লাভ হলো না দাম বাড়িয়েও

সরকার দাম বাড়িয়ে সর্বোচ্চ দাম ৩৫ টাকা ঠিক করলেও কারওয়ান বাজারের দাম দেখা গেছে ৪৫ থেকে ৫০। ছবি: নিউজবাংলা

লাভ হলো না দাম বাড়িয়েও

খুচরা বাজারে দাম এখনও ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারিতে দাম বেশি। পাইকারদের কেউ কেউ দাবি করছেন, তারা নির্ধারিত দামেই বিক্রি করছেন। কেউ বলেছেন, দাম কমতে আরও সময় লাগবে।

কেজিতে পাঁচ টাকা দাম বাড়িয়ে, টিসিবির মাধ্যমে কমে বিক্রি করেও আলুর বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারল না সরকার। নির্ধারিত দর ৩৫ টাকায় মিলছে না রান্নায় বহুল ব্যবহৃত সবজিটি।

গত ৭ অক্টোবর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ৩০ টাকা সর্বোচ্চ ঠিক করে পাইকারি ও হিমাগারে দর বেঁধে দেয়। তবে সে দামে আলু বিক্রি হচ্ছিল না কোথাও।

এই পরিস্থিতিতে ‘বাস্তব অবস্থা বিবেচনায়’ মঙ্গলবার কৃষি বিপণন অধিদপ্তর খুচরায় সর্বোচ্চ ৩৫, পাইকারিতে ৩০ আর হিমাগারে দাম ২৭ টাকা পুনঃনির্ধারণ করে।

পরদিন ট্রাকে করে খোলাবাজারে ২৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি শুরু করে টিসিবি। রাজধানীতে ৮০টি ট্রাকে দুই হাজার চারশ টন আলু বিক্রি করেছে সরকার। কিন্তু এর কোনো প্রভাব নেই খুচরা বাজারে।

কারওয়ান বাজার, মহাখালী, মোহাম্মদপুর, শ্যামবাজারে আগের মতোই খুচরায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা করে আলু বিক্রি হতে দেখা গেছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রতিষ্ঠান টিসিবি বলছে, বুধবার দেশে আলুর দাম ছিল ৪২ থেকে ৪৫ টাকা।

টিসিবির আলু বিক্রি শুরু
বুধবার থেকে টিসিবি ট্রাকে করে ২৫ টাকা দরে আলু বিক্রি শুরু করেছে

খুচরা বিক্রেতা বলছেন, আড়তে দাম বেশি, আড়তদাররা বলছেন, তারা কেবল কমিশনে বিক্রি করেন। দাম নির্ভর করে হিমাগারের ওপর।

বাজারে আলুর সরবরাহও বেশ কম। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটে অল্প পরিমাণ আলু নিয়ে বসেছিলেন খুচরা ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম।

দাম কত?

জবাব এল, ‘৫০’।

কয় কেজি নেবেন জিজ্ঞেস করেই মাপাও শুরু করে দিলেন।

সাংবাদিক পরিচয় দিলে দোকান ছেড়ে উঠে এসে পাশে দাঁড়ান। বলেন, ‘আমার ছবি নিছেন। সেটা ডিলেট মাইরা দেন। আর আলুর কেজি ৩৫ টাকা।’

আলুর দাম কমেনি
গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় পেলে বিক্রেতারা দাম বলছেন কম

সরকারের বেঁধে দেয়া ৩৫ টাকায় না করে কেন বেশি দাম রাখছেন, এমন প্রশ্নে আরেক খুচরা বিক্রেতা বলেন, ‘আমরাই আড়তদারদের থিকা কিনি ৪০ টাকায়। ৩৫ টাকাই বেচলে তো উলটা লস।’

মহাখালী কাঁচাবাজারের খুচরা ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘যত ঝামেলা সব আমাদের। আড়তদাররা রাইতের বেলা ৪০ টাকা দরে আমগোর কাছে বেইচচা চইলা যায়। আর ম্যাজিস্ট্রেটের ঝামেলা পোহাই আমরা। চাপ দেয় ৩৫ টাকায় বেচার। আমরা কি অহন নিজের টেকা ভর্তুকি দিয়া কম দামে বেচুম?’

‘আমরা কম দামে কিনতে পারলে, কম দামে বেচুম। তাতে তো আমাদের কোনো সমস্যা নাই’- বলেন এই ব্যবসায়ী।

শ্যামবাজারের আড়তদার জয়নাল মিয়ার কাছে মোবাইল ফোনে প্রশ্ন ছিল, দাম কত।

দাবি করেন, দাম ৩০। বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধি উপস্থিত রেখেই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আমরা ৩০ টাকা দরে বিক্রি করছি। আমাদের কাছে রশিদ আছে।’

খুচরা ব্যবসায়ীরা যে বলছেন বেশি দাম?

এমন প্রশ্নে জয়নাল বলেন, ‘খুচরা ব্যবসায়ীরা বেশি টাকা লাভের আশায় বানিয়ে কথা বলে।’

জয়নাল সত্যি বলেছেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে আরেক আড়তদার মঞ্জুর মিয়ার কথায়। তিনি বলেন, ‘দাম নির্ধারণ হয়েছে দুইদিন হইল। আমরা তো পুরাতন আলু, পুরান দামেই কিনছি। তাই আগের দামেই বেচতে হইতাছে। আর সব খরচ মিলাইয়া ৩০ টাকা বেইচা আমাদের হাতে কিছুই থাকে না। সরকারকে আমাদের কথাও ভাবতে হইব।’

হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেন সরকারের কাছে ২৭ টাকায় আলু বিক্রির অঙ্গীকার করে এসে এখন বলছেন উল্টো কথা। তার দাবি, ‘২৭ টাকায় পোষায় না’।

নিউজবাংলাকে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘এখন আলুর কেজিতে খরচ আছে ২৩ টাকা। আনুষঙ্গিক যে খরচ তার কস্ট তো কম না। তার মধ্যে এই সিজনে আলু রাইখা দিলে ওজন কইমা যায়। সরকার যে দাম দিয়েছে এই দামে কীভাবে বিক্রি করবে?’

‘তাও আমরা ২৭ টাকা দরেই বিক্রি করছি। তারপরে পাইকাররা আর খুচরা ব্যবসায়ীরা কি করছে আমরা জানি না। তারা নির্ধারিত মূল্যের বাইরে বিক্রি করলে তার দায় আমাদের না। মনিটরিং করা হোক। ব্যবস্থা নেয়া হোক।’

আলুর ঘাটতির তথ্য

হিমাগার মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর কোল্ড স্টোরেজে এই সময়ে আলু মজুদ ছিল ৫৫ লাখ টন। এ বছর মজুদ হয়েছে ৪৫ লাখ টন। অর্থাৎ এবার ১০ লাখ টন কম।

কৃষি বিপণন অধিদফতর সহকারী পরিচালক মজিবর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দাম নির্ধারণের সভায় হিমাগার মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী এদের সবাইকে রাখা হয়েছে। তাদের সম্মতি নিয়েই দাম ঠিক করা হয়েছে। তাই এখন অভিযোগ করে নিজেদের সিন্ডিকেট ঢাকার সুযোগ নেই।’

আলুর ঘাটতির তথ্য
বুধবার খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বাজারে স্বাভাবিকের চেয়ে কম আলু দেখা গেছে

তবে আলুর ঘাটতির কথা স্বীকার করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলে টানা চার মাস প্রলম্বিত বন্যার কারণে এবারে আবার আলুর আবাদও কম ছিল। করোনায় ত্রাণ কার্যক্রমে প্রচুর পরিমাণ আলু কিনেছে বিভিন্ন সংগঠন। তাছাড়া বিদেশি দাতা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ আলু কিনেছে।’

সরকারের ২০ শতাংশ ভর্তুকির কারণে গত বছরের তুলনায় চলতি বছর প্রায় ৪০ গুণ বেশি আলু রপ্তানি হয়েছে।

হিমাগারে আলুর মজুদ কম রয়েছে এমন তথ্য দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত পণ্যটি রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, দেশের ৩৯৩টি হিমাগারে এখনো ২২ থেকে ২৩ লাখ টন আলু মজুদ আছে। এর মধ্যে বীজ আলু আছে ১০ লাখ টন। আগামী ডিসেম্বরে নতুন আলু বাজারে আসার কথা। কিন্তু বন্যার কারণে সেটি বিলম্বিত হতে পারে। ফলে প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন আলু ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে রপ্তানি হয়েছিল তিন লাখ ৩৬ হাজার ডলারের আলু। আর চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে রপ্তানি হয়েছে এক কোটি ৪৮ হাজার ডলার মূল্যের আলু।

শেয়ার করুন

মন্তব্য