× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য

মতামত
My teacher and colleague Muhith
hear-news
player

আমার শিক্ষক ও সহকর্মী মুহিত

আমার-শিক্ষক-ও-সহকর্মী-মুহিত
কনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন আমি আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সঙ্গে কাজ করেছি। এ সময় আমি তার থেকে বহু কিছু শিখেছি। কোনো কোনো সময় কনিষ্ঠ সহকর্মীর পরামর্শও তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেছেন।

চলে গেলেন একজন অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও পরিবেশবিদ। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একই সঙ্গে ছিলেন অনেক কিছু।

১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটের এক পরিচিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মেধাবী মুহিত ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে তৎকালীন সারা প্রদেশে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এমএ পাস করেন।

চাকুরিরত অবস্থায় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের চিফ ও উপসচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বৈষম্য বিরাজমান ছিল, তার ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা পালনে পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে উপস্থাপিত এটিই ছিল এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন। ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১ এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন। তার পদত্যাগ তখন মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছিল।

অর্থনৈতিক কূটনীতিতে মুহিত সবিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় তিনি সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। লেখক হিসেবেও মুহিত সমান পারদর্শী। মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনৈতিক সমস্যা বিষয়ক গ্রন্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার ৩০টির বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

আবুল মাল আবদুল মুহিত আমার অগ্রজ, পেশাগত জীবনে আমার জ্যেষ্ঠ এবং এক অর্থে দীর্ঘকালীন শিক্ষক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসৈনিক, কলমযোদ্ধা এক প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক ‘প্রতিষ্ঠান’। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম পুরোধা পুরুষ ছিলেন আবদুল মুহিত।

তিনি রাষ্ট্রের উচ্চ মর্যাদার স্বাধীনতা পদকের মতো অন্যান্য পদকে ভূষিত হয়েছেন। অন্যদিকে প্রকৃত অর্থে একজন পরিশীলিত নাগরিক হয়েও সিলেট অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতিতে তার গভীর পাণ্ডিত্য ছিল; তিনি এই সংস্কৃতি প্রসারে জোরালো অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের খেলাধুলার অঙ্গনেও তার শক্তিশালী ভূমিকা ছিল। পরিণত বয়সে উচ্চ দায়িত্ব পালনের সময় খেলাধুলার প্রসারে তিনি সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন।

তার কনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন তার সাথে কাজ করার সময় আমি তার থেকে বহু কিছু শিখেছি। কোনো কোনো সময় কনিষ্ঠ সহকর্মীর পরামর্শও তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেছেন।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তথা কর্মজীবী এবং প্রধাণত গ্রামীণ নিম্নআয়ের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ ছিল তার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বাজেট তৈরিতে এই সকল মানুষের কল্যাণে আমাদের উভয়ের দায়বোধ ও কর্মপ্রচেষ্টা একটি ‘অলিখিত চুক্তি’র মতো সার্বক্ষণিক বিরাজমান ছিল। চিত্রকলা ও সঙ্গীতের প্রতিও সম্মানজক জ্ঞান ও আগ্রহ ছিল তার।

বাংলাদেশের শিল্পী ও সাহিত্যিক সমাজের সঙ্গে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মানবোধ ও সহযোগিতার সম্পর্ক ছিল এই গুণী মানুষের। রাতভর মাঠে বসে ধ্রুপদী সঙ্গীতের স্বাদ গ্রহণ করতেন তিনি। আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনেও অকাতরে সহযোগিতা করেছেন; প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন।

সিলেট অঞ্চলের সকলেই জানেন অসাম্প্রদায়িক এই কৃতি পুরুষের সঙ্গে সিলেটের মনিপুরী সম্প্রদায় ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির আত্মিক সম্পর্ক ছিল। আমার ধারণা ধর্মান্ধ না হয়েও কিভাবে একজন মানবপ্রেমী ধার্মিক হওয়া যায়, এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ তিনি।

মামাবড়ি সুনামগঞ্জের (জগন্নাথপুর) প্রতি ছিল তার অপার স্নেহ ভালোবাসা। আমি সুনামগঞ্জের একজন সন্তান হিসেবে কর্মক্ষেত্রে তার এই আগ্রহের অনেক প্রমাণ পেয়েছি। সময়োত্তীর্ণ প্রজ্ঞা ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী আবুল মাল আবদুল মুহিতের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই নিরন্তর।

এম এ মান্নান, এমপি: পরিকল্পনামন্ত্রী।

আরও পড়ুন:
মুহিতেরই স্বপ্ন ছিল ‘সবার জন্য পেনশন’
মুহিতের সমালোচনা করে তোপের মুখে মুক্তাদির
মুহিতের মৃত্যুতে সিলেট আ.লীগের ২ দিনের শোক
রাষ্ট্রপতি হতে চেয়েছিলেন মুহিত
রায়নগরে সমাহিত হবেন মুহিত

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
Abdul Ghaffar Chowdhury The narrator of tomorrow

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: কালের কথক

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: কালের কথক
জনগণের ভাষা, তাদের চাহিদা গাফ্ফার চৌধুরী সুদূর ব্রিটেনে বসেও বুঝতেন। যে কারণে পাঠক অপেক্ষায় থাকত কবে তার কলাম বের হবে। কবে সামনের রাজনীতির ধারণাটা পাওয়া যাবে। একজন কলাম লেখক যে কালের কথক তা অনিরুদ্ধ, গাছপাথর, নির্মল সেন ও গাফ্ফার চৌধুরীর লেখায় বোঝা যেত।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী যিনি ভাষা দিবসের গানের গীতিকবি হিসেবে যেমন পরিচিত ছিলেন তেমনি পরিচিত ছিলেন একজন কলাম লেখক হিসেবে। একটি জীবন কাটিয়ে দিলেন- শুধুই লিখে। তার লেখার বিষয়, লেখার দর্শন বা তার লেখার বিষয়ের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে অনেকেরই কথা থাকতে পারে। তারপরও একথা ঠিক যে, লিখে তিনি একটি জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন- এক শুদ্ধব্রতচারী ঋত্বিকের মতো।

গাফ্‌ফার চৌধুরীরর সাংবাদিক জীবনের কথা বলতে গেলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অমলকান্তি কবিতাটার কয়েকটি লাইন মনে পড়ে। ‘আমরা কেউ মাস্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল/অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি/সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।’ আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আসলে শুধু সাংবাদিক হতে চেয়েছিলেন। তিনি তার সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন। তার নাম মানেই এক কলম সৈনিকের নাম। এক যোদ্ধার নাম, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের নাম। তিনি দলনিরপেক্ষ ছিলেন না, কিন্তু যে দলের সমর্থন করতেন সে দলের গঠনমূলক সমালোচনাও করতে সামান্য দ্বিধা করতেন না। তার সাংবাদিকতার মুনশিয়ানা ছিল তার ভাষা কাঠামো নির্মাণ। স্বল্প শিক্ষিত একজন মানুষও তার লেখা পড়ে মুগ্ধ হতো, আবার শিক্ষিত মানুষও। সহজ ভাষায় যুক্তি দিয়ে নিজস্ব মতকে তুলে ধরায় তার কোনো জুড়ি ছিল না। তার লেখার আলোচনা-সমালোচনা দুই-ই ছিল। একজন কলাম লেখকের পক্ষ থাকে, পাঠক থাকে বিপক্ষও থাকে এটাই নিয়ম।

আমার মনে পড়ে একসময় আমরা একদল তরুণ যারা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম তারা ‘দৈনিক সংবাদ’-এ অনিরুদ্ধর (সন্তোষ গুপ্ত) কলাম পড়তাম আবার গাছপাথরের (অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী) কলাম পড়ে তর্কে জড়িয়ে যেতাম। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম নিয়ে বিতর্ক করতাম। নির্মল সেনের কলাম নিয়েও বিতর্ক হতো। কিন্তু লেখকের সার্থকতা তো এখানেই। তবে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর বেলায় কথাটা ভিন্ন। তা হচ্ছে- একুশে ফেব্রুয়ারির গীতিকবিতা থেকে তার কলাম পড়ে মনে হয়েছে তিনি তার পাঠককে নির্বাচন করতেন লেখার আগেই।

জনগণের ভাষা, তাদের চাহিদা গাফ্‌ফার চৌধুরী সুদূর ব্রিটেনে বসেও বুঝতেন। যে কারণে পাঠক অপেক্ষায় থাকত কবে তার কলাম বের হবে। কবে সামনের রাজনীতির ধারণাটা পাওয়া যাবে। একজন কলাম লেখক যে কালের কথক তা অনিরুদ্ধ, গাছপাথর, নির্মল সেন ও গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখায় বোঝা যেত। আমি কোনো কলাম লেখককে খাটো করছি না, এই কজনের কথা মনে করছি মাত্র। আজ তার লেখার কাঠামো, বিন্যাসও ভাষার ব্যবহার দেখাতে একটা লেখার উদ্ধৃতি দেব-

‘‘২০০১ সালের বিএনপি সরকারের ভিশন ও মিশনের আর কত ফিরিস্তি দেব? সেই সময়ের বিএনপি সরকারের একশ’ দিনের কর্মসূচি এবং ক্ষমতায় থাকার পূর্ণ সময়টাতে তাদের কার্যকলাপ কেউ যদি মিলিয়ে দেখেন, তাহলে তারা সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন, তাদের বর্তমানের ‘ভিশন-২০৩০’ এর পরিণতি কী ঘটবে! রূপকথায় আছে, এক সিংহ বৃদ্ধ বয়সে নখ-দন্ত ও শিকার ধরার ক্ষমতা হারিয়ে একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল এবং ঘোষণা দিয়েছিল, সে অহিংসা ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। সে বনের পশুপাখিদের অহিংসা ধর্মে দীক্ষা দেবে। তার ঘোষণায় বিশ্বাস করে বহু পশুপাখি অহিংসা ধর্মে দীক্ষা নিতে তার কাছে যেতে শুরু করল। সিংহ সুযোগ পেয়ে তাদের হত্যা করে খেয়ে ফেলত। তাকে আর শিকার ধরার পরিশ্রম করতে হতো না। এ সময় এক শিয়াল গেল সিংহের কাছে; কিন্তু গুহায় ঢুকল না। সিংহ বলল, ভাগ্নে এসো এসো, তোমাকে অহিংস ধর্মে দীক্ষা দেই। শিয়াল বলল, মামা, দীক্ষা নিতেই তো এসেছিলাম; কিন্তু এখন দেখছি যেসব পশুপাখি তোমার কাছে দীক্ষা নিতে এসেছে, তাদের পায়ের ছাপ সবটাই ভেতরের দিকে গেছে; কোনোটাই ফিরে আসেনি। আমি তাই এখান থেকেই বিদায় নিচ্ছি। ভেতরে এসে তোমার আজকের দিনের খোরাক হতে চাই না।

বিএনপির ভিশন-২০৩০-এর ঘোষণা শুনেও দেশের মানুষ কি বিশ্বাস করবে, দলটি সন্ত্রাস ছাড়বে, সন্ত্রাসীদের ছাড়বে, জামায়াতের সঙ্গ ছাড়বে, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির এককালের দুর্গ হাওয়া ভবনের স্বেচ্ছানির্বাসিত অথবা পলাতক নেতার প্রভাবমুক্ত হবে? সবচেয়ে বড় কথা, অহিংস গণতন্ত্রের দীক্ষা নেবে? এই ব্যাপারে কেউ যদি সন্দেহ পোষণ করেন, তাকে কি দোষ দেয়া যাবে? উপকথার সিংহ ও শিয়ালের গল্পটির নীতিকথা আমাদের কী শেখায়?” (বিএনপি কি সত্যিই অহিংস ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে? দৈনিক যুগান্তর, ১৬ মে, ২০১৭) লেখাটি আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর। তার লেখা কতটা সহজবোধ্য, প্রখর ও রসালো ছিল এটাতেই বোঝা যায়। লেখাকে সহজবোধ্য করতে তিনি প্রচলিত গল্পের ভাষায় রাজনীতির শক্ত বিষযগুলোর গেরো খুলে দিতেন। আমার যতদূর মনে পড়ে যায়াযায়দিনে তার লেখা পড়া শুরু করেছিলাম। তার অনেক লেখা বিভিন্ন কাগজে পড়েছি। সহজ বাক্যে সুন্দর বিশ্লেষণ।

