× হোম রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া সিটিজেন জার্নালিজম বিচিত্র ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য আফগানিস্তান ১৫ আগস্ট কী-কেন স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও যৌনতা-প্রজনন ইউরোপ অন্যান্য উদ্ভাবন প্রবাসী আফ্রিকা ক্রিকেট শারীরিক স্বাস্থ্য আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়া সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ মানসিক স্বাস্থ্য ব্লকচেইন অন্যান্য ভাষান্তর ফুটবল অন্যান্য পডকাস্ট বাংলা কনভার্টার নামাজের সময়সূচি আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

মতামত
Male vs female screenwriter
google_news print-icon

পুরুষ বনাম নারী চিত্রনাট্যকার

পুরুষ-বনাম-নারী-চিত্রনাট্যকার
বেচডেল টেস্টের জরিপ দেখতে গেলেই বোঝা যায়, নারীরা নারীর চরিত্র ভালো লেখেন, যথার্থভাবে পর্দায় তুলে ধরেন। বেশিরভাগ পুরুষ নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার এতে ব্যর্থ। তবে কি এখন নারীরাই শুধু নারীদের চরিত্র লিখবেন?

সামনে মেডিটেরেনিয়ান সাগর। নীল জলরাশি। চারপাশে নানা দেশের, নানা বয়সী মানুষ। ছানাপোনারা দৌড়ে বেড়াচ্ছে, বালির প্রাসাদ গড়ছে-ভাঙছে-গড়ছে। কোথাও চলছে বিচ ভলিবল, কোথাও সানগ্লাস চোখে স্রেফ বসে থাকা। জলের কাছে ফেরার উৎসব। রোদ পোহানোর উৎসব। এমন আনন্দযজ্ঞে বসে কবিতা লিখতে পারলে বেশ হতো। কিন্তু ভাবনায় ফেলে দিলো ছোট্ট দুই ভাইবোন, জেরেমি আর জেসেমি। এরা বেশ অনেকক্ষণ আমার কাছাকাছি বসেই খেলছে। কী খেলছে, কী করছে তেমন খেয়াল করে দেখিও নি। সমস্ত মনোযোগ নিয়ে ঘুরে তাকালাম আসলে একটা মাত্র কথা শুনে। ‘চিকো সালভারা আ চিকা’। ‘বয় সেভস দ্য গার্ল’। ‘ছেলেরাই মেয়েদেরকে উদ্ধার করে’।

দুই ভাইবোনের ঝগড়া তখন তুঙ্গে। জেসেমি ছোট বোন। তার এক দফা, এক দাবি: তার পুতুলকে উদ্ধার অভিযানে যেতে দিতে হবে। কেন? কারণ দুইবার তার পুতুল বালির প্রাসাদে বন্দী ছিল, বড় ভাই জেরেমির পুতুল তাকে উদ্ধার করেছে। আর দশ বছর বয়সী জেরেমির সহজ, স্বাভাবিক (!) উত্তর, ‘ছেলেরাই মেয়েদেরকে উদ্ধার করে।’ ভেবে দেখলাম, জেরেমির উত্তরের পক্ষে রেফারেন্সও আছে অনেক। আমাদের রাজপুত্র থেকে শুরু করে জেমস বন্ডরা যুগ যুগ ধরে রাজকন্যা এবং বন্ডগার্লদের উদ্ধার করে আসছে। জেরেমির হাতে ধরা স্পাইডারম্যানের অ্যাকশন ফিগার। সে বেচারাকে আমি নিজেই ২০০২ থেকে নায়িকা উদ্ধারে নিয়োজিত দেখছি, জেরেমির আর কী দোষ!

‘উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা’ এই নারী চরিত্রের প্রয়োজন কেন? কারণ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় পুরুষের বীরত্ব, তার ভালোমানুষি। অর্থাৎ নারী চরিত্রের উপস্থিতি শুধুমাত্র পুরুষ চরিত্রটির গল্প বলবার জন্যই। ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় নারী মানেই সে নায়কের প্রেমিকা, স্ত্রী, মা, বোন বা স্রেফ ‘সাইড কিক’। নায়কের সাথে নারীর সম্পর্ক, নায়কের চোখে নারীর যে রূপ তা-ই সেসব চরিত্রের একমাত্র পরিচায়ক। আবার প্রায়ই গল্পে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না থাকার পরও ভীষণ সুন্দরী নায়িকারা পর্দায় আসেন। হাইহিল আর ঝাঁ-চকচকে পোশাকের নায়িকারা যখন হেঁটে যান, ক্যামেরা তার পা থেকে প্যান করে কপাল পর্যন্ত উঠে যায়। এই পরিবেশনা কতটা বাস্তব বা রুচিসম্মত সেই আলোচনা করা হয় না, কেননা পর্দার ‘অর্নামেন্টেশনের’ জন্য আকর্ষণীয় নায়িকার উপস্থিতি প্রয়োজন।

এই প্রথার বিশ্লেষণে পঞ্চাশের দশকের নির্মাতা বাড বয়েট্টিচার বলে গিয়েছেন, ‘পর্দায় নারীর উপস্থিতি প্রয়োজন, কেননা তারাই পুরুষ চরিত্রটির মধ্যে প্রেম, যৌন অনুভূতি বা ভয় জাগাবে। পর্দার সেই নারী চরিত্রটির জন্য নায়ক যা অনুভব করে, সেটিই তো দর্শক অনুভব করবে।’

আরও পরে ১৯৭৫ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গবেষক লরা মালভিও লিখলেন সিনেমায় ‘মেল গেজ’-এর প্রাবল্যের কথা। মালভির মতে, মেল গেজ বা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পর্দায় নারীদেরকে ‘সেক্সুয়াল অবজেক্ট’ হিসেবে তুলে ধরে। নারীকে ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে দেখতে গিয়ে এই মেল গেইজ তাকে আর ‘চরিত্র’ হিসেবে দেখতে পায় না। ফলে সৌন্দর্য, যৌন আবেদনময়তার বাইরে তার চরিত্রের আর কোনো দিকই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না।

