× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

মতামত
Ninety percent arithmetic
hear-news
player
google_news print-icon

নব্বই শতাংশের পাটিগণিত

নব্বই-শতাংশের-পাটিগণিত
আমার কর্মস্থল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির একজন নেতার বক্তব্য শুনলাম, তিনি বলছেন, নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে ক্লাসে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা নাকি ঠিক হয়নি হৃদয় মণ্ডলের। হ্যাঁ, এটি তার ব্যক্তিগত মত; কেননা পরে সমিতির পক্ষ থেকে দেয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ভিন্ন কথাই বলেছেন তিনি। কিন্তু তার ওই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটি উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। তার বক্তব্যে উদ্ধৃত ওই নব্বই শতাংশের পাটিগণিতটাই আসলে সব সর্বনাশের মূল।

করোনা যখন দোর্দণ্ড প্রতাপে, বাংলাদেশে তখন সব কিছু খোলা থাকলেও বন্ধ ছিল স্কুল। আবার এখন, এই প্রচণ্ড গরমে, রমজানের আবহে অন্য সব সেক্টরে যখন ঢিলে-ঢালা ভাব, তখন কেবল স্কুলের ব্যাপারে আমরা খুব কঠিন-কঠোর, ছুটি দেয়া যাবে না সহসাই। মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তবু একটু শিথিল, কিন্তু প্রাথমিকে আমরা আরও কড়া। এক দেশের এই দুই নীতি, স্কুল শিক্ষা নিয়ে তো এখন আলোচনা হওয়ারই কথা।

হচ্ছেও। কিন্তু সেটা হচ্ছে সম্পুর্ণ ভিন্ন কারণে! হঠাৎ করেই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছেন দেশের দুই অঞ্চলের দুজন স্কুল-শিক্ষক। ঘটনাচক্রে দুজনই সংখ্যালঘু সনাতন ধর্মাবলম্বী, আর তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীরটাকে শানানো হয়েছে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুভূতির পাথরে ঘষে। মুন্সিগঞ্জের হৃদয় মণ্ডলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিজ্ঞান ক্লাসে তিনি ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করেছেন, তাতে এমনই আঘাত পেয়েছে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুভূতি যে তাকে জেলখানাতেই পুরতে হয়েছে! আর নওগাঁর আমোদিনি পালের বিরুদ্ধে গুজব: ‘হিজাব পরার কারণে’ তিনি পিটিয়েছেন স্কুলের মেয়ে শিক্ষার্থীদের। কপাল ভালো, তাকে এখনও কারাদর্শন করতে হয়নি, তবে কারণ দর্শানোর একখানা নোটিশ পেয়েছেন তিনি।

এ নিয়ে ব্যাপক সরগরম গণমাধ্যম। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কাঁটা-ছেঁড়া চলছে, তারা আসলেই এমন কিছু করেছেন কি না তা নিয়ে। বিশেষ করে হৃদয় মণ্ডল কারো হৃদয়ে সত্যিই আঘাত করেছেন কি না সেটা নিয়ে।

অন্তর্জালের জগতে উড়ে বেড়ানো দশম শ্রেণির ক্লাসে তার সঙ্গে জনৈক ছাত্রের কথোপকথন শুনে আমি তো রীতিমতো বিস্মিত! দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী যে ভাষায় তার শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলছেন, সেটা বিস্ময়কর বটে। আমিও ছাত্র পড়াই এবং পড়ানোর সময় আমি আমার ছাত্রদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করি, কারণ আমি মনে করি প্রশ্ন করতে না পারলে ঠিক ঠিক শেখাটা হয়ে ওঠে না। সে হিসেবে ওই ছাত্রের প্রশ্ন করার ধরনটাকে আমার ভালো লাগারই কথা। কিন্তু না, কোনোভাবেই সেটা ভালো লাগাতে পারছি না। বরং হৃদয় স্যার যেমন ধৈর্যের সঙ্গে এই সব অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, সেটাই আমাকে মুগ্ধ করছে; আমার মনে হচ্ছে, এমন শিক্ষক প্রত্যেকটা স্কুলে থাকা দরকার!

এই ভাবনা আরও অনেকেরই মনে জাগছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু ভিন্নমতটাও যে শুনতে পাচ্ছি! আমার কর্মস্থল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির একজন নেতার বক্তব্য শুনলাম, তিনি বলছেন, নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে ক্লাসে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা নাকি ঠিক হয়নি হৃদয় মণ্ডলের। হ্যাঁ, এটি তার ব্যক্তিগত মত; কেননা পরে সমিতির পক্ষ থেকে দেয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ভিন্ন কথাই বলেছেন তিনি। কিন্তু তার ওই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটি উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।

তার বক্তব্যে উদ্ধৃত ওই নব্বই শতাংশের পাটিগণিতটাই আসলে সব সর্বনাশের মূল। নইলে একেবারে সাদাচোখে দেখলেই এই মামলা টেকে না! মামলাটি করা হয়েছে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৯৫ (ক) ধারায়। মনে রাখা দরকার, ব্লাসফেমি বিষয়ে এই আইনের মূলধারা, অর্থাৎ ২৯৫ নম্বর ধারায় মামলা যে কেউ করতে পারে না; তবে ২৯৫ (ক) ধারায় পারা যায়। কিন্তু সেই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিকদের কোনো শ্রেণির ধর্মীয় অনুভূতিতে কঠোর আঘাত করার উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাকৃতভাবে ও বিদ্বেষাত্মক কথিত বা লিখিত শব্দাবলীর সাহায্যে বা দৃশ্যমান কল্পমূর্তির সাহায্যে উক্ত শ্রেণির ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করে বা করার উদ্যোগ করে, তবে উক্ত ব্যক্তি যে কোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে (যাহার মেয়াদ দুই বৎসর পর্যন্ত হইতে পারে) বা অথর্দণ্ডে বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’

এই ধারা অনুসারে ‘স্বেচ্ছাকৃতভাবে’ ধর্ম অবমাননা অপরাধ, কিন্তু যে তথ্যপ্রমাণের উপর ভিত্তি করে এই মামলাটি দাঁড়িয়ে, সেই কথোপকথন শুনলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে হৃদয় স্যার তার ক্লাসে বিজ্ঞান নিয়েই কথা বলছিলেন, ধর্ম নিয়ে কোনো কথা তিনি স্বেচ্ছায় বলেননি। বরং অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবে ছাত্রটি বার বার সেই প্রসঙ্গ তোলায় বাধ্য হয়ে তিনি কিছু জবাব দিয়েছেন মাত্র। জবাবে ধর্ম সম্পর্কে তিনি অবমাননাকর কিছু বলেছেন কি না, এই প্রসঙ্গটিই তাই এখানে অবান্তর।

আমার চিন্তার বিষয় তাই হৃদয় স্যার ধর্ম অবমাননা করেছেন কি না বা তিনি বিজ্ঞানের পক্ষে যৌক্তিক অথবা অবান্তর কথা বলেছেন কি না, সেটা নিয়ে নয়। আমাকে ভাবাচ্ছে এই প্রক্রিয়াটি, যেখানে দশম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী, যে কি না বাণিজ্য শাখায় অধ্যয়নরত, সে তার বিজ্ঞান শিক্ষককে বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞান দিচ্ছে। কোন কোন বই পড়তে হবে সেটাও বলে দিচ্ছে। ক্লাস চলাকালে তার হাতে আছে ডিজিটাল ডিভাইস, যা দিয়ে শিক্ষকের অজান্তে তার কথাবার্তা রেকর্ড করছে, করে সেটির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছে অভিযোগ করছে। প্রতিষ্ঠান প্রধান সেটা আমলে নিয়ে শিক্ষককেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দিচ্ছেন; অভিভাবকসহ স্থানীয় লোকজন স্কুল ঘেরাও করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছেন যে শিক্ষককে কারাগারে নিতে হচ্ছে!

কথোপকথনটি শুনছি, আর মনে মনে কল্পনা করছি, আমার ছেলেবেলার স্কুলে এ রকম কিছু ঘটলে প্রতিক্রিয়া কী হতে পারতো! প্রথম প্রতিক্রিয়া- আমাদের বিজ্ঞানশিক্ষক, প্রবল ধর্মানুরাগী মোজাম্মেল স্যার নিশ্চিত কানের নিচে এমন একটা চটকানা দিতেন যে পরের প্রশ্ন করার শখই উবে যেত। তর্কের খাতিরে ধরা যাক সেটা না ঘটে পরের ধাপটা পর্যন্ত গেলাম। হেড স্যার, যিনি এমন ধর্মানুরাগী ছিলেন যে টিফিন পিরিয়ডে মসজিদে যাওয়ার বাধ্যতামূলক আদেশ জারি করেছিলেন, তার কাছে যদি এমন একটা দরখাস্ত নিয়ে যেতাম, তিনি দরখাস্ত পড়ার ধার না ধেরে অভিযোগটা মুখে শোনামাত্র কাঁচা বেত দিয়ে পেটানো শুরু করতেন। আর কোনো কারণে যদি এই অভিযোগের কথা বাড়িতে তুলতাম, তাহলেও একই প্রতিক্রিয়া হতো, পিতার হাতেও খেতে হতো বেত্রাঘাত। তখনকার শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কটাই ছিল এমন, শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর ছাত্রের ভালো-মন্দের দায়িত্ব নেয়া ছিল যে সম্পর্কের ভিত্তি।

এখন তো আর বিষয়টা সে রকম নেই। এখন ছাত্র পেটালে সেটা অন্যায়, আমোদিনি পাল যে অন্যায়ের কারণে অপরাধী। কিন্তু সেই অপরাধ ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে তার ধর্মীয় পরিচয়, ফেসবুকে মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে তারই ছাত্রীরা স্কুল ইউনিফর্ম না পরার বিষয়টিকে আড়াল করে নিয়ে আসছে হিজাব পরার প্রসঙ্গ, আর মুহূর্তেই সেটা ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে; স্কুলের বাইরে থেকে উত্তেজিত জনতা এসে হামলা করছে স্কুলে।

হৃদয় মণ্ডলের ক্ষেত্রেও ঘটনা একই, ধর্মের প্রসঙ্গটি যেন স্ফুলিঙ্গের মতো আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে, আর সে আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে দাউ দাউ করে। এই প্যাটার্নটাই সবচেয়ে বেশি ভাবনার কারণ। কেন ধর্ম নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলেই উত্তেজিত হয়ে উঠছে এত মানুষ? কেন মসজিদের মাইকে একটা ঘোষণা শুনে হিন্দু পাড়ায় আগুন লাগাতে ছুটে যাচ্ছে মানুষ, বৌদ্ধ মন্দিরে ভাঙচুর করছে, এমনকি স্কুল পর্যন্ত ঘেরাও করছে? একটা ভালো কাজে ডাক দিলে তো এভাবে এগিয়ে আসে না কেউ!

