‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’

‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’

অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: নিউজবাংলা

‘যখন আমি চূড়ান্ত, তখনও জানি না যে গল্প কী, চরিত্র কেমন। যখন আমি স্ক্রিপ্টটা পেলাম, চরিত্রটা পড়লাম, আমি অনেকটা চমকে গিয়েছিলাম। কারণ, এমন চরিত্র আমি আশা করিনি। একদমই করিনি।’

আষাঢ় মাসের বৃষ্টি বৃষ্টি ভাবটা বেশ উপভোগ্য। সূর্যের তীব্রতা নেই, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা পরিবেশ সবখানে।

সেদিন বুধবার (১৬ জুন), গেন্ডারিয়ার একটি শুটিং লোকেশনে আমরা। বাড়িটিকে কেউ বলেন ‘দারোগা বাড়ি’, কেউ বলেন ‘আন্টির বাড়ি’। তিনতলা একটি বাসা। আমরা দাঁড়িয়েছিলাম দোতলার বারান্দায়।

বারান্দার সামনে একটা মাঠের মতো খোলা জায়গা। বৃষ্টির পানি জমে আছে, তবুও খেলছে বাচ্চারা। তার পরেই আবার চিকন পাকা রাস্তা। আর তার পরেই নদী। সেখানে বড় বড় জাহাজ ভেড়ানো। বারান্দা থেকে সব স্পষ্টই দেখা যায়।

রোদ নেই, গরম নেই, অনেক মানুষ ভিড় করেছে সেখানে। তবে আমরা এমন প্রকৃতি দেখতে যাইনি সেখানে। আমাদের উদ্দেশ্য অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণের সাক্ষাৎকার নেয়া। বিষয় মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত প্রথম ওয়েব সিরিজ লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান -এ কাজ করার গল্প শোনা। এতে সাবিলা চরিত্রে অভিনয় করেছেন হালের জনপ্রিয় এ অভিনেত্রী।

সন্ধ্যা ৬টা তখন, কিন্তু শুটিং স্পটে ছিলেন না ফারিণ। আউটডোরে গেছেন। ফিরলেন যখন তখন আর মিষ্টি আলো ছিল না। বলা যায়, আঁধার করেই ফিরলেন তিনি। আর ফিরেই শুরু করলেন কথা বলা।

যেভাবে যুক্ত হওয়া

ডিসেম্বরের কোনো এক শুক্রবার। আমি আমার ফ্যামিলির সঙ্গে ডিনার করতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ করে ফারুকী ভাইয়ের একজন সহকারী আমাকে ফোন করেন।

ফোনে আমাকে বিস্তারিত কিছু বলেননি। শুধু বললেন, ভালো একটা প্রজেক্ট আছে। তুমি আগ্রহী হলে ভাইয়া তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।

প্রাইমারি আলাপে ফারুকী ভাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমার বয়স তো কম। কিন্তু পর্দায় কি তোমাকে ২৫ থেকে ২৭ বছরের নারীর চরিত্রে দেখাতে পারব?

‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’
লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান ওয়েব সিরিজের দৃশ্যে তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: সংগৃহীত

তিনি আমার কাছে বিভিন্ন ধরনের ছবি চাইলেন। বিশেষ করে একটু ম্যাচিউর লুকের।

আমি পাঠালাম। তারপর ফারুকী ভাই বললেন যে, তোমাকে যদি বলি ওয়েট গেইন করতে, তুমি কি গেইন করতে পারবে?

আমি বললাম, হ্যাঁ, সমস্যা নাই। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, ওয়েট গেইন করতে কত দিন সময় লাগবে?

মজার বিষয় হলো, আমার ওয়েট বাড়াতে এবং ওয়েট কমাতে বেশি সময় লাগে না। আমি জানালাম যে, এক মাস সময় দিলেই আমি ওয়েট গেইন করতে পারব। মানে ৫-৬ কেজি বাড়িয়ে ফেলতে পারব।

এসব কথা হওয়ার পর এক মাস কোনো কথা নেই। এর মধ্যে আমি ওয়েট গেইন শুরু করে দিয়েছে।

আমি কিন্তু জানি না, এই কাজটা হবে কি না, হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না। তারপরও ওয়েট গেইনটা শুরু করে দিয়েছি। মনে করলাম, দেখি কী হয়।

‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’
অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: সংগৃহীত

