× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট

মতামত
The Julio Curie Medal takes the country to unique heights
hear-news
player
print-icon

জুলিও কুরি পদক দেশকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়

জুলিও-কুরি-পদক-দেশকে-অনন্য-উচ্চতায়-পৌঁছে-দেয়
১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই পদকপ্রাপ্ত ৪৮তম রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে ১৪০টি দেশের ২০০ প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধুকে এই বিরল সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিলে ১৯৭৩-এর ২৩ মে ২৩তম এশীয় শান্তি সম্মেলনের এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে সেই পদক পরিয়ে দিয়েছিলেন সংস্থার সে সময়ের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র। অনুষ্ঠানে রমেশ চন্দ্র বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার মহানায়ক নন, তিনি সারা বিশ্বের, বিধায় বিশ্ববন্ধু।’

২৩ মে যে আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে একটি অতি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, সে কথাটি আজ অনেকেরই স্মৃতির অন্তরালে চলে গেছে। অথচ ১৯৭৩ সালের সেই দিনটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মাননা পদক। পঞ্চাশের দশকে শান্তির জন্য নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক জোলিও এবং তার স্ত্রী ইরেন কুরির নাম অনুসারে ১৯৫৯ সালে বিশ্ব শান্তি পরিষদ তাদের শান্তির জন্য প্রদেয় পদকের নামকরণ করেন এই বিজ্ঞানী দম্পতির নামে, ১৯৫৮ সালে ফ্রেডেরিক জোলিওর প্রয়াণের পর। উভয়ে যৌথভাবে নোবেল বিজয়ী এই দম্পতি শুধু বিজ্ঞান চর্চাই অবদান রাখেননি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে গোটা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেন। ফ্রেডেরিকের একান্ত প্রচেষ্টায় গঠিত এই বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রথম সভাপতি তিনি নিজেই ছিলেন।

এই দম্পতি নোবেলপ্রাপ্তির সঙ্গে যে অর্থ পেয়েছিলেন, তা দিয়েই বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তিদের পদক প্রদান শুরু হয় ১৯৫০ সাল থেকে, যা ১৯৫৮ সালে ফ্রেডেরিকের মৃত্যুর পরও চলতে থাকে। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যেসব মহান ব্যক্তির হাতে এ পদক দেয়া হয় তাদের মধ্যে ছিলেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ভিয়েতনাম মুক্তির নায়ক হো চি মিন, চিলির সালভাদর আয়েন্দে, ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত প্রমুখ। এরা সবাই সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছিলেন।

১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই পদকপ্রাপ্ত ৪৮তম রাষ্ট্রনায়ক। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে ১৪০টি দেশের ২০০ প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধুকে এই বিরল সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিলে ১৯৭৩-এর ২৩ মে ২৩তম এশীয় শান্তি সম্মেলনের এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে সেই পদক পরিয়ে দিয়েছিলেন সংস্থার সে সময়ের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র। অনুষ্ঠানে রমেশ চন্দ্র বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলার মহানায়ক নন, তিনি সারা বিশ্বের, বিধায় বিশ্ববন্ধু।’ এভাবেই একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানেই বঙ্গবন্ধু বিশ্ববন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের পর এই পদককে দ্বিতীয় শীর্ষ আন্তর্জাতিক পদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর সেই বিরল সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা, ঠিক আমাদের স্বাধীনতার পর পরই, যা জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থানকে অনেক গৌরবময় করে তুলেছিল।

বঙ্গবন্ধুকে এ পদক প্রদানের জন্য শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার নেতৃত্বের কথাই বিবেচনায় নেয়া হয়নি, বিশ্ব সভাগুলোয় গোটা মানবজাতির জন্য তার ভাষণ এবং অবদানের কথাও বিবেচনায় আনা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে, ১৯৭৩-এ জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে এবং কমনওয়েলথ সম্মেলনে তার ভাষণগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করেছিল শান্তি পরিষদ।

এসব আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত, যথা শাসক এবং শোষিতের মধ্যে, আর তিনি শোষিতের পক্ষে। বঙ্গবন্ধুর সেই মন্তব্য তাকে এক বিশেষ গুরুত্ববাহী দার্শনিকের পর্যায়ভুক্ত করে দিয়েছিল। তিনি শুধু কথার মধ্যেই তার প্রচেষ্টা সীমিত রাখেননি, তার নীতির প্রতিফলন ঘটিয়ে ছিলেন মুক্তিকামী ফিলিস্তিনি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোর জনগণকে সমর্থন প্রদান করে। আগে ভিয়েতনাম যুদ্ধেও তিনি সে দেশের যুদ্ধরত জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

১৯৪৫ সালে ভারত বিভাগের আগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সময়, যাতে বঙ্গভূমিতে কমবেশি ১০ লাখ লোক অনাহারে মৃত্যুবরণ করে, তখন ছাত্রনেতা শেখ মুজিবের ভূমিকা ছিল অসাধারণ, যা বহু রাজনৈতিক নেতাও করতে পারেননি। সিভিল সাপ্লাই-মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন ভারতের অন্যান্য এলাকা থেকে খাদ্য আনতে। তিনি নিজ উদ্যোগে অনেক লঙ্গরখানা খুলে বহু বুভুক্ষু মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে পেরেছিলেন। নিজের লেখাপড়াকে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেছেন দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত মানুষের পক্ষে।

সোহরাওয়ার্দী সে সময়ের তরুণ শেখ মুজিবের ভূমিকা দেখে অবাক হয়েছিলেন। একই ধরনের বলিষ্ঠতা নিয়ে তিনি ১৯৪৫-এ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সে সময়ে দ্বিজাতিতত্ত্বের নামে যে হত্যাযজ্ঞের উদ্ভব হয়েছিল, তা প্রতিরোধ করতে; তখনও তিনি লেখাপড়া বাদ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সাম্প্রদায়িক দস্যুদের প্রতিহত করার লক্ষ্যে। তিনি এমনকি বাংলাভূমির বাইরেও বিচরণ করেছেন দাঙ্গা বন্ধের উদ্দেশ্যে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর বহুদিন সোহরাওয়ার্দী পশ্চিম বাংলায়ই থেকে গিয়েছিলেন, জিন্না-লিয়াকত আলি-নাজিমুদ্দিন গংয়ের ষড়যন্ত্রের ভিকটিম হয়ে। তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবও বহু সময় পাকিস্তান আসেননি। একসময় তিনি সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে পাকিস্তান যাওয়ার পরামর্শ দিলে সোহরাওয়ার্দী সাহেব তার অনিচ্ছা প্রকাশ করে বরং তরুণ নেতা শেখ মুজিবকে বলেছিলেন পূর্ব বাংলায় চলে গিয়ে সেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধে ভূমিকা রাখতে। বলেছিলেন, হিন্দুরা যেন পূর্ব বাংলা ছেড়ে ভারতে পাড়ি না জমায় সেদিকে খেয়াল রাখতে।

ভারত বিভাগের পর তিনি অন্তত দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা ভাষণ দিয়েছিলেন। এর একটি ছিল ১৯৫২ সালে চীনে অনুষ্ঠিত ‘পিস কনফারেন্স অফ দ্য এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিওনাল’ আর অন্যটি ছিল ১৯৫৬ সালের এপ্রিলে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি পরিষদের সম্মেলন। স্টকহোম সম্মেলনে সবার দৃষ্টি কেড়ে এই তরুণ নেতা বলেছিলে- ‘বিশ্ব শান্তি আমার জীবনের মূল নীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত এবং স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই হোক না কেন, তাদের সঙ্গে আমি রয়েছি, আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’

তখন সবার মুখেই একটি বাক্য প্রতিধ্বনিত হয়েছে, তা ছিল এই যে লর্ড বার্ট্রান্ড রাসেলের পর এ ধরনের ভাষণ আর কেউ দেননি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি আমলের সিয়াটো-চুক্তি বর্জন করে জোট নিরপেক্ষ নীতির পথ ধরেছিলেন। বিশ্ব তখন একদিকে ন্যাটো, সিয়াটো, সেন্টো নামক তিনটি মার্কিন প্রভাবিত শিবির এবং অপরদিকে ওয়ারস নামক সোভিয়েত ব্লকের চুক্তিতে বিভক্ত ছিল। এদের কাজ ছিল বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রসহ আরও অধিক সমরাস্ত্র উৎপাদন করে বিশ্বে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।

বঙ্গবন্ধু সমরাস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধ করে, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার থামিয়ে বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদনে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে, শান্তিকামী মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। যে কারণে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সে সময়ের বিশ্বকাঁপানো নেতৃবৃন্দ, যথা ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ইন্দিরা গান্ধী, নায়ারেয়ার, মার্শাল টিটো, বুমেদিন, ইয়াসির আরাফাত প্রমুখের চোখের মধ্যমণিতে পরিণত হয়েছিলেন। নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির জন্য তার দাবি সবার কানে পৌঁছেছিল।

যে ব্যক্তি বিশ্ব মানবতার বিজয়ের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন, জোলিও কুরি পুরস্কার তার অবশ্যই প্রাপ্য ছিল। বেঁচে থাকলে তিনি নোবেলও পেতে পারতেন, অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বিরোধিতা করত।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।

আরও পড়ুন:
গৌতম ঘোষের ক্যামেরায় কথা বলবেন শেখ হাসিনা
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করবে সশস্ত্র বাহিনী
এ দিন বিশ্ববাসীর সামনে প্রথম পিতা হত্যার বিচারের দাবি তোলেন শেখ রেহানা
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ইইডির প্রধান প্রকৌশলীর শ্রদ্ধা
সব ইউপিতে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপনের নির্দেশ

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
The history of the budget and the countrys 22 23 fiscal year

বাজেটের ইতিবৃত্ত ও  দেশের ’২২-২৩ অর্থবছরে আলোকপাত

বাজেটের ইতিবৃত্ত ও  দেশের ’২২-২৩ অর্থবছরে আলোকপাত
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ও স্বাধীনতার ৫১তম বাজেটের মধ্যে টাকার অঙ্ক ও সময়ের অনেক ব্যবধান থাকলেও দুটি বাজেটের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন অর্থাৎ বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। আমরা আশাবাদী বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপিত বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারসহ ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি এটাই কামনা উচিত।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা সময়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন করা হয় জুনে, এক বছরের জন্য, যা বছরের পয়লা জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ কার্যকর থাকে। মূলত সরকারের নির্দিষ্ট সময়ের (জুলাই ১ থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন ) দেশের আর্থিক পরিকল্পনার সুষ্ঠু চিত্র প্রতিফিলত হয় বাজেটের মাধ্যমে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৮৭(১) অনুচ্ছেদে বাজেট শব্দটি ব্যবহারের পরিবর্তে সমরূপ শব্দ ‘বার্ষিক আর্থিক বিবরণী’ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবছর জুনে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সরকারের পক্ষে অর্থমন্ত্রী বাজেট বিল আকারে পেশ করেন। এবারে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য বাজেট পেশ করেছেন জাতীয় সংসদে গতকাল।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা (কোভিড-১৯) পরবর্তী অর্থনৈতিক অভিঘাত সফলভাবে মোকাবিলা করে চলমান উন্নয়ন বজায় রাখা ও উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটের শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন’। অর্থাৎ এবারের বাজেটে মহামারি করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের আশা ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। মোট বিনিয়োগ ধরা হয়েছে জিডিপির ৩১.৫ শতাংশ যার মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪.৯ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬.৬ শতাংশ। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে আয় ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। সে অনুযায়ী এবারে বাজেটে মোট প্রাক্কলিত আয়ের পরিমাণ বাড়ছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)তে এ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লক্ষ ৪৬ হাজার ৬৬ কোটি টাকা।

বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ইউক্রেন-রাশিয়ার কারণে বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণসহ উৎপাদন সরবরাহ ঠিক রাখা। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেট হচ্ছে দেশের ৫১তম বাজেট। স্বাধীনতা পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার দেশের প্রথম বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেন জাতীয় নেতা ও তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একই সঙ্গে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছর অর্থাৎ দুই অর্থবছরের বাজেট ১৯৭২ সালের ৩০ জুন ঘোষণা করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রথম বাজেট যা ছিল বিদেশি অনুদান ও ঋণনির্ভর যেটাকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন ‘উন্নয়ন এবং পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন বাজেট’। আর এবার ঘোষিত বাজেট হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের প্রায় ৮৬০ গুণ যার শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন’।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট ও স্বাধীনতার ৫১তম বাজেটের মধ্যে টাকার অঙ্ক ও সময়ের অনেক ব্যবধান থাকলেও দুটি বাজেটের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন অর্থাৎ বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। আমরা আশাবাদী বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপিত বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব। ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির পুনরুদ্ধারসহ ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি এটাই কামনা উচিত।

একটি দেশের বাজেট ঘোষণার পর সেটি নিয়ে যেভাবে আলোচনা ও সমালোচনা হয়, বাজেট প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ততটা সহজ নয়। কেননা প্রতিটি দেশের জন্য প্রণীত বাজেটের কাঠামো ও আইনি ভিত্তিও বহুমাত্রিক। প্রতিবছর সংসদে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেন সেই ‘বাজেট’ শব্দের উৎপত্তি নিয়েই রয়েছে বিস্তর বিতর্ক। কেননা ‘বাজেট’ ইংরেজি শব্দ। সাবেক অর্থসচিব ও অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান তার রচিত ‘বাংলাদেশে বাজেট : অর্থনীতি ও রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন- মধ্যযুগের ইংরেজি ‘বুজেট’ (Bougette) থেকে বাজেট শব্দের উৎপত্তি। বুজেট শব্দের অর্থ মানিব্যাগ বা টাকার থলি। বাংলায় থলির সমার্থক বোচকা-পোটলা। তবে, বুজেট এর পরিভাষা এখনও রচিত হয়নি।

বাংলা একাডেমির বিবর্তনমূলক অভিধানে উল্লেখ রয়েছে বাংলায় বাজেট শব্দটি ১৯০২ সালে প্রথম ব্যবহার করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাজেটের উৎপত্তি হয়েছে আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৩শ বছর আগে। ১৭২৫ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত রবার্ট ওয়ালপুল যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী এবং কার্যত প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি সারা বছরই কর কমানো বা কর বাতিলের দাবি পেতেন।

এসব তিনি একটি ‘বুজেটে’ বা মানিব্যাগে ভরে রাখতেন। অর্থবছরের শেষদিকে যখন বাজেট তৈরির কাজ শুরু হতো, তখন তিনি কাগজগুলোর ভিত্তিতে আয়-ব্যয়ের হিসাব দাঁড় করাতেন। মানে বাজেট প্রণয়ন করতেন। সেই থেকে ‘টাকার থলি বা বাজেট’ হয়ে গেছে সরকারের বার্ষিক হিসাব-নিকাশের প্রতিশব্দ। সুতারং ইতিহাস বলে, বাজেট-ব্যবস্থার উৎপত্তি মানিব্যাগ থেকে। শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের অর্থনীতি অনেক বড় হয়। ফলে বাজেট-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাড়তে থাকে। এত বেশি দাবি আসে যে, এসব প্রস্তাব শুধু একটি মানিব্যাগে সংকুলান সম্ভব হয় না। ফলে মানিব্যাগের জায়গায় আসে ব্রিফকেস। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী সংসদের বাজেট অধিবেশনে ব্রিফকেস নিয়ে যান এবং ব্রিফকেসের ভেতর থাকে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার কপি।

বাজেট হচ্ছে একটি দেশের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব। সরকারকে দেশ চালাতে হয়, সরকারের হয়ে যারা কাজ করেন তাদের বেতন দিতে হয়, আবার নাগরিকদের উন্নয়নের জন্য রাস্তাঘাট বানানোসহ নানা ধরনের উদ্যোগ নিতে হয়। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট অর্থবছরে কোথায় কত ব্যয় হবে, সেই পরিকল্পনার নামই বাজেট।

মহান জাতীয় সংসদে প্রতিবছর জুনে অর্থমন্ত্রী বিল আকারে যে বাজেট উপস্থাপন করেন তার আইনি ভিত্তি হচ্ছে মূলত বাংলাদেশের সংবিধান। সংবিধানের ৮৭ (১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে- “প্রত্যেক অর্থ-বৎসর সম্পর্কে উক্ত বৎসরের জন্য সরকারের অনুমিত আয় ও ব্যয়-সংবলিত একটি বিবৃতি (এই ভাগে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’ বা Annual Financial Statement নামে অভিহিত)।” অর্থাৎ সংবিধানে স্পষ্টভাবে বাজেট শব্দটি উল্লেখ নেই আছে ‘বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি’। মূলত এই বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিই ‘বাজেট’ নামে অভিহিত। সংবিধানের পঞ্চম ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের আওতায় ৮১ থেকে ৯৩ নম্বর অনুচ্ছেদে সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনার ভিত্তি বর্ণিত আছে। তাছাড়া সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “অর্থ-বৎসর” অর্থাৎ জুলাই মাসের প্রথম দিবসে অর্থ বৎসরের আরম্ভ।

বাংলাদেশের সংসদে অর্থমন্ত্রী যে বাজেট উপস্থাপন করেন তার রীতি বর্ণিত আছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি’তে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ষোড়শ অধ্যায়ে “আর্থিক বিষয়াবলী সংক্রান্ত কার্যপদ্ধতি” শিরোনামে বাজেট, মঞ্জুরি-দাবি, নির্দিষ্টকরণ বিল, সম্পূরক ও অতিরিক্ত মঞ্জুরি এবং ঋণের ওপর ভোট, ছাঁটাই প্রস্তাব, প্রস্তাবের ওপর আলোচনা, আলোচনার জন্য স্পিকার বরাদ্দকৃত সময় ইত্যাদির বিশদ বর্ণনা রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১১১(১) বিধিতে বার্ষিক আর্থিক বিবৃতিকে ‘বাজেট’ নামে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১১১(২) বিধিতে বলা হয়েছে, “এই ব্যাপারে সংবিধানের বিধান সাপেক্ষে অর্থমন্ত্রী যেরূপ উপযোগী মনে করেন, সেই আকারে বাজেট সংসদে পেশ করিবেন।”

১৯৭২ সাল থেকে সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হলেও ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট কোনো আইন ছিল না। যার ফলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রিত হতো মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রণীত বিধির মাধ্যমে। ২০০৯ সালে সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদের বিধান সাপেক্ষে বাংলাদেশে প্রণীত হয় ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯’। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়: ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯’; সচিবালয় নির্দেশমালা-২০১৪; রুলস অব বিজনেস-১৯৯৬; জেনারেল ফিন্যান্সিয়াল রুলস ইত্যাদির বিধি-বিধান মোতাবেক। সংবিধানের ৮২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক ‘রাষ্ট্রপতির সুপারিশ’ নিয়ে ‘সংসদে উত্থাপন করা’ হয় অর্থ বিভাগ হতে প্রণীত প্রস্তাবিত বাজেট। অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট বিল আকারে উপস্থাপনের পর উত্থাপিত বাজেট নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়, সংসদে তর্ক হয় ও বিতর্ক হয়।

সংসদে উত্থাপিত অর্থবিল সংসদ সদস্যদের অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হয় এবং তা পরবর্তী অর্থবছরের জন্য কার্যকর হয়। বাংলাদেশে প্রণীত বাজেটের অংশ থাকে মূলত তিনটি: যার প্রথম ভাগে থাকে আয়ের হিসাব। অর্থাৎ প্রস্তাবিত বাজেটের সরকারের সম্ভাব্য আয়ের হিসাব থাকে। সরকারের সম্ভাব্য আয়ের উৎস আবার তিনটি। যথা- জনগণ প্রদেয় কর (এনবিআর ও অন্যান্য সংস্থার আদায়কৃত কর); কর বহির্ভূত আয় (ফি, লভ্যাংশ, অর্থদণ্ড, জরিমানা ইত্যাদি) এবং বৈদেশিক অনুদান।

বাংলাদেশে প্রণীত বাজেটের দ্বিতীয় ভাগে থাকে সরকারের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব। বাজেটের সম্ভাব্য ব্যয় চারটি ভিন্ন খাতে বিভক্ত করা হয়: পরিচালন ব্যয়; খাদ্য হিসাবে ক্রয়; ঋণ ও অগ্রিমবাবদ পরিশোধ এবং উন্নয়ন ব্যয়। বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য দরকার আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব। ড. আকবর আলি খান তার ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ উল্লেখ করেছেন ‘‘আমরা যেমন দেখি, ‘যদি সঠিক আয়ের হিসাবে বাজেটের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়, তাহলে অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব হবে’।

বাজেটের তৃতীয় ভাগে থাকে সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হলে বাজেটকে বলা হয় ‘ঘাটতি বাজেট’। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সব বাজেটই ছিল ‘ঘাটতি বাজেট’। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে কিছুটা ঘাটতি থাকা ভালো কেননা এতে অব্যবহৃত সম্পদের ব্যবহার বাড়ে, ঘাটতি পূরণের চাপ থাকে এবং অর্থনীতিতে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। এবারে প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা যা জিডিপির ৫.৫ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি যা ছিল জিডিপির ৬.২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি বাজেট মেনে নেয়া হয়। বাজেট-ঘাটতি দুভাবে পূরণ করা হয়। যেমন, বৈদেশিক উৎস; এটি মূলত বৈদেশিক ঋণ। সরকার বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশ থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়। এই উৎস থেকে বেশি ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে পারলে তা অর্থনীতির জন্য বেশি সহনীয়। কারণ, এতে সুদ হার কম এবং পরিশোধ করতে অনেক সময় পাওয়া যায়। তবে শর্ত থাকে বেশি। অভ্যন্তরীণ উৎস সরকার দুভাবে দেশের ভেতর থেকে ঋণ নেয়। যেমন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা। ব্যাংকবহির্ভূত ব্যবস্থা হচ্ছে সঞ্চয়পত্র। ‘ঘাটতি বাজেট’ নেতিবাচক শোনালেও এটা বরং উন্নয়ন সহায়ক।

