়া কেন আসছে? ওদের কেন রাখছ? এ রকম নানা ধরনের কথা বলে। মানে বাড়িতে গিয়েও শান্তি নাই। তাই অনেকে বাড়ি গিয়েও চলে আসছে।’

তনু বলেন, ‘এখন হাটবাজারেও চাল-ডাল, আলু-তেল চাইতে গেলে দোকানদাররা আগের মতো দেয় না। বলে এখন আমাদেরই চলে না, আবার তোমাদের কী দেব?’

তিনি বলেন, ‘এখন এমন একটা পরিবেশ চলছে যে, আরেকজনের কাছে যাব, তার কাছ থেকে কিছু চাইব, সেই পরিবেশটাও নাই। এখন আমরা কীভাবে চলব, সেটা বুঝতেছি না। আর ছিনিয়ে নিয়ে যে কিছু কামাই করব, তাও তো পারছি না। কারণ লকডাউনে মানুষ তো রাস্তায় বের হচ্ছে না।’

তনু জানান, তার আড়াই শ শিষ্যের মধ্যে ২৫ জন বাসা ভাড়া দিয়ে বাজার করে চলতে না পেরে তার কাছে চলে এসেছেন, যাদের ডাল-ভাতের বেশি কিছু দিতে পারছেন না তিনি।

এই পরিস্থিতিকে মরণদশার সঙ্গে তুলনা করেছেন ময়মনসিংহ শহরের কাচারিঘাট এলাকার ট্রান্সজেন্ডারদের এই গুরুমা।

তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের মরতে হবে। কারণ পরিবারে আমরা ঠাঁই পাই না; বাড়িতে গেলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। আর যেসব পরিবার আশ্রয় দেয়, তারাও বলে শাড়ি পরতে পারবা না। চুল কেটে ছেলেদের মতো করো, নখ কাটো, মেয়ের পোশাক পরা চলবে না, ছেলের পোশাক পরো; ঘর থেকে বের হবে না, বের হলেও বাইরের মানুষের সামনে যাবে না।

‘আমি তো একটা মানুষ ভাই। ঘরে বন্দি হয়ে কি সব সময় থাকতে পারি? আশপাশের মানুষের সঙ্গে কথা না বললে আমি কি বাঁচব, ভাইয়া?’

রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার ট্রান্সজেন্ডার রূপকথা বলেন, ‘করোনার শুরু থেকেই আয়-রোজগার বন্ধ। এখন মানুষের বাচ্চাকাচ্চা হলেও করোনার কারণে আমাদের বাসায় ঢুকতে দেয় না। পাড়া-মহল্লায় মানুষের কাছ থেকে যে সাহায্য পেতাম, এখন তাও পাই না।

‘সবারই অভাব। কে কাকে সাহায্য করবে? জমানো কিছু টাকা আর গুরুমার সাহায্যে এখনও দুই বেলা খেয়ে বেঁচে আছি। তবে বাসা ভাড়া দিতে পারতেছি না। এভাবে আর কত দিন চলতে পারব জানি না ভাই।’

রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন ট্রান্সজেন্ডার কোয়েল। করোনায় আয়-উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চার মাসের ভাড়া বকেয়া রেখেই বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তিনি।

কোয়েল বলেন, ‘আমার মতো এই রকম অনেকে আছে, যারা এই করোনার সময় কাজকাম না পেয়ে অভাবে দেশের বাড়ি চলে গিয়েছিল। কিন্তু বেশির ভাগই আবার শহরে চলে আসছে। তাদের কেউ পরিবারে জায়গা পায়নি। আবার কেউ পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি।

‘আমাদের তো কেউ কোনো কাজেও নেয় না যে আমরা কাজ করে খাব। এখন কী করব সেটাই বুঝতে পারছি না। কোনো উপায় না পেয়ে দুই মাস আগে গুরুমা অনু হিজড়ার বাসায় উঠছি।’

কোয়েল নিউজবাংলাকে জানান, তিনি একা নন; বাসা ভাড়া টানতে না পেরে লাভলী, মধু শাহনাজ, আলিশাসহ ১০ থেকে ১২ জন ট্রান্সজেন্ডার গুরুমা অনুর বাসায় থাকছেন।

তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে কারও বাচ্চাকাচ্চা হলে আমাদের বাসাবাড়িতে ঢুকতে দেয় না। আবার বিয়েশাদির অনুষ্ঠান সবকিছুই বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানেও আমাদের যেতে দেয় না।

‘তাই কোনো রকম খেয়ে না-খেয়ে বেঁচে আছি। জীবনে যা রোজগার করছিলাম, করোনার এক বছর তা দিয়ে চলছি। আর চলতে পরতেছি না। বাড়িতেও যেতে পারি না। কোনো উপায় না পেয়ে গুরুমার কাছে উঠছি। এখানেই দুবেলা দুটো ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে আছি।’

