অর্থনৈতিক উন্নয়নে ১২ খাতকে গুরুত্ব ঢাকা চেম্বারের

সংবাদ সম্মেলনে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান

অর্থনৈতিক উন্নয়নে ১২ খাতকে গুরুত্ব ঢাকা চেম্বারের

খাতগুলো হলো- রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, স্থানীয় বিনিয়োগ, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানো, কর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া তরান্বিত করা, মানব সম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির উৎকর্ষসাধন, এসডিজি অভীষ্ট লক্ষ্যসমূহ, ব্লু ইকনোমি, অবকাঠামো উন্নয়ন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী দ্রুত বাস্তবায়ন ও কুটির অতিক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ১২ খাতকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।

মতিঝিলের ডিসিসিআই মিলনায়তনে শনিবার দেশের অর্থনীতিরি সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ পরিকল্পনার কথা জানান ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান। এ সময় অর্থনৈতিক পরিস্থির ওপর একটি প্রতিবেদন পেশ করেন তিনি।

করোনার মধ্যে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান ঢাকা চেম্বারের সভাপতি। সেই সঙ্গে এ খাতের বিকাশ অব্যাহত রাখতে আলাদা নীতিমালা তৈরির কথাও বলেন তিনি।

‘এসএমই খাতের বিকাশের পথে প্রধান বাধা হচ্ছে ঋণ প্রাপ্তির জটিলতা। এ খাতের উদ্যোক্তারা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঠিক মতো ঋণ পাচ্ছেন না।’

এসএমই ফাউন্ডেশন ও বিসিকের সাথে যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এখাতে ঋণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব করেন রিজওয়ান রাহমান।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে ঢাকা চেম্বার যে ১২ খাতকে গুরুত্ব দিতে বলেছে তার মধ্যে রয়েছে- রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ, স্থানীয় বিনিয়োগ, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানো, কর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া তরান্বিত করা, মানব সম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির উৎকর্ষসাধন, এসডিজি অভীষ্ট লক্ষ্যসমূহ, ব্লু ইকনোমি, অবকাঠামো উন্নয়ন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী দ্রুত বাস্তবায়ন ও কুটির অতিক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব।

প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাকালীন সময়ে সরকার ২২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ৫৪ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এসএমই খাতের অবদান ছিল ৩২ শতাংশ। করোনার প্রভাবে এটি কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল।

২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ হবে বাংলাদেশের। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে। সেজন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া দরকার বলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে।

দক্ষ জনবল ও রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান ঢাকা চেম্বারের সভাপতি। সেই সঙ্গে রপ্তানি কর কমিয়ে আনার পরামর্শ দেন তিনি।

‘বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করপোরেট কর অনেক বেশি, যা শিল্পায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। আগামী তিন বছর করপোরেট করহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে হবে।’

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি চায় ডিসিসিআই
উৎপাদনে বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিজনেস কনক্লেভ’ শুরু মঙ্গলবার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান
মানব-সম্পদ উন্নয়নে ডিসিসিআই ও ইউল্যাবের সমঝোতা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মহামারিতে মুনাফা বাড়ল ডাচ বাংলার

মহামারিতে মুনাফা বাড়ল ডাচ বাংলার

২০২০ সালের জন্য শেয়ার প্রতি ১৫ শতাংশ নগদ এবং ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে ডাচ বাংলা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। ছবি: সংগৃহীত

ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ২০২০ সালের জন্য ১৫ শতাংশ নগদ (শেয়ার প্রতি দেড় টাকা) এবং ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। আগের বছরে ব্যাংকটি ১৫ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। 

করোনা মহামারির মধ্যে শেয়ার প্রতি আয় বেড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের কোম্পানির ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের। এ অবস্থায় আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে ব্যাংকটি।

শনিবার ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ২০২০ সালের জন্য ১৫ শতাংশ নগদ (শেয়ার প্রতি দেড় টাকা) এবং ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়।

আগের বছরে ব্যাংকটি ১৫ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাংকগুলোর লভ্যাংশ দেয়ার ক্ষেত্রে সীমা বেঁধে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বলা হয়, প্রভিশন সংরক্ষণসহ অন্যান্য খরচ বাদে যেসব ব্যাংক ১৫ শতাংশ বা তার বেশি মূলধন সংরক্ষণ করতে পারবে সেসব ব্যাংক তাদের সামর্থ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ বোনাসসহ মোট ৩০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারবে।

এ নির্দেশনা অনুযায়ী সর্বোচ্চ লভ্যাংশই দিয়েছে ব্যাংকটি। এ সময়ে ব্যাংকটির শেয়ার প্রতি আয় হয়েছে ১০ টাকা। আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ৭ টাকা ৮৯ পয়সা।

সক্ষমতা অনুযায়ী আরও বেশি লভ্যাংশ দেয়ার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এর চেয়ে বেশি লভ্যাংশ দেয়ার সুযোগ নেই ব্যাংকটির।

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ নিউজবাংলাকে বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান ডাচ বাংলা ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। করোনার মধ্যে তাদের শেয়ার প্রতি যে আয় তাতে চাইলে তারা আরও বেশি হারে নগদ লভ্যাংশ প্রদান করতে পারত।

‘ডিসেম্বর ক্লোজিং হওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন লভ্যাংশ ঘোষণা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় নিয়ে সমাধান করে দেয়া।’

এ ক্ষেত্রে কোনো প্রস্তাব আছে কি না জানতে চাইলে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য অনুযায়ী লভ্যাংশ দেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। কোম্পানি মুনাফা করার পর যদি তা বণ্টন করতে না দেয়া হয় তাহলে মনে করার কারণ নেই যে, সে টাকা ব্যাংকে বা প্রতিষ্ঠানে থাকবে। কোনো না কোনো খাতে সে টাকা ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়া সুযোগ থাকবে। যেখানে লভ্যাংশ আকারে আসলে তা একটি হিসাবের মধ্যে দিয়ে যাবে।’

গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডাচ বাংলা ব্যাংকের শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫৮ টাকা ৬৫ পয়সা।

আগামী ২৬ এপ্রিল ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) হবে। বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে রেকর্ড ডেট নির্ধারণ করা আছে ২৮ মার্চ।

পরিবর্তন হবে ফ্লোর পাইস

শেয়ারধারীদের ১৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করায় রেকর্ড ডেটের পর ডাচ বাংলা ব্যাংকের ফ্লোর পাইস পরিবর্তন হবে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি যদি রাইট বা বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ আকারে প্রদান করে তবে তার রেকর্ড ডেটের পর যে দর থাকবে তার সমন্বয় দরই হবে সেই কোম্পানির ফ্লোর পাইস।

দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর পুঁজিবাজারে ধস ঠেকাতে সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দিয়ে ঘোষণা করা হয় ফ্লোর প্রাইস। তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির ক্ষেত্রেই এই দাম বেঁধে দেয়া আছে। বলা হয়েছে, এর নিচে কোনো অবস্থাতেই শেয়ারের দাম যাবে না।

বর্তমানে ডাচ বাংলা ব্যাংকের ফ্লোর পাইস নির্ধারণ করা আছে ৫৬ টাকা ৯০ পয়সা।

এর আগে ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো বাংলাদেশ লিমিটেডের ফ্লোর প্রাইস ৯০৭ টাকা ৬০ পয়সা থেকে পরিবর্তন করে ৫১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালের জন্য বিনিয়োগকারীদের ২০০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল।

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি চায় ডিসিসিআই
উৎপাদনে বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিজনেস কনক্লেভ’ শুরু মঙ্গলবার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান
মানব-সম্পদ উন্নয়নে ডিসিসিআই ও ইউল্যাবের সমঝোতা

শেয়ার করুন

এলডিসি থেকে উত্তরণ: করতে হবে বাণিজ্য চুক্তি

এলডিসি থেকে উত্তরণ: করতে হবে বাণিজ্য চুক্তি

সন্ধ্যা নামতেই আলো ঝলমল হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন ফরিদপুর-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। ছবি: সাইফুল ইসলাম

