জীবন পাচ্ছে রিং সাইন, উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি

জীবন পাচ্ছে রিং সাইন, উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্তুতি

শিগগিরই কোম্পানিটি আবার উৎপাদনে যাবে। যে উদ্দেশ্যে কোম্পানিটিকে আইপিও মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে তারা। আমরা আশাবাদী নতুন বোর্ড কোম্পানিটিকে আবার আগের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে: বিএসইসি কমিশনার শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদকে সরিয়ে নতুন পর্ষদ গঠনের সুফল পেতে যাচ্ছে রিং সাইন টেক্সটাইলস লিমিটেড। প্রায় পৌনে এক বছর ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা কোম্পানিটিকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে।

গত বছরের শেষদিকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে দেনায় ডুবে যাওয়া কোম্পানিটিকে টেনে তুলতে গত ২৭ জানুয়ারি পর্ষদ ভেঙে দিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয় কোম্পানির বাইরের কয়েকজনকে।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া মোট ছয়টি কোম্পানিকে নতুন জীবন দিতে এই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। আর প্রথম কোম্পানি হিসেবেই সফল হতে যাচ্ছে রিং শাইন।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার দ্বিতীয় বছরে করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়ার পর বিদেশি ক্রেতা কমে যাওয়া, আমদানি করা কাঁচামালের স্বল্পতার কথা জানিয়ে গত সেপ্টেম্বরে এক মাসের জন্য কোম্পানিটি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়া হয়। পরে আরও তিন দফা বন্ধের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

এর মধ্যে চলতি বছরের শুরুর দিকে বিএসইসি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। নতুন বোর্ডকে দায়িত্ব দেয়া হয় কোম্পানি চালুর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে।

চার মাসের মাথায় নতুন বোর্ড সদস্যরা কোম্পানির জটিলতা কাটিয়ে উৎপাদন চালু করার মতো পর্যায়ে আসার চেষ্টা করছেন।

বিএসইসির কমিশনার কমিশনার শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন, নতুন বোর্ড এরই মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক করে কোম্পানির নতুন নীতি ঠিক করার কাজ এগিয়ে নিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘শিগগিরই কোম্পানিটি আবার উৎপাদনে যাবে। যে উদ্দেশ্যে কোম্পানিটিকে আইপিও মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে তারা। আমরা আশাবাদী নতুন বোর্ড কোম্পানিটিকে আবার আগের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

মঙ্গলবার বিকেলেও নতুন পর্ষদ বৈঠক করেছে। পর্ষদের সদস্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক সগির হোসাইন খন্দকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কোম্পানিটির বিষয়ে আমরা আশাবাদী। আমরা চেষ্টা করছি।’

কবে নাগাদ কোম্পানিটি আবার চালু হতে পারে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। কারণ, এটি একটি রপ্তানিমুখী কারখানা। এর সঙ্গে ক্রেতা, রপ্তানির বাজার জড়িত। যেহেতু কারখানাটি বন্ধ ছিল, সেহেতু সবকিছু ঠিক করতে হবে। তবে আমরা আশাবাদী, কোম্পানিটিকে দ্রুত উৎপাদনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।’

আইপিওর টাকায় পাবে নতুন জীবন

কোম্পানিটি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে যে দেড় শ কোটি টাকা তোলে সেই টাকা নিয়ে কোম্পানির বিদেশি পরিচালকরা দেশে চলে যাচ্ছেন, এমন গুঞ্জনের মধ্যে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে হস্তক্ষেপ করে বিএসইসি। তাদের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক কোম্পানির ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেয়। ফলে সে টাকা আর তুলতে পারেনি।

২০ মে বিএসইসি আইপিওর ৪০ কোটি টাকা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে নতুন পর্ষদকে। এর মধ্যে ১৫ কোটি টাকা ছাঁটাই করা কর্মীদের দেয়া হবে। ৩ কোটি টাকা দিতে হবে বেজপার পাওনা বাবদ। তিতাস গ্যাসের পাওনা পরিশোধে যাবে সাড়ে ৩ কোটি টাকা। ১০ কোটি টাকায় পরিশোধ করা হবে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ঋণ আর ৬ কোটি টাকা দেয়া হবে ঢাকা ব্যাংককে। এর বাইরে আরও আড়াই কোটি টাকা খরচ হবে বিবিধ খাতে।

প্রসপেক্টাসে তহবিল ব্যবহারের যে কথা বলা ছিল, তার বদলে অন্য খাতে ব্যয় করার জন্য আইনি বাধাও দূর করে দিয়েছে কমিশন।

বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কোম্পানির ৫১ শতাংশ শেয়ারধারীদের উপস্থিতিতে সাধারণ সভা করারও অনুমোদন দেয়া হয়।

এই টাকার পুরোটাই ব্যয় হবে ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধে।

বাকি ১১০ কোটি টাকাও ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হবে ধাপে ধাপে।

২০৮ কোটি টাকার হদিস নেই

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে রিং সাইনের বিষয়ে যেসব তথ্য আছে, তাতে এর রিজার্ভে ২০৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা আছে বলে জানানো আছে।

তবে পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সগির হোসাইন খন্দকার জানান, তারা এই টাকার কোনো সন্ধান পাননি।

তিনি বলেন, ‘ভুয়া পেপারে এ ধরনের কোনো হিসাব থাকলে থাকতে পারে। তবে আমাদের কাছে কোনো হিসাব নেই।’

