20201002104319.jpg
বই বিক্রি চলে যাচ্ছে অনলাইনে

রাজধানীর নীলক্ষেত বইয়ের বাজারে এক ক্রেতা। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

বই বিক্রি চলে যাচ্ছে অনলাইনে

করোনাকালে দোকানগুলো ফাঁকা প্রায়। বইয়ের বিক্রি বেশিরভাগ চলে যাচ্ছে অনলাইনে। তবু দোকান গুটিয়ে নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। বলছেন, পরিস্থিতি যাই হোক, পাঠকের পছন্দ বই নেড়েচেড়ে দেখা।

পড়তে ভালোবাসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র আজমাঈন তূর হক। পছন্দের বিষয় সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ পড়েন নিয়মিত। সময় পেলেই ঢুঁ মারেন বইয়ের দোকানে।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের নিচ তলায় বইয়ের দোকানগুলোতে ঘুরছিলেন আজমাইন। হাতে ছিল বেশ কিছু বই; নতুন কেনা।

‘দোকানে ঘুরে ঘুরে বইয়ের পাতা উল্টে, ঘ্রাণ শুঁকে পছন্দের বইগুলো কিনেছি। কী যে ভালো লাগছে!’, নিউজবাংলাকে অনুভূতির কথা বলেন ওই তরুণ।

মার্চের শুরু থেকে পছন্দের জায়গাটিতে আর আসা হয়নি। সাত মাস আজিজের বইয়ের দোকানে আসা হয়নি করোনার কারণে। সব যখন খুলছে, তখন তিনিও আর অপেক্ষা করেননি।

‘এই সাত মাস কি বইয়ের বাইরে ছিলেন?’

‘না, না, তা হবে কেন? বই না পড়লে আমার চলে না। অনলাইনে অর্ডার করে কিনেছি।’

অনলাইনেই যখন বই পাওয়া যায়, তখন দোকানে কেন, তার একটি ব্যাখ্যা দিলেন আরেক পড়ুয়া রাজদীপ দত্ত।

ডাক্তারি পড়ছেন বারডেম মেডিক্যালে। করোনাকালে বন্ধ কলেজ। আছেন হবিগঞ্জে। সেখানে পছন্দের বই পাওয়া আরও কঠিন। বইয়ের ক্ষুধা তিনিও মিটিয়েছেন অনলাইনে অর্ডার করে। তবে প্রাণ ভরেনি।

রাজু বলেন, ‘অর্ডার দেয়ার পর ঘরে বসেই পেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু দোকানে একটা কিনতে গিয়ে আরও তিনটা কিনে ফেরার আনন্দ এখানে পাচ্ছি না।’

Boost Online Book sell
ক্রেতাশূন্য অবস্থায় এক বই বিক্রেতা। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস

 

আজিজের বইয়ের দোকানে আজমাইনের মতো ক্রেতা আসছেন দুয়েক জনই। ক্রেতা না বাড়ায় হতাশ বিক্রেতারা।

একই চিত্র দেশে সবচেয়ে বড় বইয়ের মার্কেট বাংলাবাজারে। প্রকাশকরা জানালেন, বিক্রি প্রায় শূন্য; অলস বসে কাটে দিন।

বাতিঘর প্রকাশনী বের করে মূলত সাহিত্যের বই। ছোট গল্প, ফিকশন, ভ্রমণ কাহিনিই বিক্রি হয় বেশি।

বাতিঘরের ব্যবস্থাপক আতিকুর রহমান বলেন, ‘গত ২২ মার্চ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। জুনে দোকান খোলার পরও বিক্রি একদমই হচ্ছে না। যতটুকু যা বিক্রি, বেশিরভাগ অনলাইনে রকমারি আর আমাদের ফেসবুক পেজে।’

রকমারি ডটকমের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান মাহমুদুল হাসান সাদী বলেন, ‘মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বই ডেলিভারির কাজ পুরোপুরি বন্ধ ছিল। তবে মে মাস থেকে যখন বিক্রি আবার শুরু হলো, তখন করোনার আগের সময়ের চেয়ে অর্ডার প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।’

বাংলাবাজারে যারা পাঠ্য বা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেফারেন্স বই বেচেন, তাদের হতাশা আরও বেশি। তাদের বিক্রি নেই অনলাইনেও।

ঢাকেশ্বরী লাইব্রেরির সৌমিত্র ঘোষ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আমরা যারা পাঠ্যবই ও রেফারেন্স বইয়ের প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত, তারা পুরোপুরি লোকসানে। বাধ্য হয়ে আমরাও অনলাইনে সাহিত্যের বই বিক্রি শুরু করেছি। অনলাইনে বিক্রি করে আমরা প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পেরেছি।’

রাজধানীর বাংলাবাজারে একটি বইয়ের দোকান। ছবি: নিউজবাংলা

 

প্রকাশনায় বেশ পুরনো নাম মাওলা ব্রাদার্স। বিক্রি করে সাহিত্য ও পাঠ্য—দুই ধরনের বইই। করোনাকাল তাদের ঠেলে দিয়েছে কেবল সাহিত্যের বইয়ের দিকে।

আবুল বাশার বললেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন শুধু সাহিত্যের বইয়ের বাজারই কিছুটা টিকে আছে। সেটা দিয়ে আমরা কোনো রকমে চলছি। পাঠ্যবই তো বিক্রিই হয় না।’

পুস্তক ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি শ্যামল পাল বলেন, ‘বই বাজারে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটা খুব দ্রুত কাটার সম্ভাবনা দেখছি না। টিকে থাকতে হলে এখন থেকে অনলাইনে বিক্রিতেই নজর বেশি দিতে হবে।’

অনলাইন বাজার সব ধরনের ব্যবসায়ীর খরচ কমিয়েছে। ব্যস্ত জায়গায় খরচ করে দোকান করতে হয় না। গুদামটাও যেখানে বেশি ভাড়া সেখানকার বদলে কম ভাড়ার এলাকায় রাখলে সমস্যা হয় না। বড় বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে রাখলে খরচ আরও কমে; কর্মচারীও লাগে কম।

বাসা থেকে তৃতীয় পক্ষের ডেলিভারি কোম্পানি বই নিয়ে যায়। ক্রেতাই দেন ডেলিভারির খরচ।

তবে এত সুবিধার পরও বইয়ের বাজার অনলাইনের চেয়ে দোকানই সবসময় প্রাধান্য পাবে বলে মনে করেন প্রথমা প্রকাশনীর সহব্যবস্থাপক হুমায়ূন কবীর।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখন পাঠকদের অনলাইনে বই কেনার প্রবণতা বেশি থাকলেও বেশিরভাগ পাঠক আসলে বইয়ের দোকান ঘুরেই বই কিনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলে পাঠক আবার বই বাজারে ফিরে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য