গণমানসের এই পরিবর্তনটা দিন দিন এমনই জোরালো হয়ে উঠছে বলেই স্কুলের ছাত্রকে দিয়ে শিক্ষকের কথোপকথন রেকর্ড করার দুর্বুদ্ধিটা মাথায় আসছে কারো; অ্যাসেম্বলিতে স্কুল-পোশাক না পরার কারণে মার খেয়ে তাতে হিজাবের গল্প যোগ করে ফেসবুকে পোস্ট করছে শিক্ষার্থী। ওই নব্বই শতাংশের পাটিগণিত এতই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে তার সামনে তুচ্ছ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, শিক্ষকের মর্যাদা, এমনকি নিরাপদ দূরত্বে বসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতাদেরও বুক কাঁপে তার বিরুদ্ধে যেতে।

এই পাটিগণিতটাই বদলাতে হবে সবার আগে! কেন এমন পরিবর্তন হচ্ছে, কীভাবে সেটা ঠেকানো যায়, সেটা নিয়ে সত্যিকারের গবেষণা হওয়া দরকার; সেই গবেষণার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। না হলে এক হৃদয় মণ্ডল-আমোদিনি পালদের মতো আরো অনেকেই বলির পাঁঠা হবেন, নিশ্চিত।

লেখক: অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
Toab Khan is an explorer of the times in journalism

সাংবাদিকতায় কালের অভিযাত্রী তোয়াব খান

সাংবাদিকতায় কালের অভিযাত্রী তোয়াব খান
ত্রিকালদর্শী এক স্বপ্নীল মানুষ ছিলেন তোয়াব খান। ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও একজন অসাম্প্রদায়িক বাঙালি। অনিয়ম, দুর্নীতি, মৌলবাদ, জঙ্গিতন্ত্রসহ দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে তার সাংবাদিকতা ছিল আপসহীন ও তেজদীপ্ত।

চলে গেলেন সাংবাদিকতার বটবৃক্ষ তোয়াব খান। শনিবার রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিংবদন্তি সাংবাদিক তোয়াব খান বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে দ্যুতি ছড়ানো গুণীজন ছিলেন।

১৯৫৩ সালে সাপ্তাহিক জনতার মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৬১ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ-এর বার্তা সম্পাদক হন। এরপর ১৯৬৪ সালে যোগ দেন দৈনিক পাকিস্তানে।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে যোগ দেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তার আকর্ষণীয় উপস্থাপনায় নিয়মিত প্রচারিত হয় ‘পিন্ডির প্রলাপ’ নামক অনুষ্ঠান। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৈনিক পাকিস্তান থেকে বদলে যাওয়া দৈনিক বাংলার প্রথম সম্পাদক ছিলেন তোয়াব খান। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি দৈনিক বাংলার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব ছিলেন। পরে তিনি প্রধান তথ্য কর্মকর্তা এবং প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। দৈনিক জনকণ্ঠ প্রকাশের দিন থেকেই প্রায় তিনি পত্রিকাটির উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি তিনি দৈনিক বাংলার সম্পাদক ছিলেন। তবে মানুষের কাছে তার পরিচয় জনকণ্ঠ-এর তোয়াব খান হিসেবেই। ২০১৬ সালে সাংবাদিকতায় অনন্য অবদানের জন্য ‘একুশে পদক’ পান এই গুণী সাংবাদিক।।

ত্রিকালদর্শী এক স্বপ্নীল মানুষ ছিলেন তোয়াব খান। ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ ও একজন অসাম্প্রদায়িক বাঙালি। অনিয়ম, দুর্নীতি, মৌলবাদ, জঙ্গিতন্ত্রসহ দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে তার সাংবাদিকতা ছিল আপসহীন ও তেজদীপ্ত। সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, রিপোর্টিং, ফিচারসহ অন্যান্য পাতায় নিঃসংকোচে লেখা প্রকাশে দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ দিতেন।

কখনও সক্রিয় রাজনীতি করেননি। তবে রাজনীতির কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক আগ্রহী ছিলেন। তার নীতি ও নৈতিকতা ছিল প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার। সাংবাদিকতার ইতিহাস, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সঙ্গে স্মৃতিময় ঘটনা, স্বাধীনতাপূর্ব এবং পরবর্তী রাজনীতির নানা স্মৃতিময় ঘটনা তার কাছ থেকে শুনেছি। তিনি ছিলেন গুণীজন, সাংবাদিকতায় তার অবদান জীবিত অবস্থায়ই তিনি প্রমাণ দিয়ে গেছেন।

তোয়াব খানের সাংবাদিকতা ও জীবনসংগ্রাম আমার সাংবাদিকতা জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি বলতেন, সাংবাদিকতার দায়বন্ধতা সব সময় পাঠকের কাছে। কোনো সম্প্রদায়, রাজনৈতিক দল বা সরকারের কাছে নয়। সাংবাদিকদের পরীক্ষা দিতে হয় প্রতিদিন। তাই সংবাদ পরিবেশনে অতিমাত্রায় সচেতন হওয়া জরুরি। বলতেন, পাঠক যেমন কাগজের মূল প্রাণ, তেমনি তারা বিশ্লেষক ও বিচারক। আমার সাংবাদিকতার পরিপূর্ণতা তার কাছে। ২০০৯ সালে জনকণ্ঠ-এর সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিয়ে প্রথম দিকেই তার নজর কেড়েছিলাম একটি ধারাবাহিক লেখা সম্পাদনা করতে গিয়ে। লেখাটির সম্পাদনা দেখে তোয়াব ভাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বেশ ভালো করেছ। সব লেখাই এভাবে দেখে ছাড়বে।’ সেই থেকে বিশ্বাস আর কাজের প্রতি আন্তরিকতায় বিশ্বস্ত হই। প্রায়ই সম্পাদকীয় ও চতুরঙ্গ পাতা দেখাতে গেলে বলতেন, ‘লেখাগুলো তুমি পড়েছ তো?’ বড় লেখা কীভাবে সীমিত শব্দের মধ্যে আনতে হয়, অপ্রয়োজনীয় ও একাধিকবার ব্যবহৃত শব্দ বর্জন করে বিকল্প শব্দের ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন। বাক্যের যোগ্যতা হারায় এমন কোনো শব্দ ব্যবহার না করার কথা বলতেন। অনেক ক্ষেত্রে শব্দ ধরে দেখিয়ে দিতেন। যেদিন আমার সম্পাদকীয় লেখার পালা ছিল, সেদিন সম্পাদকীয়টিতে কোনো অসংগতি থাকলে মার্ক করে পরিবর্তন এবং পরিমার্জনের কথা বলতেন। আসলে জনকণ্ঠ-এর সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতে গিয়ে নতুনভাবে আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি ছিল তোয়াব খানের কাছে।

২০১৯ সালে আমি জনকণ্ঠ ছেড়ে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে (পিআইবি) যোগ দিই। তোয়াব খান চাননি আমি জনকণ্ঠ ছেড়ে আসি। তিনি আমার অব্যাহতিপত্র ১৫ দিন ধরে রেখে দিয়েছিলেন। বললেন, ‘তোমার ব্যাপারে আমি মালিকের সঙ্গে কথা বলব। তুমি চলে যাও আমি চাই না।’

সর্বশেষ তিনি জনকণ্ঠ-এ আমাকে পার্টটাইমও রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চাকরির শর্তের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পিআইবিতে যোগদানের পরও তোয়াব ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হতো। পিআইবির সাময়িকী নিরীক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ (‘আমার তীর্থযাত্রা’) ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক তার দুটি লেখা আমরা প্রকাশ করেছিলাম। সর্বশেষ সিনিয়র সাংবাদিক আলী হাবীব ভাইকে দিয়ে তার একটি সাক্ষাৎকার করিয়ে নিরীক্ষায় প্রকাশ করেছিলাম। তোয়াব ভাইকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত বহু স্মৃতি আজও অমলিন।

আমার মতো বহু সাংবাদিকের কাছে তোয়াব খান একটি অহংকারের নাম। কারণ সাংবাদিকতায় তিনি সাধারণ থেকে অসাধারণ। সাংবাদিকতার প্রতিটি স্তরে তিনি প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে পরিণত হয়েছিলেন মহীরুহে। তাই একজন শারীরিক তোয়াব খানের চলে যাওয়া মানে সবশেষ নয়। সাংবাদিকতায় তার বর্ণাঢ্য জীবনই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল। তোয়াব খান হারিয়ে যাওয়ার নয়, কারণ তার ব্যাপ্তি গণমাধ্যমব্যাপী, তিনি যে সাংবাদিকতায় কালের অভিযাত্রী।

লেখক: সহকারী সম্পাদক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

আরও পড়ুন:
কোয়াড বিতর্ক
আল কায়েদা ও হেফাজত
রাষ্ট্রীয় হেফাজত
প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সক্ষমতা
পশ্চিমাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি

মন্তব্য

মতামত
From Zias curfew democracy to Khaleda Tareqs stick and rod system

জিয়ার কারফিউ গণতন্ত্র থেকে খালেদা-তারেকের লাঠি-রডতন্ত্র

জিয়ার কারফিউ গণতন্ত্র থেকে খালেদা-তারেকের লাঠি-রডতন্ত্র
গত কয়েকদিন ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে বিএনপির বিভিন্ন সমাবেশ-জনসভায় বিএনপি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ট্রাক এবং বিভিন্ন যানবাহনে করে লাঠি সরবরাহ করছে। এই লাঠিগুলোতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে তাদের সন্ত্রাসী-কর্মীদের হাতে দিচ্ছে।

গত কয়েক বছর শান্তি, মানবতা ও গণতন্ত্রের জন্য কূটনীতিকদের কাছে নানা অভিনয় আর মায়াকান্না কাঁদলেও বিএনপি যে একটি নিম্নস্তরের ও মধ্যযুগীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, লাঠি-রড নিয়ে তাদের তাণ্ডব আর আস্ফালনে সেটি গত কয়েকদিনে গোটা জাতি দেখল। বিশেষ করে, গত কয়েক মাস ধরে বিএনপি দেশে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এবং এ লক্ষ্যে তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য বিদেশি রাষ্ট্র এবং কূটনীতিকদের কাছে ধরনা দিয়ে আসছে। বিএনপি নিজেদের মাদার তেরেসা হিসেবে উপস্থাপন করতে কূটনীতিকদের কাছে কতইনা মায়াকান্না করেছে। কূটনীতিক মহলসহ অনেকের চোখ ছানাবড়া করে দিয়ে সেই বিএনপি গত কয়েকদিনে তার আসল চেহারা উম্মোচন করেছে।

গত কয়েকদিন ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে বিএনপির বিভিন্ন সমাবেশ-জনসভায় বিএনপি পূর্বপরিকল্পিতভাবে ট্রাক এবং বিভিন্ন যানবাহনে করে লাঠি সরবরাহ করছে। এই লাঠিগুলোতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে তাদের সন্ত্রাসী-কর্মীদের হাতে দিচ্ছে। এই লাঠি নিয়ে তারা বিভিন্ন জায়গায় তাণ্ডব চালানোর চেষ্টা করছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাড্ডা হাই স্কুলের সামনে বিএনপির সমাবেশস্থলে এই দৃশ্য দেখা গেছে। গতকাল ২৬ সেপ্টেম্বর হাজারীবাগে শিকদার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল সংলগ্ন সড়কে বিএনপির সমাবেশে আসা সন্ত্রাসী-কর্মীদের হাতে এই রকম লাঠি দেখা যায়। তাদের কারো কারো কাছে রড ও আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা যায়। তারা এই লাঠি ও রডের জোরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা করছে এবং ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় অংশ নিচ্ছে। এই লাঠি আর রডের কারণেই তারা নিজেদের শক্তিশালী মনে করছে আর তাণ্ডব চালাচ্ছে।

বিএনপি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করে জাতীয় পতাকার অবমাননা করছে। এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের মধ্যে পড়ে। জাতীয় পতাকা নিয়ে বিএনপির এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নতুন প্রজন্মের কাছে কী বার্তা দিচ্ছে?

