× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য

মতামত
Village Transformation Three Decades of Observation
hear-news
player

গ্রাম রূপান্তর: তিন দশকের পর্যবেক্ষণ

গ্রাম-রূপান্তর-তিন-দশকের-পর্যবেক্ষণ
গ্রামগুলোয় দারিদ্র্য কমেছে, তবে বেড়েছে বিচ্ছিন্নতা। আগে সাত গ্রামের মানুষ ঈদের নামাজ এক জামাতে আদায় করত, এখন তা সাত গ্রামে আলাদাভাবে আদায় হয়। ডায়রিয়া-কলেরার মতো জীবাণুঘটিত রোগের বদলে এসেছে ডায়াবেটিস ও ব্লাড প্রেশারের মতো জীবনাচারজনিত রোগবালাই।

তানোর-গোদাগাড়ী রাজশাহী জেলার দুটি উপজেলা। বরেন্দ্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তানোর-গোদাগাড়ীর গ্রামগুলোর রূপান্তর পর্যবেক্ষণ করছি প্রায় তিন দশক। এই রূপান্তরের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ইতিবাচকতা এবং পেছনে কিছু নেতির ছায়া। যা যা বদলে যেতে দেখেছি, সেগুলো তুলে ধরছি।

সড়ক যোগাযোগ

গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ সূচকে এ এলাকা বেশ এগিয়ে। শুধু গ্রামের সংযোগ সড়ক নয়, গ্রামের অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ অর্থাৎ একপাড়া থেকে আরেক পাড়ায় যাওয়ার ক্ষেত্রেও সড়ক যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। গত শতাব্দীর ৯০-এর আগে তানোরে উপজেলা সড়ক ছাড়া আর কোনো পাকা সড়ক ছিল না। সেখানে এখন প্রায় প্রতিটি গ্রাম পাকা সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত। এ সংযুক্তি উন্নয়নের মূল কারক হিসেবে কাজ করছে। সড়কের পথ ধরে আসছে সমৃদ্ধি।

সড়ক যোগাযোগের বিস্তৃত প্রভাব পড়েছে জনজীবনের সকল সূচকে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বাণিজ্য সব ক্ষেত্রে এসেছে অভাবনীয় অগ্রগতি। তবে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি ছোট-বড় নদী ও খাড়িগুলো সচল রাখা গেলে সেচ কাজ, পানিপথ নির্ভর চলাচল সহজতর হতো, যা জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ফেলতে ইতিবাচক প্রভাব।

পরিবহন ও চলাফেরা

সড়ক পাকা হওয়ায় গরুর গাড়ি আজ প্রায় অপসারিত। সে স্থান দখল করেছে ভ্যান, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, মোটরসাইকেল ও ছোট লরি। মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার অবলীলায় গ্রামে ঢুকে যাচ্ছে ।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে এসেছে গতিশীলতা। যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষের সময় ও ব্যয় কমেছে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, যে গ্রামে একসময় দুটি মটরসাইকেল ছিল, সেই গ্রামে এখন তা ১৪টি। গ্রামের মানুষ সার্বক্ষণিক চলাচলের সুযোগ পেয়েছে।

বিদ্যুৎ

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে এ এলাকাটি পল্লি বিদ্যুতের আওতায় আসে। বিদ্যুৎ সার্বিক জীবনযাত্রা, পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। চাষাবাদের জন্য স্থাপিত গভীর নলকূপগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। বাড়িঘরে বিদ্যুৎ সংযোগের ফলে নতুন নতুন অনেক চাহিদা তৈরি হয়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে বিদ্যুৎ সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাছ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় ফিড, কোল্টস্টোরেজ ও বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানা আজ শহর সংলগ্ন গ্রামগুলোতে গড়ে উঠছে। বিদ্যুৎ হয়ে উঠছে অগ্রসরতার বিশেষ সূচক।

জমি

তিনটি ‘জ’– জন, জমি ও জলের সমন্বয় গড়ে উঠছে উন্নয়নের নতুন পাটাতন। বরেন্দ্রের জমি বহুমাত্রিক উৎপাদনের জন্য বুক উদাম করে দিয়েছে। যে জমিতে কেবল ধান চাষ হতো, সেখানে আলু, পটল, করলা, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ জমে উঠেছে। জমির পেট আর খালি রাখার সময় নেই। সবুজ প্রান্তর সবসময় রত্নগর্ভা।

বেড়েছে মানুষের সৃজনশীলতা। নতুন নতুন চাষাবাদ ও সৃজনে কৃষক পারঙ্গম হয়ে উঠছে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার চাষাবাদকে সহজ করছে। গরুর লাঙ্গল ও মই ফেলে কৃষক এখন কম্বাইন্ড হারভেস্টর ও ধান মাড়াই মেশিন, হ্যারো মেশিন, সার ও কীটনাশক ছিটানোর জন্য নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। জৈব সারের পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক।

সমস্যা হলো কৃষক জেনে বা না জেনে জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছে। এর মূল লক্ষ্য কেবল উৎপাদন বৃদ্ধি। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে আমলে নেওয়া হচ্ছে না। যদি জমি কোনো কারণে তার উৎপাদনশীলতা হারিয়ে ফেলে তাহলে এক মহাবিপর্যয় নেমে আসবে। কৃষিজমির স্বাস্থ্য সুরক্ষা অতি জরুরি।

গ্রামগুলো থেকে যারা জীবন ও জীবিকার কারণে শহরে অভিবাসী হয়েছে, তাদের জমিজমা অন্যেরা চাষাবাদ করছে। এতে জমির মালিক ও বর্গাচাষি উভয়েই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

গভীর নলকূপ ও কৃষি উৎপাদনে বৈচিত্র্য

এক সময় বরেন্দ্রের জমি ছিল এক-ফসলি। এ অঞ্চলে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে গভীর নলকূল স্থাপন শুরু হয়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে এক-ফসলি জমি তিন ফসলি জমিতে উন্নীত হয়। উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের আয় বাড়তে থাকে।

উৎপাদন ব্যবস্থার অমূল পরিবর্তনে তিন দশকে এ এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিয়েছে। খাবার নিশ্চয়তা এসেছে। আশির দশকে প্রতিবেশীর ভালো জামা পরে বিয়ে করতে যাওয়া বা জুতা/স্যান্ডেল ধার করে বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যেত। এখন সেটা চিন্তাও করে না কেউ। সবকিছুতে রূপান্তরের ছাপ সহজেই চোখে পড়ছে।

তবে হালে গভীর নলকূপ ব্যবস্থাপনা, পানির দাম ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পড়ে যাওয়া গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রজেক্ট নির্ভর চাষাবাদ ও কৃষিতে নয়া সামন্তবাদ

শুরু হয়েছে গভীর নলকূলকেন্দ্রিক প্রজেক্ট নির্ভর চাষাবাদ। এতে শহরের বা আধাশহরের লগ্নিকারীরা গ্রামে যাচ্ছে। স্থানীয় ফড়িয়া বা গভীর নলকূপের মালিকদের সঙ্গে তাদের নতুন নেক্সাস তৈরি হয়েছে। কৃষক নিজের পছন্দ মতো জমি চাষাবাদের অধিকার হারাতে বসেছে। এটিকে অনেকে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় নয়া সামন্তবাদ হিসেবে চিহ্নিত করছে। মাটির নিচে পানির প্রকৃত মালিক জনগণ। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনা জরুরি, যাতে পানি নিয়ে কেউ কৃষককে জিম্মি করতে না পারে।

আবাদি জমি কমছে

জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে প্রতি বছর আবাদি জমি কমছে। ঘন বসতির এ দেশে জমির পরিমাণ কমে গেলে খাদ্য উৎপাদন যে হুমকির মুখে পড়বে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকার কৃষিজমি সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিলেও তার কার্যকর প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

গ্রামে খোলা জায়গা, মাঠ বা উন্মুক্ত প্রান্তর সীমিত হয়ে পড়ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে জমির চাহিদা বাড়ছে অবিশ্বাস্য গতিতে। সরকারি খাসজমির বড় একটা অংশ রয়েছে ক্ষমতাশালীদের দখলে।

রেডিও, টিভি, কম্পিউটার ও মোবাইল

আশি বা নব্বইয়ের দশকে গ্রামে রেডিও থাকলেও টেলিভিশন ছিল দুর্লভ। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা স্থানীয় ক্লাবগুলোয় টেলিভিশন থাকত। চেয়ারম্যান সাহেবদের বাসা বা ক্লাবে গিয়ে মানুষ টেলিভিশন দেখত। টেলিভিশনে মাত্র দুটো চ্যানেল দেখা যেত। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও কলকাতার দূরদর্শন। চ্যানেল নির্বাচনের ক্ষেত্রে দর্শকের কোনো পছন্দ ছিল না। টেলিভিশন যাদের নিয়ন্ত্রণে তারাই চ্যানেল নির্বাচন করত। কেবল পুরুষেরা এসব টেলিভিশন দেখার সুযোগ পেত। এখন পরিবারের নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোর সবাই একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখার সুযোগ পাচ্ছে।

আজ কমবেশি প্রতিটি বাড়িতে টেলিভিশন সেট ও ৬০টি চ্যানেল। স্কুল, ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক ও পোস্টঅফিসগুলোতে কম্পিউটার সুবিধা চালু হয়েছে। গ্রামের বাজারগুলোতে কম্পিউটার শপ চালু হয়েছে। কমবেশি সবার হাতে মোবাইল প্রযুক্তি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে অসংখ্য ভার্চুয়াল কমিউনিটি গড়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সোশ্যাল এজেন্ডা নিয়ন্ত্রণ করছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে।

ইন্টারনেট

গ্রামে গেছে ওয়াইফাই ইন্টারনেট সংযোগ। তানোর-গোদাগাড়ীর আলোকছত্র, প্রসাদপাড়া, পলাশী ও চকতাঁতিহাটি গ্রামে এসেছে ক্যাবলবিহীন ওয়াইফাই ইন্টারনেট। কেবল স্বচ্ছল নয় আদিবাসী সাঁওতাল পল্লীও স্যাটেলাইট টিভির সংযোগের আওতায় এসেছে। তৈরি হয়েছে স্যাটেলাইট সংস্কৃতি উপভোগের অবারিত দিগন্ত।