বিশ্বের প্রায় অর্ধশত দেশ, অঞ্চল ও বাণিজ্য জোটের সঙ্গে চুক্তি করার লক্ষ্যে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তবে প্রাথমিকভাবে বিশ্বের ১১টি দেশের সঙ্গে এফটিএ এবং পিটিএ করার জোর প্রস্তুতি সরকারের রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সেপা চুক্তি করারও উদ্যোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামনে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ শুরু হয়ে গেছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে পাওয়া সুবিধা হারানোর পাশাপাশি বাংলাদেশকে সংরক্ষণমুলক বাণিজ্যের পরিবর্তে বিশ্বের উদার বাণিজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

এ উদার বাণিজ্যে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুটোই রয়েছে। তবে বিভিন্ন দেশ, অঞ্চল বা জোটের সঙ্গে পরিকল্পিত বাণিজ্য চুক্তি করেই সম্ভাব্য এই ঝুঁকিকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের পথ তৈরি হবে।

সব চুক্তির ধরন ও শর্ত এক রকম নয়। এই আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোয় দেশ বা অঞ্চল, দ্বিপক্ষীয় বা বহুপাক্ষিক জাতিগোষ্ঠী বিবেচনায় অনেক ভিন্নতাও রয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশ সব সময় এগুলো বহন করার সক্ষমতা রাখে না।

এ পরিস্থিতিতে কোন পথে পা বাড়াবে বাংলাদেশ? হাতে প্রস্তুতির সময় মাত্র পাঁচ বছর।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উত্তরণের এই ঝুঁকি কমাতে পূর্বসূরীদের মতো বাংলাদেশও বাণিজ্য চুক্তি করার পদক্ষেপেই হাঁটছে। তবে কোন চুক্তিতে অগ্রসর হলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সর্বাধিক কার্যকর হবে, তা নিয়ে সরকার এবং বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, উত্তরণজনিত ঝুঁকি হ্রাস এবং সক্ষমতার উন্নয়নে উত্তরণকারী দেশগুলো মোটা দাগে চারটি চুক্তিতে নিজেকে যুক্ত করতে পারে।

এগুলো হলো ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (পিটিএ) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি, রিজিওনাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (আরটিএ) বা আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি এবং বিশেষ কোনো একটি দেশের সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) বা বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশিদারিত্ব চুক্তি।

এর বাইরেও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা বৃহত্তর অর্থনৈতিক অংশিদারিত্ব বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (আরসিইপি) অথবা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপের (টিপিপি) মতো কোনো জোটেও। তবে এর সঙ্গে দেশের ভৌগলিক সীমারেখা ও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের মানদণ্ড ও বাণিজ্যিক লাভালাভের অংকটি যুক্ত।

এই এতোসব চুক্তির মধ্যে বাংলাদেশের জন্য কোন চুক্তি উত্তরণের জন্য সর্বাধিক কার্যকর হবে? সরকারই বা কোন দিকে বেশি অগ্রসর হচ্ছে?

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেশ বুঝে চুক্তি করতে হবে।’

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমেরিকা, চীন এবং ভারতের মতো দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার মতো সক্ষমতায় বাংলাদেশ নেই। কারণ এফটিএ মানে হচ্ছে, এসব দেশের সব পণ্যের অবাধ রপ্তানির জন্য আমাদের বাজার পুরোপুরি খুলে দেয়া। এর চাপ দেশের শিল্পগুলো সামলাতে পারবে না। ভৌগলিক সীমারেখার প্রেক্ষাপটে আমাদের আরটিএগুলো সেভাবে সক্রিয় নয়। খুব বেশি আরটিএ আমরা করতেও পারিনি।

‘বাকি থাকল অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ)। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। কারণ এতে সব পণ্য আসবেও না, বাংলাদেশ থেকেও সব কিছু তারা নেবে না। যার যার দেশের চাহিদা অনুযায়ী চুক্তিতে উল্লেখ করা পণ্যগুলোর আমদানি-রপ্তানি হবে। তবে তালিকাভূক্ত পণ্য নির্ধারণে ভীষণ দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। আবার শুল্কহারের দরকষাকষির দূরদর্শিতাও দেখাতে হবে।’

আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, আপাতত পিটিএর মাধ্যমে অগ্রসর হলে সব কূলই রক্ষা হবে।

অন্যদিকে, বেসরকারি আরেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান নিউজবাংলাকে জানান, উত্তরণ পর্যায়ের এই প্রস্তুতিতে সময় বিবেচনায় এফটিএ-এর তুলনায় পিটিএর গুরুত্ব বেশি। আবার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্টতার প্রেক্ষাপটে বড় অর্থনৈতিক শক্তির দেশগুলোর সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট বা বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশিদারিত্ব চুক্তিই (সেপা) বেশি গুরুত্ব রাখে। এই চুক্তি ভারত এবং চীনসহ অনেক দেশের সঙ্গেই হতে পারে। আরটিএ বিবেচনায় তিনি আসিয়ান জোটে ভেড়ার পরামর্শ দেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার মতো বাণিজ্য জোটের সঙ্গেও পিটিএকে তিনি সমর্থন করেন।

এ নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দীন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাণিজ্যকারী দেশগুলোর সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আমাদের আন্তর্জাতিক চুক্তির পথে যেতেই হবে। সেক্ষেত্রে কার সঙ্গে আমরা কোন চুক্তি স্বাক্ষর করব, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট দেশের আগ্রহ এবং বাংলাদেশের লাভক্ষতির গ্রহণযোগ্য এবং প্রামাণ্য পর্যালোচনার ওপর। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ধরন ও সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। সরকার সব ধরনের সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়েই চুক্তির পথে এগোচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে দেশে প্রধান এই বাণিজ্য কর্মকর্তা জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার বিশ্বের প্রায় অর্ধশত দেশ, অঞ্চল ও বাণিজ্য জোটের সঙ্গে চুক্তি করার লক্ষ্যে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে বিশ্বের ১১টি দেশের সঙ্গে এফটিএ এবং পিটিএ করার জোর প্রস্তুতি সরকারের রয়েছে। এছাড়া ভারতের সঙ্গে সেপা চুক্তি করারও উদ্যোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এমন চুক্তিতেই যাবো, যেখানে আমাদের ঝুঁকিকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে পারব। তবে শুধু চুক্তি করলেই হবে না। এর পাশাপাশি নিজেদের আন্তর্জাতিক বাজার বিনা শুল্কে প্রতিযোগিতা করার মতো এবং মুক্ত বাণিজ্যের ধাক্কা সামলানোর মতো সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে। সরকার সব দিক সামলানোরই জোরদার প্রস্তুতিতে রয়েছে।’

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্ত উত্তরণ বা পদোন্নতির সুপারিশ দেয় জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (ইউএনসিডিপি)। এই উত্তরণ প্রক্রিয়ার কারণে ২০২৬ সালের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বাজার সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রবিধান অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত সুবিধায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টিসহ বিশ্বের ৫৫টি দেশে পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা (জিএসপি) পেয়ে আসছে, যা আর থাকবে না। এতে দেশের উদ্যোক্তা-রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দারুণভাবে কমে আসবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় রকমের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হতে হবে বাংলাদেশকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ভুটানের সঙ্গে পিটিএ স্বাক্ষর করেছে। বিশ্বের কোনো দেশের সঙ্গে এটিই বাংলাদেশের প্রথম পিটিএ। এখন নেপালের সঙ্গেও একই চুক্তি হতে যাচ্ছে। আগামী জুনের মধ্যেই তা স্বাক্ষর হতে পারে। পিটিএ করা হবে ইন্দোনেশিয়া এবং মালদ্বীপের সঙ্গেও। এছাড়া পর্যায়ক্রমে পিটিএর তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হলো মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, মেক্সিকো, মরক্কো, কানাডা, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, মিশর এবং একটি আঞ্চলিক গ্রুপ ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল’ (জিসিসি)।

