বাতাসে পূজা পূজা গন্ধ। শুরু হয়ে গেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। আকাশে সাদা মেঘ, দিকে দিকে কাশফুলের শুভ্রতা আর বাতাসের বদলে যাওয়া ঘ্রাণ- সবই বার্তা দিচ্ছে শারদীয় উৎসবের।
তাহলে এটা কোন মাস বাংলায়? শরৎ? না, হেমন্ত!
তবে যে এই ক্ষণে বাজলো শারদীয় দুর্গাপূজোর ঢাক? এবার কি দেরি হয়ে গেলো তবে?
না, পূজা ঠিক সময়েই হচ্ছে৷ শরৎ বা হেমন্ত মুখ্য নয়। মুখ্য তবে কী? ওই যে! বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট কণ্ঠে আবৃত্ত মহালয়ার আগমনীর সেই ‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে…’!
হ্যাঁ, দুর্গাপূজা শুরুর নির্ধারিত মাসটি আশ্বিন। মহালয়ার মধ্য দিয়ে আশ্বিনেই শুরু হয় দুর্গাপূজা, আগমনী যাকে বলে।
এই দুর্গাপূজা কত পুরনো? বা মানব সভ্যতায় ঈশ্বরবিশ্বাসীদের জন্য এই দেবীরূপের প্রকাশ কত প্রাচীন?
সর্বপ্রাচীন যে গ্রন্থে দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায় তা হচ্ছে ঋগ্বেদ। যদিও সেখানে সঙ্গতভাবেই দেবীর প্রতিমা পূজার কোনো বর্ণনা বা নির্দেশনা ছিলো না। মূলত বৈদিক ধর্মীয় দর্শন আর বর্তমানে প্রচলিত ধর্মীয় আচারাদির মাঝে নদীর স্রোতে মেশা পলির মতোই যোগ হয়েছে সহস্রাব্দের বিবিধ লোকাচার, বিশ্বাস, সংস্কার, কুসংস্কার ও সময়ের বা পরিস্থিতির প্রয়োজনীয়তায় উপলব্ধ নিদান, বিধান।
মূলত পূজা হিসেবে, দুর্গাপূজার সূচনা রাজা সুরথের হাত ধরে বলেই প্রাচীনতম তথ্যসূত্র পাওয়া যায়।
মার্কন্ডেয় পুরাণে রাজা সুরথকে দেবী দুর্গার পূজারী ও মর্ত্যে তার প্রচারক বলে উল্লেখ করা হয়।
মজার বিষয় হচ্ছে, এই সুরথ রাজার জয়কৃত রাজ্যের রাজধানী ছিলো স্বপুর (পুরাণে উল্লিখিত নাম), যা কিনা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরে অবস্থিত৷ বলা হয়, সুরথ রাজা যে বিপুলসংখ্যক পশু বলি দিতেন দুর্গাপূজায়, তা থেকেই বলিপুর নামের উদ্ভব যা কালের বিবর্তনে বোলপুর রূপ ধারণ করেছে।
দেবী মাহাত্ম্যের ১২তম এবং ১৫তম লাইন ‘তত: স্বপুরমায়াতো নিজেদেশাধিপোহভবৎ’ অনুসারে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরের বর্তমান ‘সুপুর’ (স্বপুর)-এর রাজা ছিলেন। এ থেকে আমরা দুটি বিষয় নিশ্চিত হতে পারি।
এক, দুর্গাপূজা প্রচলনের প্রাচীনতম তথ্যসূত্র বাংলা অঞ্চলেই এই দেবীর প্রথম উপাসনার সংবাদ দেয়।
দুই, বাংলা অঞ্চলের ভূমিকন্যা বলে গণ্য করা যায় এই দেবীরূপকে। সে কারণে বাংলা অঞ্চলের হিন্দুদের মাঝেই দুর্গাপূজা উদযাপনের মাত্রা সবচেযে অনন্য। শুধু তাই নয়, বাঙালির কাছে দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; দুর্গাপূজা আক্ষরিক অর্থেই বাঙালি হিন্দুর জীবনের, তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই সুরথ রাজা শাক্ত ছিলেন। শাক্ত হচ্ছে হিন্দু ধর্মীয় দর্শনের একটি মতবাদ বা শাখা। এরা শক্তির পূজারী। এবং সচরাচর শাক্তরা শক্তির প্রকৃত রূপ বলতে মাতৃশক্তিকেই জ্ঞান করে। এ অর্থে শাক্তরা মাতৃপূজারী, যে কারণেও সুরথ রাজার দেবী দুর্গার উপাসক হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিলো।
এই সুরথ রাজা দুর্গাপূজা করতেন বসন্তকালে। সেটাই সঙ্গত ছিলো তৎসময়ে। কেননা হিন্দু ধর্মে পৌষ থেকে চৈত্র পর্যন্ত পূজাদি করার প্রচলন বিদ্যমান বহুলাংশে। কারণ হিন্দু জনপ্রিয় মতবাদগুলোর বিশ্বাস অনুযায়ী, এ সময়ে স্বর্গের দেবতারা জেগে থাকেন। অর্থাৎ এটি তাদের দিবাকাল, পৃথিবীর ছয় মাসে তাদের এক দিন হয়, আর অপর ছয় মাস তাদের এক রাত।
পরবর্তীতে রামায়ণে, বিশেষত এর বাংলা সংস্করণগুলোতে আমরা দেখতে পাই, যার মাঝে উল্লেখযোগ্য কৃত্তিবাসী রামায়ণ; যে অবতার পুরুষ রাম-রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার আগে দেবী দুর্গার বন্দনা করেন যুদ্ধে জয় প্রার্থনার জন্য। এ পূজা তিনি শরৎকালে করেন। যেটি অকাল ছিলো দুর্গাপূজার জন্য৷ এ কারণে এই পূজাকে অকালবোধন বলেও আখ্যায়িত করা হয়।
মূলত পূজার এই ধরনটিই বিবিধ কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অধিক জনপ্রিয়তা পায়৷ আজ আমরা যে পূজা দেখতে পাই প্রতি বছর, তা মূলত সেই রামচন্দ্রের করা পূজারই বার্ষিক উদযাপন ও পালন।
তবে উল্লেখ থাকে যে, প্রতি বছর বসন্তকালেও কিন্তু দুর্গাপূজা হয়। ওই যে, রাজা সুরথের ধারা অনুযায়ী। তবে তা ততোটা ঘটা করে আজ আর পালিত হয় না। এ পূজাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়।
এ তো গেল কেবল দুর্গাপূজা প্রচলনের ইতিহাস। কিন্তু যার প্রচলনের ইতিহাস এটি, তার আবির্ভাবের বর্ণনা আবার ভিন্ন। অর্থাৎ পুরাণ অনুসারে মহিষাসুর বধের সেই আখ্যান। যে আখ্যান অনুযায়ী, পূজা করার সূচনা সেই রাজা সুরথের আমলে এবং যে বিশ্বাসের পালন রামচন্দ্রও করেছেন রামায়ণমতে। পৌরাণিক সে আখ্যান এই যে, যখন মহিষাসুর নামক শক্তিশালী ও রূপ বদলে সক্ষম, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে অত্যন্ত পারঙ্গম অসুর স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল জয় করে দেবতাদের অতিষ্ঠ করে তোলে এবং সব দেবতা তার কাছে পরাজিত হন তখন সব দেবতার সম্মিলিত ক্রোধের তেজস্বীতে প্রকাশিত হোন শক্তির এক তেজস্বিনী রূপ। সব দেবতা যাকে দেন নিজ নিজ অস্ত্রাদি, উপচার ও ব্যবহার্য। আর এসব একা ধারণ করতে সেই দেবী হয়ে ওঠেন দশভূজা। দশ হাতে তিনি ধারণ করেন খড়্গ, ত্রিশুল, কমন্ডলু, শঙখ, চক্র ইত্যাদি। বাহন হয় সিংহ৷
