নিজেদের হাতে গড়া চতুর্থ প্রজন্মের তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংককে ধ্বংস করতে বিভিন্ন ধরনের ছক কষেছিলেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান (ম খা) আলমগীর ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর মাত্র দুই বছরের মধ্যেই ব্যাংকটি লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নিয়েছেন ব্যাংকটির তৎকালীন ইসি কমিটির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক ওরফে বাবুল চিশতী। তিনি তার অসাধু উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ব্যাংকটির রাজধানীকেন্দ্রিক সব শাখার বড় গ্রাহকদের ব্যবহার করেছেন।
ম খা আলমগীর ও বাবুল চিশতী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে মূল্যায়ন না করে শুধু মতিঝিল শাখা থেকেই প্রথম দুই বছরে ১১৬ কোটি টাকার বেশি অনিয়ম করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৫ সালের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী প্রথম দুই বছরে মতিঝিল শাখায় যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে তার বেশিরভাগই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দেয়া হয়েছে। ঋণ অনুমোদনের আগেই বিতরণ করা হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ অধিগ্রহণ ও মার্জিন ঋণ প্রদান করা হলেও যথাযথ জামানত বা ঝুঁকি বহনের সক্ষমতা বিবেচনা না করেই দেয়া হয়েছে অনেক বড় অংকের ঋণ।
ঋণ অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে দায়-দেনার বিবরণী সংগ্রহ করার আগেই ঋণ বিতরণ এবং অনুমোদনের থেকে অনেক বেশি বিতরণের অভিযোগও রয়েছে। এক খাতের ঋণ ভিন্ন খাতে দেখিয়ে তা সরিয়ে নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। যে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেয়া হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যক্তির আবেদনেও দেয়া হয়েছে বড় অংকের ঋণ। এছাড়া যৌক্তিক বিচার-বিশ্লেষণ না করেই ঝঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ করে নেয়া হয়েছে সুবিধা।
২০১৪ সালের ২০ মে পান্ডুঘর লিমিটেড নামের এক কোম্পানির নামে ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ১৫ কোটি টাকার একটি ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ কোটি টাকা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মেয়াদি ঋণ অধিগ্রহণের জন্য এবং ২ কোটি টাকা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন সংস্থানের জন্য ওভার ড্রাফটের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে অনুমোদনের আগে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়নি, যা বিধিবহির্ভূত। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে পান্ডুঘর লিমিটেড নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আদ-দ্বীন হাসপাতল লিমিটেডের নামে একটি চলতি হিসাব খোলা হয়। কিন্তু হিসাবটি খোলার আগেই হাসপাতালের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। কিন্তু সেই প্রকল্পের জন্যই যন্ত্রপাতি ক্রয় বাবদ ২০ কোটি টাকার মেয়াদি ঋণের আবেদন জানানো হয়। পরবর্তী মাসের ৫ তারিখে ৫ বছর মেয়াদে এ ঋণ অনুমোদনও করা হয়। কিন্তু এ ঋণের অর্থ উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন কোম্পানিটির সহযোগী দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলারের নির্দেশনার লঙ্ঘন।
ইস্ট-ওয়েস্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইস্ট-ওয়েস্ট ফ্যাশন গার্মেন্ট লিমিটেডের নামে ২০১৪ সালের ১৮ মে ছয় বছর মেয়াদি ৬ কোটি টাকার একটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে দুটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কোম্পানিটির অপর দুই প্রতিষ্ঠানের নামে নেয়া ২৩ কোটি টাকাসহ সহযোগী ৫ প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬০ কোটি টাকা ঋণ আবেদন করে ইস্ট-ওয়েস্ট ফ্যাশন গার্মেন্টস। এর বিপরীতে কোম্পানিটিকে পূর্বের অনুমোদিত ৬ কোটিসহ মোট ৪০ কোটি টাকা ঋণ সুবিদা প্রদান করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির ঋণ-ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই অধিগ্রহণের নামে গ্রাহককে অতিরিক্ত ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে, যা বিআরপিডির নির্দেশনার লঙ্ঘন।
প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজে ২০১৪ সালের ১৮ জুন ৫ কোটি টাকার একটি ওভার ড্রাফট (ওডি) অনুমোদন করা হয়েছে। এ ঋণের মেমোতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অনুমোদন রয়েছে। আর নির্বাহী কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত মর্মে কমিটির চেয়ারম্যানের সিল ও স্বাক্ষর থাকলেও অনুমোদনের তারিখ উল্লেখ নেই। অর্থাত মেমোটি নির্বাহী কমিটির সভায় উপস্থাপন না করেই কমিটির চেয়ারম্যান বাবুল চিশতী বিধিবহির্ভূতভাবে অনুমোদন করেছেন। এছাড়া প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজের এই ঋণ মূলত মার্জিন ঋণের অর্থ সংস্থানের জন্য নেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে এ ধরনের ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তার বিপরীতে জামানত রাখা হয়নি।
