করোনা শেষে আসছে চীনা বিনিয়োগ

করোনা শেষে আসছে চীনা বিনিয়োগ

কোভিড-পরবর্তী বিদেশি বিনিযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী চীন। এ সুযোগ কাজে লাগাতে সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

করোনা পরবর্তী বিনিয়োগ স্থানান্তরের বা রি-লোকেশনের দিকে ঝুঁকছে চীন। বিশেষ করে সংযোজন শিল্প ও উৎপাদনমুখী অনেক কারখানা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইনে নিয়ে যাচ্ছে দেশটি।

বাংলাদেশেও বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছে দেশটি। ফলে কোভিড-পরবর্তী বিদেশি বিনিযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে চায় সরকার।

গত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি বিনিয়োগে খরা যাচ্ছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ অনুপাত বর্তমানে ২৩ শতাংশ। পাঁচ বছর একই জায়গায় তা ঘুরপাক খাচ্ছে। করোনা তা আরো পিছিয়ে দিয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষাপটে বিশ্ব্যব্যপী বিনিয়োগ স্থানান্তরের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের তা নজরে এনেছে। এ নিয়ে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করতে কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। একটি কমিটি গঠনেরও সিদ্বান্ত হয়।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মূলত দুটি কারণে চীন অপর দেশে বিনিয়োগে উৎসাহী। চীনে জীবনমান উন্নত হওয়ায় সে দেশে মজুরি বেড়ে গেছে। ফলে পণ্য উৎপাদনে খরচ বেড়েছে।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভালো নয়। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনেক কারখানা সরিয়ে নিচ্ছেন চীনের উদোক্তারা। বিকল্প খুঁজছে দেশটি।

যোগাযোগ করা হলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি (ডিসিসিআই) আবুল কাসেম খান নিউজবাংলাকে বলেন, কোভিড-পরবর্তী চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ এদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে আমাদের।

বিনিয়োগ বিকাশে কিছু বাধা আছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এগুলো সমাধান করতে হবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিতে হবে।

গত বছর দেশে এফডিআই এসেছে ২ বিলিয়নের কাছাকাছি। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভিয়েতনামে এসেছে ১৭ বিলিয়ন ডলার।

আবুল কাসেম খান বলেন, বর্তমানে আমাদের অর্থনীতির যে আকার, সে অনুযায়ী জিডিপির কমপক্ষে চার শতাংশ এফিডআই থাকা উচিত। অথচ আছে মাত্র ১ শতাংশ। সে জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বর্তমানে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক রয়েছে। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারসহ অনেক মেগা প্রকল্প চীনের ঋণে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

চীনের সংগে সম্পর্ক আরো গভীর হয় তিন বছর আগে, যখন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং ঢাকা সফর করেন। বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, আইসিটি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে ২৪ বিলিয়ন (২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার) চুক্তি সই হয়। যদিও চুক্তির অগ্রগতি এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য নয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী, ২৭টি প্রকল্পের মধ্যে সাতটি প্রকল্পে অর্থ ছাড় নিশ্চিত করেছে চীন সরকার। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন।

চীন এখন ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে কোভিড-পরবর্তী সময়কাল বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। চীনের খ্যাতনামা কোম্পানি ইয়াবেং গ্রুপ বাংলাদেশ প্রিন্টিং, ডাইং, ওষুধ ও কেমিক্যাল শিল্পে ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে।

এছাড়া ওরিয়েক্স বায়োটেক স্থানীয় সামিট টেকনোলজির সঙ্গে কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্কে ৩০ কোটি ডলারেরর প্লাজমা প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। বর্তমানে প্রায় একশ চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসা করছে।

চীনের বিনিয়োগে উজ্জ্বল সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৭৭৪ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে চাইনিজ ইকোনোমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজে)। বিনিয়োগে বাধা অপসারণে প্রয়োজনীয় আইন-কানুন সহজ ও প্রণোদনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্ব্যংকের ‘ইজ অব ডুইয়িং বিজনেস-২০১৮’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসার পরিবেশের দিক দিয়ে র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৩। এমনকি যুদ্ববিধ্বস্ত আফগানিস্তানের চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

সরকারের লক্ষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে একশতে উঠে আসা। এ জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস (একই জায়গা থেকে সব সেবা দেয়া) সেল গঠন, কোম্পানি আইন সংশোধনসহ প্রয়োজনীয় আইন-কানুন সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

ঢাকা চেম্বারের বর্তমান সভাপতি সামস মাহমুদ বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও সহায়ক নীতির কারণে চীন বর্তমানে উৎপাদন খাতের অনেক কারখানা, বিশেষ করে সংযোজন শিল্প, বাংলাদেশে স্থানান্তর করতে চায়।

তিনি আরো বলেন, বিদ্যমান শুল্ক ও কর নীতিতে কিছু জটিলতা আছে। বিশেষ করে পণ্য আমদানিতে কাস্টমসের এইচএস কোডে নানা অস‌ঙ্গতি ও জটিলতা রয়েছে।

ইপিজেড ও এর বাইরে শিল্প স্থাপনে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য আছে। বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে এসব সমস্যা সমাধান করেতে হবে। এ জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) একটি ‌হেল্‌প ডেস্ক চালুর দাবি জানান তিনি।

বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কমিটি

কোভিড-পরবর্তী বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এনবিআরের সদস্য (করনীতি) আলমগীর হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৬ অক্টোবর চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আরো কী কী সুবিধা দেয়া যায়, বিশ্বের অন্যান্য দেশে কী ধরনের প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে, দেশীয় এবং বিদেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে কোথায় বৈষম্য আছে এবং তা কীভাবে দূর করা যায়–এসব বিষয় পর্যালোচনা করে এ কমিটি সুপারিশ করবে সরকারকে। আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন তৈরি করে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেবে কমিটি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য