যুদ্ধে প্রবল শক্তিধর মহিষাসুরকে তিনি পরাজিত করেন। দেবতার বরে যে ছিলো সব দেব, যক্ষ, গন্ধর্ব ও পুরুষের অবধ্য। প্রবল অহঙ্কারে যে প্রমত্ত হয়ে তুচ্ছজ্ঞান করেছিলো নারী বা মাতৃশক্তিকে, যাদের থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য বর গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সে বোধ করেনি। তাই তো দেবী দুর্গাকে সামনে দেখেও সে হেসে কটাক্ষ করতে শুরু করে। তাচ্ছিল্য করে ও ঘরে ফিরে যেতে বলে। কিন্তু তৎপরবর্তীতে শোচনীয়ভাবে যখন সে মাতৃশক্তির কাছে পরাজিত ও আহত হয় তখন মৃত্যুকালে সে-ই আবার মা দুর্গার কাছে শরণাগত হয় এবং প্রার্থনা করে মায়ের পূজার আগে যেন তার পূজাও হয়৷ আর এ জন্যই প্রতি বছর দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গার পূজার প্রথম আনুষ্ঠানিকতাই শুরু হয় মহিষাসুরের পূজার মধ্য দিয়ে।
এটিই সংক্ষেপে দেবী মাহাত্ম্য, অর্থাৎ ঈশ্বরের এই দেবী রূপের লীলামাহাত্ম্য হচ্ছে এই বর্ণনাটিই। কিন্তু এটিকে আবার বিশ্লেষিত করা যায় নানা মতবাদ দিয়ে, যা এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য নয়। তবে প্রাসঙ্গিক বিধায় এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে হিন্দু ধর্মের বহমান নানা ধারা বা মতবাদের সবাই প্রচলিত বিশ্বাসের সব ক্ষেত্রে ঐকমত্য না হলেও প্রতিটি কষ্টিপাথরে নিজস্ব দর্শনানুযায়ী বিশ্লেষণের পরও সব মতবাদই ধারণ করছেন এমন এক সত্তা বা কল্পনা হচ্ছেন দেবী দুর্গা।
দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় উৎসব। আরও সহজ ভাষায় বললে বলে ফেলতে হয়- বাঙালি হিন্দুর পরিচয় আর দুর্গাপূজা একে অপরের সমান্তরাল।
নিরপেক্ষভাবে বললে, শুধু বাঙালি হিন্দুই নয়, গোটা বাঙালি জাতির ব্যাপ্তির দিক থেকে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও উৎসবমুখর উদযাপনটির নাম দুর্গাপূজা।
২০২১ সালে ইউনেস্কো একে ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
ইউনেসকোর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘দুর্গাপূজাকে ধর্ম ও শিল্পের সর্বজনীন মিলন ক্ষেত্রের সর্বোত্তম উদাহরণ হএসবে দেখা হয় এবং সহযোগী শিল্পী ও ডিজাইনারদের জন্য একটি সমৃদ্ধ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশের এক প্রান্তের হিমালয়-কন্যা নেপালে যার নাম দাশাইন, আর বিপরীতের শেষতম প্রান্তে কোথাও বা তার নাম নবরাত্রি (তামিলনাড়ু) কোথাও বা কুল্লু দাশেরা (মাইশোর, কর্ণাটক ইত্যাদি)।
আর মাঝের পুরো ভূমিটি জুড়ে এই উদযাপন বর্ণে, গন্ধে, ছন্দে মাতিয়ে তোলে; রাঙিয়ে তোলে সমগ্র ভারতবর্ষকে নয়টি দিন জুড়ে। আর আজ তো বিশ্বায়নের যুগে প্রবাসী হিন্দুদের কারণে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে তা নানা ধরনে, নানা আয়োজনে।
দুর্গাপূজা শুধু ব্যাপ্তিতে নয়, বৈচিত্র্যেও অনেকটা বিস্তৃত। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ভূখণ্ডেও এক দুর্গাপূজায় যে পরিমাণ ভিন্নতা দেখা যায়, বাস্তবে পশ্চিমা মহাদেশগুলোতে ততো বৈচিত্র্য খুঁজে পাওয়ার মতো কোনো উপলক্ষ অত্যন্ত দুষ্কর৷ এটি প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক উর্বরতার প্রমাণ নির্দেশ করে।
বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে যেমন প্রতিমা বা প্যান্ডেলের ধরণ দেখা যায়, শতখানেক কিলোমিটার দিক বদলাইলেই উত্তর-পূর্বের সিলেট অঞ্চলে তা সম্পূর্ণ ভিন্নতর। আর যদি যাওয়া হয় দক্ষিণবঙ্গের দিকে, তবে দেখা মিলবে আড়ম্বরের অন্যতর রূপ।
আধ্যাত্মিক দিক থেকেও দুর্গাপূজার আছে এমন কিছু অনুষঙ্গ যা বর্তমান বিশ্বের প্রচলিত ধর্মীয় আচারাদির মধ্যে অত্যন্ত স্বকীয়। দুর্গাপূজাই খুব সম্ভবত এখন অবধি চলমান সবচেয়ে বড় চর্চা যেখানে মানুষের পূজা সরাসরি হয়। দুর্গাপূজার অষ্টমীর দিনে কুমারী পূজা হয়। যেখানে একটি নাবালিকা কন্যাশিশুকে দেবীরূপে পূজিত করা হয়। পূজার এই দিনের সব আনুষ্ঠানিকতা এই উপলক্ষকে ঘিরেই আয়োজিত ও পালিত হয়।
এছাড়াও দুর্গাপূজাকে ঘিরে লৌকিক যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাও অনন্য৷ যেমন, পুরো ভারতবর্ষে পূজা হয় দেবী দুর্গার, যিনি মহিষাসুরকে বধ করেছেন। কিন্তু বাঙালি তার লোকাচারের সঙ্গে মিলিয়ে একেও বানিয়ে বসে আছে ঘরের মেয়ের নাইওর আসার আখ্যান। অর্থাৎ বাঙালি পূজার পাঁচটা দিনকে গণ্য করে এভাবে যে, বাড়ির মেয়ে পার্বতী (দুর্গা) তার পূত্র-কন্যাসহ নাইওর এসেছেন পিতৃগৃহে।
আগে সম্পন্ন বাঙালি গৃহস্থ তার বাড়িতে নাইওর আসা কন্যাকে সমাদর করতেন, আপ্যায়ন করতেন পাঁচ দিন ধরে; হুবহু সেভাবেই বাঙালি দুর্গাপূজায় নিজস্ব সেসব আচার পালন করে। যেমন অষ্টমীতে নিরামিষ রান্না করে খাওয়ানো’ নবমীতে মাছ-ভাত আর পিঠাপুলিতে একদম থালা সাজিয়ে আপ্যায়ন। দশমীতে শাঁখা-সিঁদুরে বাড়ির মেয়েকে সাজিয়ে বিদায় জানানো। প্রতিমা বিসর্জনের যে দৃশ্য সাধারণ্যে দৃশ্যমান তা কেবল মাটির প্রতিমার বিসর্জনই সোজা বাংলা। মূল বিসর্জন হয় ঘট বিসর্জন, যা দৃশ্যমান প্রসেশনের আগেই হয়। প্রসেশনের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মূলত আধ্যাত্মিক কোনো মাহাত্ম্য নেই। এটি নিছক পূজা শেষে পুজার উপাচারাদি, প্রতিমা ইত্যাদির নদীতে বিসর্জন।