এর আগে ফারুকী ভাইয়ের সঙ্গে একটি টিভিসি করেছিলাম। তখন আমি খুব শুকনা ছিলাম। সেখানে ফারুকী ভাই বলেছিলেন যে, তোমাকে নিয়ে একটা চরিত্র ভেবেছিলাম, কিন্তু তুমি যে শুকনা, এমন হলে হবে না।

তারপর আসলে তিশা আপুর প্রবল আগ্রহে ফারুকী ভাই আমার সঙ্গে কথা বলে। কারণ তিশা আপুর মনে হয়েছিল যে ক্যারেক্টারটা আমি করতে পারব।

জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে ফারুকী ভাই আমাকে বাসায় আসতে বলে কথা বলার জন্য। আমি তখন চট্টগ্রামে শুটিংয়ে ছিলাম। আমি সকালের ফ্লাইটে ঢাকা পৌঁছাই এবং দুপুরে ফারুকী ভাইয়ের বাসায় যাই।

আমাকে দেখে তিনি বলেন, ওয়াও, তোমাকে আগের চেয়ে অন্যরকম লাগছে।’ আমি ওয়েট গেইন করছি শুনে তিনি আরও ইমপ্রেসড হন এবং স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়।

পরদিন আমি আবার যাই। ওই দিন আমার খুব ছোট একটা অডিশন হয়। আমি জানি না তিনি কী খুঁজে পেলেন। আমাকে বললেন সময় ফাঁকা রাখতে; এক মাস পর জানাচ্ছি।

‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’
লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান ওয়েব সিরিজের দৃশ্যে তাসনিয়া ফারিণ ছবি: সংগৃহীত

এক মাস আমি এই ‘জানাচ্ছি’র মধ্যে ছিলাম। কী যে একটা অবস্থা। আমি প্রায়ই নক করতাম ফারুকী ভাইয়ের সহকারীদের।

এটা জানুয়ারির কথা বলছি। তার পরেই ফেব্রুয়ারি মাস। ভ্যালেন্টাইনের কাজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। প্রচুর কাজের অফার আসছে আমার কাছে। কিন্তু আমি টাইম দিতে পারছি না। এদিকে আমি নিশ্চিতও না যে, আমি ফারুকী ভাইয়ের কাজটি করছি কি না।

শেষের পাঁচ দিন আরও অনেক উদ্বিগ্নতায় কেটেছে। আমি যে চরিত্রে অভিনয় করেছি, সেই চরিত্রের নাম সাবিলা। চরিত্রটির জন্য দুজনকে সিলেক্ট করা হয়। যার মধ্যে আমি ও অন্যজন।

মনে আছে, আমি থাকছি কি না জানতে সকালে ফোন করতে বলেছিল। সকালে ফোন করলাম। বলে রাতে ফোন করতে। রাতে ফোন করলাম, কিন্তু তখনও বলছে না। পরে আমাকে জানাল যে, হ্যাঁ, তুমি থাকছ। অনেক সময় লেগেছে এই প্রজেক্টে ঢুকতে।

গল্প ও চরিত্র

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যখন আমি চূড়ান্ত, তখনও জানি না যে গল্প কী, চরিত্র কেমন। আমাকে শুধু দুই-একটা ধারণা দেয়া হয়েছিল। যেমন বলা হয়েছিল, বাবা থাকবে।

‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’
অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: সংগৃহীত

ফারুকী ভাই যখন আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তখন আমার ফ্যামিলি নিয়ে অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন।

যখন আমি স্ক্রিপ্টটা পেলাম, চরিত্রটা পড়লাম, আমি অনেকটা চমকে গিয়েছিলাম। কারণ, এমন চরিত্র আমি আশা করিনি। একদমই করিনি।

স্ক্রিপ্ট পড়ার পর ফারুকী ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য দুই-তিন দিন সময় নিয়েছিলাম। সাধারণত কি হয়, কোনো চরিত্র পড়ার সময় সেই চরিত্রে নিজেকে ভাবি। কিন্তু সাবিলা চরিত্রটি পড়ার সময় নিজেকে আর সেই চরিত্রে বসিয়ে এগোতে পাড়ছিলাম না। এটা আমি কীভাবে করব।

