× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য

মতামত
In 1971 the order of the military court and the turning point of life changed
hear-news
player

একাত্তরে সামরিক আদালতের নির্দেশ ও জীবনের বাঁক বদল

একাত্তরে-সামরিক-আদালতের-নির্দেশ-ও-জীবনের-বাঁক-বদল
সেদিন আমরা কেউ-ই বেলুচিস্তানের কসাই-খ্যাত জেনারেল টিক্কা খানের আদালতে হাজির হইনি। সামরিক আদালত ৮ জুন আমাদের অনুপস্থিতিতে প্রত্যেককে ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে।

১৯৭১-এর ২০ এপ্রিল আমার জীবনের এক বিশেষ দিন। এই দিনে পাকিস্তানের সামরিক সরকার সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে স্বাধীন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও বেতার উপদেষ্টা আবদুল মান্নান, দি পিপল পত্রিকার সম্পাদক আবিদুর রহমান এবং আমাকে ২৬ এপ্রিল সকাল ৮টায় সামরিক আদালতে সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করে। ’৭১-এর এই দিনে প্রকাশিত সব পত্রিকায় আমাদের ৫ জনকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশটি সিঙ্গেল কলামে ছাপা হয়। শিরোনাম ছিল ‘৫ ব্যক্তির প্রতি সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ সকাশে হাজির হওয়ার নির্দেশ।’ আমাদের সবার বিরুদ্ধে পাকিস্তান পেনাল কোডের ১২১, ১২৩ক, ১৩১ ও ১৩২; এবং সামরিক বিধি ৬, ১৪, ১৭ ও ২০ এবং ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক নির্দেশ ১২৪ ও ১২৯ আইনের আওতায় অভিযোগ আনা হয়। এই নির্দেশে একমাত্র আবিদুর রহমান ছাড়া অন্য কারো কোনো পেশাগত পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। এটি ছিল পাকিস্তান সামরিক সরকারের একটি হাস্যকর অপপ্রয়াস।

কারণ, যাদেরকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তারা বাংলার মানুষের কাছে সুপরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং জনপ্রতিনিধি। বলাবাহুল্য, সেদিন আমরা কেউ-ই বেলুচিস্তানের কসাই-খ্যাত জেনারেল টিক্কা খানের আদালতে হাজির হইনি। সামরিক আদালত ৮ জুন আমাদের অনুপস্থিতিতে প্রত্যেককে ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর থেকে পাকিস্তানিরা বহির্বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিল পুরো এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করে প্রচার করত ‘তাদের নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে’। ’৭১-এর ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ গণপরিষদে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ অনুসারে ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুক্তাঞ্চল বৈদ্যনাথতলাকে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঘোষণা করা হয় এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে।

প্রকৃতপক্ষে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার ফলে পাকিস্তানের কফিনে যে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়েছিল, ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সেই কফিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধিস্থ করা হয়। সেদিনের সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নিয়মতান্ত্রিক অভ্যুদয়। দেশের অভ্যন্তরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি ছিল নিষ্ঠুর গণহত্যার খলনায়ক জেনারেল টিক্কা খান ও সামরিক শাসকদের জন্য চরম আঘাত। এরকম আঘাতের পর জেনারেল টিক্কা খান আরও হিংস্র হয়ে ওঠে এবং আমাদের বিরুদ্ধে সামরিক নির্দেশ জারি করে।

আমাদের বিরুদ্ধে সামরিক ট্রাইব্যুনালের রায় ভারতের মাটিতে বসে শুনলাম এবং হাসলাম। কারণ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তখন এগিয়ে চলেছে। মুজিববাহিনীর অন্যতম প্রধান হিসেবে ৭টি জেলার দায়িত্বে ছিলাম আমি। পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী। এই অঞ্চলের মুজিববাহিনীর সদস্যদের দেরাদুনে প্রশিক্ষণের পর বিমানে করে দমদম বিমানবন্দর, এরপর ব্যারাকপুরে আমার যে ক্যাম্প ছিল সেখানে তারা অবস্থান করত। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে তাদের আমরা বাংলাদেশে প্রবেশ করাতাম।

কতজনের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছি, তাদের অনেকের সঙ্গে পরবর্তী জীবনে আর কোনোদিন দেখা হয়নি। ব্যারাকপুরে আমার ক্যাম্পেই মুজিববাহিনীর জন্য ভারতীয় সাহায্য আসত। এই সাহায্য আমি মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাইয়ের কাছে পৌঁছাতাম। ভারত সরকারের পক্ষে আমাদের দায়িত্বে ছিলেন মিস্টার ব্যানার্জী। যার ছদ্মনাম ছিল মিস্টার নাথ। তিনি আমাদের সর্বাত্মক সাহায্য করেছেন। ’৬৯-এর অক্টোবরে লন্ডনে বঙ্গবন্ধু এই মিস্টার নাথের সঙ্গে মিটিং করেছিলেন। মিস্টার নাথ মুক্তিযুদ্ধে অক্লান্ত পরিশ্রম ও আমাদের অপরিসীম সাহায্য করেছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এসে তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানকালে তিনি আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। কৃতজ্ঞচিত্তে তার অবদান স্মরণ করছি।

পাকিস্তান সামরিক শাসকগোষ্ঠী আমাদের প্রতি যে কী নিষ্ঠুর ছিল তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এবং এই মামলার রায় থেকে উপলব্ধি করা যায়। আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে। ভাবতে কত ভালো লাগে জাতির পিতার নির্দেশিত পথেই আমরা প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, ‘তোমাদের জন্য আমি সব রেখে গেছি। যে নির্দেশ আমি দিয়েছি। সেই নির্দেশিত পথে তোমরা পরিচালিত হও। বন্ধু রাষ্ট্র ভারতে গেলে তোমরা সর্বাত্মক সাহায্য পাবে।’ ভারতে গিয়ে চিত্তরঞ্জন সুতার যে বাড়িতে অবস্থান করতেন অর্থাৎ ‘সানি ভিলা, ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কোলকাতা’-সেই বাড়িতেই আমরা অবস্থান করেছি।

সেখান থেকেই মুজিববাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনা করেছি। চিত্তরঞ্জন সুতার (সূত্রধর) ছিলেন বামপন্থি নেতা। তিনি জীবনে বহুবার কারা নির্যাতন ভোগ করেছেন। ’৭০-এর নির্বাচনের আগে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগে যোগদান করে স্বরূপকাঠি থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক ছিলেন এবং আমাদের সর্বাত্মক সাহায্য করেছেন। তার অমর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার খরচ হিসাবে বঙ্গবন্ধু আমাকে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। নির্বাচনে খরচ হয়েছিল ২১ হাজার টাকা। বাকি ৪ হাজার টাকা ইউনাইটেড ব্যাংকের ভোলা শাখায় জমা ছিল। পাকিস্তান সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে। দেশ স্বাধীনের পর ফেরত পেয়েছিলাম। সেদিন অভিযুক্তদের মধ্যে চার ব্যক্তিত্বই আজ প্রয়াত। প্রজাতন্ত্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ উভয়েই ’৭৫-এর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সশস্ত্র বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের গুলিতে শহীদ হন। মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও বেতার উপদেষ্টা আবদুল মান্নান স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।

কবি-সাংবাদিক-শিল্পপতি হিসেবে সুপরিচিত ‘দি পিপল’ পত্রিকার সম্পাদক নিভৃতচারী সজ্জন মানুষ জনাব আবিদুর রহমান পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। এখন বেঁচে আছি কেবল আমি। যে প্রশ্নটি আমায় নিয়তই তাড়া করে, সেদিন কেন আমাদের সঙ্গে আবিদুর রহমানকেও পাকিস্তান সামরিক সরকার জড়িত করেছিল? আসলে সামরিক সরকার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। কারণ আবিদুর রহমান সম্পাদিত ইংরেজি পত্রিকা ‘দি পিপল’ ছিল জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নির্ভীক কণ্ঠস্বর। বর্তমানে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিপরীতে অবস্থিত ‘দি পিপল’ পত্রিকার দপ্তরটি ’৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাতে গ্রেনেড ও ট্যাংক হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর অফিসটির ধ্বংসস্তূপ থেকে পত্রিকাটির দু’জন কর্মীর পোড়া কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। কত ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছি। বিভীষিকাময় ২৫ মার্চ কালরাতে গ্রিন রোডে অবস্থিত ‘চন্দ্রশিলা’ নামক যে বাসায় আমি এবং প্রয়াত শ্রদ্ধাভাজন নেতা আবদুর রাজ্জাক থাকতাম, পাকিস্তান সেনাবাহিনী তা ধ্বংস করে দেয়। সেখানে সংরক্ষিত ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের দুর্লভ ছবি, দেশি-বিদেশি খবরের কাগজ ও দলিলপত্রাদি ভস্মীভূত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর সব কিছুই ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ’৪৮-এর ১১ মার্চ প্রথম পর্বের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে বীজ তিনি রোপণ করেছিলেন, তা বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে কারাগারে আমরণ অনশন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ’৬৬-এর ৬ দফা, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ’৭০-এর নির্বাচন। ’৭০-এর নির্বাচনের পর পরই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সামরিক শাসকগোষ্ঠী বিজয়ী আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তখন থেকেই তিনি স্থির করেন ঘটনাধারাকে এমনভাবে নিয়ে যাবেন যে, ওরা হবে আক্রমণকারী আর আক্রান্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন। শ্রী চিত্তরঞ্জন সুতারকে বঙ্গবন্ধু ভারতে পাঠিয়েছিলেন।

চিত্তরঞ্জন সুতার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ভারতে গিয়ে আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করেছিলেন। এখানেই বঙ্গবন্ধু ক্ষান্ত হননি। সিরাজগঞ্জ থেকে প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্য আমার বন্ধু ডা. আবু হেনাকে অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে ভারতে পাঠিয়েছিলেন। আবু হেনা যে পথে গিয়েছিলেন ও যে পথে ফিরে এসেছিলেন, ঠিক সেই পথেই ২৯ মার্চ কেরানিগঞ্জ থেকে দোহার-নবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সারিয়াকান্দি-বগুড়া হয়ে ৪ এপ্রিল আমরা ভারতে পৌঁছাই। সঙ্গে ছিলেন জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, জাতীয় নেতা এএইচএম কামারুজ্জামান, শেখ ফজলুল হক মণি-শ্রদ্ধেয় মণি ভাই-এবং ডা. আবু হেনা ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক। মুক্তিযুদ্ধের ৯টি মাস আবু হেনা আমাদের সঙ্গে থেকে নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

মনে পড়ে, ১৭ এপ্রিল প্রথম বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে বজ্রকণ্ঠে স্লোগান তুলেছিলাম, ‘জাগো জাগো বাঙালী জাগো’; ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’; ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’; ‘আমার দেশ তোমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’; ‘আমার নেতা তোমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব’; ‘জয় বাংলা’! শত-সহস্র মুক্তিযোদ্ধা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সমবেতভাবে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেছে মুজিবনগরের আম্রকানন। সেদিন আমার পরিবার-পরিজন জানত না আমি কোথায় আছি, কীভাবে আছি বা আদৌ বেঁচে আছি কি না। সে-সব দিনের কথা ভাবলে গর্বে যেমন বুক ভরে ওঠে।

আবার দুঃখও লাগে এই ভেবে যে, ১৭ এপ্রিল ‘মুজিবনগর দিবস’ মহান মুক্তিযুদ্ধের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রাপ্তির মহত্তর দিন। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে যে-সব দল রাজনীতি করছে, বার বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নের ঐতিহাসিক এই দিবসটি পালন করে না। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তাদের জন্য এটি বেদনাদায়ক যে, একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দল ‘মুজিবনগর দিবস’ উদযাপন করে না। অথচ মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৭ এপ্রিল আমাদের গণপ্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার গৌরবময় দিন।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য। সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

আরও পড়ুন:
বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দিন
‘জে কে ১৯৭১’ হবে ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায়
ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ দিবস
কলকাতায় চলছে ‘জে কে ১৯৭১’
তোফায়েল আহমেদের ফিজিওথেরাপি শুরু