দুর্গাপূজার অর্থনৈতিক বা অন্যান্য প্রভাবও পড়ে ভারতবর্ষে ব্যাপকভাবেই। ২০১৩ সালের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বছরে ২৫ হাজার কোটি রুপির বাজার সৃষ্টি হয় কেবল দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এবং এই বাজারের বার্ষিক বৃদ্ধির হার তখন ছিল ৩৫ শতাংশ। এছাড়া কুমার, বিশেষ প্রকৃতির তাঁতী ইত্যাদি শ্রেণীর পেশা টিকে থাকার অন্যতম মাধ্যম এই দুর্গাপূজা।
তবে অর্থনৈতিক গুরুত্ব, সামাজিক গুরুত্ব ইত্যাদিকে ছাপিয়ে যায় যে জিনিসটি সেটি হচ্ছে এই পূজার রাজনৈতিক গুরুত্ব।
দুর্গাপূজা কোনো বিচিত্র কারণে বঙ্গীয় জনপদে সব সময়ই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বিশেষত এ অঞ্চলে সার্বজনীন দুর্গাপূজার প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ বিস্তৃতি পায় ১৬ শতকে। তারপর থেকে দুর্গাপূজা সব সময়েই ব্যবহৃত হয়েছে রাজনৈতিক উপলক্ষ হিসেবেও। বাঙালির বিদ্রোহ, বিপ্লব ও বোমাবাজির রাজনীতি থেকে তোষামোদ ও চাটুকারিতার রাজনীতি- সর্বত্রই দুর্গাপূজা প্রবল গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে দেখা দিয়েছে বার বার, বহুবার।
যেমনটা দেখা যায় ব্রিটিশ আমলে৷ ইংরেজবিরোধী জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তোলার জন্য হিন্দু নেতারা যুবসমাজকে এক করা ও স্বাচ্ছন্দ্যে কর্মকাণ্ড চালানোর অন্যতম উপলক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন দুর্গাপূজাকে।
এমনকি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসও সে সময়ে ভিন্ন ভিন্ন পূজা মণ্ডপে নিয়মিত উপস্থিত হয়ে পূজার শুভেচ্ছা বক্তব্যের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেন বিপবী জাতীয়তাবাদের স্ফুলিঙ্গ।
বিপ্লবী অতীন্দ্রনাথের সিমলা ব্যায়াম সমিতির পূজায় অষ্টমীর দিনটি পালিত হতো বীরাষ্টমী হিসেবে৷ এদিনে সারা বছরে রপ্ত করা সব কসরৎ দেখাতে ব্যায়ামবীরেরা উপস্থিত হতেন, আয়োজন হতো কুস্তি, অসিখেলা, লাঠিখেলা, ছুরিখেলার। শপথ পাঠ ইত্যাদিও হতো। এই ব্যায়াম সমিতি সুভাষচন্দ্রকে পূজা আয়োজক কমিটির সভাপতিও করেছিলো।
তবে দিনশেষে ধর্মীয় আচার বা উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য যতটা না অর্থনীতি বা রাজনীতিকে প্রভাবিত করে, তার চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এর সামাজিক প্রভাব।
আর সে জায়গায় নিঃসন্দেহে বাঙালির দুর্গাপূজা এখনও অসাধারণ এক উপলক্ষ। আজও বাঙালির ধর্ম-নির্বিশেষে আনন্দে ভাসার দিনগুলোর মাঝে পাঁচটি দিন আসে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে। মেলা বা নাটিকা, সঙ্গীতায়োজন ইত্যাদি কেবল হিন্দুদের নয়, পুরো জাতির বিনোদনের একটি উৎস হয়ে ওঠে। পূজার আয়োজনে, বিশেষ করে বাংলাদেশে মুসলিমদের আন্তরিক সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আক্ষরিক অর্থেই এটি ভ্রাতৃত্ববোধকে প্রতি বছর একবার করে মজবুততর করে।
তাই এখনও বাংলাদেশে দুর্গাপূজা শারদোৎসব। এবং নিঃসন্দেহেই তা থাকবে আবহমান।
সেই শারদোৎসবের মঙ্গলদীপ উদ্ভাসিত করুক, নির্মল করুক, দূর করুক অজ্ঞানতার অন্ধকার। ঋত, ঋদ্ধ হোক বাংলাদেশ।
আগামী বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন।
রোববার (২ নভেম্বর) সচিবালয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে তাবলিগের দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠক শেষে উপদেষ্টা এ কথা জানান।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি উপস্থিত ছিলেন।
উপদেষ্টা জানান, দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ইজতেমার তারিখ ঠিক করা হবে।
পোপ হলেন ক্যাথলিক চার্চের সর্বোচ্চ নেতা। ১.৪ বিলিয়ন মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দু। যিশুর প্রধান শিষ্য। ফলে আস্থার দিক থেকে খ্রিষ্টান সমাজ ও চার্চে পোপের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ধরা হয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে শুধুমাত্র পুরুষকেই বেছে নেওয়া হয়। সেখানে কোনো নারীর জায়গা নেই।
যাজক হিসেবে সবসময়ই পুরুষদের নির্বাচিত করায় বারবারই প্রশ্নের মুখে পড়েছে চার্চ। কয়েক শ বছর থেকেই যাজকের দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন নারীরা। ১২ বছর ধরে রোমান ক্যাথলিকদের ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর প্রয়াত হয়েছেন পোপ ফ্রান্সিস। তার প্রয়াণের পর এবার নতুন করে শুরু হবে পোপ নির্বাচন। তখন নতুন করে উঠেছে প্রশ্নটি।
পোপের মৃত্যু পর বা পদ্যত্যাগ করার পর ১৫-২০ দিন সময় নেয় রোমান ক্যাথলিক চার্চ। এই সময়ের মধ্যে সারা বিশ্ব থেকে চার্চের সবচেয়ে প্রবীণ কর্মকর্তারা রোমে এসে উপস্থিত হন। তাদের সম্মিলিতভাবে ‘কলেজ অব কার্ডিনালস’ বলা হয়। ভ্যাটিকান থেকে তাদের কাছে পোপ নির্বাচনে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ আসে।
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সকলকে তাদের পছন্দের ব্যক্তির নাম কাগজে লিখে জানাতে হয়। কঠোর প্রোটোকল অনুসারে, এই নির্বাচনে শুধুমাত্র পুরুষরাই অংশগ্রহণ করতে পারবেন, কোনো নারী নয়।