পল্টন-ওয়ারী এলাকার ট্রান্সজেন্ডারদের গুরুমা অনু নিউজবাংলাকে জানান, তার শিষ্য আছে প্রায় ২০০। তাদের আয়-রোজগার বলতে গেলে একদমই নেই। দুই-একজন ছাড়া বেশির ভাগেরই অবস্থা ভালো নয়।

তিনি বলেন, ‘তারা কোনো রকম খেয়ে-পরে বেঁচে আছে। ১০-১৫ জন আর কোনোভাবেই বাসা ভাড়া দিয়ে ঢাকা শহরে চলতে পারতেছিল না। আমি তাদের আমার বাসায় নিয়ে আসছি। আমি যা খাই, তাদেরও তা খাওয়াই। কিন্তু আর কত দিন এভাবে চলব, বলেন?’

২০১৪ সালে বাংলাদেশে ট্রান্সজেন্ডারদের স্বতন্ত্র লিঙ্গ হিসেবে সাংবিধানিক ও আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয় ৷ ভোটাধিকারও পেয়েছেন তারা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাবে বাংলাদেশে ট্রান্সজেন্ডারের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার।

তবে অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা এর দ্বিগুণের বেশি। ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে কাজ করা একটি বেসরকারি সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে তাদের সংখ্যা দেড় লাখ।

তবে গুরুমা অনুর দাবি, ‘ঢাকা শহরেই ট্রান্সজেন্ডারের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। খোঁজ নিয়ে দেখেন তারা সবাই খুবই খারাপ অবস্থায় আছে।’

‘আমরাও তো মানুষ, কী খেয়ে বাঁচব’
পল্টন-ওয়ারী এলাকার ট্রান্সজেন্ডারদের গুরুমা অনু। ছবি: নিউজবাংলা

তিনি বলেন, ‘আর কার কাছে আমরা সাহায্য চাব বলেন। সবাই তো এখন অভাবী। সব মিলিয়েই খুব খারাপ আছি, ভাই। পোলাপাইনের মুখের দিকে তাকাতে পারি না।’

সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেশ কিছু সাহায্য পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন পুরান ঢাকার ট্রান্সজেন্ডার মিতু।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে ঢাকার জেলা প্রশাসক, সিটি করপোরেশন, বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, উত্তরণ ফাউন্ডেশন আর পুলিশের ডিআইজি হাবিব ভাই আমাদের সাহায্য করেছেন।’

বেসরকারি সংগঠন বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ম্যানেজার (ট্রেইনিং অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং) মেসবাহ ইউ আহমেদ বিরাজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের হিসাবে সারা দেশে প্রায় দেড় লাখ ট্রান্সজেন্ডার আছে। করোনাকালে আমরা সাধ্যমতো তাদের সাহায্য করে যাচ্ছি। ৩৭টি সংগঠনের মাধ্যমে আমরা সারা দেশে সাত থেকে আটবার রিলিফ দিয়েছি। ইউএনডিপির ত্রাণও আমাদের মাধ্যমে তাদের কাছে পৌঁছেছে।’

তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ ১৫ দিনে হয়তো ওদের অবস্থা একটু খারাপ হয়েছে। কারণ হয়তো ওরা ত্রাণের সদ্ব্যবহার করতে পারে নাই।’

ট্রান্সজেন্ডারদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (সামাজিক নিরাপত্তা) সাব্বির ইমাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের তালিকায় যারা আছেন, তাদের ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি ও ট্রেনিং চালিয়ে যাচ্ছি। ত্রাণের কাজটা আমরা করি না; এটা করে ত্রাণ মন্ত্রণালয়।’

এ বিষয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা সেলিম হোসেন বলেন, ‘আসলে তাদের জন্য আলাদা করে আমাদের কোনো সাহায্য কর্মসূচি নেই। সাধারণ মানুষ যেমন আমাদের হটলাইন (৩৩৩) নম্বরে ফোন করে খাদ্যসহায়তা পাচ্ছেন, তেমন তারাও পাচ্ছেন।’

আরও পড়ুন:
একটু উদার হোন, ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিন: আইএসবধূ শামীমা

শেয়ার করুন

নারী এমডি পেল পিকেএসএফ

নারী এমডি পেল পিকেএসএফ

পিকেএসএফের নতুন এমডি নমিতা হালদার।

২০১৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া নমিতা বর্তমানে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরিয়াল ফেলো হিসেবে যুক্ত আছেন। তিনি বাংলাদেশ মানাবাধিকার কমিশনের একজন সম্মানিত সদস্য।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক সচিব নমিতা হালদার।

