কারখানা নিরাপদ না হলে পণ্য বিক্রি বন্ধ: সালমান এফ রহমান

কারখানা নিরাপদ না হলে পণ্য বিক্রি বন্ধ: সালমান এফ রহমান

সালমান এফ রহমান বলেন, ‘বড় সমস্যা স্থানীয় বাজারের জন্য যারা পণ্য উৎপাদন করেন তাদের। সবশেষ সেজান জুস কারখানায় আগুনের ঘটনা তার প্রমাণ। সব আন্তর্জাতিক পত্রিকায় এটি শিরোনাম হয়েছে, যা আমাদের জন্য নেতিবাচক।

কোনো শিল্প কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ (কমপ্লায়েন্স) না থাকলে দেশের বাজারে তাদের পণ্য বিক্রি বন্ধ করে দেয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।

তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পের অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের মতো দেশেই বিশেষ তদারকি প্রতিষ্ঠান গঠন করে সব কারখানাকে কমপ্লায়েন্স করা হবে। কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে কারখানাগুলোকে সরকার দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করবে। ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।’

চামড়া শিল্প নিয়ে মঙ্গলবার এক অনলাইন আলোচনায় এ কথা বলেন তিনি।

‘রিভাইভিং দ্য লেদার সেক্টর ইন দ্য আফটারম্যাথ অফ কোভিড-১৯’ শিরোনামে আলোচনা সভাটি আয়োজন করে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ), দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্ট্রিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড)।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সালমান এফ রহমান বলেন, ‘আমাদের দেশের শিল্প কারখানার বড় সমস্যা কমপ্লায়েন্স। তাজরীন ফ্যাশন ও রানা প্লাজার ঘটনার পর বিদেশি ক্রেতাদের চাপে তৈরি পোশাক শিল্পে কমপ্লায়েন্স হয়েছে। ব্র্যান্ডগুলোও স্বীকার করছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স।’

‘তবে বড় সমস্যা স্থানীয় বাজারের জন্য যারা পণ্য উৎপাদন করেন তাদের। সবশেষ সেজান জুস কারখানায় আগুনের ঘটনা তার প্রমাণ। সব আন্তর্জাতিক পত্রিকায় এটি শিরোনাম হয়েছে, যা আমাদের জন্য নেতিবাচক।

‘এখন প্রশ্ন হলো, স্থানীয় শিল্প কারখানাকে কীভাবে কমপ্লায়েন্স করবো? আমি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের মতো কিছু একটা করতে হবে। কমপ্লায়েন্স করার জন্য কারখানাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে হবে। সরকার সেক্ষেত্রে কারখানাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করবে। ঋণের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব স্থানীয় শিল্প-কারখানার কমপ্লায়েন্স থাকবে না তাদের পণ্য বাজারে বিক্রি বন্ধ করে দেয়া হবে।’

গার্মেন্টসের মতোই সব খাতে সুবিধা দেয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘গার্মেন্টস যে সুবিধা পায় তা পেলে অন্য খাতও ভালো করবে এটা আমরা সবাই বুঝি। এ বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রীও একমত। এটার ওপর আমরা শতভাগ সমর্থন দিয়ে কাজ করছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বলব, তা নিয়ে যেন কাজ করা হয়।’

ইআরএফ সভাপতি শারমীন রিনভীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশের (পিআরআই) গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ আব্দুর রাজ্জাক ও র‌্যাপিড এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউছুফ।

আব্দুর রাজ্জাক তার প্রবন্ধে বলেন, ‘করোনায় এই সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ১০ শতাংশ কমলেও চামড়াজাত পণ্যের বাণিজ্য কমেছে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ চামড়াজাত পণ্য খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। অন্যদিকে, বৈশ্বিকভাবেই নন লেদার পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি কাঁচামালের দামও বাড়ছে। ফলে চামড়া শিল্পের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।’

এসব চ্যালেঞ্জের কারণে চীন থেকে বড় বড় ব্র্যান্ডের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা দারুণ বলেও মনে করছেন আব্দুর রাজ্জাক। এর জন্য ট্যানারি শিল্পনগরীকে উপযুক্তভাবে গড়ে তোলা ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।

আবু ইউছুফ বলেন, ‘চামড়াজাত পণ্যের তিনটি আইটেমে (লেদার, লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার) গত বছর প্রবৃদ্ধি ছিল। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। এর জন্য সব স্তরে কমপ্লায়েন্স হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি।’

পশু পালন, পশু জবাই, কাঁচা চামড়া প্রস্তুতকরণ ও ট্যানারি কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

আরেক প্রবন্ধে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘গত বছর চামড়াজাত পণ্যে ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১৯ সালের তুলনায় এটি ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কম। তবে বৈশ্বিক বাজারে বিপুল চাহিদা রয়েছে। বিশ্বে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ডলারের জুতা বিক্রি হয়। ব্র্যান্ডগুলো এখনও টেকসই লেদার চায়। তবে লজিস্টিক ও শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি আমাদের চামড়া শিল্পের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।’

শিল্প ব্যবস্থাপনা যথাযথ হলে চামড়া শিল্পের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোরবানির সময়ে চামড়া ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো করতে হবে। দেশের কারখানাগুলোকে এলডব্লিউজি সনদ পাইয়ে দিতে একটি রোডম্যাপ তৈরির পরামর্শও দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির পরিচালক ড. মিজানুর রহমান, ডিটিআইইডব্লিউটিপিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম জাহিদ হাসান ও ট্যানারি ওয়ার্কাস ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জিনাত আরা বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘আমাদের অনেক কাঁচামাল থাকার পরও চামড়া শিল্প পিছিয়ে থাকার কারণটি বের করতে হবে। তৈরি পোশাকের মতো এ শিল্পের ক্ষেত্রেও সমান সুযোগ দিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।’

রপ্তানির ক্ষেত্রে এলডিসি পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের চুক্তি রয়েছে। ওষুধ শিল্পসহ কয়েকটি খাতে বিদ্যমান সুবিধা ২০২৬ সালের পরও যেনো অব্যাহত থাকে সে আলোচনা চলছে।’

আরও পড়ুন:
ওয়াল্ট ডিজনি রপ্তানি ‘বাড়াবে’ এক বিলিয়ন ডলার
গার্মেন্টস খোলা রাখতে মালিকদের চার যুক্তি
কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে পোশাক কারখানা চালু
সরকার বললে পোশাক কারখানা বন্ধ রাখবেন মালিকরা
বিশ্বের শীর্ষ ১০০ সবুজ কারখানার ৩৯টি বাংলাদেশে

শেয়ার করুন

মন্তব্য