এর বাইরে চিটাগাং ফ্যাশন টেকনোলজি লিমিটেডকে ২০১৪ সালের ১৮ মে ৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে লিজ ফাইন্যান্স ঋণ হিসেবে অনুমোদিত ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার মধ্যে ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ছাড়পূর্বক কোম্পানির চলতি হিসাবে স্থানান্তর করে নগদ উত্তোলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট টাকা সঞ্চয়ী হিসাবে স্থানান্তর করা হয়।
এছাড়া সিয়াম এন্টারপ্রাইজকে ২০১৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ৪ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দেয়ার অনুমোদন করা হয়। কিন্তু নির্বাহী কমিটির সভায় এ ঋণের এলটিআর সীমা এলসির ভেতরে না রেখে আরও ২ কোটি ৫৫ লাখসহ মোট ৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা নিয়মবর্হিভূতভাবে ঋণ প্রদান করা হয়। এর বাইরে ৬ মাস মেয়াদি ঋণের অনুমোদন করে কোম্পানিটিকে তা অন্যত্র সরিয়ে নিতে সুবিধা দেয়া হয়।
২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এইচ এম এন্টারপ্রাইজের ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু এ অর্থ ছাড় হওয়ার পর তা কোম্পানিটির দুটি ঋণ হিসাবে সমন্বয় করা হয়েছে, যা বিআরপিডির নির্দেশনার লঙ্ঘন। পরবর্তীতে কোন প্রকার যৌক্তিক বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া কোম্পানির ঋণসীমা একাধিক বার বর্ধিতকরণ এবং আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়।
শুভ্র এন্টারপ্রাইজ ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহে ২০১৪ সালে প্রথম দফায় ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে কোম্পানিটির নামে যে ব্যক্তি আবেদন করেছেন তার সঙ্গে কোম্পানির কোনো প্রকার সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও ঋণ দেয়া হয়েছে। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডির নির্দেশনার লঙ্ঘন।
এছাড়া কোম্পানির ঋণ নির্ধারিত সময়ে সমন্বয় না করা সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে বাড়তি সুবিধা দিয়ে আরও ২ কোটি টাকা মেয়াদি ঋণ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান বাবুল চিশতীর সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল।
এছাড়াও এন আর ট্রেডিংয়ের নামে ২০১৪ সালে ২৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকার ওভার ড্রাফট অনুমোদন হলেও ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়েছে ১১ গুণ বেশি। অর্থাৎ ৩ কোটি ২০ লাখ টাকার ঋণ সুবিধা অনুমোদন করা হয়েছে কোম্পানিটিকে, যা বিআরপিডির নির্দেশনার লঙ্ঘন।
আরও পড়ুন:বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হলো।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আজ এই মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
এরপর আবু সাঈদকে গুলি করার দুটি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করা হয়। এ সময় ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন মনিটরে ছেলেকে গুলির দৃশ্যের ভিডিও দেখে বার বার চোখ মুছছিলেন।
এরপর প্রসিকিউসনের আবেদনে আগামীকাল এই মামলায় প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
গত ৩০ জুলাই প্রসিকিউসনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এই মামলায় অভিযোগ গঠনের প্রার্থনা করেন।
অন্যদিকে, আসামী পক্ষে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চাওয়া হয়।
এরপর গত ৬ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য ২৭ আগস্ট দিন ধার্য করেন।
এই মামলার যে ৩০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনা হয়, তাদের মধ্যে গ্রেফতার ৬ জন আজ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন।
এরা হলেন-বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক সাবেক কর্মচারী মো. আনোয়ার পারভেজ, পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ।
আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৩০ জুন ৩০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন যখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন ১৬ জুলাই দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে গুলিবিদ্ধ হন আবু সাঈদ।
২৫ বছর বয়সী আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নিরস্ত্র আবু সাঈদের পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়লে, সারা দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদেই সোচ্চার হন বহু মানুষ, যাতে আরও গতিশীল হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন।