পোপ হওয়ার অধিকার থেকে নারীদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি চার্চের দীর্ঘদিনের রীতির সঙ্গে যুক্ত। এই বিষয়টি কেবল পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। ক্যানন আইন (ক্যানন ১০২৪) অনুসারে, শুধুমাত্র দীক্ষিত পুরুষদেরই পোপ হিসেবে নিযুক্ত করা যেতে পারে। আসলে খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস যে প্রভু যীশু কেবল পুরুষদের শিষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যে নিয়ম ক্যাথলিক চার্চে বহুদিন ধরে চলছে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিলিজিওন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি প্রোগ্রামের ডিরেক্টর রেভারেন্ড টমাস রিজের মতে, পোপের মতো পদের জন্য অর্ডিনেশন প্রয়োজন এবং নারীদের পুরোহিত হওয়ার অনুমতি নেই।
একবার প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসকে প্রশ্ন করা হয়, নারীরা কি কখনো পোপ হতে পারবেন না? উত্তরে পোপ বলেন, আপনি যদি সেইন্ট দ্বিতীয় জন পলের ঘোষণা ভালোভাবে পড়ে থাকেন তাহলে সেই নির্দেশনা এখনও অব্যাহত রয়েছে। নারীরা অন্য অনেক কাজে পুরুষের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো করতে পারেন। তবে পোপ হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ওপর বিধিনিষেধ আছে।
ইতিহাসের দিক থেকে, পোপ হওয়ার মানদণ্ড মতবাদের পরিবর্তে নজিরের ওপর ভিত্তি করে। ১৪৫৫ সালে পোপ ক্যালিক্সটাস তৃতীয় ছিলেন পোপ নির্বাচিত হওয়া শেষ অ-পুরোহিত এবং ১৩৭৮ সালে আরবান ষষ্ঠ ছিলেন শেষ অ-কার্ডিনাল পুরোহিত যাকে নির্বাচিত করা হয়েছিল।
ক্যাথলিক চার্চের ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে, যিশুখ্রিষ্ট ১২ জন পুরুষকে তার শিষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যারা পরে তাদের পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়ার জন্য অন্যান্য পুরুষদের বেছে নিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ, চার্চ এই পুরুষতান্ত্রিক ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। ঠিক সেই কারণেই নারীরা কখনো যাজক হতে পারে না।
প্রতীকী ছবি
পবিত্র লাইলাতুল কদর বা শবে কদর বৃহস্পতিবার। এর অর্থ ‘অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত’ বা ‘পবিত্র রজনী’।
আজ সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হবে কদরের রজনী।
যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সারা দেশে রাতটি পালন করা হবে।
মহান আল্লাহ লাইলাতুল কদরের রাতকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন। হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও এ রাতের ইবাদত উত্তম।
এ রাতে আল্লাহর অশেষ রহমত ও নিয়ামত বর্ষণ করা হয়। নির্ধারণ করা হয় মানবজাতির ভাগ্য।
৬১০ সালে কদরের রাতেই মক্কার নূর পর্বতের হেরা গুহায় ধ্যানরত মহানবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) কাছে সর্বপ্রথম সুরা আলাকের পাঁচ আয়াত নাজিল হয়। এরপর আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর বহনকৃত ওহির মাধ্যমে পরবর্তী ২৩ বছর ধরে মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট আয়াত আকারে বিভিন্ন সুরা নাজিল করা হয়।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে।
‘শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরা আল- কদর, আয়াত ১-৫)।’
হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) রমজান মাসের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ ১০ রাতে লাইলাতুল কদর সন্ধান করো (বুখারি ও মুসলিম)।’
মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় পবিত্র রাতটি ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে কাটিয়ে দেন। কামনা করেন মহান রবের অসীম রহমত, নাজাত, বরকত ও মাগফিরাত।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ রাত থেকে পরের দিন ভোররাত পর্যন্ত মসজিদসহ বাসা-বাড়িতে এবাদত বন্দেগিতে মশগুল থাকবেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। নফল নামাজ, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আসকার, দোয়া, মিলাদ মাহফিল ও আখেরি মোনাজাত করবেন তারা।
এই উপলক্ষে শুক্রবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে রাতব্যাপী ওয়াজ মাহফিল, ধর্মীয় বয়ান ও আখেরি মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের সব মসজিদেই তারাবির নামাজের পর থেকে ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন থাকবে।
পবিত্র লাইলাতুল কদর/শবে কদর উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি রেডিওগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করবে।
এ ছাড়া সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করা হবে।
ইসলামের স্বর্ণযুগের চিকিৎসাকর্মী। ছবি: দ্য রিভিউ অব রিলিজিয়নস
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ক্রিকেটার তামিম ইকবালের সুস্থতায় দেশবাসী যেমন চরম আনন্দ পেয়েছে, তেমনই তাদের অনেকে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। এতদিন দেশের মানুষের বিশাল অংশের একটি ধারণা ছিল যে, বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসক নেই। কিন্তু তামিম ইকবাল যখন বুকে ব্যথা অনুভব করেন, তখন দুই ঘণ্টার মধ্যেই এনজিওগ্রাম, হার্টে স্টেন্ট তথা রিং বসানোসহ সবকিছু হয়ে যায়।