কয়েক মাস আগে মধ্যযুগীয় কায়দায় লাঠি সোটা নিয়ে বিএনপির কয়েকশ সন্ত্রাসী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে গিয়েছিল। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিরোধের মুখে তারা পালিয়েছিল। গত কয়েকদিনের বিএনপির মধ্যযুগীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেখলেই বোঝা যায়, তারা আগামী নির্বাচনে কী করতে চায়। তাদের কয়েকদিনের লাঠি-রডতন্ত্র প্রমাণ করেছে, তারা চর দখলের মতো লাঠি রড অস্ত্র নিয়ে ভোটকেন্দ্র দখল করে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসতে চায়। কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, ভোট জালিয়াতি বন্ধ করার জন্য আমরা যে ইভিএমের দাবি করে আসছি, বিএনপির সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আমাদের সেই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শেখ হাসিনার সরকার প্রবর্তিত ই-টেন্ডারিংয়ের কারণে যেমন এ দেশে টেন্ডারবাজি- টেন্ডার ছিনতাইসহ টেন্ডার সংক্রান্ত সকল দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে, ইভিএম এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে কেন্দ্র দখল-ভোট ডাকাতিসহ সকল নির্বাচনি অপরাধ বন্ধ হবে।

একেবারে গোল্ডফিশ না হলেও অনেকটা ভুলোমনা বাঙালি জাতি অসাংবিধানিক ও অবৈধ শক্তির পকেটে জন্ম নেয়া 'ইললেজিটিমেট' কিংস পার্টি বিএনপির ইতিহাস ভুলে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সংবিধান লংঘনকারী ও অসাংবিধানিক শাসক হিসেবে ঘোষিত জিয়ার কারফিউ গণতন্ত্রের কথা আমরা ভুলে গেলেও ইতিহাসে সঠিকভাবেই লিপিবদ্ধ আছে। একদিকে সংবিধানকে পদদলিত করে গণতান্ত্রিক শাসন রুদ্ধ করেছিলেন, অন্যদিকে বিদ্রোহ দমনের নামে মধ্যযুগীয় কায়দায় হাজার হাজার সেনা সদস্যকে নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন জিয়া। বন্দুকের ভয় দেখিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ দখলকারী জিয়ার তথাকথিত গণতন্ত্র সম্পর্কে বিচারপতি সায়েম তার লেখা বইয়ে কী লিখেছিলেন সেটি আমরা জানি। জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণকে সায়েম ‘রক্ষণ যখন ভক্ষক’ আখ্যা দিয়েছিলেলন। জিয়ার নির্বাচনি কারচুপিতে দেশে বিদেশি মহল যে ‘ছি ছি’ করেছিল, সেটি জাস্টিস সায়েমের বইতে উঠে এসেছে। জাতির পিতার হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী জিয়া সশরীরে পিতার হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া খুনিদের বিদেশে কূটনীতিকের চাকরি দিয়ে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। জাতির পিতার হত্যার বিচার বন্ধ রাখতে জিয়া-এরশাদ-খালেদা ইনডেমনিটি আইন বহাল রেখেছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করা বিএনপির ইতিহাস এতো কুৎসিত, যা স্বল্প সময়ে বর্ণনা করা যায় না। তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চেয়েছিল। নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিল।১৫ ফেব্রুযারির একদলীয় ভোটারবিহীন নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিল। মা-ছেলের নির্দেশে গ্রেনেড হামলা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা ও বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাসহ গোটা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে হত্যা করে দেশকে নেতৃত্বশূন্য করতে চেয়েছিল। ক্ষমতায় থাকতে তারা আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদেশে লবিস্টের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে তারা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। এই টাকা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় পাচার হওয়া দুর্নীতির টাকা।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির কর্মকাণ্ড এবং তাদের নেতাদের বক্তব্য শুনলেই বোঝা যায়, তারা কোন ধরণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। নির্বাচনে তারা কীভাবে অংশ নিতে চায়। তাদের পুরোনো চরিত্র আর মানসিকতার যে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি, গত কয়েকদিনে সেটিই তারা প্রমাণ করল। তাদের কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, এখনও তারা আশির দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরু-বাবলুর সন্ত্রাসী রাজনীতির দর্শনে মজে আছে। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে আজ বিশ্বে নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, বাংলাদেশ যে একুশ শতকে এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তথ্য প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার অপেক্ষায় আছে, সেই তথ্য কী অর্ধ শিক্ষিত আমানুল্লাহ আমানের বাহিনী জানে? এরা এখনও মধ্যযুগীয় মানসিকতা নিয়ে বসে আছে। এই মধ্যযুগীয় শক্তিকে আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে l সেটা এখনই l

লেখক: আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক

আরও পড়ুন:
দুর্দিনের সহযাত্রী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
স্বার্থপরতার রাজনীতিতে উপেক্ষিত দেশপ্রেম!
নারী ‍ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকেই
ধর্মমুখী রাজনীতি ও ‘সংখ্যালঘু’র যাতনা
অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা: জেগে ওঠো বাংলাদেশ

মন্তব্য

মতামত
Sheikh Hasina Swapnajoys Prometheus

শেখ হাসিনা: স্বপ্নজয়ের প্রমিথিউস

শেখ হাসিনা: স্বপ্নজয়ের প্রমিথিউস
রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই শেখ হাসিনা যে অভূতপূর্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে সম্মানিত করেন, নিঃসন্দেহে তা দেশ ও জাতির জন্য গৌরবের। বাংলাদেশকে এক সময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করা বিশ্বমোড়ল রাষ্ট্রগুলোও বাংলার অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অর্জনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমনকি বাঙালির জন্মশত্রু পাকিস্তানের সাংসদরাও তাদের সংসদে মিনতি করে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমাদের বাংলাদেশের মতো বানিয়ে দাও।’

আশির দশকের কথা। তখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরোধীদলীয় নেতা। একদিন খ্যাতনামা কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সাথে আলাপচারিতার সময় শেখ হাসিনাকে তিনি ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করছিলেন। শেখ হাসিনা কবিকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমি আপনার অনেক ছোট, আপনি আপনি করছেন কেন?’ তখন কবি বঙ্গবন্ধুকন্যাকে জবাব দিলেন, ‘শেখ হাসিনা, আপনিই তো বাংলাদেশ।’

স্বাধীনতার মহান স্থপতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দীর্ঘ ২৩ বছরের সংগ্রামী জীবনের আত্মত্যাগের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদ ও আড়াই লক্ষাধিক মা-বোনের জীবন সম্ভ্রমের বিনিময়ে ভিনদেশি পাকিস্তানি শোষণ থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাঙালি জাতিকে এনে দিয়েছেন রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও স্বাধীন আত্মপরিচয়। বঙ্গবন্ধু চিরকাল একটি অসাম্প্রদায়িক, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত আত্মনির্ভরশীল সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন। পিতার লালিত স্বপ্নকে আজ বাস্তবে পরিণত করে চলেছেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা ১৬ কোটি বাঙালির প্রাণের নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাতা কালজয়ী ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি দেশের পরনির্ভরশীলতার তীব্র সমালোচনা করে তার এক বক্তব্যে বলেন, ‘ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না। বিদেশ থেকে পয়সা এনে দেশকে গড়া যাবে না। দেশের মধ্যেই পয়সা করতে হবে।’

বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার সুবিবেচিত নির্দেশনাকে উপলব্ধি করে অর্থনৈতিকভাবে বৈশ্বিক সাহায্যের প্রতি বাংলাদেশের অতিনির্ভরশীলতার চিরায়ত ধারাকে পরিবর্তন করার দুঃসাহসী স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছেন। বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি স্বাবলম্বী দেশে প্রতিষ্ঠিত করার প্রায় অসম্ভব স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল, মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও পদ্মাসেতুর মতো অগণিত বৃহৎ বা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। এ ছাড়াও বিশ্বের একাধিক দরিদ্র দেশকে ঋণপ্রদান করে বাঙালি জাতির চিরকালের আরাধ্য সে অসম্ভব স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে এ জাতির আত্মমর্যাদাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফল ও স্বার্থকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে দেশের ইতিবাচক অগ্রযাত্রা ও সামগ্রিক অর্জনকে বাংলাদেশের দিন বদলের বিপ্লব বললেও অতিরঞ্জন হবে না।

এ ছাড়াও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা শুধুমাত্র বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রসারণ ঘটিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি প্রতিবেশি দেশ ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা অনুযায়ী প্রায় আরেকটি বাংলাদেশের সমপরিমাণ সমুদ্রসীমা বিজয় করেন। ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যাটির সমাধান করেও বাংলাদেশের আরেকটি অকল্পনীয় বিপ্লবকে বাস্তবতায় পরিণত করেছেন বাংলার ইতিহাসের সফলতম রাষ্ট্রনায়ক প্রাণের নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সকলের জ্ঞাতার্থে বলে রাখা ভালো যে, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পূর্বে বাংলাদেশের আয়তন ছিল ১ রাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটার, আর শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশের ছিটমহল সমস্যা সমাধানের পর বাংলাদেশের আয়তন প্রায় ১ হাজার বর্গকিলোমিটার বেড়ে দাঁড়িয়েছ ১ লখ ৪৮ হাজার ৪৬০ বর্গ কিলোমিটারে! সাধারণ চোখে যা ছিল সুদূরপরাহত অকল্পনীয় বিষয়, যে দুঃসাহস পূর্বের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান দেখাতে পারেনি, তাই সফলভাবে সম্পন্ন এবং বাস্তবায়ন করেছেন বাঙালি জাতির স্বপ্নজয়ের প্রমিথিউস বঙ্গবন্ধুকন্যা তথা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা ।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত শেখ হাসিনার স্বরচিত ‘বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’ শীর্ষক গ্রন্থের ভূমিকাংশে তিনি লিখেছেন, ‘আমি রাজনীতি করি এ দেশের মানুষকে ভালোবেসে। দেশের শহর, গ্রাম যেখানেই আমি সফরে যাই, মানুষের দুঃখ-কষ্ট মনকে দারুণভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে। প্রকৃতির কাছে মানুষ যেমন অসহায়, আবার গোষ্ঠী স্বার্থের কাছেও মানুষ কত অসহায় নিগৃহীত, শোষিত। আমার এ রাজনৈতিক জীবনে এসব ঘটনা যখন যেভাবে চোখে পড়েছে, অনুভব করেছি, সেভাবে লেখার চেষ্টা করেছি।’