অন্যদিকে এফটিএ স্বাক্ষরের তালিকায় রয়েছে ভিয়েতনাম, চীন, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে।

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি চায় ডিসিসিআই
উৎপাদনে বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিজনেস কনক্লেভ’ শুরু মঙ্গলবার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান
মানব-সম্পদ উন্নয়নে ডিসিসিআই ও ইউল্যাবের সমঝোতা

শেয়ার করুন

পকেট ফাঁকা করেছে মুন্নু অ্যাগ্রো

পকেট ফাঁকা করেছে মুন্নু অ্যাগ্রো

যে কোম্পানির শেয়ার দর ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার ভেতরে থাকত, ২০১৮ সালে সেটি হঠাৎ করেই বাড়তে বাড়তে চলে যায় ৫ হাজার ৮০০ টাকায়। ওই বছর ৩৫০ শতাংশ এবং পরের দুই বছর ২০ ও ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দেয়ার পর শেয়ারপ্রতি দাম সমন্বয় হয় ৯৭৬ টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু এর এখন বাজারমূল্য কৃত্রিমভাবে ফ্লোর প্রাইসের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে ৭৯৪ টাকা ৮০ পয়সায়। কিন্তু এই দামে শেয়ার কেনার মানুষ নেই।

প্রথমে ৩৫০ শতাংশ। পরে ২০ শতাংশ ও ১০ শতাংশ।

২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মুন্নু অ্যাগ্রোর বোনাস শেয়ারের হিসাব এটি।

প্রথমে কোম্পানিটির নাম ছিল মুন্নু স্টাফলার। তখন তারা উৎপাদন করত পাটকলের যন্ত্রাংশ। এখন উৎপাদন করে কৃষি যন্ত্রপাতি।

এই ব্যবসা পরিবর্তনের জন্য পরিশোধিত মূলধন ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয় তিন বছর আগে। আর তখন একে কেন্দ্র করে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়ে যায় ২০ গুণের মতো।

কিন্তু যারা উচ্চমূল্যে সেই শেয়ার কিনেছেন, তারা এখন ব্যাপক হতাশ। কারণ বিপুল পরিমাণ লোকসান দিয়েছেন তারা। ফ্লোর প্রাইসের কারণে শেয়ার দর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের নিচে নামতে পারছে না বটে। কিন্তু লোকসান গুনে কেউ শেয়ার বেচতেও পারছেন না। কারণ এই ফ্লোর প্রাইসেও নেই ক্রেতা।

যে কোম্পানির শেয়ার দর ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে থাকত, ২০১৮ সালে সেটি হঠাৎ করেই বাড়তে বাড়তে চলে যায় ৫ হাজার ৮০০ টাকায়।

১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির পেছনে তখন কাজ করেছে ভালো লভ্যাংশ দিয়ে কোম্পানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা।

ওই বছর কোম্পানিটি সাড়ে ৩০০ শতাংশ বোনাস অর্থাৎ প্রতি ১০০ শেয়ারের বিপরীতে সাড়ে ৩০০টি শেয়ার লভ্যাংশ হিসেবে দেয়।

ওই বছর উচ্চ মূল্যে যারা শেয়ারটি কিনেছেন, তাদের সবাই পড়েন বিপাকে।

বোনাস শেয়ার যোগ হওয়ার পর ৫ হাজার ৮০০ টাকার শেয়ারের দাম সমন্বয় হয় এক হাজার ২৮৮ টাকা।

পরের দুই বছর কোম্পানিটি যথাক্রমে ২০ শতাংশ ও ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দেয় লভ্যাংশ হিসেবে।

এই হিসাবে তিন বছর যিনি শেয়ারটি ধরে রেখেছেন, তার শেয়ারের দাম পড়ে ৯৭৬ টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু এর এখন বাজার মূল্য কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা হয়েছে ৭৯৪ টাকা ৮০ পয়সায়।

তাও প্রতি শেয়ারে বর্তমানে লোকসান ১৮১ টাকা ৬০ পয়সা। আর তিন বছরের বোনাস শেয়ার বিবেচনায় আনলে আগের দামে লোকসান দাঁড়ায় এক হাজার ৭৮ টাকা ৭০ পয়সা।

কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার কথা বলা হচ্ছে এই কারণে যে, গত বছর প্রতিটি কোম্পানির সর্বনিম্ন শেয়ারদর বেঁধে দিয়ে যে ফ্লোর প্রাইস ঘোষণা করা হয়, তাকে মুন্নু অ্যাগ্রোর এই দাম ঠিক করা হয়।

এই দাম ঠিক করার পর ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার যোগ হলেও ফ্লোর প্রাইস পাল্টায়নি। পাল্টালে দাম দাঁড়াতে পারত ৭২২ টাকা ৬০ পয়সা।

কিন্তু বিনিয়োগকারীদের কাছে এর বর্তমান দাম যে যৌক্তিক মনে হচ্ছে না, তা স্পষ্ট কোম্পানিটির লেনদেনের চিত্রে।

এই দামে গত এক মাসে এক দিনে সর্বোচ্চ ২৫টি শেয়ার হাতবদল হয়েছে। প্রতিদিন বিক্রেতা থাকে, কিন্তু ক্রেতা থাকে না কেউ।

কোম্পানি সম্প্রসারণ, ব্যবসা পরিবর্তনের পর মুনাফায় বৃদ্ধি হয়েছে, এমন নয়। ২০১৮ সালে ৩৫০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দেয়ার সময় শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৮ টাকা ৭৪ পয়সা। শেয়ার সংখ্যা বাড়ায় পরের দুই বছর এই আয় কমে হয় যথাক্রমে ২ টাকা ৭৪ পয়সা ও ২ টাকা ১২ পয়সা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আয় হয়েছে এক টাকা ১৭ পয়সা।

কোম্পানি সচিব বিনয় পাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০১৮ সালে আমাদের কাছে বিনিয়োগযোগ্য নগদ অর্থ ছিল। তখন আমাদের পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ৪৬ লাখ টাকা। আমাদের কোম্পানি সম্প্রসারণের জন্য তখন বিএসইসি ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে পরামর্শ করে আমরা ৩৫০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিলাম। নগদ লভ্যাংশ দিলে টাকাগুলো চলে যেত। তাই বোনাস লভ্যাংশ দিয়ে আমরা আমাদের কোম্পানির সম্প্রসারণে ব্যয় করেছি।’

তারপরও কোম্পানিটি কেন ভালো হয়নি প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের আগে জুট মেশিনের স্পেয়ার পার্টস তৈরি করতাম। সেখানেই আমাদের টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। ২০১৯ সালে এসে আমরা আমাদের কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে অ্যাগ্রো বেইস পোডাক্ট তৈরিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এখন আমরা হারভেস্টিং মেশিন, ভুট্টা মাড়াই মেশিন তৈরি করছি।

‘এই প্রজেক্টের বয়স বেশি দিন না হওয়ায় এখনও মুনাফা আসেনি। তবে আগামীতে ভালো সম্ভাবনা আছে।’

কোনো কোম্পানি অনেক বেশি বোনাস শেয়ার দিয়ে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর খবরে যারা বিনিয়োগ করেছেন, মুন্নু অ্যাগ্রোর মতো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বড় লোকসানে পড়েছেন। তবু অনেক বেশি বোনাস শেয়ার দেবে, এমন খবরে বাড়তি দাম দিয়ে হলেও শেয়ার কিনতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কমতি নেই।

২০১০ সালের পর থেকে শতভাগের বেশি বোনাস শেয়ার দেয়া প্রায় সব কোম্পানির ক্ষেত্রেই একই চিত্র দেখা গেছে।