বিষয়টিকে আরও সহজ করে বুঝিয়ে বলেছেন প্রযোজক ও পরিচালক ড্যানিয়েল পালাডিনো। পালাডিনো বললেন, ‘আপনার সিনেমার কোনো দৃশ্যে আপনি একটি চেয়ার ব্যবহার করলেন। এর কারণ হতে পারে দুটো। এক, অভিনেতারা সেটি বসতে, হেলান দিতে বা ছুড়ে ফেলতে ব্যবহার করবে। দুই, অভিনেতারা সেটি ছুঁয়েও দেখবে না। তবে সুন্দর একটি চেয়ারের ব্যবহারের কারণে হয়তো দৃশ্যটি সুন্দর লাগবে। পর্দায় নারীর উপস্থিতি আর চেয়ারের উপস্থিতিতে কোনো পার্থ্যক্য নেই। কেননা পর্দায় নারী মানেই অনুষঙ্গ বা অলংকার।’

কিন্তু এর কারণ কী? ইতিহাস বলে, আমাদের চারপাশের মতো নাট্যজগত, সিনেমাজগত, মিডিয়াও বরাবরই পুরুষতান্ত্রিক। মিডিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় অনেক কম। তাই যুগের পর যুগ আমরা পর্দায় যে নারীদের দেখি, তারা মূলত পুরুষের চোখে দেখা, পুরুষের লেখায় ফুটে ওঠা, পুরুষ দর্শকের জন্য তৈরি নারী চরিত্র। সোজা কথায়, এরা পুরুষ যা দেখতে চায়, সে কথা ভেবে তৈরি নারী চরিত্র। এখানে নারীর বাস্তবতা নেই, নারীর নিজস্ব গল্প নেই। ঠিক যেমনটা পালাডিনো বলেছিলেন, এই নারী চরিত্রদের ব্যাপ্তি ও গভীরতা ততটুকুই। এরা অনুষঙ্গ অথবা অলংকার অথবা দুটোই।

তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, লেখক, চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, নির্দেশক পুরুষ না নারী, এ বিবেচনা কেন আলোচনায় আসবে? আসত না, আসার কথাও না। সমতায় বিশ্বাসী কোনো মানুষই সিনেমা দেখবার আগে, নাটক দেখবার আগে, বিজ্ঞাপন দেখবার আগে ভেবে দেখবেন না এটি নারী নির্মাতার তৈরি নাকি পুরুষ নির্মাতার। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে, নারীরা যখন নারী চরিত্র সৃষ্টি করেন, তারা পুরুষের নির্মিত নারী চরিত্রের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠেন। ঠিক শুনেছেন, আমি বলছি, বেশিরভাগ পুরুষ চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতাই নারী চরিত্রের প্রতি সুবিচার করতে পারেন না (চানও না)।

তাই বেলার মতো চরিত্র সৃষ্টি করার জন্য ওয়াল্ট ডিজনি স্টুডিওর একজন লিন্ডা উলভারটনকে প্রয়োজন হয়। লিন্ডা যখন বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট (১৯৯১) এর চিত্রনাট্য লেখেন, বেলা তখন সিন্ডারেলা বা স্নো হোয়াইটের মতো ‘ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস’ হয়ে যায় না, স্লিপিং বিউটির মতো রাজপুত্রের অপেক্ষায় জীবন কাটানোই তার একমাত্র কাজ হয় না। বেলা বই পড়ে, বেলার নিজস্ব ভাবনার জগতটা আমাদের সামনে আসে। রাজপুত্রের সাথে রোম্যান্টিক সম্পর্কই তার চরিত্রের একমাত্র দিক না। বেলা বাবাকে ভালোবাসে, বাবাকে রক্ষা করতে চায়। বেলা নিজের সুরে বন্ধুদের সাথে গান গায়, গল্প করে; সেই গান বা গল্পের মূল উদ্দেশ্য রাজপুত্রের সন্ধান করা নয়। মোট কথা, বেলা স্রেফ নায়িকা না, একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র। নায়কের পার্শ্ববর্তী ‘সুন্দর অলংকার’ হওয়া ছাড়াও তার কিছু বলার ছিল।

এখানে বলতেই হয় যে, বেলার স্রষ্টা লিন্ডা উলভারটন ছিলেন অ্যানিমেটেড সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা প্রথম নারী। অথচ লিন্ডা চিত্রনাট্য লেখার আরো ষাট বছর আগে থেকে যাত্রা শুরু করেছে ওয়াল্ট ডিজনি পিকচার্স, লিন্ডার বিউটি আন্ড দ্য বিস্ট-এর আগে আরও ১৭৮টি সিনেমা ডিজনি থেকেই প্রযোজিত হয়েছে। তার কোনোটিতেই বেলার মতো নারী চরিত্রের দেখা মেলে না। তারা রাজপুত্রের অপেক্ষায় থাকা সুন্দরী রাজকন্যা হয়েই রয়ে যান।


শুধু ডিজনি কেন, এবার মূলধারার হলিউডে ফিরি। হলিউডে ‘বেচডেল টেস্ট’ নামে ভারী মজার এক পরীক্ষা বেশ জনপ্রিয়। ফিকশনে নারী কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে তাই নিয়ে এক কমিক স্ট্রিপ আঁকতে গিয়ে আশির দশকে এই টেস্টের উদ্ভাবন করেন কার্টুনিস্ট অ্যালিসন বেচডেল। নারীকে পুরুষের অনুষঙ্গ নয়, বরং স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে দেখানো হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করতে ফিকশনকে তিনটি সহজ শর্ত পূরণ করতে হবে।