বাংলাদেশের আবহমান সমাজব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা দ্বারা সুদীর্ঘকাল ধরে নিষ্পেষিত হয়ে আসা বাঙালি নারী সমাজকে পুনরুজ্জ্বীবিত করে তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির সাহসী আলোর মিছিলে নেতৃত্ব প্রদানের সুযোগ করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। আজ বাংলায় নারী-পুরুষের শিক্ষাগত বৈষম্য প্রায় নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রথম নারী স্পিকার, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী উপাচার্য, মন্ত্রিপরিষদসহ দেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রতিটি অঙ্গনে নারী জাগরণের অনন্য দিকপাল হিসেবে যে অনবদ্য বিপ্লব ঘটিয়েছেন শেখ হাসিনা, তা ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে। যে সাহসের প্রমাণ কেউ রাখেনি আগে, বছরের প্রথম দিন কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে নতুন পাঠ্যবই, শিক্ষা সরঞ্জাম তুলে দেওয়া, বিনামূল্যে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার বৃত্তি প্রদানের মতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে। পাবলিক সার্ভিসে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনোরকম দলীয়করণকে প্রশ্রয় না দিয়ে প্রতি বছর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছতার সাথে বিসিএস পরীক্ষাসহ সকল সরকারি চাকরির পরীক্ষাসমূহ আয়োজনের সংস্কৃতি প্রবর্তন করেছে শেখ হাসিনা সরকার। অথচ বিএনপি জামায়াত শাসনামলে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত অনেক ঝক্কিঝামেলা শেষে মাত্র একবার বিসিএস পরীক্ষায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তাও বিএনপি দলীয় ক্যাডারদের মধ্যেও চাকরি সীমাবদ্ধ রাখা হতো।

ভীতিকর যে তথ্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে তা হলো মধুরক্যান্টিন থেকে ছাত্রদল-শিবির নেতাদের হাতে নাকি সব ভর্তি পরীক্ষা ও বিসিএসের প্রশ্নপত্র আগেই তুলে দেয়া হতো এবং বিএনপি-জামাত নেতাদের হাতেই থাকতো রেডিমেইড বিসিএস ক্যাডার তৈরির সকল গুরুদায়িত্ব। অথচ এ দেশের অগণিত মেধাবী গ্রাজুয়েটকে যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্মানজনক চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার মতো স্বদেশপ্রেমের নজির শেখ হাসিনার আগে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান স্থাপন করতে সক্ষম হননি।

প্রসঙ্গক্রমে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ভূমিহীন নাগরিককে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে পাকা ঘর, দুই শতক জমি, গবাদিপশুসহ নগদ অর্থ প্রদান করেছেন। এ দৃষ্টান্ত বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুকন্যার মতো বিশ্বের অন্য কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এত বিপুল সংখ্যক সহায়-সম্বলহীন নাগরিককে বিনামূল্যে ঘর, জমি ও অর্থ প্রদান করে পুনর্বাসিত করার দুঃসাহস দেখাতে পারেননি। তাছাড়া, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় ১২ লাখ অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে অনন্য মানবতাবাদি দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় বিশ্ববাসী শেখ হাসিনাকে বিশ্ববিবেক বা মাদার অব হিউম্যানিটি উপাধিতে ভূষিত করেছে।

পিতামাতা, আদরের ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামাল ও তার নবপরিণীতা স্ত্রী জাতীয় অ্যাথলেট সুলতানা কামাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী জামাল এবং প্রাণপ্রাচুর্যের অমিত সম্ভাবনার দেবশিশু শেখ রাসেলসহ নিকট আত্মীয় পরিজন সবাইকে হারিয়ে সর্বহারা শেখ হাসিনা একমাত্র সহোদরা শেখ রেহানাকে নিয়ে তার সংগ্রামী জীবনে অজস্র প্রতিকূলতার শ্বাপদসঙ্কুল পথ অতিক্রম করে পিতার স্বপ্নকে আজ বাস্তবে পরিণত করে চলেছেন । স্বপ্নজয়ের এ অদম্য যাত্রায় এক অবিনাশী ধ্রুবতারা হিসেবে তিনি আলোকিত করে চলেছেন বাংলার প্রতিটি ঘরকে। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যাকারী একাত্তরের পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও সামরিক স্বৈরাচারের দীর্ঘ দুর্বৃত্তায়িত দুঃশাসনে আপাদমস্তক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়া দুর্ভাগা পিতৃহীন এতিম জাতির ঘুরে দাঁড়ানো ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবার লক্ষ্য নিয়ে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে বাংলাদেশ আজ শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। গহীন পাহাড়ি আরণ্যক জনপদ থেকে শুরু করে সুদূরের বালুকাময় দ্বীপেও বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেয়ার নেপথ্য কারিগর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতার এ বৈপ্লবিক অর্জনের সুফল ভোগ করবে এ দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

প্রসঙ্গক্রমে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করে উল্লেখ করেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নতি, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নতির মতো বিষয়গুলো এ দেশের মানুষের সামনে নতুন নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে।’

বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজ সচেতনভাবে এ রাষ্ট্রের সামগ্রিক ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে বিচারবুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন যে, সত্যিকার অর্থেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের প্রত্যেকটি সেক্টরে ইতিবাচক পরিবর্তন ও অর্জনের অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে গেছে। মহাকাশে লালসবুজের পতাকা, পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, গভীর সমুদ্রবন্দর, বাংলাদেশে প্রাইভেটকার উৎপাদন, দেশব্যাপী ইপিজেড স্থাপন, প্রতিটি বিভাগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহুমুখী উন্নয়নযজ্ঞ– সবই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একেকটি বিপ্লবের সমান।

শেখ হাসিনা পরিবারের সবাইকে হারানোর মর্মবেদনার পাথরবিদ্ধ হৃদয় নিয়ে বাংলার মাটিতে ফিরে এসেছিলেন। বাংলা মায়ের অদম্য সাহসী সন্তান শেখ হাসিনা সামরিক স্বৈরাচারের বন্দুকের নলকে পদদলিত করে মা, মাটি ও কোটি মানুষের মলিনমুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে, পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় শপথ নিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তারিখে মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন। বাংলার কোটি মানুষ অকৃত্রিম অনুরাগে আবাহন করে নেয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারকে।

বাংলার আপামর মানুষ যখন সার্বিকভাবে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, তখন গণমানুষের অধিকার আদায়ের মুখপাত্র হিসেবে রাজপথে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হন শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই শেখ হাসিনা যে অভূতপূর্ব অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে সম্মানিত করেন, নিঃসন্দেহে তা দেশ ও জাতির জন্য গৌরবের। বাংলাদেশকে এক সময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কটাক্ষ করা বিশ্বমোড়ল রাষ্ট্রগুলোও বাংলার অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অর্জনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমনকি বাঙালির জন্মশত্রু পাকিস্তানের সাংসদরাও তাদের সংসদে মিনতি করে বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমাদের বাংলাদেশের মতো বানিয়ে দাও।’

সম্প্রতি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পূর্ণ অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে ' ক্রাউন জুয়েল’ (মুকুটের মণি) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এই অধিবেশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ জেফ্রি ডেভিড স্যাকস শেখ হাসিনাকে উল্লেখ করে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সঙ্গে একসাথে হতে পেরে আমরা আনন্দে উদ্বেলিত। আমরা আপনার কথা শুনতে চাই, বিশেষ করে এই জন্য যে, আমরা যখন পৃথিবীর দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের অগ্রগতি বিশ্লেষণ করি যা প্রতি বছর জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্ক করে থাকে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রগতিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে। তাই আমরা সেই অর্জনের জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই।’

শেখ হাসিনার জীবন সংগ্রামকে বিবেকবোধ দ্বারা বিচার করলে উপলব্ধি করা যায় যে তিনি কেমন করে বেঁচে আছেন। তিনি কী কারণে শত সহস্র গ্রেনেড বিছানো পথে হেঁটে রাজনীতি করে চলেছেন। পিতা-মাতা আত্মীয়-পরিজন সবাইকে হারিয়ে এমন কী আছে যা পাওয়ার আশায় সামরিক সন্ত্রাসের বুলেট উপেক্ষা করে তিনি প্রবাস থেকে পিতার এনে দেওয়া বাংলাদেশে আর বাংলার গণমানুষের কাছে ফিরে এসেছেন। তিনি কি নিজের প্রয়োজনে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন? শেখ হাসিনার মতো একজন সর্বস্ব হারানো মানুষের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কীই বা থাকতে পারে! কবিগুরুর ভাষায় তাই শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলতে হয়:

‘তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী,

আমি অবাক হয়ে শুনি,

কেবল শুনি।

সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে

সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে

পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে

বহিয়া যায় সুরের সুরধ্বনী

তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী।’

প্রসঙ্গক্রমে, ধরুন আপনার-আমার একমাত্র অবলম্বন পিতা-মাতা ভাই ও নিকট আত্মীয়দেরকে কোনো এক দেশে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ঘাতকগোষ্ঠী সে দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছে। এ অবস্থায় কি আপনি আমি বা যে কেউ সেই দেশটিতে ফিরে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারব? আবার সেখানে সক্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নেয়া ও নেতৃত্ব দেয়ার মতো হিম্মত কি সকলের আছে? এদিকে শুধু গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যাওয়ার ভয়ে গত ১৬ বছর ধরে লন্ডনে পলাতক রয়েছেন এতিমদের অর্থ আত্মসাৎ, জানমালে অগ্নিসংযোগ ও একাধিক দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল হোতা পলাতক আসামী তারেক রহমান! অথচ বাংলাদেশে তার গর্ভধারিনী মা ও জনগণ রয়েছে। জননী জন্মভূমির কিংবা দেশের নেতাকর্মী জনগণের জন্য ন্যূনতম ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা অনুভব করলে তিনি কি এতদিনে সব ঝুঁকি মোকাবিলা করে দেশে ফিরে আসতেন না? বাংলাদেশের জনগণ অবশ্য বহুকাল আগেই বুঝে গিয়েছে যে বিএনপি এ বাংলাদেশ ও এ দেশের জনগণের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতার জন্য রাজনীতি করে না। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে খুন করে ১৯৭৮ সালে সামরিক সন্ত্রাসের ছত্রছায়ায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া বিএনপি নামক দলটি সৃষ্টি হয়েছিল বাঙালি জাতির উপর ১৯৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে। স্বাধীন এ জাতিকে শাসন ও শোষণ করার হীন পায়তারা বাস্তবায়নই যে বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তা ইতিহাস সচেতন শিক্ষিত তরুণ সমাজ অনেক আগেই বুঝতে পেরেছেন।

