গায়ে গায়ে স্পর্শ না হলে যৌন হেনস্তা নয়: মুম্বাই হাইকোর্ট

মুম্বাই হাইকোর্ট। ছবি: সংগৃহীত

গায়ে গায়ে স্পর্শ না হলে যৌন হেনস্তা নয়: মুম্বাই হাইকোর্ট

ভারতের ‘প্রটেকশন অফ চাইল্ড ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্স বা পকসো আইন’-এ তাই বলা আছে বলে জানিয়েছেন মুম্বাই হাইকোর্টের এক বিচারক।

শরীরে শরীরে স্পর্শ না লাগলে যৌন হেনস্তা হবে না বলে মত দিয়েছে ভারতের মুম্বাই হাইকোর্ট। আইনও তাই বলছে বলে দাবি বিচারকের।

এক শিশুর স্তনে হাত দেয়ার অপরাধে তিন বছরের সাজা পাওয়া ৩৯ বছর বয়সী এক আসামির আপিল শুনানিতে ‘প্রটেকশন অফ চাইল্ড ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্স বা পকসো আইন-২০১২’ তুলে ধরে আদালত।

ব্যাখ্যায় আদালত জানায়, যৌনতার উদ্দেশ্যে গায়ে গায়ে সরাসরি কোনো সংসর্গ না হলে, যৌনাঙ্গ প্রবেশ না করালে আইন অনুযায়ী যৌন নিপীড়ন হবে না।

হাইকোর্টের নাগপুর বেঞ্চের বিচারক পুষ্প গনেড়িওয়ালা জানান, পকসো আইন অনুযায়ী যৌন নিপীড়নের দায়ে কাউকে তিন থেকে পাঁচ বছরের সাজা দিতে হলে ‘আরও অকাট্য ও গুরুতর অভিযোগের প্রয়োজন’।

সংশ্লিষ্ট মামলাটি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রমাণগত দিক থেকে, এটা এমন বিচারিক মামলা নয় যে, আপিল করা আসামি শিশুটির টপ (জামা) সরিয়ে স্তনে হাত দিয়েছে।’

বিষয়টি আরও পরিষ্কার করে পুষ্প গনেড়িওয়ালা বলেন, ‘১২ বছর বয়সী শিশুর স্তনে চাপ দেয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বর্ণনা নেই। লোকটি টপ সরিয়ে নাকি টপের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে স্তনে চাপ দিয়েছে বলা যাচ্ছে না। এটা যৌন নিপীড়নের সংজ্ঞায় পড়ে না।’

তবে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, লোকটির এই অপরাধ শ্লীনতাহানির অভিযোগে ভারতীয় দণ্ডবিধি ৩৫৪ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য হতে পারে। সে অনুযায়ী ওই ব্যক্তিকে দণ্ড কমিয়ে এক বছরের জেল দেয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

প্রতিকূলতা-জয়ের গল্প শোনালেন সুইটি

প্রতিকূলতা-জয়ের গল্প শোনালেন সুইটি

নওগাঁর উদ্যোক্তা মেহের নিগার সুইটি। ছবি: নিউজবাংলা

‘ব্যবসার শুরুর দিকে প্রতিবেশী ও পরিবারের লোকজন অনেকে হেয় করে কথা বলেছে... সেই সময়ে উৎসাহ বা সান্ত্বনা দেয়ার মতো কাউকে পাশে পাইনি ঠিকমতো... নিজের সুখকে বির্সজন দিয়ে সন্তানদের ভবিষৎ গড়তে এবং কারও কাছে যেন সাহায্যের হাত পাততে না হয়, সে জন্য পরিশ্রম করে এখন এ পর্যায়ে এসেছি।’

প্রায় সাত বছর আগে স্বামীর মৃত্যু; এরপর আর ঠাঁই হয়নি শ্বশুরবাড়িতে। আত্মসম্মান রক্ষায় যাননি বাবার বাড়িতেও। সেই থেকে দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে একাই বন্ধুর পথে চলছেন নওগাঁর মেহের নিগার সুইটি।

শহরের প্রাণকেন্দ্র বসাক শপিং কমপ্লেক্সের ‘রাশেদ ব্যাগ হাউজ’ নামে দোকানটি সুইটির। এই ব্যাগ হাউজের যাত্রা অবশ্য স্বামী রাশেদের হাত ধরে। তার মৃত্যুর পর হাল ধরেন সুইটি। কর্ম-মেধা আর কঠোর পরিশ্রমে এগিয়ে নেন প্রতিষ্ঠানটি।

দোকানে গিয়ে কথা হলো অদম্য এই নারীর সঙ্গে। নিউজবাংলাকে তিনি শোনালেন জীবনযুদ্ধ-জয়ের গল্প।

সুইটির বাড়ি জেলা সদরের ভবানীপুর গ্রামে। ১৭ বছর বয়সে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ানো দুরন্ত কিশোরী সুইটির বিয়ে হয় রাশেদ রহমান খানের সঙ্গে। সংসারের ১৪ বছরের মাথায় মারা যান রাশেদ। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় তার টিকে থাকার সংগ্রাম।

জেলা শহরের পুরাতন সোনালী ব্যাংক রোডের বসাক শপিং কমপ্লেক্সে স্বামীর বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘রাশেদ ব্যাগ হাউজ’ দোকানটি চালু করেন তিনি। এখন তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ৯ জন।

ওই দোকানের কর্মী শরিফুল ইসলাম ও সাব্বির হোসেন নিউজবাংলাকে জানান, তারা এখানে প্রায় ছয় বছর ধরে কাজ করছেন। বেকারত্ব ঘুঁচেছে এখানে; সংসারও চালিয়ে নিচ্ছেন নির্বিঘ্নে।

সুইটির দোকানে আছে নিয়মিত কিছু গ্রাহক। ছবি: নিউজবাংলা

সুইটির দোকানের নিয়মিত গ্রাহক বিজিবি ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা মুনমুন চৌধুরী ও জান্নাতুন নাঈম। তারা জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর সুইটি যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, তা অন্য নারীদের জন্য অনুকরণীয়।

একা সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা কেমন, জানালেন সুইটি।

‘স্বামীর মৃত্যুর পর বিয়ে করিনি শুধু দুই সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে। তাদের উন্নত ও প্রতিষ্ঠিত জীবন উপহার দিতে নেমে পড়ি যুদ্ধে। স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়ি ছাড়া তেমন কিছুই নেই, যা দিয়ে সংসার চালাব। এমন অবস্থায় হঠ্যাৎ করে মাথায় এলো স্বামীর ব্যাগের ব্যবসার কথা।