২০১২ সালে ডেল্টা লাইফ ২১০০ শতাংশ অর্থাৎ একটি শেয়ারের বিপরীতে ২১টি, ২০১৩ সালে ফ্যামিলিটেক্সের ১০০ শতাংশ, ২০১৭, ১৮ ও ১৯ সালে স্টাইল ক্রাফটের যথাক্রমে ৮০, ৪১০ ও ১৫০ শতাংশ, জেমিনি সি ফুড ২০১৬ ও ২০১৭ সালে যথাক্রমে ৫০ ও ১২৫ শতাংশ, ২০১৮ সালে ডাচ বাংলা ব্যাংক ১৫০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দিয়ে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর পর কোম্পানিগুলো ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি ঘটাতে পারেনি।

এ কারণে এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করে বিপুল পরিমাণে লোকসানে আছেন বিনিয়োগকারীরা।

সাম্প্রতিক সময়ে কেবল বহুজাতিক দুটি কোম্পানিই শতভাগ বা তার চেয়ে বেশি বোনাস শেয়ার ইস্যুর পরও দর ধরে রাখতে পেরেছে।

কোম্পানি দুটি হলো ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো লিমিটেড বা বিএটিবিসি ও বার্জার পেইন্টস। যদিও বোনাস শেয়ার নেয়ার পর লোকসান কাটাতে বেশ কিছু সময় লেগেছে বিনিয়োগকারীদের।

২০১৮ সালে ২০০ শতাংশ বোনাস ও শেয়ার প্রতি ৫০ টাকা নগদ এবং ২০২০ সালের জন্য আবার ২০০ শতাংশ বোনাস ও শেয়ার প্রতি ৬০ টাকা নগদ মুনাফা দিয়েছে বিএটিবিসি।

দুই বছরে ধরে রাখার পর বিনিয়োগকারীরা ২০১৮ সালে উঠা চার হাজার ৮০০ টাকার সঙ্গে সমন্বয় করতে পেরেছেন।

একই পরিস্থিতি বার্জার পেইন্টসের।

২০১৮ সালে ১০০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দেয়ার পর কোম্পানিটির শেয়ারের দাম তিন হাজার টাকার কাছাকাছি চলে যায়। দুই বছর পর এখন শেয়ার পর দেড় হাজার টাকার কিছু বেশি। ফলে লোকসান কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন বিনিয়োগকারীরা।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সভাপতি আতাউল্লাহ নাঈম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেসব কোম্পানি বড় অংকের বোনাস শেয়ার দেয়, সেসব কোম্পানিতে মূলত দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হয় বেশি। বিনিয়োগকারীরা মনে করে সমন্বয়ের পর দর বাড়লে তারা লাভবান হবেন। কিন্ত যখন দেখা যায় সেই শেয়ার আর বিক্রি করা যাচ্ছে না তখনই সমস্যা তৈরি হয়।

‘এ জন্য কোম্পানির কাছে টাকা থাকলেও সেটির বিপরীতে বড় অংকের বোনাস দেয়ার প্রবণতা বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে।’

বিনিয়োগকারীদের আরেক সংগঠন বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী জাতীয় ঐক্যের সভাপতি মিজানুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘কোম্পানিগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা বলে বোনাস দিয়ে সেই অর্থ বিনিয়োগ করে না। ফলে কোম্পানির আয় বাড়ে না। এতে সার্বিক কোম্পানি ও শেয়ার দরের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে বিএসইসিকে অনেক আগেই বলেছিলাম যেসব কোম্পানি ন্যূনতম পাঁচ বছর টানা নগদ লভ্যাংশ দেবে না তাদের কে যেন বোনাস লভ্যাংশ দেয়ার অনুমতি না দেয়া হয়। কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েই দুই তিন বছর টানা বোনাস দিয়ে পরে আর টিকে থাকতে পারে না। কিন্ত বড় অঙ্কের বোনাস লভ্যাংশ প্রলোভনে শেয়ার দর বাড়লেও পরে তা আর টিকে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।’

পরের পর্বে থাকছে স্টাইলক্রাফটের কাহিনি

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি চায় ডিসিসিআই
উৎপাদনে বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিজনেস কনক্লেভ’ শুরু মঙ্গলবার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান
মানব-সম্পদ উন্নয়নে ডিসিসিআই ও ইউল্যাবের সমঝোতা

শেয়ার করুন

ওটিসিতে ৩ দিনেই শেষ ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের শেয়ার

ওটিসিতে ৩ দিনেই শেষ ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের শেয়ার

২৮ ফেব্রুয়ারি খবর আসে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পুরাতন বোর্ড বাতিল করে কোম্পানিটিতে সাত সদস্যের স্বতন্ত্র পরিচালকে দায়িত্ব দিয়েছে। এরপরই কোম্পানিটির শেয়ার কিনতে ব্যাপক আগ্রহ বাড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।

পুঁজিবাজারের দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানি হিসেবে ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেটে (ওটিসি) লেনদেন হওয়া ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের বোর্ড পুনর্গঠনের খবরে তিন দিনেই ৭৮ লাখ শেয়ার বিক্রি হয়ে গেছে।

গত ১৩ জানুয়ারি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে কোম্পানিটিকে জেড ক্যাটাগরি থেকে ওটিসিতে স্থানান্তর করে। তারপর একের পর এক আসতে থাকে কোম্পানির শেয়ার বিক্রির আদেশ।

এর মধ্যে ২৮ ফেব্রুয়ারি খবর আসে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পুরাতন বোর্ড বাতিল করে কোম্পানিটিতে সাত সদস্যের স্বতন্ত্র পরিচালকে দায়িত্ব দিয়েছে।

এর ফলে ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের প্রধান হিসেবে আর থাকছেন না তাসবিরুল আলম চৌধুরী। তাকে সরিয়ে দিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কাজী ওয়াহিদুল আলমকে।

এভিয়েশন ব্যবসায় বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া ওয়াহিদুলের। তিনি বাংলাদেশ বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি পর্যটন ও এভিয়েশন বিষয়ক একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

নতুন পর্ষদের আরও আছেন এম সাদিকুল ইসলাম, মাসকুদুর রহমান সরকার, এটিএম নজরুল ইসলাম, প্রফেসর ড. বদরুজ্জামান ভূইয়া, মুহাম্মদ ইউনুস ও মুহাম্মদ শাহ নেওয়াজ।

বিএসইসির এমন সিদ্ধান্তে পাঁচ বছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ ইউনাইটেডে এয়ারওয়েজে বিনিয়োগ করা হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। বিনিয়োগ করা অর্থ আবার ফিরে পাবার প্রত্যাশা শুরু হয়।

এমন খবরের তিন দিন পরেই ওটিসি মার্কেটে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের বিক্রির আদেশ দেয়া ৭৮ লাখের বেশি শেয়ার বিক্রি হয়ে গেছে গত ৩ মার্চ।

ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যে দেখা গেছে, এদিন এক কোটি ৪৮ লাখ ১০ হাজার ৩৮০ টাকায় ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ৭৮ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০টি শেয়ার বিক্রি হয়েছে।

বর্তমানে এই কোম্পানির ১৭ হাজার ৬৮০টি শেয়ার বিক্রির অপেক্ষায় আছে, যা বিক্রির আদেশ দেয়া হয়েছে গত ৪ মার্চ।

গত সপ্তাহের রোববার বস্ত্র খাতের দুই বন্ধ প্রতিষ্ঠান সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল ও ফ্যামিলি টেক্সের পরিচালনা পর্ষদও পুনর্গঠন করা হয়েছে। যার প্রভাবে টানা তিন কার্যদিবস এই কোম্পানিগুলো উঠে এসেছিল দর বৃদ্ধি পাওয়া শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকায়। এর আগের বিএসইসি বস্ত্র খাতের আরেক কোম্পানি রিং সাইন টেক্সটাইলের বোর্ড পুনর্গঠন করেছে।

