সেজানের আগুনে ছাই স্বপ্না-তুলির স্বপ্ন

সেজানের আগুনে ছাই স্বপ্না-তুলির স্বপ্ন

তুলি ও লিমা হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে। আব্দুল মান্নানের ৬ মেয়ে ও ২ ছেলে। এদের মধ্যে তুলি পঞ্চম। উপজেলার কালাউক উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল সে। আর লিমা পড়ত লাখাই মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে।

লকডাউনে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই পরিবারে কিছুটা সচ্ছলতা ফেরাতে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তুলি আক্তার এবং তার বড় বোন লিমা আক্তার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুস কারখানায় কাজ করতে গিয়েছিল।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাড়িতে বড় বোনকে ফোন করে জানিয়েছিল, ঈদে বাড়ি আসবে। কিন্তু তা আর হলো না। কারাখানায় আগুন থেকে বড় বোন লিমা বেঁচে গেলেও, নিখোঁজ তুলি।

তুলি ও লিমা হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রামের আব্দুল মান্নানের মেয়ে। আব্দুল মান্নানের ৬ মেয়ে ও ২ ছেলে। এদের মধ্যে তুলি পঞ্চম। উপজেলার কালাউক উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল সে। আর লিমা পড়ত লাখাই মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে।

তুলিকে জীবিত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছে পরিবার। তারা বলছেন, এখন অন্তত মরদেহটা যেন পাওয়া যায়।

তুলির বাবা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমার মেয়েদের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। কিন্তু লকডাউনে স্কুল/কলেজ বন্ধ থাকার কারণে সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে আমার দুই মেয়ে গিয়েছিল কারখানায় কাজ করতে। কিন্তু এখন আমার মেয়ে বেঁচে আছে না মারা গেছে জানি না।’

‘তুলি গত ৩০ জুন স্কুলে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়ে ওইদিনই নারায়ণগঞ্জ চলে যায়। কোরবানি ঈদের আগেই তাদের বাড়ি ফেরার কথা ছিল।’

তুলির মামাতো ভাই রাজিব আহমেদ বলেন, ‘তুলি চারতলায় আর লিমা নিচতলায় কাজ করত। আগুন লাগার পর লিমা নিচ তলায় থাকার কারণে বের হয়ে আসলেও তুলি বের হতে পারেনি।

এই কারখানায় আগুনে মারা গেছেন জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গুলডুবা এলাকার নারী স্বপ্না রাণী। তার মৃত্যুটা ছিল একেবারেই অনাকাঙ্খিত। তিনতলা থেকে কিছু সময়ের জন্য বসের সঙ্গে দেখা করতে চারতলায় গিয়েছিলেন। আর ফিরতে পারেননি।

নিহত স্বপ্না রাণী ওই এলাকার যতী নমঃ-এর স্ত্রী। অস্বচ্ছল পরিবারে ৫ মেয়ে নিয়ে বিপাকে পড়া স্বামীকে সাহায্য করতে ৬ মাস আগে গ্রাম ছেড়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে।

সেজানের আগুনে ছাই স্বপ্না-তুলির স্বপ্ন
নিহত স্বপ্না রাণীর পরিবার। ছবি: নিউজবাংলা

সেখানে বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরু করেন। সেজান জুস কারখানায় শ্রমিক হিসেবে চাকরি নেন তিনি, তার স্ত্রী স্বপ্না ও বড় মেয়ে বিসকা।

যতী নমঃ জানান, আগুন লাগার সময় তিনি কারখানায় ছিলেন না। তার স্ত্রী ও মেয়ে নিচতলায় কাজ করত। আগুন লাগার কিছুক্ষণ আগে বসের সঙ্গে দেখা করতে চার তলায় গিয়েছিলেন স্বপ্না। আগুন লাগার পর মেয়ে বেরিয়ে এলেও, স্বপ্না আর সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেননি। আগুন থেকে বাঁচতে জানালা দিয়ে লাফ দেন স্বপ্না। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।

তিনি বলেন, ‘দুই মেয়ে, আমার স্ত্রী আর আমি কাজ করার কারণে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরতে শুরু করেছিল। স্বপ্নার স্বপ্ন ছিল ছোট তিন মেয়েকে কাজ নয়, লেখাপড়া করাবে। তাদেরকে শিক্ষিত করবে। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আর পুরণ হলো না।’

শুক্রবার স্বপ্না রাণীর মরদেহ নবীগঞ্জ নিয়ে আসা হয়। মাকে হারিয়ে নির্বাক ৫ বোন।

লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লুসিকান্ত হাজং বলেন, ‘স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পেরেছি। দাফনের খরচ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেয়া হবে। এছাড়া পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী তাদের আর্থিক সহযোগিতাও করব।

আরও পড়ুন:
সেই কারখানা ছিল ‘মৃত্যুকূপ’
সজিবের কারখানায় অভিযান শেষ, মেলেনি আর মরদেহ
‘আম্মুর লাশ পাইলেও শান্তি’
রূপগঞ্জের আগুনে চরফ্যাশনের ৫ শ্রমিক নিখোঁজ
‘আমার মারে আইন্না দেন’

শেয়ার করুন

মন্তব্য