‘রাশেদ মারা যাওয়ার পর তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রায় এক বছর বন্ধ ছিল। শুধু দোকানঘরের পজেশন নেয়া ছিল। তারপর আমার জমানো কিছু টাকা ও গয়না বিক্রি করে নতুন করে দোকানের যাত্রা শুরু করি।

‘বর্তমান আমার এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ৯ জন কর্মচারী রয়েছেন। এখান থেকে উপজেলার বিভিন্ন শোরুমে পাইকাররা পণ্য কিনে নিয়ে যায় এবং খুচরাও বিক্রি করে থাকি। এ ছাড়া আমার দোকানের পণ্যের এখন চাহিদা অনেক বেশি। তবে এ ব্যবসাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আছে।’

ব্যবসার পরিসর আরও বাড়াতে চান সুইটি। ছবি: নিউজবাংলা

কষ্টের দিনগুলোয় পরিবারের কেউ পাশে দাঁড়ায়নি বলে জানান সুইটি। উল্টো সমাজ থেকে আসতে থাকে নানা চাপ।

‘ব্যবসার শুরুর দিকে প্রতিবেশী ও পরিবারের লোকজন অনেকে হেয় করে কথা বলেছে। স্বামী নাই, নতুন করে বিয়ে না করে ব্যবসা করছি, দোকানে বসছি, প্রতিদিন এগুলো নিয়ে চারপাশের সবাই কেমন জানি অন্য চোখে দেখত। এগুলো ভাবতে আমার খুবই খারাপ লাগত।

‘সেই সময়ে উৎসাহ বা সান্ত্বনা দেয়ার মতো কাউকে পাশে পাইনি ঠিকমতো। কত দিন, কত রাত নীরবে কেঁদেছি, কতটা অসহায়বোধ করেছি তা বলে বোঝাতে পারব না।

‘তবে আমার আশা-ভরসা ও নিঃসঙ্গ জীবনে দুই সন্তানই ছিল সুখ। নিজের সুখকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে এবং কারও কাছে যেন সাহায্যের হাত পাততে না হয়, সে জন্য পরিশ্রম করে এখন এ পর্যায়ে এসেছি।’

সুইটি জানালেন, বড় মেয়ে রেজওয়ানা রহমান রিশা এখন নওগাঁ সরকারি কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ছে। ছেলে গোলাম মোস্তফা রিফাত পড়ে নওগাঁ জিলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে।

সুইটি মনে করেন, বাংলাদেশের প্রান্তিক নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা অর্থ ও দিকনির্দেশনার অভাব।

‘উদ্যোক্তা হতে গেলে কোন মাধ্যম থেকে পুঁজির ব্যবস্থা করা যাবে, সেটাই জানেন না অনেক নারী। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিলে টানতে হয় চড়া সুদ। সরকারিভাবে ঋণ-সেবার তথ্য ভালোভাবে সবার কাছে পৌঁছানো দরকার।’

শুধু অর্থের জোগান হলেই হবে না। পণ্যের সঠিক বাজারজাতের পদ্ধতিও জানতে হবে বলে মনে করেন সুইটি।

শেয়ার করুন

ভ্যানের চাকায় ঘোরে মুংলীর সংসার

ভ্যানের চাকায় ঘোরে মুংলীর সংসার

ভ্যান চালিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালান জয়পুরহাটের মুংলী। ছবি: নিউজবাংলা

মুংলী বলেন, ‘বিয়ানে (সকালে) ভ্যান লিয়ে বাড়ি থেকে বার হই। সারা দিন জীবনের ঝুঁকি লিয়ে ভ্যান চালায়ে কেলান্ত (ক্লান্ত) হয়ে বাড়ি ফিরি। হাত-পাও তহন খুব বেদনা করে।’

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের সপ্তমী রানী (মুংলী)। ২০০২ সালে যখন তার বিয়ে হয়, তখনও বয়স ১৮ হয়নি। সংসার কী, বোঝার আগেই তার জীবনে নেমে আসে নির্যাতন।

শ্বশুর ও স্বামীর মারধরে টিকতে না পেরে তিন সন্তান নিয়ে ২০১৩ সালে ফেরেন বাবার অভাবের সংসারে। মুংলী ও তার সন্তানদের ভরণপোষণের সামর্থ্য ছিল না হতদরিদ্র বাবার। তবে থেমে থাকেননি মুংলী।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে পান বিক্রি করে শুরু করেন জীবনসংগ্রাম। তাতে না পোষালে শেষ পর্যন্ত শুরু করেন ভ্যান চালানো।

মুংলীর মা শেফালী রানী জানান, সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে বাড়িতে ফেরার পর থেকেই ফেরি করে পান বিক্রি শুরু করে তার মেয়ে। মাঝে খাল-বিল থেকে মাছ ধরে বাজারেও বিক্রি করেছে। আর এখন ভ্যান চালায়।

স্থানীয় প্রদীপ কুমারসহ কয়েকজন জানান, বাবার অভাবের সংসারে বোঝা হতে চাননি মুংলী। দুবেলা খাবার জোগাড় করতে এবং তিন সন্তানকে মানুষ করতে শুরুর দিকে পাড়ায় পাড়ায় পান ফেরি করতেন। পরে মাছ বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এতেও সংসার না চললে ২০১৫ সাল থেকে শুরু করেন ভ্যান চালানো।

মুংলী বলেন, ‘আগে পাও পেডেল ঘুরে (পায়ে চালানো) ভ্যান চালাইতাম। আর এখন ব্যাটারিয়ালা (ব্যাটারিচালিত) ভ্যান চালাই। বিয়ানে (সকালে) ভ্যান লিয়ে বাড়ি থেকে বার হই। সারা দিন জীবনের ঝুঁকি লিয়ে ভ্যান চালায়ে কেলান্ত (ক্লান্ত) হয়ে বাড়ি ফিরি। হাত-পাও তহন খুব বেদনা করে।

তিনি আরও বলেন, ‘দিনে দুই-তিন শ টাকা কামাই করে বাড়ি ফিরি। সেই টাকা দিয়ে সংসার চালাই। তিন বেটা-বেটিক পড়াশুনা করাই। তাত্থেকে গ্যারেজআলাকও টাকা দেওন লাগে।’

