কাজী আনোয়ার হোসেন ইন্তেকাল করার প্রেক্ষাপটে সাইবার প্রজাবৃন্দ আবার সেই আলোচনাটাকে সামনে এনেছেন: বাংলাদেশে পাঠকবৃদ্ধিতে তার ভূমিকা বা এরকম। এইরকম আলাপ-আলোচনা বছর দুয়েক আগে শেখ আবদুল হাকিমের সঙ্গে তার স্বত্বাধিকারের আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটেও একবার উঠেছিল। এ দফায় তফাৎ হলো, সাইবার হৈ-চৈয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা ছিল হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তার প্রভাব-প্রতিপত্তির তুলনা। সারাংশে, কাজী আনোয়ার হোসেন আর হুমায়ূন আহমেদ দুজনের মধ্যে পাঠকসৃষ্টির রাজমুকুট কার মাথায় চড়ানো যাবে তাই নিয়ে এই বিতর্ক। দু-চারজন নেটপ্রজা হয়তো নেহায়েত রঙ্গরসের মুডে ছিলেন; উত্তরটা তাদের জরুরি তা ভঙ্গিতে বা স্বরে মনে হয়নি আমার। কিন্তু অন্য অনেক নেটপ্রজা এই বিতর্কের আশুনিষ্পত্তি ঘটানোর জন্য মরিয়া ছিলেন। যেন, রাজমুকুটটা তখনই দুজনের মধ্যে তার পছন্দের জনকে না দিতে পারলে পরকালে গুরুতর স্ট্যাটাস সংকটে পড়ে যাবেন লেখক।
পরিচিত অনেকেই লাগাতার বলতে থাকেন যে সাইবার হৈ-চৈ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নাই। কিংবা এটাকে তারা সিরিয়াসলি নেন না। কিংবা এখানকার কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভেবে তিনি সময় ‘নষ্ট’ করেন না। আমি দীর্ঘকাল এই মতামত-প্রতিক্রিয়াগুলোকে প্রতিহত করেছি। কখনও আলাপের চেষ্টা করেছি। এটা অনেকটা লেগুনার যাত্রীদের অপছন্দ করার মতো, কিংবা পাবলিক বাসের যাত্রীদের। নিশ্চয়ই কেউ সেটা করতে পারেন। কিন্তু কোনো একটা যানবাহন নিজে যাত্রীর গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্য উৎপাদন করে না; করে কেবল মূল্যমান। ফলে, ফেসবুক বা সাইবার জগতের আলাপ-আলোচনাকে, মূল্যায়নকে যারা না-গুরুত্ব দেবার ঘোষণা দিতে থাকেন, তাদের কোথাও কিছু একটা বাধে।
তাহলে কী দাঁড়ালো? আমি একে ধন্বন্তরী বা ঐশীবাণী মর্যাদায় দেখি? অবশ্য, এটা ভালো প্রশ্ন হলো না। কারণ, তাতে ঐশীবাণী বা ধন্বন্তরীকে আমি কীভাবে দেখি তার আলাপ করা লাগে। আমি, সাইবার রাজ্যের প্রতিক্রিয়াকে জগতের সকল প্রতিক্রিয়ার মতোই পাঠযোগ্য হিসাবে দেখি। অবশ্যই সেগুলোকে শতায়ূ বা দীর্ঘস্থায়ী হিসাবে দেখি না। কিন্তু হ্রস্বস্থায়ী মাত্রই গৌণ নয়। মশার আয়ু সাত দিন আর কাছিমের ৫০০ বছর বলে আমরা যে খাবার টেবিলে বসে কাছিমের জীবন নিয়েই অধিক আলাপ-আলোচনা করি, মশার তুলনায়, তার প্রমাণ পাওয়া মুশকিল।
মুক্তধারা বা পুঁথিঘরের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? কিংবা ঝিনুক পুস্তিকা? অথবা বুক কো-অপারেটিভ? এটা কয়েকটা মাত্র নাম। নাম নেয়াটাও ইচ্ছাকৃত। বাস্তবে স্বাধীন বাংলাদেশে, কিংবা তার আগেই বাংলা ভাষায় কয়েক ডজন প্রকাশকের নাম নেয়া যায়; একটু খোঁজখবর করলেই তা সম্ভব। এদের সকলেরই বিপুল পরিমাণ বই বের হতো। এবং একেকটা বইয়ের বিপুল সংখ্যক কপি ছাপা হতো। উদাহরণ হিসাবে সত্যেন সেনের মতো সিরিয়াস এবং শ্রমিক-ইতিহাসনির্ভর বইগুলোও হেসেখেলে কয়েক হাজার কপি বিক্রি হতো। মহকুমা শহরগুলোতে গণ-গ্রন্থাগার বা পাবলিক লাইব্রেরির অস্তিত্ব এই ধরনের বইয়ের পাঠকবিস্তারে সহায়তা রেখেছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাঠাগারগুলোর ভূমিকা রয়েছে ধারাবাহিক ও নিয়মনিষ্ঠ পাঠক তৈরিতে। সত্যেন সেনের নামটাও আমার তরফে একটা বাছাই মাত্র, নিজের পছন্দের দিক থেকে। কিন্তু সেখানেই সীমিত নয়।