উল্লেখ্য, ১৯৭৫ এর ভয়াল নৃশংস ১৫ আগস্ট পরবর্তী জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে শেখ হাসিনা তার লেখা ‘বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম’ বইতে বলেন, ‘’৭৫ এর ১৫ আগস্ট আমার সব স্বজন, সব আপন, সব বন্ধনই যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। আমি আর আমার ছোটবোন রেহানা তখন জার্মানিতে। সে সময় সেখানে ছিল আমার স্বামীর কর্মস্থল। সেই প্রবাসে বসেই সংবাদ পেলাম দীর্ঘ তিন দশকের (৩০ বছর) বাঙালি প্রতিবাদের সোচ্চার কণ্ঠস্বর বঙ্গবন্ধু, আমার বাবা শেখ মুজিব নেই! নেই আমার তিন ভাই, নব পরিণীতা দুটি বধূ, আমার স্নেহময়ী মা, আর পরিবারের অন্য স্বজনরা! নেই কর্নেল জামিল! এ শোকের বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রিয় পাঠক, আমার এ দৈন্য ক্ষমা করুন।’

আধুনিক বাংলাদেশ ও আধুনিক বাঙালি জাতির সার্বিক অগ্রযাত্রার অদম্য শক্তির আধার বঙ্গবন্ধুকন্যা কোটি বাঙালির প্রাণের নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের মধুমতী নদী বিধৌত টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে বাঙালি জাতির প্রাণের নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার ৭৬তম জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর সার্বিক সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে জানাই প্রাণসিক্ত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সংগ্রামী অভ্যর্থনা।

মহান পিতার মহান কন্যা

প্রাণের নেত্রী শেখ হাসিনা,

দিন বদলের নেত্রী তুমি

বাংলা মায়ের শেষ ঠিকানা।

লেখক: ইয়াসির আরাফাত-তূর্য, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য

মতামত
Piyush Banerjee is a fellow traveler of Durdin

দুর্দিনের সহযাত্রী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

দুর্দিনের সহযাত্রী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় পলাশী থেকে ধানমন্ডি নাটকের দৃশ্যে পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বঙ্গবন্ধুকে এখন প্রতিদিন দেখে মানুষ। প্রতিক্ষণ তার কণ্ঠ শোনেন। কিন্তু ওই সময়টাতে হামলা-মামলা উপেক্ষা করে প্রমিথিউস মুজিবকে জনতার অন্তর্গহীনে দাঁড় করানোটা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং।

মঞ্চজুড়ে হালকা আলো; সাদামাটা কক্ষে পায়চারি করছেন শেখ মুজিব। দীপ্তিময় প্রক্ষেপণ তার অবয়ব ছাড়িয়েছে। তাতে অনাড়ম্বর পাঞ্জাবির গোটানো হাতা সবিশেষ সাদাসিধে; পায়ের চটি জোড়া স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল।

মুজিব হাঁটছেন মেঝের এ প্রান্ত হতে সে প্রান্তে। অতপর দাঁড়ালেন মাঝ বরাবর। চুরুটের ধোঁয়ায় হালকা আচ্ছন্ন। সব নৈর্বক্তিকতা ছাপিয়ে হাজারো দর্শকের জোড়াচোখ আরেকবার দেখলো এ দেশের মানচিত্র কিংবা তার বিশাল বুক। আকস্মাৎ ঘরে ঢুকলেন তাজউদ্দিন।

মুজিব আড়মোড় ভেঙে বলে উঠলেন- ‘তাজউদ্দিন, এ্যাতো ফরমালিটি করো ক্যান? তুমি হলে গিয়ে বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। আমার ঘরে যহন কেউ থাকবে না, হানিপকে জিজ্ঞাসা করবা- ভিতোরে ঢুকে পড়বা। আর এটা তো গণভবন না, এটা তো বত্রিশ নম্বর বাড়ি, নাকি!’

-আপনি এখন দেশের প্রেসিডেন্ট। আমি অর্ডিনারি সিটিজেন। পার্থক্যটুকু আমাদের থাকতেই হবে।

-তাজউদ্দিন, আমি তোমার কাছে মুজিব ভাই হয়েই থাকতে চাই।

স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন শেখ মুজিব। দরাজ কণ্ঠের অনুরণন ছড়িয়ে পড়লো অডিটরিয়ামের দেয়ালে দেয়ালে।

ততোক্ষণে অজস্র করতালি। জয় বাংলা ধ্বনিতে আরেকবার কম্পিত হলো লন্ডনের লোগান হল। অতপর দু ঘন্টা ধরে চলা নাটকের বাঁকে বাঁকে তৈরি হলো ক্লাইমেক্স। অন্তঃচাপের নিস্তবন্ধতা ভেঙে বাঙালি আবারও জেগে উঠল। কেউ কেউ বললেন, জয় বঙ্গবন্ধু।

বলছিলাম ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন আবহ। সময়টা ২০০৪ সালের মার্চ। শীতের সুবায়ু কিছুটা থাকলেও মানসিক প্রদাহ ছিল মনে-মননে। বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসন তখন চলমান। তমসাঘন সময়ে নাটক দূরে থাক বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণেও ঝুঁকি ছিল। জীবন মুঠোয় রেখে ‘প্রোটাগনিস্ট ক্যারেকটার’ করেছিলেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি একাধারে নাট্যজন, লেখক ও সাংবাদিক। ক্রান্তিকালে শেখ মুজিবের ভূমিকায় অভিনয় করাটা ছিল তার জীবনের আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ অধ্যায়। ২৩ সেপ্টেম্বর কিংবদন্তি পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন। আজকের দিনে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন বয়স ৭২। তার জন্য শতায়ু প্রার্থনা।

শ্যাম বেনেগাল থেকে শুরু করে কেউ কেউ জাতির জনককে মহিমান্বিত করতে সগৌরবে কাজ করছেন। কিন্তু এও সত্য যে, বহুমাত্রিক লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীর ডাকে ২০০৩-২০০৪ সালে কেউ সাড়া দেননি। লন্ডন-আমেরিকায় গিয়ে মঞ্চ নাটক করবেন, সিরাজ-উদ্দৌল্লার মতো করুণ মৃত্যুদশা তুলে ধরবেন-এ ছিল এক শূন্য কল্পনা।

‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ ডকু-ড্রামার নেপথ্যের কাহিনী জানতে চাইলে নাট্যজন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফরের দল যা করেছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরেও তার সবিশেষ মিল পেয়েছিলেন বোদ্ধা সাংবাদিক গাফফার চৌধুরী। কাহিনীটিকে মঞ্চনাটকে রূপ দিতে বেশ কজন লিজেন্ড অভিনেতার সঙ্গে কথাও বলেন। কিন্তু কেউ রাজি হননি শেখ মুজিবের চরিত্রে অভিনয় করতে। বহু খোঁজাখুঁজির পর পীযূষ ব্যানার্জীকে পেয়েছিলেন। প্রস্তাব দিলে অতপর পীযূষও রাজি হয়ে যান।

অবশ্য এর একটা বিশেষ সুবিধা খুঁজে পেয়েছিলেন নাট্যকার গাফফার চৌধুরী। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ফরিদপুরে। কৈশোরে বেড়ে ওঠা গোপালগঞ্জে। কথাবার্তায় বঙ্গবন্ধুর যে বিশিষ্টতা তার পুরোটাই ছিল পীযূষের মধ্যে। আঞ্চলিকতার মিষ্টি ভাব, ভাষার সারল্যপনা ও অহমবোধ ঠিক রাখতেই ওই এলাকার একজনকে খুঁজছিলেন গাফফার চৌধুরী।

কথায় কথায় পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ২০০১ সালের পর থেকে দেশব্যাপী যে বর্বরতা চালিয়েছিল জোট সরকার তাতে ভয় পেয়েছিল বহু মানুষ। কিন্তু পরবাসী গাফফার চৌধুরী লন্ডনে থেকে দমে যাননি। ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ নাটকটি মঞ্চোপযোগী করতে জাতির জনকের ছোট মেয়ে শেখ রেহানার সঙ্গেও আলোচনা করেছেন। উপদেশ পেয়েছেন বড় মেয়ে শেখ হাসিনার কাছ থেকেও। কিন্তু দিন-ক্ষণ এগিয়ে আসতেই সব তালগোল পাকিয়ে যায়। যারাই কথা দিয়েছিল তারা আর অভিনয় করতে চাইছিলেন না। সেই অবেলায় হাসান ইমাম, লায়লা হাসান, প্রফেসর রতন সিদ্দিকীসহ আরও কজনের সার্বিক সহযোগিতা ছিল উল্লেখ করার মতো। উদীচী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেউ কেউ এগিয়ে এসেছিল রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। বাংলাদেশ থেকে কোনো নাট্যকর্মী যাতে লন্ডনে যেতে না পারেন বিভিন্ন সংস্থা সেব্যাপারে সজাগ ছিল। প্রচণ্ড মানসিক চাপ উপেক্ষা করে শেষতক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় পাড়ি জমান লন্ডনে। শুরু করলেন রিহার্সাল।

শেখ মুজিবের চরিত্রে অভিনয় করবেন-দিনরাত তাই মুজিবের খুঁটিনাটি সংগ্রহ করতেই ব্যস্ত থাকা। দিনের পর দিন নিউ মার্কেট খুঁজে উদ্ধার করতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর মোচ। কেমন সেন্ডেল পড়তেন, চুল আঁচড়াতেন কিভাবে, পানজাবির হাতা কেমন করে গোটাতেন আর কেমন করেই বা চুরুট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তেন-সবই রপ্ত করতে হয়েছিল পীযূষকে।

পূর্ব লন্ডনের একটি বাড়িতে রিহার্সাল হতো। ইউরোপের আরও কটি দেশ থেকে কুশীলবেরা এসেছিল। যাদের কেউ কেউ একেবারে নবীন। অভিনয় সম্পর্কে তেমন ধারণাও ছিল না। চেতনার বশে দুজন ছুটে এসেছিল নিউ ইয়র্ক থেকে। মানিক ও মাহবুবুলের অবদান এখনো মনে ধরে পীযূষের। অর্থাৎ একদিকে জোট সরকারের চলমান বর্বরতা অপরদিকে সঙ্গোপনে গণনাটকের প্রস্তুতি। শম্ভ মিত্র, উৎপল দত্ত, বিজন ভট্টাচার্যদের আদলে রাস্তার মোড়, গঞ্জের ভিড় কিংবা অপেরা হাউজের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিল জাতির জনকের আত্মত্যাগ। ইতিহাস বিকৃতির বিপরীতে ইউরোপবাসীকে জানাতে চেয়েছিল নানামুখী ডামাডোলের কারণে ‘প্রমিথিউস’ মুজিবের নাম কেনো ভুলতে বসেছিল বাঙালি। এমনকি শেখ সাহেবকে যাতে ভুলতে বাধ্য হয় তার জন্য প্রকল্পও নেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রিয়ভাবে।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় সাক্ষাতকার দেন। অকপটে বলে যান ওই সময়ের ঘনঘটা। নানান ধরনের ডকুমেন্ট ঘেঁটে আবদুল গাফফার চৌধুরী নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, জিয়াউর রহমানই শেখ মুজিবের খুনি। ইতিহাসের ছাত্র গাফফার চৌধুরী সে সময় বহু ধরনের চোথা ঘেঁটে আবিষ্কার করেছিলেন মুজিব সম্পর্কে অজানা সব তথ্য।

