এবার উল্লম্ফন জীবন বিমায়, আড়মোড়া ভাঙছে ব্যাংকও

বিনিয়োগকারী শূন্য ব্রোকারেজ হাউজে এখন থাকছেন কেবল কর্মীরা। ছবি: নিউজবাংলা

এবার উল্লম্ফন জীবন বিমায়, আড়মোড়া ভাঙছে ব্যাংকও

সাধারণ বিমা খাতে চাঙ্গাভাব অব্যাহত আছে। জীবন বিমার তিনটি ছাড়া বেড়েছে সবগুলো। কমেনি একটিরও দর। ঝিমাতে থাকা ব্যাংক খাতে টানা দুই দিন বেশ কিছু কোম্পানির দর বৃদ্ধিতে এই খাত নিয়ে যে দীর্ঘ হতাশা তা কিছুটা হলেও দূর হবে কি না, এ নিয়ে কথা হচ্ছে।

টানা দুই দিন ব্যাংক খাতে কিছুটা নড়চড় দেখা গেল পুঁজিবাজারে। সাধারণ বিমা খাতে বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বাড়ল আরও। নতুন যোগ হয়েছে জীবন বিমা খাত।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১২টি জীবন বিমা কোম্পানির মধ্যে ছয়টির দর বাড়ল এক দিনে যত বাড়া সম্ভব ততই। সর্বাধিক দর বৃদ্ধির ছয়টি কোম্পানিই এই খাতের। কোনো কোম্পানির দর কমেনি। তিনটির দর কেবল অপরিবর্তিত ছিল।

সাধারণ বিমা খাতের ৩৮টি কোম্পানির মধ্যে দাম কমেছে কেবল তিনটির। পাল্টায়নি দুটির। আরও বেড়েছে বেড়েছে ৩৩টির দর।

তবে ঝিমাতে থাকা ব্যাংক খাতে টানা দুই দিন বেশ কিছু কোম্পানির দর বৃদ্ধিতে এই খাত নিয়ে যে দীর্ঘ হতাশা তা কিছুটা হলেও দূর হবে কি না, এ নিয়ে কথা হচ্ছে।

গত ডিসেম্বরে সমাপ্ত অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত যে লভ্যাংশ দিয়েছে, সেটি কেবল আকর্ষণীয় নয়, অভাবনীয়ও বটে। করোনাকালে আয় কমে যাবে, লভ্যাংশ তলানিতে নামবে-এমন প্রচারের বিপরীতে ঘটেছে উল্টোটা।

যেসব ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, তাদের সিংহভাগই মহামারির বছরে আয় করেছে আগের বছরের চেয়ে বেশি, লভ্যাংশও দিয়েছে ভালো। বেশ কিছু ব্যাংকে টাকা রাখলে বছর শেষে যে মুনাফা পাওয়া যায়, শেয়ার লভ্যাংশ দিয়েছে তার চেয়ে বেশি। সঙ্গে দিয়েছে বোনাস শেয়ার।

তারপরও এই খাতে নড়চড় ছিল না গত কয়েক মাস ধরে। তবে চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার কিছুটা নড়চড় দেখা গেছে, দ্বিতীয় দিন বাড়ল আরও বেশ কিছু ব্যাংকের দর।

সব মিলিয়ে এই খাতের ৩১টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ১৫টির দর। কমেছে ছয়টির। বাকি ১০টির দর পাল্টায়নি।

টাকার অংকে সবচেয়ে বেশি প্রাইম ব্যাংকের বেড়েছে এক টাকা ১০ পয়সা।

পূবালী ও সাউথইস্ট ব্যাংকের দাম বেড়েছে ৬০ পয়সা করে।

সিটি ও এনসিসি ব্যাংকের দর বেড়েছে ৪০ পয়সা করে। ৩০ পয়সা বেড়েছে আল আরাফাহ ও ডাচ বাংলার শেয়ার দর। বাকিগুলোর দর ১০ থেকে ২০ পয়সা করে বেড়েছে।

সবচেয়ে বেশি কমেছে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের দর। ৩০ পয়সা দর হারিয়েছে কোম্পানিটি। এবি, ইবিএল, ইসলামী, মার্কেন্টাইল ও রূপালী দর হারিয়েছে ১০ থেকে ২০ পয়সা করে।

আর্থিক খাতে চাঙ্গাভাব দেখা গেছে পর পর দুই দিন। এই খাতের ২৩টি কোম্পানির মধ্যে ১২টির দাম বেড়েছে। টাকার অংকে সবচেয়ে বেশি দুই টাকা ৩০ পয়সা বেড়েছে ন্যাশনাল হাউজিং ফিনান্স্যের দর। লংকাবাংলার দর বেড়েছে ৯০ পয়সা। বে লিজিং, বিডি ফিন্যান্স, ইসলামিক ফিন্যান্সের দর বেড়েছে ৫০ পয়সা করে। বাকিগুলো ১০ থেকে ৪০ পয়সা করে বেড়েছে।

বস্ত্র খাতেরও বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে। এর মধ্যে শতকরা হিসাবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ম্যাকসন্স ও মেট্রো স্পিনিং মিলসের শেয়ার দর। ১০ শতাংশের কাছাকাছি বেড়েছে দর। ডেল্টা স্পিনার্সের দরও বেড়েছে ৯ শতাংশের বেশি। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেড়েছে মালেক স্পিনিং মিলসের দরও।

তারপরেও রাজা বিমা খাত

মঙ্গলবার পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি দর বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির মধ্যে দুটিই ছিল বিমা খাতের। একটি রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং অপরটি সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স। দিনের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ করে শেয়ার দর বেড়েছে এই দুই কোম্পানির।

এ তালিকায় ছিল সন্ধানী ইন্স্যুরেন্স, যার শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। প্রাইম লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যার শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যার শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, যার শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

সাধারণ বিমা খাতের মধ্যে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। কর্ণফুলী ইন্সুরেন্সের শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। পূরবী জেনারেল ইন্সুরেন্সের শেয়ার দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী নজরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘লকডাউনের পুঁজিবাজারে বিমা খাতের শেয়ারের এমন উত্থান হবে তা প্রত্যাশা ছিল না। হাতে দুটি কোম্পানির বিমার শেয়ার ছিল। সেগুলো থেকে মুনাফা করে এখন অন্যান্য কোম্পানির শেয়ার ছেড়ে দিয়ে বিমা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেছি।’

তিনি বলেন, ‘বিমা খাতের শেয়ারের দর যেভাবে বেড়েছে তা অতিমূল্যায়িত হয়েছে সত্য। কিন্ত শেয়ার প্রতি দুই তিন টাকা মুনাফা নিয়ে আবার এখাতে নতুন বিনিয়োগ করছি। এতে ঝুঁকি কিছুটা কম থাকছে।’

সূচক ও লেনদেন

ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২৪ দশমিক ১১ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৩৫ পয়েন্টে।

শরিয়াহভিত্তিক কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসইএস ১ দশমিক ০৮ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৪৯ পয়েন্টে।

বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস-৩০ সূচক ২ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১১৮ পয়েন্টে।

লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৪১টির, কমেছে ১৪৭টির। দর পাল্টায়নি ৬৭টির।

লেনদেন হয়েছে মোট ১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা।

চট্টগ্রাস স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৩৭ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাাজর ৯৯১ পয়েন্টে।

লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১১২টির। কমেছে ১০৭টির। দর পাল্টায়নি ৪২টির। লেনদেন হয়েছে মোট ৩৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন:
ঘরে বসে জীবন বিমার প্রিমিয়াম

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বাজেট নিয়ে গোপনীয়তা কেন

বাজেট নিয়ে গোপনীয়তা কেন

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, বাজেটের গোপনীয়তা রক্ষা করার বিষয়টি চলে আসছে প্রথাগতভাবে। গোপন রাখার ব্যাপারে কোনো আইন নেই। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাজেট গোপন রাখার প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশে সাধারণত জুনের প্রথম সপ্তাহে বাজেট ঘোষণা করা হয়। ৩০ জুন তা জাতীয় সংসদে পাস হয়। কার্যকর হয় ১ জুলাই থেকে।

বাজেট এলেই অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের মধ্যে, বিশেষত যারা বাজেটবিষয়ক প্রতিবেদন করেন, তাদের মধ্যে টেনশন বাড়ে। কারণ, কার আগে কে ব্রেকিং প্রতিবেদন দিতে পারেন, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে।

যে প্রতিবেদক আগেভাগে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করতে পারেন, তিনি কৃতিত্বের দাবি রাখেন। অফিস কর্তৃপক্ষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে।

তথ্য জানার অধিকার সবার রয়েছে। তবে এটা এখনও কাগজকলমে।

আমাদের দেশে গণমাধ্যমে ‍যারা প্রতিনিয়ত সংবাদ পরিবেশন করেন, নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের প্রতিবেদন করতে হয়। বাজটবিষয়ক তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি সত্য।

কিন্তু জাতীয় বাজেট প্রণয়ন নিয়ে এই আড়াল কেন? বাজেট কি গোপন দলিল? সরকারি নীতিনির্ধারক মহলের কাছ থেকে এর পরিষ্কার কোনো জবাব পাওয়া যায় না। তবে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এ নিয়ে তর্ক রয়েছে।

বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, বাজেটের গোপনীয়তা রক্ষা করার বিষয়টি চলে আসছে প্রথাগতভাবে। এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই যে, বাজেটের বিষয়বস্তু গোপন রাখতে হবে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাজেট গোপন রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। জনগণের জন্যই বাজেট। সুতরাং এতে যেসব পরিবর্তন আসবে, আগেভাগে জানিয়ে দেয়া উচিত। এতে করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং জনগণ উপকৃত হবে।

সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান রচিত ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ গ্রন্থে বাজেট নিয়ে গোপনীয়তার রীতি ব্যাখা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যদি কোনো ব্যবসায়ী আগে থেকে জানেন যে, নতুন বাজেটে কর বা শুল্ক বাড়বে কিংবা কমবে তাহলে ওই ব্যবসায়ী তার জ্ঞান ব্যবহার করে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যেতে পারেন। কাজেই সংসদে বাজেট পেশ করার আগে বাজেটের প্রস্তাবাবলি গোপন রাখতে হবে। যে অর্থমন্ত্রী তার বাজেটের গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারবেন না, তার পক্ষে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।’

বাজেট ফাঁস হওয়ায় ব্রিটেনের এক অর্থমন্ত্রীকে যে বিপদে পড়তে হয়েছিল, সে কথাটিও এই অর্থনীতিবিদ তার বইতে তুলে ধরেন।

আকবর আলি খান উল্লেখ করেন, অধ্যাপক হিউ ডালটন ১৯৪৭ সালে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ব্রিফকেসে বাজেট নিয়ে যখন সংসদে ঢুকছিলেন, তখন সাংবাদিকরা শুল্ক-করবিষয়ক কিছু প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দেন।

এ খবর সংবাদমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ হয়ে যায়।

অর্থমন্ত্রী ডালটন যখন সংসদে তার বাজেট বক্ততা পড়ছিলেন, তখন পত্রিকার কপি সংসদে উপস্থিত এমপিদের হাতে হাতে। বাজেট ফাঁস হয়ে গেছে, এমন অভিযোগে বিরোধী দল হইচই শুরু করে।

ডালটন তার ভুল স্বীকার করে পদত্যাগ করেন।

আকবর আলি আরও বলেন, অনেক দেশে ঘোষণার আগের সপ্তাহে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তাদের একটি হোটেলে বদ্ধ অবস্থায় রাখা হতো, যাতে কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে।

তবে গত ২০০ বছরে বাজেট প্রণয়ন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

এ বিষয়ে আকবর আলি খান বলেন, ‘অনেক দেশে সংসদে এখন শুল্ক-কর প্রস্তাব গোপন থাকে না। এসব প্রস্তাব নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হয়। দর-কষাকষি করা হয় এবং আপস করা হয়।’

কিন্তু বাংলাদেশে এখনও অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বাজেট নথি তৈরি করা হয়। এমনকি সংসদেও কোনো আলোচনা করা হয় না। কিছু ক্ষেত্রে অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হলেও তার প্রতিফলন দেখা যায় না বাজেটে।

বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত এবং আমলানির্ভর বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তবে বাজেট নিয়ে কাজ করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এমন সাবেক কর্মকর্তারা মনে করেন, শুধু শুল্কবিষয়ক প্রস্তাবগুলো গোপন রাখা উচিত। এর বাইরে বাকি সবকিছু অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। এতে করে করদাতা ও বিনিয়োগকারী উভয়ই উপকৃত হবেন।

বাজেট গোপন রাখা উচিত নয় বলে মনে করেন গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে করনীতি নিয়ে নাটক করা হয়। গোপনীয়তা একটি ভুল নীতি, বর্তমান যুগে যার কোনো প্রয়োজন নেই।’

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে সংসদে বাজেট উপস্থাপন করার পর জনপ্রতিনিধিদের কাছে মতামতের জন্য দেয়া হয়। তারা মতামত দেয়ার পর আলাদা বাজেটবিষয়ক সাব কমিটি সংশোধন করে। এই সাব কমিটি অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে বাজেট চূড়ান্ত করে। সেখানে সরকারের কোনো ভূমিকা থাকে না।

এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুর রহমান বলেন, শুল্কবিষয়ক প্রস্তাবগুলো গোপন রাখতে হবে। এই তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে ব্যবসায়ীদের আগে থেকে এলসি খুলে মালামাল আমদানির মাধ্যমে মজুত করে ফায়দা নেওয়ার সুযোগ থাকে। এর বাইরে বাকি সব বিষয় আগেভাগে জানালে কোনো ক্ষতি হবে না; বরং লোকে লাভবান হবে।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বাজেটে কর কাঠামোর বিষয়ে আগাম ঘোষণা থাকলে একজন বিনিয়োগকারীর পক্ষে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেয়া সহজ হবে। এমন নীতি হলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারাও উপকৃত হবেন।

আরও পড়ুন:
ঘরে বসে জীবন বিমার প্রিমিয়াম

শেয়ার করুন

বয়স্ক ও বিধবা ভাতায় আরও ১২ লাখ

বয়স্ক ও বিধবা ভাতায় আরও ১২ লাখ

নতুন বাজেটে অতিরিক্ত সাড়ে ১২ লাখ বয়স্ক ও বিধবা ভাতাভোগীকে নতুন করে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হচ্ছে। ছবি: নিউজবাংলা

এখন বয়স্ক ও বিধবা ভাতা মাসিক ৫০০ টাকা। নতুন বাজেটে ভাতার অঙ্ক অপরিবর্তিত রেখে শুধু সুবিধাভোগীদের সংখ্যা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বাজেট লোগোকরোনাভাইরাস মহামারিতে আরও বেশি গরিব মানুষকে সামাজিক সুরক্ষা দেবে সরকার। এ জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বয়স্ক ও বিধবা ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। তবে অপরিবর্তিত থাকছে ভাতার অঙ্ক।

অর্থ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন বাজেটে অতিরিক্ত সাড়ে ১২ লাখ বয়স্ক ও বিধবা ভাতাভোগীকে নতুন করে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা হচ্ছে।

এর মধ্যে বয়স্ক ভাতায় যুক্ত হচ্ছে ৮ লাখ ২৬ হাজার জন। অবশিষ্ট ৪ লাখ ২৪ হাজার জন পাবেন বিধবা ভাতা।

এখন বয়স্ক ও বিধবা ভাতা মাসিক ৫০০ টাকা। নতুন বাজেটে ভাতার অঙ্ক অপরিবর্তিত রেখে শুধু সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নিয়ম অনুযাযী, বর্তমানে ৬৫ বছর ও বেশি বয়সী ব্যক্তিরা মাসিক ভাতা পান।

বয়স্ক, বিধবাসহ বর্তমানে আট ধরনের মাসিক ভাতা চালু রয়েছে, যা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালনা করে।

এসব ভাতার বিপরীতে বর্তমানে উপকার বা সুফলভোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯১ লাখ ৫০ হাজার।

আগামী বাজেটে নতুন করে আরও সাড়ে ১২ লাখ যুক্ত হচ্ছে। ফলে সুবিধাভোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১ কোটি ৪ লাখে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, এবারের বাজেটে ১৫০টি উপজেলার শতভাগ যোগ্যদের, অর্থাৎ যারা ভাতা পাওয়ার সামর্থ্য রাখে, তাদের সবাইকে আওতায় আনা হচ্ছে।

বর্তমানে ওইসব উপজেলায় ৪৬ শতাংশ যোগ্য ব্যক্তি বয়স্ক ও বিধবা ভাতা পাচ্ছেন। যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে, তাতে ১১২টি উপজেলার শতভাগ যোগ্যদের ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে দেশের ২৬২ উপজেলার যোগ্য সবাইকে ভাতার আওতায় আনতে সক্ষম হলো সরকার।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে পর্যায়ক্রমে সব উপজেলার যোগ্য সবাইকে ভাতার আওতায় আনা। সে অনুযায়ী কাজ করছে সরকার।

বর্তমানে সারা দেশে ৪৯২টি উপজেলা রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ২৫০ উপজেলায় তুলনামূলকভাবে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেশি। বেশির ভাগই গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের। কিছু উপজেলা আছে ময়মনসিংহ ও জামালপুর জেলায়। এসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।

বয়স্ক ও বিধবা ভাতায় আরও ১২ লাখ

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এখন পর্যন্ত বয়স্ক, বিধবা সুবিধাভোগীর সংখ্যাই সর্বাধিক। মোট ভাতাভোগীর ৭৬ শতাংশই এই দুই শ্রেণির।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি হচ্ছে বয়স্ক ভাতা। এই সংখ্যা বর্তমানে ৪৯ লাখ। তার পর রয়েছে বিধবা ভাতা, যার সংখ্যা সাড়ে ২০ লাখ।

এ ছাড়া অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার সংখ্যা আড়াই লাখ। তবে অসচ্ছল প্রতিবন্ধীর ভাতার অঙ্ক একটু বেশি। এদের মাসিক ভাতা ৭৫০ টাকা।

একই সঙ্গে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী পরিবারের সদস্যদের জন্য শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে বৃত্তিও দেয়া হয়। এর পরিমাণ সর্বনিম্ন ৭৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা।

আবার সমাজে পিছিয়ে পড়া জনগণ ও চা-শ্রমিকদের জন্য এককালীন ভাতা দেয় সরকার।

এ ছাড়া দুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা রয়েছে। তারা প্রত্যেকে মাসিক ১২ হাজার টাকা করে ভাতা পান। দুই ঈদে দুটি বোনাস ও বৈশাখী ভাতাও পান তারা। প্রায় ২ লাখ মুক্তিযোদ্ধা এই সুবিধা পাচ্ছেন।