এক, ফিকশনে অন্তত দুটি নারী চরিত্র থাকতে হবে।

দুই, এই নারী চরিত্রগুলোর মাঝে কথোপকথনের অন্তত একটি দৃশ্য থাকতে হবে ।

তিন, এই কথোপকথনের বিষয়বস্তু হতে হবে পুরুষ চরিত্রটি ছাড়া অন্য কোনো কিছু।

চলচ্চিত্র গবেষক ম্যাট ড্যানিয়েলসের নেতৃত্বে এই বেচডেল টেস্টের আওতায় আনা হয় ১৯৯৫-২০১৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সবচেয়ে ব্যবসা সফল ২০০টি হলিউডি চলচ্চিত্রকে। ফলাফল প্রকাশিত হয় তিন ধাপে। এক, যে চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রনাট্য লেখার টিমে কোনো নারী ছিলেন না, সেগুলোর মধ্যে ৪৭ শতাংশ এই বেচডেল টেস্টে সফল। দুই, যে চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রনাট্য লেখার টিমে অন্তত একজন নারী ছিলেন, সেগুলোর মধ্যে ৬২ শতাংশ বেচডেল টেস্ট উতরে যায়। তিন, যে চলচ্চিত্রগুলোর চিত্রনাট্য লেখার টিমে শুধুমাত্র নারীরাই ছিলেন, তার সবগুলো অর্থাৎ ১০০ শতাংশ বেচডেল টেস্টে সফল। ম্যাট ড্যানিয়েলসের এই পরীক্ষাটি একটি সহজ বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। পুরুষদের নিয়ে চিন্তাভাবনা বা কথা বলা ছাড়াও যে নারীদের জগতে অন্য কিছু থাকতে পারে, এই অতি স্বাভাবিক বিষয়টিও হলিউডের বেশিরভাগ পুরুষ চিত্রনাট্যকার বুঝতে চান না বা পারেন না।

বলিউডও ব্যতিক্রম নয়। সেখানে একজন মেঘনা গুলজার যখন সিনেমায় সারোগেসির গল্প বলেন, সৃষ্টি হয় ফিলহাল (২০০২)। সন্তান ধারণ নিয়ে গল্প বলতে এসেও মেঘনা নারী চরিত্রদের স্রেফ মাতৃত্বের তাড়নায় ভুগতে থাকা লিঙ্গ হিসেবে রেখে দেননি। তাদের নিজস্ব গল্প আছে, বন্ধুত্বের বন্ধন আছে, মাতৃত্বের হাহাকারের বাইরেও তাদের অন্যান্য অনুভূতি আছে। এই সারোগেসিকে যখন পুরুষ নির্মাতার চোখ দিয়ে দেখা হয়, তৈরি হয় হার দিল জো পেয়ার কারেগা (২০০০), চোরি চোরি চুপকে (২০০১)। দুটি সিনেমাতেই নারী চরিত্রের ব্যাপ্তি প্রেমিকা, স্ত্রী, পুত্রবধূ এবং মা হয়ে ওঠা পর্যন্তই। বংশ রক্ষা ও নায়কের প্রতি প্রবল প্রেমের চার দেয়ালে তারা এমনভাবে বন্দী যে তাদের আর কোনো স্বপ্ন নেই, অনুভূতি নেই, গল্পও নেই। যদি গল্প থেকেও থাকে, সেটিও যৌন আবেদনময়তার মোড়কে এমন করে মুড়িয়ে দেয়া যে সূক্ষ্ম সব অনুভূতি সেখান থেকে দৌড়ে পালায়। অথচ জুহি চতুর্বেদীর লেখা ভিকি ডোনার (২০১২) দেখে অবাক হয়ে যাই। প্রায় সমপর্যায়ের সংবেদনশীল বিষয় স্পার্ম ডোনেশন নিয়ে নির্মিত এই সিনেমায় নায়ক বা নায়িকা কেউই অনর্থক যৌন আবেদনময় হয়ে উঠছে না। নায়ককেন্দ্রিক কমার্শিয়াল সিনেমা বলে জুহির গল্পে নারীরা স্ত্রী, প্রেমিকা, মা, দাদী হিসেবে থেকে যান না। ভিকির সত্তোর্ধ্ব বিজিকেও (দাদী) আমাদের মনে রাখতে হয়। কেননা, হিন্দি-পাঞ্জাবির মিশেলে কথা বলতে থাকা আধুনিক বিজিরও নিজস্ব একটা গল্প আছে। আর সেই গল্প শুধু নায়কের সাথে তার সম্পর্কের সংজ্ঞায় শেষ হয়ে যায় না।

প্রবাসী গৃহবধূরা কী করেন? কেমন জীবন তাদের? সেই গল্প দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে (১৯৯৫)তে চাইলে খানিকটা আদিত্য চোপড়াও বলতে পারতেন। বলেননি। অমন মা ও গৃহবধূদের গল্পটা শুনতে তাই আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে গৌরি শিন্দের ইংলিশ ভিংলিশ (২০১২) এর জন্য। প্রাপ্তবয়স্কা অবিবাহিত নারীরা কেমন হয়? সারাক্ষণ বিয়ের জন্য পাগল হয়ে থাকেন? কারান জোহরের মিসেস ব্র্যাগেনজার মতো কর্মক্ষেত্রেও তারা যৌন অনুভূতি ছাড়া তেমন কিছু ভাবতে পারেন না? অবিবাহিত, যৌন আবেদনসম্পন্ন নারী মানেই কি অপ্রকৃতিস্থ কমিক রিলিফ? এই প্রশ্নের সংবেদনশীল উত্তর পেতেও আমাদের অপেক্ষা করতে হয় কামনা চন্দ্র ও তনুজা চন্দ্রের কারিব কারিব সিঙ্গেল, জুহি চতুর্বেদীর পিকুর জন্য। কারিব কারিব সিঙ্গেল-এর জায়া প্রেম করতে চায় বলে বোধবুদ্ধি খোয়ায়নি! বলিউডের জন্য সে কী অবাক করা কথা!