‘ঝিনুক পুস্তিকা’ থেকে নজরুল থেকে শুরু করে শরৎ পর্যন্ত সকল রচনাবলী অতিশয় সুলভ মূল্যে বিপণন-সরবরাহ করা হয়েছিল। জীবনীগ্রন্থের একটা বড় চালান আসতো এবং সেগুলোর বিশাল পাঠক বাহিনী ছিল। বাংলাবাজারের এসব প্রকাশকের বিপণন-নেটওয়ার্ক ছিল সারা বাংলাদেশ ঘিরে। ৩০০ কপি বই ছেপে লেখক পয়দা করার পুরা প্রক্রিয়াটাই ৯০ পরবর্তী শাহবাগ-কাঁটাবনকেন্দ্রিক প্রকাশনা-বিস্তারের আশু ফসল। অনুবাদের একটা বিস্তর গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বাংলা একাডেমি এই বিষয়ে অগ্রগণ্য হলেও মুক্তধারাকেও পাশাপাশিই রাখতে হবে। মনে করতে পারা ভাল যে, এমনকি ইসমত চুগতাই বা সাদত হাসান মান্টোর উর্দু সাহিত্যের অনুবাদও ১৯৭২-এর বাংলাদেশে সুলভ এবং এর পাঠক সংখ্যা ছিল বিশাল। আর কিছু বাদ দিলেও বাংলাদেশে সাদত হাসান মান্টোর যে বিশাল একটা পাঠক বাহিনী ছিলেন, সেটা টের পাবার জন্য কারো বিশেষ কোনো রকমের গবেষণা করারই দরকার পড়বে না।
আমার মনে পড়ে, জনৈক সদরুল্লাহ, যিনি মাণিকগঞ্জের কোনো এক পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার ছিলেন, তিনি সংস্কৃত থেকে জয়দেব অনুবাদ করেছিলেন, আর চাইলে আরবি থেকেও অনুবাদের দক্ষতা তার ছিল বলে খোঁজ পেয়েছিলাম। ‘গীতগোবিন্দ’ বইয়ের সেই অনুবাদটি ১৯৮৭ সালে নিউ মার্কেটের একটা দোকান থেকে আমাকে আমার অগ্রজ বন্ধু ফিরোজ কিনে দিয়েছিলেন। বইটিতে কিছু চিত্রসংযোজন ছিল। সেগুলো আমার অত পছন্দের ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই যে আজ এত বছর পর যখন বইটি আর খুঁজে পাই না, আমি অনুবাদক সদরুল্লাহ সাহেব কিংবা প্রকাশক জয়বাংলা প্রকাশনী নিয়ে অনেকের কাজে জিজ্ঞাসা করেছি। এদের খোঁজ আমি পাইনি। হয়তো আমি যাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছি, তার বাইরে কেউ বলতেও পারতেন।
পশ্চিমবাংলার প্রকাশনীগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে আলাপ করলে অনেকেই গাল ফোলাতে পারেন। কিন্তু বাদ দিয়েই বা আলাপ হবে কীভাবে! পশ্চিমবাংলা আর বাংলাদেশের মধ্যকার প্রকাশনা ও বিপণনের সম্পর্কের ম্যানিপুলেশন নিয়ে স্বতন্ত্র আলাপের দরকার আছে। তারপরও সেই আলাপ পুস্তক উৎপাদকদের করাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কিন্তু যখন আমরা পাঠকবিস্তারের প্রসঙ্গে কথা বলছি, তখন তো আর বিদ্যমান প্রবণতাকে উড়িয়ে বা এড়িয়ে আলাপ চলতে পারে না। যদি অন্য কোনো প্রকাশকের কথা বাদও দিই, মিত্র ও ঘোষ এবং দে’জ প্রকাশনীর সুবিপুল পুস্তক সংখ্যা এবং সাশ্রয়ী মূল্যের প্রসঙ্গ সামনে আনতেই হবে। বিশেষত, সেই সময়ে এটা আরো প্রাসঙ্গিক যখন ভারতীয় বইয়ের দাম বাংলাদেশে মুদ্রিত মূল্যমানের সাড়ে তিন গুণ ছিল। মিত্র ও ঘোষ কেবল অপেক্ষাকৃত কম দামে নানাবিধ রচনাসমগ্র হাজিরই করেনি, উপরন্তু বাংলাদেশে বাহ্যত অজনপ্রিয়-থাকতে-পারতেন এমন দুইজন কর্ণধারের দুর্দান্ত বাংলা রচনার সাথে পাঠককে পরিচিত করিয়েছেন – যথাক্রমে গজেন্দ্রকুমার মিত্র এবং সুবোধ ঘোষ। খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, গজেন মিত্র এমনকি বাংলাদেশের প্রথম দিকের স্যাটেলাইট জমানাতেই ধারাবাহিকের বিষয়বস্তু হয়েছিলেন – আফসানা মিমি পরিচালিত ‘পৌষ ফাগুনের পালা’। টেলিভিশনে চিত্রায়নের সূত্র ধরে কোনো কিছু প্রমাণ করতে চাইছি না আমি। কিন্তু বাংলাদেশের টেলিভিশনে গড়ে ধ্রুপদী সাহিত্যনির্ভর কাহিনির যে প্রবণতা, তাতে পশ্চিমবাংলার অপেক্ষাকৃত বড় তারকার বাইরে কারো সাহিত্যকে অধিগ্রহণ পরিচালকীয় সাহিত্যরুচিকে যেমন স্পষ্ট করে; তেমনি পাঠকবিস্তারের প্রসঙ্গটাকে বুঝতে এটা সহগ উপাদান।
সুবোধ ঘোষ তার বন্ধুর মতো উপন্যাসনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন না। তুলনায় ভ্রমণকাহিনি আর ছোটগল্পের ওস্তাদ তিনি। ভ্রমণকাহিনিকে উপন্যাসের/ফিকশনের স্বাদে পুষ্ট করাতে তিনি ঈর্ষণীয় দক্ষতারও ছিলেন। আমি যে সুবোধ ঘোষের ‘রম্যাণী বীক্ষ’ গ্রন্থটির প্রায় সবগুলো খণ্ডই (সম্ভবত ২৩টা) পড়ে ফেলেছিলাম, সেটারও কারণ এই যে, ওই মহকুমা (পরে জেলা) পাবলিক লাইব্রেরিতেই সুবোধ ঘোষ সংযোজিত ছিলেন।
হুমায়ূন আহমেদ যে তখন জন্মেছিলেন কোনোই সন্দেহ নেই, তবে কিতাব লিখেছিলেন কিনা খোঁজ নিতে হবে। ‘মাসুদ রানা’ তখন বিরাজেন, লাইব্রেরির তাকে শোভা পান, এবং প্রচুর তরুণের প্রথম পছন্দের তাক সেগুলো। আমি ‘মাসুদ রানা’র ভক্ত ছিলাম না, সেটা দৈবাৎ হিসাবে দেখি। কোনো কিছু লঘুগুরু প্রমাণের চেষ্টায় বলছি না। এটা আমার একটা প্রস্তাব যে, ‘মাসুদ রানা’র জনপ্রিয়তার সাথে ১৯৭৫ পরবর্তী সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জমিনে মার্কিনী তারুণ্য ও সামরিকমনস্ক যুবকত্ব একটা প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এটা প্রমাণের জন্য যতটা কাঠখড় পোড়াতে হবে, তা এক্ষুনি আমি চাইছি না।
বাংলাদেশের পাঠকসংখ্যা এখানকার জনসংখ্যার সাপেক্ষে নিশ্চয়ই কম। কিন্তু জনসংখ্যাকে সাপেক্ষ ধরে আলাপগুলো বিশেষ সুবিধার হয় না। তাহলে ক্রীড়ানৈপুণ্য কেবল ভারত আর চীনেরই দেখাতে পারার কথা। ফিলিস্তিনি বা আলবেনীয় সাহিত্য নিয়ে, জামাইকান সঙ্গীত নিয়ে কিংবা জর্জীয় চলচ্চিত্র নিয়ে আলাপ বা আগ্রহের মানেই হয় না।
যা হোক, যেসব হামানদিস্তা চিন্তাকাঠামো নিয়ে আমার সমস্যা, সেগুলো নিয়ে বলতে গিয়েই এই উল্লেখ করলাম মাত্র। এই কম সংখ্যক পাঠকের দেশেও পাইরেটেড বইয়ের গুরুত্বও সমধিক। সেটা অনুধাবনের জন্য একদম লেটারপ্রেসের কালেই যেতে হবে আমাদের। পাইরেসি সংক্রান্ত যে নৈতিক চাপ সেগুলো অনেক কম ছিল। কিন্তু এখানে আমি চাই পাঠকেরা মনোযোগ দিন অন্য একটা জায়গায়। একটা বইয়ের কপি হাতে পাবার পর সেটাকে পড়ে পড়ে নিকটবর্তী কোনো অপেক্ষাকৃত সস্তা বিনিয়োগের একটা ছাপাখানায় আদ্যোপান্ত বইটির হরফ পুনর্সজ্জিত হলো; সেটাকে ছাপাখানায় তুলে নিউজপ্রিন্টে