× হোম রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া সিটিজেন জার্নালিজম বিচিত্র ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য আফগানিস্তান ১৫ আগস্ট কী-কেন স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও যৌনতা-প্রজনন ইউরোপ অন্যান্য উদ্ভাবন প্রবাসী আফ্রিকা ক্রিকেট শারীরিক স্বাস্থ্য আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়া সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ মানসিক স্বাস্থ্য ব্লকচেইন অন্যান্য ভাষান্তর ফুটবল অন্যান্য পডকাস্ট বাংলা কনভার্টার নামাজের সময়সূচি আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

মতামত
The plight of digital Bengali language
google_news print-icon

ডিজিটাল বাংলা ভাষার দুর্দশা

ডিজিটাল-বাংলা-ভাষার-দুর্দশা
ডিজিটাল বাংলার এই রূপ দেখে মনে হয়, দপ্তরগুলো যেন ধরেই নিয়েছে ওসব লেখা কেউ পড়বে না; পড়ে সময় নষ্ট করার মতো গাঁজাখুরি কাজ কেউ কোনোদিন করবে না! কিন্তু তারা কি ভেবেছেন, এই সরকারি বাংলা প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের তরফে বাংলা ভাষার উপস্থাপন। ভুলে ভরা এই বাংলা কি এটাই বোঝায় না যে, রাষ্ট্র বা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলার কোনো অর্থমূল্য বা সাংস্কৃতিক মূল্য নেই।

গত দুই দশকে বাংলাদেশের বাংলা ভাষা নতুন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে; তার নাম হতে পারে ডিজিটাল বাস্তবতা। আমরা এখন যান্ত্রিকভাবে লেখাকে বিন্যস্ত করতে পারি। আর তাই মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটারের পর্দায় বাংলা ভাষাকে আমরা উৎপাদিত ও পুনরুৎপাদিত হতে দেখি। বই, পত্রিকাসহ বহুবিধ প্রকাশনা আজ ঠাঁই নিয়েছে ডিজিটাল পর্দায়। এক সময় সাইন বোর্ড, ব্যানার, পোস্টার, বিজ্ঞপ্তি লেখা হত হাতে। এখন আর তার প্রয়োজন পড়ে না।

প্রযুক্তির সহায়তায় প্রচারিত এই বাংলা ভাষাকেই বলতে পারি ‘ডিজিটাল বাংলা’। নতুন এই বাংলার প্রয়োগ ও প্রচারে সরকারি, বেসরকারি নানা উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হবে। কিন্তু একইভাবে গভীর শোকের সঙ্গে বলতে হবে, ভালো নেই ডিজিটাল বাংলা ভাষা; যার বিস্মৃতি-অযোগ্য প্রমাণ: ‘মুজিব বর্ষ’কে ‘মুজিবর্ষ’ হিসেবে উপস্থাপন। সামান্য চোখ বুলালেই দেখতে পাব, ভাষাটি ডুবে আছে দুর্দশার অতলে। ডুবে থাকার সেই বৃত্তান্তে সরকারি বাংলাই সব চেয়ে বেশি দুর্দশাগ্রস্ত।

দুর্দশা চিহ্নিতকরণে প্রধান মানদণ্ড হতে পারে রীতিসিদ্ধ ব্যাকরণ এবং বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম। উল্লেখ্য যে, ২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর সরকারি কাজে বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানের নিয়ম অনুসরণের নির্দেশ জারি করেছিল বাংলাদেশ সরকার। সরকারি পরিপত্রে ‘বানানের শুদ্ধতা’ ও ‘ভাষারীতির সমরূপতা’র প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। সরকারি ওই ঘোষণার লক্ষ্য ছিল, ‘সরকারি কাজে বাংলা ভাষার সামঞ্জস্য বিধান।’ এই পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রকাশনা নিয়ে এসেছিল: সরকারি কাজে ব্যবহারিক বাংলা (২০১৫) এবং সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম (২০১৭)। এসবের অনুসরণে বাংলাদেশের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোর যে প্রান্তেই চোখ রাখি না কেন, দেখতে পাব ভুলের অবিরল চিহ্ন।

রাষ্ট্রপতির দপ্তর: শীর্ষ থেকে শুরু

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ওয়েব সাইটে চোখে পড়ে বানানের সমন্বয়হীনতা, ভুল বানান, সংশয়। আর তাই একই সঙ্গে সেখানে আছে: কার্যাবলি/ কার্যাবলী, গ্যালারি/ গ্যালারী। ভুল বানানে লেখা হয়েছে: মুল, পুনঃর্বাসন, হত্যাকান্ড, স্বীকৃতিস্বরুপ, গুরুর্তপূর্ন, শরনার্থী, ব্রাহ্মনবাড়িয়া। বাংলা একাডেমির প্রমিত বানান অনুসরণ না করে লেখা হয়েছে: জানুয়ারী, আবুধাবী, সৌদী আরব, জার্মানী, ইতালী। এমনকি ‘বাঙালি’কে লেখা হয়েছে ‘বাঙ্গালী’। বিভক্তির প্রয়োগে আছে দ্বিধা; তাই লেখা হয়েছে: রিপোর্ট এর, পাকিস্তান-এর। কিশোরগঞ্জ হয়েছে কিশোগঞ্জ। শব্দের শেষে বিসর্গ বর্জিত হলেও লেখা হয়েছে: মূলতঃ।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির জীবনাখ্যান থেকে শুরু করে বিজ্ঞপ্তি ও লেখায় নজরে পড়বে নানা ধরনের ভুল। শিক্ষা সংক্রান্ত কাজ প্রসঙ্গে তিনটি লাইন লেখা হয়েছে; তার মধ্যে আছে দুটি ভুল। বহুবচন ব্যবহারে সমস্যা দেখা যাচ্ছে; যেমন : ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের চ্যান্সেলর।’ একই বাক্যে বসেছে ‘সকল’ ও ‘সমূহ’। শেষ বাক্যে সমাবর্তন শব্দটিকে লেখা হয়েছে ‘সমার্বতন’। রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম বিষয়ে লেখা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে বঙ্গভবনে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস, বিজয় দিবস, ঈদ-উল-ফিতর, ঈদ-উল-আযহা, দুর্গাপূজা, জন্মাষ্টমী, বুদ্ধপূর্ণিমা এবং বড়দিন উপলক্ষে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। দেশি বিদেশি বিভিন্ন শ্রেণি পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।’ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে? নাকি বঙ্গভবনের উদ্যোগে? দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেন? নাকি ‘এ ধরনে’র অনুষ্ঠানে অংশ নেন?

বাদ যায়নি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ওয়েবসাইটেও খুঁজে পাওয়া যায় বিচিত্র ধরনের ভুল। আরবি-ফারসি উৎসজাত আপস শব্দটিকে লেখা হয়েছে আপোষ। দপ্তরগুলো সম্ভবত সমঝোতায় আসতে পারেনি যে, শহিদ লিখবে, নাকি শহীদ। অকারণে দুটি শব্দকে যুক্তভাবে করা হয়েছে। যেমন : এরফলে, বেশকিছু, শান্তিরবৃক্ষ। লিডারশিপ শব্দটিকে লেখা হয়েছে লিডারশীপ; যুক্তরাষ্ট্র হয়ে গেছে ‍যুক্তরাস্ট্র, স্বয়ম্ভরতা হয়ে গেছে সয়ম্ভরতা। প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘দরিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য।’ প্রশ্ন থেকে যায়, দরিদ্র্য বিমোচন, নাকি দারিদ্র্য বিমোচন? গরিবি না কমালে গরিব কমবে কী করে? প্রধানমন্ত্রীর বইগুলোর নাম উল্লেখ করতে গিয়ে যথাযথভাবে উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহার করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে পাওয়া যাচ্ছে: ধ্বস, অন্তভুক্তিকরণ, উদ্বাস্ত, মূদ্রা, স্বয়-সম্পূর্ণ, অন্তভুর্ক্ত, তদুর্ধ্ব ইত্যাদি বানান।

শিক্ষা সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়: ভাষার দুর্গতি

বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগের মর্মান্তিক নিদর্শন শিক্ষা সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটগুলো। সেখানে বানান ও ব্যাকরণের অজ্ঞতা ব্যাপকভাবে চোখে পড়ে। পাশাপাশি আছে উদযাপন ও উদ্যাপন, ডিগ্রি ও ডিগ্রী। পাওয়া যাচ্ছে, সময়কালে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সাইটে প্রাপ্ত ভুল বানান : সম্মূখ, ওয়াকশপ, লীড, ভূক্তি, বিতরন, অংগ, পাঠ্যপুসত্মক, ডিগ্রী, ভূক্ত, পরিবীক্ষন, গ্রহন, কাযকারিতা, বস্তনিষ্ঠা, নৃতাত্বিক, ঝুকি, দেশাত্ববোধ, পরিমন্ডল, সংশিষ্ট, গুরত্ব, প্রনয়ণ, প্রনোদনা ইত্যাদি। তে, কে, এর রূপ হয়েছে এরকম: কর্মসূচি-তে, সমিতি-কে, যোগ্যতা-র। বাংলা ও রোমান হরফের মিশ্রণে লেখা হয়েছে: ‘32 হাজার 667 টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম স্থাপন করা হয়েছে।’ একটি অংশে বলা হয়েছে: ‘মাধ্যমিক পর্যায়ে পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কারণ।’ অভিধানে সংস্কারণ শব্দটির হদিস পেলাম না। আরেকটি অংশে পেলাম, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি/গভর্নিং বডি পূর্ণ:প্রতিষ্ঠা।’ কোলনযুক্ত বা কোলনছাড়া ‘পূর্ণ:প্রতিষ্ঠা’ বলতে কোনো শব্দ আছে কি?