আইএমএফের তথ্যমতে, কাতার, লুক্সেমবার্গ, উজবেকিস্তান ইত্যাদি পেট্রো-ডলারে সমৃদ্ধ হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ‘ঘাটতি বাজেট’ দেয়া হয়।

দেশে দেশে বাজেট উপস্থাপনের নানা ঐতিহ্য রয়েছে। সব দেশেই অর্থমন্ত্রীদের ব্রিফকেস সঙ্গে নিয়ে সংসদে বাজেট ঘোষণার রেওয়াজ দেখা যায়। তবে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন তার প্রথম বাজেটটি ঘোষণার সময় ব্রিফকেসের পরিবর্তে লালসালুতে মোড়া বাজেট ডকুমেন্ট সঙ্গে নিয়ে সংসদে ঢুকেছিলেন। দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যের লাল শাড়ির সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে ওই বছরের বাজেট ডকুমেন্ট সাজিয়েছিলেন তিনি। কানাডায় ১৯৫০ সাল থেকে সে দেশের অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশের আগের দিন নতুন জুতা কেনেন। সেই নতুন জুতা পায়ে দিয়ে অর্থমন্ত্রী সংসদে যান, বাজেট পেশ করেন।

কানাডার ইতিহাসে প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড এ বছর জুতা কিনেছেন মোড়ের দোকান থেকে। করোনা আক্রান্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রণোদনার প্রতীক হিসেবে। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের বাজেটের প্রতীক হলো ‘ব্রিফকেস’। আর এই ব্রিফকেসটি কেনা হয় অর্থ বিভাগের সেবা শাখার মাধ্যমে।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২৭.০৫ শতাংশ; এর মধ্যে মানবসম্পদ খাতে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাত) বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। ভৌত অবকাঠামো খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ লাখ ৮৬০ কোটি টাকা বা ২৯.৬২ শতাংশ; যার মধ্যে সার্বিক কৃষি ও পল্লি উন্নয়ন খাতে ৮৬ হাজার ৭৯৮ কোটি; যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে ৭৯ হাজার ২৬ কোটি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৬ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। সাধারণ সেবা খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ২০৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ২২.৫৯ শতাংশ।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি), বিভিন্ন শিল্পে আর্থিক সহায়তা, ভর্তুকি, রাষ্ট্রায়ত্ত, বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য ব্যয়বাবদ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭.৮৪ শতাংশ; সুদ পরিশোধ-বাবদ প্রস্তাব করা হয়েছে ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১১.৮৫ শতাংশ; নিট ঋণদান ও অন্যান্য ব্যয় খাতে প্রস্তাব করা হয়েছে ৭ হাজার ৪১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১.০৪ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ অবকাঠামো, ভৌত অবকাঠামো, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কৃষি, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫১তম বাজেটের শিরোনাম করা হয়েছে ‘কোভিডের অভিঘাত পেরিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন’ এবং বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে সরকারের অতীতের অর্জন এবং উদ্ভূত বর্তমান করোনা ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে। এছাড়া আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন করা হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু যা দেশের জিডিপিতে ১ শতাংশের বেশি অবদান রাখবে মর্মে অর্থনীতিবিদেরা মতামত ব্যক্ত করেছেন। সুতারং আমরা আশাবাদী যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশে যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে তার ধারা অব্যাহতসহ আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করার পদক্ষেপের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাব প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যেমে।

লেখক: উপসচিব ও কনসালটেন্ট, এটুআই প্রজেক্ট, ঢাকা

আরও পড়ুন:
বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী
মূল্যস্ফীতি ৫.৬ শতাংশে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়: সিপিডি
প্রস্তাবিত বাজেট বিনিয়োগবান্ধব: চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি
পাচার টাকা দেশে আনার উদ্যোগ অনৈতিক: সিপিডি
প্রস্তাবিত বাজেট ‘জনগণের জীবনমান পরিবর্তনমুখী’

মন্তব্য

মতামত
Flood and drinking water of Sylhet

সিলেটের বন্যা ও সুপেয় পানি

সিলেটের বন্যা ও সুপেয় পানি
দেশের যেকোনো সংকটময় সময়ে নানা মতের মানুষ এগিয়ে আসেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বন্যার্ত সিলেটবাসীর পাশে দাঁড়ানোর তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি না। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও এগিয়ে আসতে পারে। পানি বিশুদ্ধকরণে এসব ধাপ অনুসরণ করে একে একে নলকূপগুলো থেকে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার উপায় তো নিশ্চিত করতে পারে।

সিলেটের বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। সুরমা, কুশিয়ারা, ধলাই ও পিয়াইন নদীর পানি কমতে শুরু করায় ধীরে ধীরে বন্যার পানিও কমছে। আকস্মিক বন্যায় জেলার প্রায় পনেরোটি উপজেলা প্লাবিত হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দশ থেকে বারো লাখ মানুষ ছিল পানিবন্দি।

বন্যায় পানিবন্দি মানুষের অস্থায়ী দুর্ভোগ পোহাতে হয় দুই সময়। যখন বন্যায় পানিবন্দি থাকতে হয়, তখন এক ধরনের দুর্ভোগ। পানিবন্দি অবস্থায় অনেকের ঘরের ভিতর পানি ঢুকে পড়েছিল। হাঁটুপানি, কোমরপানি, গলা সমান পানি। কোনো কোনো জায়গায় ঘরবাড়ি ডুবে যায় পুরোপুরি। মানুষ অস্থায়ী মাচা বানিয়ে কিংবা বাড়ির ছাদে কোনো রকমে দুঃসহ সময় কাটিয়েছেন। ওদিকে তখন আবার বৃষ্টিও হয় কয়েকদিন। দুর্ভোগের ওপর আরও দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন বন্যার্তরা। তার ওপর ছিল ছিঁচকে চোর-ছিনতাইকারীর উপদ্রব।

সিলেটের বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ সেই অসহায় অবস্থা পেরিয়ে এসেছেন। এতদিনে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। কিছু জায়গায় পুরোপুরি নেমেও গিয়েছে।

বন্যার পানি নামার পর শুরু হয় দুর্ভোগের দ্বিতীয়পর্যায়। বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। সঙ্গে আছে খাবার সংকট, ঘরবাড়ি মেরামত সংকট, সেনিটেশন সংকট। যে কারণে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরেও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় মারাত্মকভাবে। ঘরে থাকা খাবারের মজুদ অনেক আগেই অনেকের ফুরিয়ে গিয়েছে। এ সময় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা করা এবং তা সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা করা জরুরি। তারচেয়েও জরুরি বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা।

যদিও চারধারে কেবল পানি আর পানি। বিখ্যাত ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দি অ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনার’ কবিতার মতো- ওয়াটার ওয়াটার এভরিহয়ার অ্যান্ড নট আ ড্রপ টু ড্রিঙ্ক।

বন্যার্তদের চারপাশে কেবল পানি আর পানি। কিন্তু এক ফোঁটাও পানযোগ্য বিশুদ্ধ পানি নেই। বিশুদ্ধ পানির অভাবে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়।

বন্যার পর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমনিতেই ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু ভেঙে পড়ার আগেই যদি হাল ধরা না যায়, তবে সেটা মারাত্মক আকার ধারণ করে। এমনকি বন্যায় যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে।

সিলেটের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সুপেয় পানির উৎস্য প্রধানত দুটো। গভীর নলকূপ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা খাবার পানি। কিন্তু এই বন্যায় প্রায় ১২ হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জকিগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় সাড়ে ছয় হাজার মিটার পানি সরবরাহের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৭৮ হাজার শৌচাগারও ক্ষতিগ্রস্ত। সিলেটের জনস্বাস্ব্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতে, সবমিলিয়ে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা।

বিশুদ্ধ পানির সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ নিয়েছে সিলেটের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। মোবাইল ওটায়ার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। জেলার কানাইঘাট, কোম্পানিগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় এ কাজ চলছে। ট্রিটমেন্ট প্লান্টে ঘণ্টায় ৬০০ লিটার পানি পরিশোধন করে গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানি বিতরণ করা হচ্ছে।

এর বাইরে জেলার বন্যাকবলিত এলাকায় ছয় লাখ ৬৩ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও দশ লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এক হাজার ৪০০টি পানির জার ও ৯০০ বালতিও বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণ করেছে বলে জানিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

এদিকে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বন্যার পানি থেকে জেগে ওঠা নলকূপ জীবাণুমুক্ত করার জন্য একটি পরামর্শ দিয়েছে। আটটি ধাপের এ পরামর্শ হচ্ছে- ধাপ ১: ১২ থেকে ১৫ লিটার পানি একটি বালতিতে নিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডার ভালোভাবে মেশাতে হবে।

ধাপ ২: একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মিশ্রণ ছেঁকে নিতে হবে। অথবা মিশ্রণটি স্থির না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

ধাপ ৩: নলকূপের পাম্পের হাতল ও প্লাঞ্জার রড পাম্প থেকে উঠিয়ে ফেলতে হবে।

ধাপ ৪: মিশ্রণের অর্ধেক পানি পাম্পের ভিতর ঢালতে হবে।

ধাপ ৫: হাতল ও প্লাঞ্জার রড ভালোভাবে পরিষ্কার করে ময়লা ও কাদা সরিয়ে ফেলতে হবে।

ধাপ ৬: হাতল ও প্লাঞ্জার রড আবার স্থাপন করতে হবে। এবং ঘোলা পানি দূর না হওয়া পর্যন্ত পাম্প করে যেতে হবে।

ধাপ ৭: পাম্প করে পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার পর অবশিষ্ট মিশ্রণ পাম্পের ভিতর ঢালতে হবে এবং ব্লিচিং পাউডার বা ক্লোরিনের গন্ধ থাকা পর্যন্ত পাম্প করতে হবে।

ধাপ ৮: নলকূপের আশেপাশ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

কথা হলো, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার সব মানুষের পক্ষে কি এসব ধাপ অনুসরণ করে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা সম্ভব? বিভিন্ন কারণে এটা সবসময় সম্ভব হয় না। আর সে কারণেই শুধু ধাপের উল্লেখ করে বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সব এলাকায় পানি বিশুদ্ধ করার জন্য এসব উপকরণ সহজলভ্য না-ও হতে পারে।

দেশের যেকোনো সংকটময় সময়ে নানা মতের মানুষ এগিয়ে আসেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বন্যার্ত সিলেটবাসীর পাশে দাঁড়ানোর তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি না। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও এগিয়ে আসতে পারে। পানি বিশুদ্ধকরণে এসব ধাপ অনুসরণ করে একে একে নলকূপগুলো থেকে বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার উপায় তো নিশ্চিত করতে পারে। তাতেও বন্যার্ত সিলেটবাসী উপকৃত হবে। অন্তত খাবার পানির সংকট তো কাটবে!