ছাপা হলো। পেপারব্যাক বা নরম বাঁধাই হলেও একটা দ্বিরঙা পাতলা প্রচ্ছদ ছাপানো হলো। তারপর লঞ্চঘাট কিংবা রেলস্টেশনে গরিব ফিরিওয়ালার কাঁধে চেপে-চেপে বইগুলো বিক্রি হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় লগ্নিকারের যদি কোনোরকম লভ্যাংশের সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে এই কাজটাতে তিনি হাত দেবেন কেন? এই ধরনের বইয়ের বিপুল একটা বাজার ছিল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন গুপ্ত থেকে নিমাই ভট্টাচার্য, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় থেকে বিমল মিত্র, কখনও কখনও এমনকি আশাপূর্ণা দেবী।
যে ধরনের ছাপাখানা থেকে এই ‘বেআইনি’ বইগুলো মুদ্রিত হতো, সেই একই ধরনের ছাপাখানা থেকে নূরানি নামাজ-শিক্ষার বই, বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাণীমালা কিংবা পঞ্জিকাও বের হতো – তারাচাঁদ পঞ্জিকা, লোকনাথ পঞ্জিকা। এসব পঞ্জিকার একটা ছিল পকেট সংস্করণ, আরেকটা বড় সংস্করণ। পঞ্জিকার মুদ্রণকে ঠিক হাজারের সংখ্যা দিয়ে বোঝা সম্ভব হতো না। সম্ভবত ওগুলো ছিল লাখের অংকে। এখন কেউ চাইলে পঞ্জিকাকে পাঠাভ্যাসবিস্তারী কোনো পুস্তক হিসাবে দেখতে নাও চাইতে পারেন। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি যে, দুপাতা পঞ্জিকা তিনি দক্ষপাঠ করে প্রমাণ দিতে পারবেন না যে ‘পড়তে পারেন’। পঞ্জিকার ক্রমবর্ধমান চাহিদার মধ্যে একটা ফিউশনও ঘটে – মোহাম্মদী পঞ্জিকার আবির্ভাব ঘটে এবং এরও বিপুল পাঠক।
আচ্ছা, নিকট অতীতে তসলিমা নাসরিনকেই বা কোথায় রাখব? তসলিমা নাসরিন বহুলপঠিত, অতিশয় জনপ্রিয়, নতুন পাঠক সৃষ্টিকারী লেখক ছিলেন। এই সারসত্যটিকে না দেখতে পারার জন্য অহংকারী পুরুষ ও পুরুষালি আধিপত্যের নিবিড় প্রজা হওয়া দরকার। তসলিমা যে একজন অতিকায় প্রপঞ্চ ছিলেন, সেটা বোঝার জন্য ‘ক’ উপন্যাস পরবর্তী বিশাল পত্রিকা হাউজগুলোর পক্ষ থেকে তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টার আয়োজনের বহর থেকেই বোঝা যায়। এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটির গুণমাণ এবং লিঙ্গ-রাজনীতি নিয়ে স্বতন্ত্র আলাপ হতে পারে। কিন্তু তাকে প্রতিহত করার আয়োজনে আমার মনোযোগ পড়েছে আরও বেশি। কিন্তু আমি আরও আটপৌরে চিত্র হাজির করি বরং। হুমায়ূন আহমেদ সাহেবের জনপ্রিয়তার আগেই তসলিমা নাসরিন জনপ্রিয় ছিলেন। গদ্যের জন্য যেমন, কবিতার জন্যও তেমন। যশোলোভী পুরুষ সাহিত্যিকদের জন্য অশান্তির হলেও এটাই বাস্তব। এমনিতে হুমায়ূন সাহেবের সাহিত্যিক জনপ্রিয়তাকে দেখা দরকার প্যাকেজ নাটক ও স্যাটেলাইট উত্থানের সাথে মিলিয়ে। এটা একটা প্রস্তাব মাত্র, এবং উপেক্ষা-অযোগ্য প্রস্তাব। এখানে তুলবার কারণ হলো, তসলিমার জনপ্রিয়তা এসব মাত্রাও পায়নি। তার আগে দৈনিকের পর্যালোচনার পাতায় হাতেগুণে সম্ভবত এক দুইজন নিয়মিত নারীকে পাওয়া গেছে – আনোয়ারা সৈয়দ হক একজন। মনে পড়ে, পত্রিকার পাতায় তাকে কলামিস্ট হিসাবে আনবার কৃতিত্ব জাহিরি কিছু বক্তৃতাও ‘ক’-উত্তর কালে দুচারজন সম্পাদক ঝাড়ছিলেন। এই হলো ঢাকা!
যাদের মনে নেই, তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিই, ওই সময়কালে তসলিমা কার্যত নিষিদ্ধ ছিলেন। বাস্তবে মানুষজনের মনে পড়বে যে ‘ক’ নিষিদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু তার জীবনে নিষিদ্ধ হওয়া নতুন কিছু নয়। ‘লজ্জা’ আমার পছন্দের উপন্যাস নয়; কিন্তু নিষিদ্ধ হওয়াতে খুশিও হইনি। সেটা ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৯ তে ‘আমার মেয়েবেলা’ও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু কথা আসলে বই নিষিদ্ধ নিয়ে হচ্ছে না। কার্যত পুস্তক ব্যবসায়ীদের একাংশ কোনো না কোনো কারণে তসলিমাকে ‘বয়কট’ করে রাখছিলেন।
‘লালন আখড়া রক্ষা আন্দোলন’-এর গুরুত্ব যাই হোক, আমি ছিলাম একজন কর্মী। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলাতে সমন্বয়ের কাজ নিয়ে গেছি। ১৩ এপ্রিল ২০০১-এর নৈশ বাসে। যে বাড়িতে শেষরাতে আশ্রয় নিয়েছি, স্থানীয় একজন কলেজ শিক্ষক, সকালে ঘুম থেকে উঠে তার বাড়িতে নাস্তা করে বেরোনোর কথা। ঠিকঠাকমতো নাস্তা করার আগেই রমনা বটমূলের কথিত ‘মৌলবাদী’ হামলার খবর এসেছে। লালন আখড়া আন্দোলন মাথায় উঠল, আসলে নাস্তাও বিশেষ রুচল না মুখে। এ ছাড়া, অস্বীকার করব না, ‘মৌলবাদী হামলা’ থিসিসটার প্রতি গুরুত্বপূর্ণ আস্থা বজায় রাখতেও পারছিলাম না। সারাদিন ভুমমারা মুখে বসে আছি এখানে-ওখানে। রাতের বাস ধরব। বিকাল নাগাদ বসে আছি স্থানীয় একটা বইয়ের দোকানে। থমথমে মুখে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আলাপ করছি দোকানের কর্ণধার, একজন সাংবাদিক, একজন শিক্ষক, আমি – ভ্রমণকারী সংগঠক। বোদা কলেজ থেকে দুজন ছাত্রী এলেন। মাথায় ওড়না পেঁচানো। তখনো হিজাব নিখিল বাংলাদেশি জনপ্রিয় পোশাক হিসাবে আবির্ভূত হয়নি। নিচু গলায় তারা জানতে চাইলেন, যে বই দুটো বলে গেছিলেন তা আনা হয়েছে কিনা। বিক্রেতাও বেশি কথা না বাড়িয়ে কাগজের ঠোঙায় দুইখানা তসলিমার বই সরবরাহ করে দিলেন। তসলিমা নাসরিন এমনই এক লেখকের নাম। একেবারেই নিকট অতীতের বাংলাদেশে।
খুবই হ্রস্বস্মৃতির মানুষজন চারপাশে। প্রতি বছরই যেমন মানুষ বলতে থাকেন ‘এ বছরের মতো গরম আমার বাপের জন্মে দেখিনি।’ এসব কথাকে বস্তুগত সত্য হিসাবে গ্রহণ বা অনুধাবন করা যাবে না। জাস্ট কথার কথা আরকি!
লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক
ফাইল ছবি
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিমসহ ছয়জনকে হত্যার একটি মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন নিয়ে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে আদেশের জন্য মঙ্গলবার (৩০ জুন) দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
সোমবার (২৯ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন।
টানা তৃতীয় দিনের মতো আসামিপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মিজানুর রহমান। তিনি আদালতে দাবি করেন, মামলার কোনো আসামির বিরুদ্ধেই অভিযোগ গঠনের মতো পর্যাপ্ত উপাদান নেই। পাশাপাশি তদন্তেও নানা ত্রুটি রয়েছে বলে তিনি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এদিকে সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম। এর আগে ২৮ জুন তিনি তার মক্কেলের অব্যাহতি চেয়ে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। আর ২৪ জুন পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী মো. আমির হোসেন, আবুল হাসান, ইশরাত জাহান ও মোহাম্মদ এনাম শুনানি করেন।
গত ২২ জুন প্রসিকিউশন আদালতে ২২ আসামির বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অভিযোগের ভিত্তি (প্রাইমা ফেসি গ্রাউন্ড) রয়েছে উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য ৩০ জুন দিন নির্ধারণ করেন।
এদিন ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, আবদুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিনসহ অন্যান্য আইনজীবী।
মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচ আসামি হলেন- সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরী, যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, মো. ফিরোজ এবং দেবাশীষ পাল দেবু। তবে সোমবার ফজলে করিম ছাড়া বাকি চার আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
এ মামলায় হাছান মাহমুদ ছাড়াও পলাতক রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন, রেজাউল করিম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচ এম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ ও সুমন দে।
এর আগে, গত ৭ এপ্রিল তিনটি অভিযোগে ২২ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২। তারও দুই দিন আগে ৫ এপ্রিল প্রসিকিউশন আদালতে ফরমাল চার্জ দাখিল করে।
মামলার প্রথম অভিযোগে ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যার দায় আনা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে তানভীর সিদ্দিকী, সায়মন ওরফে মাহিম এবং হৃদয় চন্দ্রকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে জাহিদ হাসান, আবদুল কাদের, আছিয়া খাতুন, সানজিদা সুলতানা, আবদুল্লাহসহ শতাধিক ছাত্র-জনতাকে গুরুতর আহত করার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের টেকনাফ সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া একটি বাংলাদেশি ট্রলারসহ পাঁচ রোহিঙ্গা জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)। গত রোববার (২৮ জুন) সকালে ছেড়া দ্বীপসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
অপহৃত জেলেরা হলেন মোহাম্মদ আইয়ুব (২৪), মোহাম্মদ আজিমুল্লাহ (৩০), সালাম নুর(৩১), আয়ুব আলী (৩৭) এবং ছৈয়দ হোসেন (২৫)। তারা সবাই উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা( ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী।
স্থানীয় জেলেরা জানান, রোববার (২৮ জুন) দুপুরে প্রতিদিনের মতো টেকনাফের কায়ুকখালী ঘাট থেকে সাবরাং ইউনিয়নের আলীর ডেইল গ্রামের বাসিন্দা আলী আহমদের মালিকানাধীন একটি ট্রলার মাছ ধরার উদ্দেশে সাগরে যান জেলেরা। পরে ট্রলারটি ছেড়া দ্বীপসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে আরাকান আর্মির সদস্যরা ধাওয়া দিয়ে সেটি আটক করে।
এরপর ট্রলারসহ পাঁচ জেলেকে নিয়ে যান তারা। এসময় আশপাশে থাকা আরো কয়েকটি মাছ ধরার ট্রলার দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নিরাপদে ফিরে আসে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী জলসীমার ভেতরে ঢুকে যাওয়ায় আরাকান আর্মি একটি ট্রলারসহ পাঁচ জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়েছি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা সবাই রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা। আটক জেলেদের বিষয়ে বিজিবির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।
ফাইল ছবি
একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (২৯ জুন) রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তায় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয় এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানানো হয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের চিত্রকলা, পাপেট শিল্প, নাটক ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
তিনি বলেন, দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ, শিশুদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও সৃজনশীলতা চর্চায় তার অনন্য অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
এদিকে, শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যু দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, যা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতি তার অবদানকে সর্বদা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একইসঙ্গে তার কাজ ও আদর্শ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মরহুমের আত্মার চিরশান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন মুস্তাফা মনোয়ার (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইনি ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০।
ছবি: সংগৃহীত
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার রানীশিমুল ইউনিয়নের খারামোরা সীমান্ত এলাকায় মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে দুইজনকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সোমবার (২৯ জুন) সকালে ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচা বিজিবি ক্যাম্পের আওতাধীন সীমান্ত দিয়ে মানবপাচারকারীরা ওই দুইজন বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। পরবর্তীতে তাওয়াকুচা ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার হাবিলদার মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা সকাল ৯টা ২০ মিনিটে সীমান্ত পিলার ১০৯৭-এর পাশ দিয়ে তাদের আবার ভারতের দিকে ফেরত পাঠায়।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা ওই দুই ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের যশোরের বাসিন্দা বলে দাবি করলেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি।
তাওয়াকুচা বিজিবি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার হাবিলদার মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, সোমবার (২৯ জুন) সকালে সীমান্ত এলাকায় দুইজনকে পাওয়া যায়। আমরা তাদের ভারতের সীমানায় রেখে এসেছি। বর্তমানে তারা ১০৯৭ নম্বর পিলারের পাশে অবস্থান করছে। সীমান্তে মানবপাচারসহ সব ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমরা সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছি।
ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন (৩৯ বিজিবি)র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরুল আমিন বায়েজীদ জানান, বিজিবির টহল দলের তাৎক্ষণিক সতর্ক অবস্থান গ্রহণ এবং সীমান্তবর্তী স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার ফলে তাদের অনুপ্রবেশের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি ও টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবি সর্বদা সতর্ক ও দায়িত্বশীলভাবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
ছবি: সংগৃহীত
শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় একটি চক্রের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর টাকা হরিলুটের অভিযোগে থমকে গেছে গুরুত্বপূর্ণ শরীয়তপুর-চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের নির্মাণকাজ।
কাগজে-কলমে অবকাঠামো দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা লোপাট, ৫ ইঞ্চির গাছের দাম ৫৬ হাজার টাকা ধরা এবং ক্ষতিপূরণের চেক তুলতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে এই প্রকল্পের পেছনে।
টাকার ঘাটতিতে থমকে আছে প্রকল্প: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই মহাসড়কটি প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এর মধ্যে ৪ ফেনের জন্য জমি অধিগ্রহণ বাবদ ৪৩০ কোটি এবং ২ লেনের সড়ক নির্মাণে বাকি ৪৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
২০২১ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমি জটিলতায় প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। ইতোমধ্যে বরাদ্দের সব টাকা শেষ হয়ে গেলেও জমি অধিগ্রহণ হয়েছে মাত্র ৫১ শতাংশ (৯৫.৮৫ হেক্টরের মধ্যে ৪৯ হেক্টর)। এখন কাজ চালু করতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) আরও ৪১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ে।
দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিনব কৌশল: সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ আইন ২০১৭-এর তোয়াক্কা না করে অভিনব সব উপায়ে টাকা লুটের উৎসব চলেছে এই প্রকল্পে।
অস্তিত্বহীন ভবনের লাখ লাখ টাকা বিল: জমি অধিগ্রহণের নকশা বা ভিডিওতে যা নেই, তারও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ভেদরগঞ্জের চরতারবুনিয়া মৌজায় শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির একতলা ভবনের ওপর কাগজের কলমে ‘দোতলার একাংশ’ দেখিয়ে অন্তত ২০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে।
গাছের অবিশ্বাস্য মূল্য: ভেদরগঞ্জের পাপরাইল এলাকায় জয়নাল খাঁর বাগানের ৫.৮ ইঞ্চি মোটা একেকটি গাছের মূল্য ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার টাকা! অবাস্তব আকৃতির ও অস্তিত্বহীন ২০০টি গাছের জন্য ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ প্রস্তুত করা হয়েছে।
আইন ভেঙে নিজেরাই আপিল নিষ্পত্তি: নিয়ম অনুযায়ী, তালিকায় বাদ পড়া কোনো স্থাপনার আপত্তি থাকলে তা বিভাগীয় কমিশনারের নিষ্পত্তি করার কথা। কিন্তু এলএ শাখা নিজেরাই প্রায় ১২০টি আপত্তি নিষ্পত্তি করে কোটি কোটি টাকা ছাড় করেছে। চরকাশাভোগ এলাকার শাহিদা বেগম নামের এক নারীকে প্রথমে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলেও পরে জেলা প্রশাসনের শুনানিতে ৪৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা দেওয়া হয়। অথচ বর্তমানে সেখানে কোনো ঘরের অস্তিত্বই নেই।
চেক তুলতেও দিতে হয় মোটা অঙ্কের ঘুষ: ক্ষতিপূরণের টাকা তুলতে গিয়ে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার সার্ভেয়ার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন সাধারণ মানুষ।
দক্ষিণ মধ্যপাড়া এলাকার মনোয়ারা বেগম ও আব্দুল মালেক দম্পতি জানান, তাদের একটি টিনের ঘরের ১৬ লাখ টাকার চেক তুলতে আড়াই লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।
একই এলাকার নান্নু সরদার ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেলেও ভ্যাটের কথা বলে তার কাছ থেকে মোট টাকার ৬ শতাংশ (প্রায় ১৬ লাখ টাকা) কেটে নিয়েছেন এলএ শাখার সার্ভেয়াররা।
যা বলছেন দায়িত্বশীলরা: সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ নাবিল হোসেনের দাবি, মূল ডিপিপিতে (DPP) জমি অধিগ্রহণের টাকা কম ধরা হয়েছিল। জমি বুঝে না পাওয়ায় ঠিকাদার কাজ করতে পারেননি। তবে মাঠপর্যায়ের কোনো অনিয়ম এখন প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাসুদুল আলম দাবি করেন, এসব অনিয়ম আগের কর্মকর্তাদের সময়ে ঘটেছে। বর্তমান জেলা প্রশাসক মিজ তাহসিনা বেগম বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এলএ শাখা ঢেলে সাজিয়েছি এবং অনেককে বদলি করেছি। আমার জানামতে এখন কেউ পারসেন্টেজ নিচ্ছেন না। সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ দিলে কাউকে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না।’
ছবি: সংগৃহীত
নড়াইলে দলবল নিয়ে ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু রায়হানকে তাঁর অফিস কক্ষের ভেতরে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার (২৮ জুন) বিকেলে সদর উপজেলা পরিষদের নতুন ভবনে এই ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় লাঞ্ছিত মৎস্য কর্মকর্তা নিজেই বাদী হয়ে ওই দিন রাতে সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অজয় কুমার কুন্ডু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অভিযুক্ত যুবকের নাম মো. জিসানুর রহমান ওরফে জিসান। তিনি নড়াইল সদর উপজেলার যদুনাথপুর গ্রামের মো. টিপু সুলতানের ছেলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক যুবক জানান, জিসান এক সময় ছাত্রদলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি ওই দলের সাথে জড়িত কি না, তা জানা নেই।
সদর থানায় মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, উপজেলা পরিষদের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়। অভিযুক্ত জিসান প্রায়শই অফিসে এসে বিভিন্ন গোপনীয় তথ্যাদি দাবি করতেন। অফিসের গোপনীয় তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে তিনি প্রায়ই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন।
গত রোববার (২৮ জুন) অফিস চলাকালীন বিকেল ৩টার দিকে জিসান ৪/৫ জনকে সাথে নিয়ে মৎস্য কর্মকর্তার অফিসে চড়াও হন। সেখানে তিনি নড়াইল জেলার সকল সুবিধাভোগী সদস্যদের প্রদর্শনীর তালিকা দাবি করেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে এই তালিকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জিসান ও তার সহযোগীরা মৎস্য কর্মকর্তাকে গালিগালাজ ও মারধর করেন। এ সময় তারা অফিসের সরকারি ডেস্কটপ ও মনিটর ভাঙচুর করে ক্ষতিসাধন করেন।
যোগাযোগ করা হলে মো. জিসানুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, আমরা গ্রামের কৃষকদের নিয়ে কাজ করি। তাদের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধার কারণে প্রায়ই উপজেলা পরিষদে যেতে হয়। কিন্তু মৎস্য কর্মকর্তার কাছে গেলে তিনি কোনো তথ্য দিতে চান না এবং আমাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তিনি রাজনৈতিক দলের প্রভাব দেখান, যার প্রমাণ আমার মুঠোফোনে রেকর্ড করা আছে।
জিসান আরও অভিযোগ করেন, আমি ঘটনার সময় ভিডিও করতে গেলে মৎস্য কর্মকর্তা আমার হাত থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলেন। এরপর অফিসের কয়েকজন স্টাফসহ তিনি আমাকে মারধর করেন। তিনি কেমন মানুষ, তা অফিসের কর্মচারীদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবু রায়হান বলেন, জিসান প্রায়ই অফিসে এসে ঝামেলা করেন এবং বিভিন্ন প্রদর্শনীর বরাদ্দ দেওয়ার জন্য অনৈতিক দাবি জানান। যেকোনো বরাদ্দ একটি কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়, এককভাবে কোনো বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এই বিষয়টি একাধিকবার বুঝিয়ে বলার পরও তিনি দলবল নিয়ে অফিসে এসে ভাঙচুর চালিয়েছেন এবং আমাকে লাঞ্ছিত করেছেন। বাধ্য হয়ে আমি থানায় মামলা করেছি।
নড়াইল সদর থানার ওসি অজয় কুমার কুন্ডু বলেন, ঘটনাটি জানার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে ঘটনার সাথে জড়িতরা ততক্ষণে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। মৎস্য কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
কিশোরগঞ্জ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১০টি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারের মাঝে ৫ লক্ষ টাকা করে সর্বমোট ৫০ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করা হয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শোকার্ত পরিবারগুলোর হাতে এই সহায়তার চেক তুলে দেন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এরশাদুল আহমেদ।
চেক বিতরণ শেষে উপস্থিতির উদ্দেশ্যে জেলা প্রশাসক তার বক্তব্যে প্রাপ্ত অর্থের সঠিক ও উৎপাদনশীল সদ্ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি পরিবারগুলোকে কেবল অনুদানের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার আহ্বান জানান।
এই অর্থ অপচয় না করে ফলমূল চাষাবাদ, গবাদি পশু পালন, নারীদের সৃজনশীল কারুশিল্প চর্চা এবং লভ্যাংশভিত্তিক নিরাপদ বিনিয়োগে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি। সেই সাথে কর্মদক্ষতা ও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের বিভিন্ন যথাযথ প্রশিক্ষণ গ্রহণে সকলকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেন।
মন্তব্য