‘বিশেষ সুবিধা’ দিয়ে অর্থপাচার ঠেকানোর চিন্তা

‘বিশেষ সুবিধা’ দিয়ে অর্থপাচার ঠেকানোর চিন্তা

এক সেমিনারে ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত যারা টাকার পাচার করেন তাদের ‘সুবিধা দিয়ে’ দেশেই টাকা রাখা যায় কি না- সে বিষয়ে চিন্তা করতে এনবিআরকে তাগিদ দেন। জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ প্রস্তাবের সঙ্গে আমি একমত। পাচার রোধে বিশেষ কর সুবিধা দেওয়া যায় কিনা- আমাদের চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।’

‘বিশেষ সুবিধা’ দিয়ে অর্থপাচার রোধ করা যায় কিনা সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একজন বিশিষ্ট চিকিৎসকের প্রস্তাবের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম একথা জানিয়েছেন।

সোমবার জাতীয় আয়কর দিবস উপলক্ষে অয়োজিত এক সেমিনারে তিনি আরও জানান, দেশ থেকে অর্থপাচার রোধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কীভাবে টাকা পাচার বন্ধ করা যায় সে কর্মকৌশল খুঁজে বের করতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করা হবে।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এনবিআর সম্মেলন কক্ষে এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনবিআর সদস্য মো. আলমগীর হোসেন। মূল প্রবন্ধে স্বচ্ছ ও আধুনিক করসেবার মাধ্যমে করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের কথা বলা হয়।

সেমিনারে অনলাইনে যুক্ত হয়ে আলোচনায় অংশ নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ, প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস বাংলাদেশের ম্যানেজিং পার্টনার মামুন রশিদ প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধে আলমগীর হোসেন বলেন, এক দশকে কর বেড়েছে সাড়ে তিনশ শতাংশ। আয়কর খাতে প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ।

এসময় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত হলে করদাতার সংখ্যা আরও বাড়বে। এই লক্ষ্য আমরা কাজ করছি।’

প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, ‘অনেকে বিদেশে টাকা পাচার করছেন। এ টাকা উদ্ধারে শক্তিশালী ও কার্যকর আইন করতে হবে।’

যারা টাকার পাচার করেন তাদের ‘সুবিধা দিয়ে’ দেশেই টাকা রাখা যায় কি না- সে বিষয়ে চিন্তা করতে এনবিআরকে তাগিদ দেন তিনি।

জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘এ প্রস্তাবের সঙ্গে আমি একমত। পাচার রোধে বিশেষ কর সুবিধা দেওয়া যায় কিনা- আমাদের চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।’

একই সঙ্গে কার্যকর আইন প্রণয়নে শিগিগরই সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠকে বসবেন জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মূলত আমদানি-রফতানির আড়ালে আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসের মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার হয়। কর ফাঁকির টাকাও দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে।

প্রতি বছর দেশ থেকে কত টাকা পাচার হয় তার কোনো সঠিক তথ্য নেই সরকারের কাছে। এ বিষেয় তেমন কোনো গবেষণাও হয়নি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, ২০১৫ সালে বাণিজ্যের নামে কারসাজির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। টাকার অংকে যার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রতি বছর দেশের বাইরে টাকা পাচার বাড়ছেই। কার্যকর কোনো আইন না থাকায় বিপুল পরিমাণ এ টাকা উদ্ধার করতে পারছে না সরকার।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানান, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় টাকা পাচারের সত্যতা সরকার পেয়েছে। প্রাথমিকভাবে অর্থপাচারে জড়িত যাদের তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে সরকারি কর্মচারীই বেশি।

এমন প্রেক্ষাপটে অর্থপাচারকারীদের নাম-ঠিকানার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চেয়েছে হাই কোর্ট।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মধ্যম আয় এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার যে লক্ষ্য ঠিক করেছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব আহরণ অনেক বাড়াতে হবে। সেজন্য সৃষ্টি করতে হবে করদাতাবান্ধব পরিবেশ।’

নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘আমরা মাত্র দশ বছরে মাথা পিছু আয় ৭০০ ডলার থেকে প্রায় তিনগুণ বাড়িয়ে ২ হাজার ৬৪ ডলারে উন্নীত করেছি, যে সাফল্যে আমাদের প্রতিবেশীরাও উদ্বিগ্ন।’

এই সাফল্য ধরে রাখতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেন বিআইডিএস-এর এ গবেষক।

মামুন রশিদ বলেন, ‘রাজস্ব বাড়াতে হলে অবশ্যই করদাতাদের সঙ্গে কর প্রশাসনের দূরত্ব কমাতে হব।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য