মুংলীর ১২ বছরের ছেলে স্বপন কুমার পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। ৯ বছরের মেয়ে সুফলা দ্বিতীয় শ্রেণিতে। তবে ৭ বছরের মেয়ে শংকরীকে এখনও স্কুলে দিতে পারেননি জানিয়ে মুংলী বলেন, ‘হাজারও কষ্ট হোক, তিনটা বাচ্চাকে মানুষের মতো মানুষ করার ইচ্ছা আছে। জানি না, ভগবান কী করবেন।’

আনতাজ আলীসহ স্থানীয় কয়েকজন পুরুষ ভ্যানচালক জানান, তারা মুংলীর সব কিছুই জানেন। আদর করে কেউ তাকে শাপলা, আবার কেউ সপ্তমী রানী বলে ডাকেন। মুংলীর যাতে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে সেদিকে নজর থাকে তাদের।

তিলকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম মাহবুব সজল জানান, মুংলীকে সাহায্য দিতে চাইলেও নিতে চান না। নিজের পরিশ্রমে সৎভাবে উপার্জন করেন বলে সবাই তাকে সম্মান করেন।

তিনি আরও জানান, মুংলীর বসতবাড়ি না থাকায় প্রধানমন্ত্রীর তহবিলের আবাসন প্রকল্পের একটি বাড়ির জন্য তার নামের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

মুংলীর মতো পরিশ্রমীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনসহ দাতাদের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি।

জেলা নারীবিষয়ক কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন নিউজবাংলাকে জানান, মুংলী তাদের জন্য গর্বের। তার কাছে গেলে তিনি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন, যাতে মুংলী সেলাই বা বাটিকের প্রশিক্ষণ নিয়ে একটা সংগঠন পরিচালনা করতে পারেন।

সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহায়তা করার আশ্বাসও দেন তিনি।

শেয়ার করুন

১৬ হাজার কোটি ঘণ্টার কাজ, নেই স্বীকৃতি

১৬ হাজার কোটি ঘণ্টার কাজ, নেই স্বীকৃতি

গৃহস্থালি কাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। ছবি: সাইফুল ইসলাম

গৃহস্থালিকাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার আর্থিক মূল্যমান ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে জিডিপিতে নারীর অংশ বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশে।

নাজমা আক্তার। পেশায় গৃহকর্মী। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বের হয়ে দুপুর পর্যন্ত মিরপুরের শেওড়াপাড়ার তিনটি বাসায় গৃহস্থালিকাজ করেন। দুপুরের পর আবার বের হন। আরও তিনটি বাসায় কমপক্ষে ছয় ধরনের কাজ শেষ করে যখন বাসায় ফেরেন, ততক্ষণে অস্তমিত সূর্য।

মাসের ২৫ থেকে ২৮ দিনই এমন রুটিন মেনে চলে জীবন। সব মিলিয়ে মাসে নাজমার আয় হয় আট থেকে নয় হাজার টাকা। ঘরভাড়া এবং দুই সন্তানের চাহিদা এই টাকায় পূরণ হয়। আর খাওয়াদাওয়ায় ব্যয় হয় স্বামীর আয়। সংসারে যে খরচ হয়, তার সিংহভাগের জোগান দেন নাজমা।

কিন্তু নাজমার এই আয় অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে কতটুকু? সংসারে আয়ের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী সমান হলেও মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে নাজমার কাজের কী মূল্যায়ন?

নাজমার মতোই দেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত প্রায় ১৭ লাখ নারী।

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত। গৃহকর্মে শ্রমের প্রায় ৯০ ভাগই নারীর। এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে এত দিনেও নিশ্চিত হয়নি অধিকার এবং কর্মপরিবেশ।

সরকারি পর্যায়ে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এখনও শেষ হয়নি নীতিমালা তৈরির কাজ। শুধু গৃহকর্মই নয়, সার্বিকভাবে নারীর গৃহস্থালিকাজের কোনো স্বীকৃতি নেই।

গৃহস্থালি কাজে বিপুল কর্মঘণ্টা ব্যয় করেও স্বীকৃতি পান না নারীরা। ছবি: সাইফুল ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বেসরকারি সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষণা পরিচালক ড. সায়মা হক বিদিশা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘৯০ শতাংশের ওপরে নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। আশির দশকে শ্রমবাজারে নারীর অবদান ছিল ৮ শতাংশ। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৩২ শতাংশ।

‘কিন্তু সার্বিকভাবে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়, পরিচালক, বড় ধরনের উচ্চপদে নারীর অবস্থান এখনও অনেক কম। এ জন্য বাল্যবিয়ে বন্ধ, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। পারিবারিক বা গৃহস্থালি শ্রমের কারণে নারীরা মূলধারায় আসতে পারে না। এ জন্য নারীর কাজের সহায়কপদ্ধতি, পলিসি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

একটা স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট খুলে নারীর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমমূল্যের একটা আলাদা হিসাব করার প্রস্তাব দেন বিদিশা। তিনি বলেন, ‘এমন হিসাব করলে নারীর যে অবদান একেবারে আমাদের চোখের বাইরে থেকে যায়, সেটা বোঝা যাবে। এটা নারীর সম্মান বৃদ্ধিতে একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

তিনি বলেন, ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজগুলো শুধু স্বীকৃতি দিলে হবে না, পুনর্বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যরা যেন ঘরের কাজে সমভাবে অংশ নেয়, সেটার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক কাজের চাপের কারণে নারীরা মূলধারার শ্রমবাজারে কাজ করতে চায় না।

‘ইচ্ছা করলেও নারীরা অন্য কাজ করতে পারে না। এ জন্য প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি, ব্যক্তি খাতের অফিসে শিশু দিবাকেন্দ্র থাকা জরুরি। আর যেসব অফিসে শিশু দিবাকেন্দ্র আছে সেগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগের তুলনায় শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণই বেশি। সংসারে সচ্ছলতার জন্য নিজের জমানো অল্প কিছু অর্থ নিয়েই গ্রামের অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত একজন নারী তার ব্যবসা শুরু করার সাহস দেখাচ্ছে। তাদের এ শ্রমের মূল্যায়ন হচ্ছে না।’

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বড়সংখ্যক নারী

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন দেশের বিপুলসংখ্যক নারী। ছবি: সাইফুল ইসলাম