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
Abdul Ghaffar Chowdhury The son of news and literature

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র
তরুণবেলায়, সেই ১৯৫২ সালে কলম ধরেছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করেছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সমান প্রতিবাদী ছিলেন তিনি। যখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়, দেশের অপরাজনীতি যখন অপপ্রচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে তার কলম। দুই চোখজুড়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রচলিত সংবাদভাষ্য ও সাহিত্যের ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। দেশের সংবাদপত্রে তার কলাম সৃষ্টি করে নতুন এক ঘরানা। সাহিত্য দিয়ে যার লেখালেখি শুরু, তিনি হয়ে ওঠেন সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র।

গাফ্‌ফার ভাই চলে গেলেন! আর কখনও তার ফোন পাব না। কোনোদিন আর ফোন করা হবে না তাকে। তিনি আর বলবেন না, ‘নজরুল, দেশের খবর কী বলো?’ তাকে ফোন করলে তিনি প্রথমেই জানতে চাইতেন দেশের খবর। সব ঠিক আছে তো? বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে তিনি অত্যধিক স্নেহ করতেন। তাদের খোঁজ নিতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ছিল তার অগাধ আস্থা। একান্ত আলাপচারিতায় বলতেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই।

তার সঙ্গে কত শত স্মৃতি। ২০০৪ সালে আমার জীবনের একটি বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছিলেন তিনি। ওই বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে একদিন ফোনে বললেন, ‘এবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তুমি পত্রিকার জন্য একটা প্রবন্ধ লেখ। ডাকযোগে আমার কাছে পাঠাও। আমি দেখে ঠিক করে দেব। তারপর তা তুমি পত্রিকায় পাঠাবে। ওরা ছাপাবে।’

তার কথায় আমি লিখেছিলাম। তিনি দেখে একটু যোগ-বিয়োগ করে আমার কাছে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। আমি তা ফ্রেশ করে লিখে ঢাকা ও লন্ডনের পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। ছাপা হয়। তারপর আরও পাঁচটি প্রবন্ধ তিনি দেখে দিয়েছিলেন। এরপর আর দেখে দিতে হয়নি। তার প্রেরণা ও আশীর্বাদে এখন আমি পত্রিকায় নিয়মিত লিখে যাচ্ছি। তার কাছে আমার অন্তহীন ঋণ।

দুই যুগেরও বেশি প্রায় প্রতিদিন তার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হতো। হাসপাতালে তার ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন থাকত না। তিনি নার্সের সহায়তায় ইন্টারনেট কানেকশন নিয়ে আমাকে প্রতিদিন ফোন করতেন। গত ১৮ মে বুধবার রাতেও তিনি আমাকে ফোন করেছেন। কথা হয়েছে। ১৯ মে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় দুপুরে খবর পেলাম তিনি অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন।

শৈশবে, যখন থেকে একুশের প্রভাতফেরিতে যাচ্ছি, তখন থেকেই তার নামের সঙ্গে পরিচয়। কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সেই তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন তার স্কুল জীবনেই। স্কুলের পাঠ নিতে নিতেই নিয়েছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির পাঠ। আধুনিকমনস্ক মানুষটি মননে ছিলেন প্রগতিশীল। তরুণবেলায়, সেই ১৯৫২ সালে কলম ধরেছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করেছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সমান প্রতিবাদী ছিলেন তিনি। যখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়, দেশের অপরাজনীতি যখন অপপ্রচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে তার কলম। দুই চোখজুড়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রচলিত সংবাদভাষ্য ও সাহিত্যের ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। দেশের সংবাদপত্রে তার কলাম সৃষ্টি করে নতুন এক ঘরানা। সাহিত্য দিয়ে যার লেখালেখি শুরু, তিনি হয়ে ওঠেন সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র।

অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন সৃজনশীল আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী, সঙ্গীও। ব্রিটিশ-ভারত থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের জন্ম। এই ইতিহাসের অনেক কিছুরই সাক্ষী তিনি। জন্মেছিলেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে, ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি প্রয়াত হাজী ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী তার বাবা, মা জোহরা খাতুন। উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসা ও উলানিয়া করোনেশন হাই ইংলিশ স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেও। ছাত্রজীবনেই লেখালেখিতে হাতেখড়ি। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত মাসিক সওগাত পত্রিকায় তার গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। ১৯৫২ সালে সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সাংবাদিকতায় হাতেখড়িও ছাত্রজীবনেই। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন যোগ দেন দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে যোগ দেন খায়রুল কবীর সম্পাদিত দৈনিক সংবাদের বার্তা বিভাগে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন ১৯৫৬ সালে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী কলমযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মডারেটরের ভূমিকাও পালন করেছেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনপদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী।

বাংলাদেশে সেলিব্রিটি সাংবাদিকের সংখ্যা হাতেগোনা। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সেই স্বল্পসংখ্যক সাংবাদিকের একজন, যার কলামের অপেক্ষায় থাকত দেশের সিংহভাগ পাঠক। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী কলামে যে মতপ্রকাশ করতেন, তার সঙ্গে অনেক পাঠকেরই হয়ত মতের মিল হতো না। কিন্তু তিনি কী লিখছেন, কী ভাবছেন, তা জানার আগ্রহ পাঠকদের ছিল। এমনকি তার বিরুদ্ধ-রাজনৈতিক মতবাদের মানুষও আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম পড়তেন সমান আগ্রহে। সাংবাদিকতা জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। কলামের প্রতিটি শব্দে ছিল অসম্ভব চৌম্বক শক্তি। পাঠককে ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা এমন কজনের আছে? আইন পেশায় একটা কথা আছে, ‘ক্যারি দ্য কোর্ট’। পাঠককে টেনে রাখার অসম্ভব শক্তি ছিল তার কলমে। প্রযুক্তি এগিয়েছে; কিন্তু তিনি হাতে লিখতেন। মুক্তোর মতো স্বচ্ছ হাতের লেখা। টানা লিখে যেতেন পাতার পর পাতা। কোথাও কাটাকাটি নেই। অসামান্য দক্ষতায় নির্মেদ গদ্যে যেন সময়ের ছবি আঁকতেন সংবাদ-সাহিত্যের এক অসামান্য শিল্পী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী।

ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিনি কলেজের ছাত্রজীবন থেকে। চিনি বলতে দূর থেকে দেখেছি। সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ কিংবা সাহস হয়নি তখন। সামনাসামনি জানাশোনা আমার প্রবাস জীবনের শুরুতেই। তখন থেকেই তার সান্নিধ্য পেয়ে আসছি। তিনি লন্ডনে, আমি ভিয়েনায়। ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়া, ইউরোপের দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব যতই থাক না কেন, দিনে দিনে নৈকট্য বেড়েছে। একুশের প্রভাতফেরির গানের রচয়িতা, খ্যাতিমান সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সঙ্গে অপরিচয়ের দূরত্ব ঘুঁচে যেতে সময় লাগেনি। একসময় যাকে খুব দূরের বলে মনে হতো, তিনি আমাকে অপত্য স্নেহে কাছে টেনে নিয়েছেন। তার স্নেহ-সাহচর্যে আমি ঋদ্ধ। আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, আমাদের স্নেহে ভাই সহজ-সরল একজন মানুষ, যিনি সবাইকে আপন করে নেয়ার অসামান্য ক্ষমতা রাখেন। তার সঙ্গে দেশের ভালো-মন্দ, রাজনীতির বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হতো, এ আমার অনেক বড় পাওয়া।

লন্ডনে গেলে তার সঙ্গে দেখা করা ছিল আমার নিত্য রুটিন। বিদেশেও অনেক জায়গাতে গিয়েছি তার সঙ্গে। ভিয়েনাতে এসে আমার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন তিনি, এ আমার অনেক বড় পাওয়া। মনে আছে, ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’ নাটকের প্রদর্শনী হয়েছিল ভিয়েনায়। হল-ভর্তি দর্শক বিস্ময়-বিমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছিল নাটকটি। বোধহয় সেটাই ছিল লন্ডনের বাইরে পলাশী থেকে ধানমণ্ডি নাটকের প্রথম প্রদর্শনী।

দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের কাছে অতি পরিচিত ছিলেন তিনি। প্রতিক্রিয়াশীলদেরও জানা ছিল এই মানুষটি যেকোনো মুহূর্তে গর্জে উঠতে পারেন। বাংলা সাহিত্যেও তার অবদান উপেক্ষা করার নয়।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী তার লেখায় পাঠককে দিতেন চিন্তার খোরাক। অসাম্প্রদায়িক, উদারনৈতিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে তার মতো প্রগতিশীল মানুষকে আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল। আমাদের প্রত্যাশা ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকাবাহী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আরও অনেক দিন লিখবেন, সক্রিয় থাকবে তার কলম ও চিন্তার জগৎ। আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হলো না। অনন্তের পথে পাড়ি জমালেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। বিদায় নিলেন এক অসামান্য গল্প-কথক। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। এ এক অপূরণীয় ক্ষতি।

লেখক: সভাপতি, সর্ব-ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ। অস্ট্রিয়া-প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
শুক্রবার বাসায় ফিরতে চেয়েছিলেন গাফ্ফার চৌধুরী
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু
গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আসছে সোমবার
দেশে আনা হচ্ছে গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ
‘বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান গাফ্‌ফার চৌধুরী’

মন্তব্য

মতামত
Abdul Gaffar Chowdhury is my friend

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু
আমার জীবনে আমি কম সাংবাদিক-কলাম লেখক দেখিনি, কিন্তু গাফ্‌ফার ভাইয়ের মতো এত জনপ্রিয় কলাম লেখক বোধহয় বাংলাদেশে বিরল। একজন অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে গাফ্‌ফার ভাই চিরকাল মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হবেন।

বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী অতি পরিচিত, অতি প্রিয় একটি নাম। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক অলিখিত ইতিহাস, অনেক ঐতিহাসিক গৌরবগাথা। অষ্টাশি বছরের দীর্ঘজীবনে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও ১৯৫২ সালের প্রেক্ষাপটে রচিত ‘অমর একুশে’ গানের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তার রচিত অমর সংগীত বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়। এই গানটি তাকে অমরত্ব দান করেছে। আমার সৌভাগ্য যে, এমন একজন বরেণ্য মানুষ আমার অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। তার আকস্মিক প্রয়াণে সমগ্র বাঙালির মতো আমিও অশ্রুসিক্ত, শোকে মুহ্যমান।

একটি মহানক্ষত্রের পতন হলে যেমন করে কেঁপে ওঠে আকাশের বিশাল হৃদয়, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর মতো একজন মহান মানুষের মহাপ্রয়াণেও বাংলা ও বিশ্ব-বাঙালির অন্তরজুড়ে দুলে উঠছে চাপা কান্না। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর অকালপ্রয়াণ এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যার জন্য আমরা কেউই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না।

আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন থেকেই আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে চিনি। তিনি বয়সে আমার চেয়ে দশ বছরের বড় হলেও আমাকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করতেন। আমি তাকে গাফ্‌ফার ভাই বলে ডাকতাম, তিনিও আমাকে মোনায়েম ভাই বলে সম্বোধন করতেন। বাংলাদেশের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ছিলেন একজন অগ্রগণ্য কলমযোদ্ধা।

তার অগ্নিঝরা কলমে বাংলাদেশের ইতিহাস অবিকৃতভাবে উঠে এসেছে। যখনই তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কোনো কিছু লিখেছেন, তখনই তিনি সত্যকে অবলীলায় স্বীকার করে নিয়েছেন। মিথ্যা ভাষণ কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে কখনোই তিনি ইতিহাসকে বিকৃত করেননি। নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করেছেন গাফ্‌ফার ভাই তাদের অন্যতম।

গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা জন্মে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে নিহত হলে আমি কলকাতায় স্বেচ্ছানির্বাসনে যাই। সেখানে প্রায় চার বছর অবস্থান করি এবং দেশে-বিদেশে বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। গাফ্‌ফার ভাই তখন লন্ডনে থেকে আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন এবং খুনিদের বিরুদ্ধে হাতে কলম তুলে নেন। সে সময়ে বাংলার ডাক, বজ্রকণ্ঠ, সোনার বাংলা (দ্বিভাষিক), সানরাইজ প্রভৃতি পত্রিকায় গাফ্‌ফার ভাই লিখতেন এবং সেসব পত্রিকা আমার কাছে অ্যাটাচে ব্যাগে করে কলকাতায় আসত।

আমি অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে সেগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করতাম। এমনকি জেলখানায়ও আমি সেসব পত্রিকা লোক মারফত পাঠাতাম। এসব পত্রিকা পড়ে মুজিব আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের মনোবল চাঙা হতো। তারা ঘাতকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দীপ্ত প্রত্যয়ে জ্বলে উঠত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে গাফ্‌ফার ভাই যেভাবে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠেন, বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক বুদ্ধিজীবীর মধ্যেই আমি সেই বিদ্রোহীভাব প্রত্যক্ষ করেছি। গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন বটে কিন্তু তার অন্ধ-সমর্থক ছিলেন না। ‘আপদ-বিপদ-মসিবত’ বলতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের যে তিনজন বরেণ্য সাংবাদিককে বোঝাতেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সেই তিনজনের একজন ছিলেন।

কথা ছিল গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখবেন। কিন্তু জীবনী লেখার আগেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখতে না পারার বেদনা মৃত্যু পর্যন্ত গাফ্‌ফার ভাইকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের একুশ বছর পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আমি বঙ্গবন্ধুর জীবনী লেখায় হাত দেই। ১৯৯৮ সালে লন্ডনে গিয়ে গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি এবং আমার পরিকল্পনার কথা তাকে খুলে বলি।

আমার কথা শুনে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। আমি যতদিন সেবার লন্ডনে ছিলাম বেশিরভাগ সময়ই গাফ্‌ফার ভাইয়ের সান্নিধ্যে কাটাই। তৎকালীন অ্যাম্বাসেডর এ এইচ মাহমুদ আলীর বাসায় গাফ্‌ফার ভাই প্রতিদিন আসতেন এবং আমরা অনেক রাত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতাম। রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর গাফ্‌ফার ভাইয়ের বিদায়ের সময় অ্যাম্বাসেডর মাহমুদ আলী নিজে গাড়ি চালিয়ে গাফ্‌ফার ভাইকে টিউব স্টেশনে পৌঁছে দিতেন। গাফ্‌ফার ভাই টিউব রেলে চড়ে বাসায় চলে যেতেন।

গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এত কথা জানেন, এত ইতিহাস তার স্মৃতিতে জমে ছিল যা তার কাছে না শুনলে বোঝা যেত না। কিছু কথা থাকে সব সময় সেসব কথা লেখা যায় না, পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে হয় চুপ থাকতে হয়, নয়তো ভুলে যেতে হয়- গাফ্‌ফার ভাই এমন একজন অকুতোভয় সাহসী সাংবাদিক যিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কখনোই কুণ্ঠিত হননি।

অত্যন্ত খোলা মনে তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন, কখনও কখনও সমালোচনাও করেছেন, বঙ্গবন্ধুর উদারতা ও আবেগী মনোভাবের জন্য। গাফ্‌ফার ভাই অনেক আশাবাদী মানুষ ছিলেন, তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে নেতিবাচক বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনগ্রন্থ লেখার সময়ই টের পেয়েছি- লেখালেখি কিংবা পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ করার সময় তিনি কতটা মনোযোগী হয়ে সব কিছু খেয়াল করতেন।

আমার সম্পাদনায় বঙ্গবন্ধুর জীবনীগ্রন্থ দুই খণ্ডে প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি (২০০৮ সালে)। বইটি দেখে গাফ্‌ফার ভাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং আমাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দেন।

গাফ্‌ফার ভাই বাংলা ভাষার পাঠকদের জন্য প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখতেন। তার লেখার মাধ্যম বাংলা হলেও, ইংরেজিকে তিনি এড়িয়ে যাননি। ইংরেজিতেও তিনি নিয়মিত কলাম লিখতেন পত্র-পত্রিকায়। একদিন আমাদের ২৩ চামেলীবাগের বাসায় কথায় কথায় তার অকালপ্রয়াত স্ত্রীর কথা মনে করে তিনি আনমনা হয়ে যান। সে সময় আমাকে বলেন, ‘জানেন মোনায়েম ভাই, আপনার ভাবি হুইল চেয়ারে বসেই আমার জন্য লেখার কাগজ-কলম টেবিলে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখত।

একদিন সকালে আমি কী লিখব এটা ভেবে পায়চারি করছিলাম আর মাথা চুলকাচ্ছিলাম, এমন সময় আপনার ভাবি বললেন, কী ব্যাপার তুমি এমন করছ কেন? আমি বললাম, কী লিখব বিষয় খুঁজে পাচ্ছি না, তখন আপনার ভাবি বলল, ‘কেন মোনায়েম ভাইকে ফোন দাও, তাহলেই তো তুমি লেখার বিষয় পেয়ে যাবে।’ এ কথা বলছিলেন আর বার বার চোখ মুছছিলেন। প্রতিদিন ভোরেই গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হতো। ১৯ তারিখে মৃত্যুর আগেও তার সঙ্গে আমার প্রায় এক ঘণ্টা কথা হয়। সে বিষয়ে কিছু বলার আগে গাফ্‌ফার ভাইয়ের আশিতম জন্মদিন নিয়ে দুই একটি কথা লিখতে চাই।

২০১৫ সালে গাফ্‌ফার ভাই আশি বছরে পদার্পণ করেন। ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদ হলে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান উদ্‌যাপিত হয়। তখন গাফ্‌ফার ভাই কিছুটা আর্থিক সমস্যায় ছিলেন। এ কথা জানতে পেরে আমি গাফ্‌ফার ভাইকে কিছুটা আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। আমার ভাবনায় ছিল- হয় ২১ লাখ, না-হয় ৫২ লাখ টাকা তাকে উপহার দেব। যে মানুষ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে কালজয়ী গান রচনা করে বাংলা ভাষা-আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন তার জন্য এটুকু আমরা করতেই পারি।

সে সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত ভাই। তাকে টেলিফোন করলে তিনি আমার কথা শুনে আমাকে ধন্যবাদ দেন ও কিছুটা আশ্বস্ত করেন। পরে ব্যাংকারস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি নূরুল ফজল বুলবুলকে বিষয়টি অবগত করলে তারাও এগিয়ে আসে। নূরুল ফজল বুলবুল সেবার ২১ লাখ টাকার একটি চেক আমার হাতে দেন, আমি তা গাফ্‌ফার ভাইকে হস্তান্তর করি। যতদূর মনে পড়ে আমার টার্গেট অনুযায়ী প্রায় ৫২ লাখ টাকার মতোই সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম। এত টাকা এক সঙ্গে দেখে গাফ্‌ফার ভাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন। শিশু-সুলভ সরলতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘জানেন মোনায়েম ভাই, এক সাথে এত টাকা আমি কোনোদিন গুণি নাই। আপনি আমার জন্য যা করলেন তা চিরদিন মনে থাকবে।’

১৯৯৬ সালে আমাদের ২৩ চামেলীবাগের বাসায় আমি ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শামস কিবরিয়া মিলে গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ’ প্রতিষ্ঠা করি। বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন গাফ্‌ফার ভাইয়ের খুব প্রিয় জায়গা ছিল। তিনি যখনই বাংলাদেশে এসেছেন তখনই বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনে ছুটে এসেছেন। শেষের কয়েক বছর ঢাকা এলে তিনি ফাউন্ডেশনের অফিস কক্ষেই বসবাস করতেন।

ঢাকার যেকোনো পাঁচ তারকা হোটেলে থাকা তার জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তার দুই কন্যা- চিনু ও বিনু আমাদের ফাউন্ডেশন ছাড়া আর কোথাও উঠতে চাইত না। গাফ্‌ফার ভাইও আমার কাছে থেকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ২০১৯ সালে শেষবারের মতো তিনি বাংলাদেশে ছোট মেয়ে বিনিতাকে (বিনু) নিয়ে এসেছিলেন। সে সময়ও তিনি আমাদের ফাউন্ডেশনেই ছিলেন। গাফ্‌ফার ভাই এলে বাংলাদেশের সব বরেণ্য ব্যক্তি এসে ভিড় করতেন আমাদের ২৩ চামেলীবাগে। কবি-সাহিত্যিক, নায়ক-গায়ক, নেতা-মন্ত্রী-আমলা সবাই আসতেন গাফ্‌ফার ভাইকে একনজর দেখতে। এদেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন গাফ্‌ফার ভাই।

আমার জীবনে আমি কম সাংবাদিক-কলাম লেখক দেখিনি, কিন্তু গাফ্‌ফার ভাইয়ের মতো এত জনপ্রিয় কলাম লেখক বোধহয় বাংলাদেশে বিরল। একজন অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে গাফ্‌ফার ভাই চিরকাল মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হবেন।

১৮ মে বিকাল ৪টার দিকে তার সঙ্গে আমার প্রায় এক ঘণ্টা টেলিফোনে কথা হয়। তিনিই ফোন করেছিলেন। অনেক কথার ফাঁকে তিনি বললেন, ‘বহুবার আপনি আমাকে আমার আত্মজীবনী লিখতে অনুরোধ করেছেন, এবার ভাবছি হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় গেলে আর কলাম লিখব না, আপনার কথামতো শুধু আত্মজীবনী লিখব।’ আমি তার কথায় খুশি হয়ে বললাম, ‘আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যান এই কামনাই করি। আশা করি এবার জাতি আপনার আত্মজীবনীর মধ্য দিয়ে অনেক অলিখিত ইতিহাসের হদিস খুঁজে পাবে।’ ১৯ মে দুপুর আড়াইটার দিকে খবর শুনতে পাই গাফ্‌ফার ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। তখন আমি, সৈয়দ জাহিদ হাসান (কবি ও কথাশিল্পী) ও লায়লা খানম শিল্পী একসঙ্গে খেতে বসছিলাম। খবর শুনে ভাত না খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে পড়ি।

এরপর দেশ-বিদেশ থেকে একের পর এক ফোন আসতে শুরু করে। বাংলা টিভি, এটিএন নিউজ ক্যামেরাম্যান পাঠিয়ে ইন্টারভিউ নিয়ে যায়। যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও আরও কয়েকটি কাগজ থেকে ফোন আসতে থাকে লেখার জন্য। সত্যি বলতে কি গাফ্‌ফার ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে আমি মোটেই স্বাভাবিক ছিলাম না। যার নব্বইতম জন্মদিন পালনের জন্য আমি মনে মনে কত পরিকল্পনা করে রেখেছি, হঠাৎ তার মৃত্যুসংবাদ শুনে আমি যেন হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার এত এত স্মৃতি জমে আছে যে, যেসব বলতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর বরেণ্য সাংবাদিক, কলাম লেখক, কবি ও গীতিকার আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বাংলাদেশের একজন অতুলনীয় অভিভাবক ছিলেন। বাংলাদেশের যেকোনো সংকটে তিনি নির্ভীকভাবে এগিয়ে এসেছেন। তার মহাপ্রয়াণে বাংলাদেশ একজন প্রকৃত অভিভাবক হারালেন, এই ক্ষতি অপূরণীয়।

এই শোককে হৃদয়ে ধারণ করা অত্যন্ত বেদনার। পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্ম হয় অন্ধকারে আলো ছড়ানোর জন্য। গাফ্‌ফার ভাইও দুর্ভেদ্য অন্ধকারে আলো ছড়ানোর কঠিন তপস্যায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আলোর মশাল হাতে নিয়ে অন্ধকার তাড়াতে তাড়াতে দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে গেলেন মধ্যরাতের সূর্যতাপস আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। তার অনন্তযাত্রা শান্তিময় হোক।

লেখক: রাজনীতিবিদ, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক। মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ।

মন্তব্য

মতামত
The result of family system is todays Sri Lanka

পরিবারতন্ত্রের ফল আজকের শ্রীলঙ্কা

পরিবারতন্ত্রের ফল আজকের শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিণতি শুধুই কি অর্থব্যবস্থাকে সামলাতে না পারার ফল? না, এ শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়। শ্রীলঙ্কার রাজাপাক্ষে পরিবার— যে পরিবারের এক ভাই দেশের প্রেসিডেন্ট, অন্য ভাই প্রধানমন্ত্রী, আরও দু’ভাই এবং ছেলেমেয়েদের অধীনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তর, সব মিলিয়ে দেশের বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে যে পরিবারটি— যে ভঙ্গিতে দেশ চালিয়েছে, এটা তার প্রতিফলন। অন্য কারো মতের তোয়াক্কা না করে, কেবল নিজেদের স্বার্থের কথাটুকু ভেবে।

অপরিণামদর্শী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতা ও পরিবারতন্ত্রকে প্রাধান্য দেয়া, দেশের মধ্যে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে দমন করতে না পারা, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্যাঁচ, বৈশ্বিক মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইত্যাদি নানা কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা এখন চরম সংকটে। সেখানে এখন হিংসার আগুনে রাজনীতিবিদদের বাড়িঘর জ্বলছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশশাসন করেছেন, তারা এখন বিক্ষুব্ধ জনতার হিংস্রতার শিকার হচ্ছেন। জান নিয়ে পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।

সেনাবাহিনী ও পুলিশ অলিখিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুন তাতে কমছে না। দেশজুড়ে বিক্ষোভ আর হাহাকার চলছে। দিনের অর্ধেক সময় লোডশেডিং, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, পেট্রল পাম্পে তেল নেই, রান্নার গ্যাস নেই। তুমুল মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের পরিমাণ বিপুল— তা শোধ দেয়ার সামর্থ্য নেই। দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার তলানিতে ঠেকেছে।

ব্যাপক ক্ষোভের মুখে ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন মাহিন্দা রাজাপাক্ষে। এরপর মাহিন্দার সমর্থকেরা অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে পথে নামেন। শুরু হয় সংঘর্ষ। মানুষ গর্জে ওঠে। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে মাহিন্দা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।

বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন লাগিয়ে দেয় রাজাপাক্ষের পূর্বপুরুষের বাড়ি এবং দেশের আরও বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদের বাড়িতে। দেশজুড়ে কারফিউ জারি করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহে। যদিও প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা এখনও অনড়।

কয়েক বছর আগেও যে দেশের মনব-উন্নয়ন সূচকের উদাহরণ দেওয়া হতো, তার এমন অবস্থা কী করে হলো? খানিকটা ভাগ্যের মার, অস্বীকার করার উপায় নেই। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির একটা বড় দিক হলো পর্যটন শিল্প। কোভিডের ধাক্কায় তার অবস্থা ভয়াবহ।

অপরদিকে রয়েছে নীতিনির্ধারকদের অপরিণামদর্শিতা। ঋণ করে দেশ চালানোর অভ্যাস করে ফেলেছিলেন সে দেশের শাসকরা। তা-ও চড়া সুদে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণ। এদিকে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে মন দেয়নি সরকার, অর্থব্যবস্থার রাশ ছেড়ে রেখেছিল শাসকদের ঘনিষ্ঠ কিছু সাঙ্গাতের হাতে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিপুল ধার, তার উপর নিরাপত্তার অভাব— সব মিলিয়ে দেশের ক্রেডিট রেটিং কমেছে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাণিজ্যিক ধার পাওয়ার পথও বন্ধ হয়েছে ক্রমে। এদিকে, নতুন নোট ছাপিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টায় আরও দ্রুত গতিতে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি।

২০১৯-এর শেষপর্বে শ্রীলঙ্কার বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯৪ শতাংশ। ২০২১-এর শেষপর্বে তা ১১৯ শতাংশে পৌঁছায়। ফলে বিদেশি ঋণ পাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জানুয়ারির গোড়াতেই সে দেশে মূল্যবৃদ্ধি ২৫ শতাংশ ছুঁয়ে রেকর্ড গড়ে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষপর্বে তলানিতে ঠেকেছিল বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার। প্রাক অতিমারি পরিস্থিতির তুলনায় বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় কমে যায় প্রায় ৭৫ শতাংশ।

চলতি বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক ঋণ এবং সুদ মেটাতে অন্তত ৬৯০ কোটি ডলার (প্রায় ৫২,৪০০ কোটি টাকা) ব্যয় করতে হবে শ্রীলঙ্কাকে। অথচ সরকারি তথ্য বলছে, বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় মাত্র ২৩১ কোটি ডলারে (প্রায় ১৭,৫৪০ কোটি টাকা) এসে ঠেকেছে। বিদেশি মুদ্রার ভাঁড়ারে টান পড়ার প্রভাব পড়ে আমদানিতে। বিশেষত, জ্বালানি তেল কেনা কমে যায় অনেকটাই।

আর তার পরিণতিতে আকাশ ছোঁয় মূল্যবৃদ্ধি। শ্রীলঙ্কায় এখন এক কাপ চায়ের দাম ১০০ টাকা! এক কিলোগ্রাম চাল ৫০০ টাকা। চিনির কিলোগ্রাম ৪০০ ছুঁতে চলেছে। এমনকি, শিশুখাদ্যের দামও সাধারণের নাগালের বাইরে। অপ্রতুল জীবনদায়ী ওষুধ। কাগজের অভাবে বন্ধ স্কুল-কলেজের পরীক্ষা।

গত কয়েক বছরে টাকার অভাব সামাল দিতে বিপজ্জনক সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের সরকার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিদেশি মুদ্রায় রাসায়নিক সার কিনতে হয় এবং তার উপর ক্রেতাদের ভর্তুকিও দিতে হয়, তাই সে খরচ বাঁচাতে রাতারাতি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল রাসায়নিক সার— গোটা দেশে অর্গানিক চাষ চালু করা হয়।

প্রেসিডেন্ট রাজাপাক্ষে বলেছিলেন— অচ্ছে দিন, থুড়ি, কৃষিতে উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের সমৃদ্ধি এল বলে। আসেনি। ধান উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ২০ শতাংশ, এখন বাংলাদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হচ্ছে। অর্থনীতির উন্নতি হবে বলে রাতারাতি করের হার কমিয়ে দিয়েছিল সরকার। শিল্প উৎপাদন বাড়েনি, কিন্তু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে বিপুল পরিমাণে। ফলে, রাজকোষ ঘাটতির হার জিডিপি-র প্রায় ১৫ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিণতি শুধুই কি অর্থব্যবস্থাকে সামলাতে না পারার ফল? না, এ শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়। শ্রীলঙ্কার রাজাপাক্ষে পরিবার— যে পরিবারের এক ভাই দেশের প্রেসিডেন্ট, অন্য ভাই প্রধানমন্ত্রী, আরও দু’ভাই এবং ছেলেমেয়েদের অধীনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তর, সব মিলিয়ে দেশের বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে যে পরিবারটি— যে ভঙ্গিতে দেশ চালিয়েছে, এটা তার প্রতিফলন। অন্য কারো মতের তোয়াক্কা না করে, কেবল নিজেদের স্বার্থের কথাটুকু ভেবে।

রাজাপাক্ষে পরিবারের দুর্নীতি, দেশের সব ক্ষমতা দখলের চেষ্টা— সব কিছু নিতান্ত প্রকাশ্যে থাকার পরও পরিবার চার বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পরে ২০১৯ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়েই প্রেসিডেন্ট হন গোতাবায়া রাজাপাক্ষে; দুদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহেকে ছেঁটে সেই পদে বসেন মহিন্দ রাজাপাক্ষে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর নিঃশর্ত সমর্থন ছিল তাদের দিকে— কারণ, মহিন্দ রাজাপাক্ষে দ্ব্যর্থহীনভাবে এই সিংহলি সংখ্যাগরিষ্ঠতানির্ভর উগ্র জাতীয়তাবাদের পক্ষে।

প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকার সময় এলটিটিই-র কোমর ভেঙেছিলেন মহিন্দ, সঙ্গে মারা পড়েছিলেন অন্তত পঁচাত্তর হাজার তামিল। তিনি জানেন, সিংহলি জাতীয়তাবাদের পালের হাওয়াই তাকে টেনে নিয়ে যাবে। উগ্র জাতীয়তাবাদের সব সময়েই কোনো না কোনো শত্রুপক্ষের প্রয়োজন হয়। দুর্বল হয়ে যাওয়া তামিল জনগোষ্ঠীকে দিয়ে সেই কাজ আর চলছে না বলে রাজাপাক্ষেরা নতুন শত্রু হিসেবে বেছে নিয়েছেন মুসলমানদের। বড় মাপের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি ঠিকই, কিন্তু দ্বীপরাষ্ট্রের মুসলমানরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়েছেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যবাদ দিয়ে অর্থব্যবস্থার স্বাস্থ্যের উন্নতি করা কঠিন। দীর্ঘ সিংহলি-তামিল গৃহযুদ্ধে শ্রীলঙ্কায় ঋণের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছিল। সেই গৃহযুদ্ধ মিটেছে, কিন্তু জাতিগত অবিশ্বাসের আবহে অর্থব্যবস্থা গুটিয়েই থেকেছে— শ্রীলঙ্কায় লগ্নি করতে ভয় পেয়েছেন অনেকেই।

পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গেও ক্রমশ সম্পর্ক ছিন্ন করেছে শ্রীলঙ্কা— দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর জন্য আন্তর্জাতিক চাপকে রাজাপাক্ষেরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির অন্যায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা বলে দেখিয়েছেন। ফলে, লাভজনক শর্তে বিদেশি বিনিয়োগ বা সহজতর শর্তে ঋণ, কোনোটাই পায়নি শ্রীলঙ্কা। এই ফাঁক পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে চীন। শ্রীলঙ্কাজুড়ে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে লগ্নি করেছে চীন— সে লগ্নি আসলে চড়া সুদে ঋণ।

যে দেশ অন্য কোথাও থেকে ঋণ পায় না, তাকে চড়া হারে ঋণ দেয়া চীনের ইদানীংকার নীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর নাম দিয়েছে ডেট ট্র্যাপ ডিপ্লোম্যাসি— ঋণের দায়ে জড়িয়ে ফেলার কূটনীতি। শ্রীলঙ্কায় চীনের লগ্নি প্রচুর, রাজাপাক্ষে পরিবার ও সাঙ্গাতদের তাতে লাভ প্রচুরতর, কিন্তু দেশের কতখানি উপকার হয়েছে, সে হিসাব নেই।

সিংহলি-বৌদ্ধ আধিপত্য বজায় থাকায় শ্রীলঙ্কায় রাজাপাক্ষে পরিবারের ওপর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খুশিই ছিল। ‘আন্তর্জাতিক চাপ’-এর কাছে দেশের প্রেসিডেন্টের মাথা না নোয়ানোর সাহসেও অনেকেই গর্বিত ছিলেন। এপ্রিলের গোড়ায় যে মন্ত্রীরা দল বেঁধে পদত্যাগ করেছেন অপশাসনের অভিযোগ তুলে, তারাও দীর্ঘদিন ধরে বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছেন সব কিছুই। অর্থব্যবস্থার যখন ক্রমেই ভরাডুবি হচ্ছে, আইএমএফ তখন বারে বারে সাহায্য করতে চেয়েছিল— গোতাবায়া রাজি হননি।

তার বিশ্বাস ছিল, ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার ‘স্ট্র্যাটেজিক’ অবস্থানের কারণেই গোটা দুনিয়া বিনাশর্তে আর্থিক সাহায্যের ঝুলি নিয়ে ছুটে আসবে, চীনের আরও প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে। সেই বিশ্বাস ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে— এমনকি চীনও খুব আগ্রহ দেখায়নি শ্রীলঙ্কার মাথায় ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা লাঘব করার জন্য। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, গোতাবায়া যখন এমন বিপজ্জনক পথে হাঁটছিলেন, চার পাশের কেউ বাধাও দেননি তাকে।

শ্রীলঙ্কার উদাহরণ থেকে বাংলাদেশ বা এদেশের হর্তাকর্তা-বিধাতারা কিছু শিখবে, সেই আশা ক্ষীণ। তবে, একটা মস্ত বার্তা দিয়ে গেল শ্রীলঙ্কা— সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করলে, ‘মাফিয়াতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করলে, চারপাশে শুধু ‘জি হুজুর’-দের জায়গা দিলে শেষপর্যন্ত তার ফল হয় মারাত্মক।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ
ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম টেস্ট
ঢাকা টেস্টের দলে নেই শরীফুল
তাইজুলের ঘূর্ণিতে চাপে লঙ্কানরা
লঙ্কান শিবিরে তাইজুলের জোড়া আঘাত

মন্তব্য

মতামত
Raktveja May 19 Self sacrifice for the Bengali language

রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান

রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজপথজুড়ে নারী-পুরুষ; শিশুর পদভার বেড়ে ওঠে। বিপন্ন বাংলা ভাষা, বিপন্ন মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ সবার হৃদয়ে। উত্তাল জনসমুদ্র। বাঁধভাঙা মানুষ। সবার কণ্ঠে স্লোগান, ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা’। গ্রেপ্তার হয় অনেকে। রেললাইনজুড়ে মানুষের ঢল। প্রতিরোধে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং বেপরোয়া লঠিচার্জ করে। কিন্তু আহতরা তবু স্থান ত্যাগ করেনি। শহরজুড়ে শুধু স্লোগান। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে নিরস্ত্র বঙ্গভাষীদের ওপর চালানো হলো গুলি। রেলওয়ে চত্বরে লুটিয়ে পড়ে ১১টি তাজা প্রাণ, যাদের জন্ম একদার সিলেটে।

১৯৬১ সালের ১৯ মে রক্তভেজা একটি দিন বাংলা ভাষাভাষীর জন্য। এর ৯ বছর আগে এই বাংলা ভাষার জন্য রক্ত ঢেলে দিয়েছিল ঢাকার রাজপথে বাংলার কিছু দামাল ছেলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিল ছাত্র-যুবারা। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, বাংলাকে শুধু রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিতই করেনি, বাঙালির স্বাধীন সার্বভৌম দেশও অর্জন করেছে। ২০০০ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বিশ্বদরবারে বাংলাভাষার মর্যাদাকে উচ্চাসন দিয়েছেন। জাতিসংঘে পিতার মতো তিনিও বাংলায় ভাষণ দিচ্ছেন। বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম স্থানে অবস্থিত বাংলা ভাষা। এই ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

পূর্ব বাংলার মানুষকে অবদমিত করার জন্য পাকিস্তানি শাসকরা উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাঙালি তা মানেনি। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বিশ শতকে বাঙালি অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। আর একষট্টি বছর আগে আসামের বরাক নদীতীরে বরাক উপত্যকায় বাংলাভাষী মানুষের রক্ত ঝরেছিল মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের দাবিতে। যদিও আসাম রাজ্যে শুধু বাংলাভাষী নয়, অন্যান্য জনগোষ্ঠীও রয়েছে। খাসিয়া, বড়ো, গারো, মিছিং, মণিপুরী, আও, মিজো, কার্বি, রাভা, ককবরক, চাকমা, মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া, আদি (অরুণাচল), ডিমাসা- এসব ভাষাভাষী মানুষও রয়েছে। এরা সবাই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। মূলত বাংলাভাষী সংখ্যাগুরু হলেও, অসমীয়া ভাষাভাষীরা তাদের উপরে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, এখনও সে প্রচেষ্টা অব্যাহত।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের আসাম বা আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের আরেক রক্তাক্ত নজির। অবশ্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে এই আন্দোলনে পার্থক্য রয়েছে। আসাম রাজ্যে অসমীয়ারা একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার একপর্যায়ে পুরো রাজ্যে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলে প্রবল আন্দোলন।

বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মবলিদানের দ্বিতীয় এ নজির স্থাপিত হয়েছিল ৬১ বছর আগে। বরাক উপত্যকার মানুষজন মূলত বাংলাভাষী। এক সময় এ এলাকা ছিল সিলেটের অংশ। দেশভাগ তাদের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটায়। মুসলিম সংখ্যাধিক্য এবং বাংলাভাষী অঞ্চল হলেও ব্রিটিশের কলমের খোঁচায় সিলেটের ৪টি থানা আসাম তথা ভারতভুক্ত হয়। আর এ অঞ্চলের মানুষকে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলা শুধু নয়, শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ বঞ্চিত করে। বরাক অঞ্চলে ভাষার জন্য আন্দোলনের বীজ আসাম রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেই নিহিত ছিল। এখনও তা লুপ্ত হয়নি।

শ্রীহট্ট তথা সিলেট ছিল অবিভক্ত বাংলার অন্তর্ভুক্ত আয়তনে বড় জেলা। ১৮৪৭ সালে আসাম প্রদেশ গঠন করে ব্রিটিশ শাসকরা। সিলেট তখন বঙ্গের সঙ্গে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে সিলেট পূর্ববঙ্গ-আসাম প্রদেশের মধ্যে পড়ে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সিলেট পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। শুধু একটি অংশ আসামের সঙ্গে জুড়ে দেয় ব্রিটিশ। যদিও ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ওই অংশের বাসিন্দারা পূর্ববঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হবার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। করিমগঞ্জ ‘হাইলাকান্দি, শিলচর’ কাছাড়-বাংলাভাষী ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো সিলেটের অংশ হলেও তা হয়ে যায় আসামের অংশ। এমনকি আরও কিছু বাংলাভাষী অঞ্চল। তদুপরি এসব অঞ্চল আসামভুক্ত করা হয়। দেশভাগের মর্মযাতনা তাদের এখনও উপলব্ধি করতে হয় যখন ‘বঙ্গাল খেদাও’ অভিযানে নামে অসমীয়ারা।

রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গকালে সিলেটকে বঙ্গদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার বেদনা প্রকাশ করেছিলেন এভাবে- “মমতাবিহীন কালস্রোতে/বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে/ নির্বাসিতা তুমি/সুন্দরী শ্রীভূমি।” দেশভাগের শিকার হয়ে শ্রীহট্টের যে বাঙালিরা অসামে যান, ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের আগে, অবিভক্ত ভারতবর্ষে, তাদেরও জন্মভূমি ছিল অসাম। কারণ তা তখন অসাম প্রদেশভুক্ত অঞ্চল। কিন্তু তাদেরকে পূর্ববঙ্গীয় বলে ঘোষণা দিয়ে অসমীয়রা হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ ভাষার অধিকারও কেড়ে নিয়েছিল। ক্ষমতাসীন অসাম রাজ্য সরকার ঘোষণাই দিয়েছিল, আসাম হবে কেবল অসমীয়াদের জন্যই। তখন থেকেই অসমীয়া ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হলো বাংলাভাষীদের উপর। দেশভাগ সিলেট ও অসমের মানচিত্রকে পাল্টে দিয়েছিল। বাঙালি হিন্দুরা দেশত্যাগ করে আসামের বিভিন্ন জেলায় বসবাস শুরু করে। অনুরূপ অসাম থেকেও প্রচুর মুসলমান সিলেটে অভিবাসী হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৫ নভেম্বর আসামের বিধানসভার অধিবেশনে রাজ্যপাল ঘোষণা করেন যে, আসাম এখন থেকে অসমীয়রাই শাসন করবে। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিলীন হতে হবে। সরকার রাজ্যে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারে প্রশ্রয় দেবে না। সরকারি এই ঘোষণায় বাংলাভাষীসহ অন্যান্য ভাষাভাষীরাও ফুঁসে ওঠে। স্থায়ী ও অভিবাসী বাংলাভাষীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ঘৃণা ও উপেক্ষার শিকার হতে থাকে বাংলাভাষীরা। তাদেরকে চিহ্নিত করা হয় ‘অনুপ্রবেশকারী বিদেশী’, ‘বহিরাগত’, ‘সন্দেহভাজন শরণার্থী ’ হিসেবে। অসমে বাংলা ভাষাভাষী ৪৩ লাখ মানুষ ছিল যেখানে, সেখানে ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে দেখানো হয় ১৭ লাখ। বিপরীতে ২০ লাখ অসমিয়াভাষী বাড়িয়ে করা হয় ৪৯ লাখ। এই অবিশ্বাস্য সংখ্যাবৃদ্ধিকে সে সময়ে অভিহিত করা হয়েছিল ‘জীবতাত্ত্বিক বিস্ময়’ (বায়োলজিক্যাল মিরাকল) হিসেবে। ষড়যন্ত্রের শিকার হলো বাংলাভাষীরা। সংখ্যাগুরু থেকে পরিণত হলো সংখ্যালঘুতে। এই বিভেদ জাতিগত দাঙ্গায় রূপ নেয়। ইতিহাসের পাতায় তাই দেখা যায়, ১৯৪৮ সালের মে মাসে গুয়াহাটিতে বাঙালি-অসমীয়া দাঙ্গা, ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুট ও অগ্নিসংযোগ এবং হতাহত অর্ধশত। এই দাঙ্গার প্রসারে আসামজুড়ে ‘বঙ্গাল খেদাও’ অভিযান শুরু হয়। ১৯৫০ সালে এই অভিযান গণহত্যায় পরিণত হয়।

বাংলাভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলে নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চলে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোয়ালপাড়া জেলার বাংলাভাষীরা। আতঙ্কিত বাংলাভাষীরা আত্মরক্ষার্থে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় পালিয়ে যায়। পরবর্তীকালে এদের শর্তসাপেক্ষে আসামে পুনর্বাসন করা হয় যে, তাদের মাতৃভাষা হবে অসমীয়া। বাংলা উচ্চারণ করা যাবে না। তারপরও বাংলাভাষীরা থেমে থাকেনি। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানায় মাতৃভাষার অধিকারের জন্য। এতে ক্ষুব্ধ অসীময়ারা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের সরকারি ভাষা করার জন্য সরকারি মদদে নারকীয় কাণ্ড ঘটাতে থাকে। শুরু হয় বাংলাভাষী নিধন।

১৯৬০ সালের ২১ ও ২২ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি একতরফাভাবে প্রস্তাব নেয় যে, অসমীয়া ভাষাই হবে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা। বাংলাভাষী অঞ্চল কাছাড় জেলার নির্বাচিত দশ সদস্য এর বিরোধিতা করে। প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ২ ও ৩ জুলাই কাছাড় জেলার শিলচর গান্ধীবাগে ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন’ করা হয়। প্রায় ২৫ হাজার বঙ্গভাষীর সমাবেশে বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম রাজ্যভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার দাবি তোলা হয়। এই দাবির জবাব দেয়া হয় তিন জুলাই।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা । এতে বহু বঙ্গভাষী নিহত হয়। দশ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়। বাস্তুচ্যুত হয় পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ। বঙ্গভাষীর আহবানে হরতাল পালনও হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর শান্তি প্রক্রিয়াও ব্যর্থ হয়। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের ওপর বলিষ্ঠ চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি। কারণ রাজ্য সরকার তো কংগ্রেসেরই। বাংলাভাষীদের ওপর এই নারকীয় হামলায় তাদের রক্ষায় তেমন কেউ এগিয়ে আসেননি। সব সচেতন ও কল্যাণকামী এবং মানবাধিকার সংগঠনের আহবান কোনো কাজে দেয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর রাত দশটায় আসাম বিধানসভায় অহমিয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে অনুমোদন করা হয়। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বঙ্গভাষীরা। বাংলাভাষী জেলা কাছাড়ে মানুষ প্রতিবাদে রাজপথে নামে। করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, শিলচরে গণজাগরণ তৈরি হয়। আসামের সংখ্যালঘু অন্য ভাষাভাষীরাও এই আন্দোলনে শরিক হয়।

১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। এসময় সিলেটের অঙ্গ করিমগঞ্জে বৃহৎ জনসম্মেলনে গণসংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। অজস্র কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল সেদিন, ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ।’ ১৪ এপ্রিল তথা পয়লা বৈশাখ সত্যাগ্রহী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘সংকল্প দিবস’ পালন করা হয়। অযুতকণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জান দেব তবু জবান দেব না, আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা।’ আন্দোলনে আতঙ্কিত আসাম সরকার। ১৯৬১ সালের ১৯ মে সারা আসামে ‘বন্ধ’ ও সত্যাগ্রহের কর্মসূচি দেয় আন্দোলনকারীরা। শিলচরসহ অন্যত্র সেনা টহল চালু ও ১৪৪ ধারা জারি হয়। কিন্তু এসব উপেক্ষা করে বঙ্গভাষীসহ অন্য ভাষাভাষীরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং বরাক উপত্যকায় ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে তখন।

১৯৬১ সালের ১৯ মে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে খুব ভোরে সত্যাগ্রহী, স্বেচ্ছাসেবীরা শিলচর রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্টেশন, অফিস-আদালতের সামনে সমবেত হতে থাকে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজপথজুড়ে নারী-পুরুষ; শিশুর পদভার বেড়ে ওঠে। বিপন্ন বাংলা ভাষা, বিপন্ন মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ সবার হৃদয়ে।

উত্তাল জনসমুদ্র। বাঁধভাঙা মানুষ। সবার কণ্ঠে স্লোগান, ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা’। গ্রেপ্তার হয় অনেকে। রেললাইনজুড়ে মানুষের ঢল। প্রতিরোধে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং বেপরোয়া লঠিচার্জ করে। কিন্তু আহতরা তবু স্থান ত্যাগ করেনি। শহরজুড়ে শুধু স্লোগান। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে নিরস্ত্র বঙ্গভাষীদের ওপর চালানো হলো গুলি। রেলওয়ে চত্বরে লুটিয়ে পড়ে ১১টি তাজা প্রাণ, যাদের জন্ম একদার সিলেটে। একাদশ শহীদের বুকের তাজা রক্তে শিলচর রেল স্টেশন রঞ্জিত হয়ে ওঠে।

বরাক উপত্যকার মাটি বঙ্গভাষীর রক্তের দাগে ফুটিয়েছে কৃষ্ণচূড়া। শহীদ কমলা ভট্টাচার্য, বয়স তার ষোলো, মিছিলের মুখ ছিল, তাকেও হতে হলো ভাষার বলি। আত্মদান করেছিল সেদিন হীতেশ বিশ্বাস, শচীন্দ্র পাল, সুকোমল পুরকায়স্থ, কুমুদ দেব, সত্যেন্দ্র দেব, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডিচরণ সূত্রধর, ধীরেন্দ্র সূত্রধর, তরণী দেবনাথ ও সুনীল সরকার। এই আত্মদানেরও পাঁচ বছর পর ১৯৬৬ সালের ২২ মার্চ বরাক অঞ্চলে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

‘বরাক উপত্যকার ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থের ভূমিকায় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপক সুবীর কর উল্লেখ করেছেন-

“আমরা সবাই মিলেছিলাম মায়ের ডাকে। সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছে বাহান্নের ঢাকার ভাষা সংগ্রাম। রফিক, সালাম, বরকতেরা ছিলেন আদর্শ। পদ্মা মেঘনা যমুনার মধ্যে কুশিয়ারা, ধলেশ্বরী, সুরমা খুঁজে নিয়েছিল তার ঠিকানা। বুড়িগঙ্গা আর বরাক হয়ে উঠেছিল চেতনার সংগ্রাম”।

বরাক ভাষা আন্দোলনের উপর শিলচর থেকে ইমাদউদ্দিন বুলবুল রচিত ‘দেশী ভাষা বিদ্যা যার’ ও ‘ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার’ নামে দুটি গ্রন্থ রয়েছে যাতে পটভূমি বিধৃত রয়েছে। বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মবলিদানের দ্বিতীয় উদাহরণ শিলচর তথা বরাক উপত্যকা। যেখানে ভাষা সংগ্রাম জাতিসত্তার স্বতন্ত্র মর্যাদাকে সংরক্ষিত করেছে।

ভারতের আসাম রাজ্যে বঙ্গভাষীদের হাল এখনও করুণ। প্রায়শই বঙ্গভাষীদের ওপর নিপীড়ন নামে। কিন্তু অসমীয়দের এই আচরণ অবশ্য সাম্প্রতিক নয়। আরও প্রাচীন। ১৯৩৬ সালে শনিবারের চিঠি সম্পাদক সজনীকান্ত দাশ লিখেছিলেন-

“যে কারণেই হউক আসামের ভাষা ও কালচারকে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেবার জন্য যে সরকারি চেষ্টা আজকাল চলিতেছে, সংবাদপত্র পাঠক মাত্রেই তাহা অবগত রহিয়াছেন। কিন্তু এই চেষ্টা বহুদিন পূর্বে শুরু হইয়াছে।”

১৮৭০ সালে মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত জন মারডক রচিত ‘ক্যাটালগ অব দি ক্রিশ্চিয়ান ভার্ণাকুলার লিটারেচার অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে অহমীয়া ভাষা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-“বাঙ্গলার সঙ্গে অসমীয়া ভাষার সাদৃশ্য এত বেশী যে, স্বতন্ত্র ভাষা হিসাব অসমীয়াদের দাবি অনেকে স্বীকার করেন না। যদিও অনেক সরকারি কর্মচারী অসমীয়া ভাষার স্থলে বাঙ্গলার প্রবর্তনে প্রয়াসী। কিন্তু সরকার স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার প্রশ্রয় দিচ্ছেন”। গৌহাটি প্রবাসী বাঙ্গালী ছাত্র সম্মিলন এর ১৯৩৬ সালের ১৪ অক্টোবর গৌহাটিতে আয়োজিত অষ্টম অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণে সজনীকান্ত দাশ বলেছিলেন- ‘‘কামরূপ-গৌহাটিতে বসে আপনারা আপনাদের সম্মিলনীর নাম ‘প্রবাসী বাঙ্গালী ছাত্র সম্মিলনী’ দিয়েছেন। মনে হইতেছে আপনারা পরাজিত এবং অভিমান ক্ষুব্ধ। অসমে বাঙ্গালীকে প্রবাসী করিবার জন্য রাজনৈতিক প্রচেষ্টা সম্প্রতি শুরু হইয়াছে। কিন্তু ইতিপূর্বে বাঙ্গালীরা প্রবাসী ছিল না। সংখ্যায়, শিক্ষায় জীবনের প্রায় সকল বিভাগেই বাঙ্গালীর প্রাধান্য ছিল এবং সর্বত্র বাঙ্গালীর স্বার্থ অসমের মাটি ও প্রকৃতির সহিত জড়িত ছিল। অসমের শিক্ষাকেন্দ্র ছিল কলিকাতা। চা বাগানগুলি বাদ দিলে আসাম বলিতে কামরূপ, শ্রীহট্ট, শিলচর, শিলংয়ের মত কয়েকটি শহর বুঝাইত এবং সকল স্থলেই ছিল বাঙ্গালীর কর্তৃত্ব্। প্রাগ ঐতিহাসিক যুগ হইতেই কামরূপ বাঙ্গলাদেশের অঙ্গ ছিল।” মহাভারতে যে এ অঞ্চলের বর্ণনা রয়েছে, তা পরবর্তীকালেও গবেষকরা উল্লেখ করেছেন। সজনীকান্ত দাশ বলেছেন,“ভাষার দিক দিয়া আসামী ভাষা বাঙ্গলার একটি উপভাষা বা ‘প্রভিন্সিয়াল ডায়ালেক্ট’ মাত্র। উপভাষাতে কোনো সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। এই কারণেই অহমীয়া ভাষার উল্লেখযোগ্য কোন সাহিত্য নাই। বাঙ্গলা সাহিত্যের উপরই আসামবাসীকে নির্ভর করিতে হইয়াছে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অসমের সুবিখ্যাত হলিরাম ঠেকিয়াল ফুকন ও যজ্ঞরাম ফুকন বাঙ্গলা ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করিতেন। হলিরামের ‘আসাম বুরঞ্জী’ নামক অসমের প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ বাঙ্গলা ভাষাতেই রচিত হয়ে ১৮২৯-৩০ সালে কলকাতার সমাচার চন্দ্রিকা যন্ত্রালয়ে মুদ্রিত হয়।” আসাম বর্ণমালা মূলত বাংলা বর্ণমালা। দু’একটি অক্ষর ব্যতিক্রম রয়েছে।

সুরমা উপত্যকা তথা সিলেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাংলাভাষী অঞ্চলের মানুষ তাদের মাতৃভাষায় কথা বলবে সেটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ সিলেট, আসাম সফর করেছেন। বাংলাভাষী মানুষজন তাদের আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের গানই গেয়েছিলেন। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সেদিন বাংলাভাষার অধিকার রক্ষার দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল যারা, প্রতিবেশী দেশের প্রতিবেশী রাজ্যে, তাদের আত্মদান বৃথা যায়নি। অন্য ভাষাভাষী যেমন বোড়ো, ককবরক ভাষীরাও তাদের মাতৃভাষার অধিকার পেয়েছে। ওরা ১১ জনও গেয়েছিল ‘আ-মরি বাংলাভাষা।’ আমরাও তা গাই।

লেখক: কবি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক। মহাপরিচালক প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

আরও পড়ুন:
স্ত্রী হত্যায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার
বিজিবির কাছ থেকে ইয়াবাসহ মাদককারবারি ছিনতাই
এসআই-কনস্টেবলকে পিটিয়ে আটককে ছিনতাই
আদালতের হাজতখানা থেকে আসামি চম্পট
হ্যান্ডকাফসহ আসামি ছিনতাই

মন্তব্য

মতামত
Sheikh Hasina came to politics with hope

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে এসেছিলেন আশা জাগিয়ে

শেখ হাসিনা রাজনীতিতে এসেছিলেন আশা জাগিয়ে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকগুলো নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন শেখ হাসিনা। রাজনীতিবিদরা সাধারণ ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিতে অভ্যস্ত। ক্ষমতার বাইরে থেকে যা বলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তা করেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা এখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তিনি যা বলেন, তা করেন। চাপ দিয়ে, আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে নমনীয় করা যায়নি, যায় না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আছে। প্রথমটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। দ্বিতীয়টি তার কন্যা শেখ হাসিনার। বঙ্গবন্ধু ৯ মাস পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি জীবন কাটিয়ে স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে।

বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিরা আটক করেছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাংলাদেশের ওপর সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দেয়ার পর। ওরা ভেবেছিল, বঙ্গবন্ধুকে আটক করলে, তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর অপচেষ্টা চালালে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণ হবে না। রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেবে বাঙালির স্বাধীন দেশের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তা হয়নি। বাঙালি নয়মাস অসম সাহসে লড়েছে, মরেছে, তারপরও স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশেই ফিরে এসেছিলেন ১০ জানুয়ারি। তার এই ফিরে আসা ছিল আশা ও উদ্দীপনার। লাখো শহীদের রক্তে মুক্ত স্বদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা নিয়ে।

শেখ হাসিনাও ফিরেছিলেন এক নতুন পটভূমিতে। তিনি যখন স্বামীর সঙ্গে বিদেশে যান তখন তার পিতা জীবিত, দেশের সরকারপ্রধান। কিন্তু তিনি যখন ফিরে আসেন তখন পিতা নেই, মাতা নেই, নেই ভাই, নেই আরও কত আত্মীয়স্বজন। এক গভীর শূন্যতার মধ্যে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন নতুন এক বিরাট দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। আওয়ামী লীগের মতো একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে। তার এই স্বদেশফেরা পঁচাত্তর-পরবর্তী দেশের রাজনীতির আবহ বদলে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।

ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন, কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভানেত্রীও নির্বাচিত হয়েছেন। অত্যন্ত কাছে থেকে দেখেছেন পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন। জেল-জুলুম-অত্যাচার-মামলা উপেক্ষা করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রাণপাত ধারাবাহিক সংগ্রাম। কিন্তু তিনিও রাজনীতির পিচ্ছিল পথে হাঁটবেন, সেটা হয়তো ভাবনায় সেভাবে ছিল না। অথচ তাই হলো।

১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে দলের ঐক্য ধরে রাখার বৃহত্তর প্রয়োজনে বাধ্যতামূলক নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তিনি দেশে ফিরেছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের লালচোখ উপেক্ষা করে। দেশে ফিরে রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়ার কারিগর হতে আত্মনিয়োগ করলেন। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাই রাজনীতির বাইরের মানুষ তাকে বলা যাবে না। তবে রাজনীতির মঞ্চে তার আরোহণ একটু ব্যতিক্রমভাবে হয়েছে। বিশেষ অবস্থায়, বিশেষ প্রয়োজনে তিনি নৌকার হাল ধরেন।

১৯৮১ থেকে ২০২২। ৪০ বছরের বেশি সময়ের এই পথপরিক্রমা তাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যাত্রাপথ অবশ্যই ফুল বিছানো ছিল না। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে চলতে হচ্ছে তাকে। এখনও তিনি দল ও দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। ইতিহাস যেন তার কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে অনেক দায় ও দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনে তিনি ক্লান্তিহীন যোদ্ধা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যে রাষ্ট্রটির জন্ম দিয়েছিলেন, সেই রাষ্ট্র তার জীবন রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। নিজের পরিচর্যায় আন্তরিক দরদে গড়া দল, আওয়ামী লীগ, যে দল মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে, সে দলটিও মুজিব-হত্যার আকস্মিকতায় ছিল হতবিহ্বল। তারাও কোনো কার্যকর প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত ব্যর্থতা খুনিদের উল্লাস নৃত্য দেখতে বাধ্য করেছিল গোটা জাতিকে।

১৯৮১ সালের বৃষ্টিস্নাত ১৭ মে শেখ হাসিনাকে বরণ করার জন্য জনতার ঢল নেমেছিল। যারা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হারিয়ে দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে পারেননি, তারা ১৭ মে অকাতরে চোখের জল ঢেলে দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন যেন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তাৎক্ষণিকভাবেই তৈরি হয়েছিল পরিবর্তনের অভিঘাত। মুক্তিযুদ্ধের হারানো চেতনাকে ফিরিয়ে আনার রাজনীতি বলবান হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

শেখ হাসিনা বাবার মতো রাজনীতিতে সাফল্য দেখাতে পারবেন কি না তা নিয়ে শুরুতে কারো কারো মধ্যে সংশয় ছিল। রাজনীতি থেকে যিনি নিজেকে পিতার ইচ্ছায় দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন, তিনি পিতার রাজনীতির ধারা এগিয়ে নিতে পারবেন কি না সে প্রশ্নও ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই শেখ হাসিনা প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, তার ধমনীতে শেখ মুজিবের রক্ত বহমান, তাই তিনি পরাজয় মানতে জানেন না।

যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে মুজিব হত্যার বিচার হবে না, আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারীদের বিচার হওয়া সম্ভব নয়, তাদের ভুল প্রমাণ করেছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে আর সবাই পরাজিত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু যেমন তার সময়ের অন্যসব রাজনীতিকদের ছাড়িয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন, শেখ হাসিনাও তেমনি তার সময়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। কাজটি অবশ্যই সহজ ছিল না। ঘরে-বাইরে বৈরিতা ছিল এবং আছে। সব মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার এক বিরল কৃতিত্বের অধিকারী এখন শেখ হাসিনার।

শেখ হাসিনা একটি কথা প্রায়ই বলে থাকেন— ‘আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, শিশু ছোটভাই রাসেলসহ আপনজনদের হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাঁদের ফিরে পেতে চাই।’

মানুষের প্রতি তার মমত্ববোধ আর ভালোবাসার কারণে আজ পৃথিবীতে বাংলাদেশ একটি কার্যকর কল্যাণমুখী রাষ্ট্র। শেখ হাসিনা সরকার-প্রবর্তিত সামাজিক সুরক্ষা বলয় গোটা উন্নয়নশীল বিশ্বে এক অনন্য ঘটনা। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে লাখ লাখ গৃহহীন, ঠিকানাহীন মানুষের জন্য নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার সুদক্ষ, সাহসী নেতৃত্ব ও সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় মিয়ানমার ও ভারতের কাছ থেকে বিশাল সমুদ্রসীমা জয় করেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সমুদ্র-আইন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে পৃথিবীর খুব কম দেশই এত সফলভাবে সমুদ্রের ওপর তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।

পাকিস্তানের ২৪ বছরে, জিয়া-এরশাদ ও খালেদা জিয়ার মোট ৩১ বছর শাসনামলে যেখানে ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়নি, সেখানে তার কার্যকর কূটনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারত গ্রহণ করেছে, যার মোট আয়তন ৭ হাজার ১১০ একর ভূমি।

অপরদিকে, ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশ পেয়েছে, যার মোট আয়তন ১৭ হাজার ১৬০ একর ভূমি। ফলে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে ১০ হাজার ৫০ একর বা ৪০.৬৭ বর্গকিলোমিটার ভূমি পেয়েছে।

একটি স্বল্পোন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও ১৩ হাজার ৫ শয়ের মতো কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। আরও ৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণাধীন। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তার নেতৃত্বে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। দেশের কৃষক-শ্রমিক, দিনমজুর, খেটে খাওয়া তথা স্বল্প আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। মানুষকে বাঁচাতে ও অর্থনীতিকে রক্ষা করতে লাখ লাখ কোটি টাকার অনুদান ও প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে, যা খুব প্রশংসনীয়।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন তার আরেকটি সাহসী সিদ্ধান্ত। যা বাঙালিকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। চলতি বছর জুন মাসেই সেতুতে চলাচল শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। এতে দক্ষিণ বঙ্গের সঙ্গে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই সহজ হবে না, অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেকগুলো নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন শেখ হাসিনা। রাজনীতিবিদরা সাধারণ ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিতে অভ্যস্ত। ক্ষমতার বাইরে থেকে যা বলেন, ক্ষমতায় গিয়ে তা করেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা এখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তিনি যা বলেন, তা করেন। চাপ দিয়ে, আন্দোলনের নামে সহিংসতা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে নমনীয় করা যায়নি, যায় না।

তিনি যেটা সঠিক মনে করেন, সেটা বাস্তবায়িত করার জন্য যে যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার তিনি তা নিতে পিছপা হন না। তবে তাকে কখনও কখনও কৌশলী হতে হয়, সময় ও সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাতে কারো কারো মধ্যে সংশয়ও হয়তো তৈরি হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত শেখ হাসিনা তার নিজের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়তা দেখাতে ভুল করেন না। তার গৃহীত পদক্ষেপ সবাইকে নিশ্চয়ই খুশি করে না। রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে রাজনীতিতে একমত একপথ হয়ে চলা সহজ নয়। তবে শেখ হাসিনার হাত ধরে রাজনীতিতে অস্থিরতা অনেকটাই দূর হয়েছে। শেখ হাসিনাকে যদি সময় ও সুযোগ দেয়া যায় তাহলে তিনি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন।

তিনি পরপর তিনবার দলকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করে তার রাজনৈতিক কৌশলের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। রাজনীতি মূলত নীতি ও কৌশলের খেলা। কৌশলে তিনি শতভাগ জিতেছেন। তবে দেশে নীতিহীনতার রাজনীতি প্রকট হয়ে উঠেছে। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। রাজনীতি পরিণত হয়েছে কেনাবেচার পণ্যে। রাজনীতির ব্যবসা অনেকের ভাগ্য বদলে সহায়ক হয়েছে। এটা দুঃখজনক। রাজনীতি নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব অনেকের মধ্যেই প্রবল। নষ্ট রাজনীতি নিয়ে হতাশাও ব্যাপক। সেজন্য এখন ক্ষমতার রাজনীতির পাশাপাশি নীতির রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার সাফল্য দেখার অপেক্ষায় দেশের মানুষ।

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অবস্থায় যারা মনে করছেন বাংলাদেশের পরিণতিও শ্রীলঙ্কার মতো হবে, তাদের উল্লাসনৃত্য বন্ধ হতে সময় লাগবে না । তবে হ্যাঁ, শেখ হাসিনা নিঃসঙ্গ শেরপার মতো একাই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে চলছেন। তার সঙ্গে একদল বিশ্বস্ত নির্লোভ সহযোদ্ধা এখন খুব বেশি প্রয়োজন। পাবেন কি তেমন নিবেদিতপ্রাণ আদর্শের লড়াইয়ে শামিল হওয়ার মতো যোদ্ধা দল?

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা সোমবার
বিদেশিদের নালিশ না দিয়ে আমার কাছে আসুন: প্রধানমন্ত্রী
‘আম্মা...পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর শব্দ’
মা দিবসের শুরু কবে
তত্ত্বাবধায়কের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার দিন আজ

মন্তব্য

মতামত
Sheikh Hasina came back for human welfare

শেখ হাসিনা মানবকল্যাণের জন্যই ফিরে আসেন

শেখ হাসিনা মানবকল্যাণের জন্যই ফিরে আসেন
একজন ব্যক্তি অদম্য সংকল্প এবং কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে ভয়ের কালো মেঘকে সরিয়ে দেন, দেশের মানুষ আশার আলো দেখে। তার পরিচয় প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি তিনি এক অদম্য সাহসী মানুষ। তিনি একজন যোদ্ধা ও অভিভাবক। তিনি সাহসিকতার সঙ্গেই কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করছেন, এখন এটি বিশ্বের সেরা উদাহরণ এবং বিশ্ব নেতারা বিশ্বব্যাপী সংকট পরিচালনার জন্য তার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।

গতকাল ১৭ মে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪২তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস ছিল। ১৯৮১ সালের এই দিনে প্রায় ৬ বছর নির্বাসনে থাকার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকদের ষড়যন্ত্র আর অনিরাপত্তার কারণে পরিবারের সবাইকে হারানোর পরেও দীর্ঘ ৬ বছর দেশে ফিরতে পারেননি তারা।

প্রতিকূলতার মাঝেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এক সময় চাঙা হয়ে ওঠেন; নতুন করে দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বলীয়ান হন। তখন শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই নেতা-কর্মীরা কাউন্সিলের মাধ্যমে তাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করেন।

১৯৯৬ সালে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। এরপর ২০০৮ সালে দ্বিতীয়, ২০১৪ সালে তৃতীয় ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। শেখ হাসিনা সবচেয়ে দুঃসময়ে দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামে অনেক সর্বদা লড়াই করেছেন। তিনি বার বার মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছেন। ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে একটি জনপ্রিয় দল হিসেবে ক্ষমতায় এনেছেন এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করে যে অসম্ভব কাজটি সম্ভব করেছিলেন তা হলো- বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার এবং পরে ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। আর সেই সুযোগ এসেছিল বাঙালি জাতির আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি চক্রের হাতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর কালো অন্ধকার গ্রাস করেছিল, সেই অন্ধকার তাড়াতে প্রথমে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন তিনি। সে মশাল, প্রাথমিক সংকট- সীমাবদ্ধতার পর দিকে দিকে আলোকিত করতে থাকে, শুরু হয় রাহু মুক্তির পালা। সব আবর্জনা দূর করতে প্রভাতে যেমন বাঙালি একাকার হয়, প্রতিশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হয়, তেমনি এক শুভ প্রতিশ্রুতির বাতাস বইতে দেখা যায় তার দেশে ফেরার দিন থেকে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণ, বিকাশ এবং মুক্তির লক্ষ্যে অগ্রণী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিকাশের জন্য তার বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার সততা-নিষ্ঠা, যুক্তিবাদী মানসিকতা, দৃঢ় মনোবল, প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বিশ্ব অঙ্গনে এক ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তিনি বিশ্ববিখ্যাত নেতা হিসেবে পরিচিত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাহসী কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে এখন আওয়ামী লীগ ১৪ বছর ক্ষমতায় রয়েছে এবং তিনি জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার অদম্য শক্তি-সাহস, মনোবল এবং দৃঢ় নেতৃত্বে বিশ্ব অবাক করে।

২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৯তম এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ২৩তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ একটি ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে এবং ২০৪১ সালে একটি ‘উন্নত দেশ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪ টি মাইলফলক দিয়েছেন প্রথমটি হল ডিজিটাল বাংলাদেশ যা ইতিমধ্যে একটি পর্যায়ে এসছে, দ্বিতীয়টি ২০৩০ সালে টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট (এসডিজি) অর্জন করা, তৃতীয়টি ২০৪১ সালে একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার এবং চতুর্থটি ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন।

চল্লিশ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। এটি একটি অনন্য অর্জন এই ৪০ বছর তিনি শুধু যে আওয়ামী লীগের সভাপতি আছেন তা নয়, তার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত এবং দলের একজন নেতাকর্মীও মনে করেন না যে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প আছে। এটি একজন রাজনৈতিক নেতার অসাধারণ প্রাপ্তি। আর সে কারণেই তারা মনে করে যে শেখ হাসিনার বিকল্প একমাত্র শেখ হাসিনাই।

আওয়ামী লীগ সভাপতির সাফল্যের একটি বড় দিক হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন। তিনি স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে রূপ দিয়েছেন। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু থেকে শুরু করে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশকে মনে করা হয় উন্নয়নের রোল মডেল, এটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছে। আত্মমর্যাদা এবং নিজের টাকায় পদ্মা সেতু।

শেখ হাসিনা কেবল বাংলাদেশকে উন্নত এবং অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার একটি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বাংলাদেশকে একটা আত্মসম্মান মর্যাদায় নিয়ে গেছেন। বিশ্বব্যাংক যখন বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নিয়ে আপত্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ করেছিল তখন প্রধানমন্ত্রী সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে নিজের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন যে পদ্মা সেতু এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায়। শুধু পদ্মা সেতু নয়, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বিভিন্ন দৃশ্যমান উন্নয়ন এখন বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদার এক অনন্য জায়গায় নিয়ে গেছে, যেটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে যখন সংকট তীব্র হয়, যখন সবকিছু আবর্তিত হয় অনিশ্চয়তায়, বাংলার আকাশে কালো মেঘ জমে থাকে, তখন শেখ হাসিনাই আমাদের ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ান। একজন ব্যক্তি অদম্য সংকল্প এবং কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে ভয়ের কালো মেঘকে সরিয়ে দেন, দেশের মানুষ আশার আলো দেখে।

তার পরিচয় প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি তিনি এক অদম্য সাহসী মানুষ। তিনি একজন যোদ্ধা ও অভিভাবক। তিনি সাহসিকতার সঙ্গেই কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলা করছেন, এখন এটি বিশ্বের সেরা উদাহরণ এবং বিশ্ব নেতারা বিশ্বব্যাপী সংকট পরিচালনার জন্য তার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন।

এই চার দশকে তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য লড়াই করেছেন। সংগ্রামের এই গতিপথ ছিল প্রতিকূল। শেখ হাসিনা, যিনি অলৌকিকভাবে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় বেঁচে যান। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে যাওয়ার জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ।

আমরা আমাদের অর্থনীতি এবং সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে একবার নজর দিতে পারি। ২০০৮-০৯ সালে গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল মাত্র ১০৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৯-২০-এ এটি বেড়ে দাঁডিয়েছে ৩৩০.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৮-০৯ সালে রপ্তানি আয় ছিল ১৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৮-১৯ সালে, এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০.৫৪ বিলিয়ন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৮.৪৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪৪.০৩ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। ২০০১ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৭.৯ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৩৪.৩ শতাংশ। ২০২০ সালে দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ১০.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহেশখালী-মাতারবাড়ি সমন্বিত উনয়ন প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ৩৯টি হাই-টেক পার্ক এবং আইটি গ্রাম নির্মিত হচ্ছে।

কৃষি-শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, আধুনিক প্রযুক্তি সবকিছুর অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে নতুন পরিকল্পনা, চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। বাংলাদেশ আমূল বদলে যাচ্ছে টেকসই উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এদেশ। দুর্বল, অনুন্নত, নড়বড়ে অবস্থা থেকে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

প্রচলিত অবকাঠামোর আধুনিক রূপান্তর সম্ভাবনার নতুন দিক উন্মোচন করছে প্রতিদিন। যেসব খাত কিংবা ব্যবসা আগে অবহেলিত অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে চলছিল; সেগুলোতে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। অমিত সম্ভাবনার হাতছানি এদেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত, আগ্রহী করে তুলছে। অবহেলায়, অযত্নে লালিত সেই সম্ভাবনাময় খাতগুলো ক্রমেই জেগে উঠছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ, দপ্তর, মন্ত্রণালয়গুলো সময়ে সময়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। ফলে সম্ভাবনার নতুন খাতের বিকাশ ঘটে চলেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অবিশ্বাস্য রকমের। বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশ বর্তমানে ৪১তম স্থানে উঠে এসেছে।

শিক্ষায় উন্নতি, যোগাযোগের অবকাঠামো, নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ, সামাজিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত, অসহায়, বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষার সোশ্যাল সেফটি নেট সাপোর্ট প্রদান, স্বামী পরিত্যক্তা নারীদের সহযোগিতা, অটিজম, প্রধানমন্ত্রীর সরকারের প্রধান উদ্যোগসমূহ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে মর্যাদা প্রদান, আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প, নারীর ক্ষমতায়ন এবং বিভিন্ন সেক্টরের সামগ্রিক উন্নয়ন তার সরকারেরই অবদান।

আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এটিই বর্তমান নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই আমাদের কাণ্ডারি, আমাদের ভরসা ও আশ্রয়স্থল।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

আরও পড়ুন:
শেখ হাসিনার ফিরে আসা ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ
তিনি ফিরলেন সব হারানোর দেশে
শেখ হাসিনা ফিরেছিলেন বলেই দেশ এগিয়েছে
শেখ হাসিনার স্বদেশে ফেরার দিন আজ
প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা সোমবার

মন্তব্য

মতামত
There are many PKs indoors and outdoors

ঘরে-বাইরে পি কে আছে অনেক

ঘরে-বাইরে পি কে আছে অনেক
পি কে হালদারের গ্রেপ্তারের ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতের জন্য একটা বড় বার্তা। আর সেটা হলো, টাকা পাচার করে তুমি বিশ্বের যেখানেই যাও, ধরা তোমাকে পড়তেই হবে। তবে পি কে হালদার একাই টাকা পাচার করেননি। আওয়ামী লীগ সরকার বা দলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, এমন অনেকে যেমন টাকা পাচার করেছেন।

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন নিয়ে কৌতূহল ছিল সবার। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের একক সাম্রাজ্য তছনছ হয়ে যাওয়ার পর ফরিদপুর আওয়ামী লীগে চাঞ্চল্য আসে। সেদিন জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ঢাকা থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বরাবরই চাঁছাছোলা কথা বলার জন্য খ্যাতি আছে ওবায়দুল কাদেরের।

আমার বিবেচনায় আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সমালোচকদের একজন ওবায়দুল কাদের। ঘোরতর শত্রুও তথ্যের অভাবে যে সমালোচনা করতে পারেন না, ওবায়দুল কাদের অবলীলায় সেটা করে ফেলেন। কারণ আওয়ামী লীগের ভালো-মন্দ দুটিই তার জানা। ওই সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আওয়ামী লীগ করে কোটি কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। তাদের দিকে নতুন নেতৃত্বকে লক্ষ রাখতে হবে। এর যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

ওবায়দুল কাদেরের বক্তৃতার দুদিনের মাথায় কলকাতায় ধরা পড়েন প্রশান্ত কুমার হালদার, যিনি পি কে হালদার নামেই পরিচিত। পরিচিত বলার চেয়ে কুখ্যাত বলাই ভালো। বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা মেধাবী পি কে হালদার তার সমস্ত মেধা কাজে লাগিয়েছিলেন জালিয়াতির কাজে।

২০১৯ সালে দেশ ছেড়ে পালানোর আগে বছর পাঁচেকের মধ্যে অন্তত চারটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কৌশলে দখল এবং লুট করেছেন পি কে। ডাকাতিটা করেছেন সবার সামনেই। কিন্তু পিস্তল ঠেকিয়ে করেননি বলে, কেউ বুঝতে পারেননি। যখন জানাজানি হলো, ততক্ষণে পাখি হাওয়া। দুর্নীতি দমন কমিশন পি কে হালদারের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগে ৩৭টি মামলা করেছে। প্রাথমিক তদন্তে লুট এবং পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওবায়দুল কাদের টাকা পাচারের কথা বলার দুদিনের মধ্যে একজন শীর্ষ পাচারকারীর গ্রেপ্তার হওয়ার মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। এটা নিছকই কাকতাল ঘটনা। পি কে হালদার জালিয়াতিটা আওয়ামী লীগ আমলে করলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

আর্থিক খাতের নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে পি কে হালদার চুরি এবং পাচার করেছেন। পি কে হালদারের গ্রেপ্তারের ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতের জন্য একটা বড় বার্তা। আর সেটা হলো, টাকা পাচার করে তুমি বিশ্বের যেখানেই যাও, ধরা তোমাকে পড়তেই হবে। তবে পি কে হালদার একাই টাকা পাচার করেননি। আওয়ামী লীগ সরকার বা দলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, এমন অনেকে যেমন টাকা পাচার করেছেন। আবার ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য সত্য হলে আওয়ামী লীগ করেও কোটি কোটি টাকা পাচার করেছেন অনেকে। বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচারের যে পরিমাণের কথা শুনি, তাতে দেশ-বিদেশে পি কে হালদারের মতো আরও অনেক পাচারকারী আছে।

বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকুক, খুঁজে খুঁজে তাদের সবাইকে ধরতে হবে। তাদের খুঁজে বের করতে সরকারকে গোয়েন্দা এবং কূটনৈতিক দক্ষতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ করতে হবে। মালয়েশিয়ায় কারা সেকেন্ড হোম বানিয়েছে, কানাডার বেগমপাড়ায় কাদের বাড়ি আছে সেই তালিকাটা যাচাই করলেই বেরিয়ে আসবে অনেকের নাম। পি কে হালদার না হয় ১০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। কিন্তু বা্ংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ তো লাখ কোটি টাকা। বাকি টাকা কারা পাচার করল, কোথায় করল, তারা কোথায়?

পাচারকারীদের গ্রেপ্তার, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পাচারের রাস্তাটা বন্ধ করতে হবে। হাজার কোটি টাকা তো নিশ্চয়ই কেউ লাগেজে করে নিয়ে যায়নি। সেটা কোনো না কোনো ব্যাংকিং চ্যানেল বা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হয়েছে। একবার পাচার হলে সেই টাকা উদ্ধার করা অনেক জটিল প্রক্রিয়া। তাই দেশের স্বার্থে পাচার বন্ধ করাটা অনেক বেশি জরুরি।

ওবায়দুল কাদের যে এলাকার কথা বলেছেন, সেই ফরিদপুরে গণেশ উল্টে গেছে অনেক আগেই। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের ঘনিষ্ঠ দুই ভাই রুবেল-বরকতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আগেই। সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের ভাই বাবরকেও। তবে শুধু ফরিদপুর পরিষ্কার করলেই হবে না, সারা দেশের সব অর্থ পাচারকারীকেই ধরতে হবে। রুবেল-বরকত, বাবর-পি কে হালদাররাই তো শুধু অর্থ পাচার করেনি। সরকারকে প্রমাণ করতে হবে, তারা অন্যায়কে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
পি কে হালদারকে দেশে আনা হবে: আইনমন্ত্রী
পি কে হালদারকে ফেরত চাইল ঢাকা, এটা কার্ড বিনিময় নয়: দোরাইস্বামী
পি কে হালদারকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রুল শুনানি ১২ জুন
পি কে হালদার আরও ১০ দিনের রিমান্ডে
বন্দরে নিষেধাজ্ঞা পৌঁছানোর ৩৮ মিনিট আগে দেশ ছাড়েন পি কে

মন্তব্য

উপরে