‘এবং’ ব্যবহারের নমুনা দেখা যাক: ‘এই সংস্থা শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান সংরক্ষণ এবং প্রকাশ করে থাকে এবং মন্ত্রণালয়ের ইএমআইএস অংগ হিসেবে কাজ করে।’ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড সম্পর্কে লেখা হয়েছে: ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এটি একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান।’ স্বায়ত্বশাসিত বানানটি ভুল। পাশাপাশি আছে, এটি ও একটি। একটু পরেই পাওয়া যাচ্ছে ‘ইহা’ – ‘ইহা মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানসম্মত শিক্ষা উন্নয়নের নিমিত্ত পরিদর্শন ও নিরীক্ষার দায়িত্ব পালন করে থাকে।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় লিখেছে: মিসন, রুপকল্প, কর্মবন্টণ, অধিনস্ত। মন্ত্রী মহোদয়ের পরিচিতি অংশে লেখা হয়েছে, তিনি রৌমারী উপজেলার যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা ‘আহব্বায়ক’। আরও দুঃখজনক ব্যাপার এই যে, মন্ত্রী মহোদয়ের নামের নিচে লেখা ‘মন্ত্রনালয়’ বানানটি ভুল। আওয়ামী লীগ শব্দ দুটিকে বারবার যুক্তভাবে লেখা হয়েছে : আওয়ামীলীগ। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি লিখেছে একাডেমী, স্বায়ত্বশাসিত, লক্ষ্য এবং উদ্দ্যেশ্য, সমুহ, অভিক্ষাপদ, প্রণয়ণ, অন্তর্ভূক্ত, বিশ্লেষন, বছরগুলু। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাইটে পাচ্ছি: বন্টন, অধীনস্ত, পরবর্তীতে, গনশিক্ষা, মন্ত্রনালয়, প্রাইমারী। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের সাইটের ব্যানারে লেখা হয়েছে ‘পরিবীক্ষন।’ এই সাইটে মাননীয় মন্ত্রীর নামের নিচে গণশিক্ষা শব্দটিকে লেখা হয়েছে গনশিক্ষা। কোষ শব্দটিকে লেখা হয়েছে কোস: ‘পরিবীক্ষণ কোস/সেল’। মজার ব্যাপার হলো, অফিসের পরিচিত অংশে একই প্যারা দুবার লেখা হয়েছে। নিশ্চিতকরণ বানানটিকে লেখা হয়েছে নিশ্চিৎকরণ।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর সাইটে আছে রীতিগত মিশ্রণ। তবে সামগ্রীক, সহযোগীতা, সরকারী, বেসরকারী, কর্মকান্ড ইত্যাদি নজরে পড়ে সবার আগে। এই সংস্থার ‘আউট অব স্কুল চিলড্রেন এডুকেশন প্রোগ্রাম’-এর সাইট জুড়ে চোখে পড়ে অসহনীয় ভুল। এমনকি প্রোগ্রামটির স্লোগানে থাকা দীক্ষা শব্দটিই লেখা হয়েছে ভুল বানানে: ‘সেকেন্ড চান্সে হবে দিক্ষা/ সকল শিশু পাবে শিক্ষা।’ আমার মনে হয়, প্রোগ্রামের উদ্যোক্তাদের সবার আগে শিক্ষা দেয়া দরকার। আরেকটি স্লোগানে আছে: ‘সেকেন্ড চান্সে লেখাপড়া/ গুনে মানে জীবন গড়া।’’ গুন বানানটি ভুল। শুধু তা-ই নয়, বৈশিষ্ট্যকে লেখা হয়েছে বৈশিষ্ঠ্য: ‘শিখন কেন্দ্রের বৈশিষ্ঠ্য’; বিশিষ্ট হয়েছে ‘বিশিষ্ঠ’, শ্রেণিকক্ষ হয়েছে ‘শ্রেনীকক্ষ’। আরও ভুল: বহির্ভুত, অভীষ্ঠ, বাস্তবায়ীত, সুষ্ঠ। এখানেও পাওয়া যাচ্ছে রীতিগত মিশ্রণ - ‘তাহাই কোহর্ট মডেল।’

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ লিখেছে: পরিক্ষা, দুরুহ, সৃতিময়, সূবর্ণজয়ন্তী। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন লিখেছে: পরীক্ষন, অন্তর্ভূক্ত, প্রস্তত, জবাবদিহীতা, সুবিধাদী, কর্মকান্ড, প্রাসংঙ্গিক, উদিয়মান, জাতয়ি, শক্তিশালীকরন। পাশাপাশি আছে: মন্ত্রণালয়/ মন্ত্রনালয়, পূরণে/ পূরনে। বাংলা লেখায় বাংলা সংখ্যার পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছে রোমান সংখ্যা : 1টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, 4 লক্ষ শিক্ষার্থী।

বৃক্ষ তোমার নাম কী?

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি শাখার একটিতে আছে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা। মাদ্রাসা শিক্ষা বিষয়ক আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’। আবার দেখা যাচ্ছে, কারিগরী শিক্ষা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। প্রশ্ন জাগে, কোনটি ঠিক– মাদ্রাসা, না মাদরাসা? জাতীয় তথ্য বাতায়নে দ-এর নিচে হসন্ত প্রয়োগ করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সাইটে এক জায়গায় লেখা হয়েছে: মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। আরও কিছু ভুল ও অপপ্রয়োগ: উল্লেখেযোগ্য কার্যাবলী, ভূক্ত, অধদিপ্তর, এমপওি, ভূক্তকরণ, লক্ষ্য-ও-উদ্দেশ্য, আধুনিকীকরন, যুগোপযোগি, জবাবদিহীতা, বাঙালী, বিবচনা, পূরন, গুনগতমান, তদারকী, কর্মকান্ড, প্রনয়ন, প্রতিষ্ঠান্ সমুহ, তৈরী, তত্বাবধান, অধিনস্ত। মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সাইটে ভুল বানানের ছড়াছড়ি। যেমন: ম্লোগান, চৌধরী, যতদুর, শীর্ষখ প্রকল্প, মোদরাসা, পুরুস্কার। অভ্যুদয় শব্দটিকে দুবার লিখেছে ‘অদ্ভুদয়’: ‘‘বাংলাদেশের অদ্ভুদয় ঘটে।’’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়: ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট জুড়েও আছে এ জাতীয় ভুল। যদিও এ মন্ত্রণালয়ের ভাষা বিষয়ক কাজ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এর অধীন আছে বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষ। মন্ত্রণায়লটির খুব প্রিয় শব্দ ‘এবং’; কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক, ‘সার্ভিস এবং পদের শ্রেণিবিন্যাস সংক্রান্ত নীতি এবং এগুলোর মর্যাদা নির্ধারণ।’, ‘দেশে এবং বিদেশে প্রকল্পে এবং চাকরিতে বিশেষজ্ঞ/পরামর্শক হিসেবে কাজ করার নিমিত্ত সরকারি কর্মচারীদের মনোনয়ন।’, ‘সরকারি কার্যাদি উন্নততর এবং সাশ্রয়ীভাবে নির্বাহ করার জন্য প্রশাসনিক গবেষণা, ব্যবস্থাপনা এবং সংস্কার।‘, ‘সরকার এবং স্বায়ত্বশাসিত সংস্থা, কল্যাণ এবং যৌথ বিমা তহবিল এবং কল্যাণ মঞ্জুরি’র প্রশাসন এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিষয়াদি।’ তারা লিখেছে: আত্তীকরণ, মঞ্জুরিকরণ, সহজিকরণ ও সহজীকরণ। বিভক্তির প্রয়োগ নিয়ে দ্বিধা তাদেরও আছে; তাই লেখা হয়েছে ‘পরিসংখ্যান-এর সংকলন’, ‘এই মন্ত্রণালয়ের’, ‘অন্যান্য ক্যাডার এর’। স্বায়ত্তশাসিত শব্দটিকে তারা ঠিকভাবে লেখেনি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও লিখেছে: কর্ণার, গ্যালারী, দায়িত্বাবলী, শ্বাশত। এই মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমি লিখেছে, পরবর্তীতে, জৈষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, শুধুমাত্র, গুরত্বপূর্ণ, নাগরিক এর, কর্মকান্ড, গুরূত্ব, ত্বাত্তিক, ইংরেজী, দূর্নীতি ইত্যাদি।

বানান কল্যাণ মন্ত্রণালয়?