সরকারি প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ এই পদে এই প্রথম কোনো নারী দায়িত্ব পেলেন। প্রতিষ্ঠানটিতে একাদশ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেলেন নমিতা হালদার।

তিনি সাবেক এমডি মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হলেন। গত মার্চে মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেয়ার পর এই পদটি খালি ছিল।

বৃহস্পতিবার পিকেএসএফের পরিচালনা পর্ষদের সভায় নমিতার এমডি হিসেবে নিয়োগ চূড়ান্ত হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

২০১৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়া নমিতা বর্তমানে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসরিয়াল ফেলো হিসেবে যুক্ত আছেন। তিনি বাংলাদেশ মানাবাধিকার কমিশনের একজন সম্মানিত সদস্য।

নমিতা হালদার তার দীর্ঘ ৩০ বছরের সরকারি দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় প্রশাসন থেকে উচ্চতর স্তরে নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন- উভয় পর্যায়েই সুনাম অর্জন করেছেন।

তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সচিবের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

বাগেরহাটে জন্ম নেওয়া নমিতা হালদার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে উন্নয়ন প্রশাসন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টর্চাচের ক্যান্টারবেরি ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে টেকসইভাবে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিকেএসএফ গড়ে তোলে সরকার। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে দেশব্যাপী আর্থিকসহ নানা সেবা দিয়ে থাকে।

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ পিকেএসএফের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।

আরও পড়ুন:
একটু উদার হোন, ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিন: আইএসবধূ শামীমা

শেয়ার করুন

পেটের দায়ে দিনে ভিক্ষা, রাতে খদ্দেরের অপেক্ষা

পেটের দায়ে দিনে ভিক্ষা, রাতে খদ্দেরের অপেক্ষা

প্রতীকী ছবি

খদ্দের না থাকলে ভিক্ষা ছাড়া আর কী করব- নিউজবাংলার কাছে এ প্রশ্ন রেখে সাজেদা বলেন, ‘খদ্দের পাব না জেনেও আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি। করোনার শুরু থেকেই এ রকম যাচ্ছে দিনকাল। তারপরও আশায় আশায় রাত জেগে অপেক্ষায় থাকি, যদি কেউ আসে।’

‘ভাই, পেটের দায়ে এখন দিনের বেলায় বোরকা পরে ভিক্ষা করি। আর রাতের বেলায় খদ্দেরের আশায় ফুটপাতে বসে থাকি। কিন্তু কোনো খদ্দের পাই না। কীভাবে বেঁচে আছি তা বলে বোঝাতে পারব না।’

নিউজবাংলার কাছে মঙ্গলবার রাতে আক্ষেপ করে এসব কথা বলছিলেন ৩৫ পেরোনো নারী রেশমা (ছদ্মনাম)।

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকার ভাসমান এই যৌনকর্মী জানান, শুধু তিনি না, তার মতো শত শত নারী খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। লকডাউন তাদের জীবন তছনছ করে দিচ্ছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

রেশমা বলেন, ‘এখন তিন বেলা খাবারই তো জুটছে না। এই যে কোরবানির ঈদ চলে গেল, পেয়েছি শুধু কয়েক টুকরা মাংস। ঈদের শখ মেটানো তো অনেক দূরের কথা।’

মঙ্গলবার রাতেই রমনা পার্ক এলাকায় কথা হয় নানা বয়সী কয়েকজন ভাসমান যৌনকর্মীর সঙ্গে। তাদের একজন ২৫ বছর বয়সী সাজেদা (ছদ্মনাম) নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভাই, আমরা দিন এনে দিন খাই। বিপদের জন্য কোনো সঞ্চয় আমরা রাখতে পারি না। পরিবারের সঙ্গে পাঁচ বছর কোনো সম্পর্ক নাই।

‘এখন যে তাদের কাছে যাব, সেই মুখও নাই। তারপরও তো বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু এই লকডাউনে খদ্দের পাব কোথায়, কেউ তো বাসা থেকেই বের হয় না। তা ছাড়া করোনার কারণে কেউ কাছে আসতে চায় না। এমনকি রিকশাচালকরাও আসে না এখন।’

খদ্দের না থাকলে ভিক্ষা ছাড়া আর কী করব- নিউজবাংলার কাছে এ প্রশ্ন রেখে সাজেদা বলেন, ‘খদ্দের পাব না জেনেও আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি। করোনার শুরু থেকেই এ রকম যাচ্ছে দিনকাল। তারপরও আশায় আশায় রাত জেগে অপেক্ষায় থাকি, যদি কেউ আসে।’

রমনা পার্ক এলাকার আরেক ভাসমান যৌনকর্মী ২৫ বছর বয়সী ছন্দা (ছদ্মনাম) জানান, দিনের পর দিন কাজ না পেয়ে বাসা ভাড়া দিতে পারছেন না। অনেকেই রাস্তার পাশে যাত্রীছাউনি, ফুটওভার ব্রিজ ও স্টেশনে স্টেশনে থাকছেন।

ছন্দা বলেন, ‘এখন রাতে খদ্দের তো পাই-ই না, দিনের বেলায় ভিক্ষা করে যা কামাই তা দিয়ে কোনো রকমে পেট চালাচ্ছি। বাসা ভাড়া পাব কোথায়?’

তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরেই এই অবস্থা আমাদের। এর মাঝে গার্মেন্টসে চাকরির জন্য গেছি। কিন্তু করোনার কারণে নতুন কোনো লোক নিচ্ছে না কোনো কারখানা। তাই বাধ্য হয়ে দিনের বেলায় বোরকা পরে পথে পথে ভিক্ষা করি, যাতে পুরাতন কোনো কাস্টমার চিনতে না পারে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর এসব ভাসমান যৌনকর্মীর মতো দশা দেশের বিভিন্ন শহরের ভাসমান যৌনকর্মীদেরও। বিষয়টি নিয়ে যৌনকর্মীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

‘মেয়েগুলো তো ঠিকমতো খেতেও পারছে না’

লকডাউনে নারায়ণগঞ্জের যৌনকর্মীরা কী অবস্থায় আছেন, জানতে কথা হয়েছে সেখানকার যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘অক্ষয় নারী সংঘ’-এর সভাপতি কাজল আখতারের সঙ্গে।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘এ কথা বলতে গেলে মনে কষ্ট লাগে। মেয়েগুলো তো ঠিকমতো খেতেও পারছে না। ঘর ভাড়া দিতে পারছে না। আমাদের নারায়ণগঞ্জে ৩৫০ জন ভাসমান মেয়ে আছে, যারা যৌনকাজ করে জীবন চালায়।

‘এদের মধ্যে বর্তমানে গর্ভবতী দুজন, বাচ্চা আছে প্রায় ৭০ জনের। প্রতিদিনই ওদের কান্নাকাটি দেখতে দেখতে আর ভালো লাগছে না। ঘরে খাবারদাবার নাই। কাজ নাই। পেটের দায়ে রাস্তায় দাঁড়ালে পুলিশে ডিস্টাব করে।’

কাজল বলেন, ‘গত বছর প্রথম লকডাউনের পর যখন সব স্বাভাবিক হলো, তখন মেয়েগুলো কামকাজ করে চলতে পারছিল। যদিও কাজ কম হচ্ছিল, তারপরও দুই-একটা কাজ করে খেয়ে বাঁচতে পারছিল মেয়েগুলো। এরপর একের পর এক লাকডাউনের কারণে মেয়েগুলো রাস্তায় দাঁড়াতে পারছে না।

‘কী যে কষ্ট এদের বলে বোঝাতে পারব না। বাসা ভাড়া দিতে পারে না। এই লকডাউনের মধ্যে ভাড়া দিতে না পেরে অনেকে বাসা ছেড়ে রাস্তাঘাটে-স্টেশনে থাকছে।’

অক্ষয় নারী সংঘের সভাপতি বলেন, ‘এই লকডাউনের সময় অনেকে (কাস্টমাররা) বাসা থেকেই বের হয় না। কোথাও আড্ডা-জটলা হয় না। আবার করোনা হওয়ার ভয়ে ভাসমান পতিতার কাছে অনেকে আসতে চায় না। তাহলে এরা কী করে খাবে বলেন? ক্যামনে চলব এদের?

‘কারণ মেয়েগুলো কাজই করে স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, ঘাট, ফুটপাত এসব এলাকায়। এসব জায়গায় তো এখন মানুষজনই চলাচল করে না। তাহলে এদের চলবে কীভাবে?’

‘এবারের লকডাউনে কেউ কিছু দেয়নি’

গত বছর করোনার কারণে প্রথম যে লকডাউন ঘোষণা করা হয়, তখন সরকারের পক্ষ থেকে ভাসমান যৌনকর্মীদের সাহায্য করা হলেও এবারের লকডাউনে কেউ কিছু দেয়নি বলে অভিযোগ করেন অক্ষয় নারী সংঘের সভাপতি।

তিনি বলেন, ‘এবারের লকডাউনে আমরা কোনো প্রণোদনা পাইনি। কেউ কিছু দেয়নি ভাসমান যৌনকর্মীদের। তবে প্রথমবার যখন লকডাউন দেয়, তখন সরকার থেকে সাহায্য পাইছিল সবাই। কিন্তু এবার খুবই খারাপ অবস্থা সবার। ঈদে কেউ কোনো শখ পূরণ করতে পারেনি। জুটেছিল শুধু সামান্য কয়েক টুকরা মাংস।’

