টিকার অ্যাপ তৈরিতে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের খবর ‘মনগড়া’

টিকার অ্যাপ তৈরিতে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের খবর ‘মনগড়া’

ডা. হাবিবুর রহমানের বরাত দিয়ে সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে অ্যাপ তৈরিতে ৯০ কোটি টাকা খরচের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তবে হাবিবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, তার বক্তব্য বিকৃত করে প্রকাশ করেছে সংবাদপত্রটি।

করোনার টিকা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘সুরক্ষা’ নামে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) তৈরিতে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের যে খবর সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসেছে তার পুরোটাই মনগড়া বলছে সরকার।

এ ধরনের প্রচারণাকে বিভ্রান্তিকর ও গুজব বলে সতর্ক করে গণমাধ্যম বিবৃতি দিয়েছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, করোনার টিকা গ্রহণের জন্য সবাইকে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন করতে হবে অ্যাপের মাধ্যমে। টিকা গ্রহীতার সব তথ্য সংরক্ষিত থাকতে এই অ্যাপে।

অ্যাপের কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই সংবাদমাধ্যমে ব্যয় নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়। এর জের ধরে ফেসবুকেও সমালোচনা শুরু হয়েছে, যাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

অ্যাপটি আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে বিনামূল্যে তৈরি করে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) সাবেক পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘তবে এটার মেন্টেন্যান্স (ডোমেইন, হোস্টিং, এনআইডি ভেরিফিকেশন) বাবদ এক বছরে সম্ভাব্য একটা বাজেট ধরা হয়েছিল, যা প্রায় ৯০ কোটি টাকা। তবে এটা এখনও চূড়ান্ত না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যদি এই টাকা না নেয় তবে আর অর্থ খরচ হবে না। আবার তারা ডিসকাউন্টও দিতে পারে।’

ডা. হাবিবুর রহমানের বরাত দিয়ে সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে অ্যাপ তৈরিতে ৯০ কোটি টাকা খরচের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তবে হাবিবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, তার বক্তব্য বিকৃত করে প্রকাশ করেছে সংবাদপত্রটি। তিনি এক বছরে অ্যাপের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য খরচের বিষয়টি বলেছিলেন, যেটি ওই সংবাদপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করেছে।

ডা. হাবিবুর রহমান ওই বক্তব্য দেয়ার সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের পরিচালক ছিলেন, তবে এখন এর দায়িত্ব পেয়েছেন ডা. মিজানুর রহমান। তাকেও অ্যাপের খরচের বিষয়ে প্রশ্ন করেছিল নিউজবাংলা, তবে নতুন দায়িত্ব নেয়ার কথা বলে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মিজানুর রহমান।

স্বাস্থ্য বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অ্যাপ তৈরিতে একটি টাকাও ব্যয় হচ্ছে না। তবে অ্যাপ তৈরির পর করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহণকারী কোটি কোটি মানুষের তথ্য ক্লাউড সার্ভারে সংরক্ষণ করা, এনআইডি ও মোবাইল নাম্বার যাচাই এবং টিকা গ্রহীতাদের কয়েক কোটি এসএমএস প্রদানের কাজে অর্থ ব্যয় হবে।

করোনার টিকা ব্যবস্থাপনায় অ্যাপ নির্মাণের জন্য ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের খবরকে ভিত্তিহীন বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এর মধ্যে ক্লাউড হোস্টিংয়ের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ক্লাউড সার্ভার ব্যবহার করা ছাড়াও এসএমএস পাঠাবে টেলিটক, এনআইডি ভেরিফিকেশনসহ অন্যান্য সব ধাপ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর সম্পন্ন করবে।

বিষয়টি নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের টিকা গ্রহীতাদের ডেটাবেজ তৈরিতে যে অ্যাপ তৈরি করা হচ্ছে, তাতে কোনো টাকা ব্যয় হচ্ছে না। আইসিটি বিভাগের সেন্ট্রাল এইড ম্যানেজমেন্ট (ক্যাম) নামের একটি সফটওয়্যার রয়েছে। সফটওয়্যারটি আইসিটি বিভাগের প্রোগ্রামারদের একটি দল তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, ‘ওই সফটওয়্যারের মাধ্যমেই করোনাকালীন দেশের ৫০ লাখ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। সেই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেই ‘সুরক্ষা প্ল্যাটফরম’ অ্যাপটি তৈরি করা হবে। আইসিটি বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার প্রোগ্রামাররা অ্যাপটি তৈরি করবেন। নিজেদের জনবল, অফিস, সোর্স ব্যবহার করে কাজটি করার কারণে কোনো টাকাই ব্যয় হবে না।’

আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জানান, অ্যাপটি তৈরিতে ৯০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে। এই টাকা ব্যয় হলে তো সরকারি ক্রয় কমিটির অনুমোদন নিতে হতো। কারণ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা ৫০ কোটি টাকার বেশি খরচ করতে পারেন না। কিন্তু ক্রয় কমিটি, অর্থ বিভাগ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা অধিদপ্তর কারও কাছেই কোনো টাকা চাওয়া হয়নি।

পলক বলেন, ‘অ্যাপ তৈরিতে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়টি গুজব। টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করছে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, অ্যাপটি তৈরি আগে অ্যাপ ব্যবস্থাপনার করে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে অ্যাপ তৈরি ও ব্যবস্থাপনা খরচ কেমন হবে তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। এনইসি নামে জাপানের একটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান ৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল।

এমন উচ্চ ব্যয় দেখে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে এই অ্যাপস তৈরির কাজটি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপরই তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাপটি তৈরি করছে।

অ্যাপটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। স্মার্টফোনে অ্যাপটি ডাউনলোড করে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ থেকেই নিবন্ধন করতে পারবেন। নিবন্ধনের জন্য ফোন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বার, নাম, জন্ম তারিখ, অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা আছে কি না, পেশা ইত্যাদি বিস্তারিত উল্লেখ করতে হবে।

করোনা প্রতিরোধে অক্সফোর্ডের টিকা কিনছে বাংলাদেশ। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত এই টিকা দেশে আসবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে। তিন কোটি ডোজ টিকার মধ্যে ৫ লাখ ডোজের প্রথম চালানটি দেশে পৌঁছাবে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে।

প্রত্যেক ব্যক্তি করোনাভাইরাসের দুই ডোজ করে টিকা পাবেন। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের বিস্তারিত তথ্য অ্যাপের মাধ্যমে জানা যাবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই পদ্ধতি ব্যবহার করে টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে।

আরও পড়ুন:
করোনা টিকা ভারতের দামেই পাবে বাংলাদেশ
করোনার টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রুখতে গাইডলাইন
ভারতে তিন কোটি টিকা দেয়া হবে বিনা মূল্যে
টিকা পেতে নিবন্ধন শুরু ২৬ জানুয়ারি
২৫ জানুয়ারির মধ্যেই আসছে টিকা

শেয়ার করুন

মন্তব্য