এর বাইরে যুদ্ধাহত, খেতাবপ্রাপ্ত ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বজনরা সর্বনিম্ন ২৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা পান। এদের সংখ্যা ১২ হাজার।

তবে নতুন বাজেটে এসব ভাতার বিষয়ে কোনো পরিবর্তন আসছে না এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যাও বাড়ছে না বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এদিকে মাসিক ভাতার বাইরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে গরিব জনগণকে সামাজিক সুরক্ষা দিচ্ছে সরকার।

এর বাইরে রয়েছে মাতৃত্বকালীন ভাতা, যা নিয়ন্ত্রণ করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ ভাতার অঙ্ক মাসিক ৮০০ টাকা। বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ দুস্থ নারী এই সুবিধা ভোগ করছেন।

বয়স্ক ও বিধবা ভাতায় আরও ১২ লাখ

বর্তমানে সমাজকল্যাণ, ত্রাণ-দুর্যোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ ২২ মন্ত্রণালয় ও সংস্থা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ১৩০টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পেনশন সুবিধা এক ধরনের সামাজিক কর্মসূচি। আবার রেশনিং, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, জেনারেল রিলিফ, শিক্ষাবৃত্তি, কম দামে গরিবদের চাল দেয়া, ভিজিডি, ভিজিএফের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া হয়।

এসব কর্মসূচি নির্ধারিত মন্ত্রণালয়গুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে জনপ্রিয় ও বড় কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।

বর্তমানে মোট বাজেটের ১৩ শতাংশ ও জিডিপির আড়াই শতাংশ সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় করা হয়।

চলতি অর্থবছরে এ খাতে মোট ৯৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

করোনায় আরও বেশি গরিব মানুষকে সুরক্ষা দিতে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ আরও বাড়িয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রথম চালু করা হয়। এরপর থেকে কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে তা অব্যাহত রাখা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দুর্নীতির কারণে আশানুরূপ সুফল মিলছে না।

সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের সাবেক জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. জায়েদ বখত প্রকৃত যোগ্যদের এ সুবিধার আওতায় আনার পরামর্শ দেন।

তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে বর্তমানে মোবাইল ব্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীদের কাছে ভাতার টাকা চলে যাচ্ছে।

এ ছাড়া যারা সত্যিকার অর্থে সরকারি ভাতা পাওয়ার যোগ্য তাদের বাছাই করতে একটি তথ্য ভান্ডার স্থাপন করেছে সরকার।

এসব উদ্যোগের ফলে এ খাতে দুর্নীতি অনেক কমে যাবে বলে আশা করছে সরকার।

আরও পড়ুন:
ঘরে বসে জীবন বিমার প্রিমিয়াম

শেয়ার করুন

বাজেটে বিশাল ঘাটতি, সুদ পরিশোধে চাপ বাড়ছে

বাজেটে বিশাল ঘাটতি, সুদ পরিশোধে চাপ বাড়ছে

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয়ে ভাটা পড়ায় সরকারি ব্যয় নির্বাহে আগামী বাজেটে বিশাল ঘাটতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হতে হচ্ছে সরকারকে। বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় ঋণের সুদ পরিশোধে। এতে করে চাপ বাড়ছে সরকারের। ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় এখন বাজেটের সর্বোচ্চ একক খাত।

সামাজিক সুরক্ষায় এবার বরাদ্দ অনেক বাড়ছেসরকারের আয় কম। ব্যয় বেশি। ফলে এবারও বেশি ঋণ করে বিশাল ঘাটতি বাজেট করতে যাচ্ছে সরকার। আর এই ধারের বড় একটি অংশ আসছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে।

বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থাপনা ২০০৯ আইনানুযায়ী, জিডিপির পাঁচ শতাংশ ঘাটতি ধরে বাজেট তৈরির কথা উল্লেখ আছে এবং সে অনুযায়ী এতদিন বাজেট প্রণয়ন করে আসছে সরকার।

কিন্তু করোনাকালীন এ নিয়মের ব্যতয় ঘটিয়ে বাজেট করছে সরকার। যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে, তাতে ঘাটতি ধরা হয়েছে (আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য) ১ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ছয় শতাংশের কাছাকাছি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি আরও বেশি প্রাক্কলনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর পরিমাণ হতে পারে ২ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৬ শতাংশ।

বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নিউজবাংলাকে বলেন, করোনাকালে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বেশি খরচের লক্ষ্য নিয়ে বিশাল ঘাটতি বাজেট করা হচ্ছে।

নতুন বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে মোট ধার বা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৯৩ হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সংগ্রহ করে ঘাটতি মেটানো হবে।

যে অর্থবছরটি শেষ হতে যাচ্ছে, তাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি উৎস থেকে অর্থের যোগান দেয় সরকার। আবার অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণ নেয়া হয়।

আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টকা।

সুদ পরিশোধে চাপ বাড়বে

রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য ঋণের উপর বেশি নির্ভরশীল হতে হচ্ছে সরকারকে। যে কারণে বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় ঋণের সুদ পরিশোধে।

এতে করে চাপ বাড়ছে সরকারের। পরিসংখ্যানে বলে, সুদ বাবদ ব্যয় এখন বাজেটের সর্বোচ্চ একক খাত।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নভেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ব্যয় হয় ৮৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু সুদ পরিশোধে খরচ হয় ২৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে মোট ব্যয়ের ২৭ শতাংশ ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র ও বিদেশি ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধে চলে গেছে। এর মধ্যে বেশি সুদ গুণতে হয়েছে সঞ্চয়পত্রে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, আগামী বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে প্রায় ২১ শতাংশ বেশি।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ঋণের বোঝা ক্রমশ বাড়ায় বিপুল অঙ্কের সুদ গুণতে হচ্ছে সরকারকে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার কারণেই বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে।

আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার প্রচুর বিনিয়োগ। এর জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে যে পরিমাণ অর্থ জোগান দেয়ার প্রয়োজন, তা জোগান নিশ্চিত করতে পারছে না সরকার। সে জন্যই ঋণ নিতে বাধ্য হয়।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব সম্পদ আহরণের সুযোগ কম। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নমনীয় শর্তে ঋণ নিলে তা হবে অর্থনীতির জন্য ভালো।’

ব্যাংক থেকে ঋণ কমলেও, বাড়ছে সঞ্চয়পত্রে

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক দুই উপায়ে ঋণ নেয় সরকার। তবে বর্তমানে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ কমলেও বেড়েছে সঞ্চয়পত্রে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তা থেকে দুই থেকে তিন গুণ বেশি নেয়া হয়। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য প্রাক্কলন করে ২০ হাজার কোটি টাকা।

অথচ, আলোচ্য অর্থবছরের পাঁচ মাসেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নেয়া হয়। রাজস্ব আদায় কমে হওয়ায় ঋণ বেশি নিতে হচ্ছে বলে জানান অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

এর ফলে মাত্রাতিরিক্ত সুদ গুণতে হচ্ছে সরকারকে। সাধারণত সঞ্চয়পত্রে সুদহার ব্যাংক ঋণের চেয়ে বেশি।

তবে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার প্রবণতা কিছুটা কমলেও আগের ঋণ পরিশোধ করায় বর্তমানে এ খাতে পুঞ্জিভূত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যার বিপরীতে নিয়মিত সুদ দিতে হচ্ছে সরকারকে।

গত অর্থবছর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার।

বিদেশি ঋণ সস্তা

বর্তমানে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণ বাড়ছে। করোনাকালে গত অর্থবছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন বা ৮০০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পাওয়া গেছে, যা এযাবত কালের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আগে সরকার গড়ে বছরে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেত। সরকার আশা করছে, এবার ৯ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ পাওয়া যাবে।

বিদেশি ঋণের সুদ হার নমনীয় হওয়ায় এটি বেশি করে সংগ্রহের পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদরা। যে পরিমাণ ঋণ জমেছে তার বিপরীতে বছরে গড়ে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার সুদ পরিশোধ করতে হয় সরকারকে। তবে একথাও সত্যি বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বেড়েছে। এ কারণে ঋণের পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশীয় উৎস থেকে নেয়া ঋণের সুদের হার অনেক বেশি – গড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ। আর বিদেশি ঋণের জন্য মাত্র ১ থেকে দেড় শতাংশ হারে সুদ দিতে হয়। অর্থাৎ দেশীয় ঋণের খরচ অনেক বেশি। এ কারণেই সুদ অনেক বেড়ে যায়।’

সক্ষমতা বেড়েছে

ইআরডির কর্মকর্তারা বলেন, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ক্রেডিট রেটিংও ভালো।

আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস, মুডিস এবং ফিচ রেটিংসের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ভালো, যাকে স্থিতিশীল ইকোনমি হিসেবে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থাগুলো। কোনো দেশকে ঋণ দেওয়া কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ, তারই মূল্যায়ন ক্রেডিট রেটিং।

ইআরডির এক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশি ঋণ একদিকে বাড়ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কয়েক গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ কখনও খেলাপি হয় নি। ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণ দিতে আগ্রহী।

