× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য

মতামত
The Sundarbans is supposed to be free of pirates
hear-news
player
print-icon

সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়ে ওঠার কথা

সুন্দরবন-জলদস্যুমুক্ত-হয়ে-ওঠার-কথা
সুন্দরবন এখন জলদস্যুদের কাছ থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সফল কার্যক্রম এবং জলদস্যুদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও ব্যবসা নিয়ে প্রথমবারের মতো করা পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঘ চোরাকারবারীরা এখনও সুন্দরবনে রয়ে গেছে।

সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য যার বেশিরভাগ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ এই বিশ্ব ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে, তাদের বেশিরভাগই জেলে, মধু এবং কাঠ সংগ্রাহক। উপকূলীয় জনগণকে তাদের জীবিকার জন্য ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। তার পাশাপাশি জলদস্যুদের ভয় তাদেরকে সবসময় আতঙ্কগ্রস্ত করে রাখত।

২০১৬ সালে ১২টির মতো জলদস্যু বাহিনী তৎপর ছিল যারা সুন্দরবনকে নিয়ন্ত্রণ করত। এই অঞ্চলে সক্রিয় জলদস্যু চক্রের কারণে আশেপাশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দারা সব সময় আতঙ্কে থাকত। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করেন। ওই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সামনে জুম ভিডিওর মাধ্যমে ৩ হাজার ৩২১টি অস্ত্র ও অস্ত্রভাণ্ডারসহ ৬টি গ্রুপের অন্তত ৫৮ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণের আগে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং কীভাবে সুন্দরবন জলদস্যুমুক্ত হয়— এর প্রেক্ষাপট ও উত্তর খোঁজা আবশ্যক।

সুন্দরবনে জলদস্যুরা সুন্দরবনের রাজা হিসাবে বিবেচিত হতো। জলদস্যুতা, ডাকাতি এবং চোরাশিকারি বেড়ে বাংলাদেশের ফুসফুসের জন্য ক্যানসারে রূপান্তরিত হয়। স্থানীয়, জেলে এবং ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ ছিল বর্ণনাতীত। জলদস্যু ও ডাকাতদের অপরাধমূলক কার্যকলাপে উপকূলীয় মানুষ, বিশেষ করে জেলে, কাঠ ও মধু সংগ্রহকারীদের প্রাত্যহিক জীবন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হতো।

জলদস্যুদের মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত হয়েছে অনেক জেলে, মৌয়াল এবং কাঠুরিয়া; অনেক নিরীহকে হারাতে হয়েছে প্রাণ। অপহরণ এড়াতে এলাকার জেলেদের জলদস্যুদের থেকে ‘জেল থেকে মুক্ত হও’ কার্ড নিতে হতো। স্থানীয়রা অভিযোগ ছিল, জলদস্যুদের কাছে মুক্তিপণের একটি নির্দিষ্ট হার ছিল— একজন মানুষের জন্য ২০ হাজার থেকে ১ লাখ এবং একটি ট্রলারের জন্য ৫ হাজার থেকে ১০হাজার টাকা। অপরাধীরা অপহরণ এবং লুটপাটের মাধ্যমে ২শ কোটিরও বেশি ‘বার্ষিক ব্যবসা’ তৈরি করেছিল। এছাড়াও, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটন খাত মূলত জলদস্যুদের কারণেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ক্রমাগত অভিযান এবং তদারকির মাধ্যমে সরকার সুন্দরবনে জলদস্যুদের দমন করতে সক্ষম হয়েছে। নদীর দানবদের প্রতি কঠোরতা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার গ্যারান্টি জলদস্যুতা নিবৃত করতে সক্ষম হয়।

সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিজিবি এবং বন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে ২০১২ সালে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ৩০ মে মাস্টার বাহিনী নামে কুখ্যাত জলদস্যু দলটি প্রথম আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু বড় ভাই বাহিনী, আইয়ুব বাহিনী, রেজা বাহিনী, শাহিনুর বাহিনী এবং অন্যান্য দল সুন্দরবনে লুকিয়ে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছিল।

সময়ে সময়ে তাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। এই এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলদস্যুদের সঙ্গে লড়াইয়ে র‌্যাবের কমপক্ষে ২৮ সদস্য নিহত হয়েছে। তবে তারা ২শ ৪৬টি সফল অভিযান চালিয়েছে এবং ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন চক্রের ৫শ ৮৬ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এমনকি জলদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের ওপর ভিত্তি করে ‘অপারেশন সুন্দরবন’ নামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে।

শুধু দমনের প্রচেষ্টায় অভিযান চালিয়ে জলদস্যুদের ম্যানগ্রোভ বন থেকে নির্মূল করা ছিল অসম্ভব। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের পুনর্বাসন এবং তাদের পরিবারকে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য ‘সুন্দরবনের হাসি’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করা হয় যা মূলত জলদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ৩১ মে, ২০১৬ থেকে ০১ নভেম্বর, ২০১৮ পর্যন্ত ৪শ ৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে সুন্দরবনের ৩২টি ডাকাত দলের ৩শ ২৮ সদস্য। প্রত্যেক জলদস্যু তাদের নতুন জীবন শুরু করার জন্য ১ লাখ করে টাকা পায়। এছাড়াও, সেলাই, কম্পিউটার, ড্রাইভিং, বুটিকসহ নানা বিষয়ে তাদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

উল্লেখ্য, সুন্দরবন পুনর্বাসন প্রকল্প এতটাই সফল হয়েছে যে, এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার ৪৩ ডাকাত ৯৪টি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে আত্মসমর্পণ করে।

সুন্দরবন এখন জলদস্যুদের কাছ থেকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সফল কার্যক্রম এবং জলদস্যুদের পুনর্বাসনে সরকারের প্রণোদনার মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে বাঘ শিকার ও ব্যবসা নিয়ে প্রথমবারের মতো করা পিএইচডি গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাঘ চোরাকারবারীরা এখনও সুন্দরবনে রয়ে গেছে। ২০১৪ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪শ ৪০ যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১শ ১৪ তে নেমে এসেছে যেটি সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। বাঘ শিকারের সিন্ডিকেট ভাঙতে আরও কঠোর এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক।

সুন্দরবনে জলদস্যুতা এখন একটি স্মরণীয় অতীত, যা আমরা আর দেখতে চাই না। আশা করা হচ্ছে যে, সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্প আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে সহায়তা করবে। এছাড়া সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত রাখতে প্রকল্পের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।

লেখক: গবেষক, প্রবন্ধকার ও কলাম লেখক।

মন্তব্য

আরও পড়ুন

মতামত
Strong political columns stopped

শক্তিশালী রাজনৈতিক কলাম থেমে গেল

শক্তিশালী রাজনৈতিক কলাম থেমে গেল
মান্না দের গাওয়া বিখ্যাত গান ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’… গানটি বহুল শ্রুত হিসেবে গিনিচ রেকর্ডে স্থান পেয়েছে। সেই বিবেচনায় গাফ্ফার চৌধুরী রচিত অমর একুশের গান সেখানে সবার আগে স্থান পাওয়ার কথা। এব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

কালজয়ী অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের রচয়িতা, সাংবাদিক-সাহিত্যিক ও কিংবদন্তি কলাম লেখক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী চলে গেলেন। গত বৃহস্পতিবার লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

এই গুণী মানুষের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ আমি কখনই আমি পাইনি। সরাসরি কখনও দেখা বা কথা বলারও সুযোগ হয়নি। কিছু ভার্চুয়াল মিটিং বিশেষ করে সম্প্রীতি বাংলাদেশের জুম মিটিংয়ে কয়েকদিন কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কলাম পাঠের মধ্য দিয়ে। আমি আমার সেই ছাত্রজীবন থেকে গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম পড়ে আসছি। তার শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমেই তিনি আপন হয়ে গিয়েছিলেন।

রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি এবং সমসাময়িক বিষয় নিয়ে তিনি যে মানের কলাম লিখেছেন তা খুব সচরাচর দেখা যায় না। এমনকি উন্নত বিশ্বের নামকরা সব সংবাদমাধ্যমেও সেই মানের কলাম খুব একটা চোখে পড়ে না।

গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম মানেই তথ্যের সমাহার। এককথায় তিনি ছিলেন তথ্যভাণ্ডার। তথ্য শুধু স্মৃতিতে ধরে রাখাই বড় কথা নয়, সেই তথ্য প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যবহার করার মধ্যেই আছে মুনশিয়ানা। আর এই ব্যাপারে গাফ্‌ফার চৌধুরী ছিলেন যারপরনাই পারদর্শী। আমি যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছি তার কলাম পাঠ করে। অনেকেই ভাবেন গাফ্‌ফার চৌধুরী যেহেতু ভারত উপমহাদেশের রাজনীতির উত্থানপতনের প্রত্যক্ষদর্শী তাই সেই রাজনীতি ও ইতিহাসের অনেক তথ্য তিনি জানবেন এটাই স্বাভাবিক।

বিষয়টি আসলে তা নয়। সমগ্র বিশ্বের রাজনীতি এবং ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ ছিল তার নখদর্পণে। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এমনকি আফ্রিকার অনেক রাজনৈতিক উত্থানপতন এবং ইতিহাসের নানান ঘটনা ছিল তার দখলে এবং সেসব তথ্য তিনি খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই বিভিন্ন লেখায় ব্যবহার করে পাঠককে সমৃদ্ধ করেছেন।

লেখা অনেকেই লেখেন, কিন্তু অপ্রিয় সত্য কথা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে খুব কম মানুষই বলতে পারেন। গাফ্‌ফার চৌধুরী ছিলেন সেরকম একজন ব্যক্তি যিনি উচিত কথা বলতে কোনোরকম দ্বিধা করেননি। তিনি আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন অথচ সবচেয়ে বেশি আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেছেন। বরং বলা যায় গাফ্‌ফার চৌধুরীর প্রয়াণে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করার আর কেউ থাকল না।

আওয়ামী লীগের বিরোধিতা বা বদনাম করা আর সমালোচনা করা এক বিষয় নয়। প্রকৃত সমালোচনা বলতে যা বোঝায় সেই সমালোচনাই গাফ্‌ফার চৌধুরী করেছেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। তিনি তার অসংখ্য লেখায় বিএনপির প্রচণ্ড সমালোচনা করেছেন কিন্তু তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছেন যে বিএনপির মতো একটি বড় দল তাদের রাজনৈতিক আদর্শের পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল হিসেবে পরিচালিত হোক এবং সে ব্যাপারে তিনি অনেক মূল্যবান পরামর্শ তার লেখনীতে তুলে ধরেছেন।

কলম চালানোর ক্ষেত্রে এই গুণী লেখক কখনই কোথাও নতিস্বীকার করেননি বা কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলেননি। একবার একটি লেখা নিয়ে তারই এক বন্ধু এবং আমলা এনাম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং চলতে থাকে এই দুইজনের মধ্যে পালটাপালটি কলাম লেখা। এই কলাম যুদ্ধের একপর্যায়ে এনাম আহমেদ চৌধুরী সরে গেলে সেই পালটাপালটি কলাম লেখার অবসান ঘটে।

