20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
পেঁয়াজ সংকট পূর্বাভাসের অভাবে

পেঁয়াজ সংকট পূর্বাভাসের অভাবে

নিত্যপণ্য নিয়ে আগাম তথ্য দিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আছে পূর্বাভাস সেল, যা কার্যকর হয়নি ছয় বছরেও

ভারতের মহারাষ্ট্রের নাসিক অঞ্চলের পাইকারি মোকামে দাম কত, সেটি গত দুই বছর ধরেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর হয়ে আসছে। এর কারণ ভারত সরকারের দুটি সিদ্ধান্ত।

নাসিকের মোকামে দাম ওঠানামার গতিবিধি পর্যালোচনা করে ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেয় রফতানির। ফলে নাসিকে দাম বাড়ছে কি না, এই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পরপর দুই বছর ভারত রফতানি বন্ধ করেছে নাসিকে দাম বাড়ার পর।

ফলে নাসিকের এই বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলছেন ব্যবসায়ী নেতা মাতলুব আহমাদ। আর সেটা করার একটি ব্যবস্থাপনাও আছে সরকারের। তবে সেটা কাজ করেনি।

ভারত রফতানি বন্ধ করে দেওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এমনটি যে হবে, সে বিষয়ে ধারণা ছিল না তাদের।

নিত্যপণ্যের চাহিদা নিরূপণ, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক উৎপাদন এবং আমদানি-রফতানি পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর একটি পূর্বাভাস সেল গঠন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এর একমাত্র কাজ হচ্ছে দেশে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগাম তথ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা। চাল, পেঁয়াজ, তেল, ডাল, লবণ, ছোলা, খেঁজুর, মরিচ, আদা, রসুন, গরম মসলাসহ অত্যাবশ্যকীয় ১৭ পণ্য নিয়ে এই সেলটির কাজ।

এই কাজের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থা থেকে এসব পণ্যের উৎপাদন, মজুদ, সংগ্রহ পরিস্থিতি ও বিতরণ ব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।

এ ছাড়া স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারদর, বন্দরে পণ্য খালাসের পরিমাণ, পণ্যের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি হারের তথ্যও নিয়মিত সংগ্রহ করতে হয়।

এরপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিবেদন তৈরির নিয়ম রয়েছে। এই প্রতিবেদনের পণ্যভিত্তিক পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ থেকেই কোন পণ্যে কখন সংকট হতে পারে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি কেমন হবে এবং দেশে এর প্রভাবের কথা জানতে পারা যায়। এটি বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সরকারের করণীয় নির্ধারণে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

তবে প্রতিষ্ঠার প্রায় ছয় বছরেও এই সেল কতটা কার্যকর হয়েছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অতি বৃষ্টিতে ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদনে ক্ষতি হয়েছে কি না, সে দেশে সরবরাহ কেমন, রফতানিতে প্রভাব পড়তে পারে কি না, এ বিষয়ে পূর্বাভাস সরকারকে দিতে পারেনি এই সেল।

তবে পূর্বাভাস সেলের বাণিজ্য পরামর্শক জিয়াউর রহমান দাবি করেছেন, তারা যথাযথভাবেই কাজ করছেন। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘পণ্যভিত্তিক উৎপাদন, চাহিদা, আমদানি, মজুদ ও বন্দর থেকে খালাস পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক উৎপাদন ও দাম পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা এই সেলের রুটিন ওয়ার্ক। আমরা এ কাজটি সূচারুভাবেই করেছি। এখানে গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই।’

যদিও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলছেন, ভারত পেয়াঁজ রফতানি হঠাৎ বন্ধ করে দেবে, এ বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না তাদের।

ভারত রফতানি বন্ধ করতে পারে, এ বিষয়ে আগাম ধারণা না থাকায় পেঁয়াজের বিকল্প বাজার খোঁজার আগাম কোনো উদ্যোগ ছিল না বাংলাদেশের। এমনটা হয়েছে ভারত রফতানি বন্ধের পর।

সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে পেয়াঁজের চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় দেখা গেছে, উৎপাদন ১৮ থেকে ১৯ লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে থাকে।

যদিও বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৯ সালের উৎপাদন মৌসুমে দেশে ২৫ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। তবে প্রতি মৌসুমেই উৎপাদিত পেঁয়াজের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ পচে নষ্ট হয়ে যায়।

চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে এসব কারণে বছরে ৯ থেকে ১১ লাখ টনের ঘাটতি থাকে। এ ঘাটতি পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে, যার ৯৫ শতাংশ আসছে ভারত থেকে। ফলে ভারতের আবহাওয়া, উৎপাদন পরিস্থিতি কেমন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের ধারণা থাকা জরুরি।

‘রপ্তানি বন্ধের সংকেত দেয়’ নাসিকের ৩০ রুপি

ভারতে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয় নাসিকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন বেঙ্গালুরুতে। চলতি বছর এ দুটি রাজ্যে পেঁয়াজের দুই দফা উৎপাদন বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তৃতীয়বারের উৎপাদনও কিছুটা নষ্ট হয়েছে। ফলে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করতে পারে, সেটা অনুমান করার সুযোগ ছিল।

এ বিষয়ে ইন্দোবাংলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (আইবিসিসিআই) সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণত নাসিকের পাইকারি মোকামে পেঁয়াজের কেজি প্রতি দাম সারা বছর মানভেদে ৫-১০ রুপির মধ্যে ওঠানামা করে। এর উপরে ওঠতে থাকলেই আমদানিকারক দেশকে সাবধান হতে হয়। দাম ৩০ রুপি স্পর্শ করলেই রফতানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা তারই ধারাবাহিকতা।’

‘নিজেদের মার্কেট অশান্ত রেখে ভারত কোনোদিনই পেঁয়াজ রফতানি করবে না।’

ভারত রফতানি বন্ধের পর গত বছরের তুলনায় এবার বেশি তৎপর ব্যবসায়ী ও সরকার। দ্রুত আমদানির অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।

এখন পর্যন্ত পৌনে ছয় লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ মাসের শুরু থেকে এসব পেঁয়াজ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

বিপুল পরিমাণ পেয়াঁজ আসছে- এই খবরেই উঠতি বাজার কিছুটা কমেছে। ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে একশর কমে।

পেঁয়াজ ইস্যুতে আমরা কতটা প্রস্তুত ছিলাম জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভারত পেঁয়াজ রফতানি হঠাৎ বন্ধ করে দেবে সেটি তো আমরা জানতাম না। তবে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে স্থিতিশীল হয়েছে এবং দামও নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করেছে।’

ভোক্তা স্বার্থ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উদ্যোগ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এখন প্রচুর পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, যা সঠিক পদক্ষেপ। তবে আমি মনে করি সেটি অনেক দেরি হয়ে গেছে। এ উদ্যোগ দরকার ছিল আরও দুই মাস আগে। তাহলে এই সংকট দেখা দিত না।’

ভবিষ্যতে করণীয়

ব্যবসায়ী নেতা মাতলুব আহমাদের পরামর্শ দুটি। ১. ভারত ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকেও পেঁয়াজ আমদানি; ২. কৃষকদের বড় পরিসরে সহায়তা দেওয়া, যেন পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বনির্ভর হওয়া যায়।

‘এটা সম্ভব হলে ভারত কেন বিশ্বের কোনো দেশের দিকেই আমাদের মুখ চেয়ে থাকতে হবে না’, বলেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

‘তা ছাড়া আমরা যারা বড় ব্যবসায়ী আছি, আমাদেরকেও পেঁয়াজ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতে ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলে পেঁয়াজ নিয়ে এই তর্ক-বিতর্ক আর থাকবে না।’

ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘পেঁয়াজ নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। যতদিন না দেশেই পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘সংকট কাটানোর এটাই একমাত্র স্থায়ী সমাধান। পাশাপাশি উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণেরও উদ্যোগ নিতে হবে।’

জনবল সংকট

দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেলে নেই প্রয়োজনীয় জনবল। এর নেতৃত্বে রয়েছেন একজন বাণিজ্য পরামর্শক। তাকে সহযোগিতা দিচ্ছেন আরও দুইজন সহকারী বাণিজ্য পরামর্শক। তাদের অধীনে রয়েছেন একজন করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কম্পিউটার অপারেটর।

অর্থাৎ নিত্যপণ্য পরিস্থিতির সম্ভাব্য সংকট পর্যালোচনার কাজটি করছেন নয়জন। তারাও আবার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন না। ছয় মাস থেকে এক বছর পার না হতেই প্রশাসনিক আদেশে এই সেলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর ডেস্ক বদল করা হচ্ছে বা অন্য অফিসে বদলি করা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পেঁয়াজ ইস্যুতে যথেষ্ট শিক্ষা নিয়েছি। ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে যেখানে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার, আমরা নেব।’

শেয়ার করুন