তহবিল সংকটের আশ্বাস বিএসইসির

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পুনরায় চালুর জন্য গঠন করা নতুন বোর্ড শুরুতেই তহবিল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিএসইসির কাছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিএসইসির সহায়তা চেয়েছে নতুন পর্ষদ।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের দায়িত্বপ্রাপ্ত বোর্ডের প্রধান কাজী ওয়াহিদ উল আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা আগামী সপ্তাহে নতুন বোর্ড নিয়ে বসব। তখন কোম্পানির আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ধারনা পাব। তবে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব থাকবে কোম্পানিটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার। চেষ্টা থাকবে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুরক্ষা দেয়ার।’

বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, কোম্পানিটির নতুন র্বোড আমাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। আমরা তাদের সব ধরনের আইন কানুন সম্পর্কে অবহিত করেছি। তাদের বক্তব্যও আমরা শোনেছি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা একটি কোম্পানি চালুর করতে কিছু সমস্যা থাকবেই। যে কোনো সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে সব ধরনের সহযোগিতা তাদের করা হবে।

কোম্পানির আর্থিক অবস্থা

২০১০ সালে পুঁজিবাজার যখন চাঙা, তখন কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। শুরুর দিকে ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে। তবে ২০১৫ সালের পর খারাপ অবস্থায় যেতে থাকে কোম্পানিটি। এক পর্যায়ে উদ্যোক্তা পরিচালকরা তাদের হাতে থাকা প্রায় সব শেয়ার বিক্রি করে কোম্পানিটিই বন্ধ করে দেন।

৮২০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিটির ৮২ কোটি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে আছে মাত্র আড়াই শতাংশ শেয়ার। অথচ বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকতে কথা উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর কোম্পানিটির আর কোনো আর্থিক বিবরণী তৈরি হয়নি। সেখানে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির কোনো আয় নেই। তবে ২০১৬ সালের রেভিনিউ দেখানো হয়েছে ১১৯ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানের কোনো সেল নেই ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। বর্তমানে ওটিসিতে কোম্পানিটি প্রতিটি শেয়ার লেনদেন হচ্ছে এক টাকা ৯০ পয়সায়।

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি চায় ডিসিসিআই
উৎপাদনে বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিজনেস কনক্লেভ’ শুরু মঙ্গলবার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান
মানব-সম্পদ উন্নয়নে ডিসিসিআই ও ইউল্যাবের সমঝোতা

শেয়ার করুন

যে কারণে বাজার পেল না রাইস ব্র্যান অয়েল

যে কারণে বাজার পেল না রাইস ব্র্যান অয়েল

ব্যাপক সম্ভাবনা নিয়ে দেশে রাইস ব্র্যান ওয়েলের উৎপাদন শুরু হলেও ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে এই ভোজ্যতেলের বাজার। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

বিপুল সম্ভাবনার রাইস ব্র্যান অয়েল প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। চালের কুঁড়া থেকে তৈরি এ তেল বেশি পুষ্টিকর হওয়া সত্ত্বেও সয়াবিন ও পাম অয়েলকে সরিয়ে বাজার তৈরি করতে পারেনি।   

বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে দেশে যাত্রা শুরু করেছিল চালের কুঁড়া থেকে উৎপাদিত ভোজ্যতেল রাইস ব্র্যান অয়েল। কিন্তু দেড় দশক না যেতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে খাতটি। সয়াবিন ও পাম অয়েলের জায়গা দখল করতে পারেনি এটি। মুনাফা না থাকায় পিছু হটতে শুরু করেছেন উৎপাদকেরা।

একে একে দেশে ২০টি প্রতিষ্ঠান রাইস ব্র্যান অয়েল উৎপাদনে এসেছে। তবে ব্যবসা করতে পারছে না কেউই। বরং বাজার চাহিদা তৈরির প্রতিযোগিতায় রাইস ব্র্যানকে টেক্কা মেরে সয়াবিন ও পাম অয়েলের ব্যবহার আগের চেয়ে আরও বেড়েছে।

স্থায়ীভাবে ক্রেতা তৈরি করতে পারেনি রাইস ব্র্যান। ব্যাপক বাজার চাহিদা তৈরি করতে না পারায় বাস্তব রূপ পায়নি এ খাতের সম্ভাবনা।

অন্যদিকে রাইস ব্র্যানের তুলনায় সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বেশ কম, সরবরাহ বেশি। ঘর থেকে বের হলেই বিভিন্ন আকৃতির বোতলে যেকোনো মুদি দোকানেই মেলে এসব তেল।

রাইস ব্র্যানের চিত্র এর বিপরীতমুখী। যারা আগ্রহ নিয়ে এই তেল ব্যবহারে এগিয়ে এসেছিলেন, তারা ফের সয়াবিনে ফিরে গেছেন। এর অন্যতম কারণ, দোকানগুলোতে এই তেল খুব বেশি পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও ক্রেতার চাহিদামতো বোতলের সাইজ পাওয়া যায় না। রাইস ব্র্যান অয়েলের বেশির ভাগ বোতলই পাঁচ লিটারের।

এখনও যারা এই ভোজ্যতেল ব্যবহার করছেন, তাদের অনেকেরই ঝোঁক দেশি রাইস ব্র্যানের পরিবর্তে বিদেশ থেকে আমদানি করা সানফ্লাওয়ার অয়েলে বা অন্য তেলে। ফলে ক্রেতা সংকটে দিন দিন বাজার হারাচ্ছে রাইস ব্র্যান। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে উৎপাদনে।

আশানুরূপ মুনাফার দেখা না পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন উৎপাদকেরা। কেউ কেউ রাইস ব্র্যান উৎপাদন বন্ধ রেখেছেন। কেউ করছেন সক্ষমতার আংশিক উৎপাদন। সেটাও বছরের সব সময় হচ্ছে না। কেউ আবার বড় অংকের পুঁজি বাঁচাতে রাইস ব্র্যান অয়েল পরিশোধন বা রিফাইন থেকে মুখ ফিরিয়ে ওই কারখানায় সস্তা দরের সয়াবিন পরিশোধনের দিকে হাত বাড়িয়েছেন।

কেউ আবার রাইস ব্র্যানে থেকেও ব্যয়বহুল পরিশোধনে না গিয়ে এর অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল উৎপাদনে ঝুঁকছেন, যা উৎপাদকেরা অপেক্ষাকৃত কম দামে রপ্তানি করছেন ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে ২০ হাজার টন ক্রুড রাইস ব্র্যান অয়েল রপ্তানি হয়েছে। এখানেও মিলছে না ন্যায্যমূল্য। যদিও ভারত, চীনসহ আমদানিকারক দেশগুলোয় চড়া দামে রাইস ব্র্যান অয়েল বিক্রি হচ্ছে। এসব দেশে এই তেলের জনপ্রিয়তা অন্য তেলের চেয়ে বেশি। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার খাতটির প্রতি ব্যাপকভাবে নজর না দিলে দেশে রাইস ব্র্যান অয়েলের স্থানীয় উৎপাদন ও বাজারজাত অচিরেই শূন্যের কোটায় নেমে আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যসব ভোজ্যতেলের তুলনায় চালের কুঁড়ার তেল বেশি স্বাস্থ্যসম্মত।

চালের কুঁড়ার তেল বেশি পুষ্টিকর

বাজারে প্রচলিত অন্যসব ভোজ্যতেলের তুলনায় চালের কুঁড়া থেকে উৎপাদিত তেল বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। বিশ্বের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর তেল হিসেবেও এর স্বীকৃতি আছে।

বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা (বিসিএসআইআর) বলছে, ভোজ্যতেলে যেসব খাদ্যগুণ থাকা উচিত, তা জলপাই তেলের পর সবচেয়ে বেশি রয়েছে রাইস ব্র্যান অয়েলে। এতে আছে পর্যাপ্ত ভিটামিন ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট।

তাছাড়া, এই তেল শরীরের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়, নানা ধরনের রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, রোগ প্রতিরোধী শক্তিকে উন্নত করে ফ্রি-র‌্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

