× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

মতামত
Armed forces are our pride
hear-news
player
google_news print-icon

সশস্ত্রবাহিনী আমাদের গর্ব

সশস্ত্রবাহিনী-আমাদের-গর্ব

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান স্বাধীনতার স্থপতি। আর স্বাধীনতা জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ ২৩ বছর (১৯৪৮-১৯৭১) বাঙালি জাতিকে স্বাধিকার আদায়ে উদ্বুদ্ধ এবং প্রস্তুত করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে ১৯৭১ সালের এই দিনে অর্থাৎ ২১ নভেম্বর আমাদের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যগণ সম্মিলিতভাবে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ সূচনা করেন। এর ফলে আমাদের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। জাতির ইতিহাসে তাই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক। তিনি জানতেন, একটা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শুধু সশস্ত্র বাহিনী নয়, বৃহত্তর জনগণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে একাত্মতা অপরিহার্য। সে জন্যই বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার সেনাবাহিনী হবে জনগণের সেনাবাহিনী। দুয়ের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকবে না।’

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঐতিহাসিক এ ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ তিনি নির্দেশ দেন ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর ডাকে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালি জাতির এই জাগরণে ভীত ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন, শুরু করেন অত্যাচার, নির্যাতন, খুন।

২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ১২টা ২০ মিনিটে ইপিআরের ওয়্যারলেস এবং টেলিগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর দিনটি আমাদের কাছে একটি আবেগের নাম। কারণ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল আজকের স্বাধীনতা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণকে প্রতিহত ও পরাজিত করা কখনোই সম্ভব হতো না, যদি না সঠিক রণকৌশল অবলম্বন করা হতো। আর সে কৌশলের অন্যতম একটি ছিল ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর তিন বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় এই দিনটি। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পর বাংলাদেশ ভারতের সাহায্য নেয়। এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। খুব তাড়াতাড়ি ভারত-বাংলাদেশের সম্মিলিত যৌথ বাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকা শহরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বীজ বপন হয় ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। বাংলার মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে পরাধীন বাংলাকে মুক্ত করার জন্য। মুক্তিযুদ্ধে অগণিত মানুষ তাদের প্রাণ বিসর্জন দেয় দেশকে পাকিস্তান থেকে মুক্ত করার জন্য। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার পর হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা শুরু হলে সর্বপ্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ইউনিট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও অন্য অনেক বাঙালি সদস্য। এগিয়ে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি নাবিক ও নৌ অফিসার, সেনা ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সর্বস্তরের মুক্তিপাগল হাজার হাজার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক। মুক্তিসংগ্রাম রূপ ধারণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের।

এ ক্রান্তিলগ্নে পাকিস্তানি শাসকদের স্বপ্ন নস্যাৎ ও তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন দেখা দেয় একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করার।

২৫ মার্চের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ৪ এপ্রিল এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল তেলিয়াপাড়া। এটি সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) মাধবপুর থানার অন্তর্গত। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। এখানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম বৈঠক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে আসেন কর্নেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসাররা।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মেহেরপুরের মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশের প্রথম সরকার’ গঠিত হয়। সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সদস্য, ইপিআর, পুলিশ, আনসারসহ ছাত্র, শ্রমিক, জনতা তথা বীর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

সর্বাধিক কার্যকরী এবং নিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক নেতৃত্বের প্রয়োজন বোধ করে সরকার এবং এ লক্ষ্যে কার্যকর অবকাঠামো গঠন করতে কর্নেল এমএজি ওসমানীকে (পরবর্তীকালে জেনারেল) কেবিনেট মিনিস্টারের মর্যাদাসহ বাংলাদেশ ফোর্সেসের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। এ ছাড়া কর্নেল (অব) এম এ রবকে বাংলাদেশ ফোর্সেসের চিফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্তি দেয়া হয়।

কর্নেল ওসমানী মুক্তিবাহিনীর সকল বিচ্ছিন্ন সংগঠনকে কেন্দ্রীয় কমান্ডের আওতায় নিয়ে আসেন এবং ফোর্সেস সদর দফতর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে অপারেশনাল নির্দেশনা প্রণয়ন করেন। এ বিরাট বাহিনীকে সাহায্য, সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, জনবল সংগ্রহ এবং সাধারণ জনগণকে দেখাশোনা করার জন্য ১৯৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নেতৃত্বে সাব সেক্টর-ক্যাম্প পরিচালিত হয়।

এই স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী।

সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী একত্র হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যেসব বাংলাদেশি আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছিলেন, তারাও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুক্ত হন স্বাধীনতা সংগ্রামে। দেশটিকে ১১টি সেক্টর বিভক্ত করে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, কৃষক-শ্রমিক-জনতা এবং সেনাবাহিনী একত্র হয়ে কাজ করে। মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত প্রয়াস শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর আজকের এই দিনে।

স্থল সেনাদের পাশাপাশি নৌ সেনাদেরও শক্তিশালী করে তুলেছিল বাংলাদেশ। বিএনএস পদ্মা ও পলাশ নামের দুটি যুদ্ধ জাহাজ ছিল। এই দুটি যুদ্ধ জাহাজের মাধ্যমে তারা পাকিস্তান থেকে সেনাদের জন্য আসা অস্ত্র ও র‌্যাশন আটকাতে চট্টগ্রাম ও মোংলা এই দুটি প্রধান বন্দরকে কব্জা করতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বিমানবাহিনী গড়ে তোলা হয়। যেসব বাঙালি বায়ুসেনা যুদ্ধের আগে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের এই বাহিনীতে যুক্ত করা হয়। অনেকেই ভলান্টারি অবসরপ্রাপ্ত হিসেবে তৎকালীন বায়ু সেনার সঙ্গে যুক্ত হন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেন। তারাই বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিমানবাহিনী প্রস্তুত করেন। সম্মিলিত বাহিনীর সব কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর আজকের এই দিনে। তাইতো দিনটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার জন্যই পালন করা হয় আর্মড ফোর্সেস ডে বা সশস্ত্র বাহিনী দিবস।

আক্রমণের সম্মিলিত ফলশ্রুতিতে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমান্ডের নেতৃত্বে ৩ ডিসেম্বর চূড়ান্ত অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়। এই বিজয় ছিল ১৯৭১ এর ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং আপামর জনসাধারণ একযোগে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে সমন্বিত আক্রমণ, তারই ফসল।

আমাদের সেনাবাহিনীর জন্ম হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্র, মুক্তিযুদ্ধের সময়, যে যুদ্ধটি ছিল জনযুদ্ধ। সে যুদ্ধের মহানায়ক ও সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজকে যারা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন, তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম।

বঙ্গবন্ধুর সাহসী এবং দূরদর্শী নেতৃত্বে ভারতীয় মিত্র বাহিনী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শেষে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ১৭ মার্চ ১৯৭২ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফিরে যায়, যা ইতিহাসে বিরল। বিশ্বে যুদ্ধের ইতিহাসে মিত্রবাহিনী অধিকৃত অঞ্চল থেকে ফেরত আসে না কখনো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফেরত যায়। এমনকি রাশিয়ান বাহিনীও ফিরে গিয়েছিল। আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ছাড়াও যুদ্ধপরবর্তী দেশ গঠনে, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বিদেশে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে এই সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে বারবার।

শত প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগড়ার পর পরই বঙ্গবন্ধু তার জীবনের আকাঙ্ক্ষা, সেনাবাহিনীর মর্যাদার প্রতীক বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম ব্যাচের অফিসারদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে বঙ্গবন্ধু স্বয়ং হাজির হয়ে তার মনের কথা ক্যাডেটদের কাছে জাতির পিতার অবস্থান থেকে ব্যক্ত করেন। ক্যাডেটদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধুর সেই অমূল্য ভাষণের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি। বঙ্গবন্ধু ভাষণে বলেছিলেন:

‘আজ সত্যিই গর্বে আমার বুক ভরে যায়। বাংলাদেশের মালিক আজ বাংলাদেশের জনসাধারণ। সে জন্যই সম্ভব হয়েছে আজ আমার নিজের মাটিতে একাডেমি করা। আমি আশা করি, ইনশা আল্লাহ এমন দিন আসবে, এই একাডেমির নাম শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, সমস্ত দুনিয়াতে সম্মান অর্জন করবে।’

এ কথার মাধ্যমে বোঝা যায়, সেনাবাহিনী নিয়ে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল এবং ভবিষ্যতে তিনি একটা মর্যাদাপূর্ণ সেনাবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধু আবেগের সঙ্গে বলেন:

‘পাকিস্তানিরা মনে করত বাঙালিরা কাপুরুষ, বাঙালিরা যুদ্ধ করতে জানে না। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশের মাটিতে দেখে গেছে কেমন করে বাঙালিরা যুদ্ধ করতে পারে।’

ভাষণের শেষাংশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন:

‘মনে রেখো, তোমাদের মধ্যে যেন পাকিস্তানের মেন্টালিটি না আসে। তোমরা পাকিস্তানের সৈনিক নও, তোমরা বাংলাদেশের সৈনিক।’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আজও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমাদের সুশিক্ষিত, পেশাদার ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। শুধু স্বাধীনতাযুদ্ধ ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমই নয়, সশস্ত্র বাহিনী দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা করে দেশের অখণ্ড সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। জাতির প্রয়োজনে যে কোনো কঠিন দায়িত্ব পালনে সশস্ত্র বাহিনীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা অনন্য।

বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা ছাড়াও দেশের অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ছিন্নমূল মানুষের জন্য বাসস্থান তৈরি করা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমুখী কাজে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র বাহিনী নিবেদিতপ্রাণ। ছবিসহ ভোটার তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র, মেশিন রিডেবল পাসপোর্টসহ জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ, ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস নির্মাণে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবজনক। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত আমাদের পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্থান করে নিয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আজ চিনতে পেরেছে সারা বিশ্বের মানুষ। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সদস্য সংখ্যা বিশ্বের সর্বোচ্চ। জাতীয় উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। এটি এমনি এক বাহিনী যার প্রতি এ দেশের জনগণের রয়েছে অগাধ আস্থা, বিশ্বাস ও ভালবাসা।

১৯৭১ সালে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের সঙ্গে যেভাবে একীভূত হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উদ্দীপক হিসাবেই কাজ করবে। এ দিবসকে ভিত্তি করে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সৃষ্টি হতে পারে জাতীয় ঐকমত্য।

লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)

আরও পড়ুন:
চিরদিন বেঁচে থাকবে তুমি প্রিয়
জিয়ার কারফিউ গণতন্ত্র থেকে খালেদা-তারেকের লাঠি-রডতন্ত্র
দুর্দিনের সহযাত্রী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
স্বার্থপরতার রাজনীতিতে উপেক্ষিত দেশপ্রেম!
নারী ‍ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকেই

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
Jail Murder Bangabandhus beloved Kamaruzzaman

জেল হত্যা: বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য একজন কামারুজ্জামান

জেল হত্যা: বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য একজন কামারুজ্জামান
প্রতি বছর ৩ নভেম্বর ফেরে! শোকার্ত অনুভবে বাবার ওই দুই মায়াবী চোখের মাঝে দৃষ্টি দিলেই প্রদীপ ভাসে। যে প্রদীপের শক্তি আমাকে বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করতে তাগিদ দেয়। আমার পরিবারে সেই রক্ত, যে রক্ত বেঈমানি করতে জানে না।

‘দেশপ্রেমিক রাজনীতিকেরা সবসময় দেশের জন্য মৃত লাশ হতে প্রস্তুত থাকে, কিন্তু কখনোই হত্যার আদেশ দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার বন্দোবস্তে যায় না’- এমন উক্তিকে ধারণ করেই ৫১ বছরের বাংলাদেশকে যে কেউ একবার দেখে নিতে পারেন তৃতীয় চোখ দিয়ে।

একদিকে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নিথর দেহ পড়ে থাকা এবং তা সে লাল সবুজের বাংলাদেশের জন্যই। অন্যদিকে প্রতিবিপ্লবকারীদের হত্যা করার উৎসবে শাসকশ্রেণি হয়ে পড়ার অযাচিত প্রেক্ষাপট… কষ্ট তাই পাই।

আজও ভুলিনি, ভুলতে পারব না। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত জাতির জনক, আমার বাবা এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও পিতৃতুল্য তিন চাচা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও মনসুর আলীর পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার এমন নৃশংস কু-উদ্যোগের জবাব দিতে ইচ্ছে করে। মনকে স্বান্তনা দেয়ার অযুতবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। বাঙালির ভাষা ললাটে ধূসর অস্ত্রের আমদানিতে জাতি নির্বাক হয়ে যখন সবকিছু অবলোকন করছে, ঠিক একই ধারাবাহিকতায় পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়।

অনভিপ্রেত এবং অতি অবশ্যই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়ে এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে এমন কালো অধ্যায়ের জন্ম নেয়া নিয়ে উন্নত দেশগুলো বা সংস্থাগুলোর কথিত মানবাধিকার চাইবার দাবি নিয়মিত সংস্কৃতির অংশও হতে পারেনি।

৩ নভেম্বর, ১৯৭৫। উপলক্ষতাড়িত ট্র্যাজিক দিবস হিসেবে আমরা কেউ কেউ জেলহত্যা ইস্যু নিয়ে কলম ধরছি। অভিমানের উচ্ছ্বাসে রাজনৈতিক ধারাভাষ্য দিয়ে ইতিহাস সংকলনের একটা চেষ্টা!

আমি কী লিখব? সন্তান হিসাবে কী বলব? বঙ্গবন্ধু ও তার তনয়ার আদর্শের সৈনিক হিসেবে রাজনৈতিকভাবে কী লিখব? ফলত, জানা নেই।

আমার স্মৃতির পাতায় জেল হত্যা এক বেদনাবিধুর ঘটনা। আমার বাবা এ এইচ এম কামারুজ্জামান যেদিন শহীদ হলেন, আমি ও আমার ছোট ভাই স্বপন তখন কলকাতায় রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করছি। বাবার মৃতদেহটি দেখার কোনো সুযোগ আমরা পাইনি।

বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক অতন্ত্র সৈনিক। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ তার জীবনভাবনার মূল সোপান ছিল। সারাটা জীবন তিনি সেই আদর্শ ভাবনাকে অবিচল নিষ্ঠা এবং সাধনায় ব্রত হয়ে পালন করে গেছেন। নিমগ্ন থেকেছেন সত্য ও নীতির পথে। বঙ্গবন্ধুর নিঃস্বার্থ সহযোদ্ধা হিসেবে আপস করেননি ১৫ আগস্টের হত্যাকারী খুনীচক্রের সঙ্গে। শুধু আমার বাবা নন, অন্য তিন জাতীয় নেতাও ছিলেন একই রকমের ইস্পাতসম মনোবলের অধিকারী।

মায়ের কাছে শুনেছি, সেদিনের নিকষ কালো তিমির রাত্রি করে ঢাকার রাজপথে ছুটে চলা একটি জলপাই রঙের জিপ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। লাফিয়ে নামল কয়েকজন কালো পোশাক পরা অস্ত্রধারী। কারারক্ষীদের গেট খোলার নির্দেশ দিলো তারা।

কারারক্ষীরা শীর্ষ নির্দেশ ছাড়া গেট খুলবেন না। অগত্যা বঙ্গভবনে ফোন করল খুনিরা। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে যে নির্দেশ এসেছিল সেটা আমাদের সবার জানা। বঙ্গভবনের নির্দেশ পেয়ে গেট খুলে দিলো কারারক্ষীরা।

ভেতরে ঢুকে তাদের আবদার অনুযায়ী জাতীয় চারনেতা তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আমার বাবা এইচ এম কামারুজ্জামানকে ১নং সেলে একসঙ্গে জড়ো করার আদেশ দেয়া হলো। অস্ত্রের মুখে বাধ্য হয়ে কারারক্ষীরা সে নির্দেশ পালন করলেন। খুনি মোসলেম বাহিনী সেই ১নং সেলে ব্রাশফায়ারে নিভিয়ে দিলো জাতির সূর্য সন্তানদের জীবন প্রদীপ। সেকেন্ডের ব্যবধানে হারিয়ে গেল বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর অন্যতম চার নেতার প্রাণ স্পন্দন।

বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের জন্য ও ইতিহাসের সঙ্গে যাদের নিবিড় সম্পর্ক, সেই গুণী মানুষগুলো হারিয়ে গেলেও হারায়নি তাদের অমর কৃতিত্ব ও অসীম অবদান। তারা গণমানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছিলেন বলেই আজও আমরা তাদের সন্তান হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছুতে পেরেছি।

দেশবাসী অবগত আছেন, আল্লাহর অশেষ রহমত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার অশেষ স্নেহ ও নির্দেশনায় এবং প্রিয় রাজশাহীবাসী ভালোবাসায় আমি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছি। দেশের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য হতে পেরেছি। জাতির পিতা ও আমার বাবার রেখে যাওয়া কাজগুলো সমাধান করার প্রয়াসে দেশসেবায় আত্মনিয়োগের সুযোগ পেয়েছি।

বাবার অনেক স্বপ্ন ছিলো রাজশাহীকে নিয়ে। তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন রাজশাহীর কথা জাতীয় পর্যায়ে পেশ করে এর উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। রাজশাহীতে খেলাধুলার পরিবেশ তৈরির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি জানতেন, খেলাধুলার মাধ্যমে গড়ে উঠবে সুস্থ ও সুন্দর যুব সমাজ। তিনি বেশ কিছুদিন রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সমিতির সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।

বাবা বেশ ধর্মভীরু ছিলেন। ছোটবেলায় তাকে নিয়মিত নামাজ আদায় ও পবিত্র কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করতে দেখেছি। তিনি এত দ্রুত কোরআন তিলাওয়াত করতেন যে, তাকে কোরআনের হাফেজ বলে মনে হতো।

পরের দিকে, বিশেষ করে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের জন্য তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাকে আমরা বাসায় তেমন দেখতে পেতাম না। যতক্ষণ বাসায় থাকতেন সর্বক্ষণ নেতা-কর্মীদের দ্বারা সন্নিবেষ্টিত হয়ে থাকতেন। এর ফলে আমরা তেমন বাবার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেতাম না। আমরা সব ভাই-বোনই বেশ মিস করতাম তাকে। এজন্য আমাদের মাঝে মাঝে রাগও হতো।

বাবা অত্যন্ত নরম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাই বলে আমরা তাকে ভয় পেতাম না, এমন নয়। তার চোখের দিকে তাকানোর সাহস আমাদের ছিল না। কোনো অপরাধ করলে শুধু নাম ধরে ডাকলেই আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যেত।

বাবার বড় এবং ছোটমেয়ে উভয়েই খুব প্রিয় ছিল। বড় আপা পলিকে বাবা বেশি ভালবাসতেন। মায়ের সংস্পর্শেই আমরা বড় হয়েছি। আমার মায়ের ছিল অসীম ধৈর্য। তিনি বাবার রাজনৈতিক সঙ্গীদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। মায়ের ওই উদারতা ও সহায়তা না থাকলে বাবার পক্ষে অত বড় নেতা হওয়া হয়ত সম্ভব ছিল না।

প্রচলিত একটি কথা আছে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনে কোনো না কোনোভাবে একজন নারীর অবদান আছে। এ কথাটা আমার মায়ের ক্ষেত্রে দারুণভাবে প্রযোজ্য বলে আমাদের মনে হয়। বিশেষ করে স্বাধীনতার নয় মাস ছোট ছোট ছেলে-মেয়েসহ তিনি যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে দিন কাটিয়েছেন সেটা সম্ভব না হলে বাবার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হতো কিনা বলা মুশকিল। বলাবাহুল্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেসাও ছিলেন অসীম ধর্যের অধিকারী। তিনিও আজীবন বঙ্গবন্ধুর সব কাজের প্রেরণা ছিলেন।

বাবা ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি প্রথম নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তার প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও তার বাবা আবদুল হামিদের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে এক চমকপ্রদ ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। ওই ঘটনাটি তখনকার দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আজও অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বলে রাখা জরুরি যে, আমার দাদা আবদুল হামিদ রাজশাহী অঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে তার ছেলে কামারুজ্জামান নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে আবদুল হামিদ নির্বাচন থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন।

বাবা জানতেন পিতা প্রতিদ্বন্দ্বী হলে তার পক্ষে নির্বাচনে জয়লাভ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই তিনি মায়ের কাছে আবদার করলেন, বাপজানকে বুঝিয়ে যেন নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করেন! অগত্যা আবদুল হামিদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন।

নির্বাচনি এলাকা সফরে গিয়ে ভিন্ন চিত্র প্রত্যক্ষ করলেন আমার বাবা। এলাকার মুরুব্বিদের বক্তব্য হলো, দীর্ঘদিন মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থন করতে অভ্যস্ত বিধায় তারা হারিকেন (মুসলিম লীগের নির্বাচনি প্রতীক) ছাড়া অন্য কোনো মার্কায় ভোট দিতে পারবেন না। আবদুল হামিদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বাবাকে দায়ী মনে করে তারা তাকে সমর্থন দেয়া থেকে বেঁকে বসলেন।

অবস্থা বেগতিক দেখে বাবা বহু চেষ্টা করে অন্তত একটা জায়গায় রফা করতে সমর্থ হলেন যে, আবদুল হামিদ সাহেব যদি এলাকায় এসে তার পক্ষে ভোট চান, তাহলে তারা বাবাকে ভোট দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

এমন একটি পরিস্থিতিতে বাবা তার বাপজানের কাছে কথাটা বলতে সাহস না পেয়ে মায়ের কাছে বায়না ধরলেন, পিতা যেন তার পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু আবদুল হামিদের কাছে কথাটা বলতেই তিনি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। একটা দলের সভাপতি হয়ে তিনি অন্য দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না, সে যেই হোক, এটা তার সাফ কথা।

বাবা হতাশ হয়ে এক রকম প্রচার বন্ধ করে দিয়ে বাড়িতে বসে রইলেন। পিতার সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয় এটা তিনি বুঝতে পারছিলেন। সুতরাং মাঠে গিয়ে লাভ কী? তাই তিনি জানিয়ে দেন পিতা তার পক্ষে কাজ না করলে তিনি আর নির্বাচন করবেন না।

এভাবেই কিছুদিন চলে গেল। সত্যি সত্যিই ছেলে নির্বাচনি কাজে অংশগ্রহণে বিরত থাকায় পিতা আবদুল হামিদ নিজেই চিন্তায় পড়ে গেলেন। ছেলের জীবনের প্রথম নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কায় তিনি নিজেও বিচলিত হয়ে পড়লেন। অগত্যা রাজশাহী জেলার মুসলিম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নাটোরের মধু চৌধুরীকে ডেকে তিনি তার হাতে দলের সভাপতি ও সাধারণ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের আবেদনপত্র দুটি ধরিয়ে ঘটনা খুলে বললেন। এরপর পুত্রের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে নেমে তাকে বিজয়ী করতে সক্ষম হলেন।

বাবার সেই বিজয় প্রথম হলেও আর কখনও তিনি কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। তবে দাদা আবদুল হামিদের এ রাজনৈতিক নৈতিকতার ঘটনা সব সময়ের জন্যই বিরল দৃষ্টান্ত তাতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এ ঘটনা শিক্ষার বার্তা বয়ে আনতে পারে। সেই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আমার দাদা আবদুল হামিদের সুযোগ্য সন্তান এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও তার নাতিদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আজও জাতীয় নেতার আসনে রয়েছেন।

আমার বাবা তার আদর্শভিত্তিক নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির কারণে ১৯৬২ থেকে ১৯৭৫ এই ১৩ বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনেই কখনও পরাজিত হননি। এটা সম্ভব হয়েছিলো তার অসাধারণ কর্মদক্ষতা, গণমুখী সাংগঠনিক তৎপরতা আর চূড়ান্ত রাজনৈতিক সততার কারণে।

এরই ফলে তিনি রাজশাহীবাসীকে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সামিল করতে পেরেছিলেন। তার এই দক্ষতা ও যোগ্যতাই তাকে তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির মতো দলের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন করেছিল।

৩ নভেম্বর সকালেই বাবার মৃত্যু সংবাদ জানতে পারেন আমাদের মা। মা অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে যে মানুষটি কখনও আশাহত হননি সেই মানুষটি বাবার মৃত্যু সংবাদে মুষড়ে পড়েছিলেন! এ সময় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী আর আত্মীয়-স্বজনে ভরে যায় আমাদের বাড়ি।

মা চাচ্ছিলেন বাবার লাশটা রাজশাহীতে এনে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করতে। কিন্তু খুনিরা তাতে বাধ সাধে। মা তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। বাধ্য হয়ে বাবার মৃতদেহ রাজশাহীতে আনার অনুমতি দেয় ঘাতকচক্র। তবে বাবার লাশ কাউকে দেখতে দেয়া হয়নি। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার করুণ বেদনা ও দহন সহ্য করেই আমার মা এবং আমরা জীবনসংগ্রাম করেছি।

মায়ের কাছে শুনেছি, বাবার রক্তমাখা লাশটার বুকের ওপর চালচাপা দেয়া ছিল। মুখটা দেখে মনে হয়, কী নিদারুণ কষ্টে তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। কী অপরাধ ছিল বাবার, যার জন্য তাকে হত্যা করা হলো? এর জবাব কে দেবে? কারও কাছে আছে?

মাত্র ৫২ বছরের জীবনে তিনি অর্ধেকটাই কাটিয়েছেন আন্দোলন আর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অন্যান্য জাতীয় নেতাসহ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কাজে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। নিজের স্ত্রী-সন্তানের দিকে তাকাবার ফুরসৎ পাননি, সেই মানুষটাকে হত্যা করা হলো! কেন করা হলো, তা বলার সময়ও হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আমার বাবাসহ অপরাপর তিন নেতা বেঁচে থাকলে সবকিছু রাজনৈতিক অপশক্তির ইচ্ছায় হতে পারত না। কারণ জাতীয় ওই চার নেতার দেশ ও দল পরিচালনা করার ক্ষমতা ছিল।

একবার কি এই প্রজন্ম চিন্তা করতে পারে, শেখ হাসিনা যদি আমার বাবাদেরকেও ১৯৮১ সালের পরে পেয়ে যেতেন, আওয়ামী লীগকে কী রোধ করা যেত? সামরিক শাসকেরা যত্রতত্র ক্ষমতার মসনদে বসতে পারত? ক্ষমতার বিরাজনীতিকরণ হতে পারত? গণতন্ত্রের জায়গায় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারত?

জিয়া নামের এক শাসককে কী বলা যায়? ঘাতক, নাকি স্বৈরাচার? হ্যাঁ কিংবা না ভোটের প্রচলনের মাধ্যমে কে গণতান্ত্রিক আবহে স্বৈরতন্ত্রকে পরিচিত করে তুলেছিলেন? আমার বাবারা বেঁচে থাকলে মোশতাক- জিয়া-এরশাদদের কথিত শাসন চলত না এই বাংলায়।

এদিকে ১৯৮১ সালের ১৯ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তার প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরে এসে তার পিতা বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের খুনিদের বিচারের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচারের দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন। তার শাসনামলে বিচার হয়েছে। জাতি কলংকমুক্ত হয়েছে।

১৯৮১ সালের ১৯ মে থেকেই জননেত্রী শেখ হাসিনা চার জাতীয় নেতার পরিবারের সদস্যদের অতি আপনজনের মতো আগলে রেখেছেন। বড় বোনের স্নেহ দিয়ে তিনি আমাদের নির্মাণে সদা সহযোগিতা করে চলেছেন। আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আমি মহান আল্লাহর দরবারে তার সুস্থতা কামনা করি। তিনি বেঁচে থাকলেই বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে বিশ্বকে জানান দিতে পারবে, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি! এগিয়ে যেতেই হবে।

প্রতি বছর ৩ নভেম্বর ফেরে! শোকার্ত অনুভবে বাবার ওই দুই মায়াবী চোখের মাঝে দৃষ্টি দিলেই প্রদীপ ভাসে। যে প্রদীপের শক্তি আমাকে বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করতে তাগিদ দেয়। আমার পরিবারে সেই রক্ত, যে রক্ত বেঈমানি করতে জানে না।

বাবা বঙ্গবন্ধুর জন্য আনুগত্যের ঘড়্গ নিয়ে দেশপ্রেমকে স্বাগত জানিয়ে জীবনই দিয়ে গেছেন। আমি তারই কন্যা শেখ হাসিনার ভাই হিসাবে তার জন্য জীবন সঁপে দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। বাবার সৎ আত্মা আমার পিছু নেয়। তাগিদ রেখে বলেন, ‘তুমি এগিয়ে যাও। বাংলাদেশের জন্য, আওয়ামী লীগের জন্য সেরাটা দাও।‘

এক ফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি প্রায়শই। বাবার চিরপ্রস্থানকে মেনে নিতে পারিনি, পারব না। উইনস্টন চার্চিলের বিখ্যাত মতবাদ আমার অহোরাত্রগুলোকে অনুসন্ধানী ও সত্যান্বেষী করে বলে, ‘যখন ভিতরে কোনো শত্রু থাকে না, তখন বাইরের শত্রুরা তোমাকে আঘাত করতে পারে না।‘

জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! জয় শেখ হাসিনা! বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: সভাপতিমণ্ডলির সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও মেয়র, রাজশাহী সিটি করপোরেশন।

আরও পড়ুন:
জেলহত্যা দিবসের স্মৃতিকথা
জিয়া ছিলেন মোশতাকের ডান হাত: প্রধানমন্ত্রী
চার নেতার ১০ খুনির সাজা কার্যকর হয়নি এখনও
জেল হত্যার অনেক রহস্য উন্মোচন হয়নি: কাদের
ইতিহাসবিরোধী ভয়াল কালরাত

মন্তব্য

মতামত
Let the prison murder mystery be fully revealed

জেল হত্যা রহস্যের পূর্ণ উন্মোচন হোক

জেল হত্যা রহস্যের পূর্ণ উন্মোচন হোক
৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কোনো কোনো অংশগ্রহণকারী ও সমর্থক পরে প্রচার করেছেন, তারা ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও জাতির পিতাকে হত্যার বদলা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ দাবি ভিত্তিহীন বলেই মনে হয়।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডের পর সুদীর্ঘ ৪৭টি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কারাগারের নিরাপত্তা হেফাজতে চার জাতীয় নেতাকে কীভাবে কেন হত্যা করা হয়েছিল, কারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছিল, এর কুশীলব ও পেছনের সূত্রধর কারা ছিল- এসব রহস্যের আজও সুস্পষ্ট কিনারা হয়নি।

স্মরণ করা যেতে পারে, স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির মদদে কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে আকস্মিক অভ্যুত্থানে জাতির পিতা, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে।

একই রাতে স্ত্রী-সন্তানসহ হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তার মন্ত্রিসভার পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং ভাগ্নে ও বাকশালের অন্যতম সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণিকে।

এটা সুস্পষ্ট, জাতির পিতা ও তার বংশধারা নিশ্চিহ্ন করে দেয়াই ছিল অভ্যুত্থানকারীদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা এ সময় বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় খুনিদের সুদূরপ্রসারী অসদুদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আটদিন পর ২৩ আগস্ট গ্রেপ্তার হন তার দক্ষিণহস্ততুল্য চার শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মুহাম্মদ মনসুর আলি ও আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গ্রেপ্তার করার পর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে বছরের ১৭ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারে তিনি উপ-রাষ্ট্রপতি হন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদে তিনি শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বাকশালের ভাইস-চেয়ারম্যান হন।

তাজউদ্দীন আহমদ মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

মুহাম্মদ মনসুর আলী মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন।

এ এইচ এম কামারুজ্জামান মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারেও একই দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

তখনকার পরিস্থিতিতে তাদের গ্রেপ্তার হওয়াটা অবধারিতই ছিল। কারণ কোনো প্রলোভনেই তারা যে অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে হাত মেলাবেন না সেটা সবাই জানত। অথচ তখন দলের দ্বিতীয় সারির নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ খুনিদের সঙ্গে আঁতাত করেন এবং তার নেতৃত্বে একটি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভার সব সদস্যই ছিলেন হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মেলানো আওয়ামী লীগার এবং এটা ছিল একটা আধা-সামরিক সরকার। অভ্যুত্থানকারী মেজর-ক্যাপ্টেনরাই এ সরকারের ওপর ছড়ি ঘোরাত। এ সরকারের পেছনে সেনা সমর্থন থাকলেও, বঙ্গভবনের ওপর তাদের পুরোপুরি কর্তৃত্ব ছিল না। সে সময়ে বঙ্গভবন পাহারার দায়িত্বে ছিল ৪৬ ব্রিগেডের দুটি কোম্পানি, যার নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল শাফায়াত জামিল।

২৪ আগস্ট তখনকার সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। তখনকার চিফ অফ জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) খালেদ মোশাররফ আগের পদেই বহাল থেকে যান। কিন্তু ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ৮০ দিনের মাথায় সিজিএস খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এক পাল্টা অভ্যুত্থান। শাফায়াত জামিল তার ব্রিগেড নিয়ে ২ নভেম্বর মধ্যরাতেই অভ্যুত্থান শুরু করে দেন।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কোনো কোনো অংশগ্রহণকারী ও সমর্থক পরে প্রচার করেছেন, তারা ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও জাতির পিতাকে হত্যার বদলা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ দাবি ভিত্তিহীন বলেই মনে হয়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকারীরা ১৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইলে মুজিবপন্থি একটি রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারতেন। এ জন্য তারা জেলবন্দি চার শীর্ষ নেতাকে বের করে এনে তাদের হাতে এ সরকার গঠনের ভার দিতে পারতেন। কিন্তু চার নেতার কথা তাদের দূরতম চিন্তা বা পরিকল্পনাতেও ছিল, এমন মনে করার কোনো প্রমাণ তখন দেখা যায়নি।

হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী পুরো একদিনেরও বেশি সময় কেটে যাওয়ার পরই কেবল তারা জানতে পারেন, চার নেতা জেলখানার ভেতরে নিহত হয়েছেন। জানার পরও এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা বা উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাদেরকে দিয়ে যদি সরকার গঠন করার সদিচ্ছা থাকত, তাহলে তো প্রথম কাজটিই হওয়া উচিত ছিল তাদের নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করা এবং তাদেরকে বঙ্গভবনে আনার উদ্যোগ নেয়া। সে রকম কিছুই কিন্তু তখন দেখা যায়নি। বরং স্বজনরা দোয়েল চত্বরের কাছে তিন নেতার মাজার প্রাঙ্গণে চার নেতাকে কবরস্থ করার উদ্যোগ নিলে তাদের সে অনুমতিও দেয়া হয়নি।

লক্ষণীয়, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানকারীরা ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের খলনায়কদের ৩ নভেম্বর রাতেই নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেয়। এর কারণ হিসাবে বলা হয়, গৃহযুদ্ধ বাধুক সেটা তারা চায়নি। দুই পক্ষের মধ্যে এই আপস-মীমাংসায় মধ্যস্থতা করেছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী এবং চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান।

এর ঠিক দুদিন পর ৫ নভেম্বরই মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক অভ্যুত্থানকারীরা। এভাবে চিরকালের জন্য ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হন বাংলার ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফর খন্দকার মোশতাক।

তারপরও একটা জিজ্ঞাসা থেকেই যায়, চার নেতাকে কেন খুন করা হয়েছিল। তারা তখন কারাবন্দি ছিলেন, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানকারীদের পরিকল্পনায়ও তারা ছিলেন না। তাহলে কেন হঠাৎ করে তাদের হত্যা করা হল? এর পেছনে কি অন্য কোনো মহলের অন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল?

স্মরণ করা যেতে পারে, পাল্টা অভ্যুত্থানের পরদিন ৪ নভেম্বর ঢাকায় বাকশালের ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে একটি শোকমিছিল বের করা হয়েছিল। খালেদ মোশাররফের মা এবং ভাইও সে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। মিছিলের আয়োজকেরা কিন্তু তখনও জানতেন না, এর আগেই জেলের ভেতরে চার নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাহলে কেন, কিসের ভরসায় তারা এমন মিছিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

আরেকটি জিজ্ঞাস্য হল, পাল্টা অভ্যুত্থানকারীরা জেলহত্যার আশঙ্কা বা পরিকল্পনার কথা কি আগেভাগে কিছুমাত্র টের পাননি? ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান দুটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর মধ্যস্তরের কর্মকর্তাদের দুটি গ্রুপ। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কে তেমন কোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধের কথা জানা যায়নি। হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের দিকে আঙুল তোলা হলেও সংশ্লিষ্ট আরও অনেককেই সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না।

জেলহত্যার বিচার শুরু হয় হত্যাকাণ্ডের ২৯ বছর পর ২০০৪ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের শাসনামলে। ওই বছরের ২০ অক্টোবর দেয়া আদালতের রায়ে তিনজন পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, ১২ সেনা কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে অভিযুক্ত বিএনপির চারজন সিনিয়র নেতাসহ পাঁচজনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়।

আরও চার বছর পর ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে হাইকোর্ট জেলহত্যা মামলায় অভিযুক্ত ছয়জন সামরিক কর্মকর্তাকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেয়। তবে তাদের মধ্যে চারজন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দীন আহমেদকে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১০ সালে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

খালাসপ্রাপ্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে, যার চূড়ান্ত রায় এখনও পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে গভীরতম শোক ও কলঙ্কের মসীলিপ্ত দুটি দিন হলো ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস এবং ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস। পাকিস্তানপন্থি স্বাধীনতাবিরোধী সামরিক-বেসামরিক চক্র এ দুই দিনে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদাতা বঙ্গবন্ধুকে, তার রক্তসম্পর্কিতদেরকে এবং তার প্রধান সহায়ক চার নেতাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সমূলে বিনাশ করতে চেয়েছিল।

এ দুই দিনে তারা আমাদের শিরদাঁড়ায় যে মারণ আঘাত হেনেছিল, তার জের এখনও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরপর দীর্ঘ দুই দশক ধরে তারা আমাদের অবনত করে রেখেছিল, রাজাকার-আলবদরদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল, খুনিদের পুনর্বাসিত করেছিল, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে তাদের বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতি আজ ফিনিক্স পাখির মতো পুনরায় ভষ্মস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু খুনিদের অপচ্ছায়া এখনও বাংলার ভাগ্যাকাশ থেকে সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়নি। এখনও জাতীয় পতাকা বার বার খামচে ধরতে চায় পুরনো শকুনেরা। ১৯৭৫ সালের দুটি তারিখ ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর এখনও আমাদের চেতনায় কালো ছায়া বিস্তার করে থাকে।

আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী খুনিদের আর খুনের মদদদাতাদের মধ্যে যাদের পরিচয় এখনও জনসমক্ষে উদ্ঘাটিত হয়নি, তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় এনে জাতির ভবিষ্যতকে শঙ্কামুক্ত ও বিবেককে ভারমুক্ত করুন।

১৫ আগস্ট আর ৩ নভেম্বরের মতো ভয়াল দিনের মুখোমুখি জাতিকে আর কখনও যেন হতে না হয়, তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করার মাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সভ্য জাতি হিসাবে বিশ্ব সমাজে আমাদের উঁচু মাথা অনাগত দিনগুলোতে আরও উঁচু করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ, গবেষক, ফোকলোরিস্ট; অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ও সাবেক উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

আরও পড়ুন:
‘চার নেতাকে আড়ালে রেখে সোনার বাংলা গড়তে পারব না’
জেল হত্যার ছক কষেছিলেন যারা
চার নেতার স্মৃতি জাদুঘর খুলবে আগামী বছর
বিচার শেষ হলেও পূর্ণতা পায়নি ৪৬ বছরে
জেলহত্যা দিবসের স্মৃতিকথা

মন্তব্য

মতামত
Transport owners are scared because of BNPs arson attacks

বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পরিবহন মালিকরা ভীতসন্ত্রস্ত

বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পরিবহন মালিকরা ভীতসন্ত্রস্ত
বিএনপির এই অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পরিবহন মালিকসহ সাধারণ মানুষ আতংকিত। এ কারণে আজ যখন বিএনপি আন্দোলনের নামে আবার মাঠে নেমেছে, তখন লঞ্চ মালিক, বাস মালিক, ট্রেনের চালক, মালবাহী ট্রাকের মালিক সবাই আতংকিত। সে জন্য তারা তাদের পরিবহন বন্ধ রাখছে।

বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন প্রতিহত করার নামে দেশে অসংখ্য মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। হাজার হাজার নারী-শিশু বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের শিকার হয়েছিল। বিএনপি ট্রেনে আগুন দিয়েছে, গাড়িতে আগুন দিয়েছে, আগুন দিয়েছে লঞ্চে, চলন্ত বাসে। আর সে আগুনে অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল অসংখ্য মানুষ। এমনকি রোগীবাহী এম্বুলেন্সেও আগুন দেয়া হয়েছে।

বিএনপির এই অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পরিবহন মালিকসহ সাধারণ মানুষ আতংকিত। এ কারণে আজ যখন বিএনপি আন্দোলনের নামে আবার মাঠে নেমেছে, তখন লঞ্চ মালিক, বাস মালিক, ট্রেনের চালক, মালবাহী ট্রাকের মালিক সবাই আতংকিত। সে জন্য তারা তাদের পরিবহন বন্ধ রাখছে। বিএনপির সন্ত্রাসকে তারা তাদের পরিবহন ব্যবসার প্রধান অন্তরায় মনে করছে। অগ্নি সন্ত্রাসের জন্য মানুষ বিএনপিকে মানবতার শত্রু মনে করছে। বিএনপিকে তারা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। বিএনপি আজ এক আতঙ্কের নাম।

পরিবহন ব্যবসায়ীরা বিএনপির আন্দোলনে চরম ভীতসন্ত্রস্ত। তারা জানে তাদের মালিকানাধীন পরিবহন হামলার শিকার হলে তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা পথে বসবে। তারা এও জানে, এই অগ্নি সন্ত্রাসে শুধু সম্পদ নয়, মানুষের জীবনও বিপন্ন হবে।

সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে। গণপরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই খাতে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী এবং তাদের পরিবার পথে বসবে। সার্বিকভাবে দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তসহ সকলেই সংকটের সম্মুখীন হবে। বিএনপির সন্ত্রাসের আশঙ্কার কারণে পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকরা তাদের পরিবহন রাস্তায় নামাতে ভয় পায়। তারা অনাকাঙ্খিত যে কোনো পরিস্থিতি এড়িয়ে দেশের পরিবহন খাতকে নিরাপদ রাখতে চান। পরিবহন মালিকরা বিএনপির আন্দোলনের সময় যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষাসহ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসে দগ্ধ মানুষের আর্তনাদ এখনও শোনা যায়। অগ্নিদগ্ধ মানুষের কান্না আজও থামছে না। অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত মানুষের পরিবারের আর্তনাদ এখনো থামছে না। আমরা কি ভুলে গেছি সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা? ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি যখন সারা দেশে পেট্রল বোমা, অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়েছিল, মানবতা তখন ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিল। সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা কি আমরা ভুলে গেছি? অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে কাতড়ানো নারী শিশুর কথা, অগ্নিদগ্ধ মানুষগুলোকে বাঁচানোর জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রাণান্তকর চেষ্টার কথা কি আমরা ভুলে গেছি? এই অগ্নি সন্ত্রাসের সাক্ষী হয়ে আছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিট। এটি আজ ইতিহাসের সাক্ষী।

লেখক: আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক

আরও পড়ুন:
গণসমাবেশ শেষ, তবু আ.লীগ-পুলিশের তাণ্ডব থামেনি: খুলনা বিএনপি
বিএনপির সমাবেশের পর ২ মামলা, আসামি ৪২৯
‘খুলনায় বিএনপির বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহী’
নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মতোই বিচার হবে কাদের-হাছানদের: রিজভী
খুলনায় পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের মামলায় আসামি ১৭০

মন্তব্য

মতামত
An open letter to Sheikh Russell

শেখ রাসেলকে খোলা চিঠি

শেখ রাসেলকে খোলা চিঠি

প্রিয় শেখ রাসেল,

আজ তোমার জন্মদিন। আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিও। তোমার শিশু হৃদয়ের অস্পষ্ট চোখে দেখা সবুজ বাংলার প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। শরৎকালের প্রকৃতি তোমার মতোই কোমল, শান্ত, স্নিগ্ধ ও উদার। শরৎ আমাদের নানা রঙের ফুলে রাঙ্গিয়ে দেয়। শরৎ শুধু কাশফুলেই নয়, শাপলা, শালুক, জবা, পদ্ম, জুঁই, কেয়া, শিউলি, কামিনী, মালতি, মল্লিকা, মাধবী, ছাতিম, দোলনচাঁপা, বেলি, জারুল, নয়নতারা, ধুতরা, ঝিঙে, শ্বেতকাঞ্চন, রাধুচূড়া, বোগেনভেলিয়াসহ কত রকমের ফুলে যে রাঙ্গিয়ে দেয়, তা তুমি দেখে যেতে পারনি! তুমি আরও দেখে যেতে পারনি এ সব ফুলে পাতা কুড়ানি শিশুরা কীভাবে তাদের কৈশোর স্মৃতিময় করে তোলে! তুমি আমাদের অদেখা দেবশিশু, কলি থেকে ছিঁড়ে ফেলা রক্তজবা, তোমার বেঁচে থাকার আকুতি আমাকে কাঁদিয়েছে।

পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের নেতা ও কলমযোদ্ধা বার্ট্রান্ড রাসেলের নামে তোমার নাম। কিন্তু তুমি তার লেখনী পড়ে যেতে পারনি। তুমি জেনে যেতে পারনি তোমার পিতা, আমাদের দুঃখী জনকের হাতে গড়া দেশটায় আমরা কেমন আছি, আমরা তাঁকে কত ভালোবাসী!

মুক্তিযুদ্ধে তোমার দুই সহোদর সেনা অফিসারকে বীরের মতো লড়তে দেখে তুমি সেনা হতে চেয়েছিলে। তোমার হত্যাকারীর গায়ে সেনা ইউনিফর্ম দেখে তোমার কেমন লেগেছিল? তুমি জেনে হয়তো কাঁদবে রাসেল, তোমার নামে একটা সেনানিবাস হয়েছে, তোমার হত্যাকারীদের সেনা পদবিও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেই রাতের নির্মমতায় তোমার সেনা হওয়া হয়ে ওঠেনি আর, কিন্তু বাংলার অকুতোভয় সেনাদের মাঝে তুমি অমর হয়ে থাকবে।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে জুলিয়াস সিজারকে হত্যার বর্ণনাটি পৃথিবীর সবচাইতে নিষ্ঠুর বলে গণ্য করেন কেউ কেউ। কিন্তু সিজারকে মারার সময় কোনো শিশুকে মারেনি হত্যাকারীরা। সিজারকে মারার সময় কোনো গর্ভবতী নারীকেও মারেনি খুনির দল। বাড়ির কাজের লোক, এমনকি বেড়াতে আসা অতিথিকেও সেই রাতে তারা নির্মমতার শিকার করেছিল সিজারের প্রতি নিষ্ঠুরতাকে অতিক্রম করে। এমন নিষ্ঠুরতা দেখেও তুমি বাঁচতে চেয়েছিলে, মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিলে। ঘাতকের দল চিরতরে তোমার মায়ের পাশে তোমাকে কবর দিয়ে দিল! তৃষ্ণার্ত হয়ে জল চেয়েছিলে, পেলে না, আমাদের ভাসিয়ে গেলে নোনাজলে।

মুক্তিযুদ্ধে হেরে যাওয়ার গ্লানি ছিল পাকিস্তানপন্থি অফিসারদের। তুমি কি ভাবতে পেরেছিলে রাসেল, এই বয়সী একটা শিশুর উপরেও তারা যুদ্ধে হেরে যাওয়ার নিষ্ঠুর পৈশাচিক প্রতিশোধ নেবে? তোমার বিশ্বাস ছিল, তোমাকে ওরা মারবে না। কী নাম ছিল সেই সেনার? আমরা জানতে পারিনি। তারও নিশ্চয়ই এক বা একাধিক শিশু জন্মেছিল! সেই শিশুর একটুখানি হাসির জন্য সেও নিশ্চয়ই অপেক্ষার ডিউটি শেষে বাড়ি ফিরত! সেই শিশুরা কি আজ বড় হয়েছে? তারা কি তাদের খুনি পিতাকে ভালোবাসে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়।

গুলিতে ছিন্নভিন্ন, আমাদের না ফোঁটা রক্তজবা শহীদ শেখ রাসেল। শ্রাবণের সর্বস্বান্ত ভোরে তোমাকে আমরা হারিয়েছি। তুমি কি এখনো সাইকেল চালাতে ভালোবাস? কিংবা লেকে মাছ ধরে সেগুলো আবার জলে ছেড়ে দিতে এখনও ভালোবাস? তোমার কি এখনও প্রিন্সস্যুট পরতে মন চায়? এখনো কি জার্মানিতে চলে যাওয়া তোমার হাসুপার জন্য তোমার মন খারাপ হয়? কেন যে তোমার হঠাৎ জন্ডিস হয়েছিল তখন, তোমার হাসুপা তোমাকে আর নিতে পারল না হিংস্র পশুদের থাবা টার্গেট থেকে! তোমার কোমলপ্রাণ হৃদয় কি এখনও প্রশ্ন করে খুনি মোশতাককে, ‘শিশুরা তো রাষ্ট্রপতি হয় না, তাও কেন আমাকে মারলে?’

আজ তোমাকে স্মরণ করি, এই লোকায়ত বাংলার দুরন্ত শিশুদের মাঝে তোমাকে খুঁজি। তুমি শান্তিতে থেকো ভাই।

ইতি,

তোমাকে না দেখার বেদনায় কাতর একজন ছাত্রলীগ কর্মী। তোমার হাসুপা ও কামাল ভাই ছাত্রলীগ করতেন, তুমিও কি সদ্য কৈশোরে গিয়ে তাদের মতোই মিছিলে নেতৃত্ব দিতে?

লেখক : হামজা রহমান (অন্তর), কলামিস্ট, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও ছাত্রনেতা, সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।

আরও পড়ুন:
যে লজ্জা চিরকালের
শেখ রাসেল সব শিশুর প্রতিচ্ছবি
আদরের শেখ রাসেল
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শারীরিক প্রতিবন্ধীদের প্রীতি ক্রিকেট
জন্মদিনের শ্রদ্ধা: উদয়ের আগে হারানো নক্ষত্র

মন্তব্য

মতামত
You will live forever dear

চিরদিন বেঁচে থাকবে তুমি প্রিয়

চিরদিন বেঁচে থাকবে তুমি প্রিয়
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত বছর থেকে শেখ রাসেলের জন্মদিনটি ‘শেখ রাসেল দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- ‘শেখ রাসেল নির্মলতার প্রতীক, দুরন্ত প্রাণবন্ত, নির্ভীক।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র ও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার স্নেহের অনুজ শেখ রাসেলের শুভ জন্মদিন আজ।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন শেখ রাসেল। বঙ্গবন্ধু তার প্রিয় লেখক খ্যাতিমান দার্শনিক ও নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব বার্ট্রান্ড রাসেলের নামানুসারে পরিবারের নতুন সদস্যের নাম রাখেন ‘রাসেল’। এই নামকরণে মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

শৈশব থেকেই দুরন্ত প্রাণবন্ত রাসেল ছিলেন পরিবারের সবার অতি আদরের। কিন্তু মাত্র দেড় বছর বয়স থেকেই প্রিয় পিতার সঙ্গে তার সাক্ষাতের একমাত্র স্থান হয়ে ওঠে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। তবে সাত বছর বয়সে ১৯৭১ সালে তিনি নিজেই বন্দি হয়ে যান।

শেখ রাসেলের ভুবন ছিল তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাতা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব, বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালকে ঘিরে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে দেশি-বিদেশি চক্রান্তে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শেখ রাসেলকেও হত্যা করা হয়। তখন রাসেল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা সেদিন বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। তাই নরপশুরা নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলকেও রেহাই দেয়নি। শহীদ হন সবার অতি পছন্দের, আদরের, ভালবাসার শেখ রাসেল।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত বছর থেকে শেখ রাসেলের জন্মদিনটি ‘শেখ রাসেল দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- ‘শেখ রাসেল নির্মলতার প্রতীক, দুরন্ত প্রাণবন্ত, নির্ভীক।

‘১৯৬৪ সালে রাসেলের জন্মের আগের মুহূর্তগুলো ছিল ভীষণ উৎকণ্ঠার। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা ও খোকা চাচা বাসায়। বড় ফুফু ও মেজো ফুফু মার সাথে। একজন ডাক্তার ও নার্স এসেছেন। সময় যেন আর কাটে না। জামাল আর রেহানা কিছুক্ষণ ঘুমায় আবার জেগে ওঠে। আমরা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে জেগে আছি নতুন অতিথির আগমন বার্তা শোনার অপেক্ষায়।

‘মেজো ফুফু ঘর থেকে বের হয়ে এসে খবর দিলেন আমাদের ভাই হয়েছে। খুশিতে আমরা আত্মহারা। কতক্ষণে দেখব। ফুফু বললেন, তিনি ডাকবেন। কিছুক্ষণ পর ডাক এলো। বড় ফুফু আমার কোলে তুলে দিলেন রাসেলকে। মাথাভরা ঘন কালো চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় হয়েছিল রাসেল।’

সূত্র: শেখ হাসিনা, ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’

১৯৬৬ সালে কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার বাবাকে রেখে আসবে না। এ কারণে তার মন খারাপ থাকত।

কারাগারের রোজনামচায় ১৯৬৬ সালের ১৫ জুনের দিনলিপিতে রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না- যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার করছে।

“জেল গেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকেছিল। আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরে ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। যাবার সময় হলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়।”

১৯৬৭ সালে কারাগারের রোজনামচায় ১৯৬৭ সালের ১৪-১৫ এপ্রিলের অন্যান্য প্রসঙ্গ ছাড়াও রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভিতর যেয়ে ওকে কোলে করলাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করল। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে।

“আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি?’ ওর মা বলল, বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে। তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে। রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগল। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার উপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময় আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।”

১৯৭১ সালে রাসেল তার মা ও দুই আপাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ধানমণ্ডি ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। পিতা বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি এবং বড় দুই ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামাল চলে গেছেন মুক্তিযুদ্ধে। মা ও আপাসহ পরিবারের সদস্যরা ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর মুক্ত হন। রাসেল ‘জয় বাংলা’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। বাইরে তখন চলছে বিজয়-উৎসব।

শেখ রাসেলের জন্মদিনটিতে শুধু দিবস পালনে সীমাবদ্ধ না থেকে শেখ রাসেল যে পরিবারে যে পরিবেশে বেড়ে উঠতো সেই পরিবারের আদর্শ ও ছোট্ট রাসেলের ছোট্ট জীবনের মানবিক দিকগুলো সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে তা অনুধাবন ও অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারলেই দিবস পালন সফল হবে। দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।

৫৯তম জন্মদিনে শেখ রাসেলের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। এ দেশের শিশু-কিশোর, তরুণ প্রজন্মের কাছে শেখ রাসেল এক ভালোবাসার নাম, শেখ রাসেল আজ দেশের আনাচে-কানাচে এক মানবিক সত্তা হিসেবে সবার মাঝে বেঁচে আছেন। এরকম জন্মদিন যেন আর কোনো শিশুর জীবনে না আসে।

শেখ রাসেল, চিরদিন বেঁচে থাকবে তুমি প্রিয়। তোমার শরীরের মৃত্যু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আত্মার মৃত্যু হবে না কোনোদিন। তুমি বেঁচে আছো আমাদের সবার অন্তরে। জননেত্রী শেখ হাসিনার আদরের ছোট ভাই শহীদ শেখ রাসেলের শুভ জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা। জয় বাংলা।

তথ্য সংগ্রহ: বিবিসি বাংলা, উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ

কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন: নিরাপত্তা বিশ্লেষক, লেখক ও কলামিস্ট; পরিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ এবং প্রকল্প পরিচালক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

আরও পড়ুন:
অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা: জেগে ওঠো বাংলাদেশ
শেখ রাসেল অবিকশিত সম্ভাবনা
কুঁড়িতেই ঝরে যাওয়া মুকুল
রাসেল আমাদের অস্তিত্বের অনুভূতি
আলো ছড়ানোর আগেই নিভিয়ে দেয়া হলো যে জীবনপ্রদীপ

মন্তব্য

মতামত
Kalna Setu Another feather in the crown of development

কালনা সেতু: উন্নয়নের মুকুটে আরেকটি পালক

কালনা সেতু: উন্নয়নের মুকুটে আরেকটি পালক
নড়াইল ও গোপালগঞ্জকে বিভক্তকারী নদী মধুমতীর কালনা পয়েন্টে এ সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯৫৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ সেতু বদলে দেবে নড়াইলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র। সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে পর্যটন, কৃষি ও অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশের উন্নয়নে সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি পালক। কালনা সেতুর উদ্বোধন সোমবার। এ দেশের প্রথম ছয় লেনের সেতু।

রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার সড়কপথে যোগাযোগের জন্য তৈরি এ সেতু বদলে দেবে নড়াইলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র। সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে পর্যটন, কৃষি ও অর্থনীতিতে।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে বেনাপোল, যশোর, নড়াইল ও লোহাগড়া রুটে নিয়মিত বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। তা ছাড়া এ অঞ্চলের ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী যানবাহনও এই পথে চলাচল শুরু করেছে। এই মহাসড়কটি ইতোমধ্যে দেশের ব্যস্ততম সড়কে পরিণত হয়েছে।

নড়াইল ও গোপালগঞ্জকে বিভক্তকারী নদী মধুমতীর কালনা পয়েন্টে এ সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৯৫৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি একনেক সভায় মধুমতী নদীর ওপর কালনা সেতু নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭০ কোটি টাকা। সেতুর দৈর্ঘ্য ছিল ৬৮০ মিটার এবং প্রস্থ ১৮ দশমিক ২০ মিটার। তখন কালনা সেতু ছিল চার লেনের। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের পর কালনা সেতুর সঙ্গে রেললাইন স্থাপনের পরিকল্পনা, জমি অধিগ্রহণ ইত্যাদি নানা জটিলতায় কাজ শুরু করতে দেরি হয়। অবশেষে আলাদা রেল সেতু নির্মাণসহ সব জটিলতা কাটিয়ে ২০১৮ সালের ২৪ জুন সংশোধিত প্রকল্পে ছয় লেনের সেতু হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেতু কর্তৃপক্ষের কার্যাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তখন প্রকল্পের মেয়াদ ৩৬ মাস ধরে ২০২১ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার সময়ে কাজ বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এশিয়ান হাইওয়ে-১-এর অংশ ছয় লেনের দৃষ্টিনন্দন এই সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে।

সেতুর মাঝখানে বসানো হয়েছে ভিয়েতনামে তৈরি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ১৫০ মিটার দীর্ঘ নেলসন লস আর্চ টাইপের (ধনুকের মতো বাঁকা) স্টিলের স্প্যান। জাপানের নিপ্পন কোম্পানির এ স্প্যানটি ছয় লেনের এ সেতুকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে এ সেতু হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাপানের টেককেন করপোরেশন ও ওয়াইবিসি এবং বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড যৌথভাবে এ সেতুর বাস্তবায়ন করছে।

সেতু কর্তৃপক্ষ জানায়, এ সেতু নির্মাণে ৭০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের পর ২০২০ সালের ১৫ মে বাস্তবায়ন শুরু হয়। কপার ড্যাম পদ্ধতিতে নদীর তলদেশে পাইলিং করে স্থাপিত মোট ১২টি পিলারের ওপরে সেতুটি এখন দৈর্ঘ্যে ৬৯০ মিটার ও প্রস্থে ২৭ দশমিক ১ মিটার। ১৫০ মিটার স্টিলের ধনুকের মতো বাঁকা স্প্যানটির উভয় পাশের অন্য স্প্যানগুলো পিসি গার্ডারের (কংক্রিট)। সেতুতে মোট এবাডমেট রয়েছে দুটি, ১৩টি স্প্যান এবং ১৬০টি গার্ডার। সেতুর উভয় পাশে ৪ দশমিক ২৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩০ দশমিক ৫০ মিটার প্রস্থ সংযোগ সড়ক রয়েছে। ছয় লেনের এ সেতু হবে এশিয়ান হাইওয়ের অংশ।

সওজ বিভাগ ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এশিয়ান হাইওয়ে-১ এর অংশ ছয় লেনের দৃষ্টিনন্দন এ সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে। নড়াইল, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বেনাপোল, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরবাসী মাগুরা-ফরিদপুর হয়ে যাতায়াতের পরিবর্তে সরাসরি কালনা সেতু পার হয়ে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ঢাকাগামী যানবাহন যাতায়াত সহজ ও পথ সংক্ষিপ্ত হবে। এ ছাড়া স্থলবন্দর বেনাপোলের আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনেও এই সেতু ব্যবহার করা যাবে। তখন ঢাকার সঙ্গে নড়াইলের দূরত্ব হবে মাত্র ১২৫ কিলোমিটার অর্থাৎ কমে যাবে ১৮০ কিলোমিটার।

জানা গেছে, নড়াইলের কালনা এলাকায় মধুমতী নদীর তীরে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের একটি প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন। শিগগিরই এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ দৃশ্যমান হবে। ফলে এখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করবেন।

এদিকে কালনা সেতু চালুতে জেলার উদ্যোক্তারা আগে থেকেই বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন যাতে করে সেতু উদ্বোধনের পরপরই এর সুফল পাওয়া যায়। সম্প্রতি নড়াইল-যশোর আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে নড়াইল অংশে জমির দাম বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। ইতোমধ্যে বেঙ্গল গ্রুপ, কিষান গ্রুপসহ কয়েকটি কোম্পানি জমি কিনেছে। নড়াইল অংশে গড়ে উঠেছে কয়েকটি কলকারখানা। নড়াইল সদরের ধোপাখোলা এলাকায় মহাসড়কের পাশে ৩৫০ একর জমিতে বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তুলতে অধিগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) নড়াইল জেলা কর্তৃপক্ষ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইল কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) দীপক কুমার রায় জানান, কালনা সেতু চালু হলে কৃষি পরিবহণ ও বিপণন সহজ হবে। চাঙা হবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এর সুফল পাবে নড়াইলের কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

কালনা সেতু চালু হলে ঢাকা থেকে নড়াইলের দূরত্ব হবে মাত্র ১১৩ কিলোমিটার। কালনা সেতু চালু পরবর্তী আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট রাতারাতি পরিবর্তন হবে। ফরেন ইনভেস্টমেন্ট হবে, বিশেষ করে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এখানে হচ্ছে। জেলা শহরের অদূরেই বিসিক শিল্পনগরী হতে যাচ্ছে। এসবের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। নড়াইল জেলা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। কালনা সেতু চালু হলে এলাকার চিত্র পাল্টে যাবে। লোহাগড়ায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা করছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছেন।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক, লেখক ও কলামিস্ট, পরিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ এবং প্রকল্প পরিচালক বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর

আরও পড়ুন:
কালনা সেতু উদ্বোধন সেপ্টেম্বরে
পদ্মা সেতুর সুফল আটকে কালনায়

মন্তব্য

p
উপরে