এ সুযোগ কেবল মনোজগত নয়, পোশাক-আশাক ও খাদ্যভ্যাসেও নিয়ে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

খাদ্যাভাস

খাদ্যভ্যাসে এসেছে আমূল পরিবর্তন। প্যাকেটজাত খাবার আর কোমল পানীয় স্বাভাবিক খাদ্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে। গ্রামের মোড়ে মোড়ে নানা পণ্যের সরগরম বাজার জমে উঠেছে। এ দোকানগুলো প্রায় সারাদিন খোলা থাকে। একসময় মানুষ স্থানীয় হাটে সপ্তাহে একবার বাজার করার সুযোগ পেত। এখন সেই সুযোগ থাকে সারাক্ষণ।

সকালের নাস্তার মেন্যু এখন বদলে গেছে। পান্তা বা কড়কড়া ভাতের (রাতের খাবার পর থেকে যাওয়া ভাত) পরিবর্তে সে জায়গা দখল করছে পরাটা, ডিম পোচ ও মিষ্টি।

পাকাবাড়ি

প্রতিটি গ্রামে বলা যায় ৩০-৫০ শতাংশ বাড়ি আজ পাকা। জানা গেল মাটি দিয়ে বাড়ি বানাতে খরচ পাকা বাড়ির তুলনায় কোনো অংশে কম নয়। শহরের আদলে বাড়ির সঙ্গে অ্যাটাচড বাথরুম ও রান্নাঘর হচ্ছে। অধিকাংশ বাড়িতে নিজস্ব ভূগর্ভস্থ পানির নলকূল।

খাবার পানি

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক গ্রামে খাবার পানির সংকট ছিল। বিশেষত খরার সময় চাপকলগুলোতে পানি পাওয়া যেতে না। সেখানে কমবেশি প্রতিটি বাড়িতে এখন নলকূল। বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের ফলে পানিবাহিত রোগ-ব্যাধি যেমন-ডায়রিয়া ও কলেরার প্রকোপ কমেছে।

যেসব বাড়িতে নিজস্ব গভীর নলকূল নেই, তারা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক সরবরাকৃত কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্পের পানি ব্যবহার করছে। এ জন্য মাথাপিছু প্রতি মাসে ১০ টাকা করে দিতে হচ্ছে। গ্রামের মধ্যে বাসানো হয়েছে পানির পয়েন্টগুলো।

আদিবাসী সাঁওতাল পল্লিতেও রিজর্ভার দিয়ে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। দূর হয়েছে খাবার পানি সংকট। বিশুদ্ধ খাবার পানিতে জনগণের শতভাগ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়েছে।

গৃহের বাসনকোসন ও আসবাবপত্র

গৃহের আসবাব ব্যবহারের ক্ষেত্রে অমূল পরিবর্তন এসেছে। মাটির চুলা প্রায় নেই বললেই চলে। গ্যাসের চুলা, ফ্রিজ, কোথাও কোথাও ওভেন, প্রেশার কুকার, ইলেক্ট্রনিক চুলা এখন ঘরে ঘরে।

গ্রামের মানুষ খেজুরের পাতার পাটির পরিবর্তে ডায়নিং টেবিল ব্যবহার করছে। কাসার থালা ও গ্লাসের পরিবর্তে সিরামিক ও ম্যালামাইনের ব্যবহার বেড়েছে। বাড়িতে চকচকে টাইলস, শহরের আদলে টবে বর্ণিল ফুলের গাছ সহজেই চোখে পড়ছে।

শিক্ষা-দীক্ষা

আর্থিক সামর্থ্য বাড়ায় এলাকাবাসী তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে পারছে। এলাকায় গড়ে ওঠেছে স্কুল, কলেজসহ নানামুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সঙ্গে বেড়েছে প্রাইভেট ও কোচিংয়ের প্রববণা। স্কুলগুলোয় ছেলে-মেয়ের উপস্থিতি প্রায় সমান সমান। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতের পরিমাণ বাড়ায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। আবার অনেক শিক্ষিত যুবক চাকরি না খুঁজে আলু বা মাছ প্রজেক্ট ও গরু-ছাগলের খামার করছে। উদ্যোক্তা সৃষ্টির এক নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

প্রবাসী শ্রমিক

যুবকদের একটা বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। ফলে বিদেশ থেকে অর্থ আসছে যা তাদের পরিবারের জীবনমান বদলে দিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রবাসী শ্রমিকেরা কেবল অর্থই পাঠাচ্ছে না, সঙ্গে করে তারা অনেক মূল্যাবোধ বয়ে আনছে যেগুলো তাদের পরিবার ও নিজস্ব পরিসরেও চর্চিত হচ্ছে।

টয়লেট

গ্রামের মানুষ দ্রুত অনেক কিছু আত্মীকরণ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো টয়লেট। এতো দ্রুত গ্রামের মানুষ বাড়ি থেকে স্থাপিত দূরবর্তী টয়লেটগুলো শোবার ঘরের সঙ্গে প্রতিস্থাপন করেছে, ভাবতে অবাক লাগে। কারণ এক সময় গ্রামের মানুষ টয়লেট বা পায়খানা বাড়ি থেকে দূরে তৈরি করতে পছন্দ করত।

এমনকি অধিকাংশ বাড়িতে কোনো টয়লেট ছিল না। উন্মুক্ত স্থানে মল ত্যাগ ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। এখন অনায়াসে নির্মল বাতাস নেওয়া যায়। নানারকম রোগব্যাধি প্রতিরোধে এ টয়লেটগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ব্যাংক ও অনলাইল ব্যাংকিং

ব্যাংকিং সুবিধা গেছে মানুষের দোরগোড়ায়। প্রবাসী শ্রমিকেরা সহজেই বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছে। বিকাশ, নগদসহ সব ধরনের অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সুবিধা হাতের মুঠোয়। আর্থিক সেবা সহজীকরণ মানুষের জীবনমান আমূলে বদলে দিচ্ছে। কমবেশি সবাই অনলাইন অ্যাকাউন্ট মেইনটেন করছে।

রোগব্যাধি

গ্রামগুলোয় জীবাণুঘটিত সংক্রামক রোগের পরিবর্তে জীবনাচারজনিত রোগের খপ্পরে পড়েছে। কায়িক পরিশ্রমের প্রবণতা কমেছে। আগে ডায়রিয়া, কলেরা, হাম-গুটি বসন্তের পরিবর্তে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ব্লাড প্রেশারের প্রবণতা বাড়ছে। এসবের চিকিৎসা বাবদ গ্রামের মানুষকে এখন অনেক অর্থ খরচ করতে হয়।

ঘাটচর্চা

সকালবেলা পুকুরপাড়ে ঘাটে বসে গ্রামের নারীরা যেসব বিষয়আশয় চর্চা করতেন, তা দূরে সরে গেছে। বাড়িতে স্যাটেলাইট টিভি ও মোবাইল ফোন পরচর্চা কমিয়ে আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া গ্রামের নারীদের কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। কাজের প্রতি যে জেন্ডার পক্ষপাত ছিল তাও কমে এসেছে। গ্রামগুলো ঘুরে দেখা গেছে নারীরা গরু পালন করছেন, সবজি খেতে কাজ করছেন। একইভাবে পুরুষরাও ঘর-কন্নার কাজে সহায়তা করছেন।

বিনোদনকেন্দ্র

এ এলাকা সংলগ্ন দুটি বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। একটি ফুলবাড়িতে আরেকটি চাঁন্দুয়া বিলে। বেশ বড়সড়ো পরিসরে বিনিয়োগ হয়েছে। গ্রামের শিশু-কিশোরেরা নানা উৎসব ও পার্বনে সেগুলোতে নিয়মিত যাচ্ছে। আনন্দ উপভোগ করছে। বিনোদন কেন্দ্রগুলো নতুন জনপরিসর তৈরি করছে।

দারিদ্র্য ও সামাজিক বিচ্যুতি

দারিদ্র্যের হার কমে এসেছে। গ্রামগুলোতে দারিদ্র্যজনিত ঝগড়া-বিবাদ, মামলা-মোকদ্দমা নেই বললেই চলে। তবে সামর্থ্য বাড়ার কারণে মানুষের ভেতর বিচ্ছিন্নতাও বেড়েছে। আগে সাত গ্রামের মানুষ ঈদের নামাজ এক জামাতে আদায় করত, এখন তা সাত গ্রামে আলাদাভাবে আদায় হয়।

রাজনীতি

গ্রামের অধিকাংশ মানুষ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। গ্রাম্য রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির ছায়া পড়েছে গ্রামগুলোয়। আশির দশকে গ্রামে টাউট-বাটপারের আধিক্য ছিল, তা কমে এসেছে। সেই জায়গা অনেকটা দখল করেছে রাজনৈতিক টাউটরা। রাজনীতির বিষয়-আশয় আজ সমাজের সবচেয়ে প্রাধান্যশীল এজেন্ডা। সামাজিক এজেন্ডাগুলো সরে গিয়ে রাজনীতি মূল কনটেন্ট হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে। চায়ের দোকান, চুল কাটার সেলুন ও উন্মুক্ত প্রান্তরগুলো বাধ্যতামূলক গল্প শোনার ক্ষেত্র হিসেবে বিকশিত হচ্ছে।

মানুষের মধ্যে সম্পদের মালিকানাবোধ তৈরি হচ্ছে। খাবারের নিশ্চয়তা এসেছে। জাম-কাপড়, গয়নাগাঠি, আসবাবপত্র, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, সবজি চাষ ও বসতভিটা, বাড়ি-ঘরের মালিকানা তৈরি হচ্ছে।

সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় অমূল পরিবর্তন এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক চিত্রের খোলনলচে বদলে দিচ্ছে।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, কলাম লেখক

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
Sheikh Hasinas return and expected Bangladesh

শেখ হাসিনার ফিরে আসা ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার ফিরে আসা ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ
পিতা বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর তিনি দুঃসহ সামরিক শাসনে ক্ষত-বিক্ষত দেশের ক্ষত সারিয়ে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন বিশ্বদরবারে। তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করলে বাংলাদেশ ও দেশের অসহায়, নির্যাতিত মানুষ এসব থেকে বঞ্চিত হতো।

১৯৮১ সালের ১৭ মে। ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ। রোববার। ঢাকায় তখন ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিবেগে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি তো ছিলই। কিন্তু ১৫ লাখ মানুষ সেদিন ঝড়-বৃষ্টির কোনো তোয়াক্কাই করল না। সেদিন যেন সবার ঠিকানা ছিল কুর্মিটোলা বিমানবন্দর। কুর্মিটোলা থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত তাকে এক নজর দেখার আশায় রাস্তার দুপাশে সেদিন অপেক্ষমাণ ছিল লাখ লাখ মানুষ। সেদিন দীর্ঘ ছয় বছর পর তিনি স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন বিকাল সাড়ে তিনটার পরে।

তিনি এসেছেন! তিনি বাংলার মাটিতে ফিরে এসেছেন!

বিমান থেকে নেমে প্রথমেই তিনি চুমু খেলেন বাংলার মাটিতে। কারণ এ মাটি যে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে রঞ্জিত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পদধূলিতে গর্বিত। এ মাটিতে তারও স্বদেশ ভূমির মাটি। ওদিকে তাকে দেখেই সেদিন বাংলার মানুষের কণ্ঠে গর্জে ওঠল স্লোগান-

‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম।’

‘ঝড় বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে।’

‘হাসিনা তোমায় কথা দিলাম-পিতৃহত্যার বদলা নেব।’

তার আগমন ধ্বনিতে স্বৈরশাসকের গদি নিশ্চয়ই সেদিন কেঁপে উঠেছিল। কেঁপে তো ওঠারই কথা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নৃশংস হত্যার মধ্য দিয়ে উল্টো স্রোতে চলছিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতার আদর্শ, মুক্তিযুদ্ধের গর্ব দিন দিন লুণ্ঠিত হতে হতে মিশে যাচ্ছিল মাটির সঙ্গে। বাংলার মানুষেরও দিনবদল ঘটেনি। বরং শোষণের জাঁতাকলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলছিল।

সেদিন তার আগমন বাংলাদেশের মানুষের মনে আশা জাগিয়েছিল নতুন করে। ঠিক যেমন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলার মানুষের স্বাধীনতার আনন্দকে পরিপূর্ণ করেছিল। আর তার আগমনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার আশা জাগল। যেখানে বাংলাদেশ স্বাধীন করা মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন চরম অবহেলিত। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি ছিল ক্ষমতাবান। রাজাকার গোষ্ঠী ছিল পরম আদরণীয়।

তিনি বাংলাদেশকে নতুন করে জেগে ওঠায় অনুপ্রাণিত করলেন। মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তুললেন সত্যিকারের দেশপ্রেম। যদিও তার এই আগমন মোটেই সহজ ছিল না। তার পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ ছয় বছর তিনি ছিলেন নির্বাসিত। সামরিক শাসক ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি তার দেশে ফেরার পথ করে রেখেছিল রুদ্ধ। পদে পদে হুমকি আর বিপদের হাতছানি। দেশে ফেরার কয়েকদিন আগে ১১ মে ১৯৮১ সালে নিউজউইক পত্রিকার সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন- ‘জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেই আমি বাংলাদেশে যাচ্ছি।’

এখন প্রশ্ন আসতে পারে তিনি কেন বাংলাদেশে ফিরলেন? তিনি তো বিদেশে আয়েশি জীবন কাটাতে পারতেন। তার জীবনটা হতে পারত ঝুঁকিমুক্ত, ভাবনাহীন। দেশে ফেরার পর একের পর এক তার জীবনের উপর নানা হুমকি ও হামলা শুরু হলো। কিন্তু তিনি হতোদ্যম হননি। তিনি ভয় পেয়ে বিদেশে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকেননি। সরকার বা বিরোধী দল, যেখান থেকেই হোক, দেশে ফেরার পর থেকে তিনি দেশের মানুষে পাশে থেকেছেন সবসময়।

বঙ্গবন্ধুর মতো তিনিও সৎসাহসী। বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন পাকিস্তানি অন্যায় অত্যাচার থেকে মুক্তির কাণ্ডারি হিসেবে। আর তিনি দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন পাকিস্তানি ভাবধারার শোষণ থেকে দেশের মানুষকে মুক্তির কাণ্ডারি হিসেবে।

বঙ্গবন্ধুর লড়াই ছিল ভিনদেশি, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষার দানব থেকে মানুষকে মুক্ত করা, বাংলার মানুষকে স্বাধীনতার আস্বাদ দেয়া। আর শেখ হাসিনা ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত দীর্ঘ লড়াই করেছেন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, নিজদেশি দানব থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য। বাংলার মানুষের ভাত ও ভোটের অধিকার আদায় করার জন্য।

স্বার্থবাদী পাকিস্তানি কায়েমি গোষ্ঠী ঘাপটি মেরে রয়েছে বাংলাদেশের ভেতরেই। প্রতিকূলতার মধ্যেও মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার তিনি করেছেন ন্যায়ের সঙ্গে। দৃশমান শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করাটা সহজ। কিন্তু অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করা অনেকটা হাওয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো। এই অদৃশ্য শত্রুরা দেশকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি শক্ত হাতে এসব মোকাবিলা করে যাচ্ছেন এখনও।

দেশ পরিচালনায় তার নেতৃত্বের প্রমাণ তিনি দিয়েছেন। প্রমাণ করে দিয়েছেন তার দেশপ্রেম, সততা, দেশের মানুষের প্রতি তার নিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা।

২০১০ সালে নিউইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর অনলাইন জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীর মধ্যে তিনি ছিলেন ষষ্ঠ। ২০১১ সালে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় তিনি ছিলেন সপ্তম। এছাড়া আরও কিছু জরিপে প্রকাশ পেয়েছে তার নেতৃত্বগুণ। শত বাধা পেরিয়ে, আন্তর্জাতিক রক্তচক্ষু উপক্ষো করেও তিনি দেশকে এনে দাঁড় করিয়েছেন মধ্যম আয়ের দেশের দ্বারপ্রান্তে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেলের মতো স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন ‘রূপকল্প ২০৪১’ ও ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’-এর মতো দূরদর্শী পরিকল্পনা।

স্রোতের প্রতিকূলে নৌকার হাল ধরা সহজ বিষয় নয়। সুদক্ষ মাঝি ছাড়া নৌকা দিক হারাবেই। ঠিক তেমনি আদর্শিক স্রোতের বিপরীতে থাকা একটি দেশের হাল ধরাও সহজ কথা নয়। জীবনের ঝুঁকি, ঘরে-বাইরে চক্রান্তসহ নানামুখী সমস্যা সামলে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নেয়ার জন্য সুযোগ্য নেতৃত্বের বড়ই প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে এই সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাব মিটিয়েছে। তার পিতা বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর তিনি দুঃসহ সামরিক শাসনে ক্ষত-বিক্ষত দেশের ক্ষত সারিয়ে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন বিশ্বদরবারে। তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করলে বাংলাদেশ ও দেশের অসহায়, নির্যাতিত মানুষ এসব থেকে বঞ্চিত হতো। তার দেশে ফেরাটা দেশের জন্য কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজন- সেটার স্বাক্ষর তিনি রেখে যাচ্ছেন।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন কয়েক আগে নিউজউইকের ওই একই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানিয়েছিলেন, “জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।”

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুকে ভয় না করে বাংলাদেশে মানুষের কাছে ফিরে প্রথমেই তো তিনি মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। আর দেশের জন্য তার প্রতিনিয়ত যে চিন্তাভাবনা, নিরলস প্রচেষ্টা ও অগ্রগতি- এ তো তার দ্বিতীয় মহত্ত্বের পরিচায়ক।

কাব্যগ্রন্থ চিত্রায় যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবনের কথাগুলোই বলে গিয়েছেন কবিতার সুরে-

...“কী গাহিবে, কী শুনাবে! বলো, মিথ্যা আপনার সুখ,

মিথ্যা আপনার দুঃখ। স্বার্থমগ্ন যেজন বিমুখ

বৃহৎ জগৎ হতে সে কখনো শেখে নি বাঁচিতে।

মহাবিশ্ব জীবনের তরঙ্গেতে নাচিতে নাচিতে

নির্ভয়ে ছুটিতে হবে, সত্যেরে করিয়া ধ্রুবতারা।

মৃত্যুরে করি না শঙ্কা। দুর্দিনের অশ্রুজলধারা।”...

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
‘আম্মা...পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ’
মা দিবসের শুরু কবে
তত্ত্বাবধায়কের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিন আজ
মে দিবসের স্বাক্ষর ও আগামীর স্বপ্ন  
মে দিবসের র‍্যালিতে গেঞ্জি নিয়ে অসন্তোষ

মন্তব্য

মতামত
He returned after losing everything

তিনি ফিরলেন সব হারানোর দেশে

তিনি ফিরলেন সব হারানোর দেশে
শেখ হাসিনা পঁচাত্তরে যে দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন একাশিতে এসে সেই বাংলাদেশ আর ফিরে পাননি। তিনি যে দেশে ফিরে আসেন, সে দেশ তখন পূর্ব পাকিস্তানের ধারায়। যেন সব হারানোর দেশ।

একদিকে সব হারানোর বেদনা, অন্যদিকে জীবনের ঝুঁকি- এমন এক অমানিশার সময়ে তিনি ফিরেছিলেন বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। মৃত্যু তার পিছু সারাক্ষণ, তারপর অবিরাম পথচলা বাংলার পথে-প্রান্তরে। বার বার তাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু শেষপর্যন্ত এখনও বাঙালির ভাগ্যবিধাতা তিনি। আজ বাংলাদেশকে এই পর্যায়ে আনতে তিনি সক্ষম হয়েছেন, যেটা ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। তিনি শেখ হাসিনা। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। আজ তার ৪১তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যেদিন বঙ্গবন্ধুকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করা হয়, তখন শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানা, স্বামী ও দুই সন্তানসহ তখনকার পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। তারা প্রাণে বেঁচে যান।

সময়টা ১৯৮১ সালের ১৭ মে। সেদিন রাজপথে নেমেছিল জনতার ঢল। সবার চোখের দৃষ্টি কুর্মিটোলা বিমানবন্দর। পথের দুই ধারে লাখো মানুষের মিছিল। রাস্তায় ট্রাক, গাড়ির সারিবদ্ধ শোভাযাত্রা। উপলক্ষ, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন পর ঢাকায় আসছেন। দিনমজুর এক রিকশাচালকের উক্তি ছিল এমন- দেইখ্যা আসেন কুর্মিটোলা এয়ারপোর্ট, শেখের বেটির লাগি কাতারে কাতারে মানুষ জমছে সকাল থাইক্যা। শেখ মুজিবুর যেই দিন ফিরছিল যুদ্ধের পর, এমুন মানুষ সেই দিনও হয় নাই। (সূত্র: সচিত্র সন্ধানী)

সচিত্র সন্ধানীর ভাষায়: বিমানবন্দরের কাছাকাছি অপেক্ষমাণ জনতার কোঁচড়ে মুড়ি-চিড়ার স্পষ্ট আভাস দেখা যাচ্ছিল। দূর থেকে যাত্রা করে এঁরা এসেছেন। অসুস্থ, রুগণ, কিশোর-যুবক বাদ যাননি। সবার চোখ রানওয়ের দিকে। আসমানের অবস্থা দুইদিন ধরেই খারাপ যাচ্ছে। কী জানি কেমন যাবে আজকের দিন। কালো মেঘ জমছে। বিমানবন্দর ছেয়ে গেছে গাড়ি আর মানুষে। ভিআইপি লাউঞ্জে ঢোকার গেট, গেটের ওপর ছাদ, লোকে লোকারণ্য। মানুষের চিৎকার, কথা, ঠেলাধাক্কা সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে শেখ হাসিনার আগমনবার্তা।

কুর্মিটোলা থেকে শেরেবাংলা নগর, জনস্রোতে মিশে প্রায় তিন ঘণ্টায় শেখ হাসিনা শেরেবাংলা নগরে পৌঁছালেন। ঝড়বৃষ্টিতে নগরজীবন প্রায় বিপন্ন। রাস্তাঘাটে স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়ে গেছে। কিন্তু ঝড়বৃষ্টি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি জনতার ভালোবাসার কাতারে। শেরেবাংলা নগরে অপেক্ষায় লাখ লাখ মানুষ।

বিমানবন্দর থেকে সোজা মানিক মিয়া এভিনিউয়ে, সেখানে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় গণসংবর্ধনা মঞ্চে লাখো জনতার উপস্থিতিতে এক সমাবেশে শেখ হাসিনা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন- “সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেল সকলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাঁদেরকে ফিরে পেতে চাই।”

গণসংবর্ধনায় ভাষণদানকালে শেখ হাসিনা আরও বলেন, “বঙ্গবন্ধু ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমি জীবন উৎসর্গ করে দিতে চাই। আমার আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। সব হারিয়ে আমি এসেছি আপনাদের পাশে থেকে বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য।” আনন্দঘন ও হৃদয়বিদারক সমাবেশে কর্মীরা মুহুর্মুহু নানা স্লোগানে মুখরিত করে রেখেছিল: ‘শেখ হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শেখ হাসিনা, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, ‘ঝড়বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে’।

শেখ হাসিনা সেদিন বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। কর্মীদের চোখেও ছিল অশ্রুধারা। তখন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের জন্য সময়টা অনুকূলে ছিল না। পঁচাত্তরে খুনিরা তখনও তৎপর সব জায়গায়। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকন্যা পিতার পথ ধরে জীবনের সব ঝুঁকি নিয়ে শুরু করলেন বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। সেদিন তিনি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করলে এতদিনে দেশ পুরোপুরি পাকিস্তানের মতো স্বৈরাচারী, বিশৃঙ্খল ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হতো। শেখ হাসিনা সে অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছেন এবং বাংলার মানুষকে মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র ও অসম্প্রদায়িক চেতনায় অভিসিক্ত করেছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পর ২৫ আগস্ট সকালে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে শেখ হাসিনা স্বামী ওয়াজেদ মিয়া, বোন শেখ রেহানা, শিশুপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং শিশুকন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেনসহ দিল্লি পৌঁছান। ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কোনো খবরাখবর ভারতের পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে না। কাজেই তখনকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা একরকম অন্ধকারে ছিলেন। দিল্লিতে পৌঁছানোর দুই সপ্তাহ পর ওয়াজেদ মিয়া ও শেখ হাসিনা ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎ পান। সেখানেই শেখ হাসিনা ১৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনা জানতে পারেন। এরপর ভারতেই নির্বাসিত সময় কাটে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানার। ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে আওয়ামী লীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতা বিভিন্ন সময় দিল্লি যান তাদের খোঁজখবর নিতে। এরপর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন কয়েক দফায় দিল্লিতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

১৯৮১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনা খবর পান, ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। এর এক সপ্তাহ পরে আওয়ামী লীগের সেই সময়ের শীর্ষ নেতারা দিল্লি যান। আব্দুল মালেক উকিল, ড. কামাল হোসেন, জিল্লুর রহমান, আব্দুল মান্নান, আব্দুস সামাদ, এম কোরবান আলী, বেগম জোহরা তাজউদ্দীন, গোলাম আকবর চৌধুরী, বেগম সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, বেগম আইভি রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ ১৯৮১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে দিল্লি পৌঁছান।

শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কয়েকটি বৈঠক করে তারা। ১৬ মে শেখ হাসিনা ও তার মেয়ে দিল্লি থেকে একটি ফ্লাইটে কলকাতা পৌঁছান। ১৭ মে বিকালে তারা কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছান। তাদের সঙ্গে ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ ও এম কোরবান আলী।

বাস্তবতা ছিল এমন- শেখ হাসিনা পঁচাত্তরে যে দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন একাশিতে এসে সেই বাংলাদেশ আর ফিরে পাননি। তিনি যে দেশে ফিরে আসেন, সে দেশ তখন পূর্ব পাকিস্তানের ধারায়। যেন সব হারানোর দেশ।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৪১ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকার মাটি ছুঁয়ে যে কথা তিনি দিয়েছিলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন। একইভাবে সেদিন ঢাকা শহরে লাখ লাখ কর্মী যে শপথ নিয়েছিল- দেশের সব পরিস্থিতিতেই তাদের মায়ের মতো, বোনের মতো নেত্রীকে আগলে রাখবেন, সেটিই তারা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশে বার বার সংকটাপন্ন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধীদের অপরাধের বিচার হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে-এসবের নেতৃত্বে শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার চারবার দেশ পরিচালনায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময়। বিশ্বদরবারে উন্নয়নের রোল মডেল। স্যাটেলাইট-১-এর উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আকাশ বিজয় করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আকাশ-সমুদ্র-সীমান্ত বিজয় পূর্ণ হয়েছে। সব শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৮২৪ মার্কিন ডলার। রিজার্ভ প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।

অর্থনৈতিক অনেক সূচকে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ধাপে ধাপে পূরণ হয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বা রূপকল্প ২০২১-এর সব কর্মসূচি। স্বাস্থ্য-শিক্ষা, খাদ্য-বিদ্যুৎ, যোগাযোগসহ সব ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে জাজ্বল্যমান পরিবর্তন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ যোগাযোগব্যবস্থায় দৃশ্যমান হচ্ছে আমূল পরিবর্তন। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে এবং বাংলাদেশ উন্নয়নের ধারার জন্য অর্জন করছে অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্ব যখন পর্যুদস্ত, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উত্তীর্ণ।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
মা দিবসের শুরু কবে
তত্ত্বাবধায়কের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিন আজ
মে দিবসের স্বাক্ষর ও আগামীর স্বপ্ন  
মে দিবসের র‍্যালিতে গেঞ্জি নিয়ে অসন্তোষ
চাকরি হারানো পাটকল শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

মন্তব্য

মতামত
The country has moved forward because Sheikh Hasina has returned

শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন বলেই দেশ এগিয়েছে

শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন বলেই দেশ এগিয়েছে
বাংলার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের সংকল্পে শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার দিনটি ইতিহাসের এক বড় সূচনাক্ষণ নতুন অধ্যায়ের। পরতে পরতে সংগ্রামী বঙ্গবন্ধুকন্যার রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা ফেরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগের হাতে। দলীয় প্রধান হিসেবে ইতিহাস তার কাঁধে সমর্পণ করেছিল জাতির কাণ্ডারি হওয়ার দায়ভার। সেই থেকে দারিদ্র্যক্লিষ্ট এই জাতিকে মুক্তি দিতে বিরতিহীন যাত্রা একজন শেখ হাসিনার।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নরঘাতকরা ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এ সময় বিদেশে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে ঘাতকগোষ্ঠী। বাঙালি জাতির জীবনে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে ঘোর অমানিশার অন্ধকার। ঠিক এমনই ক্রান্তিলগ্নে ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাকে সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়ার পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করা হয় জাতির পিতার কন্যার হাতে। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বকে ভয় পায় ঘাতকগোষ্ঠী। খুনি সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান শেখ হাসিনাকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করতে না দেয়ার জন্য সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে প্রিয় স্বদেশভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন শেখ হাসিনা।

দীর্ঘ ৬ বছর নির্বাসন শেষে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। দেশে ফিরে তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার, বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার, স্বৈরতন্ত্রের চির অবসান ঘটিয়ে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সার্বভৌম সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি।

১৯৮১ সালের ১৭ মে ঝড়-বাদল আর জনতার আনন্দাশ্রুতে অবগাহন করে শেরে বাংলা নগরে লাখ লাখ জনতার সংবর্ধনার জবাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেলসহ সবাইকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আপনাদের মাঝেই তাদেরকে ফিরে পেতে চাই।

আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তা বাস্তবায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই, বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়, মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’

ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নীরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ সংগ্রাম শুরু হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে চলে তার একটানা অকুতোভয় সংগ্রাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তখন এদেশের মাটি ও মানুষের কল্যাণে বাস্তবায়ন করেছেন বহুমাত্রিক উদ্যোগ। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি অগাধ প্রেম এবং অক্ষয় ভালোবাসাই হলো তার রাজনৈতিক শক্তি।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা-সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নেও শেখ হাসিনা জনগণের জীবন-জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিঃস্বার্থভাবে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে জাতির অভিভাবক হিসেবে ৩১-দফা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।