লেখক: শিশু সাহিত্যিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বন্যায় বেশি ক্ষতি সড়ক-কৃষি-মাছের
বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ার নির্দেশ অধ্যক্ষের!
সিলেটে কমছে পানি, বাড়ছে রোগ
পানি কমছে, বাড়ছে ডায়রিয়া ও চর্মরোগ
সিলেটের নতুন দুর্ভোগ পানির দুর্গন্ধ

মন্তব্য

মতামত
Can people go out on the streets?

‘মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে পারে’...?

‘মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে পারে’...?
আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের দুই নেতার বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে বিএনপি এবং ছাত্রদলকে চলতে হবে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের এঁকে দেয়া ‘শান্তিসীমানার’ মধ্যে। এটা কি সম্ভব? বিএনপি দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল। এ দলের ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু নিজেদের ভুল ও ব্যর্থতার কারণে ক্ষমতার বাইরেও আছে বহু বছর ধরে। বিএনপির এখন অনেকটা হাঁপিয়ে ওঠার অবস্থা।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে বিদ্বেষ-বিরূপতা কমবে বলে কেউ কেউ আশা করছিলেন। নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করুক এটা যদি আওয়ামী লীগ চায়, তাহলে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ওপর হামলা-মামলা কম হওয়াটা প্রত্যাশিত হলেও বাস্তবে ঘটছে তার বিপরীত। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বিএনপিকে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অনুমতি দেয়ার কথা বলেছিলেন বলে গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে ছাত্রদলকে যেভাবে হামলার মুখে রেখেছে ছাত্রলীগ তাতে মনে হচ্ছে সরকার বিএনপির প্রতি নমনীয় অবস্থানে আসেনি! এর কারণ কী?

কেউ কেউ মনে করেন, বিএনপি নেতারা সরকার পতনের হুমকি-ধামকি অব্যাহত রাখলে আওয়ামী লীগও তাদের খুব ছাড় দেবে না। আর বিএনপি নেতারা উস্কানিমূলক কথা কম বললে পরীক্ষামূলকভাবে দলটিকে ছোট ছোট সভা-সমাবেশের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে দিতে চায়। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে কোনো পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা বা কর্মসূচিকে সহজভাবে নেবে না ক্ষমতাসীন দল।

বিএনপি ও ছাত্রদলের ওপর সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করলে বাধা দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে সম্প্রতি তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে এবং উন্নয়নবিরোধী যেসব উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে, তাতে তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সুতরাং বিএনপি শান্তিপূর্ণ থাকলে আওয়ামী লীগ অশান্তি সৃষ্টি করতে যাবে কেন?

অপরদিকে, ছাত্রদলের ওপর হামলার বিষয়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেছেন, ইদানীং ছাত্রদল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ভাঙচুর থেকে শুরু করে অছাত্র-বহিরাগতদের নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার অপকৌশল নিয়েছে। শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ছাত্রদলকে প্রতিহত করেছে। এখন থেকে সহিংসতার উদ্দেশ্যে ছাত্রদল যখনই ক্যাম্পাসে আসবে, তখনই তাদের প্রতিহত করা হবে।

আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের দুই নেতার বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে বিএনপি ও ছাত্রদলকে চলতে হবে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের এঁকে দেয়া ‘শান্তিসীমানার’ মধ্যে। এটা কি সম্ভব? বিএনপি দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল। এ দলের ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু নিজেদের ভুল ও ব্যর্থতার কারণে ক্ষমতার বাইরেও আছে বহু বছর ধরে। বিএনপির এখন অনেকটা হাঁপিয়ে ওঠার অবস্থা। তারা এখন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার উপায় দুটো। হয় নির্বাচনে জিততে হবে অথবা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে বিএনপি জিততে পারবে বলে মনে করে না।

তাদের ধারণা মানুষ ভোট দিলেও তাদের হারিয়ে দেয়া হবে কারসাজি করে। তাহলে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার হঠানোর চেষ্টা কি বিএনপির সামনে? কিন্তু বহু বছর ধরে চেষ্টা করেও বিএনপি সরকার পতনের আন্দোলন চাঙা করতে পারছে না। এই অবস্থায় কী করবে বিএনপি? কেউ কেউ মনে করেন, দেশের যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তাতে বিএনপির উচিত শক্তি সঞ্চয়ের জন্য কিছু সময়ের জন্য হলেও সরকারের নিয়ন্ত্রিত পথেই হাঁটা। বড় বড় হুংকার না দিয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে মানুষের কাছে যাওয়া, মানুষকে সংগঠিত করা, তাদের আস্থায় আনা। কিন্তু বিএনপি সেটা সন্মানজনক বলে মনে করছে না। তারা সরকারের সঙ্গে সমঝোতার নীতিতে নয়, সংঘাতের নীতিতেই আগাতে চায়।

এক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদল ও বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে হামলা ও বাধা এসেছে। লক্ষণীয় এটাই যে, এসব কর্মসূচি ছিল আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্যবস্তু করে বা খালেদা জিয়াকে নিয়ে তার সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের প্রতিবাদে। আবার একই সময়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিএনপি বা এর অঙ্গসংগঠন কিছু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে পেরেছে, উগ্র বক্তব্য পরিহার করায়।

আওয়ামী লীগ যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের কর্তৃত্ব খর্ব হতে দিতে চায় না। আবার সম্প্রতি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষিত হয়েছে। তারাও কিছুটা নিজেদের শক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছে। ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটিরও মেয়াদ শেষ, সম্মেলন আসন্ন। তাদের মধ্যেও নেতৃত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে তৎক্ষণাৎ কড়া জবাব দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

হঠাৎ বিএনপি উত্তেজিত হয়ে উঠলো কেন, তার কারণ অনুসন্ধানে এটা সামনে আসে যে, ১৮ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের এক আলোচনা সভায় পদ্মা সেতু নিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অতীতে দেয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে একপর্যায়ে বলেন, ‘খালেদা জিয়া বলেছিল, জোড়াতালি দিয়ে পদ্মা সেতু বানাচ্ছে।

সেতুতে যে স্প্যানগুলো বসাচ্ছে, এগুলো তার কাছে ছিল জোড়াতালি দেয়া। বলেছিল, জোড়াতালি দিয়ে পদ্মা সেতু বানাচ্ছে, ওখানে চড়া যাবে না। চড়লে ভেঙে পড়বে। আবার তার সঙ্গে কিছু দোসরেরাও…তাদেরকে এখন কী করা উচিত? পদ্মা সেতুতে নিয়ে গিয়ে ওখান থেকে টুস করে নদীতে ফেলে দেয়া উচিত।’

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই বিএনপিকে উত্তেজিত করেছে। এটাকে তারা খালেদা জিয়াকে হত্যার হুমকি হিসেবে দেখে এর প্রতিবাদ করতে থাকে। ২২ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে ছাত্রদল প্রতিবাদ সমাবেশ করে খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে। সেখানে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেন। এরপর ওই দিন সন্ধ্যায় টিএসসিতে ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীর ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ।

ছাত্রদল তাদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে ২৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। ওই দিন সকালে তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে টিএসসি যাওয়ার পথে শহীদ মিনার এলাকায় ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়। এই হামলার প্রতিবাদে ছাত্রদল গত বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ কর্মসূচি দেয়। সেদিন তারা মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে চাইলে আবারও ছাত্রলীগ হামলা করে। একপর্যায়ে ছাত্রদলের একাংশ সুপ্রিম কোর্ট ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়লে সেখানেও তাদের পেটানো হয়।

একই দিন ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হত্যার হুমকি’র প্রতিবাদে খুলনা মহানগর ও পটুয়াখালী জেলা বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশে হামলা হয়। পটুয়াখালীতে হামলা করে ছাত্রলীগ আর খুলনায় পুলিশ ও ছাত্রলীগ। এরপর বরিশালে পুলিশি বাধায় ছাত্রদলের মিছিল পণ্ড হলেও ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যুবদল সমাবেশ করেছে। তাদের কোনো বাধা দেয়া হয়নি।

নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি আদায়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বিএনপি। এই লক্ষ্যে রাজপথের আন্দোলনের রূপরেখা তৈরিতে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনাও শুরু করেছে। এই সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের সংঘর্ষের ঘটনায় মাঠে তৎপরতা বেড়েছে তাদের।

বিএনপি মনে করছে, যেভাবেই হোক দীর্ঘদিন পরে তাদের চলমান আন্দোলনে গতি এসেছে, জনসমর্থনও বেড়েছে। আন্দোলনের এই গতিকে তারা ধরে রাখবে। এখান থেকেই সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চূড়ান্ত আন্দোলনের পরিকল্পনা চলছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য: সরকারের দমন-পীড়নে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। অপরদিকে জিনিসপত্রের লাগামহীন দামসহ নানা কারণে দেশের মানুষও অতিষ্ঠ। এই প্রেক্ষাপটে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই বর্তমানে সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙা হয়েছে। মামলা-হামলা দিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলন দমানো যাবে না বলে তাদের বিশ্বাস।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, আন্দোলন শুরু হয়েছে এবং এটা চলবে। সমমনা দলগুলো বিএনপির চলমান আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন ইতোমধ্যে সমমনা দলগুলো ছাত্রদলের ওপর হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিএনপি বড় দল হিসেবে চেষ্টা করছে, আন্দোলন যে গতি পেয়েছে, সেটাকে অব্যাহত রাখতে। ধরপাকড়, মামলা-মোকদ্দমায় সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। নেতাকর্মীরা এ নিয়ে আর কিছু মনে করে না।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, ‘এত দিন সরকার নানাভাবে অন্যদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছে। খালেদা জিয়াকে কটূক্তি করার প্রতিবাদে ছাত্রদল মিছিল করেছে। এরপর যে ঘটনা সরকার ঘটিয়েছে, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, কোনো পূর্ব প্রস্তুতির প্রশ্নই ওঠে না। সরকারের ভীতির জায়গা থেকে এই ঘটনা ঘটেছে।’

বিএনপির নেতা চলমান সংঘাতকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে মনে করছেন। সারা দেশের মানুষ এখন নানা কারণে নিষ্পেষিত, দেশে অস্থিরতা বিরাজ করছে। সেই অস্থিরতার জায়গা থেকে যেকোনো সময় মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে পারে। আন্দোলন চলমান রয়েছে এবং সেখানে প্রধান দল হিসেবে বিএনপির ভূমিকা থাকবেই।