সবশেষ শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে জীবিকা নির্বাহ করছে দেশের শ্রমশক্তির বিশাল অংশ। মোট শ্রমশক্তির ৮৫ দশমিক ১ শতাংশেরই স্থায়ী কাজ নেই। দেশে ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে মোট শ্রমশক্তির মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত রয়েছেন ৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার মানুষ। এর মধ্যে নারীশ্রমিক রয়েছেন ১ কোটি ৭১ লাখ ২১ হাজার।

কর্মক্ষেত্রে নারী

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গৃহস্থালিকাজ নারীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়ার পথে বড় বাধা। শ্রমবাজারে যোগ না দেওয়া নারীর ৮১ দশমিক ১০ শতাংশই এর জন্য ঘরের কাজের চাপকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে একই কারণে শ্রমবাজারে প্রবেশে বাধা পাচ্ছেন ৮ দশমিক ১০ শতাংশ পুরুষ। উপযুক্ত কাজ পেলে শ্রমবাজারে যোগ দিতে ইচ্ছুক এমন নারীর সংখ্যাও পুরুষের প্রায় দ্বিগুণ।

উপযুক্ত কাজ পেলে শ্রমবাজারে পুুরুষের চেয়ে নারীর আগ্রহ বেশি বলে জানিয়েছে বিবিএস। ছবি: সাইফুল ইসলাম

জিডিপিতে গৃহস্থালিকাজ

গৃহস্থালিতে নারীর যে কাজ দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয় না, সেই শ্রমের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য কত? বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক গবেষণা বলছে, গৃহস্থালিকাজে দেশের নারীরা বছরে ১৬ হাজার ৬৪১ কোটি ঘণ্টা সময় ব্যয় করছেন, যার আর্থিক মূল্যমান ২ লাখ ৪৯ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। এই আর্থিক মূল্য যোগ হলে জিডিপিতে নারীর অংশ বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৪৮ শতাংশ।

শ্রম জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৫-২৯ বছর বয়স্ক নারীর ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণ নেই। অর্থাৎ তারা ঘরের ভেতরে সাংসারিক কাজে নিয়োজিত। একই বয়সের পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ। তাই শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তা পুরুষের তুলনায় অনেক কম। প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং সার্বিক শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে না নিতে পারায় গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকার প্রবণতা বাড়ছে।

শ্রমশক্তিতে নারী

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ৩৬ ভাগের বেশি। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার নারী কৃষি, শিল্প, সেবাসহ নানা খাতে কাজ করছে। তবে, এর মধ্যে মাত্র ৫৯ লাখ ৩ হাজার নারী অর্থের বিনিময়ে কাজ করছে। তাদের মাসিক আয় গড়ে ১২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকেরা জানান, শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও দৈনিক মজুরির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

নারীর কর্ম খাত

দেশের নারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ কাজ করেন কৃষি খাতে। ছবি: সাইফুল ইসলাম

কৃষি খাত এখনও নারীর শ্রম নিয়োজনের প্রধান জায়গা। নারীরা যেসব খাতে শ্রম দেয়, তার মধ্যে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ হচ্ছে কৃষি। ৫ দশমিক ২ শতাংশ শিল্প খাতে এবং সেবা খাতে রয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। শিল্প খাতে নারীশ্রমিকের সংখ্যা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে নারীশ্রমিক নিয়োগের সংখ্যা কমে গেছে। আশির দশকে গার্মেন্টস খাতে নারীশ্রমিকের হার ছিল প্রায় ৮০ ভাগ। তবে এখন তা নেই।

সিপিডির সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, তৈরি পোশাক খাতে নারীশ্রমিকের সংখ্যা ৬০ ভাগের বেশি না। নারীর বড় পদে না আসার কারণ দক্ষতার অভাব, পারিবারিক কাজের চাপ ও নিয়োগকর্তাদের মানসিকতা।

পিপলস ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার গুডসের স্বত্বাধিকারী রেজবিন হাফিজ নিউজবাংলাকে বলেন, একজন নারী সামনে এগিয়ে যেতে পারবে কি না, সে বিষয়ে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। তবে আগের চেয়ে পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। নারীর নিজে কিছু করার ক্ষেত্রে অর্থায়ন সবচেয়ে বড় বাধা। নারীরা ক্ষুদ্র কোনো ব্যবসার জন্যও যেন সহজে অর্থ পেতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা জরুরি।

শেয়ার করুন

‘তোর দ্বারা কিছু হবে না’

‘তোর দ্বারা কিছু হবে না’

বানী’স ক্রিয়েশনের স্বত্বাধিকারী তাহমিনা আহমেদ বানী। ছবি: নিউজবাংলা

বানী বলেন, ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে ভালো লাগত না। তাই সবাই বলত, তোর দ্বারা কিছু হবে না।’

‘হোম ইকোনমিকস কলেজে অ্যাপ্লায়েড আর্টে প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে স্বামীর কাছে টাকা চাইতে হতো। মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, টাকা না চাওয়ার জন্য কী করতে হবে? বিকল্প একটাই খুঁজে পাই তখন, নিজে কিছু করতে হবে।’

নিজের উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুর দিকের গল্প বলছিলেন বানী’স ক্রিয়েশনের তাহমিনা আহমেদ বানী।

কথা প্রসঙ্গে নিজের ছোটবেলার একটি গল্পও বলেন উদ্যোক্তা এই নারী।

তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে ভালো লাগত না। তাই সবাই বলত, তোর দ্বারা কিছু হবে না।

‘বারবার এমন কথা শুনে মনের মধ্যে জেদ চেপে বসে। তৈরি হয় অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সকলের তাচ্ছিল্য থেকে স্থির করি, কিছু একটা করতে হবে।’

ইচ্ছাশক্তির জোরে বানী এখন বড় উদ্যোক্তা। তৈরি করেন বাহারি কেক। তবে বাজারে এখন যে ধরনের কেক পাওয়া যায়, তেমন না। বানীর কেকে রয়েছে ভিন্নতা।

২০১৩ সালে বানী তার প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৭ সালে খিলগাঁও তালতলাতে চালু হয় প্রথম আউটলেট। বানী বলেন, ‘আগে মানুষের আস্থা তৈরি করেছি। তারপর আউটলেটে কার্যক্রম শুরু করি।’