আরও পড়ুন:
ঘরে বসে জীবন বিমার প্রিমিয়াম

শেয়ার করুন

বছরে বেতন পেলাম ৪ মাস, আমাদের কিসের ঈদ

বছরে বেতন পেলাম ৪ মাস, আমাদের কিসের ঈদ

‘গত একবছরের বেশি সময়ে চার মাসের মতো বেতন পেয়েছি। বাকিটা সময় বাড়িতে বসে আছি। এই অবস্থায় আমাদের কিসের ঈদ। বেঁচে থাকা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।’

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা কুতুব উদ্দিন। সিলেট নগরের একটি হোটেলের বিপণন বিভাগে কাজ করতেন। ২০২০ সালের মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হলে বন্ধ হয়ে যায় কুতুবদের হোটেল। সেই থেকেই অবৈতনিক কর্মীতে পরিণত হন তিনি।

করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে গত অক্টোবরে হোটেল থেকে আবার ডাক পড়ে তার। এই বছর মার্চ থেকে আবার লকডাউন। আবার বেকার কুতুব উদ্দিন। এই ঈদেও বেতন-বোনাস পাননি তিনি। ফলে স্ত্রী সন্তান নিয়ে পড়েছেন বিপাকে।

কুতুব উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘গত এক বছরের বেশি সময়ে চার মাসের মতো বেতন পেয়েছি। বাকিটা সময় বাড়িতে বসে আছি। এই অবস্থায় আমাদের কিসের ঈদ। বেঁচে থাকা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।’

নগরের জিন্দাবাজার এলাকার আরেকটি হোটেলে অভ্যর্থনাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন সুনামগঞ্জ দিরাই উপজেলার বাসিন্দা সবুজ আহমদ। গত এপ্রিল থেকে তাকে অবৈতনিকভাবে ছুটিতে পাঠিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। মার্চের বেতন পেলেও এপ্রিল মাসের বেতন পাননি। মেলেনি ঈদ বোনাসও।

সবুজ বলেন, ‘হোটেল কর্তৃপক্ষ অন্য চাকরি খোঁজার জন্য বলে দিয়েছে। এই অবস্থায় আমি নতুন চাকরি কোথায় পাব? এই দুশ্চিন্তায় দিন যাচ্ছে। ঈদের আনন্দ বলতে আমাদের পরিবারে কিছু নেই। গত তিনটি ঈদই এরকম কেটেছে।’

কেবল কুতুব উদ্দিন বা সবুজ আহমদই নয়, একইরকম অবস্থা সিলেটের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের বেশিরভাগ কর্মীদেরই। এই খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ কর্মীকে অবৈতনিকভাবে ছুটিতে পাঠিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

গত মাসের বেতন ও ঈদের বোনাস পাননি বেশিরভাগ কর্মীই। ফলে উৎসবও তাদের জন্য আনন্দের বার্তা বয়ে আনতে পারেনি। বরং চাকরি নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তারা।

গত এক যুগে সিলেটে পর্যটনখাত ব্যাপক সম্প্রসারিত হয়েছে। সিলেটজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। এগুলোর ব্যবসাও হচ্ছিল ভালো।

পর্যটনখাতকে সিলেটের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত মনে করা হতো। দুই ঈদসহ বিভিন্ন ছুটির সময়ে সিলেটে পর্যটকদের ঢল নামত। ফলে কোনো হোটেল-রিসোর্টেই কক্ষ খালি পাওয়া যেত না।

তবে করোনাভাইরাস নামক অচমকা এক ঝড়ে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতই এখন পড়েছে সবচেয়ে সঙ্কটে।

সিলেট জেলায় হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে দুই শতাধিক। এতে লক্ষাধিক কর্মী কর্মরত ছিলেন। তবে এসব কর্মীদের বেশিরভাগকেই ছুটিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

ছুটিতে যাওয়া কর্মীরা বেতনও পাচ্ছেন না। এরইমেধ্যে পেশাও বদলে নিয়েছেন তাদের অনেকে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এলাকার বাসিন্দা কয়েস উদ্দিন। সিলেটের একটি হোটেলের হিসাব শাখায় কাজ করতেন। চাকরি হারিয়ে তিনি কৃষিকাজ শুরু করেছেন।

কয়েস বলেন, ‘নিজেদের কিছু জমি ছিল। এগুলো আগে বর্গা দিয়ে চাষ করাতাম। এবার নিজেই চাষ করেছি। নিজের জমিগুলো না থাকলে না খেয়ে মরতে হতো।’

নগরের জিন্দাবাজার এলাকার গোল্ডেন সিটি হোটেলের মহাব্যবস্থাপক মিষ্ঠু দত্ত বলেন, ‘আমাদের হোটেলে প্রায় ৫০ জন কর্মী ছিলেন। তাদের গত ১ মে থেকে ছুটি দিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্য কোথাও চাকরি পেলে তাতে যুক্ত হয়ে যাওয়ার জন্যও তাদের বলে দেয়া হয়েছে।’

মিষ্ঠু বলেন, ‘এপ্রিল পর্যন্ত আমরা কর্মীদের বেতন দিয়েছি। কিন্তু এখন আর বেতন দেয়া সম্ভব হবে না। কারণ মার্চ থেকেই আমাদের ব্যবসা বন্ধ। দিনের পর দিন হোটেল বন্ধ রেখে কর্মীদের বেতন দেয়া কারও পক্ষেই সম্ভব না।’


শনিবার সিলেট নগরের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নগরের পানসী ইন, ডালাস, অনুরাগ, সুপ্রীমসহ বেশিরভাগ হোটেলের মূল ফটকে তালা ঝুলছে। আবার গোল্ডেন সিটি, ব্রিটেনিয়া, লা ভিস্তা, লা রোজসহ কিছু হোটেলের ফটক খোলা থাকলেও ভেতরে কোনো অতিথি নেই। দেখভালের জন্য দুএকজন কর্মী ছাড়া সবগুলো হোটেলই প্রায় ফাঁকা।

সিলেট হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, এই সংগঠনের সদস্যভুক্ত হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে ৩৪টি। লকডাউনের কারণে সবগুলোই সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

তবে শনিবার বিকেলে সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগান, বিমানবন্দর সড়ক, তারাপুর চা বাগানসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভিড় করেছেন বিনোদনপ্রেমিরা। চা বাগানের ভেতরে পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছেন অনেকে।

যদিও সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাইনুল জাকির জানিয়েছেন ঘুরতে আসা লোকজন স্থানীয় বাসিন্দা। এবার বাইরে থেকে কোনো পর্যটক আসেননি।

সিলেট হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমাত নুরী জুয়েল বলেন, ‘ঈদ মৌসুমে আমাদের ব্যবসা সবচেয়ে ভালো হয়। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসেন। অথচ গত তিনটি ঈদে সবগুলো হোটেল-রিসোর্ট বন্ধ ছিল।

তিনি বলেন, ‘গত বছর লকডাউনে বন্ধের ক্ষতিই আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। একটু একটু করে যখন ব্যবসা জমে উঠছিল তখন আবার লকডাউন দেয়া হলো। এমন অবস্থায় আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দুষ্কর হয়ে উঠেছে। ফলে এই খাতের কর্মীরাও সঙ্কটে পড়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের সদস্যভুক্ত সব হোটেল রিসোর্টই কর্মীদের ঈদের আগে বেতন ও বোনাস প্রদান করেছে। তবে এই সঙ্কট অব্যাহত থাকলে বেতন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না।’

আরও পড়ুন:
ঘরে বসে জীবন বিমার প্রিমিয়াম

শেয়ার করুন

পুঁজিবাজারে ‘পরিণত আচরণে’ নতুন আশাবাদ

পুঁজিবাজারে ‘পরিণত আচরণে’ নতুন আশাবাদ

‘ঈদের আগে এমন পুঁজিবাজার সচরাচর দেখা যায় না। মূলত এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে টাকা উত্তোলনের কারণে মন্দাবস্থা থাকে। কিন্তু এবার ছিল ভিন্ন চিত্র। এতে ভালো যেটা হয়েছে, ঈদের পর যখন পুঁজিবাজার লেনদেন শুরু হবে তখন কেউ আতঙ্কে বিনিয়োগ করবে না। তখন যেসব খাতের শেয়ারের দর এখনও কম সেগুলোতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়াই উত্তম হবে।’

লকডাউনের আতঙ্ক কাটিয়ে পুঁজিবাজারে উত্থানের যে চিত্র তাতে শুরুতে কেবল বিমা খাতের শেয়ার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়লেও পরে প্রায় সব খাতেই দেখা গেছে ইতিবাচক প্রবণতা।

তলানিতে থাকা ব্যাংক, বস্ত্র ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে অল্প অল্প করে দাম বাড়ছে, সেই সঙ্গে অনেক বেশি বেড়ে যাওয়া বিমা খাতে দর সংশোধন হয়ে কিছুটা কমেছে।

অথচ লকডাউনের ঘোষণা দেয়ার পর তা শুরু হওয়ার আগেই এক দিনে প্রায় ২০০ পয়েন্ট সূচক পড়েছিল। তবে ৫ এপ্রিল লকডাউন শুরুর পর বাজার ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

পরে ৬৬ শেয়ারের সর্বনিম্ন দাম বা ফ্লোর প্রাইস তুলে দেয়ার পর কয়েক দিন বাজার পতন হলেও পরে মার্জিন ঋণের হার বাড়িয়ে দেয়ার পর থেকে টানা এক মাস ধরেই বাজারে চাঙাভাব দেখা দিয়েছে।