জনগণের জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। করোনা সংকটের সময় কেউ যেন না খেয়ে থাকে সেজন্য ব্যাপক খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন। ৫০ লাখ পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন শেখ হাসিনা। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তিনি। বাংলাদেশে পরপর ৩ বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এবং ৪ বার প্রধানমন্ত্রী থাকার নজির আর কারো নেই। গণতন্ত্রকামী বাংলাদেশে নিকষ অন্ধকার ছিল জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়।

পিতৃহত্যার প্রতিশোধের আগুন বুকে চেপে নির্বাসিত ফেরারি জীবনে স্বজন হারানো দুই বোনের ঠিকানা ছিল বিদেশের মাটি; দেশান্তরে উদভ্রান্ত যাত্রায় ৬টি বছর কেটে গেছে তাদের। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা দলের সিদ্ধান্তে এক বজ্রকঠিন ব্রত নিয়ে ১৯৮১ সালে দেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন।

৪০ বছর আগে উদারনৈতিক প্রগতিশীলতার রাজনীতির পরিবেশ ফিরিয়ে, দেশ ও জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার গুরুদায়িত্ব কাঁধে নেয়ার জন্য, শেখ হাসিনা ত্যাগ করেছিলেন সন্তানদের মায়া পর্যন্ত! মাতৃসঙ্গ বঞ্চিত তার দুই সন্তান তখন বিদেশে ছোট বোন রেহানার কাছে। গণতন্ত্র আর সুবিচার নিশ্চিত করার যুদ্ধে তখন বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন। বাংলার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের সংকল্পে শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার দিনটি ইতিহাসের এক বড় সূচনাক্ষণ নতুন অধ্যায়ের। পরতে পরতে সংগ্রামী বঙ্গবন্ধুকন্যার রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা ফেরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগের হাতে।

দলীয় প্রধান হিসেবে ইতিহাস তার কাঁধে সমর্পণ করেছিল জাতির কাণ্ডারি হওয়ার দায়ভার। সেই থেকে দারিদ্র্যক্লিষ্ট এই জাতিকে মুক্তি দিতে বিরতিহীন যাত্রা একজন শেখ হাসিনার। দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে সবার বাসোপযোগী করা প্রগতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের সেই যাত্রা রাজনৈতিক-পারিপার্শ্বিক আর প্রাকৃতিক শত প্রতিকূলতাতেও হার মানাতে পারেনি দৃঢ়চেতা এই নেত্রীকে।

প্রত্যাবর্তনের চার দশকে ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে বরাবরই দেখা গেছে কল্যাণমুখী মানসিকতায় যেকোনো দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সব সামলে নেয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ভূমিকায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের জন্য সুকৌশলে তিনি যুদ্ধ করে চলেছেন প্রাকৃতিক আর মনুষ্যসৃষ্ট সব বাধা-বিপত্তির বিপরীতে। পিতৃহারা শেখ হাসিনা যখন ঢাকায় ফিরেছিলেন সে সময়টাতেও প্রকৃতি ছিল এক রুদ্র মূর্তির বাতাবরণে। কালবৈশাখীর ঝড় সামলে চলার শুরু হয়তো সেই থেকেই। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজও মুখোমুখি এক অদৃশ্য ঝড়ের। নানান সূচকে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছিল সত্যিকারের সোনার বাংলা হয়ে উঠতে, ঠিক তখনই বৈশ্বিক মহামারির বাধা এসে হাজির। সংক্রমণপ্রবণ এক জীবাণুর (করোনাভাইরাস) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এখনও পুরো জাতি। এর মধ্যেও থেমে নেই এর করাল গ্রাস থেকে উত্তরণের চেষ্টা; যার নেতৃত্বও দিচ্ছেন সেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যখন দেশে ক্রমে বেড়েই চলেছে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। ঠিক এর শুরু থেকেই এ যুদ্ধের জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত করেছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। সংক্রমণ রোধে অর্থনৈতিক স্থবিরতা নেমে আসবে জেনেও, দীর্ঘ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে মানুষকে নিরাপদ করার প্রয়াসে নির্দেশ দেন ‘ঘরে থাকার’। অর্থনীতি থেকে শুরু করে পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় সবকিছু থমকে দেয়ার বৈশ্বিক এই দুর্যোগেও বিরতিহীন যিনি শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তিনি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। অচেনা এই দুর্যোগের ধাক্কা সামাল দিতে সমাজের সব শ্রেণির জন্য রাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রতিনিয়তই ‘কিছু না কিছু’ বন্দোবস্তু করে চলেছেন তিনি। আর এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে যার নেতৃত্বে, তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

১৯৮১ সালের এই দিনে তিনি ফিরে এসেছিলেন বলেই আজ অসহায় মানুষের ত্রাতা। তিনিই দিক-নির্দেশক, অর্থনৈতিক মুক্তির অগ্রযাত্রায় বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ভয়কে জয় করে সেদিন তিনি ফিরে এসেছিলেন বলেই বাংলাদেশ আজ এই করোনা-সংকটেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তনের অগ্রনায়ক তিনি। তাকে ঘিরেই সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশ। আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন প্রিয় নেত্রী।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। পরিচালক, এফবিসিসিআই

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার দিন আজ
প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা সোমবার
বিদেশিদের নালিশ না দিয়ে আমার কাছে আসুন: প্রধানমন্ত্রী
‘আম্মা...পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ’
মা দিবসের শুরু কবে

মন্তব্য

মতামত
Baishakhi full moon and Buddhajatak

বৈশাখী পূর্ণিমা ও বুদ্ধজাতক

বৈশাখী পূর্ণিমা ও বুদ্ধজাতক
শান্তি, মানবতা, কল্যাণ, অহিংসার মূর্ত প্রতীক গৌতম বুদ্ধ। আড়াই হাজারের বেশি বছর আগে জন্মেছিলেন এই উপমহাদেশে। দুঃখবাদ থেকে বুদ্ধের দর্শনের উৎপত্তি। আর এই দুঃখবাদই তার ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য।

“... তবু জানি আমাদের স্বপ্ন হতে অশ্রু ক্লান্তি রক্তের কণিকা/ ঝরে শুধু, স্বপ্ন কি দেখনি বুদ্ধ।” (তুমি কেন বহু দূরে/ রূপসী বাংলা/ জীবনানন্দ দাশ)।

শান্তি, মানবতা, কল্যাণ, অহিংসার মূর্ত প্রতীক গৌতম বুদ্ধ। আড়াই হাজারের বেশি বছর আগে জন্মেছিলেন এই উপমহাদেশে। দুঃখবাদ থেকে বুদ্ধের দর্শনের উৎপত্তি। আর এই দুঃখবাদই তার ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য।

রাজকুমার সিদ্ধার্থ মানুষের নিত্যসঙ্গী জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, দুঃখ দেখে তা থেকে মুক্তির উপায় উদ্ভাবনের জন্য রাজঐশ্বর্য, ভোগবিলাস, স্ত্রী-পুত্র সবই ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন গহীন বনে। একাগ্র মনে ছয় বছর কঠোর ধ্যান করে শুভ বৈশাখী পূর্ণিমায় বোধিজ্ঞান লাভের মাধ্যমে তিনি আবিষ্কার করলেন দুঃখ মুক্তির উপায় বা পথ। দুঃখ কী? জন্ম-জরা, ব্যাধি, মৃত্যু। প্রিয়বিয়োগ, অপ্রিয় সংযোগ, ইপ্সিত বস্তুর অপ্রাপ্তি দুঃখ– সংক্ষেপে পঞ্চ-উপাদান স্কন্ধই দুঃখ। অর্থাৎ জন্মগ্রহণ বা দেহধারণ করাটাই দুঃখ।

বুদ্ধ বললেন, এই দুঃখের কারণ আছে। কারণ কী? তৃষ্ণাই দুঃখের কারণ। তৃষ্ণা ত্রিবিধ– কামতৃষ্ণা, ভবতৃষ্ণা, বিভবতৃষ্ণা। অবিদ্যার কারণে তৃষ্ণার উৎপত্তি হয়। এই তৃষ্ণার নিবৃত্তি বা নিরোধ অবশ্যই আছে। দুঃখ নিরোধগামিন প্রতিপাদ্য বা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গই তৃষ্ণা এবং দুঃখ নিরোধের উপায়। এই মার্গে বিচরণ করলে জরা, ব্যাধি, মৃত্যুর অবসান ঘটিয়ে পরম নির্বাণ লাভ সম্ভব হবে।

বুদ্ধ জন্মেছিলেন যখন এই উপমহাদেশে হানাহানি, বর্ণবাদ, বৈষম্যবাদ ও ধর্মের নামে পশুবলি, গোত্রে গোত্রে যুদ্ধবিগ্রহ চলছে। মানবতার এই চরম দুর্দশা দেখে বুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, মানুষ মাত্রেই সমান, মানুষের প্রতি মানুষের হিংসা ও বৈষম্য পরিহার করতে হবে। ধর্মের বা দেবতার নামে প্রাণিবধ বন্ধ করতে হবে। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার চলবে না। মানুষকে তার আপন মর্যাদা দিতে হবে। কোনো প্রাণীকে হিংসা করা যাবে না। সব প্রাণীর প্রতি দয়া ও মৈত্রী পোষণ করতে হবে।

“...এই পৃথিবীর পথে আড়াই হাজার/ বছর বয়সী আমি;/ বুদ্ধকে স্বচক্ষে মহাপরিনির্বাণের আশ্চর্য শান্তিতে/ চলে যেতে দেখে- তবু অবিরল অশান্তির দীপ্তি ভিক্ষা করে/” (তবু, শ্রেষ্ঠ কবিতা, জীবনানন্দ দাশ)।

বুদ্ধ বিশ্বাস করতেন, উপদেশও দিয়েছেন সেই আড়াই হাজার বছর আগে: সর্বজীবের হিতের জন্য, সুখের জন্য, কল্যাণের জন্যই ধর্মজীবন। বুদ্ধ অবশ্য তার নিজের উপদেশকেও অভ্রান্ত বা চিরকালের জন্য মাননীয় বলে নির্দেশ করেননি। কোনো মানুষ সর্বজ্ঞ হতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন না। বুদ্ধ তার উপদেশকে সেতুর সঙ্গে তুলনা দিয়েছেন এক স্থানে। আবার এক স্থানে নদী পার হওয়ার জন্য ‘ভেলা’ হয়েছে তার উপদেশের উপমা। বলেছেনও বুদ্ধ তাই: ‘আমার উপদিষ্ট ধর্মকে ভেলা সদৃশ মনে করিও, ইহা কেবল পার হইবার জন্য, জড়াইয়া ধরিয়া রাখিবার জন্য নহে।’

বুদ্ধ চাইতেন অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের ভেতরের বুদ্ধিকে জাগ্রত করে বুদ্ধ হয়ে ওঠা। তারই উপদেশে ‘আত্মদীপ’ হওয়া। বুদ্ধ ‘ক্ষণিক অনাত্মবাদ’-এর দর্শন তার অনুসারীদের প্রদান করেছিলেন। তবে বলেছিলেন, এই দর্শনেই চিরকাল আটকে থাকতে হবে এমনটা নয়। বরং সত্যানুসন্ধানের পথচলায় এটাকে সেতু বা ভেলার মতো ব্যবহার করে নতুনতর সত্যে পৌঁছে যেতে পারলে এটাকে পরিত্যাগ করাই বাঞ্ছনীয়। বুদ্ধ জগৎ-সমাজ-মনুষ্য সকলকেই ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তনশীল বলে ঘোষণা করেছেন এবং সেই পরিবর্তনশীলতাকে তিনি দেখেছেন ‘কার্যকারণ শৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন প্রবাহ’ রূপে। বুদ্ধ বলতেন, মানুষ নিজেই নিজের ত্রাণকর্তা, নিজেই নিজের সুখ-দুঃখ ও জন্ম মৃত্যুর কারণ।’ আরো বলেছেন, ‘সকল দেহের ক্ষয় হয়, জন্মের সাথে মৃত্যু অনিবার্য; সুতরাং এই চক্র থেকে মুক্তির জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালাও।’

বুদ্ধ মনে করতেন মানুষের মৃত্যুর পর তার আত্মা পুনরায় নতুন দেহে জন্মলাভ করে। নতুন জন্মলাভ করলেও তাকে গতজন্মের কর্মফল ভোগ করতে হয়।

বুদ্ধ প্রায় একুশ বছর কোশল রাজ্যে ধর্মপ্রচার করেন। কোশলের জেতবন নামে এক কাননের এক কুটিরে বাস করতেন। সেই কুটিরে ভোরের ধর্মসভায় একদিন ভিক্ষুরা বুদ্ধের সন্ন্যাসগ্রহণ ও ত্যাগের মহিমা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সন্ন্যাসীদের একজন বললেন, তথাগত শাক্যসিংহ যদি সন্ন্যাস গ্রহণ না করতেন, তবে তিনি শাক্যবংশের রাজা হতেন। যশোধরার মতো রূপসী স্ত্রী, রাহুলের মতো প্রিয়পুত্র ও রাজসুখ পরিত্যাগ করে তথাগত ত্যাগের পথ অনুসরণ করেছেন। যেইমাত্র তিনি সংসারের অনিত্যতা বুঝতে পেরেছেন, সেইমাত্র তিনি সংসার ত্যাগ করেছেন। রাজচক্রবর্তী হয়ে পৃথিবীর অধিপতি হওয়ার পরিবর্তে তিনি একাকী ছন্দকের সাহায্যে রাত্রির অন্ধকারে গৃহত্যাগ করেছেন। গৃহত্যাগের পর সেই আদরযত্নে লালিতপালিত দেহকে অসীম কষ্ট দিয়ে দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর তপস্যা করেছেন। এতো কষ্ট স্বীকার করে তবেই তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন।

ভিক্ষুরা যখন বুদ্ধকে নিয়ে আলোচনায় মগ্ন, তখন তিনি ধর্মসভায় প্রবেশ করেন। ভিক্ষুদের কথা শুনে বললেন, “হে ভিক্ষুগণ, কেবল এ জন্মে নয়, পূর্ব পূর্ব জন্মেও তথাগত এইভাবেই মহান ত্যাগ স্বীকার করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলেন।”

এই বলে বুদ্ধ এক অতীত কাহিনী বর্ণনা করতে লাগলেন। যে কাহিনী মূলত: বুদ্ধের নিজেরই পূর্বজন্মের। আর এসব কাহিনী ধরা আছে জাতকের কাহিনীতে।

বুদ্ধ তার কাহিনি শুরু করলেন এভাবে: “পুরাকালে রামনগরে সর্বদত্ত নামে এক রাজা ছিলেন। তার ছিল সহস্র পুত্রসন্তান। সর্বজ্যেষ্ঠ যুবঞ্জয় ছিলেন বলশালী, সুদর্শন, সুপুরুষ, সৎগুণাধিকারী। এই রাজকুমারকে সর্বদত্ত ঔপরাজ্য দান করেছিলেন। ঔপরাজ যুবঞ্জয় একদিন অন্য রাজকুমারদের মতোই ভোরে রাজউদ্যানে আমোদ করতে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে রথের সারথি। পথে যেতে যেতে দেখতে পেলেন, ভোরের আলোয় মাকড়শার জাল দেখা যাচ্ছে। সেই জালের মধ্যে বিন্দু বিন্দু শিশির মুক্তোর দানার মতো শোভিত। শুধু তাই নয়, গাছের পাতায়, ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু ঝকমক করছে। রাজকুমার বিস্মিত হয়ে সারথিকে জিজ্ঞেস করলেন, “এই জলের বিন্দুগুলো কী? গাছের আগায় মুক্তোর মতো কেন শোভা পাচ্ছে?” সারথি জানালো, “এগুলো শিশির কণা। শীতকালে শিশির পড়ে।” সারথির কাছ থেকে যুবঞ্জয় অবহিত হলেন শিশির কণা বিষয়ে।

‘যুবঞ্জয় দিনভর বাগান বাড়িতে আমোদ-প্রমোদ শেষে বিকেলে রাজবাড়িতে ফেরার পথে চারিদিকে তাকিয়ে আর শিশির কণাগুলো দেখতে পেলেন না। আবারও বিস্ময় জাগে। সারথিকে আবারও প্রশ্ন, “সকালে যে সব শিশিরের কণাগুলোকে মুক্তোর মতো শোভা পেতে দেখলাম, সেসব এখন তো চোখে পড়ছে না। কণাগুলো গেল কোথায়?” সারথি হেসে জানাল, “যুবরাজ, শিশিরকণা তো জলের বিন্দু। সকালে সেগুলোকে দেখা যায়। দিন যতো দীর্ঘ হয়, সূর্যের উত্তাপে তারা মাটির সঙ্গে মিশে যায়। শিশির কণা বড়ই ক্ষণস্থায়ী।”

‘সারথির এই সামান্য কথা অসামান্য প্রতিক্রিয়া তৈরি করলো যুবঞ্জয়ের মনে। জনম জনম ধরে তার মনে ঈশ্বর প্রেমের যে ফল্গুধারা বয়ে যাচ্ছিল, সেই ধারা যেন হঠাৎ একটি আঘাতে বাধাপ্রাপ্ত হলো। যুবঞ্জয় ভাবলেন, এই সুন্দর শিশির কণাগুলো এতোই ক্ষণস্থায়ী। এগুলো আমাদের জীবনের মতোই। ব্যাধি, জ্বরা আর মরণে মানবজীবন দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাই তিনি ব্যাধিগ্রস্ত জ্বরাগ্রস্ত হওয়ার আগেই পিতামাতার অনুমতি নিয়ে তপস্যায় বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সামান্য শিশিরকণা যুবঞ্জয়ের মনে বৈরাগ্যের হাওয়া ছড়ালো। ভেতরে ভেতরে এক বিবাগী মন তৈরি হতে থাকল।

‘রাজবাড়িতে ফিরে দেখলেন, রাজসিংহের চারপাশে কাম-রূপ আর ঐশ্বর্যের খেলা চলেছে। কিন্তু এসব তার মনকে আর মোহিত করতে পারল না। বরং বিতৃষ্ণাই জাগালো। রাজাকে বললেন, “পিতা হে রাজন, আমি প্রব্রজ্যার জন্য আপনার কাছে অনুমতি নিতে এসেছি।”

‘জ্যেষ্ঠপুত্রের মুখে প্রব্রজ্যার কথা শুনে রাজা ভীষণ উদ্বিগ্ন হলেন এবং দুঃখও পেলেন। বিস্ময়ে ভারি কণ্ঠ তার। বললেন, “হে পুত্র, এই রাজবাড়িতে তোমার যদি কিছু ভোগের অভাব হয়ে থাকে, তবে আমি তা পূরণ করব। যদি তোমার কোনো বলশালী শত্রু জন্মে থাকে, তাকে আমি বিনাশ করব। কিন্তু তুমি সন্ন্যাস গ্রহণ কোরো না। তুমি জ্যেষ্ঠপুত্র। আজ রাজ্যের প্রজারা তোমাকে চায়, তুমি তাদের মনোবাসনাকে বিফল করে দিও না।” ‘পিতার কথা শুনে যুবঞ্জয় বললেন, “পিতা এই রাজভবনে আমার কোনো কিছুরই অভাব নেই। সম্প্রতি আমার কোনো বলশালী শত্রুও নেই। আমি কেবলমাত্র নির্বাণ লাভের জন্য সংসার ত্যাগ করতে চাই। কারণ এই জ্বরাগ্রস্ত পৃথিবীর যন্ত্রণা থেকে আমি মুক্তি পেতে চাই। তাই নির্বাণের জন্য আমি ব্যাকুল।”