সরকারি বাংলার দশা আরও বেশি নাজুক ছোট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর ওয়েবসাইটে। অপপ্রয়োগ ও অসচেতনতায় বাংলা ভাষার চেহারা ম্লান ও বিষণ্ন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত পরিচিতিমূলক প্রথম বাক্যই ভুল; ওখানে বলা হয়েছে, ‘সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের পিছিয়েপড়া এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কল্যাণ, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন সাথে সংশ্লিষ্ট একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়।’ এই বাক্যে লুকিয়ে আছে ব্যাকরণগত বিচ্যুতি। আছে বানান ভুল: কর্মকান্ড, জারী। অপপ্রয়োগ: সাম্যতাবিধান।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সাইটে পাচ্ছি: বদলী, আদেশাবলী, আপীল, গ্যালারী, দূর্নীতি, জরুরী। সমাজসেবা অধিদফতর লিখেছে: বিস্তৃত্তি, জাতিগঠণমূলক, স্বার্থক, আয়ত্বাধীন, কিডনী, প্রতিয়মান, সমুহ, গরীব, বেশী, মানদন্ড, বাড়ী, নিয়ন্ত্রনকারী। বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ লিখেছে: সমুহ, গরীব, কারিগরি, উদ্ভুত, নির্মান, জলবায়ূ, পরবর্তি, উদ্ভত, গবেষনা, প্রকাশণা, অনুদান বিতরন।

ভুলের সমুদ্রে মুদ্রণ ও প্রকাশনা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের সাইটে ব্যবহৃত বাংলা ভুলে ভরা। প্রযুক্তির কারণে সৃষ্ট ভুল মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু অজ্ঞতা ও অসচেতনতা ক্ষমার অযোগ্য। সাইটের ব্যানারে গণপ্রজাতন্ত্রী শব্দটিকে লেখা হয়েছে: গনপ্রজাতন্ত্রী। শিল্প এলাকা হয়েছে শিল্ল এলাকা। স্টেশনারি শব্দটির বহুরূপী বানান চোখে পড়েছে: স্টেশনারী, ষ্টেশনারী। ষ-কেন্দ্রিক ভুলের তালিকায় আছে: ষ্ট্যান্ডার্ড, ষ্ট্যাম্প। ভুলের তালিকায় আছে: সৃস্টি, ব্যবস্হাপনা, সংস্হার, নিম্নরুপ, নিবাচনী, প্রধানগন, বন্টন, গুরুত্বপূর্ন। বগুড়াকে লেখা হয়েছে বগুরা, চট্টগ্রাম হয়ে গেছে চট্রগ্রাম। রীতিগত মিশ্রণের কারণে লেখায় ঢুকে পড়েছে ইহা, তাঁহারা।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বিষয়ক সভার (১৮ মার্চ ২০২১) কার্যবিবরণীতে দেখা যাচ্ছে কয়েক রকম ভুল: সর্বশ্রেষ্ট বাঙ্গালি, অত:পর, আলোকসজ্জায় সজ্জিতকরণ, মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার, সুবর্ণজয়ন্তী কর্ণার। অথচ প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, ‘মানসম্মত মুদ্রণ, প্রকাশনা ও সরবরাহ সেবার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অনন্য ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।’

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়: এত ভুল সইব কেমন করে?

মন খারাপ করা ভুলের সমাহার দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। ক্রিয়ার কাল, বানান, শব্দ প্রয়োগ– প্রতিটি ক্ষেত্রে পাওয়া যাবে ব্যাপক ভুল। মন্ত্রণালয়ের কার্যাবলি বোঝাতে গিয়ে লেখা হয়েছে কার্য়াবলী। কর্মসূচি হয়েছে কর্মসূচী। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রাসঙ্গিক ২৩ পৃষ্ঠার একটি লেখায় আছে অসংখ্য ভুল বানান। বঙ্গ লিখতে গিয়ে যোগ করা হয়েছে বাড়তি চন্দ্রবিন্দু– বঙ্গেঁর। বাঙালি রূপ পেয়েছে বাঙ্গালী। ভুল বানানের ছোট্ট একটি তালিকা: স্বায়ত্বশাসন, বিশববিদ্যালয়, উন্মক্ত, আহবান, হত্যাকান্ড, বহির্বিশব, বিশেবর, খন্ড, প্রাঙ্গন। বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে ঈ-কার, ঊ-কার: জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী, উর্দূ। ইংরেজি উৎসজাত শব্দে ষ ব্যবহার করে লেখা হয়েছে: ব্যারিষ্টার, কমিউনিষ্ট। আবার দন্ত্য স-এর জায়গায় এসে গেছে মূর্ধন্য ষ: শাষকগোষ্ঠী। অপপ্রয়োগের উদাহরণ হিসেবে আছে: পরবর্তীতে, সময়কালে। গভীর মর্মবেদনার বিষয় হলো ব্যক্তিনামের ক্ষেত্রে ভুল; ইতিহাস প্রাসঙ্গিক লেখাটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি তারা সম্ভবত একবার শুদ্ধভাবে লিখতে পেরেছে।

তথ্য, সম্প্রচার, ভাষা ও প্রযুক্তি: বিরহী সম্পর্ক

বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে। কিন্তু এই বিভাগের সাইটেও পাওয়া যাচ্ছে বানান-বিভ্রাট। তারা লিখেছে: কোম্পানী, ফেব্রুয়ারী, অভীষ্ট্য, সমুহ, ইর্ন্টানশীপ, ইংরেজী, স্বরুপ। এই সাইটে বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে ‘হাজার বছরের শেষ্ঠ বাঙালি’। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের সাইটে পাচ্ছি: কর্মকান্ড, রক্ষণাবেক্ষন, উদ্ধুদ্ধকরণ, জনগন, বিরুপ, ক্ষতিগ্রস্থ, তদুর্ধ, সচ্ছ, পরবর্তীতে, মন্ত্রানালয়। লিখেছে: প্রাদুর্ভাবকালীন সময়ে, বাস্তবায়নের সময়কাল।

শব্দের শেষে বিসর্গ বাদ দেবার কথা থাকলেও তথ্য ও যোগাযোগ অধিদপ্তর লিখেছে: বিশেষতঃ। একটি বাক্য খেয়াল করা যাক: ‘তথ্য ও যো’গাযোগ প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট আইন, নীতিমালা, গাইডলাইন ও প্রমিতকরণ প্রস্তুতকরণ।’ ‘প্রমিতকরণ প্রস্তুতকরণ’ ব্যাপারটি কী? এরকম অনেক বাক্য পাওয়া যাবে, যেগুলো গঠনগত দিক থেকে দুর্বল ও দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে।

এবার বাংলা বাক্যে দেখা যাক ইংরেজির শোভা: ‘করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন সংগ্রহের শুরু থেকেই এই টিম কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট শুরু করে।’ মজার ব্যাপার হলো, এই অধিদপ্তর থেকে সম্পন্ন হয়েছে ‘সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও ভাষা প্রশিক্ষণ ল্যাব স্থাপন’ প্রকল্প।

ভুল বানানের মেলা বসেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে। সিটিজেন চার্টারের পাতায় পাতায় দেখা যায় বানান বিষয়ক দ্বিধা; তারা লিখেছে: বানিজ্য, আমাদানী, রপ্তানি, অঙ্গিকারনামা, পরিমান, মুল কপি, চেকলিষ্ট, সলভেনসী, স্বচ্ছলতা। একই লেখায় রেখে দিয়েছে দুটি বানান: কাহিনী/কাহিনি, নির্মান/নির্মাণ; সরকারি ঠিক থাকলেও বেসরকারি হয়ে গেছে বেসরকারী।