শুরুতে সাধারণ বিমা খাতের শেয়ারগুলোর দাম ঢালাও বাড়লেও পরে খাত ধরে প্রথমে মিউচ্যুয়াল ফান্ড, পরে ব্যাংক খাত এবং সব শেষ ব্যাংকের সঙ্গে বস্ত্র খাতে দেখা দিয়েছে চাঙাভাব।

বিধিনিষেধে পতনের আশঙ্কা থাকলেও পাঁচ সপ্তাহে সূচক বেড়েছে ৫৭৩ পয়েন্ট। লেনদেন বেড়েছে বহুগুণ। আর নিয়মিত হাতবদল হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বেশি।

৫ এপ্রিল লকডাউন শুরুর দিন বাজারে মূল্য সূচক ছিল ৫ হাজার ১৭৭ পয়েন্ট। আর বাজার ঈদের ছুটিতে গেছে ৫ হাজার ৭৫০ পয়েন্টে।

ব্যাংক ও বস্ত্র খাতে হতাশা দূরের আশা

এক দশক ধরেই ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রবণতা চলছে। এর মধ্যে গত বছর করোনার প্রাদুর্ভাবের পর এই খাতের শেয়ারের দাম একেবারে তলানিতে নেমে আসে।

তখন কথা ছড়িয়েছিল যে, করোনায় ব্যাংকের মুনাফা কমে যাবে এবং লভ্যাংশ পাওয়া যাবে না। তবে বছর শেষে দেখা গেল করোনাকালে মুনাফা বেশি করার পর লভ্যাংশও বেশি দিয়েছে কোম্পানিগুলো।

চলতি বছর ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে এখন পর্যন্ত যে ২৭টি ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে ২৩টি কোম্পানি ২ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা কেবল নগদে বিতরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি আছে বোনাস শেয়ার।

চলতি বছর প্রথম তিন মাসের আয়ও গত বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যে ২০টি ব্যাংক প্রান্তিক ঘোষণা করেছে, তার মধ্যে ১৫টিই আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বেশি আয় করেছে। একটি ব্যাংক প্রায় তিন গুণ, একটি দেড় গুণ, একটি দ্বিগুণ এবং আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি আয় করেছে।

এই পরিস্থিতিতে এক সপ্তাহের মধ্যে হাতে গোনা এক-দুটি ছাড়া বেশির ভাগ ব্যাংকের শেয়ারদর ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

এর আগে নানা সময় ব্যাংক খাতে দুই-একদিন দাম বাড়লেও পরে আবার পতন দেখা গেছে। কিন্তু এবার বাড়তি দামে কয়েক দিন স্থিতিশীল থাকার পর আবার বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

একই পরিস্থিতি বস্ত্র খাতে। করোনার প্রাদুর্ভাবে এই খাতেও আয় ভালো হবে না ভেবে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারদর অভিহিত মূল্যের আশেপাশে বা তার চেয়ে নেমে গেছে।

প্রান্তিক প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, করোনাকালে এবার গত বছরের চেয়ে বেশি আয় করছে অনেক কোম্পানি। তবে এটাও ঠিক যে, এই খাতেই লোকসানি কোম্পানি অনেক।

ঘুমিয়ে থাকা বস্ত্র খাতও ঈদের আগে হঠাৎ একদিন লাফ দিয়ে এরপর দুই দিন স্থিতিশীল থেকে আবার লাফ দেয়।

দাম ও মূল্য সূচকের পাশাপাশি লেনদেনও বাড়ছে।

লকডাউনে সময় কমলেও এখন নিয়মিত প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে।

আস্থাশীল করবে বিনিয়োগকারীদের

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঈদের আগে পুঁজিবাজারের লেনদেন যেভাবে শেষ হয়েছে তা পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি আস্থাশীল করবে।’

ব্র্যাক ইপিএল ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সাবেক গবেষণা কর্মকর্তা দেবব্রত কুমার সরকার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঈদের আগে এমন পুঁজিবাজার সচরাচর দেখা যায় না। মূলত এ সময়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে টাকা উত্তোলনের কারণে মন্দাবস্থা থাকে। কিন্তু এবার ছিল ভিন্ন চিত্র।

‘এতে ভালো যেটা হয়েছে, ঈদের পর যখন পুঁজিবাজার লেনদেন শুরু হবে তখন কেউ আতঙ্কে বিনিয়োগ করবেন না। তখন যেসব খাতের শেয়ারের দর এখনও কম, সেগুলোতে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়াই উত্তম হবে।’

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সভাপতি আনম আতাউল্লাহ নাঈম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঈদের আগে যেভাবে পুঁজিবাজারের লেনদেন শেষ হয়েছে, তাতে সব খাতের বিনিয়োগকারীরা কম-বেশি মুনাফা পেয়েছেন। তবে বিমা খাত নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরও সজাগ থাকা উচিত ছিল।’

তিনি বলেন, ‘লকডাউনের মধ্যে যেভাবে লেনদেন হয়েছে তা আমরা ভাবতে পারিনি। কারণ লকডাউন শুরু হওয়ার আগে আতঙ্কে অনেকে শেয়ার বিক্রি করেছেন। কিন্তু লকডাউন শুরু ‍হওয়ার পর পুঁজিবাজারের অবস্থা পরিবর্তন হওয়ায় অনেকেই আবার পুঁজিবাজারের প্রতি আগ্রহী হয়েছে।’

বিনিয়োগকারীদের আচরণ বিশ্লেষণে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিনিয়োগকারীরা যেকোনো সিদ্ধান্তে দ্রুতই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। হয় শেয়ার বিক্রি করে, না হয় শেয়ার ক্রয় করে। এ সময় বিএসইসি বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিলেও তাতে বিশেষ কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। ফলে বিনিয়োগকারীরা এ সময়ে খুবই যৌক্তিক আচরণ করেছেন বলে মনে হয়।’

লকডাউনে যেভাবে বেড়েছে বাজার

লকডাউনের শুরুতে আতঙ্ক কাজ করলেও প্রায় এক মাসের লকডাউনে স্বস্তিতে ছিল পুঁজিবাজার। ৫ মে লকডাইন শুরু হওয়ার আগের দিন এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সূচকের পতন হলেও লকডাউন শুরু হওয়ার পর সূচক বেড়েছে। এদিন প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বাড়ে ৮৮ পয়েন্ট। ৬ এপ্রিল বাড়ে আরও ১০৩ পয়েন্ট।

৭ এপ্রিল বাড়ে ৫৫ পয়েন্ট।

এদিন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে পুঁজিবাজারের ৬৬ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেয়ার নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়।

এরপর ৮ এপ্রিল ও ৯ এপ্রিল পর্যায়ক্রমে ৮২ পয়েন্ট ও ৯০ পয়ন্টে কমে আসে সূচক।

কিন্তু কেন ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেয়া হয়েছে সেটি ব্যাখ্যা আসার পর অনেকটা স্থিতিশীল হয় ১১ এপ্রিল থেকে। শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটির পর লেনদেনে সূচক বাড়ে ৯০ পয়েন্ট। তারপর টানা ১০ কার্যদিবস ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত উত্থান ছিল সূচকের।

দুই সপ্তাহ উত্থান শেষে ২৬ এপ্রিল এক দিন বেশ বড় দরপতনই দেখে পুঁজিবাজার। সেদিন সূচক হারায় ৬৩ পয়েন্ট।

এরপর আবার তিন কার্যদিবস যথাক্রমে ৩৯, ১৮ ও ৪১ পয়েন্ট বাড়ার পর এক দিন সূচক কমে ছয় পয়েন্ট।

এরপর দুই-এক দিন উঠানামা হলেও ঈদের আগে টানা বেড়েছে সূচক।

৪ মে থেকে চার কার্যদিবসে যথাক্রমে ২৪, ৫৩, ১৮, ৩৯, ৭৯ ও ২৬ পয়েন্ট বেড়ে ঈদের ছুটিতে যায় পুঁজিবাজার।

লকডাউনের এ সময়ে পুঁজিবাজারে লেনদেন বেড়েছে পাঁচ গুণ। লকডাউন শুরু হওয়ার পর ৫ এপ্রিল পুঁজিবাজারে লেনদেন হয়েছিল ২৩৬ কোটি টাকা। ঈদে পুঁজিবাজার বন্ধ হওয়ার আগে ১২ মে লেনদেন হয় ১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। এই সময়ে টানা ৯ দিন হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে পুঁজিবাজারে।

প্রথম দিকে ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দেয়া কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কমলেও এমন উত্থানে দর ঘুরে দাঁড়ায় প্রায় প্রতিটি কোম্পানির।

নতুন সিদ্ধান্ত আলোচনায়

নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রথম দুদিন যে ৫০ শতাংশ করে শেয়ারদর বাড়তে পারবে তা বাতিল করা হয় এ লকডাউনে।

প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) শেয়ার এপ্রিল মাস থেকে আনুপাতিক হারে বণ্টনের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু এ সময়ে নতুন কোনো কোম্পানি না আসায় তা চলতি মে মাস থেকে কার্যকর হচ্ছে। এজন্য একজন বিও হিসাব থেকে ২০ হাজার টাকা বিনিয়োগ থাকলেও কেবল এ সুবিধা পাওয়া যাবে।