পেট চালাতে বোরকা পরে ভিক্ষাবৃত্তি

ক্ষুধার জালায় নারায়ণগঞ্জের অনেক ভাসমান যৌনকর্মী বোরকা পরে দিনের বেলায় ভিক্ষা করছেন বলে জানান অক্ষয় নারী সংঘের সভাপতি।

তিনি বলেন, ‘ভিক্ষাও যে ভালো হচ্ছে, তাও না। কারণ দোকানপাট খোলা নাই, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। তাই অনেক ভাসমান মেয়ে পথে পথে ভিক্ষা করছে, যা পাচ্ছে তাই দিয়ে কোনো রকম চাল-পানি খেয়ে দিন পার করছে।’

কাজল জানান, কিছু মেয়ে আছে যারা যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করলেও সমাজ জানে না। অনেক মেয়ে আছে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে।

‘কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে তাদের অনেকে বাসা ছেড়ে দিয়ে এদিক-সেদিক দিন কাটাচ্ছে। কারণ বাড়িওয়ালারা চাপ দিচ্ছে ভাড়ার জন্য। কিন্তু মেয়েগুলো ভাড়া দিবে কোথা থেকে? ওদের তো জমানো টাকাও নেই যে সেখান থেকে ভেঙে টাকা-পয়সা খরচ করে চলবে’, বলেন তিনি।

একমাত্র চাওয়া খাদ্যসহায়তা

অক্ষয় নারী সংঘের সভাপতি জানান, ভাসমান এসব যৌনকর্মীর এখন একমাত্র চাওয়া খাদ্যসহায়তা।

তিনি বলেন, ‘এখন যে ভাসমানদের কাজ করে খাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সেটা মনে হয় সবাই বোঝে। সরকার খাদ্যসহায়তা দিলে হয়তো তারা অন্তত খাবার খেয়ে বাঁচতে পারত।’

‘পেটের দায়ে এসব কাজ করে, কোনো বৈধতা নেই’

সারা দেশে কোনো ভাসমান যৌনকর্মীরই লাইসেন্স নেই বলে জানিয়েছেন অক্ষয় নারী সংঘের সভাপতি।

তিনি বলেন, ‘সারা দেশে যারা ভাসমান যৌনকর্মী আছে, তাদের কারো লাইসেন্স নেই। এরা পেটের দায়ে এসব কাজ করে। কোনো বৈধতা নেই। তবে অনেক ভাসমান আছে, যারা আগে পতিতালয়ে কাজ করত, তাদের লাইসেন্স বা বৈধতা ছিল।

‘যেমন নারায়ণগঞ্জে যে ৩৫০ জন ভাসমান যৌনকর্মী আছে, তাদের বেশির ভাগই আগে নারায়ণগঞ্জ টানবাজার ও নিমতলী পতিতাপল্লিতে ছিল। ১৯৯৯ সালে ব্রোথেল দুইটা উচ্ছেদের পর তারা ভাসমান হয়ে গেল। কারণ তাদের তো পেট চালাইতে হবে। টিকে থাকতে হবে।’

এরা আসে কোথা থেকে?

এসব নারী কীভাবে এই জীবনে আসছেন- জানতে কথা হয় রাজধানী ঢাকার একটি যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘দুর্জয় নারী সংঘের’ সদস্য রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘একটা সময় ছিল দালালের মাধ্যমে মেয়েগুলো বিক্রি হতো। আবার অনেক মেয়ে প্রেমে ছ্যাঁকা খেয়ে রাগেরবশত ব্রোথেলে আসত। কোনো কোনো মেয়ের প্রেমিক প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের পতিতালয়ে বিক্রি করে যেত জোর করে সর্দারনির কাছে।

‘তবে বেশ কয়েক বছর যৌনকর্মীদের সংগঠন হওয়ার কারণে ওগুলো আর করতে পারে না পতিতালয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে। এখন স্বেচ্ছায় আসলে আসতে পারে। দালাল বা সর্দারনির মাধ্যমে আসতে পারে না।’

রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘এখন যারা আসে তাদের মধ্যে অনেকে আছে ধর্ষণের শিকার মেয়ে। আবার দেখা যায়, কোনো মেয়ে ছোট চাকরি করে, কিন্তু বেতন-ভাতা ঠিকমতো পায় না, তখন সংসার চালাতে কাছের বান্ধবীর মাধ্যমে এ পথে আসছে। সারা দিন অন্য কাজ করছে, আর রাতের বেলা ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করছে।’

