কষ্টের ঘুমে গরু বিক্রির স্বপ্ন তাদের

কষ্টের ঘুমে গরু বিক্রির স্বপ্ন তাদের

সাভারের হাটে পশু নিয়ে আসা এক বিক্রেতা। ছবি: নিউজবাংলা

‘আমরা যারা গরু নিয়া হাটে আইছি তাদের একটাই স্বপ্ন, গরুগুলারে তাড়াতাড়ি ভালো দামে বিক্রি কইরা বাড়িতে চইলা যাওয়া। এ জন্যই রাতে হাটে কষ্ট কইরা থাকাটা আমাদের কিছু মনে হয় না। মশার কামড় সহ্য কইরাই যে য্যামনে পারে ঘুমায়।’

ঘুমের তেমন কোনো আয়োজন নেই। খড়ের গাদা, মাটিতে বিছানো এক টুকরা পলি, বস্তায় শুয়ে কিংবা বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়েই ক্লান্ত শরীরকে বিশ্রাম দিচ্ছেন তারা।

মাথার নিচে কোনো রকমে গায়ের পোশাকটি গুঁজে ঘুমিয়ে পড়েছেন। গরু বিক্রির স্বপ্নে যেন বিভোর তারা।

কয়েক শ কিলোমিটার আসার পথেও তাদের পোহাতে হয়েছে চরম ভোগান্তি। তীব্র গরমের সঙ্গে দীর্ঘ যানজটে আটকে অনাহারে-অর্ধাহারে সময় কেটেছে তাদের।

একটু লাভের আশায় কেউ এসেছেন নিজের একমাত্র প্রিয় পোষা প্রাণীটিকে বিক্রি করতে। অনেকেই আবার যৌথভাবে ট্রাকভর্তি করে আনা গরুগুলো বেশি দামে বেচতে এসেছেন ঢাকার হাটগুলোতে।

গভীর রাতে সাভারে আশুলিয়ার বাইপাইল পশ্চিমপাড়া হাটে গিয়ে গরু বিক্রি করতে আসা এই মানুষগুলোর রাত্রিযাপনের এমন কষ্ট চোখে পড়ে।

পাবনার সাঁথিয়া থেকে হাটে এসেছেন ব্যবসায়ী নূর মোহাম্মদ। তবে দীর্ঘ ক্লান্তির পর নূর বস্তাভর্তি খড়ের ওপরে আঁটোসাঁটো হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার সঙ্গে আসা আরেক গরু ব্যবসায়ী মো. বাবলুর সঙ্গে কথা হয় নিউজবাংলার।

তিনি বলেন, ‘আমরা ৮ জন সাঁথিয়া থাইকা ১৪টা গরু নিয়া এই হাটে আসছি। রাস্তায় অনেক জাম আর গরমের কারণে অনেক কষ্ট হইছে। কিন্তু কী আর করার? গরু বিক্রির জন্য হাটে তো আসতেই হইব।’

গরুর হাটে রাত কীভাবে কাটে এমন প্রশ্নে বলেন, ‘আমরা যারা গরু নিয়া হাটে আইছি তাদের একটাই স্বপ্ন, গরুগুলারে তাড়াতাড়ি ভালো দামে বিক্রি কইরা বাড়িতে চইলা যাওয়া। এ জন্যই রাতে হাটে কষ্ট কইরা থাকাটা আমাদের কিছু মনে হয় না। মশার কামড় সহ্য কইরাই যে য্যামনে পারে ঘুমায়।

‘অ্যার মইদ্দে পাঁচটা বিক্রি হইয়া গেছে। বাকিগুলা বিক্রি হইলে আবারও গরু আনার ট্রাকেই ফিরা বাড়িতে যামু।’

নিজের বাড়িতে পোষা একমাত্র গরুটিকে সিরাজগঞ্জ থেকে হাটে বিক্রি করতে এসেছেন কায়েস মিয়া। ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ১টায় তখন গরুর পাশেই মাটিতে পলি বিছিয়ে বিভোর ঘুমে তিনি। ক্লান্তির ছাপ তার চোখেমুখে।

সোলায়মান হোসেন নামে হাটে গরু বিক্রি করতে আসা আরেকজন বলেন, ‘রাতের বেলা গরুর পাশেই খড়ের বস্তার মধ্যে ঘুমাই। সকালে উইঠা গরু বিক্রি করব, সেই চিন্তাই শুধু আমাদের। হাটে লোকজন আসবে কি না, গরু কি বিক্রি করতে পারব- এসব নানান চিন্তা। তাই হাটে গরু আনলে এরকম কষ্ট তো হয়ই। তবে অন্য হাটের তুলনায় এখানকার পরিবেশ অনেক ভালো। বেশির ভাগ হাটে অল্প জায়গার কারণে গাদাগাদি করে থাকতে হয়।

‘প্রচণ্ড গরম আর মশার কামড়ে চাইলেও ঘুমানো যায় না। আবার খাওয়াদাওয়া আর পানির সমস্যা থাকে অনেক বেশি। কিন্তু এই হাটের লোকজন আমাদের সবাইরে রাতে কয়েলের ব্যবস্থা করে দিছে। খাওয়াদাওয়া, টয়লেট আর গোসলের আলাদা পানির ব্যবস্থা করছে।’

আশুলিয়ার বাইপাইল পশ্চিম পাড়া হাটের ইজারাদার লুতফর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাট পরিচালনা করছি। পাশাপাশি যারা হাটে বিক্রির জন্য গরু এনেছেন তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছি। মশার উপদ্রব কমাতে প্রত্যেকের জন্য কয়েলের ব্যবস্থা করেছি। পর্যাপ্ত পানি, খাবার, টয়লেট, গোসলের ব্যবস্থা করেছি।’

আরও পড়ুন:
গরুর দাম ছাড়ছেন না ব্যাপারীরা
গাবতলী পশুর হাটে ১০ লাখ টাকা জরিমানা
১৮ গরুর একটিও বেচতে পারলেন না মিজান
গাবতলীর হাটে স্বাস্থ্যবিধি ‘বাইরে’
গাবতলীতে চোখ আটকে যায় লাল বাহাদুরে

শেয়ার করুন

মন্তব্য