বর্তমানে বানী’স ক্রিয়েশনের তিনটি আউটলেট রয়েছে। এগুলোতে কাজ করছেন ২২ জন।

বানী বলেন, ‘যেকোনো থিম কেকের অর্ডার কিংবা যেকোনো কাস্টমাইজড কেক যত বড়ই হোক না কেন, তা তৈরি করে দেয়া অসম্ভব না। একটা বাচ্চার জন্মদিনে সাধারণ কেক না হয়ে যদি তার উপযোগী ডিজাইন কেক হয়, তাহলে উৎসবে আনন্দের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।’

বানীর একাডেমি
বানীর ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সেখানে বেকিং, কুকিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

বানী তার মেয়ের জন্মদিনের কথা বলছিলেন। প্রথম জন্মদিনে খুব সাদাসিধে একটি কেক নিয়ে আসেন তিনি। পরে একটা ‘হামটি ডামটি’ পুতুল বানিয়ে কেকের ওপর বসিয়ে দেন। এতে বেড়ে যায় উৎসবের আমেজ। এরপর তিনি বিভিন্ন বইয়ে রেসিপি দেখে কেক বানাতে শুরু করেন। কেকের সঙ্গে পুতুল দিয়ে নিজেই ডিজাইন করা শুরু করেন।

এ উদ্যোক্তা বলেন, ‘প্রথমে বাসা থেকে কেক সরবরাহ করতাম। পরিবারের বা বন্ধুদের যেকোনো অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে নিজের বানানো কেক নিয়ে যেতাম। সবার বাসায় এভাবে খাবার নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মার্কেটিং শুরু হয়। তখন সবাই এটা বাণিজ্যিকভাবে করার পরামর্শ দেয়। একটা সময় সবাই অর্ডার দেয়া শুরু করে।’

যতই দিন যাচ্ছে বড় হচ্ছে বানীর উদ্যোগ। বানী’স ক্রিয়েশন নামে খোলা হয়েছে ফেসবুক পেজ। সেখানে বিভিন্ন কেকের ছবি দেয়া আছে। প্রতিদিন একটি নতুন করে কেক বানান এবং তার ছবি তুলে ফেসবুকে পেজে দেন। দেড় মাস পর ফোনে মারমেইড ডিজাইনের প্রথম কেকের অর্ডার পান তিনি। এর থেকে অনলাইনে অর্ডার আসা শুরু হয়।

ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চাহিদা। স্বামী নাসিম আহমেদ নিপ্পন এবং বানী সিদ্ধান্ত নিলেন প্রফেশনাল একটি কোর্স করবেন। এক বছরব্যাপী ‘ব্রেড অ্যান্ড কুকিস’ তৈরির একটি কারিগরি কোর্স সম্পন্ন করলেন বানী। ইন্টার্নশিপ শুরু করলেন স্বনামধন্য বেকারিতে।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। বানী’স ক্রিয়েশনে প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি করে অর্ডার আসতে শুরু করে। ক্রেতাও বাড়তে থাকে হু হু করে। কয়েক বছরের মধ্যে ফেসবুক পেজের সদস্য ৬০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

কেকের সঙ্গে আরও অন্য কিছু যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে বলে জানান বানী।

বললেন, ‘আমার নিজস্ব একটা ইনস্টিটিউট আছে, যেখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এখানে বেকিং, কুকিং এসবের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটাকে আরও বড় পরিসরে পরিপূর্ণ ইনস্টিটিউট করতে চাই।’

করোনাভাইরাস মহামারিতে গত বছর অনেক ক্ষতি হয়েছে বলে জানান বানী। শুরুতে অনেক বড় বড় বুকিং ছিল, সেগুলো বাতিল হয়ে যায়। করোনার কারণে গ্রিন রোড ও পান্থপথ এ দুটি আউটলেট বন্ধ করতে হয়। কিন্তু তিনি আশাহত হননি। ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকলে তিনিও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

Bannis-Workers-NB
বানী’স ক্রিয়েশনের তিনটি আউটলেট রয়েছে। এগুলোতে কাজ করছেন ২২ জন। ছবি: নিউজবাংলা

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বানী বলেন, ‘উদ্যোক্তা হতে হলে আগে লক্ষ্য ঠিক করতে হবে। আমি কী করতে চাই, সেই বিষয়টি ঠিক করা জরুরি। যেকোনো একটি বিষয় নিয়ে আগে শুরু করতে হবে।

‘ধৈর্য, সততা, অদম্য মনোবল আর সর্বোপরি ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে। তাহলে যে কারও পক্ষে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আগে ঠিক করতে হবে, কোন খাতের উদ্যোক্তা হব। যে কাজকে ভালোবাসব সেটা নিয়েই এগোতে হবে। উদ্যোক্তা হতে হলে অর্থায়ন সবচেয়ে বড় বিষয়। এ জন্য অল্প অল্প পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বানীর পরামর্শ, ‘কোনো কিছু নিয়ে তাড়াহুড়া করা যাবে না। আগে পথঘাট চিনতে হবে। তারপর কাজ শুরু করতে হবে।’

শেয়ার করুন

সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় বাধা হতে পারে করোনা: মেরকেল

সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় বাধা হতে পারে করোনা: মেরকেল

জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। ছবি:এএফপি

জার্মান চ্যান্সেলর বলেন, ‘আমাদের এটা নিশ্চিত করতে হবে, নারীদের অধিকার আদায়ের যে লড়াই আমরা চালিয়ে আসছি, করোনা যেন আমাদের সে লড়াই থেকে ছিটকে না ফেলে দেয়।’

নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় করোনাভাইরাস মহামারি বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে এক ভিডিওবার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

মেরকেল বলেন, লকডাউনের সময় সিংহভাগ নারী ঘরে সন্তানদের সামলেছেন।

‘আমাদের এটা নিশ্চিত করতে হবে, নারীদের অধিকার আদায়ের যে লড়াই আমরা চালিয়ে আসছি, করোনা যেন আমাদের সে লড়াই থেকে ছিটকে না ফেলে দেয়।’

করোনায় নারীরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে মেরকেল বলেন, ‘বাড়ি থেকে স্কুল, সন্তানদের দেখভাল এবং তাদের চাকরির ভারসাম্য ঠিক রাখা বেশির ভাগ নারীর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জের।’

সেবামূলক কাজে নারীরা অনেক বেশি এগিয়ে আছে মন্তব্য করে মেরকেল জানান, স্বাস্থ্য খাতে কাজ করাদের ৭৫ শতাংশই নারী। তবে করোনাকালে তা ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।