সাবিলা

আমার জীবন ও সাবিলার জীবন অনেকটা ট্রেন লাইনের মতো। অল্প কিছু বিষয় ছাড়া কখনোই মেলানো সম্ভব না। আমাকে নিজেকে সাবিলাতে কনভার্ট হতে হয়েছে। আমি একা পারতাম না। আমি খুব আপসেট হয়ে গিয়েছিলাম যে চরিত্রটা আমি করতে পারব না। ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবে। কিন্তু ভাইয়া পরে আমাকে বললেন যে, তুমি চিন্তা করো না, তুমি শুধু ক্যারেক্টারটাকে ফিল করো, বাকিটা আমি দেখছি।

ট্রেলার

সাবিলাকে যে হলুদ রঙের ফিতাটি গলায় ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়, সেটি তার অফিসের আইডি কার্ড। কিন্তু সেটা কী ধরনের অফিস সেটা বলার অনুমতি নেই।

‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’
লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান ওয়েব সিরিজের দৃশ্যে তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: সংগৃহীত

তবে ছোট ছোট করে যদি বলি যে, সাবিলা একজন শ্রমজীবী নারী। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তার বাবা আছে, স্বামী আছে। সে একটা অফিসে কাজ করে। তার কলিগরা তাকে নিয়ে কথা বলছে। ট্রেলারে এগুলো দেখানো হয়েছে।

আমি বলব সাবিলার মতো অনেক মেয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ঢাকায় হয়তো আরও বেশি রয়েছে। সাবিলা তাদেরই একজন।

লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান

লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান ওয়েব সিরিজের কঙ্কালটা তৈরি হয়েছে নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে। নারী-পুরুষের সম্পর্ক নানাভাবে এখানে দেখানো হয়েছে। অনেকগুলো দিকের মধ্যে বৈষম্য বা হ্যারেসমেন্ট একটা বিষয়। তবে অবশ্যই অন্য বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এই ওয়েব সিরিজে।

‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’
অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: সংগৃহীত

কাজের অভিজ্ঞতা

আমার কখনও মনে হয়নি আমি একজন খ্যাতিমান পরিচালকের সঙ্গে কাজ করছি। আমার মনে হয়েছে শিল্পী-পরিচালক-ইউনিটের মধ্যে একটা দারুণ সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, একটা চরিত্র অন্যভাবে অ্যাপ্রোচ করার উপায়টা আমি তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে জেনেছি। ফারুকী ভাই সব সময় গুরুত্ব দেন চরিত্র অনুযায়ী অভিনয়শিল্পীর ভেতরের পরিবর্তন।

ব্যক্তিজীবনে খুব সাদামাটা থাকতে পছন্দ করি আমি। ওয়েব সিরিজে যে চরিত্রটিতে অভিনয় করেছি সেটাও সাদামাটা। পরিচালকের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবন এ ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্যই করেছে বলা যায়।

প্রাপ্তি

আমি কাজটি করে আনন্দ পেয়েছি। কাজটি যে দেখবে, সে একবার হলেও গল্প ও আমার চরিত্র নিয়ে চিন্তা করবে; মনে করবে যেন এটা আমাদেরই গল্প। আমার সবচেয়ে বেশি পাওয়া হবে যদি দর্শকের মনে থেকে যায় কাজটি। তাই কে কী আলোচনা করল, কোথায় কী ফেম পেলাম সেটা আমার মধ্যে কাজ করে না।

‘মনে হয়েছিল ফারুকী ভাই আমাকে বাদ দিয়ে দেবেন’
লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলম্যান ওয়েব সিরিজের দৃশ্যে তাসনিয়া ফারিণ। ছবি: সংগৃহীত

সিনেমা

নাটক তো করছিই। ওয়েব সিরিজ যেমন হুট করে হলো, সিনেমাও তেমন হুট করে হয়ে যাবে। যদি সব ব্যাটে-বলে মিলে যায় তাহলে তো অবশ্যই সিনেমা করব।

আগামী

সিরিজের কারণে ভ্যালেন্টাইন ও রোজার ঈদে কাজ করা হয়নি। তারপর তো আবার লকডাউন। অনেক দিন কাজ করা হয়নি। এখন কোরবানি ঈদের জন্য কাজ করছি। একটু বেছেই কাজ করছি। কারণ, সিরিজের বিষয়টি মাথায় আছে। কেউ যেন এটা না বলতে পারে যে, ওকে তো সিরিজে দেখলাম কিন্তু এখন এটা কী সস্তা ধরনের নাটক করছে। সেই প্রেসারটা একটু আছে। তার জন্য অভিনয়ে আরও নজর দিচ্ছি।

আমি নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। যেখানে অভিনয়ের সুযোগ আছে, সেখানেই আমি আছি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য