কোলন, হাইফেনের অসতর্ক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। বিসর্গের বদলে কোলন এবং কোলনের বদলে বিসর্গ ব্যবহারের উদাহরণ দেখা যায় অহরহ। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিসর্গের বদলে লিখেছে কোলন; যেমন: আন্ত:ব্যক্তিক যোগাযোগ, আন্ত: বিদ্যালয়। কোলনের বদলে বিসর্গ উপস্থিত: অর্পিত দায়িত্বঃ। অন্য অনেক মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সাইটেও এ জাতীয় প্রয়োগ পাওয়া যাবে।

ভুলের জগতে পর্যটন

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের সাইট ঘুরে আসার মানে হলো ভুলের জগত পর্যটন করে আসা। ট্যুরিজম বোর্ড লিখেছে: প্রতিযোগীতা, সউদী আরব, মন্ডিত, প্রত্ম, সম্ভাভ্যতা, রিকোভারী, গভর্ণিং বডি, বৈশিষ্ঠ্যতা, বর্হি:বিশ্ব, ভাবমুর্তি, তিঁনি, কারন, শ্রমঘণ শিল্প, অনুষংগ, প্রনয়ণ, নির্মান, ক্ষতিগ্রস্থ, বিনির্মান, ঘনিষ্ট, কর্মসুচি, সভাপত্বিত, প্রতীকি, কর্ণার, কতৃক, ফেষ্টুন, এঁর, ডকুমেন্টারী, পুরুস্কার, সূযোদয়, উত্তোলণ, প্রাথর্না, ঘোষনা। পর্যটন করপোরেশন লিখেছে: সুদূর প্রসারি, সৃস্টি, আকর্ষন, বিপণী, আমদানী, শুরুকরে, স্বায়ত্বশাসিত, এষ্টেট, প্রনয়ণ, পর্যটনক, জলকষ্ঠ, জরীপ, রেললাইস। নিজেদের কাজ সম্পর্কে করপোরেশন লিখেছে, ‘প্রকৃতি ও নৃতাত্ত্বিক ভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজমকে উনড়বয়ন করা।’

উনড়বয়ন? ফন্ট বদল? প্রযুক্তির হস্তক্ষেপ?

কলঙ্ক মাখা চাঁদ

অজস্র ভুল বানান ও অপপ্রয়োগের দৃষ্টান্ত বহন করছে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট। সুন্দর ও বহুমাত্রিক পরিকল্পনানির্ভর একটি তথ্যপূর্ণ সাইট হওয়া সত্ত্বেও এটি ভুল বানান ও ব্যাকরণের কাছে মার খেয়ে গেছে। ভুল বানানে লেখা হয়েছে: জাতিসত্ত্বা, ব্রষ্মপুত্র, উপনিত, নিপুন, রুপকল্প, আকষনীয়, কর্মকান্ড, অলঙ্ককরণ, মন্ডিত, গ্রামীন, কর্ণার। ‘দক্ষিণ-পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা’কে লেখা হয়েছে ‘দক-পশ্চিমে থীতলক্ষ্যা।’’ মহিলারা হয়েছে মাহলারা। একই লেখায় আছে জামদানি ও জামদানী। সোনারগাঁয়ের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে লেখা হয়েছে ‘শ্যামললিমা’। বিভ্রান্তিকর একটি বাক্য পড়া যাক: ‘সেই সঙ্গে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের বয়নশিল্পের কমপরিবেশ ও বিপণন চিত্রে তুলা থেকে বস্ত্র তৈরির সামগ্রিক ধারাবহিক চিত্র প্রদর্শন করা হয়েছে।’ দুর্বোধ্য বাক্যের নজির আরও আছে; আরও পড়া যাক: ‘‘সুশৃঙ্খল সূত্রমাফিক তৈরি করা হলেও কারুশিল্পে থাকে ঐতিহ্যের সমাচার। এরপরও তা সৃজনশীলতা পাশাপাশি বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বাংলাদেশের কারুশিল্প ও কারুশিল্পীদের অবদান অনস্বীকার্য। আবহমানকাল থেকেই এদেশের লোক ও কারুশিল্প নিজ নিজ ধারায় প্রবহমান।’

পড়ুয়ারা কেমন পড়েন?

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাইটে আছে: অঙ্গণে, সংগহ, সাঈজ, মূদ্রণ, তরান্বিত, বেসরকারী, জনসাধারন। রীতিগত মিশ্রণও পাওয়া যাচ্ছে: প্রতিবছর সদস্যতা নবায়ন করতে হবে নতুবা সদস্যতা বাতিল বলে গণ্য হবে। গ্রন্থ ও উন্নয়ন যোগে গ্রন্থোন্নয়ন শব্দটিকে লেখা হয়েছে গ্রন্থন্নোয়ন।

গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের কাজ সংক্রান্ত তালিকায় প্রাপ্ত ভুল বানান: প্রদর্শণী, পুণর্গঠন, ভ্রাম্যমান। গ লোপ পেয়ে গণতন্ত্র শব্দটি হয়ে গেছে ‘ণতন্ত্র’। ইন্টারনেট সেবা প্রদানের নীতিমালার একটি পৃষ্ঠায় পাওয়া গেছে: পরবর্তীতে, চলাকালীন সময়, অনাকাংখিত, জরুরী। এ ছাড়া পাওয়া যাচ্ছে: বিচ্ছুরন, স্মরনিকা। কমপ্লেক্স হয়েছে কমপ্রেক্স।

ভয়ানক দৃষ্টিকটু ভুলের সমাহার দেখা যাচ্ছে আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের সাইটে। দপ্তরটি শুধু প্রাচীন নথিপত্রেরই আরকাইভ নয়, বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগ ও ভুলেরও আরকাইভ। এখানে ঘুরে দেখা যাচ্ছে: বাড়ী, করাচী, বাঙ্গালি, পরিমান, সময়কাল, বিবরনী, ধারনা, কর্মকান্ড, পেীরসভা, অন্তর্ভূক্ত, উপনিবেশিক, প্রাকাশনা, পার্লামেন্টারী, ইউনিস্কো, বহুমূখী, চট্রগ্রম, শ্রেণিরর, গ্রন্থপুঞ্জি, পৃষ্টা, চাদা, আওতাভূক্ত, পত্রপেষ, আনুষাঙ্গিক, নির্মান, বিধী, অনুসরন, পান্ডিত, সংস্কৃতিক সংঘঠন, সংরক্ষন।

একটি বাক্য পড়া যাক: ‘বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগার আধুনিকায়ন শীর্ষক প্রকল্প দুটি চচঘই চলকান আছে।’ এর একটু পরেই আছে: ‘বর্তমানে জাতীয় গ্রন্থাগার মান উন্নয়ন শীর্ষক একটি চলমান চচঘই রয়েছে।’ আরেকটি বাক্য: ‘এখন জাতীয় গ্রন্থাগার ডিজিটাল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার মাথ্যমে সরকারের ম্যনিফেষ্টো পুরুণের চেষ্টা কওে চলেছে।‘’

আরও কিছু

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ওয়েব সাইট ঘুরেও দেখা যাবে ভুল। ব্যবহৃত হয়েছে ‘ব্যবহূত’। পাওয়া যাচ্ছে: আহবায়ক, উদ্যাপন, কংক্রীট, লাইব্রেরী। বিখ্যাত স্লোগানটিতে রাষ্ট্রভাষার বদলে পাওয়া যাচ্ছে: রাষ্টভাষা বাংলা চাই। র, য় বিভক্তি বিষয়ক সংকট পাওয়া যাচ্ছে: ইউনেস্কো-য়, ইউনেস্কো-র। বাংলাদেশ টেলিভিশন লিখেছে: উদ্ধোধন, ঘন্টা, পরবর্তীতে, অনুষ্ঠানসুচি, প্রচারসুচি, বহি:বিশ্ব, ইটালী, পান্ডুলিপি, স্পন্সরশীপ, তৈরী, পুন:প্রচার, এজেন্সী, রিয়োলিটি শো। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর লিখেছে: গণযোযোগ, সমপৃক্ত, কর্মকান্ড। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ লিখেছে গুরুপূর্ণ। শিল্পকলা একাডেমি লিখেছে: সংরক্ষন, উদ্দেশে। একই লেখায় একই সঙ্গে আছে একডেমি ও একাডেমী।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় লিখেছে: সার্কিট হাইজ, কমপ্রেক্স, বাড়ী, রক্ষণাবেক্ষন, দায়িত্ববলী, বাড়ি-ঘড়, ব্যবস্থপনা, পূনর্বাসন, পরিত্যত্ত, সমুহ, গবেষনা, অনুপ্রেরনা, তারুন্য, তৃণমুল, গুন, আবৃত্তি চর্চ্চা, মূলত: গুন; এই মন্ত্রণালয়ের সাইটের ব্যানারে লেখা হয়েছে ‘গৃহায়ন’; জাতীয় তথ্য বাতায়নে লেখা হয়েছে ‘গৃহায়ণ’। তারা বঙ্গবন্ধুর নাম লিখেছে শেখ মজিবুর রহমান।

ডিজিটাল বাংলা কি দায়সারা বাংলা?