‘মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে পারে’ বলে বিএনপি নেতাদের যে আশা তার বাস্তব লক্ষণ এখন পর্যন্ত কোথাও দেখা যায়নি। আর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও কোনো নতুন চিন্তার কথা শোনা যায় না। তাই এখন শুধু দেখার পালা, কে কীভাবে সামনে আগায়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
খুলনায় ছাত্রলীগ-বিএনপি সংঘর্ষ: গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি
ছাত্রদল ক্ষমা চাইলে ক্যাম্পাসে আসতে পারবে: ছাত্রলীগ
আজও ঢাবিতে লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান ছাত্রলীগের
পুলিশের বাধায় পণ্ড ছাত্রদল-যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল
ঢাবিতে সংঘর্ষ: ছাত্রদলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা

মন্তব্য

মতামত
May victory be fearless

জয় হোক অভয়ের

জয় হোক অভয়ের
আদর্শিক বিরোধের কারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানকে নির্মূল চেষ্টার এমন পাশবিক ঘটনা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। শেখ হাসিনা বারবার বুলেট ও গ্রেনেডের মুখ থেকে বেঁচে ফেরা এক বহ্নিশিখা। তিনি মানবতার জননী।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট যা সম্পূর্ণ করতে পারেনি, সেটাই বার বার করার চেষ্টা করে যাচ্ছে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি। সেই ’৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকেই ঘাতকের নিশানায় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। নানা সময়ে নানাস্থানে তাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। কখনও সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, কখনও বঙ্গবন্ধুর খুনি এবং তাদের অনুসারীদের মদদে কখনওবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী গোষ্ঠীর ইন্ধনে ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়। প্রতিটি ষড়যন্ত্রের পর রাজনৈতিক যোগসূত্র মিলে যায় ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারি দলগুলোর কার্যক্রমের সঙ্গে। কোনো কোনো হত্যাচেষ্টায় আওয়ামীবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ‘শত্রুর শত্রু, সে আমার মিত্র’ এই আদর্শে ঘাতকদের পক্ষ নিয়েছিল। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নানা সময়ে এই পর্যন্ত ২১ বার শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টায় তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড-বোমা ও গুলির হামলা হয়েছে।

হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে প্রকাশ্যে দুবার, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের আমলে চারবার, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চারবার, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকার আমলে চারবার, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবার ও আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক সময়ে চারবার হত্যাচেষ্টার কথা জানা যায়। খোদ, ঢাকাতেই শেখ হাসিনার ওপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয় কয়েকবার। শুধু তাই নয়, দেশের বাইরেও তাকে একাধিকবার হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছে। ঘাতকদের ষড়যন্ত্র এখনও তাড়া করে ফিরছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে। প্রতিটি হামলায় হত্যাকারীদের মূল টার্গেট শেখ হাসিনা। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বার বার বুলেট-বোমা তাড়া করে বেড়ায় তাকে? কেন বার বার হত্যাকারীদের মূল টার্গেট শেখ হাসিনা? এসব হামলার ঘটনায় ৬৬ দলীয় নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে। আহত কয়েক হাজার। পঙ্গুত্ববরণ করেছে শত শত নেতা-কর্মী।

প্রথমবার হামলা হয় ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। এই হামলায় ২৮ নেতাকর্মী প্রাণ হারান। দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার জীবন বাঁচাতে মানববর্ম তৈরি করে ৯ নেতাকর্মী আত্মাহুতি দেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি নীলনকশা আর জঙ্গিবাদ উত্থানের ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন; নিহত হন আওয়ামী মহিলা লীগের নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়েছিল। মহান সৃষ্টিকর্তার পরম কৃপায় এই হত্যাচেষ্টার ঘটনাগুলো ব্যর্থ হয়।

২০০১ সালের ৩০ মে তেমনি একটি দিন। সেদিন খুলনার রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ঘাতকচক্র সেখানে একটি শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখে। পরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, হত্যার পরিকল্পনা করেছিল হরকাতুল জিহাদ। অনুষ্ঠানের তিন দিন আগে ২৭ মে সেতুর কাছাকাছি রূপসা নদীতে দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ১৫ জঙ্গি ধরা পড়ে। তাদের লক্ষ্য ছিল ৩০ মের অনুষ্ঠান। গোয়েন্দা তৎপরতায় ঘাতকের সেই মিশনও সফল হয়নি। ১৫ জনের একজন মাসুম বিল্লাহ ওরফে মুফতি মইন ঢাকায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় অংশ নেয়। গ্রেপ্তারকৃতদের ভাষ্যে- কোটালীপাড়ায় হত্যার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা খুলনায় রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। বিস্ফোরণের আগেই বোমাটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় গোয়েন্দা পুলিশ।

একই সময় গ্রেপ্তার হওয়া অপর জঙ্গি কুতুবউদ্দিন ওরফে বাবুর বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কেষ্টপুরে। ২১ আগস্ট হামলা মামলার সে দুই নম্বর আসামি এবং হুজির আঞ্চলিক নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল ও মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়েরের ঘনিষ্ঠজন। উল্লেখ্য, এর আগে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায়। একই বছর সিলেটেও শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিল জঙ্গিগোষ্ঠী। সাজাপ্রাপ্ত হুজির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা মুফতি হান্নান স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, ২০০০ সালের জুলাই মাসে হুজির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। ওই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে কোটালিপাড়া, খুলনা ও সিলেটে হামলা।

খুলনার রূপসা সেতুর ঘটনার পর বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের কাছ থেকে সেনাবাহিনীর পোশাক, বুট ও বিভিন্ন কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারদের ভাষ্য ও এসব তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনাকারী সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ও অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপসা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার পরিকল্পনা জঙ্গিদের হলেও তাদের পরোক্ষ সহযোগিতায় ছিল সরকারবিরোধী স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু নেতাকর্মী।

বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদে কেউ কেউ স্বীকার করেছে, তারা শেখ হাসিনাকে ইসলামের শত্রু মনে করে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে ইসলামের অনেক ক্ষতি করেছে, তাই হুজির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনাকে হত্যা করা।

এরকম বাস্তবতায় তথা ধারাবাহিক ষড়যন্ত্র ও জঙ্গিবাদ আশঙ্কার মধ্যেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাপী এক বিস্ময়ের নাম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি-সন্ত্রাস-জটিলতার মধ্যেও পাল্টে যাচ্ছে দেশের চিত্র। কোনো চক্রান্ত্রই থামাতে পারছে না শেখ হাসিনার উন্নয়নরথ। তার হাত ধরে নির্মিত হচ্ছে আজকের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আজ- ইজ অ্যা মিরাকল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার। নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের ভাষায়- ‘উন্নয়নের দিক থেকে বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। কোনো কোনো সূচকে ভারত থেকেও এগিয়ে।’

সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে শেখ হাসিনা জাতিকে ঐতিহাসিক দায়মুক্তি দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি ও একাত্তরের ঘাতকদের বিচার সম্পন্ন করে জাতির কলঙ্কমোচন করেছেন। স্বপ্নের পদ্মা সেতু আজ বাস্তব, চারলেন মহাসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পানগাঁও নৌ-টার্মিনাল, এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর, রাজধানীর চারপাশে স্যুয়ারেজ ট্যানেল নির্মাণের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা-জ্বালানি, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন।

সহজ করে বললে, বঙ্গবন্ধু ভৌগোলিক মুক্তি দিয়ে গেলেও এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি শেখ হাসিনার হাত ধরেই হচ্ছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে, হচ্ছে শেখ হাসিনা বেঁচে আছেন বলেই। কোনো ষড়যন্ত্রই দমাতে পারেনি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে।

একাত্তরের পরাজিত শক্তি এখনও ওঁৎপেতে আছে প্রতিশোধের। পঁচাত্তরের ঘাতকবাহিনী, যারা হত্যা করেছে পিতা-মাতা-ভাইসহ স্বজনদের, তারা চায় শেখ হাসিনার বিনাশ। তাকে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তানি ধারায় দেশ ফিরিয়ে নিতে চায়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর দেশটাকে তারা পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব সেখান থেকে আজকের রূপে এনেছে স্বাধীনতার স্বপ্নবাহী পথে। সেই পথ অনেক চড়াই-উৎরাই। সেসব পথ মাড়িয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন।

আদর্শিক বিরোধের কারণে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানকে নির্মূল চেষ্টার এমন পাশবিক ঘটনা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। শেখ হাসিনা বারবার বুলেট ও গ্রেনেডের মুখ থেকে বেঁচে ফেরা এক বহ্নিশিখা। তিনি মানবতার জননী। বাঙালির আশার বাতিঘর। তিনি তার জীবনকে বাংলার মেহনতি দুঃখী মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে এগিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ব মানবতার দিকে দুর্বার গতিতে। গণমানুষের কল্যাণই তার রাজনীতির মূল দর্শন।

১৯৮১ সালের শুরুতে দলের দায়িত্ব নিয়ে দলকে তিনি শুধু চারবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়ই আনেননি। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে যেমনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি উদার, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি এখন তিনি। তার হাতে বাঙালি রাষ্ট্র ও বাঙালির সংস্কৃতি নিরাপদ।

জঙ্গিবাদকে নির্মূল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই। আর এ কারণেই তার নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য বার বার তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে ঘাতকচক্র। কিন্তু জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত তিনি অপ্রতিরোধ্য অদম্য বাংলাদেশ গড়ে তুলছেন। কোনো ভয়-ভীতি তাকে কাবু করতে পারে না। জাতিকে তিনি অভয়মাঝে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ। জয় হোক অভয়ের।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
তিনি ফিরলেন সব হারানোর দেশে
শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন বলেই দেশ এগিয়েছে
শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার দিন আজ
প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা সোমবার
এ দিন বিশ্ববাসীর সামনে প্রথম পিতা হত্যার বিচারের দাবি তোলেন শেখ রেহানা

মন্তব্য

মতামত
The security of citizens in the United States is declining

যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তা কমছে

যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তা কমছে
যে অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের র‍্যাবের কয়েক সদস্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সেই অবস্থা এখন তার দেশে অতি বেশি মাত্রায় বিরাজমান। তাই তাদের উচিত এই নিষেধাজ্ঞা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেয়া। তাদের বোঝা উচিত এবং বুঝতেও পারছে যে, মানবাধিকার শুধু যারা মানুষ এবং মানবিক তাদের জন্য। সমস্যা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বা নীতিনির্ধারকরা কখনই তার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করে না। এই অবস্থা আমরা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে দেখেছি এবং পঞ্চাশ বছর পরে এসে বর্তমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও দেখছি।

