মিনুর মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনা নাকি হত্যা, প্রশ্ন আইনজীবীর

সড়ক দুর্ঘটনা নাকি হত্যা, প্রশ্ন আইনজীবীর

চট্টগ্রামের মিনু আক্তারকে কৌশলে অপরাধী সাজিয়ে দুই বছর নয় মাস জেল খাটায় প্রকৃত আসামি কুলসুম। ফাইল ছবি

‘সবচেয়ে বড় কথা হলো বিনাদোষে মিনুর কারাগারে থাকার বিষয়টি দেশের সব গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। ওই থানার কেউ কি খবরের কাগজ পড়ে না? এটা তো চট্টগ্রামের বার্নিং ইস্যু ছিল, মিনুকে দেখলেই তো যে কারও চেনার কথা। তার মৃত্যুর কথা কাউকে না জানিয়ে কেনো গোপনে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামকে দিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফন করা হলো? পুরো বিষয়টি অন্য সবার মতো আমার কাছে রহস্যজনক মনে হয়।’

বিনা দোষে কারাগারে থাকা চট্টগ্রামের সেই মিনু আক্তারের মৃত্যু নিছক সড়ক দুর্ঘটনা নাকি হত্যা তা তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেয়া আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ।

নিউজবাংলাকে রোববার দুপুরে তিনি বলেন, ‘কারাগার থেকে মুক্তির পর তাকে সুস্থ স্বাভাবিকই মনে হয়েছে। পুলিশ বলছে ভোর চারটায় দুর্ঘটনা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সেসময় মানুষজন ছিল না রাস্তায়। পরিবার কেনো তার খোঁজ নেয়নি, এত রাতে ওই জায়গায় কীভাবে গেলেন তিনি?’

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো বিনাদোষে মিনুর কারাগারে থাকার বিষয়টি দেশের সব গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। ওই থানার কেউ কি খবরের কাগজ পড়ে না? এটা তো চট্টগ্রামের বার্নিং ইস্যু ছিল, মিনুকে দেখলেই তো যে কারও চেনার কথা। তার মৃত্যুর কথা কাউকে না জানিয়ে কেনো গোপনে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামকে দিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফন করা হলো? পুরো বিষয়টি অন্য সবার মতো আমার কাছে রহস্যজনক মনে হয়। এসব প্রশ্নের উত্তর বের করার জন্য একটা তদন্ত কমিটি করা প্রয়োজন।’

আইনজীবীর এসব প্রশ্ন নিয়ে কথা হয় বায়েজিদ বোস্তামি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২৮ জুন রাত ৩টা ৪০ মিনিটে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় মিনুর মৃত্যু হয়। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত শেষে পরিচয় বের করার সব চেষ্টা করেছি আমরা। পরিচয় না পেয়ে পরদিন আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামকে মরদেহটি দিয়ে দিই।’

ওসি বলেন, ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেইজেও পোস্ট করে মিনুর পরিচয় উদ্ধারের চেষ্টা করেছি।’

তবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেইজে ঘেঁটে ৮ দিনে এরকম কোনো পোস্ট পাননি এই প্রতিবেদক।

অজ্ঞাত গাড়িটি পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘গাড়িটি শনাক্তের সব ধরনের চেষ্টা করছি আমরা।’

সড়ক দুর্ঘটনা নাকি হত্যা, প্রশ্ন আইনজীবীর


গত ১৬ জুন বিকেল চারটায় বিনা দোষে ৩ বছর জেলে থাকার পর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান মিনু আক্তার।

ওইদিন বেলা আড়াইটার দিকে চট্টগ্রাম অতিরিক্ত চতুর্থ মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঞার আদালত নিরপরাধ মিনুকে মুক্তির আদেশ দেন।

মিনুর আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ নিউজবাংলাকে বলেন ‘হাইকোর্ট ৭ জুন মিনুকে মুক্তির নির্দেশ দেয়। একই সময়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের নির্দেশ দেয় আদালত। তদন্ত শেষে প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রতিবেদন জমা দিলে তার ভিত্তিতে মিনুকে মুক্তির জন্য আদালতে বন্ড দিতে বলা হয়। পরে মিনুর আইনজীবী বন্ড দিলে মুক্তির আদেশ দেয় আদালত।’

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০০৬ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার রহমতগঞ্জ এলাকায় কোহিনুর আক্তার ওরফে বেবী নামে এক নারী খুন হন। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা করা হয়।

ওই মামলায় কুলসুম আক্তার ওরফে কুলসুমী নামে এক নারী গ্রেপ্তার হন।

২০০৮ সালে এ মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা। ২০০৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুলসুম আক্তার জামিন পান। এ মামলায় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত কুলসুমকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

রায়ের দিন আসামি কুলসুম আদালতে অনুপস্থিত থাকায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরপর ২০১৮ সালের ১২ জুন মিনু নামের এক নারীকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি কুলসুম আক্তার সাজিয়ে আত্মসমর্পণ করানো হয়। তখন আদালত মিনুকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়।

২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল কুলসুম আক্তার হাইকোর্টে আপিল করেন। সেই সঙ্গে জামিনের আবেদনও করেন।

চলতি বছরের ২১ মার্চ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ১২ জুন কারাগারে পাঠানো আসামি প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি কুলসুম আক্তার।

এ আবেদনের শুনানি শেষে আদালত কারাগারে থাকা মিনুকে আদালতে হাজির করে তার জবানবন্দি নেয়। তখন তিনি জানান, তার নাম মিনু, তিনি কুলসুম নন।

মিনু বলেন, মর্জিনা নামের এক নারী তাকে চাল, ডাল দেবে বলে জেলে ঢোকান। প্রকৃত আসামি কুলসুম আক্তারকে তিনি চেনেন না।

আদালত কারাগারের রেজিস্ট্রারগুলো দেখে হাজতি আসামি কুলসুমী ও সাজা ভোগকারী আসামির চেহারায় অমিল খুঁজে পান। তখন আদালত কারাগারের রেজিস্ট্রারসহ একটি উপনথি হাইকোর্ট বিভাগে আপিল নথির সঙ্গে সংযুক্তির জন্য পাঠিয়ে দেয়। হাইকোর্ট গত ৭ জুন নিরপরাধ মিনুকে মুক্তির নির্দেশ দেয়।

আরও পড়ুন:
সড়ক দুর্ঘটনা নাকি হত্যা, প্রশ্ন আইনজীবীর
মুক্তি পেলেন সেই মিনু
নিরপরাধ হয়েও জেল খাটা মিনুকে মুক্তির নির্দেশ

শেয়ার করুন

মন্তব্য