ব্যাকরণ কিংবা নিয়ম না জানার ফলেই ভুলগুলো ঘটেছে, তাও নয়; এক ফরম্যাটের ফাইল থেকে অন্য ফরম্যাটের ফাইলে তথ্য গ্রহণ, বর্জন ও সংযোজনের কারণেও ভাষার বিচ্যুতি তৈরি হয়েছে। বাংলার ভেতর ঢুকে গিয়েছে রোমান হরফ কিংবা অন্য কোনো প্রতীক। আবার ভুল ফরম্যাটে তৈরিকৃত একটি জাতীয় বিজ্ঞপ্তি, নকশা, লোগো, টেমপ্লেট সব দপ্তরে প্রচারিত ও প্রদর্শিত হওয়ায় সেসব ভুল স্থায়িত্ব পেয়ে গেছে। যেমন: গ্যালারী, সিষ্টেম, ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় ইত্যাদি। এসব লেখা ‘ভুল’ কিংবা ‘নিয়মসিদ্ধ’ নয়, এই কথাটিই হয়তো কারো মনে পড়েনি। কিন্তু ভুল যে কারণেই ঘটুক না কেন, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত তা সংশোধন করে নেওয়ার সুযোগ ছিল। অথচ বছরের পর বছর থেকে গেছে একই ভুল। তাহলে কি সরকার, দপ্তর বাংলা ভাষার মান্যায়ন প্রক্রিয়াকে মেনে নেয়নি? কিংবা রাষ্ট্রের আইন এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন মেনে নেয়নি? রাষ্ট্র তো প্রমিত বাংলার সমর্থক।

কিছু সাইটের প্রশংসা না করলেই নয়। শব্দ, বানান, ব্যাকরণ, বিন্যাসগত দিক থেকে বাংলা একাডেমি, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের সাইট বেশ পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা দরকার, সরকারের জাতীয় তথ্য বাতায়ন সাইটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। খুব সহজেই দরকারি তথ্য এতে পাওয়া যায়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বলতেই হবে সরকারি বাংলার ভেতর কোনো সমন্বয় নেই। বানানের ব্যাপারে মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো স্বেচ্ছাচারী। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরলে দেখা যাবে একই শব্দের দুই-তিন রকম বানান। বাঙালি, বাঙালী, বাঙ্গালি, বাঙ্গালী নিয়ে মন্ত্রণালয়গুলোর ব্যাপক দ্বিধা। বহুবচনবাচক শব্দ নিয়েও আছে সংশয়; জাতীয় তথ্যবাতায়নে লেখা হয়েছে নীতিমালাসমূহ। মালার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমূহ। শব্দনির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের দরকারি মনোযোগ নেই। ইংরেজি থেকে বাংলা করতে গিয়ে সংস্কৃতের কাছে হাত পেতে বক্তব্যকে জটিল করে তুলেছে কোনো কোনো দপ্তর। ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু কর্নার’ লিখতে গিয়ে অনেক অফিস-দপ্তরই পীড়িত হয়েছে। কর্নার ও কর্ণার– দুভাবেই লেখা হয়েছে। লেখা হয়েছে: মুজিব বর্ষ ও মুজিববর্ষ।

‘র’ বিভক্তির প্রয়োগ নিয়ে কোনো কোনো দপ্তরের সংশয় চলে গেছে উন্মাদনার পর্যায়ে। লেখা হয়েছে: শেখ মুজিবুর রহমান এঁর, সংগ্রামী জীবনের এর উপর, দীপু মনি-র। দুঃখজনক তথ্য এই, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে লেখা হয়েছে ‘স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্ত্রী’।

সব মিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাকে বলা চলে ‘দায়সারা বাংলা’; এই বাংলার চর্চাকারীদের ভাবনা যেন অনেকটা এরকম: বাংলাদেশের একটি প্রধান ভাষা বাংলা– বাংলায় না লিখলে কেমন দেখায়, তাই লিখে দাও কয়েক ছত্র। কে বা কারা যে লেখে এই সব এক-দুই পাতার পরিচিতিমূলক গদ্য, সেও এক গভীর বিস্ময়। কেউ কেউ বলে থাকেন অফিসের কেরানিকুল এসব লিখে থাকেন, কম্পোজ করে থাকেন, বড় কর্তারা এসব পড়েও দেখেন না, কারণ পড়ে দেখার সময় তাদের নেই। কিন্তু এই বড় কর্তা ও ছোট কর্তার ভারসাম্যহীনতা কি কোনো অজুহাত হতে পারে?

অনুসিদ্ধান্ত

ডিজিটাল বাংলার দশা ও দুর্দশাকে ভাষাবিজ্ঞানের অবস্থান থেকে ভাবা যেতে পারে। কয়েকটি অনুসিদ্ধান্ত আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে:

এক. বাংলাদেশে প্রচলিত বাংলার প্রমিতায়ন বা মান্যায়ন বিষয়ক ভাবনার প্রয়োজন আছে। নতুন প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিদ্যাজাগতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশের বাংলা ভাষার মান্যায়ন প্রসঙ্গে দরকারি চিন্তা করা যেতে পারে।

দুই. প্রমিতায়ন সংশ্লিষ্ট কাজের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমিকে চিহ্নিত করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সকল ধরনের শিক্ষাকেন্দ্র, শিক্ষা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান, ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম বিষয়ক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ইত্যাদির সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। ভাষার প্রয়োগ ও অপ্রয়োগকে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে সবার আগে।

তিন. প্রযুক্তি মাধ্যমে বাংলা সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। ভাষাবিজ্ঞানের ভাষা-পরিকল্পনা নামক শাস্ত্রটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার আধুনিকায়নের কথা বলে থাকে। বাংলাদেশি বাংলার আধুনিকায়ন জরুরি। বাংলা ভাষা ও প্রযুক্তির সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা একান্তভাবে প্রযুক্তিবিদ কিংবা সরকারি আমলার কাজ নয়।

ডিজিটাল বাংলার এই রূপ দেখে মনে হয়, দপ্তরগুলো যেন ধরেই নিয়েছে ওসব লেখা কেউ পড়বে না; পড়ে সময় নষ্ট করার মতো গাঁজাখুরি কাজ কেউ কোনোদিন করবে না! কিন্তু তারা কি ভেবেছেন, এই সরকারি বাংলা প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের তরফে বাংলা ভাষার উপস্থাপন। ভুলে ভরা এই বাংলা কি এটাই বোঝায় না যে, রাষ্ট্র বা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলার কোনো অর্থমূল্য বা সাংস্কৃতিক মূল্য নেই। তারা বাংলা ভাষার প্রমিত রূপ ব্যবহারের কথা বলবেন, অথচ রাষ্ট্রের দপ্তরে তা যথাযথভাবে ব্যবহার করবেন না– এই দ্বিচারিতা অগ্রহণযোগ্য। বাংলা ভাষাকে তারা নিয়ে এসেছেন হাস্যকর স্তরে। ভাষাজ্ঞানের অভাব, অদক্ষতা কিংবা অসচেতনতা– যা-ই বলি না কেন, এসব প্রকৃতপক্ষে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের দিক থেকে সংঘটিত মারাত্মক অপরাধ। শুধু অপরাধ নয়, বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ প্রতারণা।

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
The garment sector of the country is under pressure of energy crisis and cost
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

জ্বালানি সংকট ও ব্যয়ের চাপে দেশের পোশাক খাত

জ্বালানি সংকট ও ব্যয়ের চাপে দেশের পোশাক খাত ছবি: সংগৃহীত

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ হয়তো আপাতত শেষ হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তীব্র জ্বালানিসংকটে ভুগছে। বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।

দেশের স্পিনিং, নিটিং ও ডায়িং কারখানাগুলো বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবহার করে। আর বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। জ্বালানির বাড়তি দাম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। গত ৬ জুন, বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ ঢাকায় তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় এক হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগই নারী। তারা জারা এবং এইচঅ্যান্ডএমের মতো পশ্চিমা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করেন। প্রায় চার কোটি মানুষ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই এসেছে পোশাক খাত থেকে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ শতাংশ। চীনের পর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ।

তবে এই খাত আগে থেকেই সংকটে আছে। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় ধাক্কা লাগে। বলে মন্তব্য করেন শিল্প বিশ্লেষক মেহেদী মাহবুব।

সেই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, পাঁচটি কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের কারাবন্দি বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতারও পোশাক কারখানা ছিল। গত তিন বছরে ৪০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে।

গত মে মাসে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকত। চট্টগ্রামের কোথাও কোথাও দিনে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। উৎপাদন চালিয়ে যেতে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে।

এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের আবিল বিন আমিন বলেন, এই শিল্প দক্ষতানির্ভর, সেখানে জেনারেটর চালু করতেই যদি ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে, তা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

উৎপাদনে বিলম্ব, জাহাজীকরণে বিঘ্ন ও পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতাদের কম চাহিদার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছে। এক জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর তার কারখানার ক্রয়াদেশ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; বছরওয়ারি হিসাবে তা কমেছে ৮ শতাংশ।

তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কাঁচামালের খরচও বেড়েছে। পোশাক তৈরির মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ যায় কৃত্রিম তন্তু, রং, ফিনিশিং কেমিক্যাল, প্লাস্টিক বোতাম ও চেইনে, যেগুলোর বেশির ভাগই পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর।

বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ পোশাক পলিয়েস্টার ফাইবার ও সুতা দিয়ে তৈরি হয়, যার মূল উপাদান ন্যাফথা। যুদ্ধ শুরুর পর ন্যাফথার দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। এ ছাড়া উৎপাদনব্যবস্থাও খণ্ডিত। কিছু সমন্বিত টেক্সটাইল মিল থাকলেও বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদনের একটি অংশ সম্পন্ন হয়। আবদুল্লাহ হিল নকিবের হিসাবে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

সংকটগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর বড় অংশই বরাদ্দ দেওয়া হয় পোশাক খাতের জন্য। তবে এই ঋণের সুদহার প্রায় ৭ শতাংশ। উদ্যোক্তারা এমনিতে চাপে আছেন, তাদের জন্য এটা কঠিন।

এদিকে কোভিড মহামারির সময় উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বড় ব্র্যান্ডগুলো পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি হয়নি। এবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যে শ্রম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, এবার তার চেয়েও বেশি হবে—এমন শঙ্কা আছে।

উৎপাদনে বিলম্ব, পরিবহন বিঘ্ন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ভোক্তাদের কম পোশাক কেনার প্রবণতার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোও কম অর্ডার দিচ্ছে।

ঢাকার একটি জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তার কারখানার অর্ডার প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

মে মাসে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকটে থাকা ব্যবসাগুলোর জন্য ৬০০ বিলিয়ন টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যার সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয় পোশাক শিল্পের জন্য। তবে এসব ঋণের সুদের হার প্রায় ৭ শতাংশ, যা এরই মধ্যে আর্থিক চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বহন করা কঠিন।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মন্তব্য

মতামত
Rooppur nuclear power plant is going to be connected to the national grid

জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছবি: সংগৃহীত

দেশের জ্বালানি খাতে যুগান্তকারী এক খবরের কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। উৎপাদনের সবশেষ জটিল ধাপ পেরিয়ে আর মাত্র দুই মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাচ্ছে রূপপুরের পারমাণবিক বিদ্যুৎ। রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য দিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বর্তমানে কমিশনিং ও স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্ববর্তী শেষ এবং অত্যন্ত জটিল ধাপ।

মন্ত্রী এরপর বলেন, চলতি আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

ফকির মাহবুব আনাম বলেন, প্রথমবারের মতো পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার এই ঘটনাটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।

মন্তব্য

মতামত
A rampant narcotics trade is rampant even on secured borders

সুরক্ষিত সীমান্তেও ভয়ঙ্কর মাদকের রমরমা কারবার

* প্রেসক্রিপশনের আড়ালে আসছে মাদক * চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৭ রুট দিয়ে ঢুকছে ক্ষতিকর সিরাপ ও ট্যাবলেট * যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অবক্ষয়ের দিকে * জাতীয় সুরক্ষায় ‘স্মার্ট সীমান্ত’ গড়ার উদ্যোগ
সুরক্ষিত সীমান্তেও ভয়ঙ্কর মাদকের রমরমা কারবার ফাইল ছবি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে কোণঠাসা হয়ে এবার পাচারের কৌশল ও মাদকের রূপ বদলেছে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র। ফেনসিডিল বা ইয়াবার মতো প্রচলিত মাদকের চেয়ে এখন কম দামি, সহজলভ্য ও ছদ্মবেশী বিকল্প তরল সিরাপ এবং উচ্চমাত্রার ব্যথানাশক ট্যাবলেটের দিকে ঝুঁকছে তারা। শুধু চোরাচালানই নয়, মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং ভারত সীমান্ত থেকে ‘পুশইন’-এর মতো ঘটনা এখন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় সুরক্ষায় ‘স্মার্ট সীমান্তে’ রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

কী এই নতুন ‘রূপ: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সিন্ডিকেটগুলো এখন প্রেসক্রিপশন ড্রাগ বা ওষুধের আড়ালে মাদক নিয়ে আসছে। ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার স্পর্শকাতর অন্তত ২৭টি রুট দিয়ে দেশে ঢুকছে এস্কাফ, ফেয়ারডিল, চকোপ্লাসের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর কোডিনযুক্ত সিরাপ এবং ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, যা দেশের যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অবক্ষয়ের দিকে।

কোডিনযুক্ত সিরাপ (এস্কাফ, ফেয়ারডিল, চকোপ্লাস): ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা এসব সিরাপে উচ্চমাত্রার কোডিন ফসফেট রয়েছে। এর নেশার তীব্রতা হুবহু নিষিদ্ধ ফেনসিডিলের সমান।

ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট: এটি মূলত তীব্র ব্যথানাশক ওষুধ হলেও মাদকসেবীরা এটিকে হ্যালুসিনেশন বা তীব্র আচ্ছন্নভাব তৈরির বিকল্প উচ্চমাত্রার নেশা হিসেবে ব্যবহার করছে।

ভয়াবহতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো সেবনের ফলে লিভার ও কিডনি স্থায়ীভাবে নষ্ট হচ্ছে। সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করায় তরুণেরা দ্রুত স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে।

অরক্ষিত সীমান্ত, পাচারের ২৭ ‘রুট : অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর ভারত-বাংলাদেশ বিস্তীর্ণ সীমান্তের অন্তত ২৭টি রুট ব্যবহার করে দেশে ঢুকছে ক্ষতিকারক নিষিদ্ধ ‘নেশা সিরাপ’ ও ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট।

মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সীমান্তের ইউনিয়নভিত্তিক অরক্ষিত পয়েন্ট ও গ্রামীণ গোপন কাঁচা রাস্তাগুলোকে বেছে নিয়ে এই চোরাচালান চক্র সচল রেখেছে। পরে এসব মাদক চলে যায় দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে।

সীমান্তের কাঁটাতারবিহীন অরক্ষিত অংশগুলোকে কারবারিরা সবচেয়ে ‘নিরাপদ’ রুট মনে করছে। এসব পয়েন্ট দিয়ে রাতের আঁধারে মাদক দেশে ঢোকানোর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে পথিমধ্যে বারবার ‘হাতবদল’ বা ক্যারিয়ার পরিবর্তন করার কৌশল নিচ্ছে সিন্ডিকেটগুলো।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সীমান্ত সুরক্ষায় তিনটি ব্যাটালিয়ন দ্বায়িত্ব পালন করছে, এর মধ্যে ৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ১৬টি চোরাচালান রুট সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন সীমান্ত এলাকায় রয়েছে ৮টি সক্রিয় রুট এবং ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় তিনটি পয়েন্ট মাদক পাচারের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বাইরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ লাগোয়া রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত রুট দিয়ে নিয়মিতই আসছে মাদক, যা বিজিবিসহ অনন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরাও পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়য়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর ও দুর্লভপুর, আলাতুলি ইউনিয়নের কোদালকাটি ও বকচর এবং চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী সীমান্ত রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের কিরণগঞ্জ, কালীগঞ্জ ও জমিনপুর; শাহবাজপুর ইউনিয়নের শ্মশানঘাট, আজমতপুর ও উনিশবিঘী; মনাকষা ইউনিয়নের শিংনগর; দুর্লভপুর ইউনিয়নের মনোহরপুর; পাঁকা ইউনিয়নের ওয়াহেদপুর এবং তেলকুপি, চকপাড়া, শিয়ালমারা ও দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের সোনামসজিদ-বালিয়াদিঘী সীমান্ত দিয়ে মাদকের চালান আসছে।