এক লেখকের লেখায় পড়েছিলাম- নিজের ঘরের সামনে বরফ জমে থাকলেও কোনো খবর থাকে না, অথচ অন্যের ঘরের সামনের কাদা পরিষ্কার নিয়ে যত মাথাব্যথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর বর্তমানে যে অবস্থা তা দেখে আমার সেই বিখ্যাত লেখকের উক্তিটিই মনে পড়ে গেল। সম্প্রতি টেক্সাসের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বন্দুকধারী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১৯ শিশুসহ মোট ২১ জনকে হত্যা করেছে। এরকম হৃদয়বিদারক ও জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড আফ্রিকার কিছু গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ ছাড়া বিশ্বের কোনো সভ্য দেশে ঘটেছে কি না আমার জানা নেই।

বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ হিসেবে খ্যাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতার শিকার হচ্ছে তা এ ঘটনায় প্রকাশ পেল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এরকম গণগোলাগুলি (ম্যাস শুটিং) বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। এরকম ঘটনা এখানে মাঝেমধ্যেই, বলা যায় নিয়মিত বিরতি দিয়ে ঘটে। এই স্কুল শুটিংয়ের মাত্র এক সপ্তাহ আগে নিউইয়র্ক রাজ্যের বাফেলো শহরের একটি শপিং মলে গণগোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে এবং সেখানেও দশজন কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হন। শুধু তাই নয়, এরকম ভয়াবহ গণ গোলাগুলি ছাড়াও এই সময়ের মধ্যে আরও কয়েকটি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে এবং বেশ কয়েকজন মারাও গেছে। কয়েক বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্কুলে এরকম গণগোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল এবং সেখানেও বিশ ছাত্র নিহত হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে এরকম বন্দুক নিয়ে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা করা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এখানে এমন কোনো দিন খুঁজে পাওয়া যাবে না যেদিন বন্দুকধারীর গুলিতে কেউ নিহত বা আহত হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যেভাবে প্রতিদিন গোলাগুলির ঘটনা ঘটে এবং বন্দুকধারীর গুলিতে মানুষ মারা যায় তেমনটা বিশ্বের আর কোনো দেশে ঘটে কি না আমার জানা নেই।

এসব ভয়াবহ বিশেষকরে ম্যাস শুটিং ঘটনার নেপথ্যের সঠিক কারণ কখনই সাধারণ মানুষ জানতে পারে না। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এসব ঘাতকদের গুলি করে মেরে ফেলে, যাকে আমাদের দেশের ভাষায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এই টেক্সাসের স্কুল শুটিং যে বালক ঘটিয়েছে তাকেও পুলিশ আটক না করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে গুলি করে মেরে ফেলেছে। নভাস্কশিয়ার সেই হত্যাকারী ১৭ বছরের বালককেও পুলিশ আটক না করে গুলি করে মেরে ফেলে। হত্যাকারীকে আটক না করে এভাবে গুলি করে মেরে ফেলার ঘটনা এখানে প্রায়ই ঘটে। এছাড়া উপায়ও নেই। কারণ পুলিশ ভালো করেই জানে যে তাদের আটক করে জেলে ভরলে তারা জামিনে বেরিয়ে এসে একই কাণ্ড ঘটাবে।

সবচেয়ে বড় কথা এ বিষয় নিয়ে তেমন কোনো সমালোচনা বা আন্দোলন সংগ্রামও নেই। এক জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ড নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে কী ভয়ানক আন্দোলন শুরু হয়েছিল কারণ তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন আসন্ন ছিল এবং এর পিছনে কিছু ভোটের হিসাবনিকাশ ছিল। এখন ১৯ জন শিশু সন্তানকে এভাবে প্রাণ হারানোর পরেও কোনো আন্দোলন নেই। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা মন্ত্রী বা কোন জনপ্রতিনিধির পদত্যাগের দাবিও নেই। এমনকি এসব লোমহর্ষক গণগোলগুলির পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বা নীতিনির্ধারকদের এতটুকু সৎসাহস হয়নি যে এই মুহূর্তে ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য বন্দুক ব্যবহার নিষিদ্ধ করবে। আমাদের দেশের মানবাধিকার কর্মী এবং টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোর আলোচকরা কী বলবেন জানি না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণগোলাগুলিসহ প্রতিদিনই শুটিংয়ের ঘটনা ঘটছে এবং এসব গোলাগুলির ঘটনায় অসংখ্য নিরীহ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু এসব ঘটনা বন্ধ করতে পারছে না এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটাতে পারছে না তাই তাদের এখন অন্য কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কোনোরকম মন্তব্য করা শোভা পায় না। যে অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের র‍্যাবের কয়েক সদস্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সেই অবস্থা এখন তার দেশে অতি বেশি মাত্রায় বিরাজমান। তাই তাদের উচিত এই নিষেধাজ্ঞা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেয়া। তাদের বোঝা উচিত এবং বুঝতেও পারছে যে, মানবাধিকার শুধু যারা মানুষ এবং মানবিক তাদের জন্য।

সমস্যা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বা নীতিনির্ধারকরা কখনই তার দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করে না। এই অবস্থা আমরা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে দেখেছি এবং পঞ্চাশ বছর পরে এসে বর্তমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও দেখছি। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ আমাদের পক্ষে থাকলেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এবং নীতিনির্ধারক আমাদের বিপক্ষে গণহত্যা সংঘটনকারী পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি বন্দুক নিয়ন্ত্রণ (গান কন্ট্রোল) করা অর্থাৎ খেলনা পিস্তলের মতো এভাবে খোলাবাজারে কেনাবেচা এবং সাধারণ মানুষের হাতে বন্দুক রাখার কোনো সুযোগ থাকবে না। মোটকথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ব্যাতিরেকে কোনো সাধারণ নাগরিক বন্দুক কিনতে বা রাখতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশে কেন সাধারণ নাগরিকের ব্যাক্তিগতভাবে বন্দুক রাখার সুযোগ থাকবে?

লেখক: ব্যাংকার-কলাম লেখক। টরনটো, কানাডা-প্রবাসী

[email protected]

আরও পড়ুন:
র‍্যাবকে মারধর: এখনও অস্বাভাবিক সেই বাজার
র‌্যাবকে মারধর: ৩ দিন পর ৩ মামলা
চাঁদাবাজ-ছিনতাই: চক্রের ২৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার র‌্যাবের
র‍্যাবের ওপর হামলায় আটক ১৩
র‍্যাবের ওপর হামলায় হয়নি মামলা

মন্তব্য

মতামত
Yet rice life

তবু ভাতময় জীবন

তবু ভাতময় জীবন
দেশে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, শিল্পকারখানা, বসতভিটা তৈরি হওয়ায় প্রথম ধাক্কা পড়ল ফসলি জমির ওপর। ফসলি জমির ওপর টান পড়ায় খুব সূক্ষ্ম ধরনের বা সেনসেটিভ চালের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

জব্বার মিয়া একজন কৃষক। গাইবান্ধা সদর হাসপাতলে ডাক্তার দেখাতে গিয়েছেন। ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন, কী সমস্যা? ৫০/৫২ বছর বয়সী জব্বার মিয়া জানালেন, ‘একদম উচি (রুচি) নাই বাহে মুখত। কিছু খাবারে পারো না।’ ডাক্তার বললেন, কেন কী খেতে পারেন না? কেন মনে হলো রুচি নাই? রোগী জানালেন, সবে খাবার পাও শুধু ভাত খাওয়া কমি (কমে) গেইছে। আগত নুন, দিয়াই কেজি টেক চাইলের ভাত খাবার পাইরতাম। এখন আর পারো না। ভাত খাইতে না পাইল্লে কীসের কী? মোখ ওষুধ দাও, বাহে।’

জব্বার মিয়ার মতো অসুস্থতা বাংলাদেশের অনেক মানুষেরই। ভাতনির্ভর জীবন আমাদের। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে যে, দেহের অধিকাংশ সমস্যা নাকি এই ভাত মানে শর্করা থেকে উদ্ভূত। তাই রোগ নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলেই ভাত কম খান বা খেয়েন না ধরনের প্রেসক্রিপশন দেবেনই। ভাতপ্রিয় বাঙালির তাতে কষ্টের শেষ নেই। ‘ভাত ঘুম’, ‘মাছে ভাতে বাঙালি’, ‘মামার বাড়ি যাই দুধ-ভাত খাই’ এই প্রচলিত প্রবাদ তাহলেতো মিছে হয়ে যাবে। ভাত ছাড়া আর কী খাব, কেমন করে খাব?

হলদে ভাত

ছোটবেলায় নীলফামারিতে দাদার বাড়ি গিয়ে দেখেছিলাম ঘরের বারান্দায় পাটি পেতে ৮/১০ জন মানুষ বসেছেন। এরা আমাদের জমিতে কাজ করে। দাদির তত্ত্বাবধানে একটি বড় গামলায় করে হলুদ রঙের ভাত, সবজি, কাঁচামরিচ, পিঁয়াজ এনে মানুষগুলোকে খেতে দেয়া হচ্ছে। লক্ষ করলাম আমরা যে ভাত খাই, এটা সেইরকম ভাত নয়, আবার খিচুড়িও নয়। ছোট ছোট দানার গোল গোল ভাত। পরে জানলাম একে কাউন বলে। উত্তরাঞ্চলে প্রচুর কাউন হয় এবং বছরের এই সময়টাতে মানুষ বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ কাউনের ভাত খায়। এটি পুষ্টিকর, অনেকক্ষণ পেটে থাকে।

আরেকদিন দেখলাম এই মানুষগুলোই পাকা কাঁঠাল ভেঙে কাঁঠাল দিয়ে কাউনের ভাত খাচ্ছে। আমারতো আর বিস্ময় যায় না। অগত্যা দাদি আমাকে কাউনের ভাত পিঁয়াজ, তেল, আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি দিয়ে মেখে দিলেন। চাচি ঘন দুধ দিয়ে কাউনের পায়েস করে দিলেন। উহ কী স্বাদ সেই খাবারের!

পরে দেখি ঢাকা শহরের অর্গানিক খাদ্য বিক্রেতারা কাউনের মান উন্নীত করে তাদের দোকানে দাম দিয়েই কাউন বিক্রি করছে। কাউন দিয়ে ভাত হয়, পায়েস হয়, খিচুড়িও হয়। তবে কাঁঠাল দিয়ে খেতে কেমন লাগবে, সেকথা ঠিক নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।

বউখুদ

এরপর পেলাম খুদভাত। যখন সংসারে চাল ঝাড়া-বাছার রেওয়াজ ছিল, তখন চালের খুদ বের করে দরিদ্র মানুষকে দিয়ে দেয়া হতো। মুরগিকে খেতে দেয়া হতো। মাঝেমধ্যে শখ করে পোলাওর চালের খুদ রান্না করা হতো। পরে দেখলাম চালের খুদ দিয়ে খুব মজাদার খুদভাত হচ্ছে। বিক্রমপুর, মুন্সীগঞ্জ এলাকায় এই খুদ রান্নার নাম বউখুদ। ময়মনসিংহ অঞ্চলে বলে বউভাত। নাম যা-ই হোক খাওয়ার পদ্ধতি কিন্তু একই।

ইদানীং তো বিভিন্ন ছোট রেস্তোরাঁতে ভাতের পাশাপাশি পোলাওর চালের বউখুদ রান্না করে রাখা হচ্ছে। খুদের চালের খিচুড়ি, আদা-হলুদ-শুকনা মরিচ-পিঁয়াজ বাগার দিয়ে যে রান্না হয়, তাই বউখুদ। সঙ্গে থাকতে হবে ব্যাপক ঝাল দিয়ে বেগুন, আলু, শুঁটকি, কালোজিরা ও সরিষা ভর্তা। এই ভাত খেতে পারেন সকালের নাস্তাতেও। এছাড়া পোলাওর চালের খুদের সঙ্গে সুজি মিশিয়ে খুব মজাদার পায়েস রান্না হতে পারে।

নাকফুল নয় বাঁশফুল

সিলেট, চট্টগ্রামে খুব পরিচিত বাঁশফুল চাল। এসব এলাকার সাধারণ ভাতের দোকানে ভাত খেতে বসে দেখবেন বেশ একটা চমৎকার গন্ধ ভেসে আসছে। ভাতগুলোও খুব সুন্দর, দেখলে মনে হবে বাঁশমতি চাল। অথচ এই বাঁশফুল চাল দেখতে গোল গোল কিন্তু ভাত হয় লম্বা। কী তার গন্ধ এবং স্বাদ।

যেকোনো উৎসবে বাঁশফুল চালের ভাতের সঙ্গে খেতে দুর্দান্ত লাগবে মাছ, মুড়োঘণ্ট, ভুনা খাসির মাংস ও বড় মাছের কালিয়া। পাশাপাশি চলতে পারে নানা ধরনের ভর্তা, চিকন ঝুড়ির আলুভাজি ও ঘন সোনা মুগের ডাল। ঠিক একইভাবে সবজি মিশিয়ে এই চালের ল্যাটকা বা পাতলা খিচুড়িও খুব মজা লাগে।

রেশনের আতপ

আমাদের দেশে আগে খিচুড়ি বা পিঠা বানানোর জন্য ব্যবহৃত হতো মোটা আতপ চাল। ৭০/৮০ দশকে ঢাকা শহরে এই আতপ চাল রেশনে দেয়া হতো। এখনও চালের বাজারে খুঁজলে দেশি মোটা আতপ চাল পাওয়া যায়। বেশ মিষ্টি ঘ্রাণ রয়েছে এই চালের। কিন্তু মোটা দানা বলে এবং দ্রুত গলে যায় এ কারণে এ চাল দিয়ে পোলাও রান্নাটা খুব একটা জম্পেশ হয় না, বরং ঝুঁকিপূর্ণই হবে বলা যায়। গ্রামে বড় কোনো দাওয়াত হলে বেশি করে দুধ দিয়ে মোটা আতপ চালের ফিরনি রান্না করা হয়।

দাদখানি চাল, মসুরির ডাল

ছেলেবেলায় পড়া যোগীন্দ্রনাথ সরকারের খুব মজার ছড়া ‘কাজের ছেলে’র কথা আমাদের মনে থাকার কথা-

“দাদখানি চাল, মসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ,

দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ।

পথে হেঁটে চলি, মনে মনে বলি, পাছে হয় ভুল

ভুল যদি হয়, মা তবে নিশ্চয়, ছিঁড়ে দেবে চুল।”

ছড়াটা পড়ার সময় কেবলই মনে হতো এই দাদখানি চাল জিনিসটা কী? কেমনইবা স্বাদ? দাদখানি চাল ছিল এই বাংলার খুব পরিচিত। কারণ এই চালের মধ্যে রয়েছে জিকং। জিংক শরীরে রোগ প্রতিরোধে খুব কার্যকর। আর তাই অসুস্থ মানুষের জন্য এই দাদখানি চাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে দেয়া হতো। এখনও খুব

ভাতময় জীবন বাঙালির

কেন বাঙালির জীবন ভাতময়, কেন বাঙালিকে নিন্দা করে বলা হয় ‘ভেতো বাঙালি’, কেন সবকিছু খাওয়ার পরও এক মুঠো ভাত না খেলে জীবন অর্থহীন মনে হয়? আমরা যদি চালের ইতিহাসের দিকে তাকাই দেখব এই বাংলায় দুইশরও বেশি ধরনের চাল হতো একসময়। প্রতিটি চালের আলাদা আলাদা রং, চেহারা ও স্বাদ এবং প্রয়োজন। একেক চাল হতো একেক ঋতুতে।

দেশে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায়, শিল্পকারখানা, বসতভিটা তৈরি হওয়ায় প্রথম ধাক্কা পড়ল ফসলি জমির ওপর। ফসলি জমির ওপর টান পড়ায় খুব সূক্ষ্ম ধরনের বা সেনসেটিভ চালের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

মা চাল

সব চালের মা বা মূল বলা হয় ‘রাইদা চাল’কে। চিকন এই চালটি কীভাবে কৃষকরা খুঁজে পেয়েছেন, তা নিয়ে গল্পও প্রচলিত আছে। অনেককাল আগে খুলনা এলাকার জেলেরা খাদ্যের খোঁজে নদীর ধার দিয়ে হাঁটার সময়, মাঝে মাঝে শুকনো ঘাস তুলে নিয়ে তাতে আগুন দিয়ে মাছ পুড়িয়ে খেতেন। এরাই একবার লক্ষ করলেন যে তারা ওই গাছ পুড়িয়ে ফেললেও সেখান থেকে কিছুদিন পর ধানের চারা বের হয়েছে। এর মানে ঘাস থেকেই সৃষ্টি হয়েছে এই রাইদা চাল।

রাঁধুনি কেন পাগল হলো?

রাঁধুনিপাগল চালটা বিখ্যাত এর গন্ধের জন্য। এর ঘ্রাণ এতই তীব্র ও মিষ্টি যে রান্নার সময় বাঁধুনি পাগল হয়ে যেত এর সুবাসে। মাঝে হারিয়ে গেলেও কৃষকরা এখন আবার নতুন করে এই ধানের উৎপাদন শুরু করেছে। রাঁধুনিপাগল চালের নাম শুনলেই বোঝা যায় এর মরতবা। খুব ঝরঝরে পোলাও আর চমৎকার পায়েস রান্না করা যায় এই চালের।

আবার কাজলদিঘা, লক্ষীদিঘা, কালারাই নামের ধানগুলো বর্ষা ও বন্যাতেও টিকে যায়। ভাদ, কালোশনি, কুমরি এসব ধান খরাতেও জন্মে। আমাদের দেশে জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে এসব ধানের আবাদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া উচিত। এখন জলবায়ু পরিবর্তনকে সামনে রেখে কৃষিবিষয়ক গবেষকরা এমন চালের খোঁজ করছেন, যা দুর্যোগেও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

বিন্নি চালই স্টিকি রাইস

জুমে যে বিন্নি ধান হয়, তা থেকে কালো, লাল এবং সাদা বিন্নি চাল পাওয়া যায়। জুমের এই চালের স্বাদ অনন্য। বেশ আঠালো হয় এই চালের ভাত ও খিচুড়ি। রান্নার সঙ্গে সঙ্গে গরম গরম খেতে হয়, নতুবা ঠান্ডা হয়ে গেলে জমে শক্ত হয়ে যায়। খোসাসহ মুগের ডাল দিয়ে বিন্নি চালের খিচুড়ির স্বাদ মুখে লেগে থাকার মতো। বিন্নি চালের পিঠা ও পায়েস দুই অনবদ্য। অধুনা ঢাকা শহরের বড় থাই ও কোরিয়ান রেস্টুরেন্টে এই চাল দিয়েই স্টিকি রাইস উইথ ম্যাংগো অ্যান্ড মিল্ক সার্ভ করা হয়। এটি জনপ্রিয় খাবার।

উৎসব

বেশ আগে পত্রিকায় দেখেছিলাম রাজশাহীর একজন কৃষক তার জমিতে ১৫০ ধরনের ধান উৎপাদন করছেন। তিনি ভাবছেন কৃষকরা পুরোনো কিছু ধান উৎপাদন করুক। তিনি কৃষকদের নিয়ে নবান্ন উৎসবও পালন করেন। তখন এসব হারিয়ে যাওয়া চাল দিয়ে বিভিন্ন ধরনের আইটেম রান্না করে অতিথিদের খাওয়ানো হয়। তিনি পঞ্চাশের বেশি বছর ধরে তার গ্রাম দুবোইলে এই চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। খোঁজ নিতে হবে এই উৎসব এখনও চলছে কি না?

ভাতের অভাবই বড় অভাব

এদেশে এত বেশি মানুষের ভাতের জোগান দিতে হয় বলে এখন কৃষকরা ধান নিয়ে গবেষণা করতে পারেন না। তাদের বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা অনুযায়ী এমন ধান আবাদ করতে হচ্ছে, যার ফলন অনেক বেশি। চিকিৎসকরা যতই বলুন না কেন ভাত কম খেতে, কিন্তু ভাতের চাহিদা বাড়ছেই বাঙালির। সময়মতো চাল বাজারে না পেলে কবির মতো বাঙালিও রেগেমেগে বলে উঠতে পারেন-

“সর্বপরিবেশগ্রাসী হলে সামান্য ভাতের ক্ষুধা

ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসে নিমন্ত্রণ করে।

দৃশ্য থেকে দ্রষ্টা অব্দি ধারাবাহিকতা খেয়ে ফেলে

অবশেষে যথাক্রমে খাবো: গাছপালা, নদী নালা’…

ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।”

লেখক: সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

মন্তব্য

মতামত
How to be austerity in the rise of commodity prices

পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কৃচ্ছ্রসাধন হবে কীভাবে

পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কৃচ্ছ্রসাধন হবে কীভাবে
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম এখন বাড়লে এই দামের এলসি করা পণ্য দেশে আসতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। কিন্তু বিক্রেতারা তো আকাশের দিকে তাকিয়ে দাম বাড়ায়, যার কোনো ভিত্তি নেই। সেটার সুরাহা হবে কীসে? এমনকি তদারকি সংস্থা এ বিষয়টি সামনে রেখে কাউকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায়ও আনেনি। ফলে বিক্রেতারা কারসাজি করতে সাহস পাচ্ছে।

বাজারে স্থিতিশীলতা নেই। বাজারে যাওয়ার আগে কোন জিনিসের দাম কত তা ঠিক করে বসানো যাবে না। আমরা শৈশবে দেখেছি আমাদের বাবা-কাকারা আমাদের মা-কাকিদের কাছে কী আছে, কী নেই সব শুনে তালিকা তৈরি করতেন। কারণ তখন বাজার এত হাতের কাছে ছিল না। তাই হাটবারে গিয়ে এক সপ্তাহের বাজার করে আসত। তালিকা করার সময় গুণে গুণে হিসাব করত কী আছে কী নেই। দাম তাদের মুখস্থ ছিল। তাই পণ্যের সামনে দাম বসিয়ে হয় টাকা অথবা ওই পরিমাণ মূল্যের সবজি বা পাট (তখনকার স্বর্ণসূত্র) নিয়ে বাজারে বিক্রি করে সপ্তাহের সাত-সদাই কিনে আনত। এখন আর সেদিন নেই। বাজারে কবে কোন জিনিসের মূল্য কত হবে সেটা বাজারে না গিয়ে বলার উপায় নেই।