জুহির পিকুও সিনেমার নায়িকা বটে, তবে তার তেমন কোনো নায়ক নেই। প্রেমের সম্পর্ক বা সংসার তার চরিত্রের মূল দিক না। বরং বৃদ্ধ বাবার সাথে তার সম্পর্কের গল্পই এই সিনেমার মূল উপজীব্য। পিকুকে আমরা নায়িকা না, নিজস্ব গল্প এবং মতামত সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ চরিত্র হিসেবে দেখি। তাকে অফিস যেতে হয়, ঘর সামলাতে হয়, বাবার খেয়াল রাখতে হয় বলে যে সে প্রেম করতে চায় না তা-ও না। পিকুর সেক্সুয়াল নিডকে জুহি আড়ালে সরিয়ে রাখেননি, আবার সেক্সুয়াল নিড আছে বলেই বলিউডের চিরাচরিত নারী চরিত্রগুলোর মতো তাকে সেক্স সিম্বল হিসেবে তৈরি করেননি।

ইদানিং বলিউডে দেশকে বাচাঁনোর, সমাজকে বাঁচানোর সিনেমার জয়জয়কার। সেখানে নারী চরিত্ররা কী ভূমিকা রাখেন? তারা সাধারণত অক্ষয় কুমার, সালমান খান বা অজয় দেবগনের পাশে তাদের ‘লাভ ইন্টারেস্ট’ হয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেন। অক্ষয় কুমার যখন পর্দায় স্যানিটেশন নিয়ে বিপ্লব করছেন, নায়িকা ভূমি পেডেঙ্কারের আবদার করা ছাড়া কোনো ভূমিকা থাকে না। অক্ষয় কুমার যখন পর্দায় স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে সচেতনতা বাড়াচ্ছেন, মেয়েদের জন্য করা এই বিপ্লবেও রাধিকা আপ্তে শুধুমাত্র স্ত্রী ও সোনম কাপুর শুধুমাত্র ‘দ্য আদার ওম্যান’। এমনকি ভারতের মঙ্গলগ্রহ অভিযানে নারীদের অবদান নিয়ে নির্মিত মিশন মংগল-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র কে জানেন? অক্ষয় কুমার! চার-চার জন গুণী অভিনেত্রীর উপস্থিতি সত্ত্বেও পুরুষের জন্য, পুরুষের দ্বারা নির্মিত এই সিনেমায় দিনশেষে ‘হিরো’ হয়ে ওঠেন একজন আলফা মেলই!

অথচ মেঘনা গুলজার যখন রাজি (২০১৮) নির্মাণ করছেন, নারী চরিত্রটি স্বচ্ছন্দে ‘হিরো’ হয়ে উঠছে। সে জন্য তাকে সিনেমার পুরুষ চরিত্র নির্মাণে অবহেলা করতে হয়নি, তাদের দুর্বল পুরুষ হিসেবে দেখাতে হয়নি। আলিয়া ভাট কেন্দ্রীয় চরিত্র বলে ভিকি কৌশলের চরিত্রটির কোনো গল্প নেই, সে ‘স্বামী’ মাত্র - এমন তো হয়নি! তবে রোহিত শেঠির সিম্বা (২০১৮) তে কেন সারা আলী খানের মুখে আমরা ডায়ালগের চেয়ে বেশি গান শুনি? কারণ বেশিরভাগ পুরুষ চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতারা নারী চরিত্র লিখতে জানেন না!

লেখা শুরু করেছিলাম জেরেমি আর জেসেমির গল্প দিয়ে। তাদের কাছেই ফেরত যাই। জেরেমির পৃথিবীতে স্বাভাবিক সত্য হচ্ছে ছেলেরাই মেয়েদেরকে রক্ষা করবে। আমি কি তবে এর উল্টোটা চাইছি? রাজকন্যারা রাজপুত্রদের ঘুম ভাঙবে? ওয়ান্ডার ওম্যানরূপী গ্যাল গাডোটরা সুপার হিরো হবে? হতেই পারে। হোক, তাতে জেসেমিদের পক্ষেও রেফারেন্স পাওয়া যায়।

তবে রক্ষাকর্ত্রী হয়ে ওঠা নিয়ে আসলে এই আলোচনা না। সিনেমা নারীকেন্দ্রিক হলেই সেখানে নারীর উপস্থাপন যথার্থ হবে তাও না। হলিউড এখনও ভাবছে নারীকেন্দ্রিক সিনেমা মানে পুরুষালি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, যুদ্ধংদেহী এক নারী। ‘ইয়াং লেডি’ ডাকায় ক্যাপ্টেন মার্ভেলকে তাই চোখমুখ শক্ত করে হুমকি দিতে হয়। হলিউডের পুরুষ নির্মাতারা যেন ধরেই নিয়েছেন নারীর শক্তির প্রথম পরিচায়ক হলো ‘নারীত্ব’কে ছুঁড়ে ফেলা!

