বন্ধ হলো সেই চীনামাটির পাহাড় কাটা

বন্ধ হলো সেই চীনামাটির পাহাড় কাটা

ছাড়পত্র ছাড়াই নির্বিচারে মাটি কাটায় পাহাড়ের শরীরজুড়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। ছবি: নিউজবাংলা

ময়মনসিংহ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ফরিদ আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সব পাহাড়েই মাটি তোলা বন্ধ রয়েছে। কোনো কোম্পানি চীনামাটি নিতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতেই হবে। আমি কাউকে মাটি কাটার অনুমতি দিইনি।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চীনামাটির একটি পাহাড় কাটা হচ্ছিল ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায়। বিষয়টি নিয়ে ‘ছাড়পত্র ছাড়াই কাটা হচ্ছে চীনামাটির পাহাড়’ শিরোনামে ২৬ এপ্রিল খবর প্রকাশিত হয় জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম নিউজবাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকমে। এররপরই নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে বন্ধ করা হয় পাহাড় কাটা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়ের চারদিকে সুনশান নিরবতা। বন্ধ হয়েছে মাটি কাটা। নেই কোনো শ্রমিকের উপস্থিতি। তবে এখনও পাহাড়ের শরীরজুড়ে রয়ে গেছে বড় বড় গর্ত।

উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নের পুটিমারি বাজারের পাশেই চীনামাটির পাহাড়। অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাহাড়টির উত্তরে ভারতের মেঘালয় ঘেঁষা গারো পাহাড়। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পাহাড় থেকে মাটি কেটে নিচ্ছিল বাংলাদেশ এগ্রো সিরামিক নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

আনিছুর রহমান নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘আগে পাহাড়টি আরও বড় ছিল। দীর্ঘদিন মাটি কেটে নেয়ার এটি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। সরকারি নিয়ম মেনে মাটি নিলে এত গর্ত হতো না। বড় গর্তগুলোও সাধারণ মাটি দিয়ে ভরাট করা হতো।’

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়তুষ বিশ্বাস বাবুল বলেন, ‘একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ইশারায় বছরের পর বছর হিসাব ছাড়া চীনামাটি নেয়া হয়েছে। খনিজ সম্পদ ব্যুরো থেকে যদি ১০০ টন মাটি নেয়ার অনুমতি আনে, তাহলে হাজার হাজার টন মাটি নিয়ে যায়। এগুলো দেখেও না দেখার ভান করে স্থানীয় প্রশাসন।’

বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় নিউজবাংলা টোয়েন্টি ফোর ডটকমকেও ধন্যবাদ জানান তিনি।

ময়মনসিংহ জেলার পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন বলেন, ‘শুধু পাহাড়ের চীনামাটি কেন? নদী থেকেও কেউ যদি এক চিমটি মাটি তোলে তাহলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র লাগবে। নয়ত মাটি নিতে পারবেনা।’

ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক আ শ ম হেফজুল কবির বলেন, ‘নির্বিচারে পাহাড় কাটলে ভূপ্রকৃতির চরম বিপর্যয় ঘটে। এর ফলে অনেক পশুপাখি পাহাড়ে আশ্রয় নিতে ভয় পায়। পর্যটকরাও এক সময় পহাড় দেখতে আসবেনা।

তিনি বলেন, ‘সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে চীনামাটি নিলেও পাহাড় ধ্বংস হতে পারে, এমন জায়গা থেকে মাটি তোলা যাবেনা। পরিবেশ প্রকৃতি টিকিয়ে রাখা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাফিকুজ্জামান বলেন, ‘খনিজ সম্পদ ব্যুরো থেকে অনুমোদন না নেয়া পর্যন্ত পাহাড় থেকে কেউ মাটি নিতে পারবেনা। কখনো কখনো তারা অনুমোদন দেয়।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া মাটি নেয়া বৈধ কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খনিজ সম্পদ ব্যুরো কার কাছ থেকে ছাড়পত্র এনে দেবে সেটাতো আমার জানার বিষয় না। যদি অনুমোদন দেয়, তাহলে মাটি নিতে পারবে। নয়ত মাটি নেয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগ কার্যালয়ের পরিচালক ফরিদ আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সব পাহাড়েই মাটি তোলা বন্ধ রয়েছে। কোনো কোম্পানি চীনামাটি নিতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতেই হবে। আমি কাউকে মাটি কাটার অনুমতি দিইনি।’

তিনি বলেন, ‘এখন মাটি নেয়া বন্ধ থাকলেও যদি আবারও কেউ মাটি নিতে চায়, আগে অবশ্যই আমাদের কার্যালয়ে আবেদন করতে হবে। ছাড়পত্র দিলে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাটি নিতে পারবে।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, ‘পাহাড়টির মাটি নেয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে। কেউ মাটি নিলে অবশ্যই অনুমোদন সাপেক্ষে নিতে হবে।’

আরও পড়ুন:
পাহাড় কেটে কওমি মাদ্রাসা, পৌনে ১ কোটি টাকা জরিমানা
পাহাড় কেটে ভবন করছে টিকে গ্রুপ
পাহাড় কেটে জরিমানা গুনলেন তিন লাখ টাকা
পাহাড়ে আঞ্চলিক দলের সংঘাতে ১৫ মাসে ৪২ খুন
বান্দরবানের মুন্ডি

শেয়ার করুন

মন্তব্য