‘নারীরা সমাজের অনেক জায়গা থেকে এখনও পিছিয়ে আছে। রাজনীতি, অর্থনীতি ও পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা সামান্য।’

জার্মান প্রতিষ্ঠানগুলোতে সম্প্রতি আইন করে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর বিধান রাখা হয়েছে উল্লেখ করে মেরকেল বলেন, ‘আমাদের উচিত নারীদের আরও বেশি সমর্থন দেয়া। সন্তানদের দেখভালের সুযোগসুবিধা দেয়ার পাশাপাশি বেতনের ক্ষেত্রে যেন বৈষম্য না থাকে সেদিকে নজর রাখতে হবে।’

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মানিতে সবচেয়ে বেশি জেন্ডারভিত্তিক বেতনপদ্ধতি চালু আছে।

২০১৯ সালে এক হিসাব অনুযায়ী, পুরুষদের তুলনায় নারীরা ১৯ শতাংশ কম আয় করেন। এর বড় কারণ অবশ্য বেশির ভাগ জার্মান নারী ফুলটাইম চাকরি করেন না।

গত সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বার্ষিক জেন্ডার সমতা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার কারণে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীরা পিছিয়ে গেছে।

শেয়ার করুন

ঘরেই বিপন্ন নারীর প্রাণ

ঘরেই বিপন্ন নারীর প্রাণ

সিলেট নগরীর কাজীটুলা এলাকায় নিজ ঘরে খুন হওয়া গৃহবধূ তামান্না। ছবি: নিউজবাংলা

সিলেট মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শিরিন আক্তার বলেন, ‘করোনায় অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। কারও বেতন বা রোজগার কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে তাদের মানসিক অবস্থায়। পুরুষের এই ক্ষোভ-হতাশার শিকার হচ্ছেন নারীরা। ফলে ঘরে নারীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা আগের তুলনায় এখন অনেক বেড়েছে।’

আজ ৮ মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হবে নারী দিবস। এর ঠিক এক দিন আগে ৭ মার্চ সকালে সিলেটে নিজ ঘর থেকে সুফিয়া বেগম নামে ২২ বছরের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় সুফিয়ার স্বামী সিলেট নগরের বাগবাড়ি এলাকার আয়নুল হককে আটক করেছে পুলিশ।

সুফিয়ার পরিবারের অভিযোগ, তাকে ইনজেকশনের মাধম্যে বিষজাতীয় কিছু প্রয়োগ করে হত্যা করেছেন আইনুল।

sylhet women
সিলেটের বাগবাড়িতে রোববার খুন হওয়া গৃহবধূ সুফিয়া বেগম। ছবি: নিউজবাংলা

এ ঘটনার তিন দিন আগে ৪ মার্চ সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কুচাই থেকে ২৬ বছরের লাকি আক্তারের মরদেহ তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ লাকিকে হত্যার অভিযোগও উঠেছে তার স্বামী শহিদ আহমদের বিরুদ্ধে। পুলিশ ওই দিনই শহিদকে আটক করে। একদিন পর স্ত্রীকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন শহিদ।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সিলেটের শাহপরাস থানাধীন বিআইডিসি এলাকা থেকে এক গৃহবধূ ও তার দুই শিশুসন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ওই নারীর সৎছেলেকে আটক করে পুলিশ। যার বয়স মাত্র ১৭।

পুলিশ জানায়, সৎমায়ের সঙ্গে মনোমালিন্যের জের ধরেই ওই কিশোর তাদের কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর ঘরে আগুনও ধরিয়ে দেয়।

সিলেটে সম্প্রতি এ রকম ঘটনা ঘটে গেছে বেশ কয়েকটি। ঘরের ভেতরেই নিজ স্বজনদের হাতে খুন হচ্ছেন নারী। সিলেট জেলা ও মহানগর পুলিশের তথ্যে গত এক মাসে জেলায় এ ধরনের হত্যার শিকার হয়েছেন অন্তত ছয় নারী। সবগুলোই পারিবারিক কলহের জের ধরে ঘটেছে।

সিলেটের শাহপরানে খুন হওয়া গৃহবধূ ও তার দুই শিশুসন্তান। ছবি: নিউজবাংলা

দেশে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা অনেক পুরোনো। ঘরে নারীদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগও অনেক দিনের। এখন তা একেবারে খুনোখুনির পর্যায়ে চলে গেছে।

এখন ঘরে থেকেও প্রাণ বাঁচাতে পারছেন না নারীরা।

নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯১৪ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে নারী দিবস। ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ দিনটি পালন করছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে।

এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’।

তবে সিলেট মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শিরিন আক্তার মনে করেন, করোনার কারণে উলটো বেড়েছে নারী নির্যাতন।

তিনি বলেন, ‘করোনার প্রকোপ কিছু কমলেও মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও আগের অবস্থায় ফেরেনি। করোনায় অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। কারও বেতন বা রোজগার কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে তাদের মানসিক অবস্থায়। পুরুষের এই ক্ষোভ-হতাশার শিকার হচ্ছেন নারীরা। ফলে ঘরে নারীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা আগের তুলনায় এখন অনেক বেড়েছে।’

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফের মতে, নারী নির্যাতনের বেশির ভাগ ঘটনাই আলোচিত হয় না। মামলা হয় না; মিডিয়াতেও আসে না।

সিলেটের কুচাইয়ে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে গ্রেপ্তার শহিদ আহমদ। ছবি: নিউজবাংলা

তিনি বলেন, ‘খুনোখুনির মতো বড় ঘটনা ঘটলে আমাদের কাছে আসে। ফলে ঘরের ভেতরে নারী নির্যাতনের বেশির ভাগ ঘটনাই আমরা জানতে পারি না। যতটুকু জানতে পারি, তার চেয়ে অনেক বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।’

সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি স্বর্ণলতা রায় বলেন, ‘পুরুষ এখনও নারীকে তার অধীনস্থ ভাবে। ফলে সংসারে পুরুষের নির্দেশনা, ফুটফরমায়েশ খাটতে কোনো নারী আপত্তি জানালেই সে ক্ষেপে যায়। নির্যাতন চালায়। অনেক সংসারেই নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার পথেও নিজের পরিবারই সবচেয়ে বড় বাধা হয়।’

স্বর্ণলতার মতে, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা প্রদান করতে হবে। নারীকে সম্মান করতে হবে। ঘরের কাজ কেবল নারীর নয়, বরং নারী-পুরুষ উভয়েরই। এটা অনুধাবন করতে হবে। তাহলে পারিবারিক নির্যাতন অনেকাংশে কমে আসবে।