করোনায় অর্থনীতির ক্ষত শুকিয়ে উঠতে না উঠতেই রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্যের বাজার চড়া হতে শুরু করল। সরকার বলেছিল, বাজারে কেউ বেশি দাম রাখতে পারবে না, টাস্কফোর্স নিয়োগ করা হবে। চল্লিশটি পণ্যের দাম বেঁধে দেয়া হবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সেকথা শোনেনি। রোজা রেখে মানুষ সাধ্যাতীত দামে পণ্য কিনেছে। অর্থাৎ সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বরং সারা বিশ্বের সয়াবিন মূল্য টপকিয়ে একদিনে ৩৮ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে জনগণের কথা না ভেবেই। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে সেই এক বুলি দিয়ে সয়াবিনের অতিরিক্ত মূল্যকে জায়েজ করা হলেও দেখা গেল বাজারে সয়াবিন নেই। ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সয়াবিনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দেশের মানুষকে জিম্মি করেছে। সরকার পরে মজুত তেল বের করল।

বাণিজ্যমন্ত্রী বললেন, তিনি ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করে ভুল করেছেন। কিন্তু তারপরও তেলের বাজার অস্থিতিশীলই রইল। ভুলের মাশুল কীভাবে পূরণ হলো আমরা বুঝলাম না। বাজারে এখন এমন কোনো পণ্য পাওয়া যাবে না, যার দাম স্থিতিশীল বা কমেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে কোনো না কোনো পণ্যের দাম। এর মধ্যে আমদানি করা পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে সবচেয়ে বেশি। চাল থেকে শুরু করে ডাল, ভোজ্যতেল, আটা-ময়দা, মসলা পণ্য, মাছ-মাংস, ডিম, শিশুখাদ্যের মধ্যে গুঁড়া দুধ, চিনি এমনকি লবণের দামও বেড়েছে।

পাশাপাশি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য সব ধরনের পণ্যের দামে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। পরিস্থিতি এমন- সপ্তাহ ও মাসের ব্যবধানে এই তালিকা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে পণ্য কিনতে ভোক্তার অবস্থা নাভিশ্বাস। এতে বেশি ভোগান্তিতে আছে নিম্ন আয়ের ও খেটে খাওয়া মানুষ। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মাসের ব্যবধানে এক শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ বেড়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বাড়ছে। সারা বিশ্বের মতো দেশের বাজারেও প্রভাব পড়ছে, এটাই স্বাভাবিক। এসব কথা বলেন আমাদের বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন জাগে বিশ্ববাজার থেকে যেসব পণ্য আনা হয় তার নয় দাম বাড়ল। কিন্তু তবে যেসব পণ্য দেশে উৎপাদন হয়, তার দাম কেন বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে? আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম এখন বাড়লে এই দামের এলসি করা পণ্য দেশে আসতে আরও তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। কিন্তু বিক্রেতারা তো আকাশের দিকে তাকিয়ে দাম বাড়ায়, যার কোনো ভিত্তি নেই। সেটার সুরাহা হবে কীসে?

এমনকি তদারকি সংস্থা এ বিষয়টি সামনে রেখে কাউকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায়ও আনেনি। ফলে বিক্রেতারা কারসাজি করতে সাহস পাচ্ছে। তাই বাজার তদারকি আরও জোরদার না করায় যা হওয়ার তাই হচ্ছে। আমাদের সবজিতে, চালে বিশ্ববাজারের কত প্রভাব পড়েছে? দাম কি সে অনুপাতে আছে? বাজারের দাম কমাতে আইন প্রযোগ করার কোনো লক্ষণ নেই। ১ হাজার লিটার তেল মজুত করার শাস্তি যদি হয় একলাখ টাকা তাহলে মজুতদারি বন্ধ হবে কি?

বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে পণ্য নিয়ে কারসাজি রোধে বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে। এবার অসাধু পন্থায় পণ্যের দাম বাড়ালে জরিমানার সঙ্গে জেলে দেয়া হবে। জেলে কি আসলেই দেয়া হবে না এ শুধু কথার কথা এ নিয়ে ভিন্ন ভাবনা আছে।

দুই.

সম্প্রতি গোপালগঞ্জ গিয়েছিলাম। গোপালগঞ্জ যেতে ফরিদপুর অতিক্রম করলেই চোখে পড়ে রাস্তার দুপাশে পাকা ধান সোনালি বরন হয়ে আছে। চোখ জুড়ানো মন ভুলানো সে দৃশ্য। গোপালগঞ্জ থেকে কোটালীপাড়া যাওয়ার পথে চোখে দৃশ্যমান হলো বিলভরা ধান। কিন্তু কাটার লোক নেই। মাঝে মধ্যে ২/৪ জন কৃষকের দেখা মেলে যারা ধান কেটে নিজে ও ছোট বাচ্চাদেরে দিয়ে ধান বাড়িতে নেয়ার চেষ্টা করছে। কথা বলে জানা গেল এবার ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। বিঘা প্রতি ৫০/৬০ মণ ধান হয়েছে। প্রতি বিঘার ধান কাটতে ১০ হাজার টাকা বললেও কেউ কাটতে আসছে না। আগের মতো দক্ষিণাঞ্চল থেকেও ধান কাটতে কেউ আসে না। কারণ সড়ক উন্নয়ন ও ব্যাটারিচালিত রিকশা। ধান কেটে যে টাকা পাওয়া যায়, তার চেয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশায় আয় বেশি। ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেল, তারা কৃষির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

আগে সব ফসল ফলালেও দাম পেত না। ফলে ফসল চাষ করতে গিয়ে একদিকে এনজিওর লোন নিতে হতো। আর সেই কিস্তি শোধ করতে মহাজনের কাছ থেকে সুদও আনতে হতো। তারা পড়তো শাখের করাতের মধ্যে। কৃষিঋণ কৃষকের হাতে সরাসরি দেয় না। দালাল লাগে। দালাল ও ব্যাংকে টাকা দিয়ে ঋণের সমুদয় টাকা আর ঘরে যায় না। কিন্তু সুদ ৫ হাজারের। সবদিকে সংকট। এরপর পুলিশ কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যায়। ঋণখেলাপিদের বাঁধে না বাঁধে কৃষকদের। তাছাড়া অন্যের জমিতে কাজ করলে কিছু বাজে কথা শুনতেই হতো। মন খারাপ হতো। সঠিক মজুরি পাওয়া যেত না। এখন গাড়ি চালাই, সম্মান আছে সুখও আছে।

কৃষকই জানে ফসল ফলানোর নিয়ম। তাই কৃষকদের সমিতি করে ছোট কোনো পরিবহন কিনে দিলে এরা বাজারজাত করলে সঠিক মূল্য পেলে কৃষি আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে। এমনটা হলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার অর্জনটা রক্ষা পাবে। যে দেশে ধান ছিটালে ফসল ফলে থাকে সেদেশে খাদ্য আমদানির কোনো দরকার আছে বলে মনে হয় না।

শুধু কৃষি খাতের দিকে নজর দিলে এবং এখনও যে প্রজন্ম কৃষিকাজ জানে তাদের কাজে লাগালে ফসল ফলবে। আবার দেশ হবে প্রকৃত অর্থে কৃষিপ্রধান। কৃষক তার ফসল নিজে বাজারে নিলে বাজার অস্থিতিশীল হবে না। বাকিটা সামলাতে সরকারের বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে জোরদার করতে হবে। সবাই দেশপ্রেম মাথায় নিয়ে কাজ করলে আমাদের দেশে সার্বিকভাবে সংকট হওয়ার কথা নয়।

এখন চলছে বোরো মৌসুম। এসময়ে চালের দাম বাড়ার কথা না। কিন্তু কিছু মিল থেকে দাম বাড়ানো হয়েছে। আবার বড় কিছু কোম্পানিও ধান মজুত করছে। যে কারণে ভরা মৌসুমেও চালের দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। বাড়ছে না শুধু আয়। চাল-ডাল, তেল, মাছ-মাংস সব পণ্যের দাম বাড়তি। সাবান-ডিটারজেন্টসহ নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম বাড়ছেই। এই বাড়তি মূল্য কেন? কারা বাড়ায় এই দাম। সাধারণ মানুষ সবই জানা ও বোঝার কথা। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেমিক তৈরি না হলে এই সংকট নিরসন সম্ভব না।

তিন.

গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অনেক জায়গায় এখন মানুষের একবেলা খেতেই কষ্ট হচ্ছে এবং সারা বিশ্বেই এই অবস্থা বিরাজমান। তারপরও তার সরকার এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সক্ষম হলেও আমদানিনির্ভর এসব পণ্যের প্রভাব তো অর্থনীতিতে পড়বেই। কারণ উৎপাদন যেমন হ্রাস পেয়েছে, তেমনি শিপমেন্ট ব্যয় বেড়ে গেছে। যে কারণে দেশের ভেতর একটু মূল্যস্ফীতি বা জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সবাইকে এটুকু অনুরোধ করব যদি একটু সাশ্রয়ী হন, মিতব্যয়ী হন বা সব ব্যবহারে যদি একটু সতর্ক হন তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’ কিন্তু কথা হলো আমাদের দেশের যে শ্রেণিটা হঠাৎ করে বিত্তবান হয়ে গেছে, পিকে হালদার, ডেসটিনির রফিকুল আমিনদের গোত্রের লোক বা সিন্ডিকেটের লোকজন ছাড়া এখন কারো এমন সাধ্য নেই যে অমিতব্যয়ী হবে। বরং এই মুহূর্তে ট্রাক সেল বন্ধের সিদ্ধান্ত তুলে নেয়া হলে বাজার যেভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাচ্ছে তাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বলতে কিছু থাকবে না। পক্ষান্তরে মধ্যবিত্তরাই দেশের প্রাণ, দেশের শিল্প-সংস্কৃতির আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। করোনায়ও এরা প্রণোদনা পায়নি। বঞ্চনায় এই শ্রেণিটি ধুঁকছে। সব কিছু ভেবে ব্যবস্থা নিলে আমাদের সংকট নিরসনযোগ্য বলে মনে হয়।

লেখক: গবেষক-প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
বাজার গরম: এবার রোজাদাররা স্বস্তি পাবে তো?
সুশাসনের চাবুকে সিন্ডিকেটকারীদের শায়েস্তা করুন: ইনু
নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল: সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী
নিত্যপণ্যের আমদানি কর প্রত্যাহার করবে সরকার
দীর্ঘ লাইনে দীর্ঘশ্বাস

মন্তব্য

p
উপরে