20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
করোনায় চিড়েচ্যাপ্টা সৌদি প্রবাসীরা

করোনায় চিড়েচ্যাপ্টা সৌদি প্রবাসীরা

সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনার আবাসিক হোটেলসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি কাজ করতেন। তাদের মধ্যে কেউ ছুটিতে দেশে রয়েছেন। কিছু সংখ্যক কাজ করলেও বেতন নেই।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। দেশটিতে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ২২ লাখের বেশি বাংলাদেশি। এদের অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণির। আর এই শ্রেণির ওপরই সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে করোনাভাইরাস মহামারীর।

কারণ করোনাকালীন আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক কোম্পানি জনবল ছাঁটাই করছে। আবার অনেকে ছুটিতে দেশে গিয়ে সময়মতো ফিরতে না পারায় তাদের চাকরি নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চিয়তা।

কুমিল্লার দুইভাই রফিকুল ও কালো মিয়া সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি সেলুনে কাজ করতেন। গত জানুয়ারিতে কালো মিয়া দুই মাসের ছুটিতে দেশে গিয়ে আটকা পড়েন। আর লকডাউনের প্রথম ধাপেই বন্ধ হয়ে যায় রফিকুলের কর্মস্থল সেলুনটি।

ছয় মাস পর রফিকুলের সেলুন চালু হলেও কালো মিয়ার সৌদি ফেরা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চিয়তা। এতোদিন ধার-দেনা করে পেট বাঁচালেও কালো মিয়ার আকামা নবায়ন করে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে উচ্চমূল্যে টিকিট কিনে ভাইকে সৌদি ফেরত আনার চিন্তায় এখন ঘুম হারাম রফিকুলের।

চাঁদপুরের আব্দুস সালাম ১১ বছর ধরে কাজ করছিলেন রিয়াদের একটি বিনোদন কেন্দ্রে। ভালোই চলছিল কর্মজীবন। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে সবকিছু পাল্টে গেছে। বন্ধ হয়ে যায় বিনোদন কেন্দ্রটি। কর্মহীন হয়ে পড়েন সালাম। তারপর প্রায় পাঁচ মাস বেকার তিনি।

আইনের কঠোরতা ও নানা বিধিনিষেধের কারণে অন্য কোনো কাজও করতে পারছে না সালাম। আগের আয় থেকে যে সামান্য অর্থ জমা ছিল, তা-ও শেষ। ধার-দেনা করে এখন দুর্বিসহ জীবন কাটাচ্ছেন।

সব মিলে দেশে ফেরত আসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই সালামের সামনে। কিন্তু দেশে এসেইবা কী করবেন, এ নিয়ে দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না তার।

শুধু কালো আর রফিকুল নয়- এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে আটকে পড়া ও সৌদিতে চাকরি হারিয়ে বহু প্রবাসী রয়েছেন মহাসংকটে। দীর্ঘদিন ধরে কাজের বাইরে থাকা এসব প্রবাসী আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন।

সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনার আবাসিক হোটেলগুলোসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি কাজ করতেন। তাদের মধ্যে কেউ ছুটিতে দেশে রয়েছেন। কিছু সংখ্যক কাজ করলেও বেতন পাচ্ছেন না।

সবচেয়ে বেশি মানবেতর জীবন যাপন করছেন কথিত ফ্রি ভিসার কর্মীরা। এই অবস্থা থেকে বাঁচতে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগী প্রবাসীরা।

মোস্তফা নামের এক প্রবাসী নিউজবাংলাকে বলেন, ‌‘ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ৪ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি এসেছি আজ ৯ মাস। কাজ নেই, খাবার নেই, টাকা নেই। এমনকি থাকার জায়গা পর্যন্ত নেই।’

ইস্রাফিল আলম নামের আরেক প্রবাসী বলেন, ‌‘আমাদের এ পর্যন্ত ১০টি ক্যাম্পে নেয়া হয়েছে। কোথাও কাজে নিচ্ছে না। আমরা এখানে খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে টিকে আছি। কবে কাজ পাবো তাও জানি না।’

সৌদি প্রবাসীদের বড় অংশ নিয়মিত দেশে টাকা পাঠান। যারা প্রতি মাসের বেতন হাতে পেয়ে বা অন্যান্য আয় থেকে নিজের খরচটা রেখে বাকি টাকা দেশে পাঠিয়ে দেন, তারাও পড়েছেন বিপাকে। হাতে টাকা না থাকায় তারা এখন নিজের খরচ চালাতেও হিমশিম খাচ্ছেন।

সৌদিতে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর কাজে যুক্ত খাইরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, কঠিন এই সময়ে প্রবাসীদের পাশে দাঁড়াতে হবে সরকারকেই। প্রবাসীদের সমস্যার সমাধান কাজে প্রমাণ করতে হবে। দেশে আটকেপড়াদের সুশৃংখলভাবে সৌদিতে ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি সৌদিতে থাকা বেকার বাংলাদেশিদের কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে।

এ প্রসঙ্গে শনিবার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ কাউন্সেলর মো. মেহেদী হাসানের সঙ্গে।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‌‘করোনা ও বিভিন্ন সেক্টরকে সৌদিকরণের ফলে অনেক বাংলাদেশি কর্মহীন হয়েছেন। যে সমস্ত বাংলাদেশি এখানে দীর্ঘদিন কাজ করে ফাইনাল এক্সিটে দেশে ফিরে যাচ্ছেন তারা যাতে তাদের সার্ভিস বেনিফিটসহ যাবতীয় পাওনা কোম্পানি থেকে নিয়ে যেতে পারেন সেজন্য দূতাবাসের শ্রম উইং কাজ করছে।’

মেহেদী হাসান বলেন, ‌‘কর্মহীনদের কাজের ব্যবস্থা করতে বিভিন্ন কোম্পানিতে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যারা বিভিন্ন কারণে এখানে আনডকুমেন্টেড হয়ে গেছেন, তারা যাতে কোনো ধরনের জেল-জরিমানা ছাড়া দেশে ফিরতে পারেন, সেজন্য সৌদি সরকারের বিশেষ প্রত্যাবাসন কর্মসূচির কাজ অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি জানান, বাংলাদেশে আটকেপড়াদের সৌদিতে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাস কাজ করে যাচ্ছে। করোনার সময়ে দূতাবাসের পক্ষ থেকে অভাবী প্রবাসীদের বাংলাদেশ সরকারের দেয়া খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।।

শেয়ার করুন