ওই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলে আওয়ামী লীগ সরকার, তার দলীয় ক্যাডার ও সরকারের অনুগত প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত করে বলে, একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে।
জাজ্জ্বল্যমান এসব অপরাধের বিচার এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
ঢাকাসহ ১৯ জেলায় ৪১ জন জেলা জজসহ একযোগে জেলা আদালতের ২৩০ বিচারককে বদলি করা হয়েছে। বদলি করা এসব বিচারকের মধ্যে রয়েছেন ৫৩ জন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, ৪০ জন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এবং ৯৬ জন সিনিয়র সহকারী জজ ও সহকারী জজ পর্যায়ের কর্মকর্তা।
গতকাল সোমবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে পৃথক চারটি প্রজ্ঞাপনে তাদের বদলির আদেশ দেয়।
বদলি করা জেলা ও দায়রা জজদের আগামী ২৮ আগস্টের মধ্যে বর্তমান পদের দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে।
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার দ্বিতীয়তলার নারী ব্যারাকে ঢুকে নারী পুলিশ সদস্যকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা একই থানায় কর্মরত সাফিউর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ২১ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আমলে নেয় বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৫ দিন ধরে ঘুরে মামলা দায়ের করতে না পারা ভুক্তভোগীকে পুলিশ লাইন্স থেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় নিয়ে তাকে বাদী করে ধর্ষণ মামলা রুজু করানো হয়েছে। আর ওই মামলাতেই সাফিউরকে আটক দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষা করানোর জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোহাম্মদ আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের অভিযোগের যাচাই-বাছাই শেষে অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবল সাফিউরের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী পুলিশ সদস্য নিজে বাদী হয়ে শুক্রবার মামলাটি দায়ের করেন। ওই মামলাতেই গত শুক্রবার রাতে সাফিউরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার সকালে তাকে আদালতে চালান করা হয়। বিষয়টি আরও গভীরভাবে জানতে অভিযুক্ত পুলিশ কনস্টেবল সাফিউরের বিরুদ্ধে আদালতের কাছে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পুরো বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার দ্বিতীয়তলার নারী ব্যারাকে ঢুকে এক নারী পুলিশ সদস্যকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে একই থানায় কর্মরত সাফিউর রহমান নামে আরেক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে গত ৬ মাস ধরে থানা ব্যারাকেই ওই নারী সদস্যকে ধর্ষণ করে ওই পুলিশ সদস্য। সবশেষ গত ১৫ আগস্ট রাত আড়াইটার দিকেও সাফিউর থানা ব্যারাকের ওই নারীর রুমে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করে। এর প্রতিকার চেয়ে গত ৫ দিন ধরে ঘুরেও থানায় মামলা করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান ভুক্তভোগী নারী পুলিশ সদস্য। বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।
দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বিচার ব্যবস্থার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি পৃথক বাণিজ্যিক আদালত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
গতকাল রোববার সিলেটের দ্য গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে বাণিজ্যিক আদালত শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ প্রস্তাব দেন।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ইউএনডিপির যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কোনো পৃথক বিচারিক ফোরাম নেই। এখন কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যিক বিরোধগুলো ছোটখাটো দেওয়ানি মামলার সঙ্গে একই সারিতে নিষ্পত্তি করতে হওয়ায় দ্রুত, কার্যকর বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এটি আমাদের বিচারকদের প্রতি কোনো সমালোচনা নয়। তাদের নিষ্ঠা প্রশ্নাতীত। বরং এটি একটি কাঠামোগত অসংগতি। ফলে মামলার জট যেমন বাড়ছে, তেমনি ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও বিনিয়োগ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত শুধু অর্থঋণ আদালতে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি মামলা অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
পৃথক বাণিজ্যিক আদালত প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি কারও একক কোনো দাবি নয় বরং বাণিজ্যিক মামলাগুলো বিশেষায়িত আদালতে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও কার্যকর রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ার জন্য বৃহৎ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী সবাই দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এই দাবি জানিয়ে আসছে।