বলিউড ভাবছে নারীর যথার্থ উপস্থাপন মানে তাকে দেবীজ্ঞান করতে হবে। তাকে মা দুর্গা হতে হবে, অথবা অন্তত স্বরস্বতী! অথচ নারীকে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দেখতে শিখলেই বিরোধ মিটে যায়। নারীকে আলাদা করে নারী না, মানুষ হিসেবে দেখেছেন বলে অ্যামি শারমান-পালাডিনো দ্য মার্ভেলাস মিসেস মেইজেল লিখতে পারেন, জোয়া আখতার গালি বয় লিখতে পারেন, অপর্ণা সেন পারমিতার একদিন লিখতে পারেন। সেখানে লিঙ্গাত্মক বিরোধ থাকে না, কেউ কারো ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় না।

দাবি করেছিলাম, বেশিরভাগ পুরুষ নির্মাতা, চিত্রনাট্যকাররা নারী চরিত্র নির্মাণ করতে জানেন না। উল্টো উদাহরণ টানার আগেই বলে নিচ্ছি, ব্যতিক্রম উদাহরণও আছে। তাই ফারাহ খানের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় দুর্দান্ত পুরুষতান্ত্রিক ম্যায় হু না বা ওম শান্তি ওম নির্মিত হয়। হলিউডের দীর্ঘদিনের চর্চিত নীতি ‘ক্যারিয়ারিস্ট নারী মানেই অনুভূতিহীন, রুঢ়, অসুখী নারীর’ স্টেরিওটাইপ মেনে নিয়ে অ্যালিন ব্রশ ম্যাকেনাও লেখেন ডেভিল উইয়ারস প্রাডা। আবার ঝলমলে, উচ্ছ্বসিত যে নায়িকারা নায়কের জীবন পালটে দেন, তাদেরও যে নিজস্ব যুদ্ধ থাকে, সেই গল্পটা পর্দায় প্রথম বলেছেন পরিচালক মাইকেল গন্ড্রি। রোজা ডিয়াজ, অ্যামি স্যান্টিয়াগো, জিনার মতো দুর্দান্ত, বাস্তবিক নারী চরিত্রগুলো পর্দায় এসেছে নির্মাতা ড্যান গুর আর মাইকেল স্কারের হাত ধরে। আরতি, অদিতি বা দয়াময়ী তো সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি। আমি যখন জুহি চতুর্ভেদীর পিকু বা ভিকি ডোনার-এর কথা বলছি, তখন এও তো বলতে হয় যে দুটো সিনেমারই নির্মাতা সুজিত সরকার।

কিন্তু ব্যতিক্রমের দোহাই দিলে আর চলছে না। বেচডেল টেস্টের জরিপ দেখতে গেলেই বোঝা যায়, নারীরা নারীর চরিত্র ভালো লেখেন, যথার্থভাবে পর্দায় তুলে ধরেন। বেশিরভাগ পুরুষ নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার এতে ব্যর্থ। তবে কি এখন নারীরাই শুধু নারীদের চরিত্র লিখবেন? অ্যামি শারমান প্যালাডিনো ২০১১ সালের এক সাক্ষাতকারে সেই উত্তর দিয়ে রেখেছেন, ‘যা জানেন না বা বোঝেন না, তা নিয়ে লিখতে হলে রিসার্চ করে লিখুন।’

তাবাসসুম ইসলাম: পোস্টগ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অফ বার্সেলোনা

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
The Minister of State ordered to speed up the work to prevent the erosion of the Karatoya river

করতোয়া নদীভাঙন রোধে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রতিমন্ত্রীর

করতোয়া নদীভাঙন রোধে কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রতিমন্ত্রীর ছবি: সংগৃহীত

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার করতোয়া নদীর ভাঙনকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। এ সময় তিনি ভাঙন প্রতিরোধে দ্রুত কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন।

গত শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেল ৪টার দিকে তিনি উপজেলার সুন্দরদিঘী ইউনিয়নের লক্ষ্মীনারায়ণী এলাকা এবং দেবীডুবা ইউনিয়নের দাড়ারহাট তেলীপাড়া এলএলপি, দাড়ারহাট ডাক্তারপাড়া ও সোনাপোতা ঢাকাইয়াপাড়া এলাকায় নদীভাঙন পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, করতোয়া নদীর ভাঙন রোধে প্রায় ১০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। দাড়ারহাট ও তেলীপাড়া এলাকার প্রতিরক্ষা কাজ খুব শিগগিরই শুরু হবে।

তিনি স্থানীয়দের উদ্দেশে বলেন, ‘এ কাজ জনগণের টাকায় বাস্তবায়িত হবে। তাই কাজের মান সঠিকভাবে বুঝে নেবেন এবং তদারকি করবেন। কোথাও যেন প্রকল্প এলাকার আশপাশ থেকে বালু উত্তোলন করে কাজ না করা হয়, সেদিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে।’

এ সময় তিনি করতোয়া নদীতে ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।

পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কৃষ্ণ কমল সরকার, পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশুতোষ বর্মন এবং দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ সাহাসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী।

মন্তব্য

মতামত
Son arrested for brutal attack on old mother for greed of property

সম্পত্তির লোভে বৃদ্ধ মায়ের ওপর নৃশংস হামলা, ছেলে গ্রেপ্তার

সম্পত্তির লোভে বৃদ্ধ মায়ের ওপর নৃশংস হামলা, ছেলে গ্রেপ্তার ছবি: সংগৃহীত

নওগাঁর ধামইরহাটে মায়ের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নেওয়ার উদ্দেশে বৃদ্ধ মায়ের ওপর নৃশংস হামলার অভিযোগে এক ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত ছেলে প্রথমে ইট দিয়ে মায়ের মাথায় আঘাত করে এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার মায়ের পায়ের রগ কেটে দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ধামইরহাট উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের বস্তাবর গ্রামের বাসিন্দা ৬৭টি বছর বয়সি আনজুমান আরার নামে কিছু জমিজমা রয়েছে। ওই সম্পত্তি জোরপূর্বক নিজের নামে লিখে নেওয়ার জন্য তার ছেলে আসাদুজ্জামান শামীম (৩৭) দীর্ঘদিন ধরে চাপ সৃষ্টি করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৭ জুন শামীম হত্যার উদ্দেশে ইট দিয়ে মায়ের মাথায় আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় আনজুমান আরা চিকিৎসা গ্রহণ করেন। পরে তিনি বাড়িতে ফিরে গেলে গত ১৪ জুন পুনরায় তার ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় শামীম ধারালো চাকু দিয়ে তার ডান পায়ের রগ কেটে দেয় বলে গত ২৪জুন করা মামলায় উল্লেখ করা হয়।

ঘটনাটি নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এর নজরে আনা হলে তার নির্দেশনায় ধামইরহাট থানা পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কয়েকদিনের ধারাবাহিক অভিযানের পর বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাত ৯টার দিকে আলমপুর ইউনিয়নের বস্তাবর গ্রাম থেকে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আসাদুজ্জামান শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, পিতামাতার প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের মতো ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে আদালতে সোপর্দের প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

মন্তব্য

মতামত
A day long discussion meeting was held in Khulna on the occasion of Holy Ashura

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে খুলনায় দিনব্যাপী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে খুলনায় দিনব্যাপী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র মহররম উপলক্ষে আঞ্জুমান-এ-পাঞ্জাতানী ট্রাস্টের উদ্যোগে ১০ দিনব্যাপী শোক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় চৌদ্দশত বছর আগের এই দিনে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার ৭২ জন সঙ্গী-সাথী সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

১লা হতে ১০ মহররম পর্যন্ত এই আলোচনা সভায় মূল বক্তা হিসেবে আলোচনা করেন ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহীম খলিল রাজাভী। সমাপনী দিনে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)-এর পবিত্র শাহাদত স্মরণে নগরীর আলতাপোল লেনস্থ কাসরে হোসাইনী ইমামবাড়ি হতে এক শোক মিছিল বের করা হয়।

শোক মিছিলপূর্ব আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা হুজ্জাতুল ইসলাম সৈয়দ ইব্রাহীম খলিল রাজাভী বলেন: ‘কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনায় মুসলমানদের জন্য এক গভীর শিক্ষা রয়েছে। কারবালার আদর্শ মুসলমানদের অন্যায় ও মিথ্যার সাথে আপোস না করা এবং সত্যের পতাকাকে সমুন্নত রাখার চেতনা জাগ্রত করে। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর এই আত্মত্যাগ কেবল কোনো ক্ষমতার লড়াই ছিল না, এটি ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের এবং অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের চিরন্তন সংগ্রাম। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, জীবন দিয়ে হলেও কীভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়। আজ বিশ্বজুড়ে যেখানেই নিপীড়ন, সেখানেই কারবালার চেতনা আমাদের প্রেরণা জোগায়।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা এবং ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার বিশ্বস্ত সঙ্গীদের শাহাদাতের পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এর গুরুত্ব ও মর্যাদা এতটুকুও কমেনি; বরং সময়ের সাথে সাথে আশুরার চেতনা বিশ্বব্যাপী আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

মিছিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা মহানর বিএনপির সভাপতি ও কেডিএ’র চেয়ারম্যান এ্যাড. শফিকুল আলম মনা। আলোচনা সভা শেষে একটি বিশাল শোক মিছিল নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ইমামবাড়িতে এসে শেষ হয়। এই শোক মিছিলে বিপুল সংখ্যক শিয়া মুসলিম নারী ও পুরুষ অংশ নেন।

সমগ্র মিছিল পরিচালনা করেন আঞ্জুমান-এ-টাঞ্জাতানী ট্রাস্ট এর সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল ও সাধারণ সম্পাদক মো. নাসিরুল হাসান।

মন্তব্য

মতামত
Request for help for the treatment of two brothers suffering from Wilsons disease in Mathbaria

মঠবাড়িয়ায় ‘উইলসন ডিজিজে’ আক্রান্ত দুই সহোদর, চিকিৎসার জন্য সাহায্যের আবেদন

মঠবাড়িয়ায় ‘উইলসন ডিজিজে’ আক্রান্ত দুই সহোদর, চিকিৎসার জন্য সাহায্যের আবেদন ছবি: সংগৃহীত

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় বিরল জেনেটিক রোগ 'উইলসন ডিজিজ'-এ আক্রান্ত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন দুই সহোদর শুভ ওঝা (২২) ও চয়ন ওঝা (১৫)। দীর্ঘদিন ধরে এই মরণব্যাধির সাথে লড়াই করতে গিয়ে অর্থাভাবে তাদের চিকিৎসা এখন বন্ধের পথে। উপজেলার ঘটিচোরা (সবুজনগর) গ্রামের এই অসহায় পরিবারটি এখন সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা কামনা করছে।

​পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৯ বছর আগে বড় ভাই শুভ ওঝার শরীরে এবং ৩ বছর আগে ছোট ভাই চয়ন ওঝার শরীরে এই বিরল রোগটি শনাক্ত হয়। উন্নত চিকিৎসার আশায় ধারদেনা করে বড় ছেলেকে ভারতের ভেলোরে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে কিছুদিন চিকিৎসা চললেও করোনা মহামারি ও চরম আর্থিক সংকটের কারণে তা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ছোট ভাই চয়নও একই রোগে আক্রান্ত হলে পরিবারটি দিশেহারা হয়ে পড়ে।

​দিনমজুর বাবা সংকর ওঝা অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “দুই ছেলের চিকিৎসায় আমরা সর্বস্ব হারিয়েছি। বড় ছেলে বিছানালগ্ন। এখন অভাবের সংসারে প্রতিদিনের ওষুধ কেনাই দায় হয়ে পড়েছে। মানুষের মানবিক সহায়তা ছাড়া তাদের বাঁচিয়ে রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব।"

