পোশাক খাতে প্রণোদনা: টাকা ফেরতে আরও সময় দাবি

পোশাক খাতে প্রণোদনা: টাকা ফেরতে আরও সময় দাবি

একটি পোশাক কারখানার চিত্র

বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সত্যিই আমরা কঠিন সময় পার করছি। সব মালিক অর্থ সংকটে আছেন। অনেক বায়ার ঠিকমতো টাকা দিচ্ছে না। অনেকে পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। সে কারণেই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই আমরা সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছি।’

করোনাভাইরাস মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের অজুহাত দেখিয়ে সরকারের কাছ নতুন দাবি করেছেন পোশাক শিল্পমালিকরা। মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ২০ হাজার কোটি টাকার যে ঋণ নিয়েছেন আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই টাকা ফেরত দিতে চান না তারা।

মহামারির মধ্যে রপ্তানিমুখী পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান চলমান রাখতে এই সুবিধা চেয়েছেন তারা।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন- বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান ও বিকেএমইএর সভাপতি এ কে এম সেলিম ওসমান রোববার এ–সংক্রান্ত একটি আবেদন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে দিয়েছেন। মহামারিকালে রপ্তানি আয়ের ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে এই সুবিধা চেয়েছেন তারা।

অর্থমন্ত্রীকে দেয়া চিঠিতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ সভাপতি বলেছেন, করোনার কারণে তৈরি পোশাকের রপ্তানিকারকেরা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিদেশি ক্রেতারা একদিকে ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে রপ্তানি হওয়া পণ্যের মূল্য পরিশোধে দীর্ঘ সময় নিচ্ছে। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও উদ্যোক্তারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। কর্মসংস্থান ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সত্যিই আমরা কঠিন সময় পার করছি। সব মালিক অর্থ সংকটে আছেন। অনেক বায়ার ঠিকমতো টাকা দিচ্ছে না। অনেকে পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। সে কারণেই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই আমরা সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে রপ্তানি পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় আমরা সুবিধাটি বাড়ানোর প্রস্তাব করেছি। আশা করছি, আগামী অক্টোবর থেকে রপ্তানি পরিস্থিতি ভালো হবে। তখন আর কিস্তি দিতে সমস্যা হবে না।’

চিঠিতে যে কথা বলা হয়েছে

অর্থমন্ত্রীকে দেয়া চিঠিতে বলা হয়, ‘সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকশিল্পের প্রধান কাঁচামাল সুতা ও কাপড়ের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এই অবস্থায় পোশাকের মূল্য নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে দর–কষাকষি করে ক্রয়াদেশ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা টিকে থাকার জন্য লোকসান দিয়েও ক্রয়াদেশ নিচ্ছেন। এসব কারণে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তারল্যসংকট বাড়ছে।

‘এমন অবস্থায় শ্রমিকের মজুরি দেওয়াসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনায় উদ্বেগের মধ্যে আছেন উদ্যোক্তারা। এদিকে আগামী মাসেই পবিত্র ঈদুল আজহা। তার আগেই শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসা পর্যন্ত ঋণের বিপরীতে কিস্তির টাকা সময়মতো পরিশোধ করা উদ্যোক্তাদের পক্ষে কঠিন।’

এসব কারণ দেখিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো ঋণ শ্রেণিকরণ না করা এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে পুনঃ তফসিল করার সুযোগ চেয়েছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।

২০২০ সালে করোনা সংক্রমণের ঋণ সুবিধা

করোনার কারণে গত বছরের মার্চে একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিতাদেশ আসতে থাকে। তখন পোশাকশিল্পের মালিকেরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লে সরকার রপ্তানিমুখী শ্রমিকদের এপ্রিল, মে ও জুন—তিন মাসের মজুরি দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে।

ওই ঋণের বিপরীতে সেবা মাশুল ছিল ২ শতাংশ। পরে পোশাকশিল্পের মালিকেরা আরও এক মাসের মজুরি দেয়ার জন্য ঋণ দেওয়ার দাবি করেন। সরকারও মেনে নেয়।

তখন তহবিলের আকার বেড়ে ৯ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা দাঁড়ায়। তবে চতুর্থ মাসের বেতনের জন্য ঋণের ক্ষেত্রে মালিকদের সুদ দিতে হবে সাড়ে ৪ শতাংশ। বাকি সাড়ে ৪ শতাংশ ভর্তুকি দেবে সরকার।

চলতি বছর ঈদুল ফিতরের আগেও শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন-ভাতা দিতে ঋণ দিতে সরকারের কাছে আবেদন করেছিল বস্ত্র খাতের তিন সংগঠন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ। কিন্তু সরকার তাতে সাড়া দেয়নি।

রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য প্যাকেজটি ঘোষিত হলেও তহবিল থেকে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১ হাজার ৮০০ কারখানা মালিক ঋণ নিয়েছেন। এই ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ছিল ছয় মাস। পরে ১৮ মাসের কিস্তিতে সেই ঋণ পরিশোধের শর্ত ছিল। তবে গত বছরের শেষ দিকে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ প্রণোদনার ঋণের গ্রেস পিরিয়ডের সময় বাড়ানোর দাবি জানায়। সরকারও তা মেনে নেয়।

অর্থ মন্ত্রণালয় গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে প্রণোদনা তহবিল থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধে ১ মার্চ থেকে বাড়তি ছয় মাস সময় দেয়ার নির্দেশনা দেয়। তার ফলে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ঋণের কিস্তি দিতে হবে মালিকদের।

করেনা সংকট কাটিয়ে উঠতে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এরমধ্যে বড় উদ্যোক্তাদের জন্য ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকার তহবিল। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক; ২০ হাজার কোটি টাকা (শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ) নিয়েছেন পোশাক শিল্পমালিকরা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, ৩০ জুন শেষ হতে যাওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) সার্বিক পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ১ শতাংশ।

আরও পড়ুন:
১৪ মাস পর বোধোদয় বাংলাদেশ ব্যাংকের
প্রণোদনার ঋণ দুই নয়, পাঁচ বছরে দিতে চায় বিজিএমইএ
যতদিন প্রয়োজন ততদিন প্রণোদনা
করোনা: প্রণোদনা প্যাকেজের ৮৩ শতাংশ বাস্তবায়িত
প্রণোদনা তালিকায় নাম তুলতে টাকা আদায়

শেয়ার করুন

মন্তব্য