বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তাঁর কালজয়ী ছোটগল্প ‘স্ত্রীর পত্র’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বিশেষ টেলিভিশন নাটক। নির্মাতা অরুণ চৌধুরীর পরিচালনা ও চিত্রনাট্যে এই নাটকের নামভূমিকায় অর্থাৎ ‘মৃণালিনী’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তরুণ অভিনেত্রী সামিয়া অথৈ। রবীন্দ্র জয়ন্তীর বিশেষ আয়োজন হিসেবে নাটকটি আগামীকাল ২৫শে বৈশাখ (৮ মে) দুপুর ৩টা ৫ মিনিটে চ্যানেল আইয়ের পর্দায় প্রচারিত হবে। মূলত নারী জাগরণ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার এক অনন্য আখ্যান নিয়ে তৈরি এই নাটকটি দর্শকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ হতে যাচ্ছে।
গল্পের মূল প্রেক্ষাপট আবর্তিত হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে এক নারীর আত্মোপলব্ধি এবং প্রতিবাদের সাহসী লড়াইকে কেন্দ্র করে। পনেরো বছরের বৈবাহিক জীবনের পর স্বামীকে লেখা এক চিঠির মাধ্যমে মৃণালিনী তাঁর অবদমিত জীবনের অভিমান ও মুক্তির ঘোষণা দেন। বিন্দুর মতো এক অসহায় অনাথ মেয়ের করুণ পরিণতি মৃণালিনীকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। প্রথাগত সংসারের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্পই এই গল্পের মূল উপজীব্য, যা সমসাময়িক প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
ঢাকার নবাবগঞ্জের বিভিন্ন মনোরম লোকেশনে চিত্রায়িত এই নাটকে মৃণালিনীর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ‘বিন্দু’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আনিকা কবির শখ। এ ছাড়া অন্যান্য বিভিন্ন চরিত্রে দেখা যাবে আরেফিন জিলানী, সূচনা শিকদার, তূর্য ও নয়নকে। রবীন্দ্রনাথের ধ্রুপদী সাহিত্যের মর্যাদা বজায় রেখে তৎকালীন সময়ের আবহ ফুটিয়ে তুলতে নির্মাণশৈলী ও কারিগরি ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন নির্মাতা অরুণ চৌধুরী। দীর্ঘ সময় পর রবীন্দ্র সাহিত্যের এমন একটি বলিষ্ঠ কাজ ছোট পর্দায় দেখার অপেক্ষায় আছেন দর্শক।
মৃণালিনী চরিত্রে অভিনয় করা নিয়ে উচ্ছ্বসিত সামিয়া অথৈ জানান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এমন একটি কালজয়ী ও শক্তিশালী চরিত্রে কাজ করা যেকোনো অভিনেত্রীর জন্যই গৌরবের বিষয়। তিনি নির্মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, মৃণালিনীর ভেতরের সেই দ্রোহ ও বেদনা ফুটিয়ে তোলা তাঁর জন্য এক দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল। অন্যদিকে নির্মাতা অরুণ চৌধুরী বলেন, রবীন্দ্রনাথের গল্প বরাবরই তাঁকে টানে এবং ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পটি আধুনিক যুগের নারীদের কাছেও এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে। শিল্পীদের নিখুঁত পারফরম্যান্স নাটকটিকে প্রাণবন্ত করেছে বলে তিনি মনে করেন।
নারী মুক্তির বলিষ্ঠ বার্তা বহনকারী এই নাটকটি দর্শকদের রবীন্দ্র সাহিত্যের গভীরতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা পুনরায় মনে করিয়ে দেবে। রবীন্দ্র জয়ন্তীর বিশেষ অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে চ্যানেল আই এই ধ্রুপদী প্রযোজনাটি দর্শকদের সামনে নিয়ে আসছে। নাটকটির মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের দর্শনে নারীর সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি নতুনভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। রবীন্দ্রপ্রেমী দর্শকদের পাশাপাশি সাধারণ নাট্যানুরাগীদের কাছেও এই প্রযোজনাটি ব্যাপকভাবে সমাদৃত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কলাকুশলীরা।
নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ‘মর্টাল কম্ব্যাট’-এর চতুর্থ কিস্তি ‘মর্টাল কম্ব্যাট টু’ শুক্রবার বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেয়েছে। ২০২১ সালের রিমেক সংস্করণের ব্যাপক সাফল্যের ঠিক পাঁচ বছর পর বড় পর্দায় ফিরল এই ধুন্ধুমার অ্যাকশন সিনেমাটি। আন্তর্জাতিক মুক্তির সঙ্গে মিল রেখে আজ থেকেই বাংলাদেশের দর্শকরাও প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
২০২১ সালের সিক্যুয়েল হিসেবে নির্মিত এই ছবিটির গল্প শুরু হয়েছে আগের কিস্তির সমাপ্তি থেকে। পূর্বের ন্যায় এবারও পরিচালনার গুরুভার সামলেছেন দক্ষ নির্মাতা সাইমন ম্যাকোয়েড। মূলত ভিডিও গেমের জনপ্রিয় চরিত্রগুলোকে নিয়ে সাজানো এই সিনেমায় এবার দেখা যাবে পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষার এক মরণপণ সংগ্রাম। ভয়ংকর শাসক শাও কানের হাত থেকে বিশ্বকে উদ্ধার করতে জনি কেজ ও অন্য চ্যাম্পিয়নরা ঐক্যবদ্ধ হবেন। তবে শক্তির অসম লড়াই এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের এক চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সিনেমাটির শক্তিশালী কাস্টিংয়ে রয়েছেন কার্ল আরবান, লুইস টান, হিরোয়ুকি সানাদা, জো তাসলিম ও জেসিকা ম্যাকনামির মতো নামকরা তারকারা। এছাড়া অ্যাডলিন রুডলফ ও যশ লসনও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। আশির ও নব্বইয়ের দশকের ‘মর্টাল কম্ব্যাট’ ও ‘মর্টাল কম্ব্যাট: অ্যানিহাইলেশন’ বক্স অফিসে আশানুরূপ ফল না পেলেও বর্তমান সিক্যুয়েলটি নিয়ে দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ফ্যান্টাসি ও অ্যাকশনপ্রেমীদের জন্য সিনেমাটি চলতি বছরের অন্যতম আকর্ষণ হতে যাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের তারাপীঠের কিংবদন্তি লোকশিল্পী ও দৃষ্টিহীন বাউল সাধক কানাই দাস বাউলের শেষ গান ‘মন ছাড়া কী মনের মানুষ রয়’ মুক্তি পেয়েছে। গত ১৮ এপ্রিল এই গুণী শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে এবং তাঁর মৃত্যুর ১৮ দিন পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গানটি ‘রইদ’ ও বঙ্গর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহায় মুক্তি পেতে যাওয়া মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’ সিনেমায় গানটি একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বিখ্যাত বাউল সাধক মাতান চাঁদ গোস্বামীর কথা ও সুরে গানটি গেয়েছিলেন কানাই দাস বাউল, যা পরবর্তীতে ‘রইদ’ সিনেমার জন্য নতুন করে সংগীতায়োজন করেছেন জনপ্রিয় সুরকার ইমন চৌধুরী। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে দেশীয় লোকজ সুরের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণে গানটিকে সমকালীন শ্রোতাদের কাছে আরও আবেদনময় করে তোলা হয়েছে। ইমন চৌধুরী এই কাজ সম্পর্কে এক গণমাধ্যমকে বলেন, “শুরু থেকেই এই গানটির প্রতি আমাদের এক অন্যরকম অনুভূতি ছিল। গানটিতে এক ধরনের হাহাকার আছে, আছে গভীর নীরবতা। আমি এবং আমার মিউজিক টিম চেষ্টা করেছি যেন দেশীয় সংগীতের আবেগের সঙ্গে আধুনিক সাউন্ডের একটি ইমোশনাল ফিউশন তৈরি হয়। আমরা গানটিতে একটি ‘ইনফিনিট ফিল’ দিতে চেষ্টা করেছি।”
নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা শেয়ার করে বলেন, চিত্রনাট্য লেখার সময় থেকেই কানাই দাস বাউলের এই গানটি ছিল তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে এক গণমাধ্যমকে জানান, “দুঃখের বিষয় হচ্ছে, গানটি কানাই দাস বাউলের মৃত্যুর পর প্রকাশ পাচ্ছে। সত্যি বলতে, তাকে যদি এই কাজটি শোনাতে পারতাম, খুব ভালো লাগতো। কিন্তু তিনি শুনে যেতে পারলেন না। তবে তার সেই মায়ামাখা কণ্ঠ আমাদের সিনেমার মধ্যদিয়ে থেকে যাবে।”
কানাই দাস বাউল সারাজীবন একতারা হাতে নিয়ে আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী গান গেয়ে মানুষের মন জয় করেছেন। ‘রইদ’ সিনেমার জন্য গত বছর তিনি এই গানটি রেকর্ড করেছিলেন। এদিকে, রটারডাম ও সিয়াটেলের মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সমাদৃত হওয়া ‘রইদ’ সিনেমাটি ঈদুল আজহায় দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে। মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি অভিনীত এই ছবিটির মাধ্যমে প্রয়াত বাউল সাধকের মায়াবী কণ্ঠ আবারও সিনেমাপ্রেমীদের স্পর্শ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
রাশিয়ার মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা। উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি নতুন এক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের খবর দিয়েছেন। ওয়ালিদ আহমেদের পরিচালনায় ‘ঢাকা-১২০৫’ শিরোনামের একটি সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা যাবে তাঁকে। এই সিনেমায় ভাবনার বিপরীতে নায়ক হিসেবে থাকছেন রাকিব হোসেন ইভন। সিনেমাটি প্রযোজনা করছে ‘সাদামাটা এন্টারটেইনমেন্ট’।
সিনেমার গল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো গোপন রাখা হলেও এটি মূলত একটি রোমান্টিক ঘরানার চলচ্চিত্র হতে যাচ্ছে। অভিনেত্রী ভাবনা জানিয়েছেন, জীবন ও বাস্তবতার নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক নিবিড় প্রেমের গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই সিনেমায়। অভিনেতা ইভনও চিত্রনাট্য নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, গল্পের ভিন্নতা ও চরিত্রের গভীরতা দর্শকদের নতুন এক অভিজ্ঞতা প্রদান করবে।
পরিচালক ওয়ালিদ আহমেদ জানিয়েছেন, সিনেমার দৃশ্যধারণের কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা ও এর আশপাশের বিভিন্ন লোকেশনে অধিকাংশ শুটিং সম্পন্ন হয়েছে। কারিগরি কারণে অন্যান্য অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। নির্মাতা জানিয়েছেন, শুটিং পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে সিনেমার বিস্তারিত তথ্য সবার সামনে তুলে ধরা হবে।
উল্লেখ্য যে, ভাবনা ও ইভন জুটির এটি দ্বিতীয় কাজ হওয়ার কথা থাকলেও তাঁদের প্রথম সিনেমা ‘চারুলতা’ নিয়ে বড় এক দুঃসংবাদ এসেছে। ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতকেন্দ্রিক গল্পের সেই সিনেমাটির কাজ নানা জটিলতায় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সাদামাটা এন্টারটেইনমেন্ট। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কারিগরি ও সমন্বয়হীনতার কারণে ‘চারুলতা’র কাজ আর এগোবে না। এর পরিবর্তে নতুন আঙ্গিকে ও ভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে ‘ঢাকা-১২০৫’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চলচ্চিত্র পাড়ায় গুঞ্জন রয়েছে যে, বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘চারুলতা’ সিনেমার জন্য ধারণকৃত কিছু ফুটেজ ও অংশবিশেষ ব্যবহার করেই ‘ঢাকা-১২০৫’ সাজানো হচ্ছে। মূলত চিত্রনাট্যে আমূল পরিবর্তন এনে এবং নতুন কিছু অংশ সংযোজন করে এই সিনেমাটির কাজ দ্রুত শেষ করা হচ্ছে। যদিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ভাবনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং ইভনের সাথে তাঁর নতুন রসায়ন এই সিনেমাটিকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।
মুক্তির প্রায় চার দশক পর প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জন আব্রাহামের কালজয়ী মালয়ালম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ‘আম্মা আরিয়ান’ (মাকে খবর দাও) কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ মে শুরু হতে যাওয়া ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের বিশেষ ধ্রুপদী বিভাগে এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। মুম্বাইয়ের ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন (এফএইচএফ) ছবিটিকে অত্যাধুনিক ৪কে (4K) রেজোলিউশনে পুনরুদ্ধার করেছে। এফএইচএফ-এর জন্য এটি কানে টানা পঞ্চম বছরের অংশগ্রহণ এবং ১৯৮৬ সালের এই বিশেষ চলচ্চিত্রটি এবারের উৎসবে ভারতের একমাত্র পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
সিনেমাটির কাহিনী সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। একজন তরুণ নকশালের মৃত্যুর পর তাঁর একদল বন্ধু ওয়ানাডের উত্তর পাহাড় থেকে দক্ষিণের কোচি পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রা শুরু করে কেবল তাঁর মাকে এই দুঃসংবাদটি পৌঁছে দিতে। রাজনৈতিক মোহভঙ্গ এবং প্রতিরোধের এই অনন্য আখ্যানটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। চলচ্চিত্রটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট (বিএফআই) একে সর্বকালের সেরা দশটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
চলচ্চিত্রটির নির্মাতা জন আব্রাহামকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম বিপ্লবী কণ্ঠস্বর হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি ছিল তাঁর পরিচালিত শেষ কাজ, ১৯৮৭ সালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রথাগত বাণিজ্যিক কাঠামো এবং গতানুগতিক গল্প বলার ধরণকে পাশ কাটিয়ে তিনি এক অকৃত্রিম ও সমষ্টিগত চলচ্চিত্র শৈলী তৈরি করেছিলেন। এই ছবিটি ‘ওডেসা কালেক্টিভ’ নামক একটি চলচ্চিত্রপ্রেমী দলের মাধ্যমে প্রযোজিত হয়েছিল, যারা মূলত সাধারণ মানুষের অনুদানের ওপর ভিত্তি করে ছবি নির্মাণ করত।
সিনেমাটি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। ২০২৩ সালে যখন কাজ শুরু হয়, তখন ছবিটির মানসম্মত কোনো কপি ছিল না। ভারতের ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত দুটি ৩৫মিমি প্রিন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, সেগুলোতে মারাত্মক আঁচড় ও দৃশ্যগত ক্ষতি রয়েছে। বোলোগনা এবং চেন্নাইয়ের ল্যাবে নিবিড়ভাবে এর সংস্কার কাজ করা হয়। বিশেষ করে ছবির শব্দ বা সাউন্ড ঠিক করতে ৪ হাজারেরও বেশি যান্ত্রিক হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। মূল মেজাজ বজায় রাখতে ছবিটির চিত্রগ্রাহক ও সম্পাদক সরাসরি এই পুনরুদ্ধার কাজের তদারকি করেছেন।
উল্লেখ্য যে, ‘আম্মা আরিয়ান’ কোনো নির্দিষ্ট প্রেক্ষাগৃহে ব্যবসার জন্য নির্মিত হয়নি। এটি একটি ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্রের মডেল হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে প্রতিটি জনপদে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সিনেমার সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। দীর্ঘ সময় পর আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে ছবিটির প্রদর্শনী বিকল্প ধারার ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য এক বড় স্বীকৃতি। কান উৎসবে ছবিটির প্রদর্শনীর সময় ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পরিচালকসহ সিনেমার প্রধান অভিনেতা ও কারিগরি কুশলীরা উপস্থিত থাকবেন।
‘রেহানা মরিয়ম নূর’ খ্যাত নন্দিত নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ সাদ দীর্ঘ পাঁচ বছরের বিরতি কাটিয়ে নতুন চমক নিয়ে ফিরেছেন। তাঁর পরিচালিত ও রচিত নতুন মিনি সিরিজ ‘অ্যানি’ জার্মানির মর্যাদাপূর্ণ ‘সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যাল’-এ বিশ্ব প্রিমিয়ারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো ওটিটি কন্টেন্ট বা সিরিজ এই প্রভাবশালী উৎসবে জায়গা করে নিয়েছে, যা দেশের বিনোদন জগতের জন্য এক অনন্য মাইলফলক। আগামী ৯ জুন জার্মানির কোলন শহরে উৎসবের ‘উইমেন ইন সিরিজ’ বিভাগে সিরিজটি বড় পর্দায় প্রদর্শিত হবে।
মিনি সিরিজটির গল্প আবর্তিত হয়েছে এক ‘ডিস্টোপিয়ান’ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে। সিরিজের নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাজিফা তুষি। কাহিনীর প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, বহির্বিশ্ব একটি রহস্যময় অসুখের কবলে পড়ে, যার প্রভাবে সংক্রমিত পুরুষেরা নারীদের প্রতি তীব্র ও অনিয়ন্ত্রিত ঘৃণা পোষণ করতে শুরু করে। এমন বৈরী পরিবেশে ছোট শহরের একজন নার্স অ্যানি তাঁর পাঁচ ভাইবোনকে নিয়ে টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যান। তবে এক রাতে এক মুখোশধারী ব্যক্তির নৃশংস হামলার শিকার হওয়ার পর অ্যানির জীবন আমূল বদলে যায় এবং তিনি চরম প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন।
এই সিরিজে নাজিফা তুষি ছাড়াও অভিনয় করেছেন একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পী, যাদের মধ্যে রয়েছেন ইয়াশ রোহান, সাইমন সাদিক, সারিকা সাবরিন, ফারহানা মিঠু এবং নাজাহ। সিরিজটি যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে মেট্রোভিডিও, ক্যাটালগ, জিরেল ও অডেশাস অরিজিনালস। এহসানুল হক বাবু ও আলি আফজাল উজ্জ্বলের প্রযোজনায় নির্মিত এই প্রজেক্টের নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে আছেন অপূর্বা বকশি। নির্মাতার মতে, সিরিজকেন্দ্রিক কোনো আন্তর্জাতিক উৎসবে এই প্রথম অংশগ্রহণ বাংলাদেশের নির্মাতাদের জন্য বিশ্বমঞ্চে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে।
আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ সাদ এর আগেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম উজ্জ্বল করেছেন। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ সিঙ্গাপুর ও রটারডাম উৎসবে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০২১ সালে, যখন তাঁর দ্বিতীয় ছবি ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে কান চলচ্চিত্র উৎসবের অফিশিয়াল সিলেকশনে জায়গা করে নেয়। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও একটি ব্যতিক্রমী ঘরানার গল্পের মাধ্যমে তিনি বৈশ্বিক আসরে ফিরছেন, যা বিশ্বজুড়ে থাকা তাঁর অনুরাগী ও সিনেমা প্রেমীদের মধ্যে বাড়তি কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
জার্মানির ‘সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যাল’ ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী সিরিজকেন্দ্রিক আয়োজন হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর এখানে বিশ্বজুড়ে নির্বাচিত মাত্র ২০টি সিরিজ প্রদর্শিত হয়, যা আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও বড় বড় প্রযোজকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলা। এই উৎসবে ‘অ্যানি’র অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের কন্টেন্ট এখন বিশ্বমানের গল্পের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। ডিস্টোপিয়া ঘরানার এই কাজটির মাধ্যমে বাংলা সিরিজ বিশ্বব্যাপী নতুন এক পরিচিতি পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘প্যান ইন্ডিয়া’ সিনেমার জয়যাত্রা সাধারণত দক্ষিণ ভারতীয় ছবিগুলোর হাত ধরেই দেখা যায়। তবে এবার সেই সমীকরণ পুরোপুরি উল্টে দিয়েছে পরিচালক আদিত্য ধরের নতুন স্পাই থ্রিলার ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’। রণবীর সিং অভিনীত এই সিনেমাটি কেবল উত্তর ভারতেই নয়, বরং দক্ষিণের রাজ্যগুলোতেও বক্স অফিসে ব্যাপক তান্ডব চালাচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে ছবিটির মোট আয় বর্তমানে ১ হাজার ১৩৯ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে, যার একটি বড় অংশ এসেছে দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি রাজ্য থেকে।
ছবিটি দক্ষিণ ভারতের বাজার থেকে প্রায় ২৫০ কোটি রুপির অবিশ্বাস্য ব্যবসা করেছে, যা দক্ষিণী মেগাস্টার প্রভাসের ছবি ‘দ্য রাজা সাব’-এর আয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণত হিন্দি সিনেমাগুলো দক্ষিণ ভারতে খুব একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে না, কিন্তু ‘ধুরন্ধর ২’ এক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস গড়েছে। বিশেষ করে কর্নাটক রাজ্য থেকে ছবিটির আয় ১২৫ কোটি রুপি স্পর্শ করেছে। কন্নড় সিনেমার দীর্ঘ ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র চারটি স্থানীয় সিনেমা এই আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করতে পেরেছিল।
অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা অর্থাৎ তেলেগু বলয়েও ছবিটির সাফল্য ছিল অভাবনীয়। সেখানে প্রভাসের মতো মহাতারকার ছবিকে পেছনে ফেলে ৮০ কোটি রুপির ব্যবসা করেছে এই হিন্দি সিনেমাটি। প্যান ইন্ডিয়া ছবিগুলো দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ডাবিং সংস্করণের ওপর নির্ভর করে চললেও ‘ধুরন্ধর ২’-এর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন ছিল। মোট আয়ের মধ্যে ডাবিং সংস্করণের অবদান ছিল মাত্র ৭০ কোটি রুপি, যা প্রমাণ করে যে দক্ষিণের বড় শহরগুলোতে দর্শকরা ডাবিংয়ের চেয়ে মূল হিন্দি সংস্করণেই ছবিটি দেখা বেশি পছন্দ করেছেন।
শহুরে দর্শকদের এই বিপুল উপস্থিতি ও ছবির শক্তিশালী আধেয় ‘ধুরন্ধর ২’-কে বলিউডের অন্য সব রেকর্ড ব্রেকিং ছবি যেমন ‘অ্যানিমেল’ বা ‘জওয়ান’-এর চেয়েও কয়েক গুণ বেশি সাফল্য এনে দিয়েছে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রণবীর সিংয়ের ক্যারিয়ারে এটি কেবল একটি হিট সিনেমা নয়, বরং দক্ষিণ ভারতে বলিউডের আধিপত্য বিস্তারের এক নতুন দিগন্ত। পরিচালক আদিত্য ধরের নিপুণ নির্মাণ ও টানটান উত্তেজনার গল্প ছবিটিকে ভারতের প্রতিটি কোণায় সমানভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
মন্তব্য