ওই পরিবারের সাথে যোগাযোগ ও সহায়তার জন্য ফোন করতে পারেন ০১৭২৮১৯৭৪৫২ এই নাম্বারে। আর সহয়তা পাঠাতে ব্যবহার করতে পারেন বিকাশ ০১৭২৮১৯৭৪৫২ নাম্বারটি।

​পরিবারের দাবি, সময়মতো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে দুই ভাইয়ের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি রোধ করা সম্ভব। এই দুই ভাইয়ের প্রাণ বাঁচাতে বিত্তবান ও মানবিক সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা জরুরি।

মন্তব্য

মতামত
If there are more than 100 guests in a wedding the MP demands a tax of Tk 1000 per person

বিয়েতে ১০০ জন অতিথির বেশি হলে জনপ্রতি ১০০০ টাকা ট্যাক্স বসানোর দাবি এমপির

বিয়েতে ১০০ জন অতিথির বেশি হলে জনপ্রতি ১০০০ টাকা ট্যাক্স বসানোর দাবি এমপির লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম। ছবি: সংগৃহীত

বিয়েতে ‘আনন্দ-ফুর্তির’ নামে অতিরিক্ত অর্থ অপচয় ও বিত্ত-বৈভবের প্রদর্শনী বন্ধ করতে অতিথি সংখ্যা ১০০ জনের বেশি হলে প্রতি অতিরিক্ত অতিথির জন্য ১০০০ টাকা করে বিশেষ ট্যাক্স বা কর নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন সেলিম।

এই সংসদ সদস্যের এমন দাবি সংবলিত একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে, যা দেশজুড়ে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীতে আয়োজিত একটি সামাজিক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তিনি এই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ভিডিওতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁকে বলতে শোনা যায়, দেশের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে বিয়েশাদিতে বর্তমানে যে পরিমাণ অর্থের অপচয় করা হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।

আলোচনা সভায় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বিয়ের নানাবিধ অনুষ্ঠানকে ‘অশ্লীল প্রদর্শনী’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, আজকাল বিয়ে ও গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে নাচের মহড়ার জন্য পেশাদার কোরিওগ্রাফার এনে এক মাস পর্যন্ত ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসব জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে লাখ লাখ টাকা অপব্যয় করা হচ্ছে এবং নাচ-গানের অনুষ্ঠানগুলোতে হাজার হাজার মানুষ এসে অংশগ্রহণ করছে।

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমন্ত্রিত অতিথিরা এসব অনুষ্ঠানে যে পরিমাণ খাবার খান, তার অর্ধেকেরও বেশি অপচয় হয়ে ডাস্টবিনে চলে যায়, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত অপচয়কে যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।

এই সংকট নিরসনে অতীত আইনি কাঠামোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, বিগত সময়ে দেশে একটি কার্যকর ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন’ ছিল, যেখানে নির্দিষ্ট সীমার বেশি অতিথি আপ্যায়ন করলেই সেখানে কঠোর ট্যাক্স বা জরিমানা আদায়ের নিয়ম রাখা হয়েছিল। সেই আইনের আদলে নতুন প্রস্তাব পেশ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের উচিত বিয়ের অনুষ্ঠানে ১০০ জন অতিথির বাইরে প্রতিজন অতিরিক্ত অতিথির জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ১০০০ টাকা করে রাষ্ট্রীয় ট্যাক্স নির্ধারণ করা।

তিনি পূর্বের অর্থনৈতিক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে দাবি করেন, যদি সামাজিক ক্ষেত্রে এই বিশাল অপচয়টা আইন করে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়, তবে দেশের বাজারে কৃত্রিম চাপ কমবে এবং একদিনের ব্যবধানেই সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম অন্তত ১০ শতাংশ কমে আসবে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২২ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে অংশ নিয়েও সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বিয়ে ও গায়েহলুদের অতিরিক্ত খরচ বন্ধে অতীতের সেই অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইনটি অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছিলেন।

মন্তব্য

মতামত
PMs Malaysia China visit marks new milestone in Bangladesh diplomacy Local Government Minister

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফর বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন মাইলফলক: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফর বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন মাইলফলক: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, এই সফরের ফলে দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং পারস্পরিক স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

শনিবার (২৭ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর উপলক্ষে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং বক্তব্য রাখতে গিয়ে এসব কথা বলেন। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর নতুন সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছে।

তিনি জানান, সফরকালে বিশেষ করে চীনের সঙ্গে ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে মালয়েশিয়া ও চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে, যা এ ইস্যুতে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরের আগে বা পরে জনসমাগমনির্ভর সংবর্ধনার প্রচলিত সংস্কৃতি পরিহার করে রাষ্ট্র পরিচালনায় সংযম, দায়িত্বশীলতা ও জনবান্ধব রাজনৈতিক চর্চার একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরও ইতিবাচক ও আধুনিক ধারায় এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মাধ্যমে অর্জিত সমঝোতা ও সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।

মন্তব্য

মতামত
Ashtagrams traditional cheese industry in crisis despite GI recognition

জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও সংকটে অষ্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পনির শিল্প

* শিল্পটিকে বাঁচাতে হিমাগার স্থাপনের দাবি এলাকাবাসীর * শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখতে লড়ছে পনির কারিগররা * বর্ষাকালে দুধের সংকটে বেড়ে যায় উৎপাদন ব্যয়
জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও সংকটে অষ্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পনির শিল্প ছবি: সংগৃহীত

নদীর জল, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ আর রূপালি ঢেউয়ের মায়াজালে ঘেরা এক জনপদ কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম। তবে কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, ঐতিহ্যবাহী পনিরের সাথে এই হাওর উপজেলার আরেকটি বড় পরিচয় জড়িয়ে আছে এক অনন্য স্বাদ ও সুবাসে। শত বছরের প্রাচীন এই 'হোয়াইট গোল্ড' বা সাদা সোনা আজ দেশজুড়ে প্রশংসিত।

গত বছর এই পনির পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের অমূল্য স্বীকৃতি, যা এই শিল্পকে নিয়ে গেছে এক আন্তর্জাতিক উচ্চতায়। কিন্তু এই জৌলুসের আড়ালে অষ্টগ্রামের পনির কারিগর ও ব্যবসায়ীদের দিন কাটছে চরম সংকট আর অস্তিত্বের লড়াইয়ে। বাইরে থেকে যা উৎসবমুখর মনে হয়, ভেতরের বাস্তব চিত্রটা আসলে নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত।

অষ্টগ্রামের পনিরের মূল প্রাণ হলো খাঁটি দুধ। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে এই পনির বুঝি কেবল মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি। ঐতিহাসিকভাবে মহিষের দুধের পনিরের সুখ্যাতি থাকলেও, বর্তমানে চারণভূমি হ্রাসের কারণে হাওরে মহিষের সংখ্যা বেশ কম। ফলে এখন অষ্টগ্রামের পনিরের সিংহভাগই উৎপাদিত হয় গরুর খাঁটি দুধ থেকে। এই পনিরের উৎপাদন ও গবাদিপশু পালনের সাথে জড়িয়ে আছে হাওরের এক অদ্ভুত ঋতুচক্র।

শুকনো মৌসুমে যখন মাইলের পর মাইল চোখ জুড়ানো সবুজ মাঠ জেগে ওঠে, তখন পশুখাদ্য বা চারণভূমির কোনো অভাব থাকে না। চারদিকে তখন দুধের প্রাচুর্য দেখা যায়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে বর্ষাকালে। বর্ষার উত্তাল জলরাশি যখন পুরো হাওরকে গ্রাস করে, তখন চারণভূমির তীব্র সংকট দেখা দেয়। চারিদিকে শুধু পানি থাকায় গবাদিপশু নিয়ে কৃষকদের চরম বিপাকে পড়তে হয়, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ে পনিরের বাজারে।

বর্ষার এই সংকটের কারণে বছরের একটি দীর্ঘ সময়জুড়ে এখানে তীব্র কাঁচা দুধের সংকট দেখা দেয়। ফলে দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় পনির উৎপাদনের খরচও হয়ে যায় আকাশচুম্বী। এই প্রাকৃতিক সংকটের সাথে যোগ হয়েছে কারিগর ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক অসচ্ছলতা। বংশানুক্রমিকভাবে এই পেশা ধরে রাখলেও অর্থনৈতিকভাবে তারা অত্যন্ত প্রান্তিক। পুঁজির অভাব এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ বা সরকারি আর্থিক প্রণোদনা না থাকায় অনেকেই এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন; কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন পেশা পরিবর্তন করতে।

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ ও আধুনিকায়নের সমস্যাও এই শিল্পকে দারুণভাবে পিছিয়ে রেখেছে। সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর মতো আধুনিক সাপ্লাই চেইন বা ই-কমার্স নেটওয়ার্ক এখনো এখানে গড়ে ওঠেনি। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের হাতে পড়ে প্রকৃত কারিগররা প্রায়শই ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

এর চেয়েও বড় জটিলতা দেখা দেয় পনির সংরক্ষণের ক্ষেত্রে। কাঁচা দুধে তৈরি এই পনির অত্যন্ত পচনশীল ও সংবেদনশীল। এটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করতে হয়। অথচ দুর্গম এই হাওর অঞ্চলে পনির সংরক্ষণে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত কোনো হিমাগার গড়ে ওঠেনি। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে পনির নষ্ট হয়ে ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়।

দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পনির ব্যবসার সাথে জড়িত অষ্টগ্রামের তোরাব আলী এই প্রতিনিধিকে ক্ষোভ ও আক্ষেপের সুরে জানান, ”পনিরের জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমাদের আনন্দ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এই স্বীকৃতি কেবল কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। এই স্বীকৃতির পর বাস্তবে এ পর্যন্ত আমরা তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা বা সরকারি সাহায্য পাইনি। চারণভূমি আর হিমাগারের অভাবে দিন দিন পঙ্গু হয়ে যাচ্ছি।" ঐতিহ্যবাহী এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সরকারের কার্যকর ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিলভিয়া স্নিগ্ধা বলেন, "আমরা পনিরের এই প্রাচীন ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। ইতিমধ্যেই পনির ব্যবসায়ীদের সাথে সরাসরি কথা বলে তাদের বিদ্যমান সমস্যা এবং বিভিন্ন চাহিদার কথা বিস্তারিত লিখিতভাবে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচাতে দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর অষ্টগ্রামের পনির এখন শুধু কিশোরগঞ্জের নয়, পুরো বাংলাদেশের এক অনন্য গৌরব। তবে এই আন্তর্জাতিক সিলমোহর তখনই সার্থক হবে, যখন এই শিল্পের পেছনের মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটবে। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে বর্ষাকালের জন্য বিকল্প পশুখাদ্যের (যেমন সাইলেজ বা উন্নত খড়) ব্যবস্থা, সরকারি উদ্যোগে আধুনিক হিমাগার স্থাপন, কারিগরদের জন্য জামানতবিহীন স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি সুদূরপ্রসারী পৃষ্ঠপোষকতা আর আধুনিক উদ্যোগই পারে শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

মন্তব্য

p
উপরে