দাপুটে ছাত্রলীগ নেতা ফারুক এখন রিকশাচালক

দাপুটে ছাত্রলীগ নেতা ফারুক এখন রিকশাচালক

যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে ছুটছেন সাবেক ছাত্র লীগনেতা আজকের রিকশাচালক ফারুক। ছবি: নিউজবাংলা

'আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ফারুকের মতো কর্মীরা অবহেলিত, এটি দুঃখজনক। জীবিকার জন্য ফারুক রিকশা চালাচ্ছেন। এতে লজ্জার কিছু নেই। তবে অনেকেই এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করছেন। আমরা যুবলীগ বিষয়টি নিয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলব। দেখি তার জন্য কিছু করতে পারি কিনা।'

একসময় তার ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন ছাত্রলীগের শত শত নেতা-কর্মী। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়াই করেছেন। সহ্য করতে হয়েছে জেল-জুলম-নির্যাতন। লেখাপড়াটাও শেষ করতে পরেননি।

নোয়াখালীর কবিরহাট সরকারি ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রলীগের দুঃসময়ের সঙ্গী সেই নেতা আনোয়ার হোসেন ফারুক এখন অর্থাভাবে রিকশা চালান।

আনোয়ার হোসেন ফারুক কবিরহাট উপজেলার পদুয়া গ্রামের মোহাম্মদ উল্যার ছেলে। মোহাম্মদ উল্যার চার ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে ফারুক দ্বিতীয়। মা, স্ত্রী, চার কন্যাসন্তান নিয়ে বড় একটি সংসারের দায়িত্ব এখন ফারুকের কাঁধে। ফারুকের ছোট ভাই পারভেজ মোশারফ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য।

২০০১ সালে বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম যখন নিভু নিভু অবস্থায়, তখন দাপটের সঙ্গে কবিরহাট সরকারি ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে সংগঠন গুছিয়ে তোলেন তিনি। সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় থাকায় জেল-জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ফারুক।

সরেজমিনে কবিরহাট বাজারে ফারুকের রিকশার যাত্রী হয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। ফারুক বলেন, ১৯৯৫ সালে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ওই বছরই কবিরহাট পদুয়া শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে কবিরহাট উচ্চ বিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি, ২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে কবিরহাট সরকারি ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এইচএসসি পাস ফারুক বলেন, তখনকার সময়ে ছাত্রলীগকে সংগঠিত করতে গিয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের রোষানলে পড়তে হয়। যার কারণে ডিগ্রি পরীক্ষাটা পর্যন্ত দিতে পারিনি। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর একটি ছোটখাটো চাকরির জন্য নেতাদের দরজায় দরজায় ঘুরেছি, পাইনি।

৪০ বছর বয়সী এই সাবেক ছাত্রনেতা বলেন, ‘তারপরও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি থেকে সরে যাইনি। ২০১০ সালে নরোত্তমপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সম্মেলনে ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পাই।’ এর পরপরই সাংগঠনিক সক্রিয়তার কারণে উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হন ফারুক।

তবে তাকে দেয়া হয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ।

ফারুক বলেন, টানা তৃতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ওয়ার্ড থেকে শুরু করে দলের উচ্চপর্যায়ে অনেকেই নানা উপায়ে অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন। কিন্তু আমরা যারা শ্রম-ঘাম দিয়ে আজকের আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছি, তাদের মূল্যায়ন হয়নি।

‘অনুপ্রবেশকারীদের ভিড়ে আমরা হারিয়ে গেছি। আমরা অপরাজনীতির শিকার হয়েছি। রাজনীতি করতে গিয়ে কোনো কাজও শিখিনি, যার কারণে আজ অর্থাভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করতে হচ্ছে।’

আনোয়ার হোসেন ফারুক বলেন, এক বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত হওয়ায় অনেকেই আমার রিকশায় উঠতে চান না।

ছাত্রলীগ নেতা ছোট ভাই পারভেজ মোশারফের একটি চাকরির আবেদন জানান সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা।

স্থানীয়রা বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ফারুক। রাজনীতি করে তিনি কিছুই করতে পারেননি। দল ক্ষমতায় থাকার পরও এখন তিন বেলার ভাত জোটানোই তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফারুকের রিকশায় চড়তে কেমন লাগে—এ প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রহমান, এমদাদ হোসেন, ইমাম উদ্দিনসহ অনেকেই বলেন, ফারুক একসময় রাজপথ কাঁপিয়েছেন। তার পেছনে হেঁটে, তার দেয়া স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়েছেন শত শত নেতা-কর্মী। এখন তার রিকশায় যাত্রী হতে লজ্জা লাগে।

কবিরহাট উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আবু জাফর আবির বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ফারুকের মতো কর্মীরা অবহেলিত, এটি দুঃখজনক। জীবিকার জন্য ফারুক রিকশা চালাচ্ছেন। এতে লজ্জার কিছু নেই। তবে অনেকেই এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করছেন। আমরা যুবলীগ বিষয়টি নিয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলব। দেখি তার জন্য কিছু করতে পারি কিনা।

কবিরহাট পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান রতন বলেন, ফারুকরা দুঃসময়ে দলের জন্য কাজ করেছেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন। দলের এই নেতা-কর্মীরা নীতিনৈতিকতার কারণে আদর্শের বাইরে গিয়ে দলবাজি করে অর্থ উপার্জন করতে পারেননি। অথচ দলের ভিতর অনুপ্রবেশকারীরা আজকে দলবাজি করে অনেক অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন।

দলীয় হাইকমান্ড থেকে এই ত্যাগী নেতা-কর্মীদের খুঁজে বের করে তাদের মূল্যায়ন করা উচিত বলে মনে করেন এই নেতা।

শেয়ার করুন

মন্তব্য