করোনায় বাড়ছে এজেন্ট ব্যাংকিং

করোনায় বাড়ছে এজেন্ট ব্যাংকিং

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মার্চ মাসে দেশে গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১ কোটি ১০ লাখ ২২ হাজার ৬৪৬ জন। অথচ এক বছর আগে এ সংখ্যাটি ছিল ৬৪ লাখ ৯৭ হাজার ৪৫২। অর্থাৎ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ১২ মাসে হিসাব বেড়েছে ৬৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে সীমিত হয়েছে ব্যাংকিং সেবা। লেনদেনের ক্ষেত্রেও এসেছে নিয়ন্ত্রণ। তবে আপৎকালীন সময়ে বন্ধ ছিল না এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম।

এ সময়ে বেড়েছে লেনদেন, পরিসর। প্রবাসী আয়, হিসাব খোলা, আমানত ও ঋণ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক অবস্থায় এই সেবা কার্যক্রম।

এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ে করা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ইতিবাচক নানান তথ্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ব্যাংকের শাখা নেই সেখানে মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। টাকা জমা, তোলা, স্থানান্তর, পরিষেবা বিল পরিশোধ ও প্রবাসী আয় তুলতে প্রত্যন্ত এলাকায় এখন এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দাপট। বাড়ছে এজেন্ট, আউটলেট ও গ্রাহকসংখ্যা। করোনাকালে বেড়েছে এই সেবায় নির্ভরতা।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরফান আলী বলেন, ‘করোনায় সীমিত পরিসরে ব্যাংকিং কাজ চলছে। এ সময় এজেন্টরা বড় ভূমিকা রাখছে।

‘গ্রামগঞ্জের অনেক গ্রাহক এই সময়ে ব্যাংক শাখায় আসতে চাননি। আর প্রতিদিন ব্যাংকের শাখাও খোলা নেই। এ জন্য সেবা পেতে এজেন্ট ব্যাংকিং হয়ে উঠেছে অনেকের ভরসা।’

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নারীদের আগ্রহের বিষয়ে তিনি বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বেশির ভাগ কার্যক্রমই গ্রামে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে ব্যাংকের শাখা নেই সেখানে এ সেবা চালু করা হচ্ছে। ফলে এ সেবার সঙ্গে গ্রামীণ নারীরা যুক্ত হচ্ছেন। ব্যাংকগুলোতে নারী গ্রাহকের হিসাব ৩০-৩৫ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিং সংখ্যা ও আউটলেট

বর্তমানে ২৭টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকগুলোর এজেন্ট সংখ্যা বর্তমানে ১২ হাজার ৩৪৫ জন এবং এজেন্ট আউটলেট সংখ্যা ১৬ হাজার ৪২১টি।

মার্চ পর্যন্ত দেশে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকসংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখ ২২ হাজার ৬৪৬ জন। গেল বছরের মার্চে এটি ছিল ৬৪ লাখ ৯৭ হাজার ৪৫২ জন। অর্থাৎ এক বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাব বেড়েছে ৬৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

এ সময়ে নারীদের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হিসাব খোলা বেড়েছে ৭১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খোলা বেড়েছে ৭১ দশমিক ১৯ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় হিসাব খোলার শীর্ষ ৫ ব্যাংকেই রয়েছে ৯০ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যাংক এশিয়ায় ৩৬ শতাংশ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে ৩৩ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংকে ১৪ শতাংশ, আল-আরাফাহ ব্যাংকে ৩ শতাংশ এবং অগ্রণী ব্যাংকে ২ শতাংশ হিসাব খোলা হয়েছে।

করোনায় বাড়ছে এজেন্ট ব্যাংকিং

আউটলেট খোলার দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক। এজেন্ট আউটলেটের ২৭ শতাংশই এই ব্যাংকটির। এর পরই রয়েছে ব্যাংক এশিয়ার ২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত

চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর আমানত স্থিতি দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। গত বছর মার্চে এটি ছিল ৮ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ১০৮ দশমিক ৮১ শতাংশ।

আমানতের ৭৫ দশমিক ০৫ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে। আর এ আমানতে নারীদের অংশ ৩৫ দশমিক ২৪ শতাংশ।

আমানত সংগ্রহের দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের ৩২ শতাংশই এই ব্যাংকটির হাতে। এরপরেই ডাচ্‌-বাংলা ও ব্যাংক এশিয়া ১৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও অগ্রণী ব্যাংক ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

ঋণ বিতরণ

করোনা মহামারির মধ্যেও এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতায় ঋণ বিতরণ বাড়িয়েছে ব্যাংকগুলো। চলতি বছরের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো।

এ ছাড়া গত বছরের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ বেড়েছে ২৭১ শতাংশ। ২০২০ সালের মার্চ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতায় ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে ব্যাংকগুলো।

তবে এই সেবার সঙ্গে যুক্ত ২৭টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ৯টি চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে। বাকি ১৮টি ব্যাংক এক টাকাও ঋণ বিতরণ করেনি।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এই ব্যাংকটি একাই ১ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ।

করোনায় বাড়ছে এজেন্ট ব্যাংকিং

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্যাংক এশিয়া বিতরণ করেছে ২২ শতাংশ ঋণ। এই ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৫৫১ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংক বিতরণ করেছে ১২ শতাংশ ঋণ। বিতরণ করা ঋণের স্থিতি ৩০৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৪৬ কোটি টাকা, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১২ কোটি টাকা, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক ১১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংক ৬ কোটি টাকা, এনআরবি ব্যাংক ১ কোটি টাকা ও মধুমতি ব্যাংক ১০ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করেছে।

রেমিট্যান্স

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এ সময়ে ব্যাংকগুলোতে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৮ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার। এই রেমিট্যান্সের ৯১ দশমিক ৫২ শতাংশই গ্রহণ করেছেন গ্রামের মানুষ।

সবচেয়ে বেশি ৫৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। এ ছাড়া ডাচ্‌-বাংলার মাধ্যমে ২৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ, আল-আরাফাহ্‌ ইসলামীর মাধ্যমে ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ রেমিট্যান্স এসেছে।

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ব্রাজিলে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। আর বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয় ২০১৪ সালে।

ওই বছরের জানুয়ারিতে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। তারা পাইলট কার্যক্রম শুরু করে মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায়।

আরও পড়ুন:
মোবাইল ব্যাংকিং ও ই-ওয়ালেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নীতিমালা
মোবাইল ব্যাংকিং: লকডাউনে বাড়ল সেন্ডমানির সীমা

শেয়ার করুন

মন্তব্য