অন্য এক প্রশ্নে তিনি জানান, আইপিওর দেড় শ কোটি টাকা দেড় বছরও ধরে ব্যাংকে থাকায় কিছু সুদ আয় হয়েছে। তবে যেহেতু যখন প্রয়োজন হবে তখনই তা তোলার উদ্দেশ্যে রাখা ছিল, তাই এই আয় খুব বেশি এমন নয়।

কোম্পানিটি আইপিওর মাধ্যমে দেড় শ কোটি টাকা তোলা ছাড়াও আইপিও প্রক্রিয়ার বাইরে প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে আরও ১৩৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। তবে শেয়ার ইস্যু হলেও সবাই টাকা দেয়নি। এই সব শেয়ার বাজেয়াপ্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন থেকে এসব শেয়ার বাদ দেয়া হবে।

বিনিয়োগকারীরে স্বপ্ন যাদের হাতে

বর্তমানে সাতজন স্বতন্ত্র পরিচালক কোম্পানিটি চালাচ্ছেন, যার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মেজবাহ উদ্দিন।

সগির হোসাইন খন্দকার ছাড়া পর্ষদের অন্য সদস্যরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জনতা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ আলী, পাওয়ার গ্রিডের স্বতন্ত্র পরিচালক ইসতাক আহমেদ শিমুল এবং অ্যাভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেসের সাবেক মহা ব্যবস্থাপক আব্দুর রাজ্জাক।

তালিকাভুক্তির পরই ভেঙে পরে কোম্পানিটি

প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে তোলা টাকায় যন্ত্রপাতি ক্রয়, ঋণ পরিশোধ এবং আইপিওর খরচ মেটানোর কথা ছিল। তবে সেই টাকা তারা ব্যবহার করার আগেই হস্তক্ষেপ করে বিএসইসি।

কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করার আগেই ২০১৯ সালের জন্য ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করে। লভ্যাংশ ঘোষণার পরবর্তী লেনদেনে সার্কিট ব্রেকার থাকবে কি থাকবে না এমন অবস্থায় কোম্পানিটি নিয়ে তৈরি হয় জটিলতা। ১২ ডিসেম্বর কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করে।

পরের বছরের জন্য কোম্পানিটি ১ শতাংশ করে নগদ ও বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ হিসেবে ঘোষণা করে কিন্তু বার্ষিক সাধারণ সভা আর হয়নি।

যদিও কোম্পানিটি বিশেষ সাধারণ সভার তারিখ ঘোষণা করে যার উদ্দেশ্য ছিল প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও থেকে তোলা টাকার ব্যবহারের খাত পরিবর্তন।

তখন অভিযোগ উঠে, কোম্পানিটির বিদেশি পরিচালকেরা আইপিওর মাধ্যমে তোলা টাকা নিয়ে নিজ দেশে চলে গেছেন। তবে সেটা সত্য প্রমাণ হয়নি। আর বিএসইসির অনুরোধে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কোম্পানির ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক।

যেভাবে বিপাকে

ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ডিইপিজেড) তাইওয়ানের মালিকানাধীন বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান রিং সাইন একটি শক্তিশালী কোম্পানি হিসেবেই পরিচিত ছিল। এর শ্রমিকসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি ছিল।

১৯৯৬ সালে ডিইপিজেডে তাইওয়ানের নাগরিক মি সাও সোয়েটার কারখানাটি চালু করেন। ব্যবসায়িক সাফল্যে একে একে তিনি গড়ে তোলেন অ্যাভাস গার্ড লিমিটেড, সাইন ফ্যাশন লিমিটেড ও ইন্টার লগ লিমিটেড। এসব কারখানায় শ্রমিক ছিল আরও অন্তত সাত হাজার।

সমস্যার শুরু পাঁচ বছর আগে। বার্ধক্যজনিত কারণে মি সাও মারা গেলে তার ছেলে মি উইং থিং ও মেয়ে অ্যাঞ্জেলা কারখানাটির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু শ্রমিক ফেডারেশন নেতা ও কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে তারা পেরে ওঠেননি।

মালিকদের অভিযোগ, শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে আমদানি করা সুতাসহ নানা উপকরণ পাচার করে দিচ্ছিলেন শ্রমিক ফেডারেশন নেতা ও কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

মি সাওয়ের মতো তার সন্তানরা ব্যবসা অতটা ভালো বুঝতেন না। আর এই সুযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ বেপরোয়া হয়ে ওঠে বলেও তথ্য আছে। একপর্যায়ে মি সাওয়ের দুই সন্তান কাউকে না বলে বাংলাদেশ থেকে চলে যান।

মালিকানার বর্তমান হিস্যা

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী ৫০০ কোটি টাকার কিছু বেশি পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিটির শেয়ারসংখ্যা ৫০ কোটি ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৩টি। এই শেয়ারের মধ্যে ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশের মালিকানা উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে আছে ১৬ দশমিক ২৩ শতাংশ শেয়ার। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিনেছেন দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক।

অর্থাৎ ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীরা মোট ২৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার ৩৪৫টি শেয়ারের মালিক।

আরও পড়ুন:
চাঙা পুঁজিবাজারে শেয়ার কেনার ধুম
২০ পয়সা লভ্যাংশে দাম বাড়ল ৬২ শতাংশ
ফেসবুকে ‘হট আইটেমের’ বিজ্ঞাপন: বিএসইসির কমিটি  
এবার ব্যাংক, বস্ত্র, বিমার সম্মিলিত উত্থান
পুঁজিবাজারের লেনদেন সময় বাড়ল

শেয়ার করুন

মন্তব্য