নতুন উচ্চতায় প্রবাসী আয়

নতুন উচ্চতায় প্রবাসী আয়

আমিরাতে কাজ করছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। ফাইল ছবি

গত অর্থবছরে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল, চলতি অর্থবছরের সাড়ে নয় মাসেই তার চেয়ে বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এই অর্থ ৩৫ শতাংশ বেশি।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বেড়েই চলেছে। চলতি এপ্রিল মাসের ১৫ দিনেই ১১৫ কোটি ৩৩ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

চলতি ২০২০-২১ অর্থ বছরের সাড়ে নয় মাসেই (২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল) প্রায় ২০ বিলিয়ন (২ হাজার কোটি) ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে।

এর আগে কখনও পুরো অর্থবছরেও এত রেমিট্যান্স দেশে পাঠাননি প্রবাসীরা।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, রোজা ও ঈদকে সামনে রেখে স্বজনদের কাছে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। ঈদের আগ পর্যন্ত এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এক হাজার ৮৬০ কোটি ৩৮ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অংক গত অর্থবছরের পুরো সময়ের (জুলাই-জুন) চেয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। আর গত অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ের চেয়ে ৩৫ শতাংশ বেশি।

আর চলতি এপ্রিল মাসের ১৫ দিনে (১ এপ্রিল থেকে ১৫ এপ্রিল) এসেছে ১১৫ কোটি ৩৩ লাখ ডলার।

সবমিলিয়ে এই সাড়ে নয় মাসে এসেছে এক হাজার ৯৭৬ কোটি ডলার।

গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে এক হাজার ৮২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে।

গত মার্চে ১৯১ কোটি ৬৬ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত বছরের মার্চের চেয়ে ৫০ দমিক ১৭ শতাংশ বেশি। ২০২০ সালের মার্চে ১২৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার এসেছিল।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেই অর্থবছরের প্রথম মাস গত বছরের জুলাইয়ে ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল, যা এক মাসের হিসাবে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

মহামারির কারণে রেমিট্যান্স কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হলেও বাস্তবে তা ঘটেনি। মহামারির আঁচ বিশ্বের অর্থনীতিতে লাগার পর গত বছরের এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স কমলেও এরপর আবার বেড়েছে।

গত আগস্টে এসেছিল ১৯৬ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। সেপ্টেম্বরে আসে ২১৫ কোটি ১০ লাখ ডলার।

অক্টোবরে এসেছিল ২১১ কোটি ২৪ লাখ ডলার। নভেম্বরে আসে ২০৭ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। ডিসেম্বরে আসে ২০৫ কোটি ডলার।

এ বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ১৯৬ কোটি ২৬ লাখ ডলার এসেছিল। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে তা কমে ১৭৮ কোটি ডলারে নেমে আসে।

গত বছরের মার্চে ১২৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। এ হিসাবে এই মার্চে গত বছরের মার্চের চেয়ে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৫০ দশমিক ১৭ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল, কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কায় ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার রেমিট্যান্স ২২ শতাংশ কমবে। বাংলাদেশে কমবে ২০ শতাংশ।

তবে দেখা গেছে, পাশের দেশ ভারতে ৩২ শতাংশ হ্রাস পেলেও বাংলাদেশে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিভিন্ন দেশে থাকা এক কোটির বেশি বাংলাদেশির পাঠানো এই অর্থ। দেশের জিডিপিতে সব মিলিয়ে রেমিট্যান্সের অবদান ১২ শতাংশের মতো।

রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে গত অর্থবছর থেকে ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২ শতাংশ হারে প্রণোদনা, কোভিড-১৯ আতঙ্কে যার কাছে যে সঞ্চয় ছিল তা পরিবার-পরিবার পরিজনের কাছে পাঠিয়ে দেয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকে টাকা রাখলে কোনো মুনাফা বা সুদ পাওয়া যায় না। অথচ বাংলাদেশে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে ১১ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশের মতো সুদ পাওয়া যায়। প্রবাসী বন্ডের সুদের হারও ১১ শতাংশের উপরে।

‘সে কারণে বেশি মুনাফার আশায় অনেক প্রবাসী এখন প্রবাসী বন্ডে বিনিয়োগ করছেন। পরিবারের অনেক সদস্যের নামে সঞ্চয়পত্র কিনছেন। তার একটা প্রভাব রেমিট্যান্সে পড়েছে।’

মহামারির কারণে হুন্ডি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে অর্থ পাঠানোয় রেমিট্যান্স বেড়েছে বলেও মনে করছেন আহসান মনসুর। বলেন, ‘রমজানের ঈদ সামনে রেখে এই প্রবাহ আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে উল্লম্ফনের মধ্য দিয়েই অর্থবছর শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা প্রতাশা করছি এপ্রিল মাসে ২.৩ থেকে ২.৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসবে।’

রিজার্ভ ৪৩.৮৫ বিলিয়ন ডলার

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর ভর করে বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে।

মঙ্গলবার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৩ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

তবে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে।

আরও পড়ুন:
বৈদেশিক শ্রমবাজারের মেঘ কাটছে না
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে
৯ মাসেই গত অর্থবছরের চেয়ে বেশি রেমিট্যান্স
মহামারিতেও বেড়েছে ১৮ শতাংশ রেমিট্যান্স
১০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স লক্ষ্য, রাষ্ট্রদূতদের চিঠি

শেয়ার করুন

মন্তব্য