বিড়াল নিয়ে ‘মিটিং’ ডেকেছে পুলিশ

বিড়াল নিয়ে ‘মিটিং’ ডেকেছে পুলিশ

মঙ্গলবার রাত ১২ টার দিকে বেসরকারি সংস্থা এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের কর্মকর্তা তাজকিয়া দিলরুবা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘থানায় করা অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে আমরা বুধবার সকাল ১১টার দিকে বসব পল্লবী থানা পুলিশের সঙ্গে। এ সময় পুচি ফ্যামিলির তাপসী দাশকেও ডাকা হবে।’

রাজধানীর পল্লবী থানায় বিড়াল নির্যাতনের অভিযোগে করা দুটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে দুই পক্ষকে ডেকেছে পুলিশ।

এক পক্ষে আছেন, অভিযুক্ত বিড়ালের কর্মকাণ্ড নিয়ে পরিচালিত ফেসবুক-ইউটিউব চ্যানেল ‘পুচি ফ্যামিলি’র তাপসী দাশ। আরেক পক্ষে আছেন, বেসরকারি সংস্থা এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান দ্বীপান্বিতা রীদি।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পারভেজ ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘থানায় করা দুটি লিখিত অভিযোগের তদন্ত করছেন এসআই শরিফুল ইসলাম। তদন্তের স্বার্থেই তিনি মিরপুর ডিওএইচএসের পরিষদে দুই পক্ষকে ডেকেছেন। আশা করছি বিড়াল নিয়ে বিবাদের নিষ্পত্তি হবে।’

মঙ্গলবার রাত ১২ টার দিকে বেসরকারি সংস্থা এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের কর্মকর্তা তাজকিয়া দিলরুবা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘থানায় করা অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে আমরা বুধবার সকাল ১১টার দিকে বসব পল্লবী থানা পুলিশের সাথে। এ সময় পুচি ফ্যামিলির তাপসী দাশকেও ডাকা হবে।’

এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান দীপান্বিতা রীদির সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার। ওই সময় তিনি বলেছিলেন, ১৩ জুন পল্লবী থানায় করা দুটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তাপসী দাশের ডিওএইচএসের বাসায় অভিযান চালিয়ে নিষ্ঠুরতার শিকার বিড়ালগুলোকে উদ্ধার করার কথা ছিল।

কিন্তু অভিযান পরিচালনার আগে ডিওএইচএস কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন আছে জানিয়ে অভিযান পরিচালনা করেনি পুলিশ। তা ছাড়া ওইদিনই থানায় অভিযোগের খবর পেয়ে তাপসী দাশ দুটি বিড়াল নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যান। সেসংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রচার করে বলেন, তারা ঢাকার বাইরে ঘুরতে গেছেন। তারপর থেকে বাসায় ফেরেননি। এ জন্য বিড়ালগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

এই প্রসঙ্গে জানতে ‘পুচি ফ্যামিলি’র তাপসী দাশ ও তার স্বামী পার্থ চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে নিউজবাংলা। তাদের ফোন সচল থাকলেও তারা কেউই ফোন ধরেননি।

উল্লেখ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক - ইউটিউবে বিড়ালের নানা কর্মকান্ডের ভিডিও প্রচার নিয়ে আলোচিত- সমালোচিত 'পুচি ফ্যামিলি' র তাপসী দাশের বিরুদ্ধে বিড়াল নির্যাতনের অভিযোগে গত ১৩ জুন পল্লবী থানায় দুটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন এএলবি অ্যানিমাল শেল্টারের তাজকিয়া দিলরুবা ও বিড়ালপ্রেমী আরেক নারী। ওই দুটি লিখিত অভিযোগে বিড়ালের ওপর নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়।

বলা হয়, তাপসী দাশ ভিডিও করার সময় এক বিড়ালের মূত্র আরেক বিড়ালকে দিয়ে পান করান। ছোট ছোট বিড়াল ছানার লেজ কিংবা গলায় ধরে টান মারেন। অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করেন। সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে অনেক বিড়ালের মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগও আনা হয়েছে তাপসীর বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া আরেকজনের বিড়াল আটকে রেখে ফিরিয়ে না দিয়ে বিড়াল পালকের চরিত্র নিয়েও বাজে মন্তব্য করেন তার ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলের লাইভে।

পুচি ফ্যামিলির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

এএলবি অ্যানিমেল শেল্টার বলছে, তাপসী দাশ ফেসবুকে বিড়ালকে নিয়ে যাচ্ছেতাই আচরণ করে থাকেন। নির্মম আচরণের ভিডিও ধারণ করে তার প্রায় ৯ লাখ ফেসবুক ফলোয়ার ও দেড় লাখ ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবারকে নিষ্ঠুরতা শেখাচ্ছেন। এদিক থেকে আইসিটি অ্যাক্টেও তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নিয়েছে সংস্থাটি।

তাপসীর নিষ্ঠুরতার উদাহরণ দিতে গিয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যান দীপান্বিতা রিদি বলেন, এক বিড়ালের মূত্র মেশানো পানি আরেক বিড়ালকে পান করানো হয়। এটি খুবই অস্বাস্থ্যকর। শুধু ভিডিও বানানোর জন্য তিনি চরম অস্বাস্থ্যকর ও নির্মমতার আশ্রয় নিয়ে থাকেন।

তাপসী দাশ মাছের নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার না করে কেবল সেদ্ধ করে বিড়ালকে খাওয়ান। এভাবে খাওয়াতে উৎসাহ দেন অনুসারীদের। এতে বিড়ালের বদহজম, ডায়রিয়া ও পেটে ক্রিমি জন্ম নেয়ার শঙ্কা থাকে।