প্রধান বিচারপতি বৈশ্বিক উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, রুয়ান্ডা, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বাণিজ্যিক আদালত গড়ে তুলে একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, এসব দেশের অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা বহন করে।
প্রধান বিচারপতি প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক আদালত ব্যবস্থার সাতটি মূল স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো- স্পষ্ট ও একীভূত এখতিয়ার নির্ধারণ, আর্থিক সীমারেখা ও স্তরভিত্তিক কাঠামো, বাধ্যতামূলক কেস ম্যানেজমেন্ট ও কঠোর সময়সীমা, সমন্বিত মধ্যস্থতা ব্যবস্থা, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার (যেমন, ই-ফাইলিং, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, হাইব্রিড শুনানি), সবার জন্য ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার এবং জবাবদিহি ও কর্মক্ষমতা পর্যবেক্ষণ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাণিজ্যিক আদালতের কার্যক্রম হবে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সেমিনারে সূচনা বক্তব্য দেন সিলেটের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি জাফর আহমেদের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফান লিলার।
বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল আবার পেছানো হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মিনহাজুর রহমানের আদালত গতকাল সোমবার আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর নতুন দিন ধার্য করেন।
এ পর্যন্ত এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা মোট ১২০ বার পিছিয়ে এসেছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি নির্মমভাবে খুন হন। ঘটনার সময় বাসায় তাদের সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ উপস্থিত ছিলেন। সাগর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা এবং রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রুনির ভাই নওশের আলম শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। মামলার প্রধান আসামিরা হলেন — রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুন, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাড়ির দুই নিরাপত্তা রক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের ‘বন্ধু’ তানভীর রহমান খান।
এদের মধ্যে তানভীর ও পলাশ জামিনে রয়েছেন, বাকিরা বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদন বারবার পিছিয়ে আসায় এ মামলার দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের মাঝে উদ্বেগ বিরাজ করছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় পুলিশের সদস্যসহ ৩০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের শুনানি আজ।
সোমবার (২৮ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এই শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ আজ এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি করবেন বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে, শুক্রবার (২৫ জুলাই) কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এই ছয় আসামি হলেন— সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, রাফিউল, আনোয়ার পারভেজ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা ইমরান চৌধুরী আশেক।
গত ১০ জুলাই পলাতক ২৬ আসামিকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত।
এর আগে, ৩০ জুন আবু সাঈদ হত্যায় পুলিশের সদস্যসহ মোট ৩০ জনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
আবু সাঈদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের সময় ১৬ জুলাই বিকালে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। আবু সাঈদ ছিলেন জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত প্রথম শিক্ষার্থী।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ধানমণ্ডির বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ রবিউল হোসেন ভূঁইয়া তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে কোন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা।
তিনি জানান, তথ্য এলে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।
দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১০ সালে খায়রুল হক শপথ নেন। পরের বছর ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
২০১৩ সালে তাকে তিন বছরের জন্য আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই মেয়াদ শেষে কয়েক দফা একই পদে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয় সাবেক এই বিচারপতিকে।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে ১৩ আগস্ট তিনি আইন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছিল না।
মন্তব্য