একটা পর্যায়ে এসব ভাসমান যৌনকর্মীই পতিতালয়ে চলে যান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন পতিতালয়ে যে সর্দারনি থাকে, তার মাধ্যমে লাইসেন্স নিয়ে নেয়। তখন তারা ফুলটাইম যৌনকর্মী হয়ে যায়।’

দুর্জয় নারী সংঘের সদস্য রাজিয়া জানান, বর্তমানে ঢাকা শহরে ১০ হাজার যৌনকর্মী আছেন, তাদের মধ্যে ৭ হাজার ভাসমান। বাকি ৩ হাজার বিভিন্ন হোটেল ও ভাড়া বাসায় যৌনকাজ করেন।

তিনি বলেন, ‘তবে ফুলটাইম আর ভাসমান, যা-ই হোক এই পেশার কেউ এখন ভালো নেই। আমাদের জন্য একটা কিছু করেন, ভাই। জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

‘ভাসমান যারা আছে, তারা নিজেরাই বের হতে পারে না। আর হোটেল তো বন্ধই। যারা ভাড়া বাসায় যৌনকাজ করে, তারা দুই-একটা কাজ কোনো রকম করতে পারছে। বাকিরা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছে।’

আরও পড়ুন:
একটু উদার হোন, ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিন: আইএসবধূ শামীমা

শেয়ার করুন

জিনস পরায় পিটিয়ে হত্যা

জিনস পরায় পিটিয়ে হত্যা

নেহা পাসওয়ান

নেহার মা শকুন্তলা দেবী বার্তা সংস্থা বিবিসিকে বলেন, জিনস পরার কারণে নেহার দাদা ও চাচা তাকে প্রচণ্ড মারধর করেন। নেহা জ্ঞান হারালে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য রিকশায় তোলা হয়। এরপর মায়ের সঙ্গে আর নেহার দেখা হয়নি। পরদিন স্থানীয় এক সেতু থেকে নেহার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ভারতে জিনস পরার অপরাধে এক কিশোরীকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন তার স্বজনরা।

১৭ বছর বয়সী ওই কিশোরীর নাম নেহা পাসওয়ান। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সাভরাজি খার্গ নামে এক গ্রামে তার বাড়ি।

নেহার মা শকুন্তলা দেবী বার্তা সংস্থা বিবিসিকে বলেন, জিনস পরার কারণে নেহার দাদা ও চাচা তাকে প্রচণ্ড মারধর করেন। নেহা জ্ঞান হারালে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য রিকশায় তোলা হয়। এরপর মায়ের সঙ্গে আর নেহার দেখা হয়নি। পরদিন স্থানীয় এক সেতু থেকে নেহার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা শ্রীইয়াশ ত্রিপাঠি জানান, এ ঘটনায় নেহার দাদাসহ চারজনকে আটক করা হয়েছে। হত্যা ও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ভারতে নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। নানা সময় এ ধরনের ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

আরও পড়ুন:
একটু উদার হোন, ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিন: আইএসবধূ শামীমা

শেয়ার করুন

বনবিদ্যায় পড়ে বন বিভাগে চাকরি নেই নারীদের!

বনবিদ্যায় পড়ে বন বিভাগে চাকরি নেই নারীদের!

২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন ছাত্রী। ছবি: সংগৃহীত

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফএসটিআইয়ের এক শিক্ষক নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সের প্রতিটি ব্যাচে আসনসংখ্যা ৫০। প্রতিবছরই ছাত্রীরা ভর্তি হন। তবে বন অধিদপ্তরের নিয়োগবিধির কারণে কোর্স শেষ করছেন না বেশির ভাগ। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাচে ছাত্রী রয়েছেন মাত্র ১২ জন।

চট্টগ্রামের ফরেস্ট্রি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট (এফএসটিআই) থেকে চার বছরের ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্স করেও বেকার বসে আছেন নারী শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ফরেস্টার পদের নিয়োগবিধিতে থাকা উচ্চতা ও বুকের মাপের শর্তের কারণেই চাকরির আবেদন করতে পারছেন না তারা, যেখানে কোর্সে ভর্তির সময় শারীরিক যোগ্যতার কোনো শর্তই ছিল না।

এসব শিক্ষার্থী বলছেন, ২০১৯ সালে প্রকাশিত বন অধিদপ্তরের কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালায় নারীদের প্রসঙ্গই নেই। এতে শারীরিক যোগত্যার যেসব শর্ত দেয়া হয়েছে, তার সবই পুরুষ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অথচ নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি দেশের বনাঞ্চল রক্ষায় নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্যই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে এখানে নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ফরেস্টার পদে নিয়োগের জন্য নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শারীরিক যোগ্যতা শিথিল করতে বাংলাদেশের প্রধান বন সংরক্ষক বরাবর ২০২০ সালের নভেম্বরে একবার লিখিত আবেদন জানান। তারপর আরও একবার একই আবেদন জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি।