বিএসইসির এমন সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে এমন ধারণা করা হলেও যেদিন এ সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে, সেদিনই সূচক বাড়ে ১৮ পয়েন্ট। আর লেনদেন আরও ৪ কোটি টাকা বেড়ে হয় প্রায় ১ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা।

টানা ৯ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

আরও পড়ুন:
ঘরে বসে জীবন বিমার প্রিমিয়াম

শেয়ার করুন

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা

পুঁজিবাজারে লেনদেন দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। ছবি: নিউজবাংলা

বেশির ভাগ ব্যাংকের শেয়ার দর এখন অভিহিত মূল্যের কাছাকাছি বা দ্বিগুণের কম হওয়ায় ব্যাংকে টাকা রাখার চেয়ে শেয়ার কিনে রাখাই বেশি লাভজনক হচ্ছে। এখন ব্যাংকে টাকা রাখলে বছরে সাড়ে ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। অথচ শেয়ারমূল্যের তুলনায় নগদ লভ্যাংশ পাওয়া যাচ্ছে এর চেয়ে বেশি হারে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে নগদে লভ্যাংশ বিতরণের প্রবণতা আরও বেড়েছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২৩টি ব্যাংক ২ হাজার ৩৫৩ কোটি ৯০ লাখ ৪৮ হাজার ৬৪৮ টাকা ২০ পয়সা নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

এর মধ্যে ১৬টি ব্যাংক নগদের পাশাপাশি বোনাস শেয়ারও দিতে যাচ্ছে। আর সাতটি ব্যাংক কেবল নগদে লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

আর তিনটি ব্যাংক কেবল বোনাস এবং একটি ব্যাংক লভ্যাংশ না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

আরও দুটি ব্যাংক গত বছর ২০০ কোটি টাকা নগদে বিতরণ করেছিল, যেগুলো এখনও লভ্যাংশ সংক্রান্ত সভা করেনি। তারা গত বছরের মতোই লভ্যাংশ দিলে শেষ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এখন পর্যন্ত লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে মোট ২৭টি ব্যাংক। আরও চারটির লভ্যাংশ ঘোষণা সংক্রান্ত সভা বাকি আছে।

লভ্যাংশ বিতরণে বিধিনিষেধ
এবার করোনা পরিস্থিতিতে শেয়ার প্রতি ১ টাকা ৭৫ পয়সার বেশি নগদে লভ্যাংশ বিতরণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর এই সর্বোচ্চ পরিমাণ নগদে লভ্যাংশ দিয়েছে তিনটি ব্যাংক। এগুলো হলো সিটি, ইবিএল ও যমুনা ব্যাংক।

টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি নগদ লভ্যাংশ বিতরণ করতে যাচ্ছে সিটি ব্যাংক। তারা ১৭৭ কোটি টাকারও বেশি বিতরণ করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংক ১৬৯ কোটি, ইসলামী ব্যাংক, ইবিএল ১৪২ কোটি, ব্র্যাক ১৩২ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১৩০ কোটি টাকা লভ্যাংশ বিতরণ করতে যাচ্ছে।

পুঁজিবাজারে এর আগে কখনও কোনো খাতের এমনকি ব্যাংকিং খাতেরও এত বিপুল পরিমাণে নগদ লভ্যাংশ বিতরণের ইতিহাস নেই।

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা
করোনাকালে এবার বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দিয়েছিল

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলো যখন বেশি বেশি স্টক দিচ্ছিল, তখন ক্যাশ লভ্যাংশের বিষয়টি এসেছিল। এতে পুঁজিবাজারের জন্য ভালো হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা অন্তত লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় ব্যাংকে বিনিয়োগ করবেন।’

ব্যাংকে টাকার রাখার চেয়ে শেয়ার কিনলে লাভ বেশি

চলতি বছর বেশ কিছু ব্যাংক যে পরিমাণ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে সেটি সঞ্চয়ের সুদহারের চেয়ে বেশি।

বেশির ভাগ ব্যাংকের শেয়ারদর এখন অভিহিত মূল্যের কাছাকাছি বা দ্বিগুণের কম হওয়ায় এখন ব্যাংকে টাকার রাখার চেয়ে শেয়ার কিনে রাখাই বেশি লাভজনক হচ্ছে।

এখন ব্যাংকে টাকা রাখলে বছরে সাড়ে ৪ থেকে ৬ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। অথচ শেয়ারমূল্যের তুলনায় নগদ লভ্যাংশ পাওয়া যাচ্ছে এর চেয়ে বেশি হারে।

গত এক বছরে প্রাইম ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ১৪ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১৮ টাকা ৬০ পয়সা। এই ব্যাংকের শেয়ারধারীরা এবার দেড় টাকা করে লভ্যাংশ পেতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ শেয়ারদরের তুলনায় লভ্যাংশ (ইল্ড) ছিল ৮ থেকে সাড়ে ১০ শতাংশ।

প্রিমিয়ার ব্যাংক এবার শেয়ার প্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। গত এক বছরে এই ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১৪ টাকা ২০ পয়সা। এই হিসাবে এই ব্যাংকের শেয়ারধারীরা ৯ থেকে ১২ দশমিক ৬০ শতাংশ মুনাফা পাবেন।

গত এক বছরে মার্কেন্টাইলে ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ১০ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ১৪ টাকা ২০ পয়সা। এই ব্যাংকের শেয়ারধারীরা এক টাকা করে নগদ পেতে যাচ্ছেন। এই ব্যাংকের শেয়ারধারীদের ইল্ড ৭ থেকে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা
গত ছয় বছর ধরে যমুনা ব্যাংক নগদে সবচেয়ে বেশি লভ্যাংশ দিয়ে আসছে

যমুনা ব্যাংকের দাম গত এক বছরে সর্বনিম্ন ছিল ১৬ টাকা, আর সর্বোচ্চ ২০ টাকা ৪০ পয়সা। এই ব্যাংকের শেয়ারধারীরা নগদ লভ্যাংশ পেতে যাচ্ছেন ১ টাকা ৭৫ পয়সা।

যাদের শেয়ার কেনা ১৬ টাকায়, তারা শেয়ারমূল্যের প্রায় ১১ শতাংশ পাচ্ছেন লভ্যাংশ হিসেবে, আর যাদের কেনা ২০ টাকা ৪০ পয়সায়, তারা পাচ্ছেন ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ রকম আরও অন্তত ১০টি ব্যাংক আছে যেগুলোর লভ্যাংশের ইল্ড বাজারে বর্তমানে সুদহারের চেয়ে বেশি। পাশাপাশি পাওয়া গেছে বোনাস শেয়ার।

এত বেশি হারে লভ্যাংশ বিতরণ করলেও ব্যাংকের শেয়ারের দর একেবারে তলানিতে।

নিয়মিত লভ্যাংশ দিয়ে আসা তিনটি ব্যাংকের শেয়ারদর এখন ১০ টাকার নিচে। আরও একটি লোকসানি ব্যাংকের শেয়ারদর ৫ টাকার নিচে।

নিয়মিত লভ্যাংশ দেয়া অন্য একটি ব্যাংকের শেয়ারদর ১০ টাকা।

১০ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে দাম আছে নয়টির। এর মধ্যে একটি কেবল এবার ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। বাকি সবগুলোই ১০ বা তার চেয়ে বেশি হারে লভ্যাংশ দিয়েছে। এর মধ্যে একটি ২০ ও একটি ১৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে।

সাতটি ব্যাংকের শেয়ারদর এখন ১৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যে। এর মধ্যে দুটি সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে। সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে একটি।

অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, ‘পুঁজিবাজারে যে লেনদেন হয় তার ৯০ শতাংশ গেমলিং করে হয়। ব্যাংকে গেমলিং কম, কারণ তাদের ইক্যুইটি বেশি। বিনিয়োগকারীরা এখন স্বল্প সময়ের লেনদেন করে মুনাফা তুলে নেয়ার পক্ষে, যা ব্যাংকে হচ্ছে না।’

নগদে লভ্যাংশের প্রবণতা বাড়ে গত বছর থেকে

পুঁজিবাজারে নগদ লভ্যাংশের প্রবণতা বাড়ে ২০১৯ সালের বাজেটে কর প্রস্তাবের পর। তখন বলা হয়, কোনো কোম্পানি নগদ লভ্যাংশের সমপরিমাণ বোনাস দিলে বোনাসের উপর কর দিতে হবে না। আর শুধু বোনাস দিলে অথবা নগদ লভ্যাংশের চেয়ে বেশি বোনাস দিলে ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

এই বিধানের পর ২০২০ সাল থেকেই ব্যাংকগুলো বোনাসের সমপরিমাণ নগদ লভ্যাংশ দিতে থাকে। যদিও করোনা পরিস্থিতিতে ব্যাংকের হাতে নগদ টাকা রাখার সুবিধার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকগুলোকে কেবল বোনাস শেয়ার দিকে বাড়তি করারোপের শর্ত থেকে মুক্তি দেয়া হয়। তার পরেও কোম্পানিগুলো বোনাসের পাশাপাশি নগদ লভ্যাংশ বিতরণ করে।

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা
২০১৯ সালের বাজেটে বলা হয়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি কেবল বোনাস শেয়ার দিলে বেশি কর দিতে হবে। এরপর থেকে নগদে লভ্যাংশ বাড়ে