কাঁচামাল পুরোটাই দেশি উপজাত

সয়াবিন, সরিষা, সূর্যমুখী ও পাম অয়েলসহ এখন পর্যন্ত যত রকমের ভোজ্যতেল ব্যবহার হচ্ছে, তার কোনোটির কাঁচামালেই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় বাংলাদেশ। ফলে চাহিদা অনুযায়ী ভোজ্যতেলের সরবরাহ সচল রাখতে এসব তেলের কাঁচামাল অথবা ক্রুড বিদেশ থেকে আনতে হয়। এর বিপরীতে রাইস ব্র্যান অয়েলের কাঁচামাল অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই পুরোপুরি জোগান পাওয়া যায়। দেশের ধানকলগুলোয় উপজাত হিসেবে এটি তৈরি হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিইএ) গবেষণা প্রতিবেদন মতে, বর্তমানে অটো, সেমিঅটো ও সাধারণ রাইস মিলে ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার টন চালের কুড়া উৎপাদন হচ্ছে। এর থেকে তেল পাওয়ার হার গড়ে ১৬ শতাংশ ধরলেও বছরে ৭ লাখ ৬৮ হাজার টন রাইস ব্র্যান অয়েল পাওয়ার কথা। অথচ দেশে সবকটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মিলে বছরে ৩ লাখ টন কুঁড়া ব্যবহার করছে, যা থেকে বছরে গড়ে তেল তৈরি হচ্ছে ৪৫ হাজার থেকে ৪৮ হাজার টন। এটাও পুরোপুরি বাজারজাত করা যাচ্ছে না চাহিদার অভাবে।

রাইস ব্র্যান অয়েলের দাম সয়াবিন ও পাম অয়েল থেকে কিছুটা বেশি। ছবি: নিউজবাংলা

ভোক্তার অভ্যাস নেই, দামও বেশি

কেন দেশে এ তেলের বাজার সম্প্রসারণ করা গেল না, এমন প্রশ্নের জবাবে মজুমদার ব্র্যান অয়েল মিলস লিমিটেডের পরিচালক অর্জুন মজুমদার নিউজবাংলাকে জানান, দেশে অনেক দিন ধরে মানুষ রান্নার কাজে সয়াবিনের তেল ব্যবহার করে আসছে। অভ্যাস বদল করে ভোক্তারা এখনও রাইস ব্র্যানে আসক্ত হতে পারেনি।

তিনি বলেন, ‘এর অন্যতম কারণ হচ্ছে রাইস ব্র্যানকে গ্রহণযোগ্যমাত্রায় পরিশোধন করলে তা দেখতে কালচে লাল বা অনেকটা সরিষার তেলের মতো দেখায়। অথচ ক্রেতারা চকচকে রঙের স্বচ্ছ তেল পছন্দ করেন। আবার রাইস ব্র্যানকে বেশি চকচকে করতে গেলে এর ন্যাচারাল পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। অনেকে অবশ্য চকচকে করেই বাজারে ছাড়ছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক পদার্থ অতিমাত্রার ব্যবহারের কারণে উৎপাদন খরচও অনেক বেশি পড়ছে।

‘প্রতি লিটার উৎপাদনেই খরচ পড়ে যাচ্ছে ১৪০-১৫০ টাকা। এটা খুচরা বাজারে কোম্পানিভেদে ১৬০ টাকা বা এর বেশি দাঁড়ায়। একদিকে ক্রেতার অনাগ্রহ, অন্যদিকে বাড়তি দামের নেতিবাচক প্রভাবে সয়াবিনের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি রাইস ব্র্যান। বরং এখনও ভোজ্যতেল হিসেবে সয়াবিন-পাম অয়েলের নিয়মিত ক্রেতা ৯৯ ভাগেরও বেশি।’

অর্জুন মজুমদার জানান, এই দেশে হরহরামেশাই বিদেশি পণ্য বিক্রি হয়। বিদেশি বলে দ্বিগুণ দামে কিনতেও ক্রেতার আপত্তি হয় না। যত আপত্তি এই রাইস ব্র্যানে। ক্রেতার দৈন্যতা, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা আর বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সয়াবিন-পাম অয়েলের বাজারজাতে আগ্রাসী তৎপরতা এর জন্য দায়ী।

অয়েল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. জাকিরুল ইসলাম ডলার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেশে করোনা টিকা সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে যেভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা হয়েছে, রাইস ব্র্যানকে ঘরে ঘরে নিয়ে যেতে এমন একটা গণপ্রচারণার প্রয়োজন ছিল।

‘এ ক্ষেত্রে উৎপাদকেরা তো পারেননি বটেই, রাষ্ট্রীয়ভাবেও রাইস ব্র্যানকে সেভাবে ব্র্যান্ডিং করা সম্ভব হয়নি। ফলে আমরা ভোক্তার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারিনি। এর বহুবিধ উপকারিতা সম্পর্কেও তাদের জানান দিতে ব্যর্থ হয়েছি।’

ভোক্তা কম হওয়ায় দোকানগুলোতে রাইস ব্র্যান অয়েল খুব একটা পাওয়া যায় না। ছবি: নিউজবাংলা

দেশি বাজারের চেয়ে রপ্তানিতে ঝোঁক

কেবিসি অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট (প্রা.) লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক তাপস চন্দ্র দেবনাথ নিউজবাংলাকে জানান, দেশে ভোক্তারা এ তেল খেতে চায় না। চাহিদা কম। প্রতিযোগিতা বেশি। দামও বেশি।

তিনি বলেন, এসব কারণে প্রতিযোগিতায় রাইস ব্র্যানের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ধাক্কা সামলাতে না পেরে ইতিমধ্যে কেবিসি এবং যমুনা অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেড, আল নূর অয়েলসহ বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এ তেল উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এর পরিবর্তে কেউ কেউ রাইস ব্র্যানের ক্রুড অয়েল বিদেশে রপ্তানি করছেন। এসব কারণে দেশের বাজারে রাইস ব্র্যানের সরবরাহ কমে গেছে।

রাইস ব্র্যান অয়েলের কাঁচামাল চালের কুঁড়া আসে দেশের চালকলগুলো থেকে।

তাপস চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ চালের কুঁড়া পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কুঁড়ার সরবরাহ সেভাবে মিলছে না। চাহিদা অনুযায়ী কুঁড়া সব সময় না পাওয়া এবং স্থানীয়ভাবে কুঁড়ার দাম বেশি হওয়ার কারণেও উৎপাদন পর্যায়ে দাম বেশি পড়ছে। তবে দেশে এর বাজার বড় না হলেও বিদেশে চাহিদা প্রচুর। আমরা এখন রপ্তানি বাজারটাকে ধরার চেষ্টা করছি। সে ভরসাতেই উৎপাদকরা এখন রপ্তানিতে মনোযোগী হতে শুরু করেছে। তবে এর জন্য সরকারের নীতিগত সহায়তা দরকার।’

ভোজ্যতেল আমদানিতে ১৬ হাজার কোটি টাকা

দেশে ভোজ্যতেলের বার্ষিক চাহিদা ১৯-২০ লাখ টন। এ চাহিদার বিপরীতে তেলজাতীয় শস্য উৎপাদন হচ্ছে ১০ লাখ টন, যা থেকে ভোজ্যতেল পাওয়া যাচ্ছে ৪ থেকে ৫ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার ৯২ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

ভোজ্যতেল আমদানিতে প্রতিবছর দেশের খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ ইকোনমিক রিভিউয়ে বলা হয়েছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভোজ্যতেল আমদানিতে দেশের ব্যয় হয়েছে ১১৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। আগের ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১৮৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাইস ব্র্যানের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে এ চাহিদার অন্তত ৫০ ভাগ দেশীয় উৎস থেকে পূরণ করা যেত। এতে আমদানিতে বেঁচে যেত বৈদেশিক মুদ্রা।