তাদের এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। তারা বলছেন, এফএসটিআইয়ের নারী শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে নিয়োগবিধি পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে। বর্তমানে পুলিশের নারী কনস্টেবলদের যে শারীরিক যোগ্যতার কথা উল্লেখ আছে, সেভাবেই তাদের বিষয়ে উল্লেখ থাকবে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এতে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

বন, পরিবেশ, বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য, বন ব্যবহার, সামাজিক বনায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম নগরীর পূর্ব নাছিরাবাদ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এফএসটিআই। এখানে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করা হয় মেধাতালিকার ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে শারীরিক উচ্চতা বা বুকের মাপ নিয়ে কোনো শর্ত নেই।

এফএসটিআইতে শিক্ষার্থীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বন ও পরিবেশ-সম্পর্কিত জ্ঞানে পারদর্শী করা হয়। বনবিদ্যায় ডিপ্লোমাধারী এসব শিক্ষার্থীই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ফরেস্টার হিসেবে যোগদান করতে পারেন। বাংলাদেশে বর্তমানে ১০ হাজার ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি জ্ঞানলব্ধ মানবসম্পদের প্রয়োজন। সম্পূর্ণ আবাসিক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন এবং বন অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এফএসটিআইতে ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সে ২১তম ব্যাচ পর্যন্ত শুধু ছাত্ররাই ছিলেন। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ছাত্রীরা এই কোর্স করতে পারছেন। প্রতিষ্ঠানের ২২তম ব্যাচের ওই শিক্ষার্থীদের মধ্যে আট ছাত্রী কোর্সটি সম্পন্ন করেছেন।

নিউজবাংলাকে এসব নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করে জানিয়েছেন, কোর্স শেষে চাকরির দরখাস্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের কোনো কথাই নেই নিয়োগবিধিতে। শারীরিক যে যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, তা আসলে পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যে কারণে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেও ফরেস্টার পদে চাকরির আবেদনই করতে পারছেন না তারা। ভবিষ্যৎ নিয়ে আছেন চরম অনিশ্চয়তায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফএসটিআইয়ের এক শিক্ষক নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি কোর্সের প্রতিটি ব্যাচে আসনসংখ্যা ৫০। প্রতিবছরই ছাত্রীরা ভর্তি হন। তবে বন অধিদপ্তরের নিয়োগবিধির কারণে কোর্স শেষ করছেন না বেশির ভাগ। বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাচে ছাত্রী রয়েছেন মাত্র ১২ জন।

তিনি বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থী ভর্তি শুরুর পর থেকেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বন অধিদপ্তরের নিয়োগবিধি পরিবর্তনের কথা বলে আসছি। কিন্তু তারা আমলে নেয়নি। তবে সম্প্রতি জানতে পেরেছি, মেয়েদের কথা চিন্তা করে নিয়োগবিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

‘কিন্তু সেখানেও পুলিশের নারী কনস্টেবলের শারীরিক যোগ্যতার মতো শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। এটা সত্য হলে পাস করে যাওয়া একটি মেয়েও চাকরি পাবেন না। তাই পুলিশের নারী কনস্টেবলের সঙ্গে নারী ফরেস্টারদের শারীরিক যোগ্যতার মাপকাঠি কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

এফএসটিআইয়ের এসব নারী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা নিউজবাংলাকে অভিযোগ করে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে নারী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়ে ফরেস্টার পদে তাদের নিয়োগ সহজ করার আশা দিয়েছে। তবে তারা ডিপ্লোমা শেষ করার পর যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়, তাতে নারীদের বিষয় উল্লেখই করা হয়নি।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, নিয়োগ বিধিমালায় ফরেস্টার পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু পুরুষ প্রার্থীদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শারীরিক যোগ্যতা (উচ্চতা ১৬৩ সেন্টিমিটার ও বুকের মাপ ৭৬ সেন্টিমিটার) নির্ধারণ করা হয়েছে। উচ্চতা ও বুকের মাপের এ শর্তের কারণে আদিবাসী নারীসহ কোনো নারীই আবেদন করতে পারবেন না।

কোর্স সম্পন্ন করা এক নারী শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা চার বছর ধরে বনবিদ্যায় ডিপ্লোমা করেছি কি পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগের মতো শর্তে চাকরি করার জন্য? আমি যখন ভর্তি হয়, তখন তো শারীরিক যোগত্যার কোনো কথা বলা হয়নি।

‘কোর্স শেষে এখন দেখছি চাকরির জন্য পুলিশের মতো শারীরিক গঠন লাগবে। কৃষি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও ডিপ্লোমাধারী নারীরা মেধার ভিত্তিতে চাকরি করছেন। তাদের ক্ষেত্রে তো পুলিশের মতো শারীরিক যোগ্যতা লাগছে না। আমাদের ক্ষেত্রে কেন লাগবে?’

তিনি বলেন, ‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাবা-মা আমাকে এখানে পড়িয়েছে। সবাই জানে আমি ফরেস্টার হব। কিন্তু পড়ালেখা শেষে দেখছি মেয়েদের ফরেস্টার হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। এখন মনে হচ্ছে, পুরোটা সময়ই নষ্ট হয়েছে। এ নিয়ে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি।’

এফএসটিআইয়ের এসব নারী শিক্ষার্থী যে শারীরিক যোগ্যতার ঘাটতির কারণে ফরেস্টার পদে চাকরির আবেদন করতে পারছেন না, তা নিউজবাংলার কাছে স্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ আলীও।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশক্রমে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দেশের একমাত্র বনবিদ্যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে নারী শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া অনেক ছাত্রী তাদের ডিপ্লোমা শেষ করেননি। যারা ছিলেন সবার রেজাল্টই ভালো।

‘যে মেয়েটি সবচেয়ে ভালো করেছেন, তার শারীরিক উচ্চতা সবচেয়ে কম। বাকি ছাত্রীদের উচ্চতাও নিয়োগবিধির উচ্চতার চেয়ে কম। এ কারণে তারা কেউই চাকরির আবেদন করতে পারছেন না।’

ফরেস্টার পদে চাকরিতে নারীদের শারীরিক যোগ্যতা কেন গুরুত্বপূর্ণ- এমন প্রশ্নে এফএসটিআইয়ের পরিচালক বলেন, ‘আগে তো এ বিষয়ে মেয়েদের অধ্যয়নের সুযোগই ছিল না। তাই পুরুষ শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়োগবিধি করা হয়। বিষয়টি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পুলিশের নারী কনস্টেবলদের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত আছে, এখানকার নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও তাই করার প্রক্রিয়া চলছে।’

চাকরির নিয়োগবিধিতে শারীরিক যোগ্যতা উল্লেখ করা হলে ভর্তির সময় কেন শারীরিক যোগ্যতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি- জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

বন অধিদপ্তরের উপপ্রধান বন সংরক্ষক ড. মো. জগলুল হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘নারীদের কথা চিন্তা করে নিয়োগবিধি পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আগের নিয়োগবিধিতে নারীদের বিষয়টি উল্লেখ না থাকলেও বর্তমানে নারী কনস্টেবলদের যে শারীরিক যোগ্যতার কথা উল্লেখ আছে, সেভাবেই তাদের বিষয়ে উল্লেখ থাকবে।’

প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে এমন কোনো শারীরিক যোগ্যতার কথা বলা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করছে সরকার। তাই বলে কারও চাকরি তো নিশ্চিত করতে পারব না। ফরেস্ট্রিতে ডিপ্লোমা করে বন বিভাগেই চাকরি করতে হবে, এ কথা তো কাউকে বলা হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক (কারিকুলাম) প্রকৌশলী ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা শুধু কারিকুলাম দেখি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি বিভাগের সিলেবাস ফলো করা হয় এফএসটিআইতে। এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের বন বিভাগে চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে সেটা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের দেখার কথা।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হেলাল উদ্দিনের অফিসের নম্বরে ফোন করলে তার ব্যক্তিগত সহকারী সাজ্জাদ হোসেন রিসিভ করেন। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘স্যার জুম মিটিংয়ে আছেন। আধা ঘণ্টা পর ফোন দেন।’

এর আধা ঘণ্টা পর একই নম্বরে ফোন করে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে বিষয়টি জানিয়ে হেলাল উদ্দিনের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে নিউজবাংলা কথা বলেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক (প্রোগ্রাম) নীনা গোস্বামীর সঙ্গে। সংস্থাটি মানবাধিকার রক্ষা, লিঙ্গসমতা, সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আইনগত সহায়তা দিয়ে থাকে।

নিউজবাংলাকে নীনা গোস্বামী বলেন, ‘নারীরা এই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে যাতে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সে বিষয়টি মাথায় রেখে নিয়োগবিধি প্রণয়ন করা উচিত। যাতে নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত না হয়।’

আরও পড়ুন:
একটু উদার হোন, ব্রিটেনে ফেরার সুযোগ দিন: আইএসবধূ শামীমা

শেয়ার করুন