তামিম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার। তাই তার চিকিৎসায় বিলম্ব হয়নি। এই যে দ্রুত গতিতে চিকিৎসাসেবা পাওয়া, সেটি তার জন্য করুণা নয়; বরং ন্যায্য পাওনা।
আকস্মিক অসুস্থতায় মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার পর তামিমের দ্রুত চিকিৎসা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ঘটনাটি সমাজে ধনী-দরিদ্র্যের বৈষম্যকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসাপ্রাপ্তির অভিজ্ঞতা এত সুন্দর বা সহজ নয়। ভর্তির ফরম পূরণ, সিরিয়ালের অপেক্ষা, হাসপাতালের করিডোরে দীর্ঘ প্রতীক্ষা—আরও কতকিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রতি পদে পদে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, এখানে উন্নত চিকিৎসা পেতে হলে আপনাকে ধনী, জনপ্রিয়ত হতে হবে অথবা আপনার তদবির করার মতো লোক থাকতে হবে। যাদের সেগুলো আছে, তারা ভালো চিকিৎসা পাবে, যাদের নেই তারা প্রক্রিয়াগত জটিলতায় পড়বেন। ভাগ্য ভালো না হলে বেঘোরে প্রাণটা হারাবেন।
জনগণ তামিমের ঘটনা থেকে জানতে পারল বাংলাদেশে চিকিৎসা নেই কথাটা ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ছাড়া ভুল। বাংলাদেশে উন্নত চিকিৎসা আছে, কিন্তু সেটা সাধারণ জনগণের জন্য সোনার হরিণেরমতো।
আসলে এটি শুধু বাংলাদেশের চিত্র নয়, সারা বিশ্বেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুচিকিৎসা পেতে অনেক বেগ পেতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি বছর প্রায় সাত হাজার ৭৪৯ ডলার খরচ করতে হয় স্বাস্থ্যবিমার জন্য। দেশটিতে গত এক দশকে বিমাহীন মানুষের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ বেড়েছে, যা দরিদ্রদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে।
জানলে অনেকে আঁতকে উঠবেন যে, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় প্রতি বছর আড়াই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় ভুল চিকিৎসায়। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও অন্য কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সংখ্যা চার লাখেরও বেশি। হৃদরোগ ও ক্যানসারে ভুল চিকিৎসার জন্য মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি।
যদিও ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD) নামে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী একটি ফোরাম বলছে, আমেরিকার চেয়ে পৃথিবীর আর কোনো দেশে চিকিৎসা খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করা হয় না। তবে চিকিৎসায় ব্যয়ের বেশির ভাগ অংশ সরাসরি রোগীদের চিকিৎসার জন্য নয়, বরং হাসপাতাল নির্মাণ, উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন ও ওষুধের উচ্চমূল্যের পেছনে ব্যয় হয়। ফলে জনসাধারণ স্বল্প মূল্যে চিকিৎসা পান না।
আমরা যখন একুশ শতকে সামরিকভাবে প্রচণ্ড প্রভাবশালী রাষ্ট্রের এ চিত্র দেখছি, তখন শত শত বছর আগে ইসলামী ভাবধারার শাসনামলে চিকিৎসা ছিল ধনী-গরিব সবার জন্য সমান। পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডে ইসলামের সোনালি এ দিনগুলোকে অন্ধকারাচ্ছন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে ১২৮৪ খ্রিস্টাব্দে কায়রোর আল-মানসুর কালাউনের বিমারিস্তানের (হাসপাতাল) পলিসি স্টেটমেন্টটি দেখলে আপনি হয়তো ফিরে যেতে চাইবেন সেই সময়ে। চলুন দেখে নিই, কী ছিল সেই পলিসি স্টেটমেন্টে।
সেখানে বলা ছিল, ‘হাসপাতাল সকল রোগীকে-পুরুষ ও নারী- সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত রাখবে। সব খরচ হাসপাতাল বহন করবে, তা সে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসুক বা নিকটবর্তী এলাকা থেকে, বাসিন্দা হোক বা বিদেশি, সবল হোক বা দুর্বল, উচ্চবিত্ত হোক বা নিম্নবিত্ত, ধনী হোক বা দরিদ্র, কর্মরত হোক বা বেকার, দৃষ্টিহীন হোক বা শারীরিকভাবে সক্ষম, মানসিক বা শারীরিকভাবে অসুস্থ, শিক্ষিত বা নিরক্ষর সবাইকে সমান সেবা দেওয়া হবে।’
এখানে কোনো শর্ত বা অর্থ প্রদানের বাধ্যবাধকতা নেই। কেউ যদি অর্থ প্রদান করতে না পারত, তাতেও কোনো আপত্তি বা ইঙ্গিত করার সুযোগ ছিল না। সম্পূর্ণ সেবাটি পরম দয়ালু আল্লাহর অনুগ্রহের মাধ্যমে প্রদান করা হতো।
১২৮৪ সালে মিসরের কায়রোতে নির্মিত এই ‘মানসুরি হাসপাতাল’ ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে উন্নত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। এখানে চারটি বড় আঙিনার কেন্দ্রে জলপ্রপাত ছিল, রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ, ওষুধ বিতরণ কেন্দ্র এবং শিক্ষার্থীদের জন্য লেকচার হল ছিল।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা শুধু রোগীদের চিকিৎসাই করতেন না, বরং প্রয়োজনে তাদের বাড়িতেও গিয়ে সেবা দিতেন। বিশেষত, জ্বর ওয়ার্ডগুলোকে জলপ্রপাতের মাধ্যমে ঠান্ডা রাখা হতো এবং রোগীদের বিনোদনের জন্য সংগীতশিল্পী ও গল্প বলার ব্যবস্থা ছিল।
বিশেষভাবে উল্লেখ করার বিষয় হলো রোগীরা হাসপাতাল থেকে ছাড়ার সময় তাদের হাতে কিছু পরিমাণ অর্থ তুলে দেওয়া হতো, যাতে তারা আর্থিক সংকটে না পড়ে এবং কাজের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
এবার একটি চমকপ্রদ চিঠি তুলে ধরা হলো, যা দেখলে আপনি অবাক হতে পারেন। আর সেই সঙ্গে ইসলামী শাসনামলের চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।
দশম শতাব্দীতে কর্ডোবার একটি হাসপাতাল থেকে এক তরুণ ফরাসি যুবকের চিঠির কথা আমির গাফার আল-আরশদি কর্তৃক ১৯৯০ সালে বৈরুতের আল-রিসালা এস্টাবলিশমেন্ট থেকে প্রকাশিত The Islamic Scientific Supremacy শীর্ষক গ্রন্থে তুলে ধরা হয়।
চিঠিটির অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো।
‘আপনি আপনার আগের চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, আমার ওষুধের খরচের জন্য কিছু টাকা পাঠাবেন। আমি বলতে চাই, আমার একেবারেই সেই টাকার প্রয়োজন নেই, কারণ এই ইসলামী হাসপাতালে চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
‘এ ছাড়াও এ হাসপাতালের আরেকটি চমকপ্রদ দিক হলো—যে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন, তাকে হাসপাতাল থেকে একটি নতুন পোশাক এবং পাঁচ দিনার দেওয়া হয়, যাতে তিনি বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সময় কাজ করতে বাধ্য না হন। প্রিয় বাবা, আপনি যদি আমাকে দেখতে আসতে চান, তবে আমাকে সার্জারি ও জয়েন্ট চিকিৎসা বিভাগের ওয়ার্ডে পাবেন। ফটক দিয়ে প্রবেশ করার পর দক্ষিণ কক্ষে যান, যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয় বিভাগ রয়েছে। এরপর আপনি সন্ধান পাবেন বাত (জয়েন্ট) রোগ বিভাগের।’
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘আমার কক্ষের পাশে একটি গ্রন্থাগার এবং একটি হলঘর রয়েছে, যেখানে চিকিৎসকরা একত্রিত হয়ে অধ্যাপকদের বক্তৃতা শোনেন এবং এটি পড়াশোনার জন্যও ব্যবহৃত হয়। হাসপাতালের প্রাঙ্গণের অপর পাশে রয়েছে স্ত্রীরোগ বিভাগের ওয়ার্ড, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। হাসপাতালের আঙিনার ডান দিকে রয়েছে বিশাল একটি হল, যেখানে সুস্থ হওয়া রোগীদের পুনরুদ্ধারের জন্য কিছুদিন রাখা হয়। এই কক্ষে একটি বিশেষ লাইব্রেরি ও কিছু বাদ্যযন্ত্রও রয়েছে।
‘প্রিয় বাবা, হাসপাতালের প্রতিটি স্থান অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। বিছানা ও বালিশ দামাস্কাসের সূক্ষ্ম সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো থাকে। কম্বল তৈরি হয় নরম ও মসৃণ প্লাশ কাপড় দিয়ে। প্রতিটি কক্ষে পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা আছে, যা পাইপের মাধ্যমে বিশাল একটি ঝরনার সঙ্গে সংযুক্ত। শুধু তাই নয়, প্রতিটি কক্ষে গরম রাখার জন্য চুলাও রয়েছে।
‘খাবারের ব্যবস্থা এত ভালো যে, প্রতিদিন রোগীদের জন্য মুরগির মাংস ও সবজি পরিবেশন করা হয়। এমনকি, অনেক রোগী সুস্থ হয়েও হাসপাতাল ছাড়তে চান না শুধু এখানকার সুস্বাদু খাবারের প্রতি ভালোবাসার কারণে।’
চিকিৎসাব্যবস্থাকে পুঁজিবাদ ও ইসলাম সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চিকিৎসা একটি লাভজনক ব্যবসা, অন্যদিকে ইসলাম চিকিৎসাকে মানবসেবার অংশ হিসেবে দেখে, যেখানে মুনাফার পরিবর্তে সবার জন্য সুলভ ও ন্যায়সঙ্গত চিকিৎসার ওপর জোর দেওয়া হয়।
ইসলামে চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইসলামে রাষ্ট্রকে জনগণের কল্যাণ এবং তাদের মৌলিক অধিকারগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল হতে নির্দেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো চিকিৎসাসেবা।
ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাসেবা এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত এক হাদিসে বলা হয়, ‘আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার নিরাময়ের উপকরণ তিনি সৃষ্টি করেননি।’ হাদিসটি ইসলামি শাসনামলে চিকিৎসাশাস্ত্রে অগ্রগতির নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
এ ছাড়া ‘যে ব্যক্তি মুসলিম ভাইয়ের কোনো দুঃখ-কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ তৈরি করবেন’ এবং ‘মুসলিম একে অপরের ভাই। যদি কেউ তার ভাইয়ের সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন’ ধরনের হাদিস তৎকালীন চিকিৎসকদের অনুপ্রাণিত করতো সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে।
সে সময় ভুল চিকিৎসায় কারও মৃত্যু হলে তাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখা হতো, তাই দক্ষতা ছাড়া কেউ এ পেশায় আসত না, যা ভুল চিকিৎসা রোধে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।
চিকিৎসাসেবার মান নিয়ন্ত্রণ ও পর্যালোচনা নিয়ে ইবন আল-উখওয়া (Ibn al-Ukhuwa) তার গ্রন্থ মা’আলিম আল-কুরবা ফি তালাব আল-হিসবাতে কয়েকটি বিষয়টি উল্লেখ করেন।
• যদি রোগী মারা যান, তবে তার পরিবারের সদস্যরা প্রধান চিকিৎসকের কাছে অভিযোগ করতে পারেন। তারা চিকিৎসকের লেখা প্রেসক্রিপশন দেখান।
• যদি প্রধান চিকিৎসক মনে করেন যে চিকিৎসক তার কাজ যথাযথভাবে করেছেন, তবে তিনি পরিবারকে জানান যে এটি একটি স্বাভাবিক মৃত্যু।
• কিন্তু যদি চিকিৎসকের অবহেলা প্রমাণিত হয়, তবে প্রধান চিকিৎসক পরিবারকে বলেন, ‘তোমাদের আত্মীয়কে ভুল চিকিৎসার কারণে হত্যা করা হয়েছে। চিকিৎসকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করো!’
এই ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতির কারণে শুধু অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসকরাই চিকিৎসাব্যবস্থায় কাজ করতে পারতেন।
ইসলামি সভ্যতায় আধুনিক হাসপাতালের ধারণা নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর সময়েই জন্ম নিয়েছিল। ইসলামের প্রথম দিনগুলোতে চিকিৎসাসেবার মূল কেন্দ্র ছিল মদিনার মসজিদ, যেখানে রোগীদের চিকিৎসার জন্য তাঁবু স্থাপন করা হতো। বিশেষ করে, গাজওয়া খন্দকের সময় নবী (সা.) আহত সেনাদের চিকিৎসার জন্য রুফাইদা বিনতে সাদ (রাঃ)-এর তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ তাঁবু স্থাপন করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ইসলামী খলিফারা চিকিৎসাসেবা আরও সংগঠিত করেন এবং ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল প্রবর্তন করেন, যা নির্দিষ্ট অঞ্চলে গিয়ে জনগণকে চিকিৎসাসেবা প্রদান করত।
১৩০০ শতকের চিকিৎসক ও পর্যটক আবদুল লতিফ আল-বাগদাদির এক চমৎকার অভিজ্ঞতা দিয়ে শেষ করব, যা ইসলামি শাসনামলে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নত অবস্থার চিত্র তুলে ধরে।
দামেস্কে শিক্ষকতা করা এ চিকিৎসক এক চতুর পার্সি যুবকের গল্প বলেছেন, যিনি নূরী হাসপাতালের চমৎকার খাবার ও পরিষেবার প্রতি এতটাই আকৃষ্ট হয়েছিলেন যে, অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। চিকিৎসক তার অসুস্থতা নিয়ে সন্দেহ করলেও তাকে তিন দিন ধরে ভালো খাবার পরিবেশন করেন। চতুর্থ দিনে, চিকিৎসক তার কাছে এসে মৃদু হেসে বললেন, ‘আরবীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, আতিথেয়তা তিন দিনের জন্য হয়ে থাকে। এখন দয়া করে বাড়ি ফিরে যান!’
পরিশেষে, তামিম ইকবাল যে দ্রুত চিকিৎসা পেয়েছেন, তা যেন কোনো ‘বিশেষাধিকার’ না হয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্য হয়—সেই লক্ষ্যে এমন সমাজের জন্য কাজ করা জরুরি যে সমাজ রুফাইদা (রা.)-এর তাঁবু বা কালাউনের হাসপাতালের মতো ‘কাউকে অর্থ বা পরিচয় জিজ্ঞাসা করবে না, শুধু নিশ্চিত করবে মানবতা।’ কেননা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি যেহেতু মুনাফাকেন্দ্রিক, সেহেতু এ ব্যবস্থা বহাল রেখে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য সুচিকিৎসা বাস্তবতা বিবর্জিত স্বপ্ন হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু স্থানে নির্মিত মসজিদটির নাম ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’। এর অবস্থান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালির রুইলুই পাড়ায়। ছবি: বাসস
যেখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের সারি, রোদের সাথে শুভ্র মেঘদলের নিত্য লুকোচুরি খেলা, সেখানেই নির্মাণ করা হয়েছে নান্দনিক এক মসজিদ। সে মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসে আজানের সুমধুর ধ্বনি।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৭০০ ফুট উঁচুতে সবুজ পল্লব আর নিসর্গের বুক চিঁড়ে সপ্রতিভ দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু স্থানে নির্মিত মসজিদটির নাম ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’। এর অবস্থান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালির রুইলুই পাড়ায়।
সেনাবাহিনীর দানকৃত এক একর ভূমির ওপর নির্মিত এ মসজিদটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৮ টাকা। এতে যৌথভাবে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ।
চার তলা ভিতের ওপর দণ্ডায়মান দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি উচ্চতায় ২২ ফুট। এতে রয়েছে চারটি গম্বুজ ও একটি সুউচ্চ মিনার।
মসজিদটির পূর্ব-পশ্চিমের দৈর্ঘ্য ৬৫ ফুট, উত্তর-দক্ষিণের প্রস্থ ৮১ ফুট এবং সামগ্রিক আয়তন ৫ হাজার ২৬৫ বর্গফুট।
সৌন্দর্যে অপরূপ মসজিদটি নির্মাণে ২০২০ সালে যৌথভাবে উদ্যোগ নেয় সেনাবাহিনী ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি সাজেকের রুইলুই পাড়ায় হ্যালিপ্যাডের পাশে মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক চট্টগ্রাম ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান।
মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লাগে ঠিক দুই বছর। বর্তমানে সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে মসজিদটি পরিচালিত হচ্ছে।
দারুস সালাম জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব মো. মনিরুজ্জামান বাসসকে বলেন, ‘২০২২ সালের পহেলা রমজানের এশা এবং খতম তারাবির নামাজের মাধ্যমে এই মসজিদে নামাজ আদায়ের সূচনা হয়। বর্তমানে প্রাত্যহিক পাঁচ ওয়াক্ত জামায়াতের পাশাপাশি জুমা এবং খতম তারাবির নামাজ আদায় করা হয় এখানে।
‘তারাবির জন্য প্রতি বছরের মতো এবারও দুইজন হাফেজ নিয়োগ করা হয়েছে। এসব জামায়াতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অসংখ্য পর্যটক অংশ নেন।’
সাজেকে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন হাজার পর্যটকের সমাগম হয়। আর বিশেষ ছুটির দিনগুলোতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ থেকে ২০ গুণ, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ইসলাম ধর্মাবলম্বী পর্যটক।
মসজিদ না থাকায় এত বছর নামাজ আদায়ে বেশ বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে মুসলিম পর্যটকদের। তবে এখন স্বাচ্ছন্দ্যেই মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারেন সাজেক ভ্রমণে আসা পর্যটকরা।
প্রকৃতির অবারিত সবুজের মাঝে সুনসান পরিবেশে এমন সৌন্দর্যমণ্ডিত মসজিদে নামাজ পড়ার সুযোগ পেয়ে পর্যটকরা দারুণ উচ্ছ্বসিত।
রাজধানী ঢাকা থেকে সাজেকে ঘুরতে আসা পর্যটক সোহেল আরমান বাসসকে বলেন, ‘চার বছর আগেও একবার এখানে এসেছিলাম। মসজিদ না থাকায় তখন জামায়াতে নামাজ আদায় করতে পারিনি। তবে এবারে এসে মসজিদের এমন নিরব-নির্মল পরিবেশে সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করতে পেরে অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করছি।’
দারুস সালাম মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক যুবরাজ বলেন, ‘সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোন, স্থানীয় কটেজ-রিসোর্ট-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী এবং পর্যটকদের দান-অনুদানে এই মসজিদের সার্বিক ব্যয় নির্বাহ করা হয়। উঁচু পাহাড়ের কারণে সাজেকে পানি পাওয়া যায় না। ফলে মসজিদে অজুসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার্য সকল পানি কিনে ব্যবহার করতে হয়।
‘প্রতিদিন এ মসজিদে গড়ে ৫ হাজার লিটার পানি লাগে। আর প্রতি লিটার পানিতে ১ টাকা করে দৈনিক ৫ হাজার টাকা খরচ হয় কেবল পানি বাবদ। এ ছাড়া আরও আনুষাঙ্গিক অনেক খরচ রয়েছে। তবে ব্যয়বহুল হলেও সবার সহযোগিতা নিয়ে এ মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় হচ্ছে।’
আরও পড়ুন:
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররমের সভাকক্ষে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটির সভা হয়। ছবি: ইসলামিক ফাউন্ডেশন
হিজরি ১৪৪৬ সালের সাদাকাতুল ফিতরের হার জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ দুই হাজার ৮০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররমের সভাকক্ষে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে জাতীয় সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সাদাকাতুল ফিতরা নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা মুফতি আবদুল মালেক।
এতে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, ইসলামী শরিয়াহ মতে, আটা, যব, কিসমিস, খেজুর ও পনিরের মতো পণ্যগুলোর যেকোনো একটি দিয়ে ফিতরা প্রদান করা যাবে।
গম বা আটা দিয়ে ফিতরা আদায় করলে অর্ধ সা’ বা ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ১১০ টাকা প্রদান করতে হবে। যব দিয়ে আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ৫৩০ টাকা, খেজুর দিয়ে আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ২ হাজার ৩১০ টাকা, কিসমিস দিয়ে আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ১ হাজার ৯৮০ টাকা এবং পনির দিয়ে আদায় করলে এক সা’ বা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা এর বাজারমূল্য ২ হাজার ৮০৫ টাকা ফিতরা প্রদান করতে হবে।
দেশের সব বিভাগ থেকে সংগৃহীত আটা, যব, খেজুর, কিসমিস ও পনিরের বাজারমূল্যের ভিত্তিতে এ ফিতরা নির্ধারণ করা হয়। মুসলমানরা নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী উপর্যুক্ত পণ্যগুলোর যেকোনো একটি পণ্য বা এর বাজারমূল্য দিয়ে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে পারবেন।
উপর্যুক্ত পণ্যগুলোর স্থানীয় খুচরা বাজার মূল্যের তারতম্য রয়েছে। সে অনুযায়ী স্থানীয় মূল্যে পরিশোধ করলেও সাদাকাতুল ফিতরা আদায় হবে।
আরও পড়ুন:
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: ইউএনবি
পবিত্র রমজান উপলক্ষে জীবনের সর্বস্তরে সংযমের বার্তা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
রমজানকে সামনে রেখে শনিবার সন্ধ্যায় দেওয়া বাণীতে এ বার্তা দেন।
পবিত্র রমজান উপলক্ষে দেশবাসীসহ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর প্রতি আন্তরিক মোবারকবাদ জানিয়ে বাণীতে তিনি বলেন, ‘সিয়াম সাধনা ও সংযমের মাস মাহে রমজান আজ আমাদের মাঝে সমাগত। পবিত্র এ মাসে আত্মসংযমের মাধ্যমে আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটে। সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি, নৈকট্য লাভ ও ক্ষমা লাভের অপূর্ব সুযোগ হয়।
‘সিয়াম ধনী-গরিব সবার মাঝে পারস্পরিক সহমর্মিতা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা পালন করে।’
তিনি বলেন, ‘আসুন, পবিত্র মাহে রমজানের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যাবতীয় ভোগবিলাস, হিংসা-বিদ্বেষ, উচ্ছৃঙ্খলতা ও সংঘাত পরিহার করি এবং জীবনের সর্বস্তরে পরিমিতিবোধ, ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শনের মাধ্যমে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করি। সিয়াম পালনের পাশাপাশি বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করি এবং ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকি।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘মহান আল্লাহ আমাদের জাতীয় জীবনে পবিত্র মাহে রমজানের শিক্ষা কার্যকর করার তাওফিক দান করুন। মাহে রমজান আমাদের জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে ক্ষমা ও হেফাজত করুন, আমিন।’
আরও পড়ুন:
মন্তব্য