এ ছাড়া তার অনেক ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি প্রায়ই বিড়ালের ছোট ছোট বাচ্চার লেজ বা গলা ধরে টান মারেন। এতে ছানাদের মেরুদণ্ড থেকে লেজ আলাদা হয়ে যেতে পারে। সেটা জোড়া লাগানোর চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই। ফলে বিড়াল সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যেতে পারে।

তার দেখাদেখি অনুসারীরাও এসব শিখছেন এবং বিড়ালের ওপর এমন নিষ্ঠুর আচরণ করছেন। এসবের প্রমাণও আছে। তার ভিডিওতে ক্রমাগত মেটিংকে (মিলন) উৎসাহ দেয়া হয়। কীভাবে মেটিং করাতে হয় তার প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকেন তিনি। তবে টানা মেটিংয়ের ফলে মরণব্যাধি হওয়ার শঙ্কা থাকে বিড়ালের।

এএলবি অ্যানিমেল শেল্টারের চেয়ারম্যান দীপান্বিতা রিদি আরও অভিযোগ করেন, ‘পিওর পার্শিয়ান বিড়ালগুলোর কখনোই স্পে, নিউটার করান না তাপসী দাশ। কিন্তু ফলোয়ারদের দেখান, তিনি স্টেরিলাইজেশন করান। এভাবে তিনি তার অনুসারীদের ভুল ধারণা দেন। এ ছাড়া ব্রিডিং করে পিওর ব্রিড বলে মিক্সড ব্রিড সেল করেন বিড়ালপ্রেমীদের কাছে। এভাবে অনেক মানুষ তার মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।’

তিনি বলেন, তাপসী যেসব টিস্যু দিয়ে বিড়ালের মূত্র পরিষ্কার করেন, সেগুলো দিয়েই বিড়ালের মুখ পরিষ্কার করেন। এ ছাড়া ছোট ছোট বাচ্চাকে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করিয়ে অনেক ছানার মৃত্যু ঘটিয়েছেন তাপসী দাশ।

বিড়াল নিয়ে ‘মিটিং’ ডেকেছে পুলিশ

‘আলো’র বিরুদ্ধে অপয়া অপবাদ! কী হয়েছিল আলোর?

এএলবি অ্যানিমেল শেল্টারের কর্মী ও প্রাণিপ্রেমিকরা নিউজবাংলাকে বলছেন, আলো নামের একটি অন্ধ বিড়াল ছিল তাপসী দাশের কাছে। সেটির সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রাণিপ্রেমীদের কাছে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করেন তাপসী। আলোকে মেন্টাল টর্চার করা হয়।

তাপসীর হেফাজতে থাকা যত বিড়াল মারা যায়, তার সব দায় চাপানো হয় আলো নামের এই বিড়ালের ওপর।

তাপসী দাশের ফেসবুক লাইভে ভেটেরেনারি চিকিৎসকের বরাত দিয়ে বলা হয়, আলো এমন এক অসুখ বহন করে, যার জন্য আলো সুস্থ থাকলেও আশপাশের সবাই মারা যায়। যদিও চিকিৎসককে বলতে শোনা গেছে, আলোর পরীক্ষা ছাড়া বলা সম্ভব না তার থেকে অসুখ ছড়িয়েছে কি না।

বিড়ালপ্রেমীদের দাবি, আলোকে কোনো রকম চেকআপ করানো হয়নি। অনেকেই আলোর চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাপসী দেননি। শুধু তা-ই নয়, আলোকে তার আসল মালিকের কাছে ফেরত দেয়ার পর সেই মালিককে পুচি ফ্যামিলি থেকে ভয় দেখানো হয়েছিল, যাতে কোনো চিকিৎসা না করান। একপর্যায়ে আলো মারা যায়।

বিড়ালপ্রেমীরা জানান, পুচি ফ্যামিলি থেকে আলোর ব্যাপারে যা যা বলা হয়েছে, তার বেশির ভাগই মিথ্যা। তাপসী দাশ টেস্ট না করিয়েই সবকিছু বলেছেন। আলোর মৃত্যুর জন্য তাপসী দাশ দায়ী এবং অবশ্যই এটা অ্যানিমেল অ্যাবিউস ও ক্রুয়েলটি।

পুচি ফ্যামিলি পেজের স্বত্বাধিকারীর বক্তব্য

পুচি ফ্যামিলি পেজের মালিক তাপসী দাশের স্বামী পার্থ চৌধুরী। তাপসী দাশের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন তিনি।

পার্থ চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আপনারা আমাদের ভিডিওগুলো দেখেন। একেবারে স্বচ্ছ। আমার স্ত্রী তাপসী দাশ অনেক আগে থেকেই বিড়াল পালন করে। কয়েকজনের পরামর্শে পেজ খোলে। অল্প সময়ের মধ্যে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ফলোয়ার হয়েছে। এটা অনেকেরই পছন্দ হচ্ছে না।

‘তাপসী একটি লাইভে এক হাতে মোবাইল ফোন ধরে রাখার কারণে আরেক হাত দিয়ে বিড়ালের লেজ বা গলা ধরেছিল। এটা অনেক আগের ঘটনা। সামুদ্রিক মাছ সেদ্ধ করে কাঁটা ছাড়িয়ে বিড়ালকে খাবার দেয়া হয়। কোনো অস্বাস্থ্যকর খাবার দেয়া হয় না। নির্যাতনও করা হয় না।’

থানার পুলিশের কাছে করা লিখিত অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পার্থ দাশ বলেন, ‘ওরা যদি মামলা করে, আমরাও আইনজীবী নিয়োগ করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’

আরও পড়ুন:
‘পুচি ফ্যামিলি’র তাপসীর বিরুদ্ধে বিড়াল নির্যাতনের অভিযোগ
গাড়ির মডেল ম্যাও ম্যাও

শেয়ার করুন

মন্তব্য