স্পষ্ট ভাষায় মুখের ওপর কথা বলতেন। একবার তার এক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম চামেলীবাগে রাজনীতিক-লেখক মোনায়েম সরকারের বাসায়। যিনি মূলত সাক্ষাৎকার নেবেন তার সঙ্গে গিয়েছিলাম আমি। আমার সেই বন্ধুতো তার লেখার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, আমার কোন লেখাটা পড়েছ ? এবারে আমি কথা শুরু করলাম তার লেখা নিয়ে। তিনি আমার স্মরণশক্তির তারিফ করে আমার বন্ধুকে বললেন খুব কায়দা করে। না পড়া দোষের নয়, না পড়ে বলাটা একজন সাংবাদিককে বিপদে ফেলতে পারে। আবার অন্য প্রসঙ্গে আমরা ঢুকে গেলাম। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী যে গুণটার কথা এবার বলব তাহলো তার বলার শক্তি। তার বিভিন্ন বিষয়ে অনেক পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতা ছিল, ছিল অবিশ্বাস্য রকমের স্মরণশক্তি। কয়েকশ মানুষের মধ্যে থাকলেও তিনি ছাড়া আর কেউ বলার সুযোগ পেতেন না। এটা তিনি জোর করে করতেন না। এটা ছিল তার জ্ঞানলব্ধ আলোচনার শক্তি। কত পাণ্ডিত্য থাকলে এ কাজটা করা যায় তা বলে শেষ করা যাবে না। এটা প্রয়াত নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদের মধ্যেও দেখেছি।

সাংবাদিকতার সেই সোনাঝরা দিন এখন আর নেই। কেউ কারো লেখার জন্য অপেক্ষা করে বলে মনে হয় না। করো লেখা পড়ার অভ্যেসটা একদম হ্রাস পেয়েছে। তবে শেষপর্যন্ত যার নাম দেখলে কলামটা পড়ত তিনি হলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। তার পাঠক ছিল ভুবন জোড়া। এত পাঠক বোধ করি কারো ছিল না। তার লেখার বিপক্ষের মানুষও কম নয়, তবে দুঃখজনক হলো তার লেখার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না করে তাকে আক্রমণ করা। এটা সাংবাদিকতার কোনো নিয়মের সঙ্গে যায় না।

দুই.

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী স্বাধীনতার পর, ১৯৭৪ সালের ৫ অক্টোবর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য তিনি সপরিবারে লন্ডনে চলে যান। তারপর সেখানেই বসবাস শুরু করেন। সেখানে ‘নতুন দিন’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। প্রায় ৩৫টি বই লিখেছেন তিনি। গাফ্‌ফার চৌধুরী বিদেশে অবস্থান করলেও দেশের সব খবর থাকত তার নখদর্পণে। দেশের জন্য তার টান ছিল অনেক। ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন দৈনিকে সমকালীন রাজণীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন তিনি।

একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ‘জয় বাংলা’, ‘যুগান্তর’ ও ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় কাজ করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তার লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি তাকে শুধু খ্যাতি নয়, অমরত্ব এনে দেয় বৈকি। প্রথমে তিনি নিজেই গানটিতে সুর করেছিলেন। পরে শহীদ আলতাফ মাহমুদ এ গানে সুরারোপ করেন এবং বর্তমান সেই সুরেই গানটি গীত হয়। বিবিসি বাংলা বিভাগের জরিপে এই গান সর্বকালের সেরা বাংলা গানের ইতিহাসে তৃতীয় সেরা গানের মর্যাদা পেয়েছে।

এটুকুই শুধু গাফ্‌ফার চৌধুরী নয়। সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ছোটদের উপন্যাসও লিখেছেন তিনি। ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’, ‘সম্রাটের ছবি’, ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’, ‘বাঙালি না বাংলাদেশি’সহ তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৩০। এছাড়া তিনি কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ নাটকও লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘একজন তাহমিনা’ ‘রক্তাক্ত আগস্ট’ ও ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’।

তুরস্কের কবি নাজিম হিকমত বলেছিলেন, বিংশ শতাব্দিতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর। কিন্তু গাফ্‌ফার চৌধুরী একটা গীতিকবিতা লেখার পরে আর না লিখলেও তার আয়ু বাংলা ও বাঙালির সমান। তার জীবন ও সংগ্রামের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র
শুক্রবার বাসায় ফিরতে চেয়েছিলেন গাফ্ফার চৌধুরী
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু
গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আসছে সোমবার
দেশে আনা হচ্ছে গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ

মন্তব্য

মতামত
Abdul Ghaffar Chowdhury The son of news and literature

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র
তরুণবেলায়, সেই ১৯৫২ সালে কলম ধরেছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করেছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সমান প্রতিবাদী ছিলেন তিনি। যখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়, দেশের অপরাজনীতি যখন অপপ্রচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে তার কলম। দুই চোখজুড়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রচলিত সংবাদভাষ্য ও সাহিত্যের ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। দেশের সংবাদপত্রে তার কলাম সৃষ্টি করে নতুন এক ঘরানা। সাহিত্য দিয়ে যার লেখালেখি শুরু, তিনি হয়ে ওঠেন সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র।

গাফ্‌ফার ভাই চলে গেলেন! আর কখনও তার ফোন পাব না। কোনোদিন আর ফোন করা হবে না তাকে। তিনি আর বলবেন না, ‘নজরুল, দেশের খবর কী বলো?’ তাকে ফোন করলে তিনি প্রথমেই জানতে চাইতেন দেশের খবর। সব ঠিক আছে তো? বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে তিনি অত্যধিক স্নেহ করতেন। তাদের খোঁজ নিতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ছিল তার অগাধ আস্থা। একান্ত আলাপচারিতায় বলতেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই।

তার সঙ্গে কত শত স্মৃতি। ২০০৪ সালে আমার জীবনের একটি বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছিলেন তিনি। ওই বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে একদিন ফোনে বললেন, ‘এবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তুমি পত্রিকার জন্য একটা প্রবন্ধ লেখ। ডাকযোগে আমার কাছে পাঠাও। আমি দেখে ঠিক করে দেব। তারপর তা তুমি পত্রিকায় পাঠাবে। ওরা ছাপাবে।’

তার কথায় আমি লিখেছিলাম। তিনি দেখে একটু যোগ-বিয়োগ করে আমার কাছে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। আমি তা ফ্রেশ করে লিখে ঢাকা ও লন্ডনের পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। ছাপা হয়। তারপর আরও পাঁচটি প্রবন্ধ তিনি দেখে দিয়েছিলেন। এরপর আর দেখে দিতে হয়নি। তার প্রেরণা ও আশীর্বাদে এখন আমি পত্রিকায় নিয়মিত লিখে যাচ্ছি। তার কাছে আমার অন্তহীন ঋণ।

দুই যুগেরও বেশি প্রায় প্রতিদিন তার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হতো। হাসপাতালে তার ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন থাকত না। তিনি নার্সের সহায়তায় ইন্টারনেট কানেকশন নিয়ে আমাকে প্রতিদিন ফোন করতেন। গত ১৮ মে বুধবার রাতেও তিনি আমাকে ফোন করেছেন। কথা হয়েছে। ১৯ মে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় দুপুরে খবর পেলাম তিনি অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন।

শৈশবে, যখন থেকে একুশের প্রভাতফেরিতে যাচ্ছি, তখন থেকেই তার নামের সঙ্গে পরিচয়। কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সেই তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন তার স্কুল জীবনেই। স্কুলের পাঠ নিতে নিতেই নিয়েছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির পাঠ। আধুনিকমনস্ক মানুষটি মননে ছিলেন প্রগতিশীল। তরুণবেলায়, সেই ১৯৫২ সালে কলম ধরেছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করেছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সমান প্রতিবাদী ছিলেন তিনি। যখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়, দেশের অপরাজনীতি যখন অপপ্রচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে তার কলম। দুই চোখজুড়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রচলিত সংবাদভাষ্য ও সাহিত্যের ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। দেশের সংবাদপত্রে তার কলাম সৃষ্টি করে নতুন এক ঘরানা। সাহিত্য দিয়ে যার লেখালেখি শুরু, তিনি হয়ে ওঠেন সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র।

অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন সৃজনশীল আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী, সঙ্গীও। ব্রিটিশ-ভারত থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের জন্ম। এই ইতিহাসের অনেক কিছুরই সাক্ষী তিনি। জন্মেছিলেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে, ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি প্রয়াত হাজী ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী তার বাবা, মা জোহরা খাতুন। উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসা ও উলানিয়া করোনেশন হাই ইংলিশ স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেও। ছাত্রজীবনেই লেখালেখিতে হাতেখড়ি। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত মাসিক সওগাত পত্রিকায় তার গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। ১৯৫২ সালে সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সাংবাদিকতায় হাতেখড়িও ছাত্রজীবনেই। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন যোগ দেন দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে যোগ দেন খায়রুল কবীর সম্পাদিত দৈনিক সংবাদের বার্তা বিভাগে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন ১৯৫৬ সালে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী কলমযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মডারেটরের ভূমিকাও পালন করেছেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনপদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী।

বাংলাদেশে সেলিব্রিটি সাংবাদিকের সংখ্যা হাতেগোনা। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সেই স্বল্পসংখ্যক সাংবাদিকের একজন, যার কলামের অপেক্ষায় থাকত দেশের সিংহভাগ পাঠক। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী কলামে যে মতপ্রকাশ করতেন, তার সঙ্গে অনেক পাঠকেরই হয়ত মতের মিল হতো না। কিন্তু তিনি কী লিখছেন, কী ভাবছেন, তা জানার আগ্রহ পাঠকদের ছিল। এমনকি তার বিরুদ্ধ-রাজনৈতিক মতবাদের মানুষও আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম পড়তেন সমান আগ্রহে। সাংবাদিকতা জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। কলামের প্রতিটি শব্দে ছিল অসম্ভব চৌম্বক শক্তি। পাঠককে ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা এমন কজনের আছে? আইন পেশায় একটা কথা আছে, ‘ক্যারি দ্য কোর্ট’। পাঠককে টেনে রাখার অসম্ভব শক্তি ছিল তার কলমে। প্রযুক্তি এগিয়েছে; কিন্তু তিনি হাতে লিখতেন। মুক্তোর মতো স্বচ্ছ হাতের লেখা। টানা লিখে যেতেন পাতার পর পাতা। কোথাও কাটাকাটি নেই। অসামান্য দক্ষতায় নির্মেদ গদ্যে যেন সময়ের ছবি আঁকতেন সংবাদ-সাহিত্যের এক অসামান্য শিল্পী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী।

ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিনি কলেজের ছাত্রজীবন থেকে। চিনি বলতে দূর থেকে দেখেছি। সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ কিংবা সাহস হয়নি তখন। সামনাসামনি জানাশোনা আমার প্রবাস জীবনের শুরুতেই। তখন থেকেই তার সান্নিধ্য পেয়ে আসছি। তিনি লন্ডনে, আমি ভিয়েনায়। ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়া, ইউরোপের দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব যতই থাক না কেন, দিনে দিনে নৈকট্য বেড়েছে। একুশের প্রভাতফেরির গানের রচয়িতা, খ্যাতিমান সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সঙ্গে অপরিচয়ের দূরত্ব ঘুঁচে যেতে সময় লাগেনি। একসময় যাকে খুব দূরের বলে মনে হতো, তিনি আমাকে অপত্য স্নেহে কাছে টেনে নিয়েছেন। তার স্নেহ-সাহচর্যে আমি ঋদ্ধ। আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, আমাদের স্নেহে ভাই সহজ-সরল একজন মানুষ, যিনি সবাইকে আপন করে নেয়ার অসামান্য ক্ষমতা রাখেন। তার সঙ্গে দেশের ভালো-মন্দ, রাজনীতির বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হতো, এ আমার অনেক বড় পাওয়া।

লন্ডনে গেলে তার সঙ্গে দেখা করা ছিল আমার নিত্য রুটিন। বিদেশেও অনেক জায়গাতে গিয়েছি তার সঙ্গে। ভিয়েনাতে এসে আমার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন তিনি, এ আমার অনেক বড় পাওয়া। মনে আছে, ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’ নাটকের প্রদর্শনী হয়েছিল ভিয়েনায়। হল-ভর্তি দর্শক বিস্ময়-বিমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছিল নাটকটি। বোধহয় সেটাই ছিল লন্ডনের বাইরে পলাশী থেকে ধানমণ্ডি নাটকের প্রথম প্রদর্শনী।

দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের কাছে অতি পরিচিত ছিলেন তিনি। প্রতিক্রিয়াশীলদেরও জানা ছিল এই মানুষটি যেকোনো মুহূর্তে গর্জে উঠতে পারেন। বাংলা সাহিত্যেও তার অবদান উপেক্ষা করার নয়।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী তার লেখায় পাঠককে দিতেন চিন্তার খোরাক। অসাম্প্রদায়িক, উদারনৈতিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে তার মতো প্রগতিশীল মানুষকে আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল। আমাদের প্রত্যাশা ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকাবাহী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আরও অনেক দিন লিখবেন, সক্রিয় থাকবে তার কলম ও চিন্তার জগৎ। আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হলো না। অনন্তের পথে পাড়ি জমালেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। বিদায় নিলেন এক অসামান্য গল্প-কথক। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। এ এক অপূরণীয় ক্ষতি।

লেখক: সভাপতি, সর্ব-ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ। অস্ট্রিয়া-প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
শুক্রবার বাসায় ফিরতে চেয়েছিলেন গাফ্ফার চৌধুরী
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু
গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আসছে সোমবার
দেশে আনা হচ্ছে গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ
‘বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান গাফ্‌ফার চৌধুরী’

মন্তব্য

মতামত
Abdul Gaffar Chowdhury is my friend

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু
আমার জীবনে আমি কম সাংবাদিক-কলাম লেখক দেখিনি, কিন্তু গাফ্‌ফার ভাইয়ের মতো এত জনপ্রিয় কলাম লেখক বোধহয় বাংলাদেশে বিরল। একজন অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে গাফ্‌ফার ভাই চিরকাল মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হবেন।

বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী অতি পরিচিত, অতি প্রিয় একটি নাম। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক অলিখিত ইতিহাস, অনেক ঐতিহাসিক গৌরবগাথা। অষ্টাশি বছরের দীর্ঘজীবনে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও ১৯৫২ সালের প্রেক্ষাপটে রচিত ‘অমর একুশে’ গানের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তার রচিত অমর সংগীত বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়। এই গানটি তাকে অমরত্ব দান করেছে। আমার সৌভাগ্য যে, এমন একজন বরেণ্য মানুষ আমার অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। তার আকস্মিক প্রয়াণে সমগ্র বাঙালির মতো আমিও অশ্রুসিক্ত, শোকে মুহ্যমান।

একটি মহানক্ষত্রের পতন হলে যেমন করে কেঁপে ওঠে আকাশের বিশাল হৃদয়, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর মতো একজন মহান মানুষের মহাপ্রয়াণেও বাংলা ও বিশ্ব-বাঙালির অন্তরজুড়ে দুলে উঠছে চাপা কান্না। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর অকালপ্রয়াণ এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যার জন্য আমরা কেউই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না।

আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন থেকেই আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে চিনি। তিনি বয়সে আমার চেয়ে দশ বছরের বড় হলেও আমাকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করতেন। আমি তাকে গাফ্‌ফার ভাই বলে ডাকতাম, তিনিও আমাকে মোনায়েম ভাই বলে সম্বোধন করতেন। বাংলাদেশের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ছিলেন একজন অগ্রগণ্য কলমযোদ্ধা।

তার অগ্নিঝরা কলমে বাংলাদেশের ইতিহাস অবিকৃতভাবে উঠে এসেছে। যখনই তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কোনো কিছু লিখেছেন, তখনই তিনি সত্যকে অবলীলায় স্বীকার করে নিয়েছেন। মিথ্যা ভাষণ কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে কখনোই তিনি ইতিহাসকে বিকৃত করেননি। নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করেছেন গাফ্‌ফার ভাই তাদের অন্যতম।

গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা জন্মে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে নিহত হলে আমি কলকাতায় স্বেচ্ছানির্বাসনে যাই। সেখানে প্রায় চার বছর অবস্থান করি এবং দেশে-বিদেশে বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। গাফ্‌ফার ভাই তখন লন্ডনে থেকে আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন এবং খুনিদের বিরুদ্ধে হাতে কলম তুলে নেন। সে সময়ে বাংলার ডাক, বজ্রকণ্ঠ, সোনার বাংলা (দ্বিভাষিক), সানরাইজ প্রভৃতি পত্রিকায় গাফ্‌ফার ভাই লিখতেন এবং সেসব পত্রিকা আমার কাছে অ্যাটাচে ব্যাগে করে কলকাতায় আসত।

আমি অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে সেগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করতাম। এমনকি জেলখানায়ও আমি সেসব পত্রিকা লোক মারফত পাঠাতাম। এসব পত্রিকা পড়ে মুজিব আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের মনোবল চাঙা হতো। তারা ঘাতকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দীপ্ত প্রত্যয়ে জ্বলে উঠত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে গাফ্‌ফার ভাই যেভাবে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠেন, বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক বুদ্ধিজীবীর মধ্যেই আমি সেই বিদ্রোহীভাব প্রত্যক্ষ করেছি। গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন বটে কিন্তু তার অন্ধ-সমর্থক ছিলেন না। ‘আপদ-বিপদ-মসিবত’ বলতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের যে তিনজন বরেণ্য সাংবাদিককে বোঝাতেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সেই তিনজনের একজন ছিলেন।

কথা ছিল গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখবেন। কিন্তু জীবনী লেখার আগেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখতে না পারার বেদনা মৃত্যু পর্যন্ত গাফ্‌ফার ভাইকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের একুশ বছর পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আমি বঙ্গবন্ধুর জীবনী লেখায় হাত দেই। ১৯৯৮ সালে লন্ডনে গিয়ে গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি এবং আমার পরিকল্পনার কথা তাকে খুলে বলি।

আমার কথা শুনে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। আমি যতদিন সেবার লন্ডনে ছিলাম বেশিরভাগ সময়ই গাফ্‌ফার ভাইয়ের সান্নিধ্যে কাটাই। তৎকালীন অ্যাম্বাসেডর এ এইচ মাহমুদ আলীর বাসায় গাফ্‌ফার ভাই প্রতিদিন আসতেন এবং আমরা অনেক রাত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতাম। রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর গাফ্‌ফার ভাইয়ের বিদায়ের সময় অ্যাম্বাসেডর মাহমুদ আলী নিজে গাড়ি চালিয়ে গাফ্‌ফার ভাইকে টিউব স্টেশনে পৌঁছে দিতেন। গাফ্‌ফার ভাই টিউব রেলে চড়ে বাসায় চলে যেতেন।

গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এত কথা জানেন, এত ইতিহাস তার স্মৃতিতে জমে ছিল যা তার কাছে না শুনলে বোঝা যেত না। কিছু কথা থাকে সব সময় সেসব কথা লেখা যায় না, পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে হয় চুপ থাকতে হয়, নয়তো ভুলে যেতে হয়- গাফ্‌ফার ভাই এমন একজন অকুতোভয় সাহসী সাংবাদিক যিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কখনোই কুণ্ঠিত হননি।

অত্যন্ত খোলা মনে তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন, কখনও কখনও সমালোচনাও করেছেন, বঙ্গবন্ধুর উদারতা ও আবেগী মনোভাবের জন্য। গাফ্‌ফার ভাই অনেক আশাবাদী মানুষ ছিলেন, তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে নেতিবাচক বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনগ্রন্থ লেখার সময়ই টের পেয়েছি- লেখালেখি কিংবা পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ করার সময় তিনি কতটা মনোযোগী হয়ে সব কিছু খেয়াল করতেন।

আমার সম্পাদনায় বঙ্গবন্ধুর জীবনীগ্রন্থ দুই খণ্ডে প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি (২০০৮ সালে)। বইটি দেখে গাফ্‌ফার ভাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং আমাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দেন।

গাফ্‌ফার ভাই বাংলা ভাষার পাঠকদের জন্য প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখতেন। তার লেখার মাধ্যম বাংলা হলেও, ইংরেজিকে তিনি এড়িয়ে যাননি। ইংরেজিতেও তিনি নিয়মিত কলাম লিখতেন পত্র-পত্রিকায়। একদিন আমাদের ২৩ চামেলীবাগের বাসায় কথায় কথায় তার অকালপ্রয়াত স্ত্রীর কথা মনে করে তিনি আনমনা হয়ে যান। সে সময় আমাকে বলেন, ‘জানেন মোনায়েম ভাই, আপনার ভাবি হুইল চেয়ারে বসেই আমার জন্য লেখার কাগজ-কলম টেবিলে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখত।

একদিন সকালে আমি কী লিখব এটা ভেবে পায়চারি করছিলাম আর মাথা চুলকাচ্ছিলাম, এমন সময় আপনার ভাবি বললেন, কী ব্যাপার তুমি এমন করছ কেন? আমি বললাম, কী লিখব বিষয় খুঁজে পাচ্ছি না, তখন আপনার ভাবি বলল, ‘কেন মোনায়েম ভাইকে ফোন দাও, তাহলেই তো তুমি লেখার বিষয় পেয়ে যাবে।’ এ কথা বলছিলেন আর বার বার চোখ মুছছিলেন। প্রতিদিন ভোরেই গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হতো। ১৯ তারিখে মৃত্যুর আগেও তার সঙ্গে আমার প্রায় এক ঘণ্টা কথা হয়। সে বিষয়ে কিছু বলার আগে গাফ্‌ফার ভাইয়ের আশিতম জন্মদিন নিয়ে দুই একটি কথা লিখতে চাই।

২০১৫ সালে গাফ্‌ফার ভাই আশি বছরে পদার্পণ করেন। ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদ হলে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান উদ্‌যাপিত হয়। তখন গাফ্‌ফার ভাই কিছুটা আর্থিক সমস্যায় ছিলেন। এ কথা জানতে পেরে আমি গাফ্‌ফার ভাইকে কিছুটা আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। আমার ভাবনায় ছিল- হয় ২১ লাখ, না-হয় ৫২ লাখ টাকা তাকে উপহার দেব। যে মানুষ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে কালজয়ী গান রচনা করে বাংলা ভাষা-আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন তার জন্য এটুকু আমরা করতেই পারি।

সে সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত ভাই। তাকে টেলিফোন করলে তিনি আমার কথা শুনে আমাকে ধন্যবাদ দেন ও কিছুটা আশ্বস্ত করেন। পরে ব্যাংকারস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি নূরুল ফজল বুলবুলকে বিষয়টি অবগত করলে তারাও এগিয়ে আসে। নূরুল ফজল বুলবুল সেবার ২১ লাখ টাকার একটি চেক আমার হাতে দেন, আমি তা গাফ্‌ফার ভাইকে হস্তান্তর করি। যতদূর মনে পড়ে আমার টার্গেট অনুযায়ী প্রায় ৫২ লাখ টাকার মতোই সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম। এত টাকা এক সঙ্গে দেখে গাফ্‌ফার ভাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন। শিশু-সুলভ সরলতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘জানেন মোনায়েম ভাই, এক সাথে এত টাকা আমি কোনোদিন গুণি নাই। আপনি আমার জন্য যা করলেন তা চিরদিন মনে থাকবে।’

১৯৯৬ সালে আমাদের ২৩ চামেলীবাগের বাসায় আমি ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শামস কিবরিয়া মিলে গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ’ প্রতিষ্ঠা করি। বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন গাফ্‌ফার ভাইয়ের খুব প্রিয় জায়গা ছিল। তিনি যখনই বাংলাদেশে এসেছেন তখনই বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনে ছুটে এসেছেন। শেষের কয়েক বছর ঢাকা এলে তিনি ফাউন্ডেশনের অফিস কক্ষেই বসবাস করতেন।

ঢাকার যেকোনো পাঁচ তারকা হোটেলে থাকা তার জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তার দুই কন্যা- চিনু ও বিনু আমাদের ফাউন্ডেশন ছাড়া আর কোথাও উঠতে চাইত না। গাফ্‌ফার ভাইও আমার কাছে থেকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ২০১৯ সালে শেষবারের মতো তিনি বাংলাদেশে ছোট মেয়ে বিনিতাকে (বিনু) নিয়ে এসেছিলেন। সে সময়ও তিনি আমাদের ফাউন্ডেশনেই ছিলেন। গাফ্‌ফার ভাই এলে বাংলাদেশের সব বরেণ্য ব্যক্তি এসে ভিড় করতেন আমাদের ২৩ চামেলীবাগে। কবি-সাহিত্যিক, নায়ক-গায়ক, নেতা-মন্ত্রী-আমলা সবাই আসতেন গাফ্‌ফার ভাইকে একনজর দেখতে। এদেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন গাফ্‌ফার ভাই।

আমার জীবনে আমি কম সাংবাদিক-কলাম লেখক দেখিনি, কিন্তু গাফ্‌ফার ভাইয়ের মতো এত জনপ্রিয় কলাম লেখক বোধহয় বাংলাদেশে বিরল। একজন অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে গাফ্‌ফার ভাই চিরকাল মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হবেন।

১৮ মে বিকাল ৪টার দিকে তার সঙ্গে আমার প্রায় এক ঘণ্টা টেলিফোনে কথা হয়। তিনিই ফোন করেছিলেন। অনেক কথার ফাঁকে তিনি বললেন, ‘বহুবার আপনি আমাকে আমার আত্মজীবনী লিখতে অনুরোধ করেছেন, এবার ভাবছি হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় গেলে আর কলাম লিখব না, আপনার কথামতো শুধু আত্মজীবনী লিখব।’ আমি তার কথায় খুশি হয়ে বললাম, ‘আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যান এই কামনাই করি। আশা করি এবার জাতি আপনার আত্মজীবনীর মধ্য দিয়ে অনেক অলিখিত ইতিহাসের হদিস খুঁজে পাবে।’ ১৯ মে দুপুর আড়াইটার দিকে খবর শুনতে পাই গাফ্‌ফার ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। তখন আমি, সৈয়দ জাহিদ হাসান (কবি ও কথাশিল্পী) ও লায়লা খানম শিল্পী একসঙ্গে খেতে বসছিলাম। খবর শুনে ভাত না খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে পড়ি।

এরপর দেশ-বিদেশ থেকে একের পর এক ফোন আসতে শুরু করে। বাংলা টিভি, এটিএন নিউজ ক্যামেরাম্যান পাঠিয়ে ইন্টারভিউ নিয়ে যায়। যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও আরও কয়েকটি কাগজ থেকে ফোন আসতে থাকে লেখার জন্য। সত্যি বলতে কি গাফ্‌ফার ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে আমি মোটেই স্বাভাবিক ছিলাম না। যার নব্বইতম জন্মদিন পালনের জন্য আমি মনে মনে কত পরিকল্পনা করে রেখেছি, হঠাৎ তার মৃত্যুসংবাদ শুনে আমি যেন হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার এত এত স্মৃতি জমে আছে যে, যেসব বলতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর বরেণ্য সাংবাদিক, কলাম লেখক, কবি ও গীতিকার আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বাংলাদেশের একজন অতুলনীয় অভিভাবক ছিলেন। বাংলাদেশের যেকোনো সংকটে তিনি নির্ভীকভাবে এগিয়ে এসেছেন। তার মহাপ্রয়াণে বাংলাদেশ একজন প্রকৃত অভিভাবক হারালেন, এই ক্ষতি অপূরণীয়।

এই শোককে হৃদয়ে ধারণ করা অত্যন্ত বেদনার। পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্ম হয় অন্ধকারে আলো ছড়ানোর জন্য। গাফ্‌ফার ভাইও দুর্ভেদ্য অন্ধকারে আলো ছড়ানোর কঠিন তপস্যায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আলোর মশাল হাতে নিয়ে অন্ধকার তাড়াতে তাড়াতে দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে গেলেন মধ্যরাতের সূর্যতাপস আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। তার অনন্তযাত্রা শান্তিময় হোক।

লেখক: রাজনীতিবিদ, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক। মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ।

মন্তব্য

মতামত
The result of family system is todays Sri Lanka

পরিবারতন্ত্রের ফল আজকের শ্রীলঙ্কা

পরিবারতন্ত্রের ফল আজকের শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিণতি শুধুই কি অর্থব্যবস্থাকে সামলাতে না পারার ফল? না, এ শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়। শ্রীলঙ্কার রাজাপাক্ষে পরিবার— যে পরিবারের এক ভাই দেশের প্রেসিডেন্ট, অন্য ভাই প্রধানমন্ত্রী, আরও দু’ভাই এবং ছেলেমেয়েদের অধীনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তর, সব মিলিয়ে দেশের বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে যে পরিবারটি— যে ভঙ্গিতে দেশ চালিয়েছে, এটা তার প্রতিফলন। অন্য কারো মতের তোয়াক্কা না করে, কেবল নিজেদের স্বার্থের কথাটুকু ভেবে।

অপরিণামদর্শী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতা ও পরিবারতন্ত্রকে প্রাধান্য দেয়া, দেশের মধ্যে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে দমন করতে না পারা, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্যাঁচ, বৈশ্বিক মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইত্যাদি নানা কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা এখন চরম সংকটে। সেখানে এখন হিংসার আগুনে রাজনীতিবিদদের বাড়িঘর জ্বলছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশশাসন করেছেন, তারা এখন বিক্ষুব্ধ জনতার হিংস্রতার শিকার হচ্ছেন। জান নিয়ে পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।

সেনাবাহিনী ও পুলিশ অলিখিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুন তাতে কমছে না। দেশজুড়ে বিক্ষোভ আর হাহাকার চলছে। দিনের অর্ধেক সময় লোডশেডিং, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, পেট্রল পাম্পে তেল নেই, রান্নার গ্যাস নেই। তুমুল মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের পরিমাণ বিপুল— তা শোধ দেয়ার সামর্থ্য নেই। দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার তলানিতে ঠেকেছে।

ব্যাপক ক্ষোভের মুখে ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন মাহিন্দা রাজাপাক্ষে। এরপর মাহিন্দার সমর্থকেরা অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে পথে নামেন। শুরু হয় সংঘর্ষ। মানুষ গর্জে ওঠে। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে মাহিন্দা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।

বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন লাগিয়ে দেয় রাজাপাক্ষের পূর্বপুরুষের বাড়ি এবং দেশের আরও বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদের বাড়িতে। দেশজুড়ে কারফিউ জারি করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহে। যদিও প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা এখনও অনড়।

কয়েক বছর আগেও যে দেশের মনব-উন্নয়ন সূচকের উদাহরণ দেওয়া হতো, তার এমন অবস্থা কী করে হলো? খানিকটা ভাগ্যের মার, অস্বীকার করার উপায় নেই। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির একটা বড় দিক হলো পর্যটন শিল্প। কোভিডের ধাক্কায় তার অবস্থা ভয়াবহ।

অপরদিকে রয়েছে নীতিনির্ধারকদের অপরিণামদর্শিতা। ঋণ করে দেশ চালানোর অভ্যাস করে ফেলেছিলেন সে দেশের শাসকরা। তা-ও চড়া সুদে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণ। এদিকে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে মন দেয়নি সরকার, অর্থব্যবস্থার রাশ ছেড়ে রেখেছিল শাসকদের ঘনিষ্ঠ কিছু সাঙ্গাতের হাতে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিপুল ধার, তার উপর নিরাপত্তার অভাব— সব মিলিয়ে দেশের ক্রেডিট রেটিং কমেছে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাণিজ্যিক ধার পাওয়ার পথও বন্ধ হয়েছে ক্রমে। এদিকে, নতুন নোট ছাপিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টায় আরও দ্রুত গতিতে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি।

২০১৯-এর শেষপর্বে শ্রীলঙ্কার বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯৪ শতাংশ। ২০২১-এর শেষপর্বে তা ১১৯ শতাংশে পৌঁছায়। ফলে বিদেশি ঋণ পাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জানুয়ারির গোড়াতেই সে দেশে মূল্যবৃদ্ধি ২৫ শতাংশ ছুঁয়ে রেকর্ড গড়ে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষপর্বে তলানিতে ঠেকেছিল বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার। প্রাক অতিমারি পরিস্থিতির তুলনায় বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় কমে যায় প্রায় ৭৫ শতাংশ।

চলতি বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক ঋণ এবং সুদ মেটাতে অন্তত ৬৯০ কোটি ডলার (প্রায় ৫২,৪০০ কোটি টাকা) ব্যয় করতে হবে শ্রীলঙ্কাকে। অথচ সরকারি তথ্য বলছে, বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় মাত্র ২৩১ কোটি ডলারে (প্রায় ১৭,৫৪০ কোটি টাকা) এসে ঠেকেছে। বিদেশি মুদ্রার ভাঁড়ারে টান পড়ার প্রভাব পড়ে আমদানিতে। বিশেষত, জ্বালানি তেল কেনা কমে যায় অনেকটাই।

আর তার পরিণতিতে আকাশ ছোঁয় মূল্যবৃদ্ধি। শ্রীলঙ্কায় এখন এক কাপ চায়ের দাম ১০০ টাকা! এক কিলোগ্রাম চাল ৫০০ টাকা। চিনির কিলোগ্রাম ৪০০ ছুঁতে চলেছে। এমনকি, শিশুখাদ্যের দামও সাধারণের নাগালের বাইরে। অপ্রতুল জীবনদায়ী ওষুধ। কাগজের অভাবে বন্ধ স্কুল-কলেজের পরীক্ষা।

গত কয়েক বছরে টাকার অভাব সামাল দিতে বিপজ্জনক সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের সরকার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিদেশি মুদ্রায় রাসায়নিক সার কিনতে হয় এবং তার উপর ক্রেতাদের ভর্তুকিও দিতে হয়, তাই সে খরচ বাঁচাতে রাতারাতি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল রাসায়নিক সার— গোটা দেশে অর্গানিক চাষ চালু করা হয়।

প্রেসিডেন্ট রাজাপাক্ষে বলেছিলেন— অচ্ছে দিন, থুড়ি, কৃষিতে উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের সমৃদ্ধি এল বলে। আসেনি। ধান উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ২০ শতাংশ, এখন বাংলাদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হচ্ছে। অর্থনীতির উন্নতি হবে বলে রাতারাতি করের হার কমিয়ে দিয়েছিল সরকার। শিল্প উৎপাদন বাড়েনি, কিন্তু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে বিপুল পরিমাণে। ফলে, রাজকোষ ঘাটতির হার জিডিপি-র প্রায় ১৫ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিণতি শুধুই কি অর্থব্যবস্থাকে সামলাতে না পারার ফল? না, এ শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়। শ্রীলঙ্কার রাজাপাক্ষে পরিবার— যে পরিবারের এক ভাই দেশের প্রেসিডেন্ট, অন্য ভাই প্রধানমন্ত্রী, আরও দু’ভাই এবং ছেলেমেয়েদের অধীনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তর, সব মিলিয়ে দেশের বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে যে পরিবারটি— যে ভঙ্গিতে দেশ চালিয়েছে, এটা তার প্রতিফলন। অন্য কারো মতের তোয়াক্কা না করে, কেবল নিজেদের স্বার্থের কথাটুকু ভেবে।

রাজাপাক্ষে পরিবারের দুর্নীতি, দেশের সব ক্ষমতা দখলের চেষ্টা— সব কিছু নিতান্ত প্রকাশ্যে থাকার পরও পরিবার চার বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পরে ২০১৯ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়েই প্রেসিডেন্ট হন গোতাবায়া রাজাপাক্ষে; দুদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহেকে ছেঁটে সেই পদে বসেন মহিন্দ রাজাপাক্ষে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর নিঃশর্ত সমর্থন ছিল তাদের দিকে— কারণ, মহিন্দ রাজাপাক্ষে দ্ব্যর্থহীনভাবে এই সিংহলি সংখ্যাগরিষ্ঠতানির্ভর উগ্র জাতীয়তাবাদের পক্ষে।

প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকার সময় এলটিটিই-র কোমর ভেঙেছিলেন মহিন্দ, সঙ্গে মারা পড়েছিলেন অন্তত পঁচাত্তর হাজার তামিল। তিনি জানেন, সিংহলি জাতীয়তাবাদের পালের হাওয়াই তাকে টেনে নিয়ে যাবে। উগ্র জাতীয়তাবাদের সব সময়েই কোনো না কোনো শত্রুপক্ষের প্রয়োজন হয়। দুর্বল হয়ে যাওয়া তামিল জনগোষ্ঠীকে দিয়ে সেই কাজ আর চলছে না বলে রাজাপাক্ষেরা নতুন শত্রু হিসেবে বেছে নিয়েছেন মুসলমানদের। বড় মাপের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি ঠিকই, কিন্তু দ্বীপরাষ্ট্রের মুসলমানরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়েছেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যবাদ দিয়ে অর্থব্যবস্থার স্বাস্থ্যের উন্নতি করা কঠিন। দীর্ঘ সিংহলি-তামিল গৃহযুদ্ধে শ্রীলঙ্কায় ঋণের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছিল। সেই গৃহযুদ্ধ মিটেছে, কিন্তু জাতিগত অবিশ্বাসের আবহে অর্থব্যবস্থা গুটিয়েই থেকেছে— শ্রীলঙ্কায় লগ্নি করতে ভয় পেয়েছেন অনেকেই।

পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গেও ক্রমশ সম্পর্ক ছিন্ন করেছে শ্রীলঙ্কা— দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর জন্য আন্তর্জাতিক চাপকে রাজাপাক্ষেরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির অন্যায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা বলে দেখিয়েছেন। ফলে, লাভজনক শর্তে বিদেশি বিনিয়োগ বা সহজতর শর্তে ঋণ, কোনোটাই পায়নি শ্রীলঙ্কা। এই ফাঁক পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে চীন। শ্রীলঙ্কাজুড়ে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে লগ্নি করেছে চীন— সে লগ্নি আসলে চড়া সুদে ঋণ।

যে দেশ অন্য কোথাও থেকে ঋণ পায় না, তাকে চড়া হারে ঋণ দেয়া চীনের ইদানীংকার নীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর নাম দিয়েছে ডেট ট্র্যাপ ডিপ্লোম্যাসি— ঋণের দায়ে জড়িয়ে ফেলার কূটনীতি। শ্রীলঙ্কায় চীনের লগ্নি প্রচুর, রাজাপাক্ষে পরিবার ও সাঙ্গাতদের তাতে লাভ প্রচুরতর, কিন্তু দেশের কতখানি উপকার হয়েছে, সে হিসাব নেই।

সিংহলি-বৌদ্ধ আধিপত্য বজায় থাকায় শ্রীলঙ্কায় রাজাপাক্ষে পরিবারের ওপর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খুশিই ছিল। ‘আন্তর্জাতিক চাপ’-এর কাছে দেশের প্রেসিডেন্টের মাথা না নোয়ানোর সাহসেও অনেকেই গর্বিত ছিলেন। এপ্রিলের গোড়ায় যে মন্ত্রীরা দল বেঁধে পদত্যাগ করেছেন অপশাসনের অভিযোগ তুলে, তারাও দীর্ঘদিন ধরে বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছেন সব কিছুই। অর্থব্যবস্থার যখন ক্রমেই ভরাডুবি হচ্ছে, আইএমএফ তখন বারে বারে সাহায্য করতে চেয়েছিল— গোতাবায়া রাজি হননি।

তার বিশ্বাস ছিল, ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার ‘স্ট্র্যাটেজিক’ অবস্থানের কারণেই গোটা দুনিয়া বিনাশর্তে আর্থিক সাহায্যের ঝুলি নিয়ে ছুটে আসবে, চীনের আরও প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে। সেই বিশ্বাস ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে— এমনকি চীনও খুব আগ্রহ দেখায়নি শ্রীলঙ্কার মাথায় ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা লাঘব করার জন্য। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, গোতাবায়া যখন এমন বিপজ্জনক পথে হাঁটছিলেন, চার পাশের কেউ বাধাও দেননি তাকে।

শ্রীলঙ্কার উদাহরণ থেকে বাংলাদেশ বা এদেশের হর্তাকর্তা-বিধাতারা কিছু শিখবে, সেই আশা ক্ষীণ। তবে, একটা মস্ত বার্তা দিয়ে গেল শ্রীলঙ্কা— সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করলে, ‘মাফিয়াতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করলে, চারপাশে শুধু ‘জি হুজুর’-দের জায়গা দিলে শেষপর্যন্ত তার ফল হয় মারাত্মক।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ
ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম টেস্ট
ঢাকা টেস্টের দলে নেই শরীফুল
তাইজুলের ঘূর্ণিতে চাপে লঙ্কানরা
লঙ্কান শিবিরে তাইজুলের জোড়া আঘাত

মন্তব্য

মতামত
Raktveja May 19 Self sacrifice for the Bengali language

রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান

রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজপথজুড়ে নারী-পুরুষ; শিশুর পদভার বেড়ে ওঠে। বিপন্ন বাংলা ভাষা, বিপন্ন মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ সবার হৃদয়ে। উত্তাল জনসমুদ্র। বাঁধভাঙা মানুষ। সবার কণ্ঠে স্লোগান, ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা’। গ্রেপ্তার হয় অনেকে। রেললাইনজুড়ে মানুষের ঢল। প্রতিরোধে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং বেপরোয়া লঠিচার্জ করে। কিন্তু আহতরা তবু স্থান ত্যাগ করেনি। শহরজুড়ে শুধু স্লোগান। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে নিরস্ত্র বঙ্গভাষীদের ওপর চালানো হলো গুলি। রেলওয়ে চত্বরে লুটিয়ে পড়ে ১১টি তাজা প্রাণ, যাদের জন্ম একদার সিলেটে।

১৯৬১ সালের ১৯ মে রক্তভেজা একটি দিন বাংলা ভাষাভাষীর জন্য। এর ৯ বছর আগে এই বাংলা ভাষার জন্য রক্ত ঢেলে দিয়েছিল ঢাকার রাজপথে বাংলার কিছু দামাল ছেলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিল ছাত্র-যুবারা। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, বাংলাকে শুধু রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিতই করেনি, বাঙালির স্বাধীন সার্বভৌম দেশও অর্জন করেছে। ২০০০ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বিশ্বদরবারে বাংলাভাষার মর্যাদাকে উচ্চাসন দিয়েছেন। জাতিসংঘে পিতার মতো তিনিও বাংলায় ভাষণ দিচ্ছেন। বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম স্থানে অবস্থিত বাংলা ভাষা। এই ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

পূর্ব বাংলার মানুষকে অবদমিত করার জন্য পাকিস্তানি শাসকরা উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাঙালি তা মানেনি। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বিশ শতকে বাঙালি অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। আর একষট্টি বছর আগে আসামের বরাক নদীতীরে বরাক উপত্যকায় বাংলাভাষী মানুষের রক্ত ঝরেছিল মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের দাবিতে। যদিও আসাম রাজ্যে শুধু বাংলাভাষী নয়, অন্যান্য জনগোষ্ঠীও রয়েছে। খাসিয়া, বড়ো, গারো, মিছিং, মণিপুরী, আও, মিজো, কার্বি, রাভা, ককবরক, চাকমা, মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া, আদি (অরুণাচল), ডিমাসা- এসব ভাষাভাষী মানুষও রয়েছে। এরা সবাই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। মূলত বাংলাভাষী সংখ্যাগুরু হলেও, অসমীয়া ভাষাভাষীরা তাদের উপরে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, এখনও সে প্রচেষ্টা অব্যাহত।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের আসাম বা আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের আরেক রক্তাক্ত নজির। অবশ্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে এই আন্দোলনে পার্থক্য রয়েছে। আসাম রাজ্যে অসমীয়ারা একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার একপর্যায়ে পুরো রাজ্যে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলে প্রবল আন্দোলন।

বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মবলিদানের দ্বিতীয় এ নজির স্থাপিত হয়েছিল ৬১ বছর আগে। বরাক উপত্যকার মানুষজন মূলত বাংলাভাষী। এক সময় এ এলাকা ছিল সিলেটের অংশ। দেশভাগ তাদের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটায়। মুসলিম সংখ্যাধিক্য এবং বাংলাভাষী অঞ্চল হলেও ব্রিটিশের কলমের খোঁচায় সিলেটের ৪টি থানা আসাম তথা ভারতভুক্ত হয়। আর এ অঞ্চলের মানুষকে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলা শুধু নয়, শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ বঞ্চিত করে। বরাক অঞ্চলে ভাষার জন্য আন্দোলনের বীজ আসাম রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেই নিহিত ছিল। এখনও তা লুপ্ত হয়নি।

শ্রীহট্ট তথা সিলেট ছিল অবিভক্ত বাংলার অন্তর্ভুক্ত আয়তনে বড় জেলা। ১৮৪৭ সালে আসাম প্রদেশ গঠন করে ব্রিটিশ শাসকরা। সিলেট তখন বঙ্গের সঙ্গে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে সিলেট পূর্ববঙ্গ-আসাম প্রদেশের মধ্যে পড়ে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সিলেট পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। শুধু একটি অংশ আসামের সঙ্গে জুড়ে দেয় ব্রিটিশ। যদিও ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ওই অংশের বাসিন্দারা পূর্ববঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হবার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। করিমগঞ্জ ‘হাইলাকান্দি, শিলচর’ কাছাড়-বাংলাভাষী ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো সিলেটের অংশ হলেও তা হয়ে যায় আসামের অংশ। এমনকি আরও কিছু বাংলাভাষী অঞ্চল। তদুপরি এসব অঞ্চল আসামভুক্ত করা হয়। দেশভাগের মর্মযাতনা তাদের এখনও উপলব্ধি করতে হয় যখন ‘বঙ্গাল খেদাও’ অভিযানে নামে অসমীয়ারা।

রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গকালে সিলেটকে বঙ্গদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার বেদনা প্রকাশ করেছিলেন এভাবে- “মমতাবিহীন কালস্রোতে/বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে/ নির্বাসিতা তুমি/সুন্দরী শ্রীভূমি।” দেশভাগের শিকার হয়ে শ্রীহট্টের যে বাঙালিরা অসামে যান, ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের আগে, অবিভক্ত ভারতবর্ষে, তাদেরও জন্মভূমি ছিল অসাম। কারণ তা তখন অসাম প্রদেশভুক্ত অঞ্চল। কিন্তু তাদেরকে পূর্ববঙ্গীয় বলে ঘোষণা দিয়ে অসমীয়রা হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ ভাষার অধিকারও কেড়ে নিয়েছিল। ক্ষমতাসীন অসাম রাজ্য সরকার ঘোষণাই দিয়েছিল, আসাম হবে কেবল অসমীয়াদের জন্যই। তখন থেকেই অসমীয়া ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হলো বাংলাভাষীদের উপর। দেশভাগ সিলেট ও অসমের মানচিত্রকে পাল্টে দিয়েছিল। বাঙালি হিন্দুরা দেশত্যাগ করে আসামের বিভিন্ন জেলায় বসবাস শুরু করে। অনুরূপ অসাম থেকেও প্রচুর মুসলমান সিলেটে অভিবাসী হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৫ নভেম্বর আসামের বিধানসভার অধিবেশনে রাজ্যপাল ঘোষণা করেন যে, আসাম এখন থেকে অসমীয়রাই শাসন করবে। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিলীন হতে হবে। সরকার রাজ্যে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারে প্রশ্রয় দেবে না। সরকারি এই ঘোষণায় বাংলাভাষীসহ অন্যান্য ভাষাভাষীরাও ফুঁসে ওঠে। স্থায়ী ও অভিবাসী বাংলাভাষীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ঘৃণা ও উপেক্ষার শিকার হতে থাকে বাংলাভাষীরা। তাদেরকে চিহ্নিত করা হয় ‘অনুপ্রবেশকারী বিদেশী’, ‘বহিরাগত’, ‘সন্দেহভাজন শরণার্থী ’ হিসেবে। অসমে বাংলা ভাষাভাষী ৪৩ লাখ মানুষ ছিল যেখানে, সেখানে ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে দেখানো হয় ১৭ লাখ। বিপরীতে ২০ লাখ অসমিয়াভাষী বাড়িয়ে করা হয় ৪৯ লাখ। এই অবিশ্বাস্য সংখ্যাবৃদ্ধিকে সে সময়ে অভিহিত করা হয়েছিল ‘জীবতাত্ত্বিক বিস্ময়’ (বায়োলজিক্যাল মিরাকল) হিসেবে। ষড়যন্ত্রের শিকার হলো বাংলাভাষীরা। সংখ্যাগুরু থেকে পরিণত হলো সংখ্যালঘুতে। এই বিভেদ জাতিগত দাঙ্গায় রূপ নেয়। ইতিহাসের পাতায় তাই দেখা যায়, ১৯৪৮ সালের মে মাসে গুয়াহাটিতে বাঙালি-অসমীয়া দাঙ্গা, ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুট ও অগ্নিসংযোগ এবং হতাহত অর্ধশত। এই দাঙ্গার প্রসারে আসামজুড়ে ‘বঙ্গাল খেদাও’ অভিযান শুরু হয়। ১৯৫০ সালে এই অভিযান গণহত্যায় পরিণত হয়।

বাংলাভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলে নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চলে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোয়ালপাড়া জেলার বাংলাভাষীরা। আতঙ্কিত বাংলাভাষীরা আত্মরক্ষার্থে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় পালিয়ে যায়। পরবর্তীকালে এদের শর্তসাপেক্ষে আসামে পুনর্বাসন করা হয় যে, তাদের মাতৃভাষা হবে অসমীয়া। বাংলা উচ্চারণ করা যাবে না। তারপরও বাংলাভাষীরা থেমে থাকেনি। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানায় মাতৃভাষার অধিকারের জন্য। এতে ক্ষুব্ধ অসীময়ারা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের সরকারি ভাষা করার জন্য সরকারি মদদে নারকীয় কাণ্ড ঘটাতে থাকে। শুরু হয় বাংলাভাষী নিধন।

১৯৬০ সালের ২১ ও ২২ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি একতরফাভাবে প্রস্তাব নেয় যে, অসমীয়া ভাষাই হবে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা। বাংলাভাষী অঞ্চল কাছাড় জেলার নির্বাচিত দশ সদস্য এর বিরোধিতা করে। প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ২ ও ৩ জুলাই কাছাড় জেলার শিলচর গান্ধীবাগে ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন’ করা হয়। প্রায় ২৫ হাজার বঙ্গভাষীর সমাবেশে বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম রাজ্যভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার দাবি তোলা হয়। এই দাবির জবাব দেয়া হয় তিন জুলাই।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা । এতে বহু বঙ্গভাষী নিহত হয়। দশ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়। বাস্তুচ্যুত হয় পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ। বঙ্গভাষীর আহবানে হরতাল পালনও হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর শান্তি প্রক্রিয়াও ব্যর্থ হয়। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের ওপর বলিষ্ঠ চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি। কারণ রাজ্য সরকার তো কংগ্রেসেরই। বাংলাভাষীদের ওপর এই নারকীয় হামলায় তাদের রক্ষায় তেমন কেউ এগিয়ে আসেননি। সব সচেতন ও কল্যাণকামী এবং মানবাধিকার সংগঠনের আহবান কোনো কাজে দেয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর রাত দশটায় আসাম বিধানসভায় অহমিয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে অনুমোদন করা হয়। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বঙ্গভাষীরা। বাংলাভাষী জেলা কাছাড়ে মানুষ প্রতিবাদে রাজপথে নামে। করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, শিলচরে গণজাগরণ তৈরি হয়। আসামের সংখ্যালঘু অন্য ভাষাভাষীরাও এই আন্দোলনে শরিক হয়।

১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। এসময় সিলেটের অঙ্গ করিমগঞ্জে বৃহৎ জনসম্মেলনে গণসংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। অজস্র কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল সেদিন, ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ।’ ১৪ এপ্রিল তথা পয়লা বৈশাখ সত্যাগ্রহী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘সংকল্প দিবস’ পালন করা হয়। অযুতকণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জান দেব তবু জবান দেব না, আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা।’ আন্দোলনে আতঙ্কিত আসাম সরকার। ১৯৬১ সালের ১৯ মে সারা আসামে ‘বন্ধ’ ও সত্যাগ্রহের কর্মসূচি দেয় আন্দোলনকারীরা। শিলচরসহ অন্যত্র সেনা টহল চালু ও ১৪৪ ধারা জারি হয়। কিন্তু এসব উপেক্ষা করে বঙ্গভাষীসহ অন্য ভাষাভাষীরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং বরাক উপত্যকায় ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে তখন।

১৯৬১ সালের ১৯ মে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে খুব ভোরে সত্যাগ্রহী, স্বেচ্ছাসেবীরা শিলচর রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্টেশন, অফিস-আদালতের সামনে সমবেত হতে থাকে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজপথজুড়ে নারী-পুরুষ; শিশুর পদভার বেড়ে ওঠে। বিপন্ন বাংলা ভাষা, বিপন্ন মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ সবার হৃদয়ে।

উত্তাল জনসমুদ্র। বাঁধভাঙা মানুষ। সবার কণ্ঠে স্লোগান, ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা’। গ্রেপ্তার হয় অনেকে। রেললাইনজুড়ে মানুষের ঢল। প্রতিরোধে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং বেপরোয়া লঠিচার্জ করে। কিন্তু আহতরা তবু স্থান ত্যাগ করেনি। শহরজুড়ে শুধু স্লোগান। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে নিরস্ত্র বঙ্গভাষীদের ওপর চালানো হলো গুলি। রেলওয়ে চত্বরে লুটিয়ে পড়ে ১১টি তাজা প্রাণ, যাদের জন্ম একদার সিলেটে। একাদশ শহীদের বুকের তাজা রক্তে শিলচর রেল স্টেশন রঞ্জিত হয়ে ওঠে।

বরাক উপত্যকার মাটি বঙ্গভাষীর রক্তের দাগে ফুটিয়েছে কৃষ্ণচূড়া। শহীদ কমলা ভট্টাচার্য, বয়স তার ষোলো, মিছিলের মুখ ছিল, তাকেও হতে হলো ভাষার বলি। আত্মদান করেছিল সেদিন হীতেশ বিশ্বাস, শচীন্দ্র পাল, সুকোমল পুরকায়স্থ, কুমুদ দেব, সত্যেন্দ্র দেব, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডিচরণ সূত্রধর, ধীরেন্দ্র সূত্রধর, তরণী দেবনাথ ও সুনীল সরকার। এই আত্মদানেরও পাঁচ বছর পর ১৯৬৬ সালের ২২ মার্চ বরাক অঞ্চলে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

‘বরাক উপত্যকার ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থের ভূমিকায় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপক সুবীর কর উল্লেখ করেছেন-

“আমরা সবাই মিলেছিলাম মায়ের ডাকে। সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছে বাহান্নের ঢাকার ভাষা সংগ্রাম। রফিক, সালাম, বরকতেরা ছিলেন আদর্শ। পদ্মা মেঘনা যমুনার মধ্যে কুশিয়ারা, ধলেশ্বরী, সুরমা খুঁজে নিয়েছিল তার ঠিকানা। বুড়িগঙ্গা আর বরাক হয়ে উঠেছিল চেতনার সংগ্রাম”।

বরাক ভাষা আন্দোলনের উপর শিলচর থেকে ইমাদউদ্দিন বুলবুল রচিত ‘দেশী ভাষা বিদ্যা যার’ ও ‘ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার’ নামে দুটি গ্রন্থ রয়েছে যাতে পটভূমি বিধৃত রয়েছে। বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মবলিদানের দ্বিতীয় উদাহরণ শিলচর তথা বরাক উপত্যকা। যেখানে ভাষা সংগ্রাম জাতিসত্তার স্বতন্ত্র মর্যাদাকে সংরক্ষিত করেছে।

ভারতের আসাম রাজ্যে বঙ্গভাষীদের হাল এখনও করুণ। প্রায়শই বঙ্গভাষীদের ওপর নিপীড়ন নামে। কিন্তু অসমীয়দের এই আচরণ অবশ্য সাম্প্রতিক নয়। আরও প্রাচীন। ১৯৩৬ সালে শনিবারের চিঠি সম্পাদক সজনীকান্ত দাশ লিখেছিলেন-

“যে কারণেই হউক আসামের ভাষা ও কালচারকে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেবার জন্য যে সরকারি চেষ্টা আজকাল চলিতেছে, সংবাদপত্র পাঠক মাত্রেই তাহা অবগত রহিয়াছেন। কিন্তু এই চেষ্টা বহুদিন পূর্বে শুরু হইয়াছে।”

১৮৭০ সালে মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত জন মারডক রচিত ‘ক্যাটালগ অব দি ক্রিশ্চিয়ান ভার্ণাকুলার লিটারেচার অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে অহমীয়া ভাষা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-“বাঙ্গলার সঙ্গে অসমীয়া ভাষার সাদৃশ্য এত বেশী যে, স্বতন্ত্র ভাষা হিসাব অসমীয়াদের দাবি অনেকে স্বীকার করেন না। যদিও অনেক সরকারি কর্মচারী অসমীয়া ভাষার স্থলে বাঙ্গলার প্রবর্তনে প্রয়াসী। কিন্তু সরকার স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার প্রশ্রয় দিচ্ছেন”। গৌহাটি প্রবাসী বাঙ্গালী ছাত্র সম্মিলন এর ১৯৩৬ সালের ১৪ অক্টোবর গৌহাটিতে আয়োজিত অষ্টম অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণে সজনীকান্ত দাশ বলেছিলেন- ‘‘কামরূপ-গৌহাটিতে বসে আপনারা আপনাদের সম্মিলনীর নাম ‘প্রবাসী বাঙ্গালী ছাত্র সম্মিলনী’ দিয়েছেন। মনে হইতেছে আপনারা পরাজিত এবং অভিমান ক্ষুব্ধ। অসমে বাঙ্গালীকে প্রবাসী করিবার জন্য রাজনৈতিক প্রচেষ্টা সম্প্রতি শুরু হইয়াছে। কিন্তু ইতিপূর্বে বাঙ্গালীরা প্রবাসী ছিল না। সংখ্যায়, শিক্ষায় জীবনের প্রায় সকল বিভাগেই বাঙ্গালীর প্রাধান্য ছিল এবং সর্বত্র বাঙ্গালীর স্বার্থ অসমের মাটি ও প্রকৃতির সহিত জড়িত ছিল। অসমের শিক্ষাকেন্দ্র ছিল কলিকাতা। চা বাগানগুলি বাদ দিলে আসাম বলিতে কামরূপ, শ্রীহট্ট, শিলচর, শিলংয়ের মত কয়েকটি শহর বুঝাইত এবং সকল স্থলেই ছিল বাঙ্গালীর কর্তৃত্ব্। প্রাগ ঐতিহাসিক যুগ হইতেই কামরূপ বাঙ্গলাদেশের অঙ্গ ছিল।” মহাভারতে যে এ অঞ্চলের বর্ণনা রয়েছে, তা পরবর্তীকালেও গবেষকরা উল্লেখ করেছেন। সজনীকান্ত দাশ বলেছেন,“ভাষার দিক দিয়া আসামী ভাষা বাঙ্গলার একটি উপভাষা বা ‘প্রভিন্সিয়াল ডায়ালেক্ট’ মাত্র। উপভাষাতে কোনো সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। এই কারণেই অহমীয়া ভাষার উল্লেখযোগ্য কোন সাহিত্য নাই। বাঙ্গলা সাহিত্যের উপরই আসামবাসীকে নির্ভর করিতে হইয়াছে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অসমের সুবিখ্যাত হলিরাম ঠেকিয়াল ফুকন ও যজ্ঞরাম ফুকন বাঙ্গলা ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করিতেন। হলিরামের ‘আসাম বুরঞ্জী’ নামক অসমের প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ বাঙ্গলা ভাষাতেই রচিত হয়ে ১৮২৯-৩০ সালে কলকাতার সমাচার চন্দ্রিকা যন্ত্রালয়ে মুদ্রিত হয়।” আসাম বর্ণমালা মূলত বাংলা বর্ণমালা। দু’একটি অক্ষর ব্যতিক্রম রয়েছে।

সুরমা উপত্যকা তথা সিলেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাংলাভাষী অঞ্চলের মানুষ তাদের মাতৃভাষায় কথা বলবে সেটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ সিলেট, আসাম সফর করেছেন। বাংলাভাষী মানুষজন তাদের আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের গানই গেয়েছিলেন। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সেদিন বাংলাভাষার অধিকার রক্ষার দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল যারা, প্রতিবেশী দেশের প্রতিবেশী রাজ্যে, তাদের আত্মদান বৃথা যায়নি। অন্য ভাষাভাষী যেমন বোড়ো, ককবরক ভাষীরাও তাদের মাতৃভাষার অধিকার পেয়েছে। ওরা ১১ জনও গেয়েছিল ‘আ-মরি বাংলাভাষা।’ আমরাও তা গাই।

লেখক: কবি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক। মহাপরিচালক প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

আরও পড়ুন:
স্ত্রী হত্যায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার
বিজিবির কাছ থেকে ইয়াবাসহ মাদককারবারি ছিনতাই
এসআই-কনস্টেবলকে পিটিয়ে আটককে ছিনতাই
আদালতের হাজতখানা থেকে আসামি চম্পট
হ্যান্ডকাফসহ আসামি ছিনতাই

মন্তব্য

মতামত
Sheikh Hasina came to politics with hope

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে এসেছিলেন আশা জাগিয়ে

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে এসেছিলেন আশা জাগিয়ে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকগুলো নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন শেখ হাসিনা। রাজনীতিবিদরা সাধারণ ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিতে অভ্যস্ত। ক্ষমতার বাইরে থেকে যা বলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তা করেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা এখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তিনি যা বলেন, তা করেন। চাপ দিয়ে, আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে নমনীয় করা যায়নি, যায় না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আছে। প্রথমটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। দ্বিতীয়টি তার কন্যা শেখ হাসিনার। বঙ্গবন্ধু ৯ মাস পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি জীবন কাটিয়ে স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে।

বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিরা আটক করেছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাংলাদেশের ওপর সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দেয়ার পর। ওরা ভেবেছিল, বঙ্গবন্ধুকে আটক করলে, তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর অপচেষ্টা চালালে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ হবে না। রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেবে বাঙালির স্বাধীন দেশের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তা হয়নি। বাঙালি নয়মাস অসম সাহসে লড়েছে, মরেছে, তারপরও স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশেই ফিরে এসেছিলেন ১০ জানুয়ারি। তার এই ফিরে আসা ছিল আশা ও উদ্দীপনার। লাখো শহীদের রক্তে মুক্ত স্বদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা নিয়ে।

শেখ হাসিনাও ফিরেছিলেন এক নতুন পটভূমিতে। তিনি যখন স্বামীর সঙ্গে বিদেশে যান তখন তার পিতা জীবিত, দেশের সরকারপ্রধান। কিন্তু তিনি যখন ফিরে আসেন তখন পিতা নেই, মাতা নেই, নেই ভাই, নেই আরও কত আত্মীয়স্বজন। এক গভীর শূন্যতার মধ্যে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন নতুন এক বিরাট দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে। তার এই স্বদেশফেরা পঁচাত্তর-পরবর্তী দেশের রাজনীতির আবহ বদলে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।

ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন, কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভানেত্রীও নির্বাচিত হয়েছেন। অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছেন পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন। জেল-জুলুম-অত্যাচার-মামলা উপেক্ষা করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রাণপাত ধারাবাহিক সংগ্রাম। কিন্তু তিনিও রাজনীতির পিচ্ছিল পথে হাঁটবেন, সেটা হয়তো ভাবনায় সেভাবে ছিল না। অথচ তাই হলো।

১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে দলের ঐক্য ধরে রাখার বৃহত্তর প্রয়োজনে বাধ্যতামূলক নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তিনি দেশে ফিরেছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের লালচোখ উপেক্ষা করে। দেশে ফিরে রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়ার কারিগর হতে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাই রাজনীতির বাইরের মানুষ তাকে বলা যাবে না। তবে রাজনীতির মঞ্চে তার আরোহণ একটু ব্যতিক্রমভাবে হয়েছে। বিশেষ অবস্থায়, বিশেষ প্রয়োজনে তিনি নৌকার হাল ধরেন।

১৯৮১ থেকে ২০২২। ৪০ বছরের বেশি সময়ের এই পথপরিক্রমা তাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যাত্রাপথ অবশ্যই ফুল বিছানো ছিল না। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে চলতে হচ্ছে তাকে। এখনও তিনি দল ও দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। ইতিহাস যেন তার কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে অনেক দায় ও দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনে তিনি ক্লান্তিহীন যোদ্ধা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে রাষ্ট্রটির জন্ম দিয়েছিলেন, সেই রাষ্ট্র তার জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। নিজের পরিচর্যায় আন্তরিক দরদে গড়া দল, আওয়ামী লীগ, যে দল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, সে দলটিও মুজিব-হত্যার আকস্মিকতায় ছিল হতবিহ্বল। তারাও কোনো কার্যকর প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত ব্যর্থতা খুনিদের উল্লাস নৃত্য দেখতে বাধ্য করেছিল গোটা জাতিকে।

১৯৮১ সালের বৃষ্টিস্নাত ১৭ মে শেখ হাসিনাকে বরণ করার জন্য জনতার ঢল নেমেছিল। যারা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হারিয়ে দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে পারেননি, তারা ১৭ মে অকাতরে চোখের জল ঢেলে দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন যেন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তাৎক্ষণিকভাবেই তৈরি হয়েছিল পরিবর্তনের অভিঘাত। মুক্তিযুদ্ধের হারানো চেতনাকে ফিরিয়ে আনার রাজনীতি বলবান হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

শেখ হাসিনা বাবার মতো রাজনীতিতে সাফল্য দেখাতে পারবেন কি না তা নিয়ে শুরুতে কারো কারো মধ্যে সংশয় ছিল। রাজনীতি থেকে যিনি নিজেকে পিতার ইচ্ছায় দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন, তিনি পিতার রাজনীতির ধারা এগিয়ে নিতে পারবেন কি না সে প্রশ্নও ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই শেখ হাসিনা প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, তার ধমনীতে শেখ মুজিবের রক্ত বহমান, তাই তিনি পরাজয় মানতে জানেন না।

যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে মুজিব হত্যার বিচার হবে না, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারীদের বিচার হওয়া সম্ভব নয়, তাদের ভুল প্রমাণ করেছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে আর সবাই পরাজিত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু যেমন তার সময়ের অন্যসব রাজনীতিকদের ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন, শেখ হাসিনাও তেমনি তার সময়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। কাজটি অবশ্যই সহজ ছিল না। ঘরে-বাইরে বৈরিতা ছিল এবং আছে। সব মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার এক বিরল কৃতিত্বের অধিকারী এখন শেখ হাসিনার।

শেখ হাসিনা একটি কথা প্রায়ই বলে থাকেন— ‘আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, শিশু ছোটভাই রাসেলসহ আপনজনদের হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাঁদের ফিরে পেতে চাই।’

মানুষের প্রতি তার মমত্ববোধ আর ভালোবাসার কারণে আজ পৃথিবীতে বাংলাদেশ একটি কার্যকর কল্যাণমুখী রাষ্ট্র। শেখ হাসিনা সরকার-প্রবর্তিত সামাজিক সুরক্ষা বলয় গোটা উন্নয়নশীল বিশ্বে এক অনন্য ঘটনা। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে লাখ লাখ গৃহহীন, ঠিকানাহীন মানুষের জন্য নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার সুদক্ষ, সাহসী নেতৃত্ব ও সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় মিয়ানমার ও ভারতের কাছ থেকে বিশাল সমুদ্রসীমা জয় করেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সমুদ্র-আইন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে পৃথিবীর খুব কম দেশই এত সফলভাবে সমুদ্রের ওপর তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।

পাকিস্তানের ২৪ বছরে, জিয়া-এরশাদ ও খালেদা জিয়ার মোট ৩১ বছর শাসনামলে যেখানে ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি, সেখানে তার কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারত গ্রহণ করেছে, যার মোট আয়তন ৭ হাজার ১১০ একর ভূমি।

অপরদিকে, ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশ পেয়েছে, যার মোট আয়তন ১৭ হাজার ১৬০ একর ভূমি। ফলে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ১০ হাজার ৫০ একর বা ৪০.৬৭ বর্গকিলোমিটার ভূমি পেয়েছে।

একটি স্বল্পোন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও ১৩ হাজার ৫ শয়ের মতো কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আরও ৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণাধীন। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তার নেতৃত্বে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। দেশের কৃষক-শ্রমিক, দিনমজুর, খেটে খাওয়া তথা স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মানুষকে বাঁচাতে ও অর্থনীতিকে রক্ষা করতে লাখ লাখ কোটি টাকার অনুদান ও প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে, যা খুব প্রশংসনীয়।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন তার আরেকটি সাহসী সিদ্ধান্ত। যা বাঙালিকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। চলতি বছর জুন মাসেই সেতুতে চলাচল শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। এতে দক্ষিণ বঙ্গের সঙ্গে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই সহজ হবে না, অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকগুলো নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন শেখ হাসিনা। রাজনীতিবিদরা সাধারণ ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিতে অভ্যস্ত। ক্ষমতার বাইরে থেকে যা বলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তা করেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা এখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তিনি যা বলেন, তা করেন। চাপ দিয়ে, আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে নমনীয় করা যায়নি, যায় না।

তিনি যেটা সঠিক মনে করেন, সেটা বাস্তবায়িত করার জন্য যে যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার তিনি তা নিতে পিছপা হন না। তবে তাকে কখনও কখনও কৌশলী হতে হয়, সময় ও সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাতে কারো কারো মধ্যে সংশয়ও হয়তো তৈরি হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত শেখ হাসিনা তার নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়তা দেখাতে ভুল করেন না। তার গৃহীত পদক্ষেপ সবাইকে নিশ্চয়ই খুশি করে না। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে রাজনীতিতে একমত একপথ হয়ে চলা সহজ নয়। তবে শেখ হাসিনার হাত ধরে রাজনীতিতে অস্থিরতা অনেকটাই দূর হয়েছে। শেখ হাসিনাকে যদি সময় ও সুযোগ দেয়া যায় তাহলে তিনি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।

তিনি পরপর তিনবার দলকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করে তার রাজনৈতিক কৌশলের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। রাজনীতি মূলত নীতি ও কৌশলের খেলা। কৌশলে তিনি শতভাগ জিতেছেন। তবে দেশে নীতিহীনতার রাজনীতি প্রকট হয়ে উঠেছে। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। রাজনীতি পরিণত হয়েছে কেনাবেচার পণ্যে। রাজনীতির ব্যবসা অনেকের ভাগ্য বদলে সহায়ক হয়েছে। এটা দুঃখজনক। রাজনীতি নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব অনেকের মধ্যেই প্রবল। নষ্ট রাজনীতি নিয়ে হতাশাও ব্যাপক। সেজন্য এখন ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি নীতির রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার সাফল্য দেখার অপেক্ষায় দেশের মানুষ।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অবস্থায় যারা মনে করছেন বাংলাদেশের পরিণতিও শ্রীলঙ্কার মতো হবে, তাদের উল্লাসনৃত্য বন্ধ হতে সময় লাগবে না । তবে হ্যাঁ, শেখ হাসিনা নিঃসঙ্গ শেরপার মতো একাই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে চলছেন। তার সঙ্গে একদল বিশ্বস্ত নির্লোভ সহযোদ্ধা এখন খুব বেশি প্রয়োজন। পাবেন কি তেমন নিবেদিতপ্রাণ আদর্শের লড়াইয়ে শামিল হওয়ার মতো যোদ্ধা দল?

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা সোমবার
বিদেশিদের নালিশ না দিয়ে আমার কাছে আসুন: প্রধানমন্ত্রী
‘আম্মা...পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ’
মা দিবসের শুরু কবে
তত্ত্বাবধায়কের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিন আজ

মন্তব্য

মতামত
Sheikh Hasina came back for human welfare

শেখ হাসিনা মানবকল্যাণের জন্যই ফিরে আসেন

শেখ হাসিনা মানবকল্যাণের জন্যই ফিরে আসেন
একজন ব্যক্তি অদম্য সংকল্প এবং কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে ভয়ের কালো মেঘকে সরিয়ে দেন, দেশের মানুষ আশার আলো দেখে। তার পরিচয় প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি তিনি এক অদম্য সাহসী মানুষ। তিনি একজন যোদ্ধা ও অভিভাবক। তিনি সাহসিকতার সঙ্গেই কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করছেন, এখন এটি বিশ্বের সেরা উদাহরণ এবং বিশ্ব নেতারা বিশ্বব্যাপী সংকট পরিচালনার জন্য তার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।

গতকাল ১৭ মে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪২তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ছিল। ১৯৮১ সালের এই দিনে প্রায় ৬ বছর নির্বাসনে থাকার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকদের ষড়যন্ত্র আর অনিরাপত্তার কারণে পরিবারের সবাইকে হারানোর পরেও দীর্ঘ ৬ বছর দেশে ফিরতে পারেননি তারা।

প্রতিকূলতার মাঝেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এক সময় চাঙা হয়ে ওঠেন; নতুন করে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বলীয়ান হন। তখন শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই নেতা-কর্মীরা কাউন্সিলের মাধ্যমে তাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করেন।

১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। এরপর ২০০৮ সালে দ্বিতীয়, ২০১৪ সালে তৃতীয় ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। শেখ হাসিনা সবচেয়ে দুঃসময়ে দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামে অনেক সর্বদা লড়াই করেছেন। তিনি বার বার মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছেন। ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে একটি জনপ্রিয় দল হিসেবে ক্ষমতায় এনেছেন এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করে যে অসম্ভব কাজটি সম্ভব করেছিলেন তা হলো- বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার এবং পরে ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। আর সেই সুযোগ এসেছিল বাঙালি জাতির আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রের হাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর কালো অন্ধকার গ্রাস করেছিল, সেই অন্ধকার তাড়াতে প্রথমে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন তিনি। সে মশাল, প্রাথমিক সংকট- সীমাবদ্ধতার পর দিকে দিকে আলোকিত করতে থাকে, শুরু হয় রাহু মুক্তির পালা। সব আবর্জনা দূর করতে প্রভাতে যেমন বাঙালি একাকার হয়, প্রতিশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হয়, তেমনি এক শুভ প্রতিশ্রুতির বাতাস বইতে দেখা যায় তার দেশে ফেরার দিন থেকে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণ, বিকাশ এবং মুক্তির লক্ষ্যে অগ্রণী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের জন্য তার বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার সততা-নিষ্ঠা, যুক্তিবাদী মানসিকতা, দৃঢ় মনোবল, প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্ব অঙ্গনে এক ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তিনি বিশ্ববিখ্যাত নেতা হিসেবে পরিচিত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাহসী কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে এখন আওয়ামী লীগ ১৪ বছর ক্ষমতায় রয়েছে এবং তিনি জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার অদম্য শক্তি-সাহস, মনোবল এবং দৃঢ় নেতৃত্বে বিশ্ব অবাক করে।

২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৯তম এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ২৩তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ একটি ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে এবং ২০৪১ সালে একটি ‘উন্নত দেশ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ টি মাইলফলক দিয়েছেন প্রথমটি হল ডিজিটাল বাংলাদেশ যা ইতিমধ্যে একটি পর্যায়ে এসছে, দ্বিতীয়টি ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট (এসডিজি) অর্জন করা, তৃতীয়টি ২০৪১ সালে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার এবং চতুর্থটি ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন।

চল্লিশ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। এটি একটি অনন্য অর্জন এই ৪০ বছর তিনি শুধু যে আওয়ামী লীগের সভাপতি আছেন তা নয়, তার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত এবং দলের একজন নেতাকর্মীও মনে করেন না যে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প আছে। এটি একজন রাজনৈতিক নেতার অসাধারণ প্রাপ্তি। আর সে কারণেই তারা মনে করে যে শেখ হাসিনার বিকল্প একমাত্র শেখ হাসিনাই।

আওয়ামী লীগ সভাপতির সাফল্যের একটি বড় দিক হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তিনি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে রূপ দিয়েছেন। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু থেকে শুরু করে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশকে মনে করা হয় উন্নয়নের রোল মডেল, এটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছে। আত্মমর্যাদা এবং নিজের টাকায় পদ্মা সেতু।

শেখ হাসিনা কেবল বাংলাদেশকে উন্নত এবং অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বাংলাদেশকে একটা আত্মসম্মান মর্যাদায় নিয়ে গেছেন। বিশ্বব্যাংক যখন বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নিয়ে আপত্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ করেছিল তখন প্রধানমন্ত্রী সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিজের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন যে পদ্মা সেতু এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। শুধু পদ্মা সেতু নয়, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বিভিন্ন দৃশ্যমান উন্নয়ন এখন বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদার এক অনন্য জায়গায় নিয়ে গেছে, যেটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে যখন সংকট তীব্র হয়, যখন সবকিছু আবর্তিত হয় অনিশ্চয়তায়, বাংলার আকাশে কালো মেঘ জমে থাকে, তখন শেখ হাসিনাই আমাদের ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ান। একজন ব্যক্তি অদম্য সংকল্প এবং কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে ভয়ের কালো মেঘকে সরিয়ে দেন, দেশের মানুষ আশার আলো দেখে।

তার পরিচয় প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি তিনি এক অদম্য সাহসী মানুষ। তিনি একজন যোদ্ধা ও অভিভাবক। তিনি সাহসিকতার সঙ্গেই কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করছেন, এখন এটি বিশ্বের সেরা উদাহরণ এবং বিশ্ব নেতারা বিশ্বব্যাপী সংকট পরিচালনার জন্য তার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।

এই চার দশকে তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য লড়াই করেছেন। সংগ্রামের এই গতিপথ ছিল প্রতিকূল। শেখ হাসিনা, যিনি অলৌকিকভাবে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় বেঁচে যান। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ।

আমরা আমাদের অর্থনীতি এবং সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে একবার নজর দিতে পারি। ২০০৮-০৯ সালে গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল মাত্র ১০৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০-এ এটি বেড়ে দাঁডিয়েছে ৩৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ সালে রপ্তানি আয় ছিল ১৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৮-১৯ সালে, এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০.৫৪ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৮.৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৪.০৩ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। ২০০১ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৭.৯ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪.৩ শতাংশ। ২০২০ সালে দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ১০.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত উনয়ন প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ৩৯টি হাই-টেক পার্ক এবং আইটি গ্রাম নির্মিত হচ্ছে।

কৃষি-শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, আধুনিক প্রযুক্তি সবকিছুর অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে নতুন পরিকল্পনা, চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। বাংলাদেশ আমূল বদলে যাচ্ছে টেকসই উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এদেশ। দুর্বল, অনুন্নত, নড়বড়ে অবস্থা থেকে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

প্রচলিত অবকাঠামোর আধুনিক রূপান্তর সম্ভাবনার নতুন দিক উন্মোচন করছে প্রতিদিন। যেসব খাত কিংবা ব্যবসা আগে অবহেলিত অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে চলছিল; সেগুলোতে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। অমিত সম্ভাবনার হাতছানি এদেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত, আগ্রহী করে তুলছে। অবহেলায়, অযত্নে লালিত সেই সম্ভাবনাময় খাতগুলো ক্রমেই জেগে উঠছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ, দপ্তর, মন্ত্রণালয়গুলো সময়ে সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। ফলে সম্ভাবনার নতুন খাতের বিকাশ ঘটে চলেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অবিশ্বাস্য রকমের। বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ বর্তমানে ৪১তম স্থানে উঠে এসেছে।

শিক্ষায় উন্নতি, যোগাযোগের অবকাঠামো, নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ, সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত, অসহায়, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষার সোশ্যাল সেফটি নেট সাপোর্ট প্রদান, স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের সহযোগিতা, অটিজম, প্রধানমন্ত্রীর সরকারের প্রধান উদ্যোগসমূহ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে মর্যাদা প্রদান, আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিভিন্ন সেক্টরের সামগ্রিক উন্নয়ন তার সরকারেরই অবদান।

আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এটিই বর্তমান নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই আমাদের কাণ্ডারি, আমাদের ভরসা ও আশ্রয়স্থল।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনার ফিরে আসা ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ
তিনি ফিরলেন সব হারানোর দেশে
শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন বলেই দেশ এগিয়েছে
শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার দিন আজ
প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা সোমবার

মন্তব্য

উপরে