রাইস ব্র্যানের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গবেষণা হয়েছে। লক্ষ্যের পথে হাঁটতে একটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (গবেষণা) প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে খাতটির উন্নয়নে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার কথা। কিন্তু সময় গড়ালেও কাজের কাজ কিছু হয়নি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) কমলারঞ্জন দাশের কাছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এ সম্পর্কে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এদিকে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভোজ্যতেলের আমদানি ব্যয় কমাতে ২৭৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। তেলজাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদা পূরণ ও আমদানি ব্যয় কমানোই এর মূল উদ্দেশ্য।

এই প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, ‘পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এ প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। যা বাস্তবায়িত হলে বাজারে ভোজ্যতেলের সিন্ডিকেট বলতে আমরা যা শুনি তার আধিপত্য কমাবে। এতে বাজার স্থিতিশীলতা বজায় থাকার পাশাপাশি দামও ক্রেতার সীমার মধ্যে থাকবে।’

কিন্তু সরকারের এই উদ্যোগেও দেখা মিলেনি রাইস ব্র্যানের বাজার সম্প্রসারণের কার্যকরী পরিকল্পনা।

বাজারে রয়েছে নানা ব্র্যান্ডের রাইস ব্র্যান অয়েল। ছবি: নিউজবাংলা

বাজারে যেসব ব্র্যান্ড

পাবনার ঈশ্বরদীতে ২০১১ সালে রশিদ অয়েল মিলস লিমিটেড ‘হোয়াইট গোল্ড’ নামে ধানের কুঁড়ার তেল উৎপাদন শুরু করে। প্রায় একই সময়ে উৎপাদনে আসে ময়মনসিংহে অ্যামারেল অয়েল ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেডের ‘স্পন্দন’। এছাড়া বগুড়ার মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ‘স্বর্ণা’, কেবিসি অ্যাগ্রোর ‘হেলথ কেয়ার’, রশিদ অয়েল মিলস লিমিটেডের ‘হোয়াইট গোল্ড’, ফিড ইন্ডাস্ট্রিজের ‘বাসমতি’, আলি ন্যাচারাল অয়েলের ‘কল্যাণী’, মজুমদার ব্র্যান অয়েল মিলস লিমিটেডের ‘পিওর গোল্ড’, আল নূর অয়েলের ‘আল নূর’, ওয়েস্টার অ্যাগ্রোর ‘ব্রানোলা’, যমুনা অ্যাগ্রোর ‘সেরা’, এসিআই কোম্পানির ‘নিউট্রিলাইফ’, বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের ‘ফরচুন’সহ আরও কয়েকটি রাইস ব্র্যান অয়েল বাজারে রয়েছে।

এছাড়া অ্যাগ্রোটেক ইন্টারন্যাশনাল, তামিম অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আব্দুল মোনেম, রায় হার্ট অয়েল লিমিটেড, প্রধান অয়েল মিলস লিমিটেড উৎপাদনে এসেছে। তবে এখন সুপারশপগুলোয় দু-তিনটি ব্র্যান্ড ছাড়া বেশির ভাগ ব্র্যান্ডের উপস্থিতি চোখে পড়ে না বললেই চলে।

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি চায় ডিসিসিআই
উৎপাদনে বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিজনেস কনক্লেভ’ শুরু মঙ্গলবার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান
মানব-সম্পদ উন্নয়নে ডিসিসিআই ও ইউল্যাবের সমঝোতা

শেয়ার করুন

তামাক ব্যবসা থেকে সেরা করদাতা

তামাক ব্যবসা থেকে সেরা করদাতা

কর দিয়ে ১৪ বার পুরস্কার পাওয়া ব্যবসায়ী কাউস মিয়া। ছবি: নিউজবাংলা

৭০ বছরের ব্যবসায়ী জীবনে ব্যাংক থেকে নেননি কোনো ঋণ। সরকারকে কর দিচ্ছেন ৫৩ বছর ধরে। ১৪ বার ভূষিত হয়েছেন বিভিন্ন রাজস্ব পুরস্কারে। মুজিববর্ষে জাতীয় পর্যায়ে জিতলেন সেরা করদাতার সম্মাননা। পুরস্কারটি হাতে পেয়ে ব্যবসায়ী কাউস মিয়া উত্তরাধিকারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘নিজে খাবা, গরিবরে দিবা’।

‘মুজিববর্ষে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতার সম্মাননা’ নিতে এসে নিজের ৭০ বছরের ব্যবসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক হাজি মো. কাউস মিয়া। নিজের বাবার মতো তিনিও উত্তরাধিকারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘নিজে খাবা, গরিবরে দিবা’।

জাতীয় রাজস্ব ভবনে শুক্রবার কাউস মিয়ার হাতে সেরা করদাতার সম্মাননা স্মারক, মানপত্র ও পুরস্কার তুলে দেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।

এ সময় নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে কাউস মিয়া বলেন, ‘আপনারা যে আয়োজন করছেন, তাতে আমার মনে যে আনন্দ, ৭০ বছর ব্যবসা করেও আমি এই আনন্দ পাইনি।’

অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ২০২০-২০২১ অর্থবছরের বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তিতে ‘মুজিববর্ষে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতার সম্মাননা’ কার্যক্রমটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সর্বোচ্চ করদাতাদের বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে ব্যক্তি পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি সর্বোচ্চ করদাতার সম্মান অর্জন করা এবং জাতীয় রাজস্ব খাতের সকল পুরস্কার পাওয়া কাউস মিয়াকে মুজিববর্ষে সেরা করদাতা নির্বাচন করা হয়।

কাউস মিয়ার জন্ম ১৯৩১ সালে ২৬ আগস্ট চাঁদপুর শহরে। তার পিতা আলহাজ আব্বাস আলী মিয়া ব্যাপারী ও মাতা ফাতেমা খাতুন। পূর্বপুরুষেরা তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যে বাস করতেন।

নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নের সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে কাউস মিয়ার। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কিশোর বয়সেই তিনি চাঁদপুর শহরে ব্যবসায়ী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন। সে সময় তিনি ১৮টি ব্র্যান্ডের বিস্কুট, সাবান ও সিগারেটের এজেন্ট হন। পরে আলোচনায় আসেন তামাক ব্যবসা দিয়ে। তার হাকিমপুরী জর্দা দেশে এক নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

২০ বছর ব্যবসা করার পর ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জে এসে ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে ৪০টি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কাউস মিয়া। আগা নবাব দেউড়ীতে থেকে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করছেন তিনি।

একেবারে তৃণমূল থেকে উঠে আসা কাউস মিয়া সরকারকে কর প্রদান শুরু করেন ১৯৬৮ সাল থেকে। ৬৩ বছর একনিষ্ঠ ও স্বপ্রণোদিতভাবে নিয়মিত কর প্রদান করে আসছেন।

কর প্রদানে সততা, আন্তরিকতা ও স্বপ্রণোদনার স্বীকৃতিস্বরূপ কাউস মিয়াকে জাতীয় রাজস্ব খাতের গুরুত্বপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড সিআইপি মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঢাকা জেলার ‘কর বাহাদুর’ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। কর প্রদানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ধারাবাহিকভাবে ১৪ বার বিভিন্ন রাজস্ব পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।

‘মুজিববর্ষে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতার সম্মাননা’ পেয়ে আনন্দে আপ্লুত হন কাউস মিয়া। বলেন, ‘আজকে আমি আনন্দিত। সবাইকে অনেক জানাচ্ছি। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমাকে যে স্মরণ করছেন, সে জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। এনবিআরের চেয়ারম্যান এই মুজিবর্ষে আমাকে স্মরণ করেছেন এ জন্য তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আত্মার শান্তি কামনা করি।’

কাউস মিয়ার হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে ‘মুজিববর্ষে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতার সম্মাননা’। ছবি: নিউজবাংলা

