রাস্তায় বদলে গেল ভিজিএফের ১৫০ বস্তা চাল

রাস্তায় বদলে গেল ভিজিএফের ১৫০ বস্তা চাল

উলিপুরে ভিজিএফের ১৫০ বস্তা নিম্নমানের চাল গুদামে ফেরত পাঠিয়েছেন হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান। ছবি: নিউজবাংলা

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা শাহীনুর রহমান বলেন, ‘খাদ্য গুদাম থেকে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে বরাদ্দকৃত ভিজিএফের চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। গুদাম থেকে ভালো চাল পাঠানো হয়েছে। নিম্নমানের চাল সেখানে কিভাবে পৌঁছাল তা জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

কুড়িগ্রামের উলিপুরে সরকারি খাদ্য গুদামের উন্নত মানের ১৫০ বস্তা চাল হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদে পৌঁছানোর আগেই খাওয়ার অযোগ্য পঁচা চালে পরিণত হয়েছে। পথেই সরকারি চাল বদলে যাওয়া নিয়ে চলছে তোলপাড়। গুদাম কর্মকর্তা, চাল সরবরাহকারী ব্যবসায়ী, গাড়ি চালক দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে সরবরাহকারীকে ঘিরে চাল ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট অহরহ এ জালিয়াতি চালিয়ে আসছে বলে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে।

উলিপুরে ঈদ উপলক্ষে দুস্থদের ভিজিএফের ১৫০ বস্তা চাল নিয়ে চলছে ব্যবসায়ী ও খাদ্য বিভাগের রশি টানাটানি। নিম্নমানের চালগুলোর দায়িত্ব কেউ না নেয়ায় গুদামেই ফেরত দেয়া হয়েছে।

শুক্রবার দুপুরে উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদে এ ঘটনা ঘটে।

হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আলাউদ্দিন বসুনিয়া জানান, ঈদ উপলক্ষে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৮০৩ টন ৫৬০ কেজি চাল ভিজিএফের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। সে অনুযায়ী হাতিয়া ইউনিয়নে বিতরণের জন্য ৬৩ টন ২১০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়।

শুক্রবার দুপুরে সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে হাতিয়া ইউনিয়নের জন্য ভিজিএফের বরাদ্দকৃত প্লাস্টিক বস্তায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি সিল মোহরযুক্ত ৫০ কেজিন বস্তায় গাড়ি প্রতি ১৫০ বস্তা করে ছয় গাড়িতে ৯০০ বস্তা পাঠানো হয়।

হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন বলেন, ‘সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে ভিজিএফের চাল ছয়টি গাড়িতে ৯০০ বস্তায় ইউনিয়ন পরিষদে আসে। পরিষদের গুদামে চালের বস্তাগুলো নামানোর সময় পাঁচ গাড়ির চাল উন্নত মানের হলেও এক গাড়ির ১৫০ বস্তা চাল প্লাস্টিকের পুরানো বস্তায় সরকারি সিল না থাকায় সন্দেহ হয়। ওই গাড়ির বস্তাগুলোর চাল খুবই নিম্নমানের এবং খাওয়ার অযোগ্য হওয়ায় তা সরকারি খাদ্য গুদামে ফেরত পাঠাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘গাড়িগুলোতে মাত্র দুই জন গ্রাম পুলিশ ছিলেন। খারাপ চালের বিষয়টি ইউএনও ও খাদ্যগুদাম কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। তারা চালের বস্তাগুলো খাদ্য গুদামে ফেরত পাঠাতে বলেছেন।’

নিম্নমানের চাল বহনকারী গাড়ির চালক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘উলিপুর সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে ১৫০ বস্তা চাল হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে আসি। এরপর চালগুলো খাবার অযোগ্য হওয়ায় চেয়ারম্যান তা নিতে অস্বীকৃতি জানান। আমাকে বস্তাগুলো ফেরত নিয়ে যেতে বলেন। তাই ফেরত আনি।’

এই ১৫০ বস্তা নিম্নমানের চালের দায় দায়িত্ব কেউ নিতে রাজি নন। খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা জানান, এ চাল গুদাম থেকে সরবরাহ করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন খাদ্য ব্যবসায়ী জানান, উলিপুর সরকারি খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা ও ধান চাল ব্যসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত। খাদ্য গুদামের কর্মকর্তার যোগসাজশে গুদাম থেকে উন্নত মানের চাল ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে পাঠানোর সময় পথে ওই সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের গুদাম থেকে ভালো চাল পরিবর্তন করে নিম্নমানের চাল সরবরাহ করেন। গুদামের ভালো চালের বাজার মূল্য ৪৫ টাকা কেজি, আর নিম্নমানের চালের মূল্য ২০-২৫ টাকা।

সূত্র জানায়, হাতিয়া ইউপি থেকে ফেরত ১৫০ বস্তা চাল সরকারি গুদামে না এনে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তাদের গুদামে নামিয়ে নিয়েছে। খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা নিম্নমানের চালের দায়িত্ব না নেয়ার ফলে ১৫০ বস্তা চাল নিয়ে উপজেলা খাদ্য বিভাগ ও ব্যবসায়ীদের রশি টানাটানি চলছে।

সূত্রটি নিশ্চিত করেছে, খাদ্য ব্যবসায়ী ও মিল চাতাল মালিক সমিতির আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান বুলেট এ নিম্নমানের চালের মালিক। তিনি কৌশলে চালগুলো হাতিয়া ইউপিতে সরবরাহ করেছেন।

তবে মাহফুজুর নিম্নমানের চালের মালিকানার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বার বার অনুরোধ করেন।

নিম্নমানের চালের গাড়িটি রক্ষায় তদবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খাদ্য ব্যবসায়ীদের নেতা হিসাবে আমাকে এটি করতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে করেছি।’

উলিপুর উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা শাহীনুর রহমান বলেন, ‘খাদ্য গুদাম থেকে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে বরাদ্দকৃত ভিজিএফের চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। গুদাম থেকে ভাল চাল পাঠানো হয়েছে। নিম্নমানের চাল সেখানে কিভাবে পৌঁছাল তা জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’

ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ফেরত পাঠানো নিম্নমানের চাল পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর না দিয়ে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আলাউদ্দিন বসুনিয়া জানান, ‘এ বিষয়ে কেউ আমাকে কিছু জানায় নি। ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা বিষয়টি সঠিকভাবে বলতে পারবেন। এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছি।’

উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, ‘হাতিয়া ইউনিয়নে খাদ্য গুদাম থেকে নিম্নমানের চাল সরবরাহের বিষয়ে চেয়ারম্যান আমাকে জানিয়েছেন। ওই চাল ফেরত পাঠাতে বলেছি। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। কোন ভাবেই নিম্নমানের চালের বিষয়টি মেনে নেয়া হবে না। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঘটনা জানার পর ইউনিয়ন পরিষদে সরেজমিন পরিদর্শন করেছি।’

কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবু বকর জানান, বিষয়টি তার জানা নাই। খাদ্য গুদামে এ রকম হওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান।

শেয়ার করুন

মন্তব্য