নাটকটি বাংলাদেশে মঞ্চস্থ করা একেবারেই অসম্ভব ছিল। লন্ডন পুলিশের অনুমতি মিললেও বাঙালি প্রতিপক্ষদের ব্যারিকেড ছিল। চেষ্টা হয়েছিল হামলা করে লন্ডভন্ড করার। লন্ডন থেকে বাংলাদেশে নাটকটির স্ক্রিপ্ট এসেছিল যারপরনাই সঙ্গোপনে। বঙ্গবন্ধুর মেয়েদের তত্ত্বাবধান না হলে প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্থ হতো-বলেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে- পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় নিবিড়ভাবে ব্যাপারটি বিশ্বাস করেন। মানুষের আস্থা ও চেতনা ফেরাতে ২০০৫ সালে ডকু ড্রামাটির ভিডিয়ো ধারণ হয়েছিল। তাও বেশ গোপনে। কলকাতার একটি স্টুডিওতে চলে শ্যুটিং। মঞ্চের যারা কুশীলব ছিল তারা বিভিন্ন দেশ থেকে কলকাতায় জড়ো হয়েছিল। স্বাধীন দেশে চেতনামুক্তির কাজ তারা ছিল বদ্ধপরিকর। চলতেন গেরিলা কায়দায়, ফোনে কথাও বলতো ইঙ্গিতে। এরপরও বাড়ে ঝুঁকি, আসে আঘাত। পুলিশ হেফাজতে চলাচল করতে হয় পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

জীবনের ৭২ টি শীত-বসন্ত পেরুনো নাট্যজন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরেকটি স্মৃতি বিশেষ মনে পড়ে। ২০০৫ সালের কোনো এক সন্ধ্যায় ব্রুকলিনে অভিনীত হয়েছিল ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি।’ হলভর্তি দর্শক সেদিন অনেক। একেকটি ডায়ালগ শেষ হতেই মুহুর্মূহু করতালি আর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান। মঞ্চে সেদিন আলোর প্রক্ষেপণও ছিল ব্যাকরণ মেনে। সবমিলে শো শেষ হবার পর এক বৃদ্ধা এসেছিলেন গ্রিণ রুমে মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে। হাতটা ধরে করুণভাবে বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে দেখিনি। তোমাকে দেখে মনটা ভরে গেলো।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে হয়েছিল অভিনয়জীবনটা সার্থক হলো আজ। একই সময়ে এ্যাস্টোরিয়াতে ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’র শো হয়েছিল। সেখানেও হলভর্তি দর্শক ছিল কিন্তু ব্রকলিনের ঘটনা আজও ভুলতে পারেন না। । নিউ ইয়র্কের মঞ্চায়ন এতোটাই গোছানো ছিল যে, অন্য স্টেটের বাঙালিরা একের পর এক আমন্ত্রণ জানাতে থাকে। যেমন করে আগের দিনে যাত্রাদলের বায়না হতো।

অতপর বিভিন্ন দেশ থেকে ডাক আসে। কিন্তু এতোবড় লটবহর নিয়ে দেশে দেশে মঞ্চায়ন করাটা ছিল সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। কর্মজীবীদের একসঙ্গে হওয়াটাও ছিল আরেক চ্যালেঞ্জ। পরে সিদ্ধান্ত হয়-এভাবে মঞ্চায়ন নয়, ভিডিওতে রূপ দিয়ে সিডি পাঠাতে হবে দেশে দেশে। শেষতক তাই হলো। ২০০৬ সালে কলকাতায় শেষ হয় দৃশ্যধারণের কাজ। ইউটিউবের কল্যাণে ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ ডকু ড্রামা এখন সবাই দেখতে পান।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বঙ্গবন্ধুকে এখন প্রতিদিন দেখে মানুষ। প্রতিক্ষণ তার কণ্ঠ শোনেন। কিন্তু ওই সময়টাতে হামলা-মামলা উপেক্ষা করে প্রমিথিউস মুজিবকে জনতার অন্তর্গহীনে দাঁড় করানোটা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং।

- এখন কমার্শিয়াল ভেঞ্চার থেকে সিনেমা হচ্ছে জাতির জনককে নিয়ে। পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশা, এসব কাহিনী সবার মনে দাগ কাটবে। কিন্তু ২০০৪ সালে গাফফার চৌধুরীর প্রয়াসটি যেমন ধ্রপদী তেমনি সন্ধ্যাদ্বীপের মতো জাজ্বল্যমান।

-যে কথা না বললেই নয়-বলেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়।

গাফফার চৌধুরী যখন রিস্কটা নিতে বলেছিলেন তখন থেকেই ঘুমের আগে-পরে কল্পনাতে শুধুই ছিলেন বঙ্গবন্ধু। জীবদ্দশায় বহুবার সামনে থেকে কিংবদন্তিকে দেখলেও তার জীবনভূমিকায় অভিনয় করা ছিল সর্বোপরি দুঃসাহসিক। তার মধ্যে ডুব না দিলে কিংবা অস্তস্থলে লীন না হলে মুজিবের ঢেউ দোলা দিবে না। সুতরাং উদ্বিগ্ন সময়ে বসবাস করে আরেকটি স্রোতকে প্রোজ্জ্বল করে তোলাই ছিল সেদিনের পরম দায়িত্ব।

পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্ষেপ, বহুজন এখনো শেখ মুজিবকে বুঝতে চায় না। আন্তরিক দীনতা থেকেই তার চেতনাকে আঘাত হানে বারংবার। কখনো শারীরিকভাবে, কখনো সোশ্যাল মিডিয়াতে কিংবা অযথাই হেয় করে মানসিকভাবে প্রতিশোধ নিতে চায় বিপরীত স্রোতের মানুষগুলো।
খুব জোর দিয়ে বলেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্গবন্ধুর কন্যারা আছেন বলেই নির্ভয়ে থাকি। ঘুমাই নিশ্চিন্তে।


(লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, একুশে টেলিভিশন। Email: [email protected])

আরও পড়ুন:
অন্ধ সাম্প্রদায়িকতা: জেগে ওঠো বাংলাদেশ
কুঁড়িতেই ঝরে যাওয়া মুকুল
রাসেল আমাদের অস্তিত্বের অনুভূতি

মন্তব্য

মতামত
Cooperation between the two countries is essential to overcome the economic crisis

অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে দুই দেশের সহযোগিতা জরুরি

অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে দুই দেশের সহযোগিতা জরুরি
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সত্ত্বেও বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, যদিও এ দেশ দুটির অর্থনীতি এ অঞ্চলের অন্য প্রতিবেশীদের চেয়ে অনেকটাই স্থিতিশীল।

২ দশমিক ৯৪ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপির ভারত বিশ্বের পঞ্চম অর্থনীতির দেশ। ভারতের মোট বাণিজ্যের ১ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয় দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সঙ্গে। নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জন্মলগ্ন থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান বাংলাদেশ সব সময়ই কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে থাকে। দুই দেশের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক সম্পর্ক সব সময়ই পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তিতে আবর্তিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সর্ববৃহৎ সীমান্ত হওয়ায় ট্রানজিট, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনেতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ভারত বাংলাদেশের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল।

করোনা মহামারির ফলে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি এক কঠিন সংকট মোকাবিলা করেছে। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি আবারও খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে। এর মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান গভীর সংকটে পতিত হয়েছে। মালদ্বীপ, ভুটান ও নেপালের অর্থনীতিও আক্রান্ত। রিজার্ভ সংকট ও মূল্যস্ফীতির ফলে এসব দেশে নাগরিকদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সত্ত্বেও বৈশ্বিক সংকটের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, যদিও এ দেশ দুটির অর্থনীতি এ অঞ্চলের অন্য প্রতিবেশীদের চেয়ে অনেকটাই স্থিতিশীল।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিরতা

ইউক্রেন যুদ্ধ ভারতসহ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারত ও বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে আকাশছোঁয়া। দুই দেশেরই আমদানি ও রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের অর্ডারের পরিমাণ কমেছে। তবে প্রতিবেশী দেশ দুটির অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের কারণে অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েনি। বিপরীতে শ্রীলঙ্কা-মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর অর্থনীতি পর্যটন খাতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় মহামারি ও যুদ্ধের ধাক্কায় সেখানকার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্য প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনের সঙ্গে আবর্তিত হয়ে থাকে। রাশিয়ার সাথে আমদানি-রপ্তানি বিঘ্নিত হওয়ায় এসব দেশের অর্থনীতিতেও মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। ফলে এসব দেশ দক্ষিণ এশিয়া থেকেও আমদানি কমিয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার রপ্তানি হ্রাসের মূল কারণ।

বর্ধিত জনসংখ্যা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ধীরগতির অন্যতম কারণ। সেই সাথে মহামারি ও যুদ্ধে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ফলে মাথাপিছু আয় কমে আসবে, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরবে। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বাণিজ্যিক অবরোধের ধাক্কায় এ অঞ্চলের আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে, যা কতদিনে শেষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

যুদ্ধের ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনগোষ্ঠী বিদেশের শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল। নেপালের জিডিপির ২৭ শতাংশ আসে রেমিট্যান্স থেকে। ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী দেশ। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি কমতে থাকায় এসব দেশ থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। মহামারির কারণে ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সালে দক্ষিণ এশিয়ার বৈদেশিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১৪০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার গ্রামাঞ্চলগুলো মূলত কৃষিভিত্তিক। মহামারিকালীন কৃষিপণ্যের পরিবহন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি ও এ খাতের ওপর নির্ভরশীল বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। মহামারির ধাক্কায় অনানুষ্ঠানিক খাতও বিপর্যস্ত হয়েছে। সরকার এ খাতের উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ নিলেও প্রায় সময়ই এর সমস্যাগুলো উন্নয়ন কার্যক্রমের আড়ালে থেকে যায়। তেলের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত না হলে অনানুষ্ঠানিক খাত মুখ থুবড়ে পড়বে।

মহামারি খাদ্য পরিবহন ও সাপ্লাই চেইনকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করেছে। পর্যাপ্ত উৎপাদন সত্ত্বেও তা ভোক্তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। আন্তঃসীমান্ত পরিবহন বন্ধ থাকায় ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা সীমিত করায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিঘ্নিত হয় এবং একই সঙ্গে স্থানীয় ফুড মার্কেটও স্থবির হয়ে যায়। এ ছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বের অন্যতম খাদ্য রপ্তানিকারক দুটি দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে খাদ্য রপ্তানি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায়ও সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে। পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। খাদ্যসংকট এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে মূল্যস্ফীতির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেনের উদ্বাস্তু শরণার্থীদের প্রতি পশ্চিমের মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশে বসবাসরত বিশ্বের সর্ববৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর ওপর থেকে মিডিয়ার মনোযোগও সরে গেছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার উদ্ভূত অর্থনৈতিক সংকট থেকে বাঁচতে সেখানকার একটি জনগোষ্ঠীর ভারতে আশ্রয় নেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেরই আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

প্রয়োজন দুই দেশের সহযোগিতা

বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি সহযোগিতাসহ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ সেপ্টেম্বর থেকে দিল্লি সফরে আছেন। এর আগে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যোগদানের উদ্দেশে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সফর করেন। সে সময় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি ও সংযোগ বৃদ্ধির ব্যাপারে আলোচনা করেন। চলমান সংকটের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান সফরের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে তা দেশ দুটির অর্থনীতির গতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। তারপরও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ১০ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার, যদিও এ হিসাব করা হয়েছে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, আন্ডার ইনভয়েসিং, বাংলাদেশ থেকে ভারতের রেমিট্যান্স এবং ভারতে বাংলাদেশের মেডিক্যাল ও পর্যটনের হিসাবকে বাইরে রেখে। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে দুই দেশকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পণ্য পরিবহনে বিভিন্ন জটিলতা রোধে কাস্টমসের প্রক্রিয়াগুলো আরও সহজ করতে হবে। পণ্য পরিবহন সহজ করতে বন্দরের অবকাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা বাড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের প্রথম দিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককালে ভারত কোনো জরুরি পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করলে তা আগে থেকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এতে বাংলাদেশ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এশিয়া প্যাসিফিক দেশগুলোর মধ্যে কৃষি গবেষণা ও শিক্ষায় সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। মার্চ মাসে জি-৭ সম্মেলনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তা মিশন ঘোষণা করেন, যেখানে তিনি আফ্রিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্য সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করার কথা বলেন। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার সাফল্য উন্নত দেশগুলোকে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে উদ্বুদ্ধ করছে। বাংলাদেশের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের অন্যতম ক্রেতা দেশ ভারত। ভারতের সাথে আমদানি ও রপ্তানির নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশের কৃষি খাত লাভবান হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে কুশিয়ারা নদীর ১৫৩ কিউসেক পানি উত্তোলনের ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। এ পানি উত্তোলন করতে পারলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৫ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে।

নদী শুকিয়ে যাওয়ায় শীতকালে নেপাল ও ভুটান দুই প্রতিবেশী দেশ মারাত্মক বিদ্যুৎ সংকটে পড়ে। ভুটানের সাথে জলবিদ্যুৎ সহযোগিতার চুক্তির জন্য বাংলাদেশ ভারতের সমর্থন প্রত্যাশী। আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ রপ্তানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সাথে বাংলাদেশের সমঝোতা স্মারক রয়েছে। নেপাল ও ভুটানের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংযোগ তৈরির জন্য ভারতের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট নিতে হবে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটানের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে বিদ্যুতের বাজার বিস্তৃত করা সম্ভব, যা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার সহযোগিতার সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে। প্রধানমন্ত্রী ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতের সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠককালে আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

ফলপ্রসূ সহযোগিতা বৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হলো সংযোগ বৃদ্ধি। ট্রানজিট বৃদ্ধির মাধ্যমে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলের মধ্যে টেকসই ও কার্যকরভাবে পণ্যের বিনিময় করা সম্ভব। ২০১৬ সাল থেকে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহন সহজ করার জন্য অত্যন্ত কম ট্রানজিট ফিতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি মোংলা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশ থেকে ট্রানজিট সুবিধা পেলেও ভুটান ও নেপালের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সহজ করার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না ভারত। ট্রানজিট বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দুই দেশেরই বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করবে।

সড়ক, রেলপথ ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ভারত বাংলাদেশকে সম্প্রতি ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে বাংলাদেশ ভারত থেকে ঋণ সহযোগিতা পেয়েছে, যার মধ্যে আছে আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ সংস্কার ও ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন প্রকল্প। বাণিজ্য ও সংযোগ বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাবিত ভারত-বাংলাদেশ সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) সইয়ের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পাবে। সীমান্ত হাট বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি শুল্ক মওকুফ, পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নতি প্রভৃতি সেপার অন্যতম লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে সেপা চুক্তি সই হবে তার অন্যতম সফলতা।

বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক সহযোগিতা দুই দেশের জন্যই ‘উইন উইন সিচুয়েশন’ তৈরি করবে। দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও খাদ্য সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উভয়ের অর্থনীতিই লাভবান হবে, যা এ অঞ্চলের অন্য অর্থনীতিগুলো থেকে বাংলাদেশ ও ভারতকে ব্যতিক্রমী করে তুলবে।

নিশাত তাসনীম: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষক।

আরও পড়ুন:
পানি না দিলে ইলিশও দেব না, হাসতে হাসতে বললেন শেখ হাসিনা
আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা বজায়ে একমত হাসিনা-মোদি
ভারত বন্ধুরাষ্ট্র, আলোচনা ফলপ্রসূ হবে: প্রধানমন্ত্রী
মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে শেখ হাসিনার শ্রদ্ধা
বৈঠকে শেখ হাসিনা-মোদি

মন্তব্য

মতামত
Prime Ministers visit to India Issues to focus on

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর: মনোযোগ পেতে পারে যেসব ইস্যু

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর: মনোযোগ পেতে পারে যেসব ইস্যু ফাইল ছবি
আশা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও উষ্ণ করবে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করবে। সেই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের কিছু অমীমাংসিত ইস্যু এই সফরে বাড়তি মনোযোগ পেতে পারে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে।

বাংলাদেশ ও ভারত ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, জাতীয় সংগীত এবং অন্য অনেক সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ। প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে পারস্পরিক বোঝাপড়ার দৃঢ়তা এবং বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে, যা গড়ে উঠেছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্যাগ ও সদিচ্ছার আলোকে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই দুই দেশের মধ্যে বহুমাত্রিক সম্পর্ক শুধু রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বিস্তৃত হয়েছে কৌশলগত ক্ষেত্রেও।

বাংলাদেশের বন্ধুভাবাপন্ন এই দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ সেপ্টেম্বর চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন। সর্বশেষ ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করেছিলেন। ৫ থেকে ৮ সেপ্টেম্বরের এই সরকারি সফরে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।

আশা করা হচ্ছে, এই সফর দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও উষ্ণ করবে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করবে। সেই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের কিছু অমীমাংসিত ইস্যু এই সফরে বাড়তি মনোযোগ পেতে পারে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে।

এবারের সফরে বাংলাদেশ চাইছে দুই দেশের মধ্যে যে সর্বোচ্চ সম্পর্ক, তা আরও একবার প্রমাণ করতে। বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, এমন যে মনোভাব ভারতের তৈরি হয়েছে তা দূর করতে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে এক ডজনের ওপর চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি প্রস্তুতিমূলক বৈঠক যতগুলো করা সম্ভব, সেগুলো আগস্ট মাসেই হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ও ভারত স্থলসীমানা, সামুদ্রিক বিরোধসহ অনেক বড় সমস্যা সমাধান করেছে এবং দুই দেশের সম্পর্ক ২০ বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিপক্ব।

প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে গঙ্গা চুক্তির ২৬ বছর পর কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর (এমওইউ) হতে যাচ্ছে। সমঝোতা অনুযায়ী বাংলাদেশ ভারত থেকে কুশিয়ারা নদীর ১৫৩ কিউসেক পানি পাওয়ার আশা করছে।

এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বিষয়ক দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু সুরাহা হওয়ার সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে কুশিয়ারা স্মারক সই হওয়ার পাশাপাশি তিস্তার বিষয়ে একটি সমাধান আসতে পারে।

তিস্তা চুক্তির বিষয়ে এখন পর্যন্ত একমাত্র বাধা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। খোঁজা হচ্ছে রাজনৈতিক সমাধানও। শেখ হাসিনার আসন্ন সফরে এ বিষয়ে একটি ফল পেতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য সব সময়ই উদ্বেগের। সে জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের যেকোনো পর্যায়ের আলোচনায় সীমান্ত হত্যা এবং শান্তিপূর্ণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা অন্যতম ইস্যু। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্ত হত্যা কমে এসেছে। এবারের আলোচনায়ও সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা পুরোপুরি বন্ধের বিষয়ে বাংলাদেশ জোর দেবে। মানব, মাদক ও সব ধরনের চোরাচালান বন্ধে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গ আলোচনায় আসতে পারে।

এবার সফরের অর্থনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সমন্বিত বাণিজ্য চুক্তি ‘সেপা’ (কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট)। এই চুক্তি হলে ভারত ও বাংলাদেশের পণ্য দুই দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে এই চুক্তি অনুমোদন করেছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশ অ্যান্টি-ডাম্পিং নীতি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক নবায়ন হতে পারে। জ্বালানি নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা চাওয়াসহ এ সফরে প্রায় ১০ থেকে ১২টি চুক্তি ও সমঝোতা হতে পারে। এই সফর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সহযোগিতামূলক কাঠামোর মধ্যে কিছু সমস্যা সমাধান করা প্রয়োজন। প্রথমত, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সীমান্ত হত্যা এবং সীমান্তজুড়ে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের ইস্যুটি দুই দেশের মধ্যে বিবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই দশকে বিএসএফ ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। নিয়মবহির্ভূত এই হত্যাকাণ্ড এড়াতে যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত বৈঠক জোরদার করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, মিথ্যা খবর, গুজবের পাশাপাশি আর্থসামাজিক ইস্যুতে অপপ্রচারের দিকেও নজর দিতে হবে।

এর কারণ হলো সংখ্যালঘু নিপীড়ন সম্পর্কে গুজব তাদের সমকক্ষদের মধ্যে প্রায়ই সহিংসতা এবং নেতিবাচক অনুভূতি উসকে দেয়। অবশেষে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারতের কাছ থেকে আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করে। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে ভারতকে মিয়ানমারের ওপর তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা উচিত।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কথা মাথায় রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার জন্য বিকল্প উপায় দেখতে হবে। ভারত ও বাংলাদেশ বেশির ভাগ বিষয়ে কমবেশি একমত হয়েছে। এই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। তিস্তা নদী এবং রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো ভারতকে কূটনৈতিক উপায়ে সমাধানে চাপ প্রয়োগ করতে হবে যেন বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয়। বেআইনি ব্যবসা, পাচার এবং গবাদিপশুর চোরাচালান, বিশেষ করে মাদকদ্রব্যের ক্ষেত্রেও নজর রাখতে হবে। ভারত ও বাংলাদেশকে অবশ্যই সার্ক, বিমসটেক এবং বিবিআইএনের মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোতে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, সংযোগ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ, প্রতিরক্ষা এবং জনগণের মধ্যে আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বহুমুখী দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় কাজ করতে হবে।

লেখক: আকিব রহমান শান্ত

[email protected]

আরও পড়ুন:
‘পাকিস্তানিরাও শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চায়’
শেখ হাসিনার বহরে হামলা: এবার আইনজীবীকে হত্যার হুমকি
শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা: অস্ত্র ও বিস্ফোরক মামলার সাক্ষ্য শুরু
শেখ হাসিনার বহরে হামলা: অস্ত্র আইনে বিচার শুরু
১/১১-এর সরকার ও শেখ হাসিনার কারামুক্তি

মন্তব্য

মতামত
Prospects and future of Bangladesh India Integrated Economic Partnership Agreement

বাংলাদেশ-ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশ-ভারত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ
উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীল উন্নতি অর্জন করায় এখন দুটি দেশই সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে ভাবছে, যাকে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট বা সেপা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এ চুক্তির পর বাংলাদেশে ভারতের অবাধ বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হবে। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত হবে।

গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বিস্তৃত করার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর বাণিজ্যিক অংশীদার ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ধীরে ধীরে বেড়েছে। গত এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়ে তিন গুণ হয়েছে।

উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীল উন্নতি অর্জন করায় এখন দুটি দেশই সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে ভাবছে, যাকে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

এ চুক্তির পর বাংলাদেশে ভারতের অবাধ বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত হবে। ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত হবে। পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি সেবা রপ্তানির সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। ভারতের বিশাল বাজারে এই সুবিধা পেলে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে লাভবান হতে পারবে।

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সাল থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সেপা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বানিজ্য অঞ্চলের (সাফটা) মতো আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তির অকার্যকারিতার কারণেও এটি আলোচিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে সেপার সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য একটি যৌথ কমিশন গঠন করা হয়, যার কাজ ছিল ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রণয়ন করা।

এর মধ্যে ২০২১ সালের মার্চ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়ে দুই দেশই নিজেদের মধ্যকার বাণিজ্য বৃদ্ধির বিষয়ে সম্মত হয়। সে সময় যৌথ বিবৃতিতে ট্যারিফমুক্ত বাণিজ্যের প্রয়োজনীয়তা, বাণিজ্য সংক্রান্ত নীতি ও প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং বাংলাদেশ থেকে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফরের ব্যাপারগুলো উঠে আসে।

এই চুক্তিতে পণ্য, সেবা ও বিনিয়োগ— এই তিনটি দিক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ভারতে এখন শুধু পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। সেপার পর সেবা রপ্তানি উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে ব্যাংক ও বিমা সার্ভিসের পরিধি বাড়বে।

সেপার প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির লাগাম টানা এবং নতুন অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো উন্মোচন করা, যার মধ্যে আছে সংযোগ, নতুন বাজার, সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব। এ ছাড়া উপআঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বহুমুখী সংযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। এ চুক্তির ফলে অ্যান্টি ডাম্পিং ও রুলস অব অরিজিন শুল্ক বসিয়ে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ থাকবে না। ফলে দুই দেশই সেপার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে।

ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী ব্যবসা সহজ করতে রেলওয়ে, সড়ক ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, সীমান্ত হাট ও বহুমুখী যোগাযোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ চুক্তির আওতায় পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া এই চুক্তির আওতায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য-প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মতো নতুন ক্ষেত্রগুলোর উন্নতিতে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। সেপার মাধ্যমে নতুন নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এটি দ্বিমুখী বাণিজ্যের প্রভূত উন্নতি সাধন করবে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ-ভারত অংশীদারত্ব শক্তিশালী করার জন্য এই চুক্তি চারটি দিকে ফোকাস করে। এগুলো হলো যোগাযোগ ও নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন বজায় রাখা, প্রতিরক্ষা সামগ্রীর যৌথ উৎপাদন, বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো উন্মোচন এবং ভ্যাকসিন ও অন্যান্য ওষুধ সামগ্রীর যৌথ উৎপাদন।

সেপার সম্ভাবনা

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সেপা সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। চুক্তির প্রথম বছরেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়বে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার। চুক্তিটি ব্যবসা-বাণিজ্য, সাপ্লাই চেইন ও উৎপাদনের বিকাশে যৌথভাবে কাজ করার ফলে আমদানি, রপ্তানি ও ব্যবসা সম্পর্কিত নিয়ম-কানুনের সংস্কারসহ দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতির সূচনা হবে।

পরিবহন খরচ কম ও সময় সাশ্রয়ের কারণে বাংলাদেশি আমদানিকারকরা একই পণ্যের জন্য দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর বদলে ভারতমুখী হবে। সেপা বাস্তবায়ন হলে এর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্ভাবনা হবে ৪০ বিলিয়ন ডলার। ভারতের সেবা ও বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির শক্তিশালী সম্ভাবনা সেপা বাস্তবায়ন হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশের জন্য সেপা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) থেকে সরে আসার পর থেকে ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার চেষ্টা করছে।

দ্বিতীয়ত, এ চুক্তি দ্বিপক্ষীয় ও উপআঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করবে যা বাংলাদেশ তাদের পলিসি ইনিশিয়েটিভের মধ্যে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সংযোগই সমৃদ্ধি। সেপা বেশ কিছু দিক দিয়ে যোগাযোগের উন্নতি ঘটাবে, যা ভবিষ্যৎ এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে।

বিবিআইএন, বিসিআইএম এবং বিমসটেক ভারত ও বাংলাদেশকে পেট্রাপোল-বেনাপোল, ফুলবাড়ী-বাংলাবান্ধা ও ডওকি-তামাবিল পয়েন্টে সংযুক্ত করেছে। এ ছাড়াও আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগের মাধ্যমে সংযোগ ঘটেছে। এ চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ব্যক্তিগত, যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী কার্গো বাহনগুলো সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবে। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে, যেখানে পণ্যের দাম অন্তত ৪.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে।

ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও ট্রানজিট নতুন নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করবে, যার ফলে মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তাদের ব্যয় কমে আসবে।

এই সংযোগের মাধ্যমে আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুফল আসবে। যেমন: বিমসটেক চুক্তির মাধ্যমে থাইল্যান্ডের র‌্যানং বন্দরের সঙ্গে চেন্নাই, বিশাখাপাটনাম ও কলকাতা বন্দর সংযুক্ত হবে। বিমসটেকের নৌ-পরিবহন চুক্তি ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ২ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত হবে। ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে পিটিএ ও এফটিএ সম্পাদনের পথ তৈরি করবে। ইতোমধ্যে থাইল্যান্ড ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ।

তৃতীয়ত, এই চুক্তির মাধ্যমে সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের নতুন জায়গা তৈরি হবে এবং যৌথ উৎপাদন হাব ও নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন তৈরির সুযোগ তৈরি হবে। এটি উভয় দেশের জন্য নতুন বাজার তৈরি করবে ও নতুন নতুন বিনিয়োগ আসতে থাকবে।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য তিনটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করেছে এবং ভারতীয় কোম্পানিগুলো টেলিযোগাযোগ, ওষুধ, এফএমসিজি ও অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে।

সেপা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাবে এবং এ ধরনের বিনিয়োগ নতুন মাত্রা পাবে। এ চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর জন্য বাংলাদেশের রাসায়নিক সার, পাটজাত দ্রব্য, হিমায়িত মৎস্য পণ্য ও তৈরি পোশাক সহজলভ্য হবে।

চতুর্থত, অনুন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের মর্যাদা লাভের জন্য বাংলাদেশকে যেসব ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করতে হবে, এই চুক্তি সেসব ক্ষেত্রগুলোতে নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

দুই দেশের স্থলভাগ ও জলসীমায় সংযোগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেরই আয় বৃদ্ধি পাবে। পণ্য, সেবা ও জনসাধারণের বিনিময় বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটন ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ঘটবে, যা দুই দেশেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানবসম্পদের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। দুই দেশেরই ওষুধ শিল্প সমৃদ্ধ হওয়ায় যৌথ ওষুধ পণ্য ও প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদনের ফলে উভয়ই লাভবান হবে।

করণীয় কী

ভারত-বাংলাদেশ উভয়ের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে সেপা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এই চুক্তির পূর্ণ সফলতার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, যেকোনো অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির পূর্ণ ফলাফল পাওয়ার জন্য অবকাঠামোগত অবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাণিজ্য, যোগাযোগ ও বিনিময়ের পূর্বশর্তই এটি।

দ্বিতীয়ত, দুই দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য যাবতীয় অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।

তৃতীয়ত, দুই দেশের মধ্যকার পরিবহন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার মাধ্যমে যোগাযোগ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

চতুর্থত, পারস্পরিক লাভের জন্য ট্যারিফ ও নন ট্যারিফের বাধ্যবাধকতা ও রুলস অফ অরিজিন উঠিয়ে দিতে হবে। পাটজাত পণ্যের ডাম্পিং ও অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক, কাস্টমসের বিড়ম্বনা, নো ম্যান্স ল্যান্ডে পণ্যের লোডিং ও আনলোডিংয়ের সমস্যাগুলোকে বিবেচনা করতে হবে।

পঞ্চমত, ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতাপূর্ণ খাতগুলোর উন্নতিতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

ষষ্ঠত, আইনি বাধ্যবাধকতাও এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে অন্তত ৯০ শতাংশ পণ্য ও সব ধরনের সেবা পরিবহনে সমস্ত বর্ডার ডিউটি ও বিধিনিষেধ উঠিয়ে নিতে হবে।

সপ্তমত, মুক্তবাণিজ্যের পূর্ণ সফলতা পেতে হলে একটি দেশের রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্য থাকতে হবে, যা দিয়ে সে বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে পারে।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশই পোশাক পণ্যের দখলে এবং এগুলো মূলত উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে রপ্তানি হয়ে থাকে। ভারতের বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা কম। তাই সেপার সফলতার জন্য রপ্তানি খাত আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নিতে হবে।

সর্বশেষ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা সেপা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যেন কোনোরূপ প্রভাব না ফেলে তা খেয়াল রাখতে হবে। ২০১৮-১৯ সালে বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে যোগদানে ভারতের বিরুদ্ধে সুপারিশ করেছিল।

দুই দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিবেচনায় সেপা একটি গেম চেঞ্জিং চুক্তি হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভিযাত্রায় ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যোগাযোগ এবং আর্থ-সামাজিক থেকে অবকাঠামো খাতে এই চুক্তি নতুন মাত্রা যুক্ত করবে।

বিস্তৃত উৎপাদন ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক বাজার সৃষ্টির জন্য বাণিজ্য, পরিবহন ও বিনিয়োগের ত্রিমাত্রিক উন্নয়নে গঠনমূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য একটি সময়োপযোগী পরিকল্পনা নেয়া ও সে অনুযায়ী কাজ করা জরুরি।

লেখক: স্বাধীন গবেষক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্যকে ছাড়িয়ে পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতি ভারত
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে নজর সম্পর্ক জোরদারে
যে কারাগারে বন্দিরা খান ‘পাঁচ তারকা হোটেলের’ খাবার
১১ সেপ্টেম্বর শুরু সাকিবদের ক্যাম্প
শেখ হাসিনাকে এবারও স্বাগত জানাবেন মোদি

মন্তব্য

p
উপরে