গত এক মাসে সিলেটে পারিবারিক নির্যাতন ও ঘরের ভেতরে নারীকে হত্যার ঘটনায় কয়টি মামলা হয়েছে এ ব্যাপারে সিলেট জেলা পুলিশ ও সিলেট মহানগর পুলিশের কাছে রোববার জানতে চাইলেও দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সুনির্দিষ্টভাবে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

তবে আইনজীবী শিরিন আক্তার বলেন, ‘ঘরের ভেতরে নারী নির্যাতনের ঘটনা আগের তুলনায় এখন অনেক বেড়েছে। প্রতিদিনই এ-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে অনেকে আসেন।

‘আগে নারীরা ঘরে থাকতেন। এখন অনেক নারীই কাজ করছেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। এটা কিছু পুরুষ মেনে নিতে পারছেন না। আবার আগে নারীরা সব ধরনের নির্যাতন মুখ বুঝে সহ্য করলেও এখন তারা অনেকে প্রতিবাদী হচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবাদের কারণে তাদের ওপর নির্যাতন আরও বেড়ে যাচ্ছে।’

সিলেটের গোলাপগঞ্জে গৃহবধূ লাকি বেগম হত্যার বিচার দাবিতে রোববার মানববন্ধন করে এলাকাবাসী। ছবি: নিউজবাংলা

স্ত্রী লাকি আক্তারকে হত্যার দায় স্বীকার করে গত শনিবার আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে দক্ষিণ সুরমার কুচাইয়ের শহিদ আহমদ জানান, বিয়ের পর থেকেই স্ত্রীর সঙ্গে তার কলহ লেগে থাকত। এর জেরে বিভিন্ন সময় স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন শহিদ। ৩ মার্চ রাতে ও পরদিন সকালে তাদের ঝগড়া বাঁধে। একপর্যায়ে লাকিকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করেন শহিদ।

একইভাবে ২ মার্চ নিজ ঘরে খুন হন সিলেটের গোলাপগঞ্জের এক গৃহবধূ। তার নামও লাকি বেগম। স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে উপজেলার বাঘা ইউনিয়নের দক্ষিণ কান্দিগাও গ্রামের দানা মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ।

গোলাপগঞ্জ থানা-পুলিশ জানিয়েছে, কলহের একপর্যায়ে দানা মিয়া ছুরি দিয়ে লাকি বেগমকে কোপাতে থাকেন। তার চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার পথেই তিনি মারা যান।

এর আগে গত ২৪ নভেম্বর সিলেট নগরের কাজীটুলা এলাকায় সৈয়দা তামান্না নামে এক নারীকে হত্যার ঘটনায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রেমের বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় স্বামী আল মামুন তাকে হত্যা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় মামলা হলেও আল মামুন এখনও পলাতক।

এতগুলো ঘটনা ঘটলেও নারী নির্যাতন তেমন বাড়েনি বলে মনে করেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ।

তিনি বলেন, ‘ঘরের ভেতর নারীর প্রতি নির্যাতন সব সময়ই ছিল। এখন এটা বেড়েছে এমন দাবির সঙ্গে আমি একমত নই। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের তৎপরতায় অভিযুক্তরা গ্রেপ্তারও হয়েছে।’

শেয়ার করুন

ঘরের কাজে হাত লাগাচ্ছে পুরুষেরাও

ঘরের কাজে হাত লাগাচ্ছে পুরুষেরাও

ঘরের কাজে নারীদের সাহায্য করছেন অনেক পুরুষ। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

২০১৭ সালে যেখানে নারী ও পুরুষের গৃহস্থালির কাজে সময় ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ১৯ ঘণ্টা, ২০১৮ সালে এই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭৫ ঘণ্টায়। ২০১৯ সালে এ ব্যবধান ৩ দশমিক ৪৩ ঘণ্টায় নেমে এসেছে।

পুরুষের শ্রম মানে সংসারের আয়। বিনিময়মূল্য বা মজুরি ছাড়া কোনো পুরুষ শ্রম দেয় এমনটা এত দিন চিন্তাই করা যায়নি। বিপরীতে গৃহস্থালির কাজের দায় কেবল নারীর, যার কোনো পারিশ্রমিক নেই। এ থেকে আয় আসে না। সংসারের যাবতীয় কাজ নারীরাই করে যাবেন।

এই ছিল চিরকালীন মানসিকতা।

কিন্তু সময় বদলেছে। পুরুষের এই মানসিকতায় পরিবর্তন এসেছে। এখন পুরুষেরাও বাড়ির কাজে নারীর মতো বিনা মজুরির শ্রম দিচ্ছেন। পরিমাণ বিচারে তা অনেক কম হলেও পারিবারিকভাবে এ চর্চা এখন শুরু হয়েছে।

কিশোর, তরুণ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহরাঞ্চল বা গ্রামে পুরুষের মধ্যে ঘরের কাজে অংশ নেয়ার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে।

বাসাবাড়ি বা গৃহস্থালির কাজের তালিকায় রয়েছে রান্না করা, সন্তান লালনপালন এবং স্কুলে আনা-নেয়া, কাপড় পরিষ্কার, ঘর ধোয়ামোছা, বিছানা ঝাড়া, মশারি টাঙানো, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে সেবা করার মতো বিষয়গুলো।

ঐতিহ্যগতভাবে সেবামূলক এসব কাজে নারীর অবদান একচ্ছত্র। যুগ যুগ ধরে তারাই মূলত পরিবারের সদস্যদের ভালোবেসে কোনো অর্থমূল্য ছাড়া এ দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সেবামূলক এই কাজগুলোকে পুরুষেরা এত দিন নারীর দায়িত্ব ভেবে এড়িয়ে চলতেন। খুব একটা মূল্যায়নও করতেন না। এখন সচেতন পুরুষেরা এসব সেবামূলক কাজের জন্য নারীর কষ্ট ও ত্যাগকে অনুধাবন করতে শুরু করেছেন। কিছুটা হলেও ভার তুলে নিচ্ছেন নিজেদের কাঁধে।

অনেকেই এখন বাইরের কাজে ব্যস্ততা সেরে ঘরে ফিরে সহায়তা দিচ্ছেন স্ত্রীকে, কেউ মা কিংবা বোনকে। সবকিছু দেখছেন ভালোবাসার দৃষ্টিতে। বয়সের পার্থক্য এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ফলে অনেকেই কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাসাবাড়ির জমে থাকা অনেক কাজ সারছেন নিজ হাতে।