সেই কলামযুদ্ধে সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের প্রকাশ ঘটেছিল কারণ উভয়ই স্ব স্ব অবস্থান থেকে বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন কিন্তু তাদের দুজনের বন্ধুত্বের সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেনি। এখানেই গাফ্‌ফার চৌধুরীর মতো লেখকের বিশেষত্ব। আমরা পাঠাকরা অবশ্য সেই কলামযুদ্ধ থেকে জানতে পেরেছিলাম অনেক কিছু।

গাফ্‌ফার চৌধুরী লেখক এবং সাংবাদিক হিসেবে পদচারণা ছিল সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে। কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক কলাম লেখক হিসেবে। প্রতিসপ্তাহে ঢাকার একাধিক পত্রিকায় কলাম লিখেছেন নিয়মিত। অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ে যখন কেউ কলম ধরতেই সাহস পায়নি, তখন তিনি সব ভয়ভীতি এবং সমালোচনার তোয়াক্কা না করে কলম চালিয়েছেন সাহসী কলমযোদ্ধার মতোই।

গাফ্‌ফার চৌধুরী প্রথম লেখার পর অন্যরা তখন সেই বিষয়ে লেখার সাহস দেখিয়েছেন। গাফ্‌ফার চৌধুরীর এরকম তীক্ষ্ণ কলামের বাইরে যে বিষয়টি দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাকে জনপ্রিয় করে রেখেছে তা হচ্ছে তারই লেখা একুশের অমর কালজয়ী গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি”। একটি মাত্র গান লিখে যে একজন গীতিকার এত জনপ্রিয় হতে পারেন তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে গাফ্‌ফার চৌধুরী ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ আছে।

একবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এসে বলেছিলেন যে এই গান এত জনপ্রিয় হবে তেমনটা ভেবে তিনি এটা লিখেননি। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত দৃশ্য দেখা সম্পূর্ণ আবেগতাড়িত হয়েই কবিতাটা রচনা করেছিলেন যা পরবর্তীকালে আলতাফ মাহমুদের সুরে গানে রূপ নেয় এবং অমর একুশের প্রভাতফেরির গান হিসেবে গ্রহণ করায় এই কালজয়ী গানটি আন্তর্জাতিকভাবেও জনপ্রিয় হয়।

গাফ্‌ফার চৌধুরী তার লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতির জন্য যা দিয়ে গেছেন তার মাধ্যমেই বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে। যতদিন বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ থাকবে এবং যতদিন অসাম্প্রদায়িক আদর্শ টিকে থাকবে ততদিনই তিনি আমাদের মাঝে থাকবেন। তারপরও তার অবদান এবং লেখাগুলো সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিতে হবে। তার লেখা তো নিছক লেখা নয়, এসব লেখা হচ্ছে আদর্শের বাণী বিতরণ।

প্রতিটা লেখায় অনেক কিছু শেখার আছে। এসব লেখা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠ করার প্রয়োজনীয়তা আছে। সে কারণেই গাফ্‌ফার চৌধুরীর সমস্ত লেখা সন্নিবেশিত করে সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করে তা সবার জন্য পাঠের সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নিতে হবে।

আর তার রচিত অমর একুশের গান যাতে গ্রিনিচ রেকর্ড বুকে স্থান পায় সেই উদ্যোগও নিতে হবে যদি সেখানে স্থান না পেয়ে থাকে। আমি যতটুকু জানি মান্না দের গাওয়া বিখ্যাত গান ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’… গানটি বহুল শ্রুত হিসেবে গিনিচ রেকর্ডে স্থান পেয়েছে। সেই বিবেচনায় গাফ্‌ফার চৌধুরী রচিত অমর একুশের গান সেখানে সবার আগে স্থান পাওয়ার কথা। এব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। একথা ঠিক যে অনেকেই গাফ্‌ফার চৌধুরীর স্মৃতি ধরে রাখার উদ্দেশ্যে নানান পদক্ষেপ নিবেন এবং অনেক স্মৃতি সংগঠনও গড়ে উঠবে। এগুলো হতেই পারে। তার মতো কিংবদন্তি কলাম লেখকের লেখা একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ এবং প্রচারের ব্যবস্থা না করলে তথ্যের বিকৃতি হতে পারে।

লেখক: ব্যাংকার, কলাম লেখক। টরনটো, কানাডা-প্রবাসী।

[email protected]

আরও পড়ুন:
গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আসছে সোমবার
দেশে আনা হচ্ছে গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ
‘বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান গাফ্‌ফার চৌধুরী’
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রয়াণ
ভারত আপনাদের রক্ষা করতে পারবে না, সরকারকে জাফরুল্লাহ

মন্তব্য

মতামত
The futility of national government theory

জাতীয় সরকারতত্ত্বের অসারতা  

জাতীয় সরকারতত্ত্বের অসারতা  
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতীয় সরকারের ঘাড়ে যেসব দায়িত্ব ন্যস্ত করতে চাচ্ছেন তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা, সময় কোনোটিই তাদের হবে না। দুইবছর দেশের সংবিধান কোথায় যাবে? ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কি বিষয়গুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন? যদি পারতেন তাহলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা এবং বিষয়টি যথাযথ পরিবীক্ষণের চেয়ে বেশি কিছু ভাবাটাই অবান্তর।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী গত কয়েক বছর রাজনীতি, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ সক্রিয় ও আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এই পরিচয়ে তাকে অনেকে শ্রদ্ধা করেন। তিনি নিজেকে একজন ভাসানী অনুসারী দাবি করলেও তার সমর্থন ও দুর্বলতা ডান-বাম, উগ্র ডান, উগ্র বামসহ সব পন্থার ব্যক্তিদের প্রতি বাছ-বিচারহীনভাবে রয়েছে- এটি গোপনীয় নয়। তিনি সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের প্রতি যেমন আনুগত্য প্রকাশ করেন আবার বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে তিনি শ্রদ্ধা করেন বলে দাবি করেন। সামরিক শাসক এরশাদের সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা তিনি নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেন। উগ্র সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক দল সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদারকে তিনি জাতীয় নেতার মর্যাদায় বসান। ১৯৭৬ সালে ভাসানীর নেতৃত্বে ভারতবিরোধী জিগির তোলার লক্ষ্যে আয়োজিত ফারাক্কা লং মার্চকে এবারও পুনর্জীবন ঘটিয়ে নিজেই উগ্র ডান, উগ্র বামদের নিয়ে রাজশাহীতে লং মার্চ করে এসেছেন। সেখানেও তিনি ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে নিজেকে আলোচনায় রেখেছেন। তার রাজনৈতিক দর্শন মূলতই অতি ডান, অতি বামদের মাঝামাঝি অবস্থানে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

বাঙালি মধ্যবিত্তের তথাকথিত শিক্ষিতজনের রাজনীতি খুব বেশি একটা দেশপ্রেম ও আদর্শভিত্তিক নয় এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য। এদের রাজনৈতিক জ্ঞান খুবই সংকীর্ণ কিন্তু প্রকাশভঙ্গি উচ্চমার্গীয়। দেশ ও জাতির জন্য এদের দরদ ভালোবাসা দেখে অনেকেই বিভ্রান্ত হন। কিন্তু কালের স্রোতে এদের হারিয়ে যাওয়ার নজির এ দেশেই অনেক আছে। দেশ ও জাতি এদের থেকে শেষ পর্যন্ত কিছুই পায় না। এরা নিজেরা যেমন সফল হয় না, তেমনি দেশ ও জাতিকেও নানা বিভ্রান্তি ও দিকভ্রান্তির চোরাবালিতে আটকে রাখার বেশি কিছু অবদান রাখতে পারেনি। কারণ এদের তত্ত্বজ্ঞান অনেকটাই বায়বীয়, বাস্তবজ্ঞান একেবারেই শূন্য। ফলে এদের কাছ থেকে দেশ ও জাতি খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দিকদর্শন পায় না। আমাদের জাতির দুর্ভাগ্য এখানেই।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী অনেক ভালো কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু মনের অজান্তে থাকা তার অনেক কথাই তিনি লুকাতে পারেন না। মুখ ফসকে বের হয়ে আসে। সেখানেই তার দ্বিচারিতার স্বরূপটি ধরা পড়ে যায়। তিনি নিজেকে যতই প্রগতিশীল, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং দেশপ্রেমিক বলে মনে করেন; কিন্তু উগ্র ডান, বাম, হঠকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মিশেল দিয়ে কেউ কখনও দেশ ও জাতিকে উদারবাদী ধারায় অগ্রসর করার কথা ভাবতে পারেন না। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রবীণ নাগরিক হিসেবে যখন বক্তব্য দেন তখন অনেকেই তার প্রতি সম্মান রেখে কথা বলেন । কিন্তু তিনি সেই সম্মানের অনেক কিছুই তার বক্তব্যের নির্মোহ বিশ্লেষণে থাকার মতো অবস্থানে না থাকলেও কেউ বিষয়গুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি বা ঘাটাঘাটি করে না। এখানেই তার বিশেষ সুবিধাটি। তবে তিনি যেসব স্ববিরোধী বক্তব্য ও আচরণ করেন সেটি বোধিচিত্তের মানুষদের না বোঝার কোনো কারণ নেই।

সম্প্রতি তিনি জাতীয় সরকারের একটি তত্ত্ব গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের ক্ষেত্রে কে বা কারা সহযোগিতা করেন তা আমাদের জানা নেই। তবে তার বিবৃতির মিশেল চরিত্র দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনি হয় জনগণের দৃষ্টিকে তার মতো করে কিংবা অন্য কারো সুদূরপ্রসারী চিন্তাকে নিয়ে মানুষকে বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার পরিকল্পনা থেকে এসব তত্ত্ব হাজির করেন। তবে কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এক-দুইদিন এ নিয়ে কিছু আলোচনা- সমালোচনার পর নানা বৈপরীত্য, অসংগতি এবং চিন্তার বালখিল্যপনার কারণে সেটি আপনা থেকে উবে যেতে থাকে।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী যেভাবে বিষয়টিকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন সেটি যে এত সহজ সরল নয়, তা তিনি কতটা জানেন বা বোঝেন জানি না। কিন্তু যে বিষয়ে তিনি এমন একটি প্রস্তাব হাজির করেছেন সেটি কোনো পক্ষই চিন্তার খোরাকের মধ্যে বিবেচনা করেছেন এমনটিও দেখা যায়নি। তবে নেপথ্যে থেকে যদি কেউ তাকে দিয়ে কাজটি করিয়ে থাকেন তারা হয়তো এখন বাজার যাচাই করছেন! ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশে আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব, কার্যকারিতা, সরকার কাঠামো ইত্যাদি উল্লেখ করেছেন।