মহামারি পরিস্থিতিতে টানা দ্বিতীয় বছর এই প্রবণতা চালু রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তালিকাভুক্ত ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যার আহসান এইচ মনসুর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শেয়ারহোল্ডারদের মনোবল ধরে রাখতে প্রায় প্রতিটি ব্যাংক ভালো লভ্যাংশ দিয়েছে। ব্যাংকের আর্থিক হিসাব অনেকটাই স্বচ্ছ। যে কারণে এ খাত থেকে প্রতি বছর ভালো লভ্যাংশ দেয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেয়ারবাজারে অন্যান্য খাতের তুলনায় ব্যাংক খাত এখনও বিনিয়োগযোগ্য। লভ্যাংশের তুলনায় ব্যাংকের চেয়ে কম দামে অন্য কোনো শেয়ার নেই বললেই চলে। কিন্তু এরপরেও বিনিয়োগকারীরা সেদিকে যেতে চান না। অনেকে গুজবনির্ভর বিনিয়োগে যান।’

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের কোম্পানি সচিব আবুল বাশার বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ থেকে ভালো রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা যেন আরও সুদৃঢ় হয় সেজন্য করোনাতে ব্যাংকগুলো শেয়ারধারীদের ভালো লভ্যাংশ দিয়েছে।’

কোন ব্যাংক কত নগদ লভ্যাংশ দিল

আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এবার শেয়ার প্রতি দেড় টাকা করে লভ্যাংশ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ব্যাংকটির শেয়ার সংখ্যা ১০৬ কোটি ৪৯ লাখ ২ হাজার ১৮৫টি। এই হিসাবে ব্যাংকটি লভ্যাংশ দেবে ১৫৯ কোটি ৭৩ লাখ ৫৩ হাজার ২৭৭ টাকা ৫০ পয়সা।

ব্যাংক এশিয়া শেয়ার প্রতি লভ্যাংশ দিচ্ছে ১ টাকা করে। এই হিসাবে ব্যাংকটি বিতরণ করবে ১১৬ কোটি ৫৯ লাখ ৬ হাজার ৮৬০ টাকা।

শেয়ার প্রতি ১ টাকা হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক লভ্যাংশ বিতরণ করবে ১৩২ কোটি ৫৮ লাখ ৭৮ হাজার ৪৭৬ টাকা। পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে প্রতি ১০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি লভ্যাংশ দিচ্ছে সিটি ব্যাংক। শেয়ার প্রতি ১ টাকা ৭৫ পয়সা হিসেবে তারা বিতরণ করবে ১৭৭ কোটি ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার ৬৫৬ টাকা ৭৫ পয়সা। পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে প্রতি ১০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা
টাকার অংকে এবার সবচেয়ে বেশি নগদ লভ্যাংশ দিতে যাচ্ছে সিটি ব্যাংক

ঢাকা ব্যাংক শেয়ার প্রতি ৬০ পয়সা করে বিতরণ করবে মোট ৫৩ কোটি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৬ টাকা। পাশাপাশি ৬ শতাংশ হারে প্রতি ১০০ শেয়ারে ছয়টি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

শেয়ার প্রতি দেড় টাকা করে ডাচ বাংলা ব্যাংক দিচ্ছে ৯৪ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পাশাপাশি ১৫ শতাংশ হারে প্রতি ১০০ শেয়ারে ১৫টি বোনাস শেয়ারও দিয়েছে ব্যাংকটি।

ইবিএল শেয়ার প্রতি ১ টাকা ৭৫ পয়সা করে বিতরণ করবে মোট ১৪২ কোটি ৬ লাখ ৪৯ হাজার ২০৬ টাকা। পাশাপাশি ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রতি ২০০ শেয়ারে ৩৫টি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা
গত ডিসেম্বরে সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য নগদ ও বোনাস মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি লভ্যাংশ দিতে যাচ্ছে ইবিএল

এক্সিম ব্যাংক শেয়ার প্রতি ৭৫ পয়সা করে লভ্যাংশ দেবে মোট ১০৫ কোটি ৯১ লাখ ৮৮ হাজার ৩০১ টাকা। পাশাপাশি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রতি ২০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

ইসলামী ব্যাংক শেয়ার প্রতি ১ টাকা করে বিতরণ করবে মোট ১৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার ৬৬৮ টাকা।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শেয়ার প্রতি ৫০ পয়সা করে নগদ ও প্রতি ১০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ার দিতে যাচ্ছে। এই হিসেবে এই ব্যাংকটি বিতরণ করবে মোট ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ৮০ হাজার ১০১ টাকা ৫০ পয়সা।

শেয়ার প্রতি ১ টাকা ৭৫ পয়সা করে মোট ১৩১ কোটি ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৮৭ টাকা ৫০ পয়সা বিতরণ করবে যমুনা ব্যাংক।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক শেয়ার প্রতি ১ টাকা করে বিতরণ করবে মোট ১০৩ কোটি ৩২ লাখ ১৭ হাজার ২৮ টাকা। পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে প্রতি ১০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা
গত ছয় বছর ধরেই বেশ ভালো অংকের নগদ মুনাফা দিয়ে আসছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক

শেয়ার প্রতি ৭৫ পয়সা করে মোট ৭০ কোটি ৯৪ লাখ ৪৪ হাজার ৮৬০ টাকা ৭৫ পয়সা লভ্যাংশ দেবে এনসিসি ব্যাংক। পাশাপাশি ৭.৫ শতাংশ হারে প্রতি ২০০ শেয়ারে ১৫টি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

নতুন তালিকাভুক্ত এনআরবিসি ব্যাংক বিতরণ করবে ৫২ কোটি ৬৮ লাখ ৮৭ হাজার ৭৪৮ টাকা ৫০ পয়সা। পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে প্রতি ১০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

শেয়ার প্রতি ৬০ পয়সা হিসেবে ওয়ান ব্যাংক দিচ্ছে মোট ৫৩ কোটি ১২ লাখ সাত হাজার ৮৪৩ টাকা। সঙ্গে সাড়ে ৫ শতাংশ বোনাস শেয়ারও দেয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। এই হিসাবে প্রতি ২০০ শেয়ারে ১১টি বোনাস শেয়ার পাওয়া যাবে।

শেয়ার প্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা হারে ১৩০ কোটি টাকা ৩৮ লাখ ৩৮ হাজার ৪০৮ টাকা ৭৫ পয়সা লভ্যাংশ দেবে প্রিমিয়ার ব্যাংক। পাশাপাশি ৭.৫ শতাংশ হারে প্রতি ২০০ শেয়ারে ১৫টি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

প্রাইম ব্যাংক শেয়ার প্রতি দেড় টাকা হারে বিতরণ করতে যাচ্ছে মোট ১৬৯ কোটি ৮৪ লাখ ২৫ হাজার ২১৫ টাকা ৫০ পয়সা।

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা
প্রাইম ব্যাংকও এবার লভ্যাংশ হিসেবে প্রায় পৌনে দুইশ কোটি টাকা বিতরণ করতে যাচ্ছে

পূবালী ব্যাংক শেয়ার প্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা হারে মোট ১২৮ কোটি ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার ৭৭৩ কোটি ৭৫ পয়সা লভ্যাংশ বিতরণ করতে যাচ্ছে।

শেয়ার প্রতি ৭০ পয়সা করে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক বিতরণ করেছে মোট ৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭৩ টাকা। পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে প্রতি ১০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ারও দিয়েছে ব্যাংকটি।

শেয়ার প্রতি ৫০ পয়সা করে এসআইবিএল লভ্যাংশ দেবে মোট ৪৬ কোটি ৯০ লাখ চার হাজার ২১২ টাকা। পাশাপাশি ৫ শতাংশ হারে প্রতি ১০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

শেয়ার প্রতি টাকা হারে সাউথ ইস্ট ব্যাংক দিতে যাচ্ছে মোট ১১৮ কোটি ৮৯ লাখ ৪০ হাজার ৫২২ টাকা।

টাকার অঙ্কে সবচেয়ে কম লভ্যাংশ দিতে যাচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। এই ব্যাংকটি শেয়ার প্রতি ২৫ পয়সা করে বিতরণ করতে যাচ্ছে মোট ২৫ কোটি ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৭ টাকা। পাশাপাশি ২.৫ শতাংশ হারে প্রতি ২০০ শেয়ারে পাঁচটি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

উত্তরা ব্যাংক শেয়ার প্রতি ১ টাকা ২৫ পয়সা করে বিতরণ করতে যাচ্ছে মোট ৬২ কোটি ৭৪ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৭ টাকা ৫০ পয়সা। পাশাপাশি ১২.৫ শতাংশ হারে প্রতি ২০০ শেয়ারে ২৫টি বোনাস শেয়ারও দেবে ব্যাংকটি।

কেবল বোনাস শেয়ার দিল যারা

আরও তিনটি ব্যাংক এখন পর্যন্ত লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে যারা কেবল বোনাস শেয়ার দেবে। এর মধ্যে এবি ও আইএফআইসি ব্যাংক কেবল ৫ শতাংশ হারে (প্রতি ১০০ শেয়ারে পাঁচটি) এবং মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১০ শতাংশ হারে (প্রতি ১০ শেয়ারে একটি) বোনাস শেয়ার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

২৩ ব্যাংকের লভ্যাংশ ২ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা
গত ডিসেম্বরে সমাপ্ত অর্থবছরের জন্য কেবল বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে এমটিবি, এবি ও আইএফআইসি ব্যাংক

টানা লোকসানে থাকা আইসিবি ইসলামী ব্যাংক এবারও শেয়ারধারীদের মধ্যে কোনো লভ্যাংশ বিতরণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যেসব ব্যাংক এখনও লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি

ন্যাশনাল, রূপালী, ট্রাস্ট ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক বা ইউসিবি এখনও লভ্যাংশ ঘোষণা সংক্রান্ত সভার কথাই জানায়নি।

আরও পড়ুন:
ঘরে বসে জীবন বিমার প্রিমিয়াম

শেয়ার করুন

বিটকয়েনে ঝুঁকি দেখছে বাংলাদেশ

বিটকয়েনে ঝুঁকি দেখছে বাংলাদেশ

ডিজিটাল এই মুদ্রার মালিকানা অনলাইনে বিনিময় হয় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে। তবে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, এই মুদ্রা কেনাবেচা করা যাবে না। এর পরেও বন্ধ নেই এর কারবার আর প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে একে-ওকে গ্রেপ্তারের খবর।

বাংলাদেশের তরুণ ইমরান রহমানের কাছে ২০১১ সালে ১১টি বিটকয়েন ছিল যিনি ভিডিও দেখে খরচ করেছেন। এখন তার আফসোসের সীমা নেই।

কারণ, এখন একেকটি কয়েনের দাম ৫২ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ৪৪ লাখ টাকার বেশি। সেই ১১টি কয়েনের দাম এখন ৫ কোটি টাকা হতো।

তবে আফসোস না করে ইমরান নিজেকে প্রবোধ দিতে পারেন এই ভেবে যে, এই ভার্চুয়াল মুদ্রার হাতবদল বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। যদি তিনি বিক্রি করতে যেতেন, তাহলে আইনি ঝামেলায় পড়তে হতো।

এ অবাক করা এক বিনিময় মুদ্রা, যার কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। কাজ হয় না সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে। ডিজিটাল ক্যাশ সিস্টেমে যা পরিচালনা করে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক।

ডিজিটাল এই মুদ্রার মালিকানা অনলাইনে বিনিময় হয় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে। তবে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, এই মুদ্রা কেনাবেচা করা যাবে না।

এর পরেও বন্ধ নেই এর কারবার আর প্রায়ই গণমাধ্যমে আসে একে ওকে গ্রেপ্তারের খবর।

বাংলাদেশ মনে করছে এই ভার্চুয়াল মুদ্রা দেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সন্ত্রাসে অর্থায়ন, মাদক লেনদেন বা অর্থ পাচারে এই মুদ্রা ব্যবহার হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখনো সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা বিটকয়েন তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। সেই ধারাবাহিকতায় এখনও আমরা এ ধরনের মুদ্রার অনুমতি দিচ্ছি না।’

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ বা এবিবির সাবেক সভাপতি ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ক্রিপ্টো-কারেন্সি বা বিটকয়েনের উপরে এখনও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এই মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা ননলিগ্যাল টেন্ডার মানি। এ দেশে অধিকাংশ মানুষ ক্যাশে পেমেন্ট করতে আগ্রহী। আর বিটকয়েনে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে হয়। এজন্য আপাতত এ ধরনের কারেন্সি অনুমোদনের সময় এখনও আসেনি’।

বিটকয়েন কী

বিটকয়েন হলো এক ধরনের অনলাইন মুদ্রা বা জিডিটাল কারেন্সি। ২০০৯ সালে এটি উদ্বোধন করেন উদ্ভাবক সাতোসি নাকামোতো (ছদ্মনাম)। তবে অস্ট্রিলীয় নাগরিক ক্রেগ রাইটসও নিজেকে বিটকয়েনের উদ্ভাবক বলে দাবি করেন।

বলা হচ্ছে, এই মুদ্রার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায় না। একজনের ব্যক্তিগত ওয়ালেট থেকে আরেকজনের ওয়ালেটে লেনদেন হয়। এই ওয়ালেট হলো ব্যক্তিগত ডেটাবেজ যা কম্পিউটার, স্মার্টফোন বা ক্লাউড যাতে তথ্য সঞ্চিত থাকে। বিটকয়েন ব্যবস্থা এতটাই গোপনীয় যে ব্যবহারকারীরাও নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে পারেন। এই কারণে যারা তথ্য গোপন রাখতে চান, তাদের মধ্যে বিটকয়েন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিটকয়েন তৈরি বা কেনার পর তা গ্রাহকের হিসাবে জমা থাকে। পরে তিনি সেগুলো ব্যবহার করে পণ্য কিনতে পারেন বা বিক্রি করে দিতে পারেন। বিভিন্ন দেশে বিক্রি করলে বিটকয়েনের পরিবর্তে প্রচলিত অর্থও গ্রহণ করা যায়। বিভিন্ন কম্পিউটার ব্যবহার করে লেনদেন করা হলেও সেসব তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে হালনাগাদ করা হয়ে থাকে।

বিশ্বে এই মুদ্রার সংখ্যা এখন ৯ কোটির বেশি। প্রতিদিন যার মাধ্যমে ৫ কোটি ডলারের লেনদেন হচ্ছে ব্যাংক থেকে শুরু করে অনলাইন বেচাকেনায়। বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ধনকুবের সংখ্যা। সেই সঙ্গে বাড়ছে অর্থ গোপন করার প্রবণতা। বিটকয়েনের অর্থ গোপনীয়তায় দেবে পূর্ণ নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশের কী সিদ্ধান্ত

২০১৪ সালে বিটকয়েন লেনদেনকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক এই সংস্থা বলছে, ‘এসব মুদ্রায় লেনদেন বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত নয় বিধায় এসব ভার্চুয়াল মুদ্রার ব্যবহার বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭; সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর দ্বারা সমর্থিত হয় না।’

২০১৭ সালে এই লেনদেনকে সতর্ক করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বলা হয়, ‘নামবিহীন বা ছদ্মনামে প্রতিসঙ্গীর সঙ্গে অনলাইনে ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের দ্বারা মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।’

এ ছাড়া, অনলাইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে লেনদেনকারী গ্রাহকরা ভার্চুয়াল মুদ্রার সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনগত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারেন বলে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যবহার থেমে নেই

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতা এবং নানান নেতিবাচক উদাহরণ সামনে এলেও বাংলাদেশে বিটকয়েনের ব্যবহার থেমে নেই। তবে, ঠিক কত মানুষ এই লেনদেনে রয়েছেন তার সঠিক কোনো তথ্য কোনো সংস্থার বা প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা জুয়া, হুন্ডি, চোরাচালান, সাইবার চাঁদাবাজিতে ব্যবহার হচ্ছে এসব ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল মুদ্রা। মাঝেমধ্যেই অভিযান চালিয়ে এসব মুদ্রা লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

তবে আউটসোর্সিং পেশার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, আউটসোর্সিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অনেক প্রতিষ্ঠানই বিটকয়েন লেনদেন করে। আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকায়, অনেকেই এই লেনদেনে থাকলেও প্রকাশ করে না।

বাংলাদেশে কি অপরিহার্য?

এবিবির সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, মানুষ এখনও এই মুদ্রা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না। ফলে তারা প্রতারিত হতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘এটা কীভাবে মুভমেন্ট হচ্ছে, কীভাবে লেনদেন চলছে সেটার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই। এটার ব্যবসা এখন যেভাবে হচ্ছে, কেউ কিনে রেখে দিচ্ছেন, দাম বাড়লে আবার বিক্রি করছেন। আজ ১ ডলার দিয়ে কিনলে কাল সেটা ১০০ ডলার হয়ে যেতে পারে। ভালোভাবে না বোঝার কারণে এখানেও কিন্তু প্রতারণার একটা সুযোগ রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটার মাধ্যমে টাকা পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে এটা মানি লন্ডারিংয়ে সাহায্য করবে। এটা অনুমোদনের ধারেকাছেও আমরা নেই। এজন্য এটা বৈধতা দেয়ার প্রশ্নই আসে না।’

ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে না হলেও তিনি ডিজিটাল মুদ্রার পক্ষে মত দেন।

বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা মাত্র ১৭ লাখ। এর মধ্যে একজনেরই তিন থেকে চারটা কার্ড আছে। এমন হিসাব করলে ক্রেডিট কার্ড ৫ থেকে ৬ লাখ হবে। এখনও আমাদের দেশে কার্ডে লেনদেন কম। সেখানে ক্রিপ্টোকারেন্সি চালু হলে সমস্যা বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘পাশ্ববর্তী দেশেও এখনো এটা নিষিদ্ধ। এখনও অনেক মানুষ চেকই ব্যবহার করতে শেখেননি, সেখানে এ ধরনের কারেন্সি কীভাবে চলবে। ডিজিটাল মানি অবশ্যই চালু হবে কিন্তু তার আগে অর্থনীতিকে সেই পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে।’

এখনও এই লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশে বৈচিত্র্যপূর্ণ মুদ্রা আছে। পরবর্তীকালে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপাতত এ ধরনের মুদ্রা অনুমোদনের কোনো পরিকল্পনা নেই।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিটকয়েনের কোনো অনুমোদন নেই। তাই এর লেনদেন অবৈধ। আমাদের নোটিশে যদি এই জাতীয় লেনদেনের খবর আসে, তাহলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

আরও পড়ুন:
ঘরে বসে জীবন বিমার প্রিমিয়াম

শেয়ার করুন