‘সর্বদত্ত পুত্রের কথা শুনে নীরব হলেন। কিন্তু নীরব থাকলেন না রাজমহিষী। পুত্র পিতার কাছে সন্ন্যাস গ্রহণের জন্য অনুমতি চাইছে, এ খবর তার কানে পৌঁছানো মাত্র তিনি রাজঅন্তঃপুর থেকে পালকি করে রাজ দরবারে হাজির হলেন। মানব জীবনে মায়ের স্নেহ সবচেয়ে বলশালী, তাই মাতৃস্নেহেই তিনি সংসারে ধরে রাখবেন পুত্রকে। এই আশা মনে পোষণ করে পুত্র যুবঞ্জয়কে বললেন, “তুমি আমার সহস্র পুত্রের মধ্যে কেবল জ্যেষ্ঠ নও, তুমি শ্রেষ্ঠও বটে। আমি মা হয়ে তোমায় না দেখে থাকতে পারব না। তাই তোমার প্রব্রজ্যা গ্রহণ সম্ভব নয়।”

‘মায়ের কথা শুনে যুবঞ্জয় মোটেই বিচলিত হলেন না। তিনি মাকে শিশিরকণার ঘটনা দিয়ে জীবনের অনিত্যতা বোঝালেন। অবশেষে পিতামাতার কাছ থেকে অনুমতি পেলেন।

‘যুবঞ্জয়ের আরেক ভ্রাতার নাম ছিল যুধিষ্ঠির। তারও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মতোই সংসারের প্রতি বিরাগ এসেছিল। যুবঞ্জয়ের সন্ন্যাস গ্রহণ করা দেখে যুধিষ্ঠিরও পিতামাতার কাছে অনুমতি নিয়ে সংসার ত্যাগ করলেন। রাজ্যশাসনের লোভ, পিতামাতার স্নেহ কোনোটিই তাদের সংসারে বেঁধে রাখতে পারল না।

‘হিমালয়ের এক নির্জনকোণে আশ্রম করে দুই ভাই আজীবন তপস্যার জীবনযাপন করলেন।’

এই কাহিনি বর্ণনা করে বুদ্ধ বললেন, ‘সেই জন্মে আমি ছিলাম যুবঞ্জয় আর আনন্দ ছিল যুধিষ্ঠির।’

বৌদ্ধশাস্ত্রে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণকে বলা হয় ‘মহাবিনিষ্ক্রমণ’। সন্ন্যাস জীবন গ্রহণের পর আরাদ কালাম নামে এক সাধক সন্ন্যাসীর কাছে গৌতম সাংখ্যযোগ, ধ্যান ও তপস্যার বিদ্যাশিক্ষা নেন। দিব্যজ্ঞান বা বোধিলাভের পর প্রায় ৪৫ বছর বুদ্ধ উপমহাদেশের নানা স্থান পরিভ্রমণ ও ধর্মমত প্রচার এবং দীক্ষা দেন। বুদ্ধ বছরে আট মাস নানা স্থানে ভ্রমণ করতেন এবং বাণী ছড়াতেন। বাকি ৪ মাস বর্ষার সময় কোনো এক স্থানে স্থায়ীভাবে বাস করতেন।

বুদ্ধ মনে করতেন জন্মগ্রহণ করলেই মানুষকে কর্ম করতে হয়। এবং কর্মের ফল মানুষকে ভোগ করতে হয়। কর্ম থেকে আসে আসক্তি ও তৃষ্ণা এবং তার থেকে আসে দুঃখ। মানুষ নিরন্তর বিভিন্ন জন্মে কর্ম করছে। আর তার কর্মের ফল হিসেবে দুঃখ ভোগ করছে। সুতরাং যদি তার পুনরায় জন্মগ্রহণকে রদ করা সম্ভব হয়, তবে মানুষ দুঃখের হাত থেকে মুক্তি পাবে। তার আত্মা নির্বাণ লাভ করবে।

বুদ্ধ মনে করতেন, তার দর্শনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল দুঃখভোগ থেকে মানুষের মুক্তিলাভের পথ নির্দেশ করা। বলেছেনও, ‘সমুদ্র জলের যেমন মাত্র একটিই স্বাদ, তা হলো লবণের স্বাদ, তার ধর্মের একটিই লক্ষ্য: দুঃখের হাত থেকে মানুষের মুক্তি। নির্বাণ হলো পুনর্জন্মের আকাঙ্খার নিবৃত্তি। নির্বাণ লাভ করলে মানুষকে দুঃখ স্পর্শ করতে পারে না।’

সব ধর্মের শিক্ষিত প্রবক্তাদের কাছে তিনি সমাদৃত এবং এ বিষয়ে তিনি সত্যই অনন্য। রাজত্বের লোভ ত্যাগ করে তিনি সত্যের সন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন। সেই সত্য সন্ধান এখনও চলছে মানবের, মানুষের।

বৈশাখী পূর্ণিমায় বুদ্ধ জন্ম, বুদ্ধত্ব ও নির্বাণ লাভ করেছিলেন। পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধ আজও জাগরণের মহাবাণী শুনিয়ে যান।

লেখক: কবি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

মন্তব্য

মতামত
Examples of Sri Lanka and some old pictures

শ্রীলঙ্কার দৃষ্টান্ত ও কিছু পুরোনো ছবি

শ্রীলঙ্কার দৃষ্টান্ত ও কিছু পুরোনো ছবি
দেশের সব গণ-অভ্যুত্থান ও গণবিস্ফোরণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সংগঠিত হয়েছিল। বিএনপির নেতারাই বারবার গণবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গণরোষের কবলে পড়েছিলেন। আপনাদের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যের কারণে সেই ছবিগুলো এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে।

কয়েক দিন ধরে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে বেশ উল্লাস প্রকাশ করছেন। তারা শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীন কিছু রাজনীতিকের মতো আওয়ামী লীগের নেতাদেরও গণরোষে পড়তে হবে মর্মে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।

বিএনপি নেতাদের গত কয়েক দিনের এসব মন্তব্য শুনে একজন গবেষক হিসেবে এ দেশের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার কথা আমার মনে পড়ল। এই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমি বিএনপি নেতাদের জিজ্ঞেস করছি, কাকে আপনারা গণ-অভ্যুত্থান আর গণরোষের ভয় দেখান? আপনারা কি ভুলে গেছেন দেশের সব গণ-অভ্যুত্থান ও গণবিস্ফোরণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই হয়েছিল আর আপনারাই বারবার গণবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গণরোষের কবলে পড়েছিলেন?

আপনারা একবার আফগানিস্তানের উদাহরণ দেন, আরেকবার পাকিস্তানের উদাহরণ দেন। আবার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো হবে। যখন সবাই অঙ্ক করে দেখাল, বাংলাদেশের অবস্থা শ্রীলঙ্কার মতো হবে না, তখন আবার আপনারা বলেন, আওয়ামী লীগের নেতারা শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীন নেতাদের মতো গণরোষের শিকার হবেন।

এবার আপনাদের জন্য ইতিহাসের সেই ঘটনাগুলো উপস্থাপন করি:

১. আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ১৯৬৯ গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক আইয়ুবের পতন হয়েছিল। বর্তমান বিএনপির আগের জেনারেশনের ক্ষমতাসীন অনেকেই তখন পালিয়েছিল। মুসলিম লীগ জেনারেশনের পরবর্তী জেনারেশন এবং তাদের সুবিধাভোগীদের নিয়েই সামরিক শাসক জিয়া বিএনপি গঠন করেছিলেন। বিএনপির পূর্বসূরীরাই ঊনসত্তরে গণরোষের শিকার হয়েছিলেন।

২. ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী অনেকেই গণরোষের শিকার হয়েছিলেন। ওই স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রায় সকলেই পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দেন। আর জাতির পিতার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগই এ দেশের স্বাধীনতা এনেছিল। বিএনপির পূর্বসূরীরা ১৯৭১ সালেও গণরোষের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

৩. আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে সামরিক শাসক এরশাদের পতন হয়েছিল। মওদুদ-শাহ মোয়াজ্জেমসহ বিএনপির অনেক নেতাই তখন স্বৈরশাসকের দোসর হিসেবে গণরোষে পড়েছিলেন।

৪. অনেক রাজনীতি বিশ্লেষক মনে করেন, চট্টগ্রামে নিহত না হলে সামরিক শাসক এরশাদের মতো জেনারেল জিয়ার পরিণতিও একই হতো। অর্থাৎ পৃথিবীর সকল সামরিক শাসকের মতো গণ-অভ্যুত্থানেই অবৈধ জিয়া সরকারের পতন হতো।

৫. আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে গণ-আন্দোলনে মাত্র এক মাসে খালেদা সরকারের পতন হয়েছিল। বিএনপির অনেক নেতা রাতের অন্ধকারে মন্ত্রিপাড়া থেকে পালিয়েছিলেন। গণরোষ থেকে বাঁচার জন্য অনেকে দেশ ছেড়েছিলেন। বিএনপির অনেক নেতাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেদিন মানবিক কারণে জনরোষ থেকে রক্ষা করেছিলেন। আবার কেউ কেউ গণরোষ থেকে রক্ষা পাননি।

৬. সীমাহীন দুর্নীতি, অপশাসন আর ভোটচুরির নানা ষড়যন্ত্রের কারণে ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুর্নীতিবাজ নেতাদের জনগণ লগি-বৈঠা নিয়ে ধাওয়া করেছিল। জনরোষ থেকে বাঁচার জন্য অনেকেই পালিয়েছিলেন। অনেককেই সেদিন জনগণ পিটিয়েছিল।

৭. বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো গণ-অভ্যুত্থান কিংবা গণ-অসন্তোষ হয়নি। দেশের ইতিহাসে একমাত্র আওয়ামী লীগই সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল ২০০১ সালে। আর রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশবিরোধী দুষ্কৃতকারীরা সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করে ক্ষমতা নিয়েছিল। এতে জনগণের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। জাতির পিতার হত্যার পর খুনি মোশতাক-জিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গণপ্রতিরোধ ও গণবিক্ষোভ মোকাবিলার জন্যই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে সামরিক আইন জারি করা হয়। জরুরি অবস্থা জারি থাকা অবস্থায় খুনিরা সামরিক আইন জারি করেছিল নিজেদের সম্ভাব্য গণপ্রতিরোধ থেকে রক্ষার জন্য।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিএনপি-জামায়াতের নেতারাই বারবার শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। আর দেশের সব গণ-অভ্যুত্থান ও গণবিস্ফোরণ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই সংগঠিত হয়েছিল। বিএনপির নেতারাই বারবার গণবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গণরোষের কবলে পড়েছিলেন। আপনাদের এই কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যের কারণে সেই ছবিগুলো এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। আপনাদের চোখে-মুখে তার পরও লজ্জার রেশ দেখতে পাচ্ছি না। আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, শ্রীলঙ্কার উদাহরণ আপনাদের জন্য প্যান্ডোরার বাক্স।

ড۔ সেলিম মাহমুদ: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আরও পড়ুন:
রাজাপাকসে ও তার মিত্রদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
শ্রীলঙ্কাকে টেনে তোলার দায়িত্ব পাওয়া এই রনিল কে
বিপর্যস্ত শ্রীলঙ্কার দায়িত্ব নিচ্ছেন রনিল বিক্রমাসিংহে
৫০ টাকায় দেখা যাবে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা টেস্ট
শ্রীলঙ্কায় নতুন প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রিসভা চলতি সপ্তাহে

মন্তব্য

মতামত
It is wrong to protest against injustice

অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই অন্যায়!

অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই অন্যায়!
দেশটা আসলে চলছে ক্ষমতার দাপটে। মন্ত্রীর আত্মীয়, এমপির পরিচিত; এভাবেই সবাই চলছে। রাস্তায় পুলিশ গাড়ি আটকালে সরাসরি মন্ত্রীকে ফোন দেয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। ছাত্রলীগ-যুবলীগের দাপটের কথাও আমরা প্রায়ই পত্রিকায় দেখি। পুরো দেশটাই এভাবে চলছে। সবাই মিলেমিশে চলছেন বলে সব ঘটনা খবর হয় না।

আমি কখনোই বিনা টিকেটে রেলে চড়িনি বা সিনেমা দেখিনি। কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের অনেককেই দেখেছি টিকেট কেনার ব্যাপারে দারুণ অনীহা। কেউ মাস্তানি করে, কেউ চুরি করে পার পাওয়ার চেষ্টা করতো। আমার খালি মনে হতো, চেকার যখন এসে টিকেট চাইবে, তখন আমি কী বলবো। এই ভাবনা, এই লজ্জা থেকেই কখনও আমার বিনা টিকেটের যাত্রী হওয়া হয়নি। এখনও নিশ্চয়ই রেলের যাত্রীদের অনেকেই বিনা টিকেটে ভ্রমণ করেন। টিটিই নিশ্চয়ই তাদের ধরেন, জরিমানা করেন। এটাই টিটিইর দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই বরখাস্ত হয়েছেন শফিকুল ইসলাম নামের এক টিটিই।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, খুলনা থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশন থেকে তিন যাত্রী বিনা টিকিটে এসি কেবিনে ঢাকা যাচ্ছিলেন। এ সময় কর্তব্যরত টিটিই শফিকুল ইসলাম তাদের টিকিট দেখতে চাইলে তারা রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দেন। টিটিই বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পাকশী বিভাগীয় রেলের সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা নুরুল আলমের সঙ্গে আলাপ করলে তিনি সর্বনিম্ন ভাড়া নিয়ে এসি টিকিট না করিয়ে সাধারণ কোচের টিকিট কাটার পরামর্শ দেন। এসিওর পরামর্শ অনুযায়ী টিটিই তাদের ৩৫০ টাকা জনপ্রতি হিসেবে ১০৫০ টাকা নিয়ে তিনটি সুলভ শ্রেণির নন-এসি কোচে সাধারণ আসনের টিকিট দেন। রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দেয়া ওই তিন যাত্রী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অভিযোগ না করলেও ঢাকায় পৌঁছে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে টিটিই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগ পেয়ে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে বাণিজ্যিক কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন সংশ্লিষ্ট টিটিইকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন। টিটিই শফিকুল ইসলামকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা কার্যকর করা হয়।

একটি সভ্য দেশ হলে, দেশে আইনের শাসন থাকলে, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য টিটিই শফিকুল ইসলাম প্রশংসিত হতেন। রেল তাকে সংবর্ধনা দিতো, পদোন্নতির বিবেচনায় তিনি এগিয়ে থাকতেন। কিন্তু ঘটেছে উল্টো ঘটনা। বাংলাদেশ বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিনা টিকেটের তিন যাত্রীর সাথে অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি অবশ্য তা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু বিনা টিকেটের যাত্রীর সাথে টিটিই খুব সৌজন্যমূলক আচরণ করবেন, এটা আশা করাও ঠিক নয়। বিনা টিকেটে রেল ভ্রমণ অপরাধ। আর অপরাধীর সাথে নিশ্চয়ই মধুর ব্যবহার করা হবে না। তবে রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দেয়ার পরও টিটিই শফিকুল ইসলাম তাদেরকে জরিমানা করেছেন, এসি কেবিন থেকে বের করে দিয়েছেন; এর চেয়ে বড় অপরাধ আর কী হতে পারে। অভিযোগে বলা হয়, টিটিই শফিকুল নাকি বিনা টিকেটের যাত্রীদের বলেছেন, রেল কি তোর বাপের। টিটিই আসলে বুঝতেই পারেননি, রেল আসলে রেলমন্ত্রীর আত্মীয়দের পৈত্রিক সস্পত্তি। আর সেই আত্মীয়রা যদি শ্বশুরপক্ষের হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। টিটিই হয়তো বুঝতে পারেননি, বাংলাদেশ এখন ক্ষমতাসীনদের দাপটে চলে। রেলমন্ত্রীর আত্মীয়রা যে মাত্র একটি এসি কেবিন দখল করেছেন, সেটা তো রেলের সৌভাগ্য। চাইলে তো তারা পুরো কামরা বা পুরো রেলই দখল করে ফেলতে পারতেন। বিনা টিকেটের তিন যাত্রী রেলমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়েছেন, এটা শোনার পর লজ্জায় রেলমন্ত্রী পদত্যাগ করতে পারতেন, সেই তিন আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু এটা সব সম্ভবের বাংলাদেশ। এখানে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই যেন অন্যায়।

এখন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন দাবি করছেন, তার আত্মীয়দের বিনা টিকেটে ট্রেনে চড়ার বিষয়টি তিনি জানেন না। বিনা টিকেটের যাত্রীরা তার আত্মীয় কিনা তাও জানেন না। এমনকি টিটিইর বরখাস্ত হওয়ার বিষয়টিও তিনি জানতেন না। মন্ত্রীর অগোচরে এত বড় ঘটনা ঘটে গেল কীভাবে? মন্ত্রী নাই জানতে পারেন। এখন তো জানলেন। এখন তিনি তার সেই তিন আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করুন। সেই তিন আত্মীয়ের নাম পরিচয় সবই তো সবার জানা। টিটিইর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া ইমরুল কায়েস রেলমন্ত্রীর স্ত্রী শাম্মী আক্তারের মামাতো বোন ইয়াসমিন আক্তারের ছেলে। অপর দুজন হলেন, শাম্মী আক্তারের মামাতো ভাই ফারুক হোসেন ও হাসান আলী। এখন জানা যাচ্ছে, রেলমন্ত্রী আসলেই কিছু জানতেন না। তার স্ত্রী শাম্মি আখতারের ফোন রেল কর্তৃপক্ষ তদন্ত ছাড়াই সুপারসনিক গতিতে টিটিইকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করেছেন। আসলে সূর্যের চেয়ে বালি সবসময়ই গরম।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের কথা নিশ্চয়ই আপনাদের সবার মনে আছে। এক সময় বড় বড় সব অভিযান পরিচালনা করে তিনি জনগণের নায়ক হয়ে উঠেছিলেন। সেই সব অভিযানে অপরাধীদের অনেকে নিশ্চয়ই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এর জেরে পদোন্নতি বঞ্চিত হন সারওয়ার আলম। সাহসী ভূমিকা আর বিভিন্ন অভিযানে অনড় অবস্থানের কারণে যার সবার আগে পদোন্নতি হওয়ার কথা ছিল, তাকেই যখন পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়, তখন নিশ্চয়ই তার মন খারাপ হয়। সারওয়ার আলমও মানুষ। সংক্ষুব্ধ সারওয়ার আলম ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘চাকরিজীবনে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যায়, অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগ চাকরিজীবনে পদে পদে বঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছেন এবং এ দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই অন্যায়।’

একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে সরকার ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এ ধরনের মন্তব্য করার মাধ্যমে তিনি অকর্মকর্তাসুলভ আচরণ করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। জনপ্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। মামলার রায়ে সারওয়ার আলমকে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে তিরস্কার করা হয়েছে। আসলে এ দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াটাই অন্যায়।

আজকের পত্রিকাতেই দেখলাম, পটুয়াখালীর পায়রা সেতুর টোল প্লাজায় সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ কাজী কানিজ সুলতানার আত্মীয়দের গাড়ি বহরের কাছে টোল দাবি করায় তারা টোল আদায়কারীদের ওপর হামলা করেছেন। আমি ঠিক বুঝতে পারি না মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দেয়ার পরও কীভাবে টিটিই জরিমানা করে, এসি কেবিন থেকে বের করে দেয় বা এমপির আত্মীয় পরিচয় দেয়ার পরও কীভাবে তাদের কাছে টোল চায়। এত বোকা লোক দেশে এখনও থাকে কীভাবে?

দেশটা আসলে চলছে ক্ষমতার দাপটে। মন্ত্রীর আত্মীয়, এমপির পরিচিত; এভাবেই সবাই চলছে। রাস্তায় পুলিশ গাড়ি আটকালে সরাসরি মন্ত্রীকে ফোন দেয়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। ছাত্রলীগ-যুবলীগের দাপটের কথাও আমরা প্রায়ই পত্রিকায় দেখি। পুরো দেশটাই এভাবে চলছে। সবাই মিলেমিশে চলছেন বলে সব ঘটনা খবর হয় না। মাঝে মাঝে দুয়েকজন সারওয়ার আলম অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, দুয়েকজন শফিকুল ইসলাম ঠিকঠাক মতো দায়িত্ব পালন করেন। টোল প্লাজার কর্মীরা এমপির আত্মীয়দের কাছে টোল চেয়ে বসেন। তখনই হইচই পড়ে যায়। তবে ব্যতিক্রমকে উদাহরণ ধরে লাভ নেই। অনিয়মটাই এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

মন্তব্য

উপরে