দুবছরের জন্য দেশে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি যেসব বক্তব্য হাজির করেছেন তা এমন: “জাতীয় সরকারের প্রথম তিন মাসের মধ্যে নতুন করে নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনি আইনের কিছু ধারার সংস্কার, গণভোট এবং ‘না’ ভোটের প্রচলন, প্রশ্নবিদ্ধ সংসদকে লক্ষ ভোটারের স্বাক্ষরে প্রত্যাহার ব্যবস্থা, জনস্বার্থ সম্পর্কিত বিভাগে ন্যায়পাল নিয়োগ, প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধকরণ এবং ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি পুরোপুরি কার্যকর করে, ওষুধ, শৈল্য চিকিৎসা ও রোগনিরীক্ষার দর সরকার স্থির করে দেবে। পর্যাপ্ত লাভ দিয়েও ওষুধের সর্বোচ্চ বিক্রিমূল্য অর্ধেকে নেমে আসবে। অপ্রয়োজনীয় ও প্রতারণামূলক ওষুধ বাতিল হবে। সব ওষুধ কোম্পানিসমূহকে একাধিক কাঁচামাল উৎপাদনে প্রণোদনা দেয়া হবে।” তার প্রস্তাবে আরও উল্লেখ করেছেন, “মানহানির মামলা করতে হলে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে ন্যূনতম ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা কোর্ট ফি দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির শহরে ফৌজদারি মামলা করতে হবে। একই মামলা বিভিন্ন জেলার একাধিক আদালতে করা যাবে না।” প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, “পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক কর্মী ও আলেমদের জামিন নিশ্চিত করে এক বছরের মধ্যে তাদের বিচার শেষ করে রায় কার্যকর করা হবে।” প্রস্তাবে তিনি বাংলাদেশকে ১৫/১৭টি প্রদেশ বা স্টেটে বিভক্ত করার কথাও বলেছেন।

এক্ষেত্রেও তার প্রস্তাব, “প্রত্যেক প্রদেশে/স্টেটে ৬-৭ জন বিচারপতি সমন্বিত হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা এবং সুপ্রিম কোর্টে একটি সার্বক্ষণিক সাংবিধানিক বেঞ্চ সৃষ্টিসহ সুপ্রিম কোর্টে ৬টি স্থায়ী বেঞ্চ থাকবে-(১) ফৌজদারি, (২) দেওয়ানী, (৩) নির্বাচন ও মৌলিক অধিকার, (৪) কোম্পানি বিরোধ ও আয়কর সংক্রান্ত, (৫) সকল প্রকার দুর্নীতি বিষয়, (৬) যৌন নিপীড়ন ও নারীদের অধিকার ।” তিনি এই প্রস্তাবনায় ‘সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন, দুই কোটি মানুষের সাপ্তাহিক রেশনিং চালু করা, মাসিক ১০০ টাকায় তিন বাল্‌বের বিদ্যুৎ-সুবিধা এবং মাসিক ২০০ টাকার প্রিমিয়ামে ওষুধসহ সকল প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিচর্যা, দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ, অভিযুক্তদের নির্বাচন থেকে বাইরে রাখা, ইভিএম পদ্ধতি বাতিল, ভোটার তালিকা সংশোধন, দলের নিবন্ধন সহজীকরণ, দলীয় প্রতীকে ইউপি ও উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নেয়া, পেশাজীবী, বয়োজ্যেষ্ঠ অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদ ও সম্মানিত ব্যক্তিদের নিয়ে জাতীয় ও প্রাদেশিক সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, বাজেট প্রদান, বাজেটে শুল্কমুক্ত আমদানি, এনজিওদের মাধ্যমে কৃষিতে ৫ শতাংশ সুদে বিনিয়োগ, কারাগার, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর হাসপাতালগুলো বিকল্প চিকিৎসাসেবা দ্বারা পরিচালিত, বিদেশফেরতদের বিমানবন্দরে ভিআইপি-সুবিধা, মৃতদেহ বিনা অর্থে দেশে আনা, প্রবাসীদের ৫০ লাখ টাকার জীবনবীমা-সুবিধা প্রদান, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ছয় মাস পর ক্ষমতা হস্তান্তর করা’ ইত্যাদি তার জাতীয় সরকারের রূপকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জাতীয় সরকার গঠন করার জন্য তিনি ৩১ ব্যক্তির নাম তাদের বিনা অনুমতিতেই প্রকাশ করেছেন। এদের কেউ কেউ আমাদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তারা আদৌ এ ধরনের সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা দেশে অনুভব করেন কি না সেটিই মস্তবড় প্রশ্ন।তাছাড়া এখানে বিভিন্ন ঘরানার কিছু ব্যক্তিকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দেয়ারও প্রস্তাব তিনি করেছেন। মন্ত্রণালয়ের নামও তিনি প্রস্তাব করেছেন। সমস্ত বিষয়টি তার একান্ত কাল্পনিক, একান্ত ব্যক্তিগত নাকি কারো কারো চিন্তাপ্রসূত প্রস্তাবনা সেটি একটি ভিন্ন প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো তিনি দেবেন না। কিন্তু যে প্রস্তাবনা তিনি গণমাধ্যমে প্রকাশের জন্য প্রেরণ করেছেন সেটি পড়ে কোনো সচেতন মানুষ ভাবতে পারবেন না যে, এটি ইউটোপিয়া ছাড়া বাস্তবে কোনো চিন্তা করার যোগ্যতা রাখে।

দেশে সংবিধান আছে। এটিকে স্থগিত করার অধিকার কারো নেই। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা জনপ্রতিনিধিদের ছাড়া এক মুহূর্তের জন্য পরিচালিত হওয়ার কথা ভাবতে পারে না। সে ধরনের চিন্তার পরিণতি আমাদের রাষ্ট্রের জন্য অতীতে (১৯৭৫, ৮১-৮২, ৯০, ৯১, ৯৬, ২০০১, ২০০৬-২০০৮) যে বিপর্যয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রে নেমে এসেছিল সেটি কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারেন না। রাষ্ট্রক্ষমতায় নির্বাচিত প্রতিনিধি ব্যতীত কেউ বসতে পারেন- সেই সুযোগ করে দেয়ার পরিণতি অনেক দেশের জন্যই বিপর্যয় ডেকে নিয়ে এসেছে।

সুতরাং জাতীয় সরকারের কথা শুনতে যত আবেগময় মনে হবে, কিন্তু বাস্তবে এর ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে জাতিকে রক্ষা করা খুবই কঠিন কাজ। বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় জাতীয় বিপর্যয় চলছে তারপরও কেউই সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলের বাইরে গিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের কথা কল্পনাও করছেন না। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতীয় সরকারের ঘাড়ে যেসব দায়িত্ব ন্যস্ত করতে চাচ্ছেন তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা, সময় কোনোটিই তাদের হবে না।

দুইবছর দেশের সংবিধান কোথায় যাবে? ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কি বিষয়গুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেন? যদি পারতেন তাহলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা, সমঝোতা এবং বিষয়টি যথাযথ পরিবীক্ষণের চেয়ে বেশি কিছু ভাবাটাই অবান্তর। যা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা একমাত্র জনপ্রতিনিধিরাই রাখেন তাদের বাদ দিয়ে অনির্বাচিত বহু মত, বহু পথ, বহু চিন্তা ও ভাবাদর্শের মানুষদের সমন্বিত করে ভাববার কথা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ভাবেন কীভাবে? রাষ্ট্র, সরকার এবং সংবিধান নিয়ে হেলাফেলা করা যায় না, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কবে এই উপলব্ধিতে ফিরে আসবেন?

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক

আরও পড়ুন:
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ভর্তির আবেদন শুরু ২২ মে
নিজেদের স্বার্থেই এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হবে: পরিকল্পনামন্ত্রী
এসডিজি বাস্তবায়নে চাই সমন্বিত প্রচেষ্টা: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী
ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ফল প্রকাশ
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে চাকরি

মন্তব্য

মতামত
Abdul Ghaffar Chowdhury The narrator of tomorrow

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: কালের কথক

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: কালের কথক
জনগণের ভাষা, তাদের চাহিদা গাফ্ফার চৌধুরী সুদূর ব্রিটেনে বসেও বুঝতেন। যে কারণে পাঠক অপেক্ষায় থাকত কবে তার কলাম বের হবে। কবে সামনের রাজনীতির ধারণাটা পাওয়া যাবে। একজন কলাম লেখক যে কালের কথক তা অনিরুদ্ধ, গাছপাথর, নির্মল সেন ও গাফ্ফার চৌধুরীর লেখায় বোঝা যেত।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী যিনি ভাষা দিবসের গানের গীতিকবি হিসেবে যেমন পরিচিত ছিলেন তেমনি পরিচিত ছিলেন একজন কলাম লেখক হিসেবে। একটি জীবন কাটিয়ে দিলেন- শুধুই লিখে। তার লেখার বিষয়, লেখার দর্শন বা তার লেখার বিষয়ের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে অনেকেরই কথা থাকতে পারে। তারপরও একথা ঠিক যে, লিখে তিনি একটি জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন- এক শুদ্ধব্রতচারী ঋত্বিকের মতো।

গাফ্‌ফার চৌধুরীরর সাংবাদিক জীবনের কথা বলতে গেলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অমলকান্তি কবিতাটার কয়েকটি লাইন মনে পড়ে। ‘আমরা কেউ মাস্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল/অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি/সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।’ আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আসলে শুধু সাংবাদিক হতে চেয়েছিলেন। তিনি তার সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেন। তার নাম মানেই এক কলম সৈনিকের নাম। এক যোদ্ধার নাম, একজন সৃষ্টিশীল মানুষের নাম। তিনি দলনিরপেক্ষ ছিলেন না, কিন্তু যে দলের সমর্থন করতেন সে দলের গঠনমূলক সমালোচনাও করতে সামান্য দ্বিধা করতেন না। তার সাংবাদিকতার মুনশিয়ানা ছিল তার ভাষা কাঠামো নির্মাণ। স্বল্প শিক্ষিত একজন মানুষও তার লেখা পড়ে মুগ্ধ হতো, আবার শিক্ষিত মানুষও। সহজ ভাষায় যুক্তি দিয়ে নিজস্ব মতকে তুলে ধরায় তার কোনো জুড়ি ছিল না। তার লেখার আলোচনা-সমালোচনা দুই-ই ছিল। একজন কলাম লেখকের পক্ষ থাকে, পাঠক থাকে বিপক্ষও থাকে এটাই নিয়ম।

আমার মনে পড়ে একসময় আমরা একদল তরুণ যারা ছাত্র ইউনিয়ন করতাম তারা ‘দৈনিক সংবাদ’-এ অনিরুদ্ধর (সন্তোষ গুপ্ত) কলাম পড়তাম আবার গাছপাথরের (অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী) কলাম পড়ে তর্কে জড়িয়ে যেতাম। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম নিয়ে বিতর্ক করতাম। নির্মল সেনের কলাম নিয়েও বিতর্ক হতো। কিন্তু লেখকের সার্থকতা তো এখানেই। তবে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর বেলায় কথাটা ভিন্ন। তা হচ্ছে- একুশে ফেব্রুয়ারির গীতিকবিতা থেকে তার কলাম পড়ে মনে হয়েছে তিনি তার পাঠককে নির্বাচন করতেন লেখার আগেই।