ব্যবসায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার স্মৃতি তুলে ধরে কাউস মিয়া জানালেন, তিনি এখনও অনেক ব্যবসায় জড়িত। অনেক ব্যবসা বাদও দিয়ে দিয়েছেন। প্রথম জীবনে করেছেন ৪০-৪২টা ব্যবসা।

‘আমার বাড়িঘর ও অনেক সম্পদ আছে। আমি সাতজন জমিদারের নাতি, আমার নানারা সাত ভাই ছিল। আজকেও এখন সব সম্পত্তি আমার কাছে আছে, সবাইকে বলছি আমাদের জায়গা সম্পদ তোমরা নিয়ে নাও। আমার ছেলে সন্তানদের নামে জায়গা আছে। ঢাকা শহরে আমার বড় জায়গা আছে। আল্লাহই দিছে, ব্যবসা করেই করছি।’

কাউস মিয়া জানালেন, তিনি নিজে বা পূর্ব বংশের কেউ কখনও ব্যাংক থেকে ঋণ নেননি। অনীহা রয়েছে রাজনীতিতেও।

‘ব্যাংক থেকে আমার পূর্ব বংশেও কেউ ঋণ নেয়নি, আমিও নেইনি। আমার পূর্ব বংশের কেউ রাজনীতি করেননি, আমিও করি না। ছেলেকেও করতে দেই না।

‘আমার ছেলের বংশ থেইক্যা কেউ সরকারি চাকরি করেন নাই। আমার বাবার কথা হইল রাজনীতিতে যাইবা না। নিজে খাবা গরিবরে দিবা। এইটাই তোমাদের সম্পদ।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান রহমাতুল মুনিম জানান, সবাইকে একবাক্যে স্বীকার করতে হবে যে, মুজিববর্ষে জাতীয় পর্যায়ে সেরা করদাতা হিসেবে কাউস মিয়াকে নির্বাচন করাটা যথার্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কর প্রদান একটি আইনি নির্দেশ, রাষ্ট্রের তরফ থেকে বাধ্য করার একটি বিষয়। তবে আজীবন কাউস মিয়া কর প্রদানকে দায়িত্ববোধ হিসেবে নিয়েছেন। কর প্রদান করাটিকে আনন্দ হিসেবে নিয়েছেন। এটি একটি রাষ্ট্রীয় বিরল উদাহরণ হয়ে থাকবে।

‘উনার (কাউস মিয়া) এই কর প্রদানের প্রতি আগ্রহ, ভালোবাসা দেখে আমাদের মনে হয়েছে যে, তিনি এই সম্মাননা পাওয়ার একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি।’

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি চায় ডিসিসিআই
উৎপাদনে বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিজনেস কনক্লেভ’ শুরু মঙ্গলবার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান
মানব-সম্পদ উন্নয়নে ডিসিসিআই ও ইউল্যাবের সমঝোতা

শেয়ার করুন

গাড়ি আমদানির জট খুলছে মোংলা বন্দরে

গাড়ি আমদানির জট খুলছে মোংলা বন্দরে

গত চার মাসে নিলামে ওঠে পাঁচ শতাধিক গাড়ি। এর মধ্যে ৯৯টি ছাড় করতে পেরেছেন ক্রেতারা। আটকে থাকা গাড়িগুলোর দ্রুত খালাসের বিষয়ে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সমাধান হলে নিলামে আগ্রহ বাড়ে ক্রেতাদের।

মোংলা বন্দরে গাড়ির জট খুলতে শুরু করেছে। নিলামের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ায় এটি সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোংলা কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা গাড়িগুলো নিলামে তোলায় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ছাড় করে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই জট কমেছে।

গত চার মাসে নিলামে ওঠে পাঁচ শতাধিক গাড়ি। এর মধ্যে ৯৯টি ছাড় করতে পেরেছেন ক্রেতারা।

বন্দর কর্তৃপক্ষ ও মোংলা কাস্টম হাউজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান মোংলা বন্দর দিয়ে গাড়ি আমদানি করে।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মামলার কারণে খালাস কার্যক্রম ব্যহত হয়। ফলে বন্দর শেড ও ইয়ার্ডে গাড়ির জট লাগে।

নিয়ম অনুযায়ী, আমদানি করা গাড়ি বন্দরে পৌঁছার ৩০ দিনের মধ্যে ছাড় করিয়ে না নিলে সেগুলো নিলামে চলে যায়। বিক্রির জন্য কাস্টম কর্তৃপক্ষ গাড়ি নিলামে তোলে।

তবে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মামলার কারণে নিলাম প্রক্রিয়ায় ক্রেতাদের সাড়া মেলেনি।

আটকে থাকা গাড়িগুলোর দ্রুত খালাসের বিষয়ে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সমাধান হলে নিলামে আগ্রহ বাড়ে ক্রেতাদের।

একই সঙ্গে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো তাদের গাড়ি ছাড় করায় আগ্রহ দেখানোর ফলে মোংলা বন্দরে গাড়ির জট আস্তে আস্তে খুলেছ। তবে প্রচুর গাড়ি পড়ে রয়েছে এখনও।

সরেজমিনে বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, শুল্ক জটিলতার কারণে শেড ও ইয়ার্ডে খালাসের অপেক্ষায় সারিবদ্ধভাবে পড়ে রয়েছে টয়োটা, নিশান, নোয়া, এক্সজিও, প্রোবক্স, প্রিমিও, লেক্রাস, পাজেরো, পিকআপ, এলিয়ান ও মার্সিডিজসহ অসংখ্য গাড়ি।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) মোস্তফা কামাল নিউজবাংলাকে বলেন, ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোংলা বন্দর দিয়ে কয়েক হাজার গাড়ি আমদানি হয়েছে।

বর্তমানে বন্দরের শেড ও ইয়ার্ডে ২ হাজার ৬৪৩টি গাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে ৯৬১টি গাড়ি ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আমদানিকৃত। এগুলো নিলামযোগ্য।

মোংলা কাস্টম হাউজের কমিশনার মো. হোসেন আহমেদ নিউজ বাংলাকে বলেন, আমদানিকৃত রিকন্ডিশন্ড গাড়ির বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী খালাস করা হচ্ছে।

অনেক পুরাতন গাড়ি আছে, যেগুলো আমদানিযোগ্য ছিল না। এসব গাড়ির বিষয়ে সরাসরি দেখছে এনবিআর।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনুমতি দিলে গাড়িগুলো নিলামে ওঠানো যেতে পারে বলে জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছয় মাস আগেও বন্দরে অনেক গাড়ি ছিল। যে কারণে জট লাগে। বারভিডার সঙ্গে আলোচনা ও এনবিআরের নির্দেশনা মেনে চলায় জট আগের চেয়ে অনেক কমেছে।

দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা বাকি গাড়িগুলো একযেগে নিলামে বিক্রি হবে কিনা এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাথে আলোচনা হয়েছে।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, ক্লিয়ারেন্স পারমিটের কারণে যে সব গাড়ি দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে, সেগুলোর বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেখবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্লিলিয়ারেন্স পারমিট পেলে দ্রুত নিলামে বিক্রি করতে পারব।‘

করোনার কারণে গাড়ি আমদানি কমলেও রাজস্ব আদায়ে তেমর প্রভাব পড়ে নি বলে জানান তিনি।

চলতি অর্থবছরে বছর মোংলা কাস্টম হাউজ ৫ হাজার ২৬৬কোটি টাকা রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে ২ হাজার ৭শ কোটি টাকা।

অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে আদায় আরও বাড়বে বলে জানান কাস্টম কমিশনার হোসেন আহমেদ।

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ‘মুক্তবাণিজ্য’ চুক্তি চায় ডিসিসিআই
উৎপাদনে বৈশ্বিক কেন্দ্রস্থল হবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বিজনেস কনক্লেভ’ শুরু মঙ্গলবার
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান
মানব-সম্পদ উন্নয়নে ডিসিসিআই ও ইউল্যাবের সমঝোতা

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg