× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট

মতামত
1 11 government and release of Sheikh Hasina
hear-news
player
print-icon

১/১১-এর সরকার ও শেখ হাসিনার কারামুক্তি

১-১১-এর-সরকার-ও-শেখ-হাসিনার-কারামুক্তি
বোঝাই যাচ্ছিল সামরিকসমর্থিত মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকার আওয়ামী লীগকে নির্মূল করার টার্গেট করেছিল। কিন্তু দেশে তখন জোট সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, নির্বাচনকে কলঙ্কিত করা ইত্যাদি অভিযোগে বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ ছিল। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের অবস্থানে থেকে আন্দোলন করে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি-জামায়াত ২০০১ সাল থেকে যেসব অপরাধ ও অপকর্ম সংঘটিত করেছিল সেসবের কারণে তীব্র ক্ষোভ ছিল তাদের বিরুদ্ধে।

ফিরে এলো ১১ জুন । ২০০৮ সালের এই দিনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ৩৩১ দিন কারাভোগের পর মুক্তি লাভ করেন। তখন ক্ষমতায় ছিল ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অনেকে এটিকে ইয়াজউদ্দিন-মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকার বলে থাকেন। ইয়াজউদ্দিন ছিলেন রাষ্ট্রপতি, মইনুদ্দিন সেনাপ্রধান এবং ফখরুদ্দিন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ প্রধান উপদেষ্টা। সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকার কথা ছিল সেটি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লঙ্ঘিত হয়। ওইদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেয়াদ শেষে দায়িত্ব হস্তান্তর না করে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদেকে প্রধান উপদেষ্টা পদ গ্রহণে প্ররোচিত করেছিলেন। ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদও গ্রহণ করেন। এই পদ তিনি সংবিধান অনুযায়ী সরাসরি গ্রহণ করতে পারেন না। ৫৮ অনুচ্ছেদের ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে সর্বশেষ অপশন তথা পছন্দ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এটি ছিল সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন। একারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের পর থেকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথম থেকেই সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনার মুখে পড়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনিয়ম বাড়তেই থাকে। রাস্তায় আন্দোলন ও প্রতিক্রিয়াও ব্যাপকতর হতে থাকে। ডিসেম্বরে সরকারের চারজন উপদেষ্টাও পদত্যাগ করেন। তারপরও রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজউদ্দিন আহমেদ চারদলীয় জোটের অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত হচ্ছিল। সব রাজনৈতিক দলের আন্দোলন, বিরোধিতা ও অংশগ্রহণহীন অবস্থাতেই একতরফা নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছিল।

এমনকি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চারদলীয় জোটের বিভিন্ন প্রার্থীকেও বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এর ফলে দেশব্যাপী তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ১১ জানুয়ারি সেনাবাহিনী এবং সুশীল সমাজের সমর্থনে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয়। ভেঙে যায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পরদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের কোথাও এমন বিধান ছিল না। তারপরও দেশের মানুষ মনে করেছিল যে পূর্ববর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনমতকে উপেক্ষা করে যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে যাচ্ছিল তা থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছে। ফখরুদ্দিনের নতুন সরকার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার। কিন্তু অচিরেই এই সরকারের গতিপ্রকৃতি বদলে যেতে থাকে। সামরিক বাহিনী প্রধান মইনুদ্দিন আহমেদ এবং উপদেষ্টা পরিষদের একাধিক সদস্য রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নানা ধরনের বেআইনি উদ্যোগ গ্রহণ করতে থাকে। ধীরে ধীরে এটি সামরিক-ব্যাকড সরকারের রূপ নিতে থাকে। মইনুদ্দিন আহমেদসহ বেশ কয়েকজন সামরিক শীর্ষকর্মকর্তা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে এবং আলোচনায় চলে আসছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ তখন পিছিয়ে যেতে থাকে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রে চোখের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার পর তাকে দেশে ফিরে আসতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। তিনি সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ২০০৭ সালের ৭ মে দেশে ফিরে আসেন। সামরিকসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে ১৬ জুলাই ধানমন্ডির সুধাসদন থেকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা রুজু করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে গ্রেপ্তার করার জন্য প্রায় ২ হাজার পুলিশ তার বাসভবনের এলাকা ঘেরাও করে।

সেখান থেকে তাকে সংসদ ভবনের পাশে অস্থায়ী জেলখানায় আটক রাখা হয়। সেখানেই অস্থায়ী আদালত বসানো হয়। আদালতে বিভিন্ন মামলার শুনানিও চলতে শুরু করে। বোঝাই যাচ্ছিল সামরিকসমর্থিত মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকার আওয়ামী লীগকে নির্মূল করার টার্গেট করেছিল। কিন্তু দেশে তখন জোট সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা, নির্বাচনকে কলঙ্কিত করা ইত্যাদি অভিযোগে বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ ছিল। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের অবস্থানে থেকে আন্দোলন করে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপি-জামায়াত ২০০১ সাল থেকে যেসব অপরাধ ও অপকর্ম সংঘটিত করেছিল সেসবের কারণে তীব্র ক্ষোভ ছিল তাদের বিরুদ্ধে। অথচ সামরিকসমর্থিত সরকার বিএনপি-জামায়াতের ব্যাপারে ততটা আগ্রহ না দেখিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের আক্রোশ প্রকাশ করায় মানুষ সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠে।

তেমন প্রেক্ষাপটে সরকার বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকেও বন্দি করে অস্থায়ী কারাগারে নিয়ে আসে। দুই দলকেই তখন ভাঙার উদ্যোগও প্রকাশ্যে নেয়া হতে থাকে, গঠিত হতে থাকে সেনাসমর্থিত কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাতে বাদ যাননি গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. ইউনূসও। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংস্কারের ধুয়া তুলে সংস্কারবাদী গ্রুপ সৃষ্টি করা হয়। তবে বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশ সাইফুর রহমান, মান্নান ভূঁইয়া এবং মেজর (অব.) হাফিজের নেতৃত্বে আলাদা সংস্কারবাদী দল সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে সংস্কারের কথা বলা হলেও দলে কোনো ভাঙন সৃষ্টি হয়নি ।

২০০৮ সালের জানুয়ারিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্যেই সংকট বেড়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে পদত্যাগ করতে হয়। দেশে তখন একদিকে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলের মধ্যে সরকারের অভ্যন্তরে সেনাসমর্থিত কিছু কর্মকর্তার বাড়াবাড়িতে অসন্তুষ্টি বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তখন খাদ্যসংকট এবং অর্থনৈতিক সংকট বেড়ে যায়। ফলে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশ পরিচালনায় ক্রমেই ব্যর্থ হতে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আন্দোলন শুরু করলে তা ব্যাপকভাবে সমর্থন লাভ করতে থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভ্যন্তরে ক্ষমতায় থাকা না থাকা নিয়ে মতভেদও বাড়তে থাকে। আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোও প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ছিল। আন্তর্জাতিক মহল থেকে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করার চাপ বাড়তে থাকে। অস্থায়ী কারাগারে বন্দি শেখ হাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীগণ তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে ফেটে পড়ে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা খুব দ্রুতই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আন্দোলনে কাবু করে ফেলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মধ্যেও তখন একটি অংশ নির্বাচনের আয়োজন সম্পন্ন করা এবং সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের মনোভাব পর্যবেক্ষণ করতে থাকে।

অপরদিকে নবগঠিত নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য ছবিযুক্ত ভোটার আইডি কার্ড এবং নির্বাচনি আচরণবিধি সংস্কার করে। আওয়ামী লীগের আন্দোলন করা এবং নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে । কিন্তু বিএনপির অবস্থানটি তখন নড়বড়ে ছিল। সেই অবস্থায় শেখ হাসিনা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার জন্য আদালত ৮ সপ্তাহের জামিনের অনুমতি প্রদান করেন।

১১ জুন মুক্তিলাভের পর শেখ হাসিনা চোখের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যান। ২০০৮ সালের ৬ নভেম্বর চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে আসেন এবং স্থায়ী জামিন লাভ করেন।

১১ জুন শেখ হাসিনার মুক্তিলাভের পর তার নেতৃত্বে দলকে সংগঠিত করার উদ্যোগ জোরদার হয়। দেশের মানুষের মধ্যেও শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন বেড়ে যেতে থাকে। মেয়াদ শেষ হওয়া সিটি করপোরেশনে নির্বাচন নতুন ভোটার আইডি কার্ডে অনুষ্ঠিত করার আয়োজন করা হয়। বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, ও খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন।

নতুন নির্বাচন কমিশন সফলভাবে এসব সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আয়োজন করে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। ২০০৬-০৭ সালে নির্বাচন নিয়ে দেশে যে চরম অরাজকতা চারদলীয় জোট সৃষ্টি করেছিল; এরই প্রতিক্রিয়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে পড়ে। সেই আন্দোলনে মূল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা। তিনি তখন ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির সমন্বয়ে গঠিত মহাজোটেরও প্রধান।

২০০১ সাল পরবর্তী সময় থেকে দেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলন চালাতে গিয়ে তিনি এবং আওয়ামী লীগ ২১ আগস্টের মতো ন্যক্কারজনক গ্রেনেড হামলার শিকার হয়। এরপর গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার অর্জনের জন্য দেশে যে আন্দোলন সূচিত হয় তিনি তার শীর্ষনেতা হিসেবে সবার কাছে সমাদৃত হন। ১/১১-এর সরকার তাকে গ্রেপ্তার করার পর তিনি আরও বেশি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ইয়াজউদ্দিন, মইনুদ্দিন ও ফখরুদ্দিনের সরকার ২ বছর অবৈধভাবে যেমনি ক্ষমতায় ছিল, একইভাবে রাজনীতিবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করায় ওই সরকার এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের বিরুদ্ধেও মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

সেই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন-প্রাক্কালে জনগণের কাছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, উন্নয়ন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ নির্মূল ইত্যাদি রাজনৈতিক ইস্যুর প্রধান নেতারূপে বিবেচিত হন। তিনি ১২ ডিসেম্বর ২০০৮ ‘দিনবদলের সনদ রূপকল্প ২০২১’ উপস্থাপন করে সেই প্রত্যাশার প্রতিধ্বনি করেন। নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করা নিয়ে দোদুল্যমান ছিল কিন্তু আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে, জনগণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটকে নিরঙ্কুশ বিজয় প্রদান করে। শেখ হাসিনা দীর্ঘ এই আন্দোলন সংগ্রাম এবং কারা ভোগের প্রতিদান হিসেবে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেন। সেই থেকে তিনি বাংলাদেশকে উন্নয়ন, প্রত্যাশা পূরণ এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দান করে আসছেন। এবার কারামুক্তির ১৪ বছরপূর্তি উপলক্ষে তিনি জাতিকে পদ্মা সেতু উপহার দিতে যাচ্ছেন।

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনার কারামুক্তি দিবস আজ
শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা: বিএনপি নেতার জামিন প্রত্যাহার
শেখ হাসিনা মডেলে ‘উদ্ধার পেতে পারে শ্রীলঙ্কা’
শেখ হাসিনা রাজনীতিতে এসেছিলেন আশা জাগিয়ে
শেখ হাসিনা মানবকল্যাণের জন্যই ফিরে আসেন

মন্তব্য

মতামত
Padma Bridge and Bangladesh Army

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা, নির্মাণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পৃক্ত ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ছবি: সংগৃহীত
মূল কাজ শুরুর ঠিক আগে পদ্মা সেতুর অ্যালাইনমেন্ট বরাবর নদীর ব্যাপক ভাঙন মোকাবিলায় সেতু বিভাগের অনুরোধে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পদ্মা নদীর পাড় বরাবর মাওয়া-কান্দিপাড়া-যশোলদিয়া এলাকায় ১.৩ কিলোমিটার নদীশাসন সম্পন্ন করে পদ্মা সেতুর মূল এলাইনমেন্টকে বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাত ধরে ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর জাজিরা অ্যাপ্রোচ রোড শুরু করার মাধ্যমে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজ মাঠ পর্যায়ে শুরু হয়।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত সুপ্রশস্ত পদ্মা সেতু আজ এক বাস্তবতা। ১৯৯৮-৯৯ সালে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা নদীতে সেতু নির্মাণের প্রাক-সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছিল।

২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে সেতুর প্রাথমিক নকশা সম্পন্ন হওয়ার পর দেশবাসীর স্বপ্ন যখন কুঁড়ি হয়ে কেবল মেলতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই দেখা দেয় অর্থায়নের অনিশ্চয়তা। দেশের এ সংকটময় মুহূর্তে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের এক যুগান্তকারী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। শুরু হয়ে যায় পদ্মা সেতু নির্মাণের বিশাল প্রকল্পমালা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সেতু বিভাগের সার্বিক তত্ত্বাবধানে শুরু হয় পদ্মা সেতু নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কার্যাবলী।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘জনগণের সেনাবাহিনী’ দেশ ও জনগণের জন্য যেকোনো চ্যালেঞ্জিং কাজে সর্বদাই এগিয়ে এসেছে। পদ্মা সেতু নির্মাণেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ২০১৩ সালের ২৫ জানুয়ারি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খ্যাতিমান প্রকৌশলী ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনার সময় পদ্মা সেতু নির্মাণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে মত প্রকাশ করেন।

ইতোপূর্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে অসংখ্য রাস্তা, কক্সবাজারে মেরিন ড্রাইভ, মিরপুর-এয়ারপোর্ট রোড ফ্লাইওভার, জাতীয় মহাসড়ক, হাতিরঝিল প্রজেক্টসহ অনেক প্রকল্প সূচারুরূপে সম্পাদন করায় পদ্মা সেতু নির্মাণে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা অত্যন্ত যৌক্তিক। ফলত এই সেতু তৈরির প্রথম থেকেই সেতু সংশ্লিষ্ট সকল স্থাপনার নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শক হিসেবে সেতু বিভাগ কর্তৃক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা হয়।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ মোট ৫টি প্যাকেজের আওতায় পরিকল্পিত—মূল সেতু, নদীশাসন, দক্ষিণ প্রান্তে ১০.৫৭ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড, উত্তর প্রান্তে ১.৬৭ কিলোমিটার অ্যাপ্রোচ রোড এবং প্রকল্পে নিয়োজিত পরামর্শক ও প্রকৌশলীগণের বাসস্থান (সার্ভিস এরিয়া-২)।

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের অ্যাপ্রোচ রোড উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংশ্লিষ্টরা। ছবি: সংগৃহীত

মূল কাজ শুরুর ঠিক আগে পদ্মা সেতুর অ্যালাইনমেন্ট বরাবর নদীর ব্যাপক ভাঙন মোকাবিলায় সেতু বিভাগের অনুরোধে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পদ্মা নদীর পাড় বরাবর মাওয়া-কান্দিপাড়া-যশোলদিয়া এলাকায় ১.৩ কিলোমিটার নদীশাসন সম্পন্ন করে পদ্মা সেতুর মূল এলাইনমেন্টকে বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে মুক্ত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাত ধরে ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর জাজিরা অ্যাপ্রোচ রোড শুরু করার মাধ্যমে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজ মাঠ পর্যায়ে শুরু হয়।

তিনটি প্যাকেজের (জাজিরা ও মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোড এবং সার্ভিসের এরিয়া-২) জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেড-হাইওয়ে কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট এবং পরামর্শক হিসেবে কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিযুক্ত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজের জন্য যথাক্রমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডকে নিয়োগ করা হয়। এভাবে সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহদাকার মেগা প্রকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করে।

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদসহ সংশ্লিষ্টরা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য এটি একটি বড় পেশাদারি স্বীকৃতি। এর পাশাপাশি স্ট্র্যাটেজিক এই সেতুর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড নামে একটি নতুন ব্রিগেড গঠন করে, যার কার্যক্রম ২০১৪ সালের ১২ মার্চ থেকে শুরু হয়। এই লেখনীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সম্পাদিত কাজগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

জাজিরা অ্যাপ্রোচ রোড

এই অ্যাপ্রোচ রোডে রয়েছে ৪ লেন বিশিষ্ট ১০.৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল সড়ক, ২ লেন বিশিষ্ট ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সার্ভিস সড়ক, ৫টি সেতু, ৮টি আন্ডারপাস, ২০টি কালভার্ট, ১টি সার্ভিস এরিয়া, টোলপ্লাজা, থানা এবং ফায়ার স্টেশন বিল্ডিং। বর্ণিত কাজ ২০১৩ সালে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ২০১৭ সালে।

মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোড

এই অ্যাপ্রোচ রোডে রয়েছে ৪ লেনবিশিষ্ট ১.৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল সড়ক, ২ লেন বিশিষ্ট ১.৮৯ কিলোমিটার সার্ভিস সড়ক, একটি কালভার্ট, সার্ভিস এরিয়া, টোলপ্লাজা, থানা এবং ফায়ার স্টেশন বিল্ডিং।

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোডে এশটি পাইলিংয়ের নির্মাণকাজে সেনা সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

অ্যাপ্রোচ রোডটি ২০১৪ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালে শেষ হয়েছে।

সার্ভিস এরিয়া-২

এই এরিয়ার মধ্যে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ৩০টি কটেজ, রিসিপশন বিল্ডিং, সুপারভিশন অফিস, সুইমিং পুল, টেনিস কমপ্লেক্স ও মোটেল মেস তৈরি করা হয়েছে। ২০১৪ সালে শুরু হয়ে ২০১৬ সালে এই প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে।

জাতীয় মহাসড়ক এন-৮

দেশের সর্বপ্রথম এ্যাক্সেস কন্ট্রোলড এক্সপ্রেসওয়ে এন-৮ পদ্মা সেতুকে উত্তরে ঢাকা এবং দক্ষিণে ফরিদপুরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এন-৮ মহাসড়কটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই মহাসড়কটির কাজ ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট উদ্বোধন করেন এবং ২০২০ সালের ১২ মার্চ এর কাজ সমাপ্ত হয়।

মহাসড়কটি ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ, যার আওতায় রয়েছে ৫টি ফ্লাইওভার, ২টি ইন্টারচেঞ্জ, ৪টি ওভারপাস, ২৯টি সেতু, ৫৪টি কালভার্ট এবং ১৯টি আন্ডারপাস। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর এন-৮ সড়ক ব্যবহার করে অতি স্বল্প সময়ে মানুষ ও মালামাল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা থেকে রাজধানী ঢাকায় পৌঁছাতে পারবে, যা ওই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে করবে ত্বরান্বিত।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প

সাশ্রয়ী মূল্যে বিপুল পরিমাণ যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের সুবিধার্থে পদ্মা সেতুর মূল নকশায় নিচের স্তরে ব্রডগেজ রেললাইনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সরকারের একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্টের তত্ত্বাবধানে ও বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের মাধ্যমে এই প্রকল্পটির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি আর্থিক বিবেচনায় (৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা) বাংলাদেশ সরকারের সর্ববৃহৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটি উদ্বোধন করেন।

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

এই রেল প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ১৭২ কিলোমিটার এবং এর আওতাধীন রয়েছে ২৩.২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ভায়াডাক্ট বা উড়াল রেল সেতু, ৫৯টি বড় দৈর্ঘ্যের সেতু, ১৪২টি কালভার্ট, ১৩৫টি আন্ডারপাস ও ২০টি স্টেশন। এ পর্যন্ত প্রকল্পের শতকরা ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

পদ্মা সেতু ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদকে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে ব্রিফিং করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

পদ্মা সেতু এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদির নিরাপত্তা

দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি, জনসাধারণের জীবনযাপনের মানোন্নয়নের পাশাপাশি কৌশলগত কারণে স্ট্র্যাটেজিক এই সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। এর নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেডকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাদেরকে বলা হয় ‘Protector of Padma Bridge’। এই ব্রিগেডটি ২০১৩ সাল থেকেই সেতু, সংশ্লিষ্ট জনবল, নানাবিধ স্থাপনা ও সেতুর নিচে বিস্তীর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আসছে।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সবচাইতে চ্যালেঞ্জিং নির্মাণ কাজ হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প। পুরো বিশ্ব অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছে একটি একটি করে পিলার ও স্প্যান উম্মত্ত পদ্মার বুক চিড়ে তৈরি হচ্ছে। আজ পদ্মা সেতু ও সেতুসংলগ্ন অন্যান্য অবকাঠামো গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এমন চ্যালেঞ্জিং, অত্যাধুনিক, বিশালাকার ও নান্দনিক স্থাপনার নানাবিধ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পেরে অত্যন্ত গর্বিত এবং বাংলাদেশ সরকারের নিকট কৃতজ্ঞ।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে নির্মাণ, নিরাপত্তা ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে সরাসরি অংশগ্রহণের সুবর্ণ সুযোগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে করেছে আত্মবিশ্বাসী এবং বাড়িয়েছে তার কর্মদক্ষতা। মহতী এ কাজে সম্পৃক্ত হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে নিজের অবস্থানকে করেছে সুদৃঢ়।

এক নজরে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

  • ১০.৫ কিমি দীর্ঘ জাজিরা অ্যাপ্রোচ রোড এবং ব্রিজ অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ।
  • ১.৬৭ কিমি দীর্ঘ মাওয়া অ্যাপ্রোচ রোড এবং ব্রিজ অ্যান্ড ফ্যাসিলিটিজ।
  • মুল সেতু ও নদী শাসনে নিয়োজিত সহস্রাধিক প্রকৌশলী, দেশি-বিদেশী পরামর্শক এবং সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা।
  • একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রিগেড (৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড) কর্তৃক সেতুর সামগ্রিক নিরাপত্তা।
  • নদী ভাঙন রোধকল্পে নদীর তীরবর্তী মাওয়া-কান্দিপাড়া-যশোলদিয়া এলাকায়। ১ হাজার ৩০০ মিটার আপৎকালীন জরী নদীশাসন।
  • কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাট সংযোগ সড়ক (৬ কিমি) প্রশস্তকরণ। শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকার ৩ কিমি রাস্তা।
  • পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিমি। দীর্ঘ অত্যাধুনিক রেললাইন।
  • ঢাকা থেকে মাওয়া এবং জাজিরা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত সর্বমোট ৫৫ কিমি দীর্ঘ দেশের সর্বপ্রথম এ্যাক্সেস কন্ট্রোলড এক্সপ্রেসওয়ে (এন-৮)।
  • পদ্মা বহুমুখী সেতু ও পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এলাকায় ভূমি উন্নয়ন, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কার।
আরও পড়ুন:
পদ্মা সেতুতে টোল ৩ সেকেন্ডে
অমিত এক সাহসের গর্বিত রূপান্তর
পদ্মা সেতুতে হাঁটা যাবে না, তোলা যাবে না ছবি
পদ্মার সুবাদে উড়বে পায়রাও
পদ্মা সেতু দেয়ালে খেয়ালে 

মন্তব্য

মতামত
The 63 year path of the Awami League a despairing assessment

আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরের পথচলা: একটি নির্মোহ মূল্যায়ন 

আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরের পথচলা: একটি নির্মোহ মূল্যায়ন 
আগামী ২৫ জুন পদ্মা মহাসেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এ সবই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিশনারি ভিশনারি নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ অর্জন করতে পেরেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল এবং আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

আজ ২৩ জুন। ১৯৪৯ সালে এদিনে পুরান ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে দুদিনব্যাপী একটি সংগঠনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ তারিখ সম্মেলন শেষে জন্ম নেয় একটি নতুন রাজনৈতিক দলের। নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ । কেউ তখন ভাবতে পারেনি এই সংগঠনটি পাকিস্তান নামক সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের পতন ঘটিয়ে পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ইতিহাসের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হবে এবং দলটির নেতৃত্বে একটি মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হবে। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়েও দলটি বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিরন্তর সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করছে। আজ সেই দলের ৭৩ বছরপূর্তি।

ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে যে দলটির জন্ম সেই দলটি ইতিহাসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই গৌরবোজ্জ্বল রাজনৈতিক দলটির নাম এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আওয়ামী লীগ শুধু অন্যতম পুরাতন রাজনৈতিক দলই নয়, একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সংগ্রামে লড়াইরত প্রতিষ্ঠানও। সেকারণে এই দলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাস। বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে আওয়ামী লীগ থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগকেও বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি শুধু করেনি, বাস্তবায়ন ঘটাতে রাজনৈতিক সব ঝুঁকি, বিপদ, কষ্ট, নির্যাতন, সহ্য করে ক্রমাগত বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেছে। অবশেষে ১৯৭১ সালে সফল হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের আদর্শে পুনর্গঠন করার জন্য দলটি একইভাবে নিরন্তর লড়াই ও কাজ করে চলছে। এখানেই এই রাজনৈতিক দলের বিশেষত্ব। দলটির প্রয়োজনীয়তা তাই আদৌ ফুরিয়ে যায়নি। বরং অধিকতর গুরুত্ব বেড়েই চলছে।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত উপমহাদেশ দ্বিখণ্ডিত হয়ে পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্রটি জন্ম নেয় তার পূর্বাঞ্চলে পূর্ব বাংলাকে যুক্ত করা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িকতার জটিল রাজনৈতিক কূটচালের শিকার হলো পূর্ব বাংলার জনগণ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগণ ধরে নিয়েছিল যে পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাদের সুখ শান্তি অবারিত হবে। ধর্মের পরিচয়ে অন্য একটি বড় জনগোষ্ঠী পাকিস্তানে সংখ্যালঘুতে পরিণত হলো। ভারত প্রজাতন্ত্রেও অনুরূপ সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুতে নাগরিকরা পরিচিত হওয়ার বাস্তবতায় পড়ে গেল। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের জনগণ ভাষার প্রশ্নে রাষ্ট্রের বৈরী আচরণের মুখে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পড়ে । উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা আগে থেকেই উচ্চারিত হতে থাকে। তখনই ধীরে নতুন এই রাষ্ট্রের চরিত্র উন্মোচিত হতে থাকে। পাকিস্তান পূর্ব বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকারকে রক্ষার পরিবর্তে বিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গি শুরু থেকেই প্রকাশ করতে থাকে। এর ফলে পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার রক্ষার তাগিদ থেকে সচেতন তরুণ এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে সংগঠন গড়ে তোলার পথে অগ্রসর হতে থাক। অথচ এই তরুণ এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাই কয়েকমাস আগেও পাকিস্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন অচিরেই ভেঙে যায় । সেখান থেকেই ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর তারিখে পাকিস্তান আন্দোলনে পুরোভাগের যুবকর্মীরা ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব বাংলা কর্মী সম্মেলনে মিলিত হয়ে গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। শামসুল হক এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই সংগঠনের সঙ্গে তরুণ কমরুদ্দিন আহাম্মদ, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, শামসুদ্দিন আহাম্মদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, নুরুদ্দিন আহম্মদ, আবদুল ওদুদ প্রমুখ জড়িত ছিলেন। এরপর আরও কয়েকটি সংগঠন ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হল মিলনায়তনে এক সভায় ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ’ সংগঠনটি ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে পুনর্গঠিত হয়। পূর্ব বাংলায় তখন থেকে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় তরুণ ও যুবসমাজ, ভাষা আন্দোলন এবং অন্যান্য আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকে। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে রাজনীতির একটি মেরুকরণ সংগঠিত হতে থাকে। সরকার এই শক্তি দমনে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের একটি আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করতে গিয়ে ১৯৪৯ সালের ১৯ মার্চ শেখ মুজিবসহ কজনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর ২৬ এপ্রিলে টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক যুবলীগের প্রার্থী সভাপতি শামসুল হক বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। মুসলিম লীগের প্রথম পরাজয় দৃশ্যমান হয়। জয় পরাজয়ের এই অবস্থান থেকেই বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতৃবৃন্দ নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে অগ্রসর হন। কলকাতায় অবস্থানরত সোহরাওয়ার্দী নতুন এই রাজনৈতিক সম্ভাবনার পক্ষে অবস্থান নেন। এরই মধ্যে ১৫০ মোগলটুলির শওকত আলীর বাসভবনকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবির গড়ে ওঠে। জেলে অবস্থানকারী শেখ মুজিবুর রহমানও এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর একটি সাংগঠনিক কমিটিও গঠিত হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি এবং ইয়ার মুহম্মদ খানকে সম্পাদক করে এই কমিটি প্রাথমিকভাবে তৈরি হয়। এই কর্মী শিবিরই ২৩ ও ২৪ জুন রোজ গার্ডেনে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে প্রদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কিছু নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্মেলনে উপস্থিত থাকেন। ২৪ তারিখ মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, আতাউর রহমানসহ কয়েকজন সহসভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক, শেখ মুজিবকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ইয়ার মোহম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ পদে নির্বাচিত করা হয়। আওয়ামী লীগ গঠনের সঙ্গে তখন তাজউদ্দীন আহমেদ, শওকত আলী, আনোয়ারা খাতুন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, আবদুল জব্বার খদ্দর, মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, আলী আমজাদ খান, শামসুদ্দীন আহমদ (কুষ্টিয়া), ইয়ার মুহম্মদ খান, মাওলানা শামসুল হক, মাওলানা এয়াকুব শরীফ, আবদুর রশিদ প্রমুখ যুক্ত ছিলেন। নবগঠিত দলের কর্মসূচি হিসেবে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, গণতন্ত্র ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ৪২টি দাবি গ্রহণ করা হয়। ২৬ জুন তারিখ শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান। আওয়ামী লীগ সংগঠন গড়ে তোলার প্রস্তুতি গ্রহণ করলে দলটির ওপর সরকারি নির্যাতন শুরু হয়। মওলানা ভাসানী, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকেই বিভিন্ন মামলায় কারাভোগ করেন। সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক সরকারি নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিবুর রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এবং আতাউর রহমান সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৩ সালে দলের দ্বিতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ভাসানী সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। ১৯৫৪ সালের ৮-১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। আওয়ামী লীগ এককভাবে ১৪৩টি আসন পায়। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তখন অন্য সব দলকে ছাড়িয়ে যায় কয়েকগুণ। ১৯৫৫ সালে অনুষ্ঠিত দলের ৩য় সম্মেলনে আওয়ামী লীগকে অসাম্প্রদায়িক আদর্শের রাজনৈতিক দলে পরিণত করা হয়। এরপরে ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগকে ত্যাগ করে মওলানা ভাসানীসহ বেশ কিছু নেতাকর্মী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠনের উদ্যোগ নেন। জুলাইয়ে ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাপ গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ তখন কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্ব পালন করছিল। কিন্তু এই বিভাজনটি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের রাজনৈতিক আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

১৯৫৮ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে এবং আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ৬০-এর দশকে আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্র ও প্রসিডেন্ট নির্বাচনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জোট গঠন করে। তবে ১৯৬৫-এর পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিব ৬ দফা পেশ এবং মার্চে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ৬ দফা গ্রহণ, শেখ মুজিবকে সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠনের পর ৬ দফা আন্দোলন সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জেলে আটক রাখার পরও আন্দোলন দুর্বল করা যায়নি।

সরকার আওয়ামী লীগ ভাঙার চেষ্টা করলে সেটিও ব্যর্থ হয়। এরপর ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবকে ১ নম্বর আসামি করে একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। ১৯৬৮ সালের শেষদিকে এই মামলার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও ছাত্র ঐক্য গড়ে ওঠে। ফলে ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি হয় সেকারণে সরকার বাধ্য হয় মামলা প্রত্যাহার করে রাজবন্দিদের মুক্তি প্রদান করতে। এর মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে শেখ মুজিব এবং পূর্ব বাংলা তখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের নিয়ামক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ষড়যন্ত্র থেকেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ও ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। আওয়ামী লীগ সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করে এবং পাকিস্তানিদের পরাজিত করে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশ পুনর্গঠনে সফলভাবে নেতৃত্ব প্রদান করছিলেন। কিন্তু দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, ক্ষমতা দখল, জেলের অভ্যন্তরে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা এবং পুরোপুরি সামরিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগ ভেঙে দেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার পথে হাঁটছিলেন। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে দলের সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তিনি ৬ বছর পর দেশে ফিরে আসেন এবং আওয়ামী লীগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময় সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান অভ্যুত্থানে নিহত হলে দেশের রাজনীতিতে ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি হয়। এরপর সামরিক বাহিনীর প্রধান এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং দেশে পুনরায় সামরিক শাসন জারি হয়।

১৯৯০ সালে সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনের পথে দেশকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। আওয়ামী লীগকে নানা ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে হয়।

সর্বশেষ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। শেখ হাসিনা সরকার গঠন এবং বাংলাদেশকে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের রূপরেখা বাস্তবায়ন শুরু করেন। এই সময়ে দেশ বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে, ডিজিটাল হওয়ার সুযোগ পায়, ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষার নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে থাকে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করে।

২০২১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করে। আগামী ২৫ জুন পদ্মা মহাসেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এ সবই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিশনারি ভিশনারি নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ অর্জন করতে পেরেছে। বঙ্গবন্ধু মেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল এবং আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ৭৩ বছরে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা, উন্নয়ন, আত্মমর্যাদা, গৌরবময় অহংকারের অনেক কিছু দিতে পেরেছে।

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক।

মন্তব্য

মতামত
Lets learn the unitary rules

চলুন, আমরা ঐকিক নিয়ম শিখি!

চলুন, আমরা ঐকিক নিয়ম শিখি!
ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রায় দ্বিগুণ প্রস্থের পদ্মা সেতু তো দুই তলা, মানে এক সেতুর মধ্যে দুইটা সেতু। ওপর তলায় গাড়ি চলবে আর নিচের তলায় চলবে ট্রেন। তো, পণ্ডিত ভাই আপনার ঐকিক নিয়মে খরচের হিসাব এখানে কী হবে? ‘প্রস্থ’ এবং ‘তলা’ হিসাব করলে তো পদ্মা সেতু ভূপেন হাজারিকা সেতুর চার গুণ বড় মনে হচ্ছে।

পণ্ডিত: মূর্খ ভাই দেখেন, ভূপেন হাজারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার আর পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার, কিন্তু পদ্মা সেতুর খরচ ৩০ গুণ বেশি! এটা কোনো কথা হলো? সহজ অঙ্ক! বোঝাই যাচ্ছে চুরি হয়েছে।

মূর্খ: পণ্ডিত ভাই, শুধু ‘দৈর্ঘ্য’ দিয়েই ঐকিক নিয়ম চলে? পদ্মা সেতুর প্রস্থের কী হবে? পদ্মা সেতুর ‘প্রস্থ’ যে ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রায় দ্বিগুণ?

পণ্ডিত: তো কী হয়েছে? ‘প্রস্থ’ দিয়ে ঐকিক নিয়ম চলে না। খরচ শুধু দৈর্ঘের ওপর হয়, প্রস্থের ওপর হয় না!

মূর্খ: আচ্ছা তাহলে, ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রায় দ্বিগুণ প্রস্থের পদ্মা সেতু তো দুই তলা, মানে এক সেতুর মধ্যে দুইটা সেতু। ওপর তলায় গাড়ি চলবে আর নিচের তলায় চলবে ট্রেন। তো, পণ্ডিত ভাই আপনার ঐকিক নিয়মে খরচের হিসাব এখানে কী হবে? ‘প্রস্থ’ এবং ‘তলা’ হিসাব করলে তো পদ্মা সেতু ভূপেন হাজারিকা সেতুর চার গুণ বড় মনে হচ্ছে।

পণ্ডিত: আপনি তো আসলেই মূর্খ দেখি! ঐকিক নিয়মে শুধু দৈর্ঘের হিসাব চলে। বাকি কিছু চলে না।

মূর্খ: পণ্ডিত ভাই, আরেকটা বিষয়, ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ক্যাপাসিটি মাত্র ৬০ টন আর পদ্মা সেতুর পাইল লোড ক্যাপাসিটি ৮ হাজার ২০০ টন। শুধু তা-ই নয়, ভূপেন হাজারিকা সেতুর একেকটি পিলারের ওজন ১২০ টন। আর পদ্মা সেতুর একটি পিলারের ওজন ৫০ হাজার টন। সে হিসাবে ভূপেন হাজারিকা সেতুর চেয়ে পদ্মা সেতু ২৫০ গুণ বেশি ভারী এবং শক্তিশালী। এখানে আপনার ঐকিক নিয়ম কী বলে? তাহলে পদ্মা সেতুর খরচ তো ভূপেন হাজারিকা সেতুর ২৫০ গুণ বেশি হওয়ার কথা, তাই না?

পণ্ডিত: আমার মনে হচ্ছে আপনি শুধু মূর্খই নন, আপনি নিশ্চয়ই শেখ হাসিনার দালাল! আপনি আমার ‘দৈর্ঘ্য’ দিয়ে করা ঐকিক নিয়মের সহজ অঙ্কের মধ্যে ‘প্রস্থ’ ঢোকাচ্ছেন, ‘তলা’ ঢোকাচ্ছেন, ‘ভার বা ওজন’ ঢোকাচ্ছেন। সমস্যা কী আপনার? শুনুন মূর্খ ভাই, ঐকিক নিয়মের অঙ্ক পরিষ্কার: ‘দৈর্ঘ্য’ বেশি তো খরচ বেশি, ‘দৈর্ঘ্য’ কম তো খরচ কম। ‘প্রস্থ’, ‘তলা’, ‘ভার বা ওজন’– এগুলোর কারণে কি খরচ হয়, না খরচ বাড়ে?

মূর্খ: তাহলে আরেকটা কথা বলেন, ভূপেন হাজারিকা সেতুতে তো নদী শাসনে খরচই হয়নি, পদ্মা সেতুতে ১৬ কিলোমিটার পাড়জুড়ে নদী শাসন করতে হয়েছে এবং পদ্মা সেতুর নদী শাসনেই তো ভূপেন হাজারিকা সেতু বানাতে যে খরচ হয়েছে তার চেয়ে ৮ গুণ বেশি খরচ হয়েছে। তো, নদী শাসনের খরচ কি আপনার ঐকিক নিয়মের অঙ্কে আসবে?

পণ্ডিত: নদী শাসন কী জিনিস? নদীকে আবার শাসন করতে হয় নাকি? ইট, বালি, সিমেন্ট আনবেন, নদীতে ফালাবেন আর সেতু বানায়ে ফেলবেন, ভূপেন হাজারিকা সেতু এমনেই বানিয়েছে। এইভাবে ঐকিক নিয়মে সেতু বানালে খরচ এত হতো না, বুঝলেন? নদী শাসন-টাশন এগুলো সব ভুয়া জিনিস।

মূর্খ: পণ্ডিত ভাই, আমি বুঝতে পেরেছি, আপনারা এই ঐকিক নিয়মেই দেশ চালিয়েছিলেন। ঐকিক নিয়মে তো বিদ্যুতের আগেই খাম্বা বানাতে হয়, তাই না? ঐকিক নিয়মে তো বিদ্যুৎ খাতের ২৩ হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ‘শূন্য’, তাই না? যাক, আলহামদুলিল্লাহ! আপনাদের ঐকিক নিয়মটা শেখ হাসিনা শিখেন নাই! শেখ হাসিনা তাহলে পদ্মার ওপর ভূপেন হাজারিকা সেতু বানিয়ে ফেলতেন!

পণ্ডিত: আমরা ঐকিক নিয়মে অঙ্ক করি, ঐকিক নিয়মে চিন্তা করি, ঐকিক নিয়মে কথা বলি। ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে আমাদের খাম্বা লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেব ঐকিক নিয়মেই দেশ চালাবে। আপনি আমাদের ঐকিক নিয়ম নিয়ে এত প্রশ্ন তোলেন কেন? আপনি তো দেখছি দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে চান না! আপনি নিশ্চয়ই শেখ হাসিনার দালাল!

লেখক: মোহাম্মদ এ আরাফাত; চেয়ারম্যান, সুচিন্তা ফাউন্ডেশন

মন্তব্য

মতামত
The history of the budget and the countrys 22 23 fiscal year

বাজেটের ইতিবৃত্ত ও  দেশের ’২২-২৩ অর্থবছরে আলোকপাত

বাজেটের ইতিবৃত্ত ও  দেশের ’২২-২৩ অর্থবছরে আলোকপাত
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ও স্বাধীনতার ৫১তম বাজেটের মধ্যে টাকার অঙ্ক ও সময়ের অনেক ব্যবধান থাকলেও দুটি বাজেটের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন অর্থাৎ বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। আমরা আশাবাদী বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপিত বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারসহ ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি এটাই কামনা উচিত।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা সময়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন করা হয় জুনে, এক বছরের জন্য, যা বছরের পয়লা জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ কার্যকর থাকে। মূলত সরকারের নির্দিষ্ট সময়ের (জুলাই ১ থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন ) দেশের আর্থিক পরিকল্পনার সুষ্ঠু চিত্র প্রতিফিলত হয় বাজেটের মাধ্যমে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৭(১) অনুচ্ছেদে বাজেট শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে সমরূপ শব্দ ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবছর জুনে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সরকারের পক্ষে অর্থমন্ত্রী বাজেট বিল আকারে পেশ করেন। এবারে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য বাজেট পেশ করেছেন জাতীয় সংসদে গতকাল।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা (কোভিড-১৯) পরবর্তী অর্থনৈতিক অভিঘাত সফলভাবে মোকাবিলা করে চলমান উন্নয়ন বজায় রাখা ও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন’। অর্থাৎ এবারের বাজেটে মহামারি করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের আশা ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। মোট বিনিয়োগ ধরা হয়েছে জিডিপির ৩১.৫ শতাংশ যার মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪.৯ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬.৬ শতাংশ। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে আয় ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। সে অনুযায়ী এবারে বাজেটে মোট প্রাক্কলিত আয়ের পরিমাণ বাড়ছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)তে এ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লক্ষ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।

বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ইউক্রেন-রাশিয়ার কারণে বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণসহ উৎপাদন সরবরাহ ঠিক রাখা। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেট হচ্ছে দেশের ৫১তম বাজেট। স্বাধীনতা পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার দেশের প্রথম বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেন জাতীয় নেতা ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একই সঙ্গে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর অর্থাৎ দুই অর্থবছরের বাজেট ১৯৭২ সালের ৩০ জুন ঘোষণা করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রথম বাজেট যা ছিল বিদেশি অনুদান ও ঋণনির্ভর যেটাকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন ‘উন্নয়ন এবং পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন বাজেট’। আর এবার ঘোষিত বাজেট হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের প্রায় ৮৬০ গুণ যার শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন’।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ও স্বাধীনতার ৫১তম বাজেটের মধ্যে টাকার অঙ্ক ও সময়ের অনেক ব্যবধান থাকলেও দুটি বাজেটের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন অর্থাৎ বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। আমরা আশাবাদী বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপিত বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারসহ ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি এটাই কামনা উচিত।

একটি দেশের বাজেট ঘোষণার পর সেটি নিয়ে যেভাবে আলোচনা ও সমালোচনা হয়, বাজেট প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ততটা সহজ নয়। কেননা প্রতিটি দেশের জন্য প্রণীত বাজেটের কাঠামো ও আইনি ভিত্তিও বহুমাত্রিক। প্রতিবছর সংসদে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেন সেই ‘বাজেট’ শব্দের উৎপত্তি নিয়েই রয়েছে বিস্তর বিতর্ক। কেননা ‘বাজেট’ ইংরেজি শব্দ। সাবেক অর্থসচিব ও অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান তার রচিত ‘বাংলাদেশে বাজেট : অর্থনীতি ও রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন- মধ্যযুগের ইংরেজি ‘বুজেট’ (Bougette) থেকে বাজেট শব্দের উৎপত্তি। বুজেট শব্দের অর্থ মানিব্যাগ বা টাকার থলি। বাংলায় থলির সমার্থক বোচকা-পোটলা। তবে, বুজেট এর পরিভাষা এখনও রচিত হয়নি।

বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক অভিধানে উল্লেখ রয়েছে বাংলায় বাজেট শব্দটি ১৯০২ সালে প্রথম ব্যবহার করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাজেটের উৎপত্তি হয়েছে আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৩শ বছর আগে। ১৭২৫ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত রবার্ট ওয়ালপুল যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী এবং কার্যত প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি সারা বছরই কর কমানো বা কর বাতিলের দাবি পেতেন।

এসব তিনি একটি ‘বুজেটে’ বা মানিব্যাগে ভরে রাখতেন। অর্থবছরের শেষদিকে যখন বাজেট তৈরির কাজ শুরু হতো, তখন তিনি কাগজগুলোর ভিত্তিতে আয়-ব্যয়ের হিসাব দাঁড় করাতেন। মানে বাজেট প্রণয়ন করতেন। সেই থেকে ‘টাকার থলি বা বাজেট’ হয়ে গেছে সরকারের বার্ষিক হিসাব-নিকাশের প্রতিশব্দ। সুতারং ইতিহাস বলে, বাজেট-ব্যবস্থার উৎপত্তি মানিব্যাগ থেকে। শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের অর্থনীতি অনেক বড় হয়। ফলে বাজেট-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাড়তে থাকে। এত বেশি দাবি আসে যে, এসব প্রস্তাব শুধু একটি মানিব্যাগে সংকুলান সম্ভব হয় না। ফলে মানিব্যাগের জায়গায় আসে ব্রিফকেস। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী সংসদের বাজেট অধিবেশনে ব্রিফকেস নিয়ে যান এবং ব্রিফকেসের ভেতর থাকে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার কপি।

বাজেট হচ্ছে একটি দেশের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব। সরকারকে দেশ চালাতে হয়, সরকারের হয়ে যারা কাজ করেন তাদের বেতন দিতে হয়, আবার নাগরিকদের উন্নয়নের জন্য রাস্তাঘাট বানানোসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নিতে হয়। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে কোথায় কত ব্যয় হবে, সেই পরিকল্পনার নামই বাজেট।

মহান জাতীয় সংসদে প্রতিবছর জুনে অর্থমন্ত্রী বিল আকারে যে বাজেট উপস্থাপন করেন তার আইনি ভিত্তি হচ্ছে মূলত বাংলাদেশের সংবিধান। সংবিধানের ৮৭ (১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে- “প্রত্যেক অর্থ-বৎসর সম্পর্কে উক্ত বৎসরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়-সংবলিত একটি বিবৃতি (এই ভাগে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ বা Annual Financial Statement নামে অভিহিত)।” অর্থাৎ সংবিধানে স্পষ্টভাবে বাজেট শব্দটি উল্লেখ নেই আছে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’। মূলত এই বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিই ‘বাজেট’ নামে অভিহিত। সংবিধানের পঞ্চম ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আওতায় ৮১ থেকে ৯৩ নম্বর অনুচ্ছেদে সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ভিত্তি বর্ণিত আছে। তাছাড়া সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “অর্থ-বৎসর” অর্থাৎ জুলাই মাসের প্রথম দিবসে অর্থ বৎসরের আরম্ভ।

বাংলাদেশের সংসদে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেন তার রীতি বর্ণিত আছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি’তে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ষোড়শ অধ্যায়ে “আর্থিক বিষয়াবলী সংক্রান্ত কার্যপদ্ধতি” শিরোনামে বাজেট, মঞ্জুরি-দাবি, নির্দিষ্টকরণ বিল, সম্পূরক ও অতিরিক্ত মঞ্জুরি এবং ঋণের ওপর ভোট, ছাঁটাই প্রস্তাব, প্রস্তাবের ওপর আলোচনা, আলোচনার জন্য স্পিকার বরাদ্দকৃত সময় ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১১১(১) বিধিতে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিকে ‘বাজেট’ নামে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১১১(২) বিধিতে বলা হয়েছে, “এই ব্যাপারে সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে অর্থমন্ত্রী যেরূপ উপযোগী মনে করেন, সেই আকারে বাজেট সংসদে পেশ করিবেন।”

১৯৭২ সাল থেকে সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হলেও ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট কোনো আইন ছিল না। যার ফলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রিত হতো মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রণীত বিধির মাধ্যমে। ২০০৯ সালে সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদের বিধান সাপেক্ষে বাংলাদেশে প্রণীত হয় ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯’। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়: ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯’; সচিবালয় নির্দেশমালা-২০১৪; রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬; জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস ইত্যাদির বিধি-বিধান মোতাবেক। সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক ‘রাষ্ট্রপতির সুপারিশ’ নিয়ে ‘সংসদে উত্থাপন করা’ হয় অর্থ বিভাগ হতে প্রণীত প্রস্তাবিত বাজেট। অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট বিল আকারে উপস্থাপনের পর উত্থাপিত বাজেট নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়, সংসদে তর্ক হয় ও বিতর্ক হয়।

সংসদে উত্থাপিত অর্থবিল সংসদ সদস্যদের অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হয় এবং তা পরবর্তী অর্থবছরের জন্য কার্যকর হয়। বাংলাদেশে প্রণীত বাজেটের অংশ থাকে মূলত তিনটি: যার প্রথম ভাগে থাকে আয়ের হিসাব। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বাজেটের সরকারের সম্ভাব্য আয়ের হিসাব থাকে। সরকারের সম্ভাব্য আয়ের উৎস আবার তিনটি। যথা- জনগণ প্রদেয় কর (এনবিআর ও অন্যান্য সংস্থার আদায়কৃত কর); কর বহির্ভূত আয় (ফি, লভ্যাংশ, অর্থদণ্ড, জরিমানা ইত্যাদি) এবং বৈদেশিক অনুদান।

বাংলাদেশে প্রণীত বাজেটের দ্বিতীয় ভাগে থাকে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব। বাজেটের সম্ভাব্য ব্যয় চারটি ভিন্ন খাতে বিভক্ত করা হয়: পরিচালন ব্যয়; খাদ্য হিসাবে ক্রয়; ঋণ ও অগ্রিমবাবদ পরিশোধ এবং উন্নয়ন ব্যয়। বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য দরকার আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব। ড. আকবর আলি খান তার ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ উল্লেখ করেছেন ‘‘আমরা যেমন দেখি, ‘যদি সঠিক আয়ের হিসাবে বাজেটের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়, তাহলে অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব হবে’।

বাজেটের তৃতীয় ভাগে থাকে সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে বাজেটকে বলা হয় ‘ঘাটতি বাজেট’। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সব বাজেটই ছিল ‘ঘাটতি বাজেট’। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে কিছুটা ঘাটতি থাকা ভালো কেননা এতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে এবং অর্থনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এবারে প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫.৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি যা ছিল জিডিপির ৬.২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি বাজেট মেনে নেয়া হয়। বাজেট-ঘাটতি দুভাবে পূরণ করা হয়। যেমন, বৈদেশিক উৎস; এটি মূলত বৈদেশিক ঋণ। সরকার বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশ থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়। এই উৎস থেকে বেশি ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে পারলে তা অর্থনীতির জন্য বেশি সহনীয়। কারণ, এতে সুদ হার কম এবং পরিশোধ করতে অনেক সময় পাওয়া যায়। তবে শর্ত থাকে বেশি। অভ্যন্তরীণ উৎস সরকার দুভাবে দেশের ভেতর থেকে ঋণ নেয়। যেমন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা। ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা হচ্ছে সঞ্চয়পত্র। ‘ঘাটতি বাজেট’ নেতিবাচক শোনালেও এটা বরং উন্নয়ন সহায়ক।

আইএমএফের তথ্যমতে, কাতার, লুক্সেমবার্গ, উজবেকিস্তান ইত্যাদি পেট্রো-ডলারে সমৃদ্ধ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ‘ঘাটতি বাজেট’ দেয়া হয়।

দেশে দেশে বাজেট উপস্থাপনের নানা ঐতিহ্য রয়েছে। সব দেশেই অর্থমন্ত্রীদের ব্রিফকেস সঙ্গে নিয়ে সংসদে বাজেট ঘোষণার রেওয়াজ দেখা যায়। তবে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন তার প্রথম বাজেটটি ঘোষণার সময় ব্রিফকেসের পরিবর্তে লালসালুতে মোড়া বাজেট ডকুমেন্ট সঙ্গে নিয়ে সংসদে ঢুকেছিলেন। দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যের লাল শাড়ির সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে ওই বছরের বাজেট ডকুমেন্ট সাজিয়েছিলেন তিনি। কানাডায় ১৯৫০ সাল থেকে সে দেশের অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশের আগের দিন নতুন জুতা কেনেন। সেই নতুন জুতা পায়ে দিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে যান, বাজেট পেশ করেন।

কানাডার ইতিহাসে প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড এ বছর জুতা কিনেছেন মোড়ের দোকান থেকে। করোনা আক্রান্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রণোদনার প্রতীক হিসেবে। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের বাজেটের প্রতীক হলো ‘ব্রিফকেস’। আর এই ব্রিফকেসটি কেনা হয় অর্থ বিভাগের সেবা শাখার মাধ্যমে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৭.০৫ শতাংশ; এর মধ্যে মানবসম্পদ খাতে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাত) বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। ভৌত অবকাঠামো খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৮৬০ কোটি টাকা বা ২৯.৬২ শতাংশ; যার মধ্যে সার্বিক কৃষি ও পল্লি উন্নয়ন খাতে ৮৬ হাজার ৭৯৮ কোটি; যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ৭৯ হাজার ২৬ কোটি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৬ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২০৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২২.৫৯ শতাংশ।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য ব্যয়বাবদ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭.৮৪ শতাংশ; সুদ পরিশোধ-বাবদ প্রস্তাব করা হয়েছে ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১১.৮৫ শতাংশ; নিট ঋণদান ও অন্যান্য ব্যয় খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৭ হাজার ৪১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১.০৪ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কৃষি, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫১তম বাজেটের শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন’ এবং বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে সরকারের অতীতের অর্জন এবং উদ্ভূত বর্তমান করোনা ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে। এছাড়া আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন করা হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু যা দেশের জিডিপিতে ১ শতাংশের বেশি অবদান রাখবে মর্মে অর্থনীতিবিদেরা মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতারং আমরা আশাবাদী যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশে যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে তার ধারা অব্যাহতসহ আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করার পদক্ষেপের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাব প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যেমে।

লেখক: উপসচিব ও কনসালটেন্ট, এটুআই প্রজেক্ট, ঢাকা

আরও পড়ুন:
বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী
মূল্যস্ফীতি ৫.৬ শতাংশে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়: সিপিডি
প্রস্তাবিত বাজেট বিনিয়োগবান্ধব: চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি
পাচার টাকা দেশে আনার উদ্যোগ অনৈতিক: সিপিডি
প্রস্তাবিত বাজেট ‘জনগণের জীবনমান পরিবর্তনমুখী’

মন্তব্য

মতামত
Flood and drinking water of Sylhet

সিলেটের বন্যা ও সুপেয় পানি

সিলেটের বন্যা ও সুপেয় পানি
দেশের যেকোনো সংকটময় সময়ে নানা মতের মানুষ এগিয়ে আসেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বন্যার্ত সিলেটবাসীর পাশে দাঁড়ানোর তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি না। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও এগিয়ে আসতে পারে। পানি বিশুদ্ধকরণে এসব ধাপ অনুসরণ করে একে একে নলকূপগুলো থেকে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার উপায় তো নিশ্চিত করতে পারে।

সিলেটের বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। সুরমা, কুশিয়ারা, ধলাই ও পিয়াইন নদীর পানি কমতে শুরু করায় ধীরে ধীরে বন্যার পানিও কমছে। আকস্মিক বন্যায় জেলার প্রায় পনেরোটি উপজেলা প্লাবিত হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দশ থেকে বারো লাখ মানুষ ছিল পানিবন্দি।

বন্যায় পানিবন্দি মানুষের অস্থায়ী দুর্ভোগ পোহাতে হয় দুই সময়। যখন বন্যায় পানিবন্দি থাকতে হয়, তখন এক ধরনের দুর্ভোগ। পানিবন্দি অবস্থায় অনেকের ঘরের ভিতর পানি ঢুকে পড়েছিল। হাঁটুপানি, কোমরপানি, গলা সমান পানি। কোনো কোনো জায়গায় ঘরবাড়ি ডুবে যায় পুরোপুরি। মানুষ অস্থায়ী মাচা বানিয়ে কিংবা বাড়ির ছাদে কোনো রকমে দুঃসহ সময় কাটিয়েছেন। ওদিকে তখন আবার বৃষ্টিও হয় কয়েকদিন। দুর্ভোগের ওপর আরও দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন বন্যার্তরা। তার ওপর ছিল ছিঁচকে চোর-ছিনতাইকারীর উপদ্রব।

সিলেটের বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ সেই অসহায় অবস্থা পেরিয়ে এসেছেন। এতদিনে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। কিছু জায়গায় পুরোপুরি নেমেও গিয়েছে।

বন্যার পানি নামার পর শুরু হয় দুর্ভোগের দ্বিতীয়পর্যায়। বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। সঙ্গে আছে খাবার সংকট, ঘরবাড়ি মেরামত সংকট, সেনিটেশন সংকট। যে কারণে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরেও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় মারাত্মকভাবে। ঘরে থাকা খাবারের মজুদ অনেক আগেই অনেকের ফুরিয়ে গিয়েছে। এ সময় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করা এবং তা সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা করা জরুরি। তারচেয়েও জরুরি বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা।

যদিও চারধারে কেবল পানি আর পানি। বিখ্যাত ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দি অ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনার’ কবিতার মতো- ওয়াটার ওয়াটার এভরিহয়ার অ্যান্ড নট আ ড্রপ টু ড্রিঙ্ক।

বন্যার্তদের চারপাশে কেবল পানি আর পানি। কিন্তু এক ফোঁটাও পানযোগ্য বিশুদ্ধ পানি নেই। বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়।

বন্যার পর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমনিতেই ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু ভেঙে পড়ার আগেই যদি হাল ধরা না যায়, তবে সেটা মারাত্মক আকার ধারণ করে। এমনকি বন্যায় যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে।

সিলেটের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সুপেয় পানির উৎস্য প্রধানত দুটো। গভীর নলকূপ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা খাবার পানি। কিন্তু এই বন্যায় প্রায় ১২ হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জকিগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় সাড়ে ছয় হাজার মিটার পানি সরবরাহের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৭৮ হাজার শৌচাগারও ক্ষতিগ্রস্ত। সিলেটের জনস্বাস্ব্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতে, সবমিলিয়ে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা।

বিশুদ্ধ পানির সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ নিয়েছে সিলেটের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। মোবাইল ওটায়ার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। জেলার কানাইঘাট, কোম্পানিগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় এ কাজ চলছে। ট্রিটমেন্ট প্লান্টে ঘণ্টায় ৬০০ লিটার পানি পরিশোধন করে গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানি বিতরণ করা হচ্ছে।

এর বাইরে জেলার বন্যাকবলিত এলাকায় ছয় লাখ ৬৩ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও দশ লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এক হাজার ৪০০টি পানির জার ও ৯০০ বালতিও বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণ করেছে বলে জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

এদিকে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বন্যার পানি থেকে জেগে ওঠা নলকূপ জীবাণুমুক্ত করার জন্য একটি পরামর্শ দিয়েছে। আটটি ধাপের এ পরামর্শ হচ্ছে- ধাপ ১: ১২ থেকে ১৫ লিটার পানি একটি বালতিতে নিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার ভালোভাবে মেশাতে হবে।

ধাপ ২: একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মিশ্রণ ছেঁকে নিতে হবে। অথবা মিশ্রণটি স্থির না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

ধাপ ৩: নলকূপের পাম্পের হাতল ও প্লাঞ্জার রড পাম্প থেকে উঠিয়ে ফেলতে হবে।

ধাপ ৪: মিশ্রণের অর্ধেক পানি পাম্পের ভিতর ঢালতে হবে।

ধাপ ৫: হাতল ও প্লাঞ্জার রড ভালোভাবে পরিষ্কার করে ময়লা ও কাদা সরিয়ে ফেলতে হবে।

ধাপ ৬: হাতল ও প্লাঞ্জার রড আবার স্থাপন করতে হবে। এবং ঘোলা পানি দূর না হওয়া পর্যন্ত পাম্প করে যেতে হবে।

ধাপ ৭: পাম্প করে পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার পর অবশিষ্ট মিশ্রণ পাম্পের ভিতর ঢালতে হবে এবং ব্লিচিং পাউডার বা ক্লোরিনের গন্ধ থাকা পর্যন্ত পাম্প করতে হবে।

ধাপ ৮: নলকূপের আশেপাশ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

কথা হলো, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সব মানুষের পক্ষে কি এসব ধাপ অনুসরণ করে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা সম্ভব? বিভিন্ন কারণে এটা সবসময় সম্ভব হয় না। আর সে কারণেই শুধু ধাপের উল্লেখ করে বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সব এলাকায় পানি বিশুদ্ধ করার জন্য এসব উপকরণ সহজলভ্য না-ও হতে পারে।

দেশের যেকোনো সংকটময় সময়ে নানা মতের মানুষ এগিয়ে আসেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বন্যার্ত সিলেটবাসীর পাশে দাঁড়ানোর তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি না। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও এগিয়ে আসতে পারে। পানি বিশুদ্ধকরণে এসব ধাপ অনুসরণ করে একে একে নলকূপগুলো থেকে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার উপায় তো নিশ্চিত করতে পারে। তাতেও বন্যার্ত সিলেটবাসী উপকৃত হবে। অন্তত খাবার পানির সংকট তো কাটবে!

লেখক: শিশু সাহিত্যিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বন্যায় বেশি ক্ষতি সড়ক-কৃষি-মাছের
বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ার নির্দেশ অধ্যক্ষের!
সিলেটে কমছে পানি, বাড়ছে রোগ
পানি কমছে, বাড়ছে ডায়রিয়া ও চর্মরোগ
সিলেটের নতুন দুর্ভোগ পানির দুর্গন্ধ

মন্তব্য

মতামত
May victory be fearless

জয় হোক অভয়ের

জয় হোক অভয়ের
আদর্শিক বিরোধের কারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানকে নির্মূল চেষ্টার এমন পাশবিক ঘটনা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। শেখ হাসিনা বারবার বুলেট ও গ্রেনেডের মুখ থেকে বেঁচে ফেরা এক বহ্নিশিখা। তিনি মানবতার জননী।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যা সম্পূর্ণ করতে পারেনি, সেটাই বার বার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি। সেই ’৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকেই ঘাতকের নিশানায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। নানা সময়ে নানাস্থানে তাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। কখনও সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, কখনও বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং তাদের অনুসারীদের মদদে কখনওবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী গোষ্ঠীর ইন্ধনে ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। প্রতিটি ষড়যন্ত্রের পর রাজনৈতিক যোগসূত্র মিলে যায় ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারি দলগুলোর কার্যক্রমের সঙ্গে। কোনো কোনো হত্যাচেষ্টায় আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ‘শত্রুর শত্রু, সে আমার মিত্র’ এই আদর্শে ঘাতকদের পক্ষ নিয়েছিল। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নানা সময়ে এই পর্যন্ত ২১ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টায় তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড-বোমা ও গুলির হামলা হয়েছে।

হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে প্রকাশ্যে দুবার, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে চারবার, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চারবার, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকার আমলে চারবার, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবার ও আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক সময়ে চারবার হত্যাচেষ্টার কথা জানা যায়। খোদ, ঢাকাতেই শেখ হাসিনার ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয় কয়েকবার। শুধু তাই নয়, দেশের বাইরেও তাকে একাধিকবার হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে। ঘাতকদের ষড়যন্ত্র এখনও তাড়া করে ফিরছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে। প্রতিটি হামলায় হত্যাকারীদের মূল টার্গেট শেখ হাসিনা। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বার বার বুলেট-বোমা তাড়া করে বেড়ায় তাকে? কেন বার বার হত্যাকারীদের মূল টার্গেট শেখ হাসিনা? এসব হামলার ঘটনায় ৬৬ দলীয় নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে। আহত কয়েক হাজার। পঙ্গুত্ববরণ করেছে শত শত নেতা-কর্মী।

প্রথমবার হামলা হয় ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। এই হামলায় ২৮ নেতাকর্মী প্রাণ হারান। দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার জীবন বাঁচাতে মানববর্ম তৈরি করে ৯ নেতাকর্মী আত্মাহুতি দেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি নীলনকশা আর জঙ্গিবাদ উত্থানের ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন; নিহত হন আওয়ামী মহিলা লীগের নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছিল। মহান সৃষ্টিকর্তার পরম কৃপায় এই হত্যাচেষ্টার ঘটনাগুলো ব্যর্থ হয়।

২০০১ সালের ৩০ মে তেমনি একটি দিন। সেদিন খুলনার রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ঘাতকচক্র সেখানে একটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখে। পরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হরকাতুল জিহাদ। অনুষ্ঠানের তিন দিন আগে ২৭ মে সেতুর কাছাকাছি রূপসা নদীতে দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ১৫ জঙ্গি ধরা পড়ে। তাদের লক্ষ্য ছিল ৩০ মের অনুষ্ঠান। গোয়েন্দা তৎপরতায় ঘাতকের সেই মিশনও সফল হয়নি। ১৫ জনের একজন মাসুম বিল্লাহ ওরফে মুফতি মইন ঢাকায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় অংশ নেয়। গ্রেপ্তারকৃতদের ভাষ্যে- কোটালীপাড়ায় হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা খুলনায় রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। বিস্ফোরণের আগেই বোমাটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় গোয়েন্দা পুলিশ।

একই সময় গ্রেপ্তার হওয়া অপর জঙ্গি কুতুবউদ্দিন ওরফে বাবুর বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কেষ্টপুরে। ২১ আগস্ট হামলা মামলার সে দুই নম্বর আসামি এবং হুজির আঞ্চলিক নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল ও মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়েরের ঘনিষ্ঠজন। উল্লেখ্য, এর আগে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায়। একই বছর সিলেটেও শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল জঙ্গিগোষ্ঠী। সাজাপ্রাপ্ত হুজির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা মুফতি হান্নান স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। ওই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে কোটালিপাড়া, খুলনা ও সিলেটে হামলা।

খুলনার রূপসা সেতুর ঘটনার পর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের কাছ থেকে সেনাবাহিনীর পোশাক, বুট ও বিভিন্ন কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারদের ভাষ্য ও এসব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনাকারী সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ও অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার পরিকল্পনা জঙ্গিদের হলেও তাদের পরোক্ষ সহযোগিতায় ছিল সরকারবিরোধী স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু নেতাকর্মী।

বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদে কেউ কেউ স্বীকার করেছে, তারা শেখ হাসিনাকে ইসলামের শত্রু মনে করে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে ইসলামের অনেক ক্ষতি করেছে, তাই হুজির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনাকে হত্যা করা।

এরকম বাস্তবতায় তথা ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও জঙ্গিবাদ আশঙ্কার মধ্যেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাপী এক বিস্ময়ের নাম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি-সন্ত্রাস-জটিলতার মধ্যেও পাল্টে যাচ্ছে দেশের চিত্র। কোনো চক্রান্ত্রই থামাতে পারছে না শেখ হাসিনার উন্নয়নরথ। তার হাত ধরে নির্মিত হচ্ছে আজকের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আজ- ইজ অ্যা মিরাকল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের ভাষায়- ‘উন্নয়নের দিক থেকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। কোনো কোনো সূচকে ভারত থেকেও এগিয়ে।’

সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে শেখ হাসিনা জাতিকে ঐতিহাসিক দায়মুক্তি দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি ও একাত্তরের ঘাতকদের বিচার সম্পন্ন করে জাতির কলঙ্কমোচন করেছেন। স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ বাস্তব, চারলেন মহাসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল, এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রাজধানীর চারপাশে স্যুয়ারেজ ট্যানেল নির্মাণের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা-জ্বালানি, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন।

সহজ করে বললে, বঙ্গবন্ধু ভৌগোলিক মুক্তি দিয়ে গেলেও এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি শেখ হাসিনার হাত ধরেই হচ্ছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে, হচ্ছে শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন বলেই। কোনো ষড়যন্ত্রই দমাতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে।

একাত্তরের পরাজিত শক্তি এখনও ওঁৎপেতে আছে প্রতিশোধের। পঁচাত্তরের ঘাতকবাহিনী, যারা হত্যা করেছে পিতা-মাতা-ভাইসহ স্বজনদের, তারা চায় শেখ হাসিনার বিনাশ। তাকে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তানি ধারায় দেশ ফিরিয়ে নিতে চায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর দেশটাকে তারা পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব সেখান থেকে আজকের রূপে এনেছে স্বাধীনতার স্বপ্নবাহী পথে। সেই পথ অনেক চড়াই-উৎরাই। সেসব পথ মাড়িয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন।

আদর্শিক বিরোধের কারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানকে নির্মূল চেষ্টার এমন পাশবিক ঘটনা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। শেখ হাসিনা বারবার বুলেট ও গ্রেনেডের মুখ থেকে বেঁচে ফেরা এক বহ্নিশিখা। তিনি মানবতার জননী। বাঙালির আশার বাতিঘর। তিনি তার জীবনকে বাংলার মেহনতি দুঃখী মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে এগিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ব মানবতার দিকে দুর্বার গতিতে। গণমানুষের কল্যাণই তার রাজনীতির মূল দর্শন।

১৯৮১ সালের শুরুতে দলের দায়িত্ব নিয়ে দলকে তিনি শুধু চারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ই আনেননি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে যেমনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি উদার, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি এখন তিনি। তার হাতে বাঙালি রাষ্ট্র ও বাঙালির সংস্কৃতি নিরাপদ।

জঙ্গিবাদকে নির্মূল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই। আর এ কারণেই তার নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য বার বার তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে ঘাতকচক্র। কিন্তু জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত তিনি অপ্রতিরোধ্য অদম্য বাংলাদেশ গড়ে তুলছেন। কোনো ভয়-ভীতি তাকে কাবু করতে পারে না। জাতিকে তিনি অভয়মাঝে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ। জয় হোক অভয়ের।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
তিনি ফিরলেন সব হারানোর দেশে
শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন বলেই দেশ এগিয়েছে
শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার দিন আজ
প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা সোমবার
এ দিন বিশ্ববাসীর সামনে প্রথম পিতা হত্যার বিচারের দাবি তোলেন শেখ রেহানা

মন্তব্য

p
উপরে