জনগণের ভাষা, তাদের চাহিদা গাফ্‌ফার চৌধুরী সুদূর ব্রিটেনে বসেও বুঝতেন। যে কারণে পাঠক অপেক্ষায় থাকত কবে তার কলাম বের হবে। কবে সামনের রাজনীতির ধারণাটা পাওয়া যাবে। একজন কলাম লেখক যে কালের কথক তা অনিরুদ্ধ, গাছপাথর, নির্মল সেন ও গাফ্‌ফার চৌধুরীর লেখায় বোঝা যেত। আমি কোনো কলাম লেখককে খাটো করছি না, এই কজনের কথা মনে করছি মাত্র। আজ তার লেখার কাঠামো, বিন্যাসও ভাষার ব্যবহার দেখাতে একটা লেখার উদ্ধৃতি দেব-

‘‘২০০১ সালের বিএনপি সরকারের ভিশন ও মিশনের আর কত ফিরিস্তি দেব? সেই সময়ের বিএনপি সরকারের একশ’ দিনের কর্মসূচি এবং ক্ষমতায় থাকার পূর্ণ সময়টাতে তাদের কার্যকলাপ কেউ যদি মিলিয়ে দেখেন, তাহলে তারা সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন, তাদের বর্তমানের ‘ভিশন-২০৩০’ এর পরিণতি কী ঘটবে! রূপকথায় আছে, এক সিংহ বৃদ্ধ বয়সে নখ-দন্ত ও শিকার ধরার ক্ষমতা হারিয়ে একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল এবং ঘোষণা দিয়েছিল, সে অহিংসা ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে। সে বনের পশুপাখিদের অহিংসা ধর্মে দীক্ষা দেবে। তার ঘোষণায় বিশ্বাস করে বহু পশুপাখি অহিংসা ধর্মে দীক্ষা নিতে তার কাছে যেতে শুরু করল। সিংহ সুযোগ পেয়ে তাদের হত্যা করে খেয়ে ফেলত। তাকে আর শিকার ধরার পরিশ্রম করতে হতো না। এ সময় এক শিয়াল গেল সিংহের কাছে; কিন্তু গুহায় ঢুকল না। সিংহ বলল, ভাগ্নে এসো এসো, তোমাকে অহিংস ধর্মে দীক্ষা দেই। শিয়াল বলল, মামা, দীক্ষা নিতেই তো এসেছিলাম; কিন্তু এখন দেখছি যেসব পশুপাখি তোমার কাছে দীক্ষা নিতে এসেছে, তাদের পায়ের ছাপ সবটাই ভেতরের দিকে গেছে; কোনোটাই ফিরে আসেনি। আমি তাই এখান থেকেই বিদায় নিচ্ছি। ভেতরে এসে তোমার আজকের দিনের খোরাক হতে চাই না।

বিএনপির ভিশন-২০৩০-এর ঘোষণা শুনেও দেশের মানুষ কি বিশ্বাস করবে, দলটি সন্ত্রাস ছাড়বে, সন্ত্রাসীদের ছাড়বে, জামায়াতের সঙ্গ ছাড়বে, সন্ত্রাস ও দুর্নীতির এককালের দুর্গ হাওয়া ভবনের স্বেচ্ছানির্বাসিত অথবা পলাতক নেতার প্রভাবমুক্ত হবে? সবচেয়ে বড় কথা, অহিংস গণতন্ত্রের দীক্ষা নেবে? এই ব্যাপারে কেউ যদি সন্দেহ পোষণ করেন, তাকে কি দোষ দেয়া যাবে? উপকথার সিংহ ও শিয়ালের গল্পটির নীতিকথা আমাদের কী শেখায়?” (বিএনপি কি সত্যিই অহিংস ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে? দৈনিক যুগান্তর, ১৬ মে, ২০১৭) লেখাটি আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর। তার লেখা কতটা সহজবোধ্য, প্রখর ও রসালো ছিল এটাতেই বোঝা যায়। লেখাকে সহজবোধ্য করতে তিনি প্রচলিত গল্পের ভাষায় রাজনীতির শক্ত বিষযগুলোর গেরো খুলে দিতেন। আমার যতদূর মনে পড়ে যায়াযায়দিনে তার লেখা পড়া শুরু করেছিলাম। তার অনেক লেখা বিভিন্ন কাগজে পড়েছি। সহজ বাক্যে সুন্দর বিশ্লেষণ।

স্পষ্ট ভাষায় মুখের ওপর কথা বলতেন। একবার তার এক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলাম চামেলীবাগে রাজনীতিক-লেখক মোনায়েম সরকারের বাসায়। যিনি মূলত সাক্ষাৎকার নেবেন তার সঙ্গে গিয়েছিলাম আমি। আমার সেই বন্ধুতো তার লেখার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, আমার কোন লেখাটা পড়েছ ? এবারে আমি কথা শুরু করলাম তার লেখা নিয়ে। তিনি আমার স্মরণশক্তির তারিফ করে আমার বন্ধুকে বললেন খুব কায়দা করে। না পড়া দোষের নয়, না পড়ে বলাটা একজন সাংবাদিককে বিপদে ফেলতে পারে। আবার অন্য প্রসঙ্গে আমরা ঢুকে গেলাম। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী যে গুণটার কথা এবার বলব তাহলো তার বলার শক্তি। তার বিভিন্ন বিষয়ে অনেক পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতা ছিল, ছিল অবিশ্বাস্য রকমের স্মরণশক্তি। কয়েকশ মানুষের মধ্যে থাকলেও তিনি ছাড়া আর কেউ বলার সুযোগ পেতেন না। এটা তিনি জোর করে করতেন না। এটা ছিল তার জ্ঞানলব্ধ আলোচনার শক্তি। কত পাণ্ডিত্য থাকলে এ কাজটা করা যায় তা বলে শেষ করা যাবে না। এটা প্রয়াত নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদের মধ্যেও দেখেছি।

সাংবাদিকতার সেই সোনাঝরা দিন এখন আর নেই। কেউ কারো লেখার জন্য অপেক্ষা করে বলে মনে হয় না। করো লেখা পড়ার অভ্যেসটা একদম হ্রাস পেয়েছে। তবে শেষপর্যন্ত যার নাম দেখলে কলামটা পড়ত তিনি হলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। তার পাঠক ছিল ভুবন জোড়া। এত পাঠক বোধ করি কারো ছিল না। তার লেখার বিপক্ষের মানুষও কম নয়, তবে দুঃখজনক হলো তার লেখার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ না করে তাকে আক্রমণ করা। এটা সাংবাদিকতার কোনো নিয়মের সঙ্গে যায় না।

দুই.

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী স্বাধীনতার পর, ১৯৭৪ সালের ৫ অক্টোবর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য তিনি সপরিবারে লন্ডনে চলে যান। তারপর সেখানেই বসবাস শুরু করেন। সেখানে ‘নতুন দিন’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। প্রায় ৩৫টি বই লিখেছেন তিনি। গাফ্‌ফার চৌধুরী বিদেশে অবস্থান করলেও দেশের সব খবর থাকত তার নখদর্পণে। দেশের জন্য তার টান ছিল অনেক। ঢাকা ও কলকাতার বিভিন্ন দৈনিকে সমকালীন রাজণীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন তিনি।

একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ‘জয় বাংলা’, ‘যুগান্তর’ ও ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় কাজ করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তার লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি তাকে শুধু খ্যাতি নয়, অমরত্ব এনে দেয় বৈকি। প্রথমে তিনি নিজেই গানটিতে সুর করেছিলেন। পরে শহীদ আলতাফ মাহমুদ এ গানে সুরারোপ করেন এবং বর্তমান সেই সুরেই গানটি গীত হয়। বিবিসি বাংলা বিভাগের জরিপে এই গান সর্বকালের সেরা বাংলা গানের ইতিহাসে তৃতীয় সেরা গানের মর্যাদা পেয়েছে।

এটুকুই শুধু গাফ্‌ফার চৌধুরী নয়। সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ছোটদের উপন্যাসও লিখেছেন তিনি। ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’, ‘সম্রাটের ছবি’, ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’, ‘বাঙালি না বাংলাদেশি’সহ তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৩০। এছাড়া তিনি কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ নাটকও লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘একজন তাহমিনা’ ‘রক্তাক্ত আগস্ট’ ও ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’।

তুরস্কের কবি নাজিম হিকমত বলেছিলেন, বিংশ শতাব্দিতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর এক বছর। কিন্তু গাফ্‌ফার চৌধুরী একটা গীতিকবিতা লেখার পরে আর না লিখলেও তার আয়ু বাংলা ও বাঙালির সমান। তার জীবন ও সংগ্রামের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র
শুক্রবার বাসায় ফিরতে চেয়েছিলেন গাফ্ফার চৌধুরী
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু
গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আসছে সোমবার
দেশে আনা হচ্ছে গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ

মন্তব্য

মতামত
Abdul Ghaffar Chowdhury The son of news and literature

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী: সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র
তরুণবেলায়, সেই ১৯৫২ সালে কলম ধরেছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করেছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সমান প্রতিবাদী ছিলেন তিনি। যখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়, দেশের অপরাজনীতি যখন অপপ্রচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে তার কলম। দুই চোখজুড়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রচলিত সংবাদভাষ্য ও সাহিত্যের ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। দেশের সংবাদপত্রে তার কলাম সৃষ্টি করে নতুন এক ঘরানা। সাহিত্য দিয়ে যার লেখালেখি শুরু, তিনি হয়ে ওঠেন সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র।

গাফ্‌ফার ভাই চলে গেলেন! আর কখনও তার ফোন পাব না। কোনোদিন আর ফোন করা হবে না তাকে। তিনি আর বলবেন না, ‘নজরুল, দেশের খবর কী বলো?’ তাকে ফোন করলে তিনি প্রথমেই জানতে চাইতেন দেশের খবর। সব ঠিক আছে তো? বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে তিনি অত্যধিক স্নেহ করতেন। তাদের খোঁজ নিতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ছিল তার অগাধ আস্থা। একান্ত আলাপচারিতায় বলতেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই।

তার সঙ্গে কত শত স্মৃতি। ২০০৪ সালে আমার জীবনের একটি বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছিলেন তিনি। ওই বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে একদিন ফোনে বললেন, ‘এবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তুমি পত্রিকার জন্য একটা প্রবন্ধ লেখ। ডাকযোগে আমার কাছে পাঠাও। আমি দেখে ঠিক করে দেব। তারপর তা তুমি পত্রিকায় পাঠাবে। ওরা ছাপাবে।’

তার কথায় আমি লিখেছিলাম। তিনি দেখে একটু যোগ-বিয়োগ করে আমার কাছে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। আমি তা ফ্রেশ করে লিখে ঢাকা ও লন্ডনের পত্রিকায় পাঠিয়েছিলাম। ছাপা হয়। তারপর আরও পাঁচটি প্রবন্ধ তিনি দেখে দিয়েছিলেন। এরপর আর দেখে দিতে হয়নি। তার প্রেরণা ও আশীর্বাদে এখন আমি পত্রিকায় নিয়মিত লিখে যাচ্ছি। তার কাছে আমার অন্তহীন ঋণ।

দুই যুগেরও বেশি প্রায় প্রতিদিন তার সঙ্গে আমার ফোনে কথা হতো। হাসপাতালে তার ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন থাকত না। তিনি নার্সের সহায়তায় ইন্টারনেট কানেকশন নিয়ে আমাকে প্রতিদিন ফোন করতেন। গত ১৮ মে বুধবার রাতেও তিনি আমাকে ফোন করেছেন। কথা হয়েছে। ১৯ মে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় দুপুরে খবর পেলাম তিনি অমৃতলোকে যাত্রা করেছেন।

শৈশবে, যখন থেকে একুশের প্রভাতফেরিতে যাচ্ছি, তখন থেকেই তার নামের সঙ্গে পরিচয়। কৈশোরোত্তীর্ণ বয়সেই তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন তার স্কুল জীবনেই। স্কুলের পাঠ নিতে নিতেই নিয়েছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির পাঠ। আধুনিকমনস্ক মানুষটি মননে ছিলেন প্রগতিশীল। তরুণবেলায়, সেই ১৯৫২ সালে কলম ধরেছিলেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। প্রতিবাদ করেছিলেন। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত সমান প্রতিবাদী ছিলেন তিনি। যখনই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়, দেশের অপরাজনীতি যখন অপপ্রচারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখনই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে তার কলম। দুই চোখজুড়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। প্রচলিত সংবাদভাষ্য ও সাহিত্যের ভাষার ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। দেশের সংবাদপত্রে তার কলাম সৃষ্টি করে নতুন এক ঘরানা। সাহিত্য দিয়ে যার লেখালেখি শুরু, তিনি হয়ে ওঠেন সংবাদ-সাহিত্যের বরপুত্র।

অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন সৃজনশীল আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী, সঙ্গীও। ব্রিটিশ-ভারত থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশের জন্ম। এই ইতিহাসের অনেক কিছুরই সাক্ষী তিনি। জন্মেছিলেন বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে, ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার কংগ্রেস কমিটি ও খেলাফত কমিটির বরিশাল জেলা শাখার সভাপতি প্রয়াত হাজী ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী তার বাবা, মা জোহরা খাতুন। উলানিয়া জুনিয়র মাদ্রাসা ও উলানিয়া করোনেশন হাই ইংলিশ স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। পড়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেও। ছাত্রজীবনেই লেখালেখিতে হাতেখড়ি। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত মাসিক সওগাত পত্রিকায় তার গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৪৯ সালে। ১৯৫২ সালে সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সাংবাদিকতায় হাতেখড়িও ছাত্রজীবনেই। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন যোগ দেন দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে যোগ দেন খায়রুল কবীর সম্পাদিত দৈনিক সংবাদের বার্তা বিভাগে। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন ১৯৫৬ সালে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী কলমযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মডারেটরের ভূমিকাও পালন করেছেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনপদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী।

বাংলাদেশে সেলিব্রিটি সাংবাদিকের সংখ্যা হাতেগোনা। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সেই স্বল্পসংখ্যক সাংবাদিকের একজন, যার কলামের অপেক্ষায় থাকত দেশের সিংহভাগ পাঠক। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী কলামে যে মতপ্রকাশ করতেন, তার সঙ্গে অনেক পাঠকেরই হয়ত মতের মিল হতো না। কিন্তু তিনি কী লিখছেন, কী ভাবছেন, তা জানার আগ্রহ পাঠকদের ছিল। এমনকি তার বিরুদ্ধ-রাজনৈতিক মতবাদের মানুষও আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলাম পড়তেন সমান আগ্রহে। সাংবাদিকতা জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। কলামের প্রতিটি শব্দে ছিল অসম্ভব চৌম্বক শক্তি। পাঠককে ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা এমন কজনের আছে? আইন পেশায় একটা কথা আছে, ‘ক্যারি দ্য কোর্ট’। পাঠককে টেনে রাখার অসম্ভব শক্তি ছিল তার কলমে। প্রযুক্তি এগিয়েছে; কিন্তু তিনি হাতে লিখতেন। মুক্তোর মতো স্বচ্ছ হাতের লেখা। টানা লিখে যেতেন পাতার পর পাতা। কোথাও কাটাকাটি নেই। অসামান্য দক্ষতায় নির্মেদ গদ্যে যেন সময়ের ছবি আঁকতেন সংবাদ-সাহিত্যের এক অসামান্য শিল্পী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী।

ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিনি কলেজের ছাত্রজীবন থেকে। চিনি বলতে দূর থেকে দেখেছি। সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ কিংবা সাহস হয়নি তখন। সামনাসামনি জানাশোনা আমার প্রবাস জীবনের শুরুতেই। তখন থেকেই তার সান্নিধ্য পেয়ে আসছি। তিনি লন্ডনে, আমি ভিয়েনায়। ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়া, ইউরোপের দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব যতই থাক না কেন, দিনে দিনে নৈকট্য বেড়েছে। একুশের প্রভাতফেরির গানের রচয়িতা, খ্যাতিমান সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর সঙ্গে অপরিচয়ের দূরত্ব ঘুঁচে যেতে সময় লাগেনি। একসময় যাকে খুব দূরের বলে মনে হতো, তিনি আমাকে অপত্য স্নেহে কাছে টেনে নিয়েছেন। তার স্নেহ-সাহচর্যে আমি ঋদ্ধ। আজ এত বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, আমাদের স্নেহে ভাই সহজ-সরল একজন মানুষ, যিনি সবাইকে আপন করে নেয়ার অসামান্য ক্ষমতা রাখেন। তার সঙ্গে দেশের ভালো-মন্দ, রাজনীতির বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হতো, এ আমার অনেক বড় পাওয়া।

লন্ডনে গেলে তার সঙ্গে দেখা করা ছিল আমার নিত্য রুটিন। বিদেশেও অনেক জায়গাতে গিয়েছি তার সঙ্গে। ভিয়েনাতে এসে আমার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন তিনি, এ আমার অনেক বড় পাওয়া। মনে আছে, ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডি’ নাটকের প্রদর্শনী হয়েছিল ভিয়েনায়। হল-ভর্তি দর্শক বিস্ময়-বিমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছিল নাটকটি। বোধহয় সেটাই ছিল লন্ডনের বাইরে পলাশী থেকে ধানমণ্ডি নাটকের প্রথম প্রদর্শনী।

দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে জড়িতদের কাছে অতি পরিচিত ছিলেন তিনি। প্রতিক্রিয়াশীলদেরও জানা ছিল এই মানুষটি যেকোনো মুহূর্তে গর্জে উঠতে পারেন। বাংলা সাহিত্যেও তার অবদান উপেক্ষা করার নয়।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী তার লেখায় পাঠককে দিতেন চিন্তার খোরাক। অসাম্প্রদায়িক, উদারনৈতিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে তার মতো প্রগতিশীল মানুষকে আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল। আমাদের প্রত্যাশা ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পতাকাবাহী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আরও অনেক দিন লিখবেন, সক্রিয় থাকবে তার কলম ও চিন্তার জগৎ। আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হলো না। অনন্তের পথে পাড়ি জমালেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। বিদায় নিলেন এক অসামান্য গল্প-কথক। এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। এ এক অপূরণীয় ক্ষতি।

লেখক: সভাপতি, সর্ব-ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ। অস্ট্রিয়া-প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
শুক্রবার বাসায় ফিরতে চেয়েছিলেন গাফ্ফার চৌধুরী
আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু
গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ দেশে আসছে সোমবার
দেশে আনা হচ্ছে গাফ্‌ফার চৌধুরীর মরদেহ
‘বাঙালির হৃদয়ে চির অম্লান গাফ্‌ফার চৌধুরী’

মন্তব্য

মতামত
Abdul Gaffar Chowdhury is my friend

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমার বন্ধু
আমার জীবনে আমি কম সাংবাদিক-কলাম লেখক দেখিনি, কিন্তু গাফ্‌ফার ভাইয়ের মতো এত জনপ্রিয় কলাম লেখক বোধহয় বাংলাদেশে বিরল। একজন অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে গাফ্‌ফার ভাই চিরকাল মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হবেন।

বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী অতি পরিচিত, অতি প্রিয় একটি নাম। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক অলিখিত ইতিহাস, অনেক ঐতিহাসিক গৌরবগাথা। অষ্টাশি বছরের দীর্ঘজীবনে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও ১৯৫২ সালের প্রেক্ষাপটে রচিত ‘অমর একুশে’ গানের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তার রচিত অমর সংগীত বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়। এই গানটি তাকে অমরত্ব দান করেছে। আমার সৌভাগ্য যে, এমন একজন বরেণ্য মানুষ আমার অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। তার আকস্মিক প্রয়াণে সমগ্র বাঙালির মতো আমিও অশ্রুসিক্ত, শোকে মুহ্যমান।

একটি মহানক্ষত্রের পতন হলে যেমন করে কেঁপে ওঠে আকাশের বিশাল হৃদয়, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর মতো একজন মহান মানুষের মহাপ্রয়াণেও বাংলা ও বিশ্ব-বাঙালির অন্তরজুড়ে দুলে উঠছে চাপা কান্না। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর অকালপ্রয়াণ এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যার জন্য আমরা কেউই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না।

আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন থেকেই আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে চিনি। তিনি বয়সে আমার চেয়ে দশ বছরের বড় হলেও আমাকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করতেন। আমি তাকে গাফ্‌ফার ভাই বলে ডাকতাম, তিনিও আমাকে মোনায়েম ভাই বলে সম্বোধন করতেন। বাংলাদেশের স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ছিলেন একজন অগ্রগণ্য কলমযোদ্ধা।

তার অগ্নিঝরা কলমে বাংলাদেশের ইতিহাস অবিকৃতভাবে উঠে এসেছে। যখনই তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কোনো কিছু লিখেছেন, তখনই তিনি সত্যকে অবলীলায় স্বীকার করে নিয়েছেন। মিথ্যা ভাষণ কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে কখনোই তিনি ইতিহাসকে বিকৃত করেননি। নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করেছেন গাফ্‌ফার ভাই তাদের অন্যতম।

গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা জন্মে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে নিহত হলে আমি কলকাতায় স্বেচ্ছানির্বাসনে যাই। সেখানে প্রায় চার বছর অবস্থান করি এবং দেশে-বিদেশে বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। গাফ্‌ফার ভাই তখন লন্ডনে থেকে আমাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন এবং খুনিদের বিরুদ্ধে হাতে কলম তুলে নেন। সে সময়ে বাংলার ডাক, বজ্রকণ্ঠ, সোনার বাংলা (দ্বিভাষিক), সানরাইজ প্রভৃতি পত্রিকায় গাফ্‌ফার ভাই লিখতেন এবং সেসব পত্রিকা আমার কাছে অ্যাটাচে ব্যাগে করে কলকাতায় আসত।

আমি অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে সেগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করতাম। এমনকি জেলখানায়ও আমি সেসব পত্রিকা লোক মারফত পাঠাতাম। এসব পত্রিকা পড়ে মুজিব আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের মনোবল চাঙা হতো। তারা ঘাতকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দীপ্ত প্রত্যয়ে জ্বলে উঠত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে গাফ্‌ফার ভাই যেভাবে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠেন, বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক বুদ্ধিজীবীর মধ্যেই আমি সেই বিদ্রোহীভাব প্রত্যক্ষ করেছি। গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন বটে কিন্তু তার অন্ধ-সমর্থক ছিলেন না। ‘আপদ-বিপদ-মসিবত’ বলতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের যে তিনজন বরেণ্য সাংবাদিককে বোঝাতেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সেই তিনজনের একজন ছিলেন।

কথা ছিল গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখবেন। কিন্তু জীবনী লেখার আগেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর জীবনী লিখতে না পারার বেদনা মৃত্যু পর্যন্ত গাফ্‌ফার ভাইকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের একুশ বছর পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আমি বঙ্গবন্ধুর জীবনী লেখায় হাত দেই। ১৯৯৮ সালে লন্ডনে গিয়ে গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করি এবং আমার পরিকল্পনার কথা তাকে খুলে বলি।

আমার কথা শুনে তিনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। আমি যতদিন সেবার লন্ডনে ছিলাম বেশিরভাগ সময়ই গাফ্‌ফার ভাইয়ের সান্নিধ্যে কাটাই। তৎকালীন অ্যাম্বাসেডর এ এইচ মাহমুদ আলীর বাসায় গাফ্‌ফার ভাই প্রতিদিন আসতেন এবং আমরা অনেক রাত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতাম। রাতের খাওয়া-দাওয়ার পর গাফ্‌ফার ভাইয়ের বিদায়ের সময় অ্যাম্বাসেডর মাহমুদ আলী নিজে গাড়ি চালিয়ে গাফ্‌ফার ভাইকে টিউব স্টেশনে পৌঁছে দিতেন। গাফ্‌ফার ভাই টিউব রেলে চড়ে বাসায় চলে যেতেন।

গাফ্‌ফার ভাই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এত কথা জানেন, এত ইতিহাস তার স্মৃতিতে জমে ছিল যা তার কাছে না শুনলে বোঝা যেত না। কিছু কথা থাকে সব সময় সেসব কথা লেখা যায় না, পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে হয় চুপ থাকতে হয়, নয়তো ভুলে যেতে হয়- গাফ্‌ফার ভাই এমন একজন অকুতোভয় সাহসী সাংবাদিক যিনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কখনোই কুণ্ঠিত হননি।

অত্যন্ত খোলা মনে তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন, কখনও কখনও সমালোচনাও করেছেন, বঙ্গবন্ধুর উদারতা ও আবেগী মনোভাবের জন্য। গাফ্‌ফার ভাই অনেক আশাবাদী মানুষ ছিলেন, তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে নেতিবাচক বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনগ্রন্থ লেখার সময়ই টের পেয়েছি- লেখালেখি কিংবা পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ করার সময় তিনি কতটা মনোযোগী হয়ে সব কিছু খেয়াল করতেন।

আমার সম্পাদনায় বঙ্গবন্ধুর জীবনীগ্রন্থ দুই খণ্ডে প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি (২০০৮ সালে)। বইটি দেখে গাফ্‌ফার ভাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং আমাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ দেন।

গাফ্‌ফার ভাই বাংলা ভাষার পাঠকদের জন্য প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখতেন। তার লেখার মাধ্যম বাংলা হলেও, ইংরেজিকে তিনি এড়িয়ে যাননি। ইংরেজিতেও তিনি নিয়মিত কলাম লিখতেন পত্র-পত্রিকায়। একদিন আমাদের ২৩ চামেলীবাগের বাসায় কথায় কথায় তার অকালপ্রয়াত স্ত্রীর কথা মনে করে তিনি আনমনা হয়ে যান। সে সময় আমাকে বলেন, ‘জানেন মোনায়েম ভাই, আপনার ভাবি হুইল চেয়ারে বসেই আমার জন্য লেখার কাগজ-কলম টেবিলে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখত।

একদিন সকালে আমি কী লিখব এটা ভেবে পায়চারি করছিলাম আর মাথা চুলকাচ্ছিলাম, এমন সময় আপনার ভাবি বললেন, কী ব্যাপার তুমি এমন করছ কেন? আমি বললাম, কী লিখব বিষয় খুঁজে পাচ্ছি না, তখন আপনার ভাবি বলল, ‘কেন মোনায়েম ভাইকে ফোন দাও, তাহলেই তো তুমি লেখার বিষয় পেয়ে যাবে।’ এ কথা বলছিলেন আর বার বার চোখ মুছছিলেন। প্রতিদিন ভোরেই গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হতো। ১৯ তারিখে মৃত্যুর আগেও তার সঙ্গে আমার প্রায় এক ঘণ্টা কথা হয়। সে বিষয়ে কিছু বলার আগে গাফ্‌ফার ভাইয়ের আশিতম জন্মদিন নিয়ে দুই একটি কথা লিখতে চাই।

২০১৫ সালে গাফ্‌ফার ভাই আশি বছরে পদার্পণ করেন। ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য-বিশারদ হলে তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান উদ্‌যাপিত হয়। তখন গাফ্‌ফার ভাই কিছুটা আর্থিক সমস্যায় ছিলেন। এ কথা জানতে পেরে আমি গাফ্‌ফার ভাইকে কিছুটা আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। আমার ভাবনায় ছিল- হয় ২১ লাখ, না-হয় ৫২ লাখ টাকা তাকে উপহার দেব। যে মানুষ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে কালজয়ী গান রচনা করে বাংলা ভাষা-আন্দোলনে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন তার জন্য এটুকু আমরা করতেই পারি।

সে সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত ভাই। তাকে টেলিফোন করলে তিনি আমার কথা শুনে আমাকে ধন্যবাদ দেন ও কিছুটা আশ্বস্ত করেন। পরে ব্যাংকারস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি নূরুল ফজল বুলবুলকে বিষয়টি অবগত করলে তারাও এগিয়ে আসে। নূরুল ফজল বুলবুল সেবার ২১ লাখ টাকার একটি চেক আমার হাতে দেন, আমি তা গাফ্‌ফার ভাইকে হস্তান্তর করি। যতদূর মনে পড়ে আমার টার্গেট অনুযায়ী প্রায় ৫২ লাখ টাকার মতোই সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম। এত টাকা এক সঙ্গে দেখে গাফ্‌ফার ভাই আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন। শিশু-সুলভ সরলতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘জানেন মোনায়েম ভাই, এক সাথে এত টাকা আমি কোনোদিন গুণি নাই। আপনি আমার জন্য যা করলেন তা চিরদিন মনে থাকবে।’

১৯৯৬ সালে আমাদের ২৩ চামেলীবাগের বাসায় আমি ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শামস কিবরিয়া মিলে গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ’ প্রতিষ্ঠা করি। বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন গাফ্‌ফার ভাইয়ের খুব প্রিয় জায়গা ছিল। তিনি যখনই বাংলাদেশে এসেছেন তখনই বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনে ছুটে এসেছেন। শেষের কয়েক বছর ঢাকা এলে তিনি ফাউন্ডেশনের অফিস কক্ষেই বসবাস করতেন।

ঢাকার যেকোনো পাঁচ তারকা হোটেলে থাকা তার জন্য কোনো ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তার দুই কন্যা- চিনু ও বিনু আমাদের ফাউন্ডেশন ছাড়া আর কোথাও উঠতে চাইত না। গাফ্‌ফার ভাইও আমার কাছে থেকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। ২০১৯ সালে শেষবারের মতো তিনি বাংলাদেশে ছোট মেয়ে বিনিতাকে (বিনু) নিয়ে এসেছিলেন। সে সময়ও তিনি আমাদের ফাউন্ডেশনেই ছিলেন। গাফ্‌ফার ভাই এলে বাংলাদেশের সব বরেণ্য ব্যক্তি এসে ভিড় করতেন আমাদের ২৩ চামেলীবাগে। কবি-সাহিত্যিক, নায়ক-গায়ক, নেতা-মন্ত্রী-আমলা সবাই আসতেন গাফ্‌ফার ভাইকে একনজর দেখতে। এদেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন গাফ্‌ফার ভাই।

আমার জীবনে আমি কম সাংবাদিক-কলাম লেখক দেখিনি, কিন্তু গাফ্‌ফার ভাইয়ের মতো এত জনপ্রিয় কলাম লেখক বোধহয় বাংলাদেশে বিরল। একজন অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে গাফ্‌ফার ভাই চিরকাল মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হবেন।

১৮ মে বিকাল ৪টার দিকে তার সঙ্গে আমার প্রায় এক ঘণ্টা টেলিফোনে কথা হয়। তিনিই ফোন করেছিলেন। অনেক কথার ফাঁকে তিনি বললেন, ‘বহুবার আপনি আমাকে আমার আত্মজীবনী লিখতে অনুরোধ করেছেন, এবার ভাবছি হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় গেলে আর কলাম লিখব না, আপনার কথামতো শুধু আত্মজীবনী লিখব।’ আমি তার কথায় খুশি হয়ে বললাম, ‘আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যান এই কামনাই করি। আশা করি এবার জাতি আপনার আত্মজীবনীর মধ্য দিয়ে অনেক অলিখিত ইতিহাসের হদিস খুঁজে পাবে।’ ১৯ মে দুপুর আড়াইটার দিকে খবর শুনতে পাই গাফ্‌ফার ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। তখন আমি, সৈয়দ জাহিদ হাসান (কবি ও কথাশিল্পী) ও লায়লা খানম শিল্পী একসঙ্গে খেতে বসছিলাম। খবর শুনে ভাত না খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে পড়ি।

এরপর দেশ-বিদেশ থেকে একের পর এক ফোন আসতে শুরু করে। বাংলা টিভি, এটিএন নিউজ ক্যামেরাম্যান পাঠিয়ে ইন্টারভিউ নিয়ে যায়। যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও আরও কয়েকটি কাগজ থেকে ফোন আসতে থাকে লেখার জন্য। সত্যি বলতে কি গাফ্‌ফার ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে আমি মোটেই স্বাভাবিক ছিলাম না। যার নব্বইতম জন্মদিন পালনের জন্য আমি মনে মনে কত পরিকল্পনা করে রেখেছি, হঠাৎ তার মৃত্যুসংবাদ শুনে আমি যেন হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে আমার এত এত স্মৃতি জমে আছে যে, যেসব বলতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর বরেণ্য সাংবাদিক, কলাম লেখক, কবি ও গীতিকার আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বাংলাদেশের একজন অতুলনীয় অভিভাবক ছিলেন। বাংলাদেশের যেকোনো সংকটে তিনি নির্ভীকভাবে এগিয়ে এসেছেন। তার মহাপ্রয়াণে বাংলাদেশ একজন প্রকৃত অভিভাবক হারালেন, এই ক্ষতি অপূরণীয়।

এই শোককে হৃদয়ে ধারণ করা অত্যন্ত বেদনার। পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্ম হয় অন্ধকারে আলো ছড়ানোর জন্য। গাফ্‌ফার ভাইও দুর্ভেদ্য অন্ধকারে আলো ছড়ানোর কঠিন তপস্যায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আলোর মশাল হাতে নিয়ে অন্ধকার তাড়াতে তাড়াতে দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে গেলেন মধ্যরাতের সূর্যতাপস আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। তার অনন্তযাত্রা শান্তিময় হোক।

লেখক: রাজনীতিবিদ, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক। মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ।

মন্তব্য

মতামত
The result of family system is todays Sri Lanka

পরিবারতন্ত্রের ফল আজকের শ্রীলঙ্কা

পরিবারতন্ত্রের ফল আজকের শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিণতি শুধুই কি অর্থব্যবস্থাকে সামলাতে না পারার ফল? না, এ শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়। শ্রীলঙ্কার রাজাপাক্ষে পরিবার— যে পরিবারের এক ভাই দেশের প্রেসিডেন্ট, অন্য ভাই প্রধানমন্ত্রী, আরও দু’ভাই এবং ছেলেমেয়েদের অধীনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তর, সব মিলিয়ে দেশের বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে যে পরিবারটি— যে ভঙ্গিতে দেশ চালিয়েছে, এটা তার প্রতিফলন। অন্য কারো মতের তোয়াক্কা না করে, কেবল নিজেদের স্বার্থের কথাটুকু ভেবে।

অপরিণামদর্শী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতা ও পরিবারতন্ত্রকে প্রাধান্য দেয়া, দেশের মধ্যে মৌলবাদী গোষ্ঠীকে দমন করতে না পারা, আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্যাঁচ, বৈশ্বিক মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইত্যাদি নানা কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা এখন চরম সংকটে। সেখানে এখন হিংসার আগুনে রাজনীতিবিদদের বাড়িঘর জ্বলছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে দেশশাসন করেছেন, তারা এখন বিক্ষুব্ধ জনতার হিংস্রতার শিকার হচ্ছেন। জান নিয়ে পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছেন না।

সেনাবাহিনী ও পুলিশ অলিখিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষোভের আগুন তাতে কমছে না। দেশজুড়ে বিক্ষোভ আর হাহাকার চলছে। দিনের অর্ধেক সময় লোডশেডিং, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, পেট্রল পাম্পে তেল নেই, রান্নার গ্যাস নেই। তুমুল মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক বাজারে ঋণের পরিমাণ বিপুল— তা শোধ দেয়ার সামর্থ্য নেই। দেশের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার তলানিতে ঠেকেছে।

ব্যাপক ক্ষোভের মুখে ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন মাহিন্দা রাজাপাক্ষে। এরপর মাহিন্দার সমর্থকেরা অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে পথে নামেন। শুরু হয় সংঘর্ষ। মানুষ গর্জে ওঠে। ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে মাহিন্দা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।

বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন লাগিয়ে দেয় রাজাপাক্ষের পূর্বপুরুষের বাড়ি এবং দেশের আরও বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদের বাড়িতে। দেশজুড়ে কারফিউ জারি করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহে। যদিও প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা এখনও অনড়।

কয়েক বছর আগেও যে দেশের মনব-উন্নয়ন সূচকের উদাহরণ দেওয়া হতো, তার এমন অবস্থা কী করে হলো? খানিকটা ভাগ্যের মার, অস্বীকার করার উপায় নেই। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির একটা বড় দিক হলো পর্যটন শিল্প। কোভিডের ধাক্কায় তার অবস্থা ভয়াবহ।

অপরদিকে রয়েছে নীতিনির্ধারকদের অপরিণামদর্শিতা। ঋণ করে দেশ চালানোর অভ্যাস করে ফেলেছিলেন সে দেশের শাসকরা। তা-ও চড়া সুদে স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণ। এদিকে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধিতে মন দেয়নি সরকার, অর্থব্যবস্থার রাশ ছেড়ে রেখেছিল শাসকদের ঘনিষ্ঠ কিছু সাঙ্গাতের হাতে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিপুল ধার, তার উপর নিরাপত্তার অভাব— সব মিলিয়ে দেশের ক্রেডিট রেটিং কমেছে। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাণিজ্যিক ধার পাওয়ার পথও বন্ধ হয়েছে ক্রমে। এদিকে, নতুন নোট ছাপিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টায় আরও দ্রুত গতিতে বেড়েছে মূল্যস্ফীতি।

২০১৯-এর শেষপর্বে শ্রীলঙ্কার বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯৪ শতাংশ। ২০২১-এর শেষপর্বে তা ১১৯ শতাংশে পৌঁছায়। ফলে বিদেশি ঋণ পাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। জানুয়ারির গোড়াতেই সে দেশে মূল্যবৃদ্ধি ২৫ শতাংশ ছুঁয়ে রেকর্ড গড়ে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষপর্বে তলানিতে ঠেকেছিল বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার। প্রাক অতিমারি পরিস্থিতির তুলনায় বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় কমে যায় প্রায় ৭৫ শতাংশ।

চলতি বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক ঋণ এবং সুদ মেটাতে অন্তত ৬৯০ কোটি ডলার (প্রায় ৫২,৪০০ কোটি টাকা) ব্যয় করতে হবে শ্রীলঙ্কাকে। অথচ সরকারি তথ্য বলছে, বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় মাত্র ২৩১ কোটি ডলারে (প্রায় ১৭,৫৪০ কোটি টাকা) এসে ঠেকেছে। বিদেশি মুদ্রার ভাঁড়ারে টান পড়ার প্রভাব পড়ে আমদানিতে। বিশেষত, জ্বালানি তেল কেনা কমে যায় অনেকটাই।

আর তার পরিণতিতে আকাশ ছোঁয় মূল্যবৃদ্ধি। শ্রীলঙ্কায় এখন এক কাপ চায়ের দাম ১০০ টাকা! এক কিলোগ্রাম চাল ৫০০ টাকা। চিনির কিলোগ্রাম ৪০০ ছুঁতে চলেছে। এমনকি, শিশুখাদ্যের দামও সাধারণের নাগালের বাইরে। অপ্রতুল জীবনদায়ী ওষুধ। কাগজের অভাবে বন্ধ স্কুল-কলেজের পরীক্ষা।

গত কয়েক বছরে টাকার অভাব সামাল দিতে বিপজ্জনক সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশের সরকার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিদেশি মুদ্রায় রাসায়নিক সার কিনতে হয় এবং তার উপর ক্রেতাদের ভর্তুকিও দিতে হয়, তাই সে খরচ বাঁচাতে রাতারাতি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল রাসায়নিক সার— গোটা দেশে অর্গানিক চাষ চালু করা হয়।

প্রেসিডেন্ট রাজাপাক্ষে বলেছিলেন— অচ্ছে দিন, থুড়ি, কৃষিতে উচ্চ উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের সমৃদ্ধি এল বলে। আসেনি। ধান উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে ২০ শতাংশ, এখন বাংলাদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হচ্ছে। অর্থনীতির উন্নতি হবে বলে রাতারাতি করের হার কমিয়ে দিয়েছিল সরকার। শিল্প উৎপাদন বাড়েনি, কিন্তু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে বিপুল পরিমাণে। ফলে, রাজকোষ ঘাটতির হার জিডিপি-র প্রায় ১৫ শতাংশ।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিণতি শুধুই কি অর্থব্যবস্থাকে সামলাতে না পারার ফল? না, এ শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়। শ্রীলঙ্কার রাজাপাক্ষে পরিবার— যে পরিবারের এক ভাই দেশের প্রেসিডেন্ট, অন্য ভাই প্রধানমন্ত্রী, আরও দু’ভাই এবং ছেলেমেয়েদের অধীনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব দপ্তর, সব মিলিয়ে দেশের বাজেটের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে যে পরিবারটি— যে ভঙ্গিতে দেশ চালিয়েছে, এটা তার প্রতিফলন। অন্য কারো মতের তোয়াক্কা না করে, কেবল নিজেদের স্বার্থের কথাটুকু ভেবে।

রাজাপাক্ষে পরিবারের দুর্নীতি, দেশের সব ক্ষমতা দখলের চেষ্টা— সব কিছু নিতান্ত প্রকাশ্যে থাকার পরও পরিবার চার বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পরে ২০১৯ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়েই প্রেসিডেন্ট হন গোতাবায়া রাজাপাক্ষে; দুদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহেকে ছেঁটে সেই পদে বসেন মহিন্দ রাজাপাক্ষে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর নিঃশর্ত সমর্থন ছিল তাদের দিকে— কারণ, মহিন্দ রাজাপাক্ষে দ্ব্যর্থহীনভাবে এই সিংহলি সংখ্যাগরিষ্ঠতানির্ভর উগ্র জাতীয়তাবাদের পক্ষে।

প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট থাকার সময় এলটিটিই-র কোমর ভেঙেছিলেন মহিন্দ, সঙ্গে মারা পড়েছিলেন অন্তত পঁচাত্তর হাজার তামিল। তিনি জানেন, সিংহলি জাতীয়তাবাদের পালের হাওয়াই তাকে টেনে নিয়ে যাবে। উগ্র জাতীয়তাবাদের সব সময়েই কোনো না কোনো শত্রুপক্ষের প্রয়োজন হয়। দুর্বল হয়ে যাওয়া তামিল জনগোষ্ঠীকে দিয়ে সেই কাজ আর চলছে না বলে রাজাপাক্ষেরা নতুন শত্রু হিসেবে বেছে নিয়েছেন মুসলমানদের। বড় মাপের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি ঠিকই, কিন্তু দ্বীপরাষ্ট্রের মুসলমানরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়েছেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যবাদ দিয়ে অর্থব্যবস্থার স্বাস্থ্যের উন্নতি করা কঠিন। দীর্ঘ সিংহলি-তামিল গৃহযুদ্ধে শ্রীলঙ্কায় ঋণের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছিল। সেই গৃহযুদ্ধ মিটেছে, কিন্তু জাতিগত অবিশ্বাসের আবহে অর্থব্যবস্থা গুটিয়েই থেকেছে— শ্রীলঙ্কায় লগ্নি করতে ভয় পেয়েছেন অনেকেই।

পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গেও ক্রমশ সম্পর্ক ছিন্ন করেছে শ্রীলঙ্কা— দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর জন্য আন্তর্জাতিক চাপকে রাজাপাক্ষেরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি শক্তির অন্যায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা বলে দেখিয়েছেন। ফলে, লাভজনক শর্তে বিদেশি বিনিয়োগ বা সহজতর শর্তে ঋণ, কোনোটাই পায়নি শ্রীলঙ্কা। এই ফাঁক পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে চীন। শ্রীলঙ্কাজুড়ে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে লগ্নি করেছে চীন— সে লগ্নি আসলে চড়া সুদে ঋণ।

যে দেশ অন্য কোথাও থেকে ঋণ পায় না, তাকে চড়া হারে ঋণ দেয়া চীনের ইদানীংকার নীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর নাম দিয়েছে ডেট ট্র্যাপ ডিপ্লোম্যাসি— ঋণের দায়ে জড়িয়ে ফেলার কূটনীতি। শ্রীলঙ্কায় চীনের লগ্নি প্রচুর, রাজাপাক্ষে পরিবার ও সাঙ্গাতদের তাতে লাভ প্রচুরতর, কিন্তু দেশের কতখানি উপকার হয়েছে, সে হিসাব নেই।

সিংহলি-বৌদ্ধ আধিপত্য বজায় থাকায় শ্রীলঙ্কায় রাজাপাক্ষে পরিবারের ওপর দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ খুশিই ছিল। ‘আন্তর্জাতিক চাপ’-এর কাছে দেশের প্রেসিডেন্টের মাথা না নোয়ানোর সাহসেও অনেকেই গর্বিত ছিলেন। এপ্রিলের গোড়ায় যে মন্ত্রীরা দল বেঁধে পদত্যাগ করেছেন অপশাসনের অভিযোগ তুলে, তারাও দীর্ঘদিন ধরে বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়েছেন সব কিছুই। অর্থব্যবস্থার যখন ক্রমেই ভরাডুবি হচ্ছে, আইএমএফ তখন বারে বারে সাহায্য করতে চেয়েছিল— গোতাবায়া রাজি হননি।

তার বিশ্বাস ছিল, ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার ‘স্ট্র্যাটেজিক’ অবস্থানের কারণেই গোটা দুনিয়া বিনাশর্তে আর্থিক সাহায্যের ঝুলি নিয়ে ছুটে আসবে, চীনের আরও প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে। সেই বিশ্বাস ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে— এমনকি চীনও খুব আগ্রহ দেখায়নি শ্রীলঙ্কার মাথায় ভেঙে পড়া আন্তর্জাতিক ঋণের বোঝা লাঘব করার জন্য। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, গোতাবায়া যখন এমন বিপজ্জনক পথে হাঁটছিলেন, চার পাশের কেউ বাধাও দেননি তাকে।

শ্রীলঙ্কার উদাহরণ থেকে বাংলাদেশ বা এদেশের হর্তাকর্তা-বিধাতারা কিছু শিখবে, সেই আশা ক্ষীণ। তবে, একটা মস্ত বার্তা দিয়ে গেল শ্রীলঙ্কা— সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যের পথে হাঁটতে গিয়ে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করলে, ‘মাফিয়াতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করলে, চারপাশে শুধু ‘জি হুজুর’-দের জায়গা দিলে শেষপর্যন্ত তার ফল হয় মারাত্মক।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ
ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম টেস্ট
ঢাকা টেস্টের দলে নেই শরীফুল
তাইজুলের ঘূর্ণিতে চাপে লঙ্কানরা
লঙ্কান শিবিরে তাইজুলের জোড়া আঘাত

মন্তব্য

মতামত
Raktveja May 19 Self sacrifice for the Bengali language

রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান

রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজপথজুড়ে নারী-পুরুষ; শিশুর পদভার বেড়ে ওঠে। বিপন্ন বাংলা ভাষা, বিপন্ন মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ সবার হৃদয়ে। উত্তাল জনসমুদ্র। বাঁধভাঙা মানুষ। সবার কণ্ঠে স্লোগান, ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা’। গ্রেপ্তার হয় অনেকে। রেললাইনজুড়ে মানুষের ঢল। প্রতিরোধে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং বেপরোয়া লঠিচার্জ করে। কিন্তু আহতরা তবু স্থান ত্যাগ করেনি। শহরজুড়ে শুধু স্লোগান। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে নিরস্ত্র বঙ্গভাষীদের ওপর চালানো হলো গুলি। রেলওয়ে চত্বরে লুটিয়ে পড়ে ১১টি তাজা প্রাণ, যাদের জন্ম একদার সিলেটে।

১৯৬১ সালের ১৯ মে রক্তভেজা একটি দিন বাংলা ভাষাভাষীর জন্য। এর ৯ বছর আগে এই বাংলা ভাষার জন্য রক্ত ঢেলে দিয়েছিল ঢাকার রাজপথে বাংলার কিছু দামাল ছেলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিল ছাত্র-যুবারা। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, বাংলাকে শুধু রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিতই করেনি, বাঙালির স্বাধীন সার্বভৌম দেশও অর্জন করেছে। ২০০০ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বিশ্বদরবারে বাংলাভাষার মর্যাদাকে উচ্চাসন দিয়েছেন। জাতিসংঘে পিতার মতো তিনিও বাংলায় ভাষণ দিচ্ছেন। বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম স্থানে অবস্থিত বাংলা ভাষা। এই ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে।

পূর্ব বাংলার মানুষকে অবদমিত করার জন্য পাকিস্তানি শাসকরা উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাঙালি তা মানেনি। মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বিশ শতকে বাঙালি অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। আর একষট্টি বছর আগে আসামের বরাক নদীতীরে বরাক উপত্যকায় বাংলাভাষী মানুষের রক্ত ঝরেছিল মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের দাবিতে। যদিও আসাম রাজ্যে শুধু বাংলাভাষী নয়, অন্যান্য জনগোষ্ঠীও রয়েছে। খাসিয়া, বড়ো, গারো, মিছিং, মণিপুরী, আও, মিজো, কার্বি, রাভা, ককবরক, চাকমা, মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া, আদি (অরুণাচল), ডিমাসা- এসব ভাষাভাষী মানুষও রয়েছে। এরা সবাই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। মূলত বাংলাভাষী সংখ্যাগুরু হলেও, অসমীয়া ভাষাভাষীরা তাদের উপরে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, এখনও সে প্রচেষ্টা অব্যাহত।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের আসাম বা আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের আরেক রক্তাক্ত নজির। অবশ্য বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে এই আন্দোলনে পার্থক্য রয়েছে। আসাম রাজ্যে অসমীয়ারা একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার একপর্যায়ে পুরো রাজ্যে অসমীয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী গড়ে তোলে প্রবল আন্দোলন।

বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মবলিদানের দ্বিতীয় এ নজির স্থাপিত হয়েছিল ৬১ বছর আগে। বরাক উপত্যকার মানুষজন মূলত বাংলাভাষী। এক সময় এ এলাকা ছিল সিলেটের অংশ। দেশভাগ তাদের ভাগ্যবিপর্যয় ঘটায়। মুসলিম সংখ্যাধিক্য এবং বাংলাভাষী অঞ্চল হলেও ব্রিটিশের কলমের খোঁচায় সিলেটের ৪টি থানা আসাম তথা ভারতভুক্ত হয়। আর এ অঞ্চলের মানুষকে তাদের মাতৃভাষায় কথা বলা শুধু নয়, শিক্ষা-দীক্ষার সুযোগ বঞ্চিত করে। বরাক অঞ্চলে ভাষার জন্য আন্দোলনের বীজ আসাম রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেই নিহিত ছিল। এখনও তা লুপ্ত হয়নি।

শ্রীহট্ট তথা সিলেট ছিল অবিভক্ত বাংলার অন্তর্ভুক্ত আয়তনে বড় জেলা। ১৮৪৭ সালে আসাম প্রদেশ গঠন করে ব্রিটিশ শাসকরা। সিলেট তখন বঙ্গের সঙ্গে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে সিলেট পূর্ববঙ্গ-আসাম প্রদেশের মধ্যে পড়ে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সিলেট পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। শুধু একটি অংশ আসামের সঙ্গে জুড়ে দেয় ব্রিটিশ। যদিও ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে ওই অংশের বাসিন্দারা পূর্ববঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হবার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। করিমগঞ্জ ‘হাইলাকান্দি, শিলচর’ কাছাড়-বাংলাভাষী ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো সিলেটের অংশ হলেও তা হয়ে যায় আসামের অংশ। এমনকি আরও কিছু বাংলাভাষী অঞ্চল। তদুপরি এসব অঞ্চল আসামভুক্ত করা হয়। দেশভাগের মর্মযাতনা তাদের এখনও উপলব্ধি করতে হয় যখন ‘বঙ্গাল খেদাও’ অভিযানে নামে অসমীয়ারা।

রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গকালে সিলেটকে বঙ্গদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার বেদনা প্রকাশ করেছিলেন এভাবে- “মমতাবিহীন কালস্রোতে/বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে/ নির্বাসিতা তুমি/সুন্দরী শ্রীভূমি।” দেশভাগের শিকার হয়ে শ্রীহট্টের যে বাঙালিরা অসামে যান, ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের আগে, অবিভক্ত ভারতবর্ষে, তাদেরও জন্মভূমি ছিল অসাম। কারণ তা তখন অসাম প্রদেশভুক্ত অঞ্চল। কিন্তু তাদেরকে পূর্ববঙ্গীয় বলে ঘোষণা দিয়ে অসমীয়রা হত্যা, নির্যাতন, লুণ্ঠনসহ ভাষার অধিকারও কেড়ে নিয়েছিল। ক্ষমতাসীন অসাম রাজ্য সরকার ঘোষণাই দিয়েছিল, আসাম হবে কেবল অসমীয়াদের জন্যই। তখন থেকেই অসমীয়া ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া হলো বাংলাভাষীদের উপর। দেশভাগ সিলেট ও অসমের মানচিত্রকে পাল্টে দিয়েছিল। বাঙালি হিন্দুরা দেশত্যাগ করে আসামের বিভিন্ন জেলায় বসবাস শুরু করে। অনুরূপ অসাম থেকেও প্রচুর মুসলমান সিলেটে অভিবাসী হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের ৫ নভেম্বর আসামের বিধানসভার অধিবেশনে রাজ্যপাল ঘোষণা করেন যে, আসাম এখন থেকে অসমীয়রাই শাসন করবে। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিলীন হতে হবে। সরকার রাজ্যে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহারে প্রশ্রয় দেবে না। সরকারি এই ঘোষণায় বাংলাভাষীসহ অন্যান্য ভাষাভাষীরাও ফুঁসে ওঠে। স্থায়ী ও অভিবাসী বাংলাভাষীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ঘৃণা ও উপেক্ষার শিকার হতