20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
হঠাৎ লিসবনে

হঠাৎ লিসবনে

জার্মানিতে বন, আর পর্তুগালে লিসবন; আমাদের আছে সুন্দরবন -- কিসের সাথে কী! আমড়া কাঠের ঢেঁকি। প্রবাসে লেখার বিষয় ভাবতে ভাবতে, মনে পড়লো লিসবনের কথা। পর্তুগাল নামের যে দেশটি পৃথিবীর মানচিত্রে, তার রাজধানী লিসবন। ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অতলান্তিকের কূলে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন মহানগর এবং ইউরোপে এথেনসের পর সবচেয়ে পুরানো রাজধানী শহর এটি। সূত্র-পর্তুগাল: এ শর্ট হিস্টোরি

লিসবন-এ যাওয়ার ইচ্ছা অনেকদিন ধরেই ডালপালা মেলেছিল, বিশেষ করে বন্ধু সারওয়ার রেজা জিমি ইরাসমুস বৃত্তি নিয়ে পর্তুগাল পড়তে যাওয়ার পর থেকে আলাপ-আলোচনায় প্রসঙ্গটি ঘুরেফিরে আসত। সুতরাং, গত বছর যখন নিজেকে নিয়ে নরওয়েতে পড়তে চলে এলাম, লিসবন ভ্রমণের সুযোগও হাতের নাগালে এলো। নরওয়েতে কিছুটা থিতু হওয়ার পর জিমিকে জানালাম, লিসবনে যেতে চাই ওর সঙ্গে দেখা করতে। শুনেই দারুণ খুশি, দুজনেরই ক্ষণ গণনা শুরু।

নরওয়েতে স্টাডি পারমিট ও রেসিডেন্ট কার্ড থাকায়, সেনগেন চুক্তি অনুযায়ী তাই পর্তুগাল ভ্রমণে আলাদা ভিসা আমার দরকার করেনি। ঊনিশ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পরিকল্পনা সাজিয়ে বিমান টিকেট কিনে ফেললাম অনলাইনে। ভ্রমণ পরের মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। অসলো বিমানবন্দর থেকে উড়ান সোয়া চার ঘণ্টার, লিসবন বিমানবন্দরে নামলাম স্থানীয় সময় দুপুর ২টায়।

ইউরোপের উত্তরের এক রাজধানী থেকে দক্ষিণের আরেক রাজধানীতে- খুবই মিশ্র অভিজ্ঞতা। জীবনের অভিযাত্রিক আমি, ঢাকা থেকে অসলো হয়ে কীভাবে পৌঁছে গেলাম লিসবন! বিমানবন্দরে অপেক্ষায় ছিলো জিমি। কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে জিমির সাথে লিসবনের রাস্তায়। নেমেই মনটা আরও খুশিতে ভরে উঠলো উজ্জ্বল সূর্যালোকে, সৌরতাপে। কারণ, রওনা হওয়ার সময় বৃষ্টি ছিলো অসলোতে, এমনিতেই শীতের দেশে সূর্যতাপ বিরল অনুভূতি।

লিসবন শুরুতেই তার উষ্ণতায় আলিঙ্গন করল আমায়। অতপর, জিমিকে আলিঙ্গন, অনুসরণ। আমার জন্য ‘সিটি রাইড’ কিনল জিমি। এই রাইড কার্ড ব্যবহার করে লিসবন শহরের সব গণপরিবহনে চড়তে পারব আমি। কার্ডে ১০টি রাইড ছিলো- অর্থাৎ ১০ বার ব্যবহার করার জন্য জিমিকে গুণতে হলো ৭ ইউরো। আমরা উঠলাম মেট্রোতে, গন্তব্য মার্তিম মুনিশ- জিমির ডেরায়।

খুবই পার্থক্য লিসবন আর অসলোর মধ্যে। দুই রাজধানী একদমই আলাদা। অসলোতে ভিড় খুবই সীমিত পরিসরের, আর লিসবনের ভিড় যেন অনেকটাই আমার চেনা- মানুষের ঠাসাঠাসিতে অভ্যস্ত আমার চোখে লিসবন যেন খুবই স্বাভাবিক ব্যস্ত শহর। মেট্রোতে আমাদের মুখোমুখি আসনে বসা দুজনের একজন বাংলাদেশি, বুঝতে পারলাম মোবাইল ফোনে চাপাস্বরে তার অনর্গল ক্লান্তিহীন বাংলায় কথোপকথনে। অবশ্য পরিচয়ের আগ্রহ জাগেনি। পুরো ট্রামের বগিতে চোখ বুলিয়ে উপলব্ধি ‘মেট্রোপলিস’- একেই বলে। প্রথম এমন অনুভূতি হয়েছিলো কলকতা ভ্রমণে। দেশ-বিদেশের, জাত-বেজাতের, ধর্ম-অধর্মের মিশেলে একাকার- কে যে কার!

খানিক পর মেট্রো বদল। লিসবনের মাটির তলায়- লাল, নীল, হলুদ ও সবুজ- চারটি পথে বিভক্ত গোটা মেট্রো ব্যবস্থা। প্রায় ৬০ বছরের পুরানো লিসবন মেট্রো খুব যে ঝকঝকে-তকতকে তা বলা যায় না, তবে ইউরোপীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। অনেক স্টেশনই চমৎকার মুরাল, স্থাপত্য, অথবা চিত্রকর্মে সজ্জিত। পথে যেতে যেতে চোখে পড়লো কয়েকটি স্টেশনে সংস্কার কাজ চলছে। প্রায় আধঘণ্টার ভূগর্ভ পরিক্রমা করে আবার মাটির ওপরে ফিরলাম- মার্তিম মুনিশে। লিসবনের বাঙালি-পাড়া বলা চলে। রীতিমতো বাংলায় সবকিছু চলে সেখানে। জিমি আমাকে নিয়ে গেল একটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয়। বেলা ৪টার দিকে দেশি খাবারেই দুপুরের খাওয়ার পাট চুকলো। খরচ হলো ১১ ইউরো।

এক পর্তুগিজ নাইট মার্তিম মুনিশ-এর নাম অনুসারে লিসবনের এই এলাকাটির নাম। মুরদের থেকে লিসবন পুনরুদ্ধারে পর্তুগিজদের অভিযানে এই নাইট নিজেকে উৎসর্গ করেন। তার নামে এলাকায় পার্ক, স্থাপত্য এবং তার প্রতিকৃতি রয়েছে। তবে এখন মার্তিম মুনিশের অলিগলিতে বলা চলে বাঙালিদের প্রধান্য। তবে মার্তিম মুনিশে খুব বেশি সময় কাটানো হলো না, কারণ জিমির সঙ্গে যেতে হলো বন্ধু মিগেলের সঙ্গে দেখা করতে।

পথে লিসবনের অলিগলির সঙ্গে কিছুটা পরিচয় করিয়ে নিতে নিতে চললো জিমি। একটা বড় অপেরা হাউজের সামনে দিয়ে গেলাম- এখন আর নাম মনে পড়ছে না। পুরানো শহরের গলি, শত বছরের পুরানো ভবন, পাথরে বাঁধানো ফুটপাত। চড়াই-উৎরাইয়ের মিশেল লিসবন। পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা এই মহানগর হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি লালন করে চলেছে। অনেকগুলো বড় গির্জা চোখে পড়লো। নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ এবং রাস্তায় ভিনদেশি, অ-ইউরোপীয়দের উপস্থিতি নজর কাড়লো।

পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে- একটি কাফেতে অপেক্ষায় ছিলো মিগেল- বলা উচিত ছিলেন, কারণ জিমির এই বন্ধুটির বয়স ৫০ এর কাছাকাছি, অথচ কী দারুণ প্রাণবন্ত! এমনভাবে আলাপ করলাম আমরা যেনো সমবয়সী। মিগেলের সঙ্গে কাফেতে কফি পান-পর্ব শেষ করার পর, ও আমাদের নিয়ে গেলো গ্রাসা-য়। লিসবনেরই একটা পাহাড়-চূড়া, পুরো শহরটা চমৎকার দেখা যায়। গোধূলির আলোয় দারুণ দেখতে। আবার কফি পান, পাশেই চমৎকার ‘স্ট্রিট মিউজিক’। পরিবেশটাই মন উচাটন করা।

ঘণ্টাখানেক সময় কাটিয়ে ফিরলাম মার্তিম মুনিশে। সেখান থেকে এবার জিমি নিয়ে চললো তার আবাসনে। মার্তিম মুনিশের কাছেই গলিপথ মাড়িয়ে জিমির বাসায়। পরিচয় হলো আরো দুজন বাংলাদেশির সঙ্গে। একজন, নাসের ভাই, এরইমধ্যে পর্তুগালে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়ে গেছেন। আমাকে পরামর্শ দিলেন, ইউরোপে থিতু হতে চাইলে পর্তুগালে চেষ্টা করাই সহজতর। কিছুক্ষণ আড্ডার পর নাসের ভাইয়ের আমন্ত্রণে এবার আরেকটি বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় চা-সিঙ্গাড়া পর্ব।

এরপর জিমি আর নাসের ভাই মিলে আমাকে পৌঁছে দিলো আমার রাত্রিযাপনে নির্ধারিত হোস্টেলে। ইউরোপে এই হোস্টেল ব্যবস্থা খুবই মজার, সস্তায় রাত্রীযাপনের চমৎকার বিকল্প। সাধারণত হোটেলে থাকাটা বেশ খরচের ব্যাপার। কিন্তু হোস্টেলে ঘুমানোর একটি বিছানা ছাড়াও স্নান ও খাবারের ব্যবস্থা থাকে। অতিথিরা একটি কক্ষে সাধারণত ৪ থেকে বারো জন পর্যন্ত ভাগাভাগি করে থাকে। অভ্যর্থনা টেবিলে যথারীতি পাসপোর্ট দেখিয়ে নাম লেখাতে হলো। আগাম পরিশোধ করতে হলো ভাড়া। এক রাতের জন্য আমাকে গুণতে হয়েছে ২৮ ইউরো- খুবই সস্তা! সঙ্গে সকালের নাস্তাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সেটা আর চেখে দেখার সুযোগ মেলেনি, কারণ পরের দিন সকাল সকাল আমরা- আমি, জিমি, মিগেল রওনা হয়ে গেলাম এভোরার পথে।

হোস্টেলের যে কক্ষে ছিলাম সেটা খুব বড় নয়, বরং কিছুটা গাদাগাদিই বলা চলে। দরজায় নোটিশ টানানো, নিজের জিনিসপত্রের দায়িত্ব নিজেকেই দেখে রাখতে হবে। নিরাপত্তা নিয়ে আমার নিজের অবশ্য খুব একটা আশঙ্কা জাগেনি, হয়ত তেমন দামি কিছু সঙ্গে ছিল না বলেই।

লিসবনে আমার প্রথম দিনটা কেটে গেল এভাবেই। বিশাল লিসবনের তেমন কিছুই দেখা হয়নি, তবে এই স্বল্প সময়েই প্রাচীন এই মহানগরকে সম্ভবত কিছুটা অনুভব করতে পেরেছি। হয়ত মনে হতে পারে এ কেমন ভ্রমণ? কিন্তু আমার এমনটাই ভালো লাগে, খুব সাধারণভাবে সাদা চোখে দেখতে, অনুভব করতে, অনুভূতিগুলো সতেজ থাকে স্মৃতিতে। আমার ‘লিসবন ড্রিম’ পূরণ হলো এভাবেই।

[email protected]

শেয়ার করুন