গৃহস্থালির কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ার প্রমাণ পাওয়া যায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা ও জরিপে।

এ বিষয়ে অ্যাকশনএইড পরিচালিত জরিপে নারীর কাজে পুরুষের সহায়তা প্রদানের প্রবণতা বাড়ার সুস্পষ্ট তথ্য উঠে এসেছে।

অ্যাকশনএইডের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে নারীরা মজুরিবিহীন সেবামূলক কাজ করেছেন দৈনিক ৭ দশমিক ৭৮ ঘণ্টা। পুরুষেরা করেছেন ১ দশমিক ১ ঘণ্টা। ২০১৭ সালে একই কাজে নারীর সেই অবদান কিছুটা কমে ৭ দশমিক ৫০ ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। আর পুরুষের অবদান বেড়ে ২ দশমিক ৩৭ ঘণ্টায় উন্নীত হয়েছে।

অর্থাৎ গৃহস্থালির অবৈতনিক কাজে নারী-পুরুষের সময় ব্যয়ের ব্যবধান প্রতিবছর কমে আসছে। অর্থাৎ পুরুষেরা এ কাজে নিজেদের সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছেন।

২০১৭ সালে যেখানে নারী ও পুরুষের গৃহস্থালির কাজে সময় ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ১৯ ঘণ্টা, ২০১৮ সালে এই ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৭৫ ঘণ্টায়। ২০১৯ সালে এ ব্যবধান ৩ দশমিক ৪৩ ঘণ্টায় নেমে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়ার অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা জরিপে দেখেছি, গৃহস্থালির অবৈতনিক সেবামূলক কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বাড়ছে। তারা এ কাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখন ঘরের সেবামূলক কাজকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করতে শিখেছেন এবং এর পাশাপাশি নারীকেও সহযোগিতা দিচ্ছেন।’

এটি শুধু যে শহুরে পরিসরে ঘটছে তা নয়। রাজধানীর বাইরে জেলা বা থানা পর্যায়েও গৃহকাজে বাড়ছে পুরুষের অংশগ্রহণ।

তিনি বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটে গৃহস্থালির সেবামূলক কাজে নারীদের পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন পুরুষেরাও। স্বামী গৃহস্থালি কাজের ভাগ নেয়ায় নারীরা বাড়তি আয়ের জন্য কাজের সময় পাচ্ছেন।

গৃহস্থালির সেবামূলক মজুরিবিহীন কাজে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে গবেষণা করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তার গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে, ভোর শুরু হওয়ার পর আবার ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একজন নারী কীভাবে অবৈতনিক সেবামূলক কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করে থাকেন। এ কাজ অবৈতনিক হওয়ায় মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) তাদের শ্রম ও কর্মঘণ্টা হিসাব হচ্ছে না।

গৃহস্থালির কাজে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে, এ সম্পর্কে ড. ফাহমিদা খাতুনের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা ঠিক, পুরুষের মানসিকতায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে সবার মধ্যে আসেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠরা এখনও আগের মানসিকতাই পোষণ করছেন। তারা এ সেবামূলক কাজগুলোকে এখনও নারীর দায়িত্ব ভেবে সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে ড. ফাহমিদা বলেন, গৃহস্থালির সেবামূলক ও মজুরিবিহীন কাজে পুরুষ ভিড়তে শুরু করেছে, এটা ইতিবাচক দিক। তবে শতকরা কত ভাগ বেড়েছে, প্রকৃত তথ্য পেতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ এমন স্লোগানে নারীর অমূল্যায়িত কাজের স্বীকৃতির দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। কতটা অগ্রগতি হলো এ লড়াইয়ে, এমন প্রশ্ন রাখা হলে বেসরকারি এ সংস্থাটির কো-অর্ডিনেটর শাহানা হুদা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলি, তাহলে বলব অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। পুরুষের মানসিকতার বড় পরিবর্তন ঘটেছে। একটা সময় বাপ-দাদারা পানিটুকুও ঢেলে খেতেন না। এখন পানি ঢেলে খাচ্ছেন, এমন মানুষ বহু মিলবে। এটা একটা উদাহরণ। নারীর কষ্ট লাঘব হয়, এমন অন্যান্য কাজেও পুরুষেরা এখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।’

তবে তথ্য-উপাত্তের দিক থেকে সেটি এখনও খুব বেশি নয় বলে মনে করেন শাহানা হুদা। তিনি বলেন, ‘কারণ এখনও নারী প্রতিদিন গড়ে ১২টির বেশি মজুরিবিহীন কাজ করছেন, পুরুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজের সংখ্যা মাত্র ২ দশমিক ৭টি।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০ মতে, ১৯৮৩-৮৪ সালে বেতনভুক্ত কাজে নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৭ দশমিক ৮ ভাগ এবং পুরুষের অংশগ্রহণ ছিল ৮৯ দশমিক ৯ ভাগ। ২০১০ সালের হিসাবে এতে নারীর অবদান বেড়ে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বেতনভুক্ত কাজে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে অবৈতনিক কাজ হ্রাস পায়। অবৈতনিক কাজ সাধারণত গৃহস্থালিতেই হয়ে থাকে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনীতির মূলধারার কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অবদান বাড়ছে। ফলে বেতনভুক্ত কাজেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৪৬ হাজার নারী কৃষি, শিল্প, সেবাসহ নানা খাতে কাজ করছে। এর মধ্যে ৫৯ লাখ ৩ হাজার নারী অর্থের বিনিময়ে উৎপাদনশীল বিভিন্ন খাতে কাজ করছে। বাকিরা অনুৎপাদনশীল খাতে মজুরির বিনিময়ে কাজ করছে।

শাহানা হুদা বলেন, ‘গৃহকাজে নারী-পুরুষ সমতায় না এলেও অন্তত সমতার কাছাকাছি পরিবর্তন আমরা দেখতে চাই। যদিও এর জন্য আরও সময় লাগবে। আগামী প্রজন্ম হয়তো এটা দেখতে পাবে। সে আশাতেই আমরা কাজ করছি। সরকারও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে দরকার সমাজ সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং জেন্ডার সহায়ক বাজেট বৃদ্ধি করে এ-সম্পর্কিত প্রকল্প চালু করা।’

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg