20201002104319.jpg
সার্বজনীন পেনশন: কৌশলপত্র অনুমোদন শিগগিরই

নৌযান থেকে কয়লা নামাচ্ছেন শ্রমিকরা। ছবি-নিউজবাংলা

সার্বজনীন পেনশন: কৌশলপত্র অনুমোদন শিগগিরই

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামতের পর কৌশলপত্রটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। সব মিলিয়ে এতে দুই মাস সময় লাগতে পারে। মন্ত্রিসভা সায় দিলে এই কৌশলপত্রের ভিত্তিতে তৈরি হবে নতুন আইন।

হাছান আহমেদ রাজধানীর বেসরকারি একটি হাসপাতালে চাকরি করেন। বেতন ছাড়া আর কোনো আয় নেই। যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন, সেখানে পেনশন তো দূরের কথা, প্রভিডেন্ড ফান্ড, গ্র্যাচুইটি কিছুই নেই। চাকরি শেষে আর্থিক অনিশ্চয়তার চিন্তা সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায় তাকে।

হাছানের মতো বেসরকারি চাকরিজীবী থেকে শুরু করে অপ্রতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সবার কাছে পেনশন সুবিধা শুধুই কল্পনা। তবে বিশাল জনগোষ্ঠীকে ‌সার্বজনীন পেনশনের আওতায় আনতে তৈরি হয়েছে সরকারের কৌশলপত্র। দুই মাসের মধ্যে এটি উঠতে পারে মন্ত্রিসভায়।

সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে 'সাম্য' প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সার্বজনীন পেনশনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় সবার জন্য পেনশনের একটি রূপরেখা প্রণয়নের আশ্বাসও দেন তিনি।

শ্রমজীবী নারী-পুরুষ
শ্রমজীবী নারী-পুরুষ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতি বাস্তবায়নের কৌশলপত্রটি এ বছরেই তৈরি হয়েছে। এর ওপর মতামত দিতে সেপ্টেম্বরের শেষে চিঠি পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে।

মতামত পাওয়ার পর কৌশলপত্রটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। সব মিলিয়ে এতে দুই মাস সময় লাগতে পারে। মন্ত্রিসভা সায় দিলে এই কৌশলপত্রের ভিত্তিতে তৈরি হবে নতুন আইন।

প্রস্তাবিত পেনশন পদ্ধতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব এ আর এম নাজমুস ছাকিবকে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘এটি একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। চাইলেই দ্রুত করা যাবে না। আইন-কানুনের বিষয় আছে। তাছাড়া অংশীজনের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।’

নাজমুস ছাকিব বলেন, ‘ভারতে ২০০৩ সালে এ বিষয়ক আইন তৈরি হওয়ার ১০ বছর পর আংশিক কার্যকর করা গেছে। আমাদের সরকারও এটা করতে ওয়াদাবদ্ধ। ’

বেসরকারি খাতে কোথাও কোথাও ভবিষ্যৎ তহবিল (প্রভিডেন্ড ফান্ড) এবং গ্র্যাচুইটি সুবিধা থাকলেও পেনশনের বিষয়টি নেই। ফলে চাকরি শেষে বিপুল অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন বিপুল সংখ্যক মানুষ।কৃষক

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কমকর্তারা বলেছেন, দেশে গড় আয়ু ও প্রবীণের সংখ্যা বাড়ায় সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে সার্বজনীন পেনশন সুবিধার প্রয়োজনীয়তা বেড়ে চলেছে।

এক কর্মকর্তা জানান, সার্বজনীন পেনশনের জন্য একটি নির্দিষ্ট আইন এবং এর তহবিল পরিচালনার  জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে।  সরকারের অনুমোদিত এক বা একাধিক কোম্পানির মাধ্যমে এসব তহবিল পরিচালিত হবে।

সার্বজনীন পেনশন হতে পারে 'অংশীদারত্বের ভিত্তিতে'। এতে চাকুরে এবং নিয়োগ কর্তৃপক্ষ উভয়েরই অবদান বা অংশগ্রহণ থাকবে।

একজন কর্মজীবী তার মাসিক বেতন বা আয় থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেবেন এ তহিবলে। একই সঙ্গে নিয়োগ কর্তৃপক্ষও সমপরিমাণ টাকা জমা দেবে। অন্যদিকে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীরা সঞ্চয়ের নির্দিষ্ট অংশ জমা দেবেন।

এভাবে তহবিলের জমা হওয়া টাকা সরকারের মাধ্যমে স্বীকৃত লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা হবে। এই বিনিয়োগ থেকে পাওয়া লভ্যাংশ থেকে 'সুবিধাভোগী'দের অবসরকালীন মাসিক পেনশন দেওয়া হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কমকর্তারা জানান, তহবিল কীভাবে পরিচালিত হবে, চাকরিজীবী বেতনের কত অংশ জমা দেবেন, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কত টাকা দেবে, বিনিয়োগের অর্জিত আয়ের কত অংশ সুবিধাভোগীদের দেওয়া হবে- সেসব বিষয় আইনি কাঠামোর মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।

সার্বজনীন পেনশনের উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছেন অর্থনীতিবিদেরা। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন বলেও মত তাদের।

সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সাবেক ঊর্ধ্বতন পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের দেশে বেশিরভাগ কর্মজীবী অপ্রতিষ্ঠানিক খাতের। আর বেসরকারি খাতের বেশিরভাগই ছোট ছোট কোম্পানি। অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। এ অবস্থায় বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন সুবিধার আওতায় আনা চ্যালেঞ্জিং হবে।’

বিবিএসের সবশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট শ্রমশক্তির সংখ্যা ৫ কোটি ৮৭ লাখ। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী পাঁচ শতাংশ। বেসরকারি খাতে নিয়োজিত আছে ১০ শতাংশ। এই ১৫ শতাংশ মিলে প্রাতিষ্ঠানিক খাত। বাকি ৮৫ ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের, যাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই।

বর্তমানে ১১ লাখ সরকারি চাকরিজীবী মাসিক পেনশন পান। এজন্য বছরে সরকারের খরচ হয় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।

শেয়ার করুন

মন্তব্য