ভোলাহাট উপজেলার ভোলাহাট সদর ইউনিয়নের চামুসা, হোসেনভিটা, গিলাবাড়ী ও বিলভাতিয়া; গোহালবাড়ী ইউনিয়নের আলী সাহপুর, দলদলি ইউনিয়নের পোল্লাডাঙ্গা-ময়ামারি সীমান্ত এবং গোমস্তাপুর উপজেলার রোকনপুর ও বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের শিবরামপুর সীমান্তকে মাদক কারবারিরা ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।

বিজিবির রেকর্ড পরিমাণ মাদক উদ্ধার: মাদকের এই নতুন রূপ রুখতে বিজিবি সীমান্ত এলাকায় কঠোর অভিযান চালাচ্ছে। উদ্ধার অভিযানের চিত্রে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৫৯ বিজিবি রেকর্ড ১২ হাজার ২৪৯ বোতল ফেনসিডিলের বিকল্প সিরাপ উদ্ধার করেছে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের নেশা জাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে ৫১ হাজার ৭৭৪ পিস। অন্যদিকে ৫৩ বিজিবি চলতি জুন মাসে ০১ জন আসামিসহ ১১৬১ বোতল নেশাজাতীয় এস্কাফ সিরাপ, ১৮৭ বোতল নেশাজাতীয় ফেয়ারডিল সিরাপ, ৪০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করে।

পাশাপাশি ১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সদস্যরাও সাম্প্রতিক একাধিক অভিযানে এস্কাফ সিরাপসহ রেকর্ড ৩০ হাজার ৭০০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পরে এসব মাদক যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

ধ্বংসের মুখে যুবসমাজ: ভারত থেকে আসার ঔষদের আড়ালে এসব ভয়ঙ্কর মাদক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন সেবনের ফলে যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এটি সরাসরি মানুষের লিভার ও কিডনি স্থায়ীভাবে নষ্ট করে এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আঘাত করে স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি কেড়ে নেয়। ফলে আসক্ত তরুণরা অল্প দিনেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবার ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একাংশের আচরণ ও পড়াশোনায় এক ধরনের নীরব অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগে মাদক বলতে অভিভাবকরা গাঁজা, ফেনসিডিল বা ইয়াবা বুঝতেন এবং সন্তানদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতেন। কিন্তু এখনকার তরুণরা নেশাজাতীয় সিরাপের আড়ালে মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এই ছদ্মবেশী মাদকের কারণে অনেক পরিবার বুঝতেই পারছে না যে কখন তাদের সন্তান অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম মেধা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।

মাদকের এই নতুন ট্রেন্ডকে পুরো দেশের জন্য একটি বড় বিপদের সংকেত হিসেবে দেখছেন সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, সিন্ডিকেটগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে যেভাবে বারবার রুট ও মাদকের রূপ বদল করছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের দাবি থাকবে—শুধুমাত্র সীমান্তে বিজিবি বা পুলিশের রুটিন অভিযান দিয়ে এই ভয়াবহতা ঠেকানো যাবে না। মাদক চোরাচালানের পেছনে থাকা মূল গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

জিরো টলারেন্স নীতিতে বিজিবি: চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান, ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করাসহ যেকোনো অবৈধ চোরাচালান প্রতিরোধে এবং সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে বিজিবি সর্বদা তৎপর রয়েছে।

৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

১৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম চোরাচালানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

মন্তব্য

মতামত
92 percent of children who died of measles were not vaccinated

হামে মৃত শিশুদের ৯২ শতাংশই টিকা পায়নি

হামে মৃত শিশুদের ৯২ শতাংশই টিকা পায়নি ফাইল ছবি

বাংলাদেশে চলতি বছর হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই হাম-রুবেলা টিকার কোনো ডোজ পায়নি। গত ১৫ মার্চ থেকে গত শনিবার (২৭ জুন) পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৬ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসেরও কম। শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের হিসাবে, নির্দিষ্ট সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৬১৫ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গে ঘটা প্রতিটি মৃত্যুকেই হামজনিত মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হয়।

কলম্বোতে ২২ ও ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হাম-রুবেলাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিশনের সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ের জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক। প্রতিনিধিদলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী সচিব, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচও ঢাকা কার্যালয়ের রোগ প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে, শিশুদের হাম প্রতিরোধক্ষমতার অভাব এবং টিকাদান কর্মসূচিতে নজরদারির ঘাটতি এই সংকটের প্রধান কারণ। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ ও ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার বিধান থাকলেও মৃত শিশুদের মাত্র ৮ শতাংশ এই টিকার আওতায় এসেছিল।

কলম্বোর সভায় উপস্থাপিত বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯ মাসের কম বয়সি শিশুর মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ২৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে ২ থেকে ৫ বছর বয়সি ১৮ শতাংশ, ৯ থেকে ১১ মাস বয়সি ১৪ শতাংশ, ১ থেকে ২ বছর ও ৫ থেকে ৯ বছর বয়সি ১৩ শতাংশ করে, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সি ৪ শতাংশ এবং ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে ১২ শতাংশ। এই চিত্র থেকে স্পষ্ট যে শিশুদের পাশাপাশি বড় বয়সিরাও হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন।

একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ হাজার ২৬৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৫৯৪ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭৮ হাজার ২৮৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেছেন, কলম্বোতে উপস্থাপিত তথ্য জুন মাসের প্রথমার্ধের। তাতে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হাম-রুবেলার টিকা পায়নি। জুনের শেষ সপ্তাহে মৃত্যু বেড়ে সাতশর বেশি হয়েছে, সে ক্ষেত্রেও টিকা না পাওয়ার হার একই থাকবে বলে আমার ধারণা।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল টিকাদান কর্মসূচির ত্রুটির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘বহু শিশুকে টিকা না দিয়েই বলা হয়েছে টিকা পেয়েছে, টিকার সাফল্যের কথা গাওয়া হয়েছে। সব পরিসংখ্যান ছিল বানোয়াট। তথ্য-উপাত্তে কারচুপি করা হয়েছে। নজরদারির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না কোনো জবাবদিহি। এত সব অনাচারের মূল্য দিতে হলো শিশুদের।’

চলতি বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কলম্বোর সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। গত ২৫ জুন ডব্লিউএইচও এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হাম মোকাবিলায় জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের পরিস্থিতি সরেজমিনে মূল্যায়নের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর অনুরোধও জানানো হয়েছে।

ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং সদস্যদেশগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাম নির্মূলের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে। দেশের প্রতিটি জেলায় ডব্লিউএইচওর মেডিকেল কর্মকর্তারা হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন রোগের তথ্য সংগ্রহ করেন, যা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়।

মন্তব্য

মতামত
82 lakhs of Khalid Hossain and 79 lakhs of Salehuddin
ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের চিকিৎসা ব্যয়

আ ফ ম খালিদ হোসেনের ৮২ লাখ, সালেহউদ্দিনের ৭৯ লাখ টাকা

আ ফ ম খালিদ হোসেনের ৮২ লাখ, সালেহউদ্দিনের ৭৯ লাখ টাকা ফাইল ছবি

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন আঠারো মাসের দায়িত্ব পালনকালে বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে বিল নিয়েছেন ৮১ লাখ ৯১ হাজার ৪৮৮ টাকা। অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে তিনিই চিকিৎসাবাবদ সর্বোচ্চ খরচ নিয়েছেন। অন্যদিকে, সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বিদেশে চিকিৎসার জন্য সরকারি কোষাগার থেকে ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ২২৯ টাকার বিল নিয়েছেন। তবে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিদেশে চিকিৎসা খরচের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্রের বরাতে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে দেশের একটি গণমাধ্যম।

এছাড়াও সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন নিয়েছেন ৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৪৪ টাকা; সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিয়েছেন ৭ লাখ ১৫ হাজার ৬৪৯ টাকা; সাবেক বিদ্যুৎ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান নিয়েছেন ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৯৩৫ টাকা; সাবেক ভূমি উপদেষ্টা হাসান আরিফ নিয়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ২১৬ টাকা; সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড. এম আমিনুল ইসলাম নিয়েছেন ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৯ টাকা এবং সাবেক খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার নিয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ১৩৪ টাকা।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সূত্র মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের মাত্র ১৮ মাসে বিদেশে চিকিৎসা খরচের ব্যয় হিসেবে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ নিয়েছেন আরো বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা।

এদিকে, চিকিৎসা বাবদ ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। ওই ব্যাখায় অপারেশনের খরচে ডিসাকাউন্ট ও নিজের পরিচর্যার জন্য তার সঙ্গে থাকা সহযাত্রীর খরচ নিজে বহন করার কথা জানিয়েছেন তিনি। ডিসকাউন্ট না পেলে ও পরিচর্যার খরচ যুক্ত হলে বিল ৮২ লাখেরও অনেক বেশি আসত বলে জানান তিনি।

রোববার (২৮ জুন) বেলা ১১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে চিকিৎসা বাবদ ব্যয়ের ব্যাখ্যায় তিনি এ কথা জানান।

অপারেশন ব্যয়ের ব্যাখ্যায় ধর্ম উপদেষ্টা বলেছেন, ‘বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে বিল দিই প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা। যার বিল আরো অনেক বেশি ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ দূতাবাসের কারণে ডিসিকাউন্ট পাওয়া যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘পবিত্র হজের দায়িত্ব পালন শেষে আবারও অসুস্থতা অনুভব করায় আমি দেশের ডাক্তারদের শরণাপন্ন হই এবং তারা দ্রুত অপারেশনের পরামর্শ প্রদান করেন। বিগত জানুয়ারি মাসে আমার অপারেশন সম্পন্ন হয় এবং বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে বিল দিই প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা। এ সংক্রান্ত সমস্ত বিলের কপি আমি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছি।

আইনানুসারে সরকার কর্তৃক মন্ত্রী/উপদেষ্টার চিকিৎসার সমস্ত খরচ সরকার বহন করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকার শুধুমাত্র আমার হাসপাতালের বিল, অপারেশন বিল ও মেডিসিনের ব্যয় বহন করেছে। প্রকৃতপক্ষে আমার পরিচর্যার জন্য সঙ্গে যাওয়া আমার সহযাত্রীর সমস্ত খরচ আমি বহন করেছি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার হোটেলে বসবাসের বিল, খাওয়ার বিল, যাতায়াত খরচও ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছি। সরকার প্রদত্ত প্রতিটি পয়সার প্রকৃত বিল, ভাউচার, রিসিপ্ট আমার কাছে সংরক্ষিত আছে। যে কেউই চাইলে হাসপাতাল ও কর্তৃপক্ষের কাছে এসব ব্যয়ের ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করতে পারবেন।

নিজের সততার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টা হিসেবে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে এবং নির্লোভ ও নির্মোহভাবে দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সরকারি কোনো অর্থ আত্মসাৎ কিংবা তসরুপ করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছি। কিন্তু কিছু মিডিয়া বৈধ, নিয়মতান্ত্রিক ও আইনগত বিষয়গুলোকে এমনভাবে ফ্রেমিং করছে যেন জনমানসের মনে শঙ্কা ও সন্দেহ তৈরি হয়। আমি এসব সংবাদ ও মিডিয়া ফ্রেমিংয়ের তীব্র নিন্দা জানাই।’

মন্তব্য

মতামত
The Prime Minister directed to develop SPARSO as a modern and up to date institution

স্পারসোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

স্পারসোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) কার্যালয় পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর আগারগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) কার্যালয় পরিদর্শন করেছেন। রোববার (২৮ জুন) সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে তিনি সেখানে যান। এটি তার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী স্পারসোর বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং তাদের কাজের খোঁজখবর নেন।

স্পারসো চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীকে সংস্থার কার্যক্রম এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। এরপর বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তারা তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী কাজ ও গবেষণা প্রকল্পগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পারসোকে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী, স্বনির্ভর এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখতে সক্ষম মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, প্রতিরক্ষা সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্পারসোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

প্রসঙ্গত, স্পারসো দেশের মহাকাশ বিজ্ঞান, উপগ্রহ প্রযুক্তি এবং দূর অনুধাবন প্রযুক্তির গবেষণা, উন্নয়ন ও প্রয়োগে নিয়োজিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান।

মন্তব্য

মতামত
Number of serious crimes decreased in all departments in one year Cabinet Department

এক বছরে সব বিভাগে গুরুতর অপরাধের সংখ্যা কমেছে: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ

এক বছরে সব বিভাগে গুরুতর অপরাধের সংখ্যা কমেছে: মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ফাইল ছবি

মাঠ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত উদ্যোগে সারাদেশে গুরুতর অপরাধের সংখ্যা ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে কমেছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গত ২১ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সারা দেশের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে মাসিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় এ তথ্য উঠে আসে। সভায় উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা পরামর্শ ও সহযোগিতা করছেন।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলের তুলনায় মে মাসে জঘন্য বা গুরুতর অপরাধ ২৪টি বা শূন্য দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। আবার ২০২৫ সালের মের তুলনায় ২০২৬ সালের মে মাসে এ ধরনের অপরাধ কমেছে ২৩৭টি বা ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সমন্বয় অধিশাখার কর্মকর্তারা বাসসকে জানান, প্রতি মাসে জেলা প্রশাসকরা সার্বিক পরিস্থিতির প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠান। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে এসব তথ্য-উপাত্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ও মাঠ প্রশাসন অধিশাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান বলেন, ‘প্রতি মাসে জেলায় পরিচালিত কার্যক্রম বিভাগীয় কমিশনারদের সভায় উপস্থাপন করা হয়। সেখানকার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়। জেলা প্রশাসকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও প্রয়োজনীয় কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করে। এভাবেই মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরিস্থিতির উন্নতি হলে তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়, আর অবনতি হলে করণীয় নির্ধারণ করা হয়।’

বাংলাদেশের আইনে যেসব অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সেগুলোকে গুরুতর বা জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পূর্বপরিকল্পিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যা (দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা), নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধিত)-এর ৯ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণ ও ধর্ষণের ফলে মৃত্যু, যৌতুকের কারণে নারীর মৃত্যু, মুক্তিপণের জন্য বা হত্যার উদ্দেশে অপহরণ (দণ্ডবিধির ৩৬৪-ক ধারা), রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা যুদ্ধের উদ্যোগ (দণ্ডবিধির ১২১ ধারা), সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই সভায় উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়— ঢাকা বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ৫২১টি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ছিল ৪৬৬টি এবং মে মাসে তা দাঁড়ায় ৪৮৫টিতে। রাজশাহী বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ৩৪৯টি। ২০২৬ সালের মে মাসে তা কমে ২৬১টিতে নেমে আসে। খুলনা বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ২৭১টি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ছিল ২১৯টি এবং মে মাসে ২৪২টি। বরিশাল বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ২২২টি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে এ সংখ্যা ছিল ২২১টি। সিলেট বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ১৯৩টি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ছিল ১১৯টি এবং মে মাসে ১২৩টি। রংপুর বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ৩১৩টি। ২০২৬ সালের মে মাসে তা কমে ২৬৩টিতে দাঁড়ায়। ময়মনসিংহ বিভাগে ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ১৬৩টি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে এ সংখ্যা ছিল ১৬২টি।

অপরাধের তুলনামূলক তথ্য অনুযায়ী, মেট্রোপলিটন এলাকায় ২০২৫ সালের মে মাসে গুরুতর অপরাধ ছিল ৪৮৮টি। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তা কমে ৪১১টিতে এবং মে মাসে আরও কমে ৪০২টিতে নেমে আসে।

সারাদেশে ২০২৫ সালের মে মাসে মোট ২ হাজার ৮০৯টি গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৯৬টি এবং মে মাসে কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৭২টিতে।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করে জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে অপরাধ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং প্রায় সব ধরনের অপরাধ কমেছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ের তথ্য গত বছরের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। আমার কাছে যে পরিসংখ্যান এসেছে, তাতে দেখা গেছে ২০২৫ সালের তুলনায় অপরাধ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ক্যাটাগরিতেই অপরাধ কমেছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, অপরাধ দমনে পুলিশ বাহিনীকে আরও শক্তিশালী (বুস্ট আপ) করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখায় তিনটি আলোচিত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের স্বীকৃতিও দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা মামলার তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া কয়েকজন পুলিশ সদস্য, দৌলতদিয়ার নৌ দুর্ঘটনায় যাত্রীদের প্রাণ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নৌপুলিশের তিন সদস্য এবং মুন্সীগঞ্জে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় চার আসামিকে গ্রেপ্তারে অবদান রাখা তিন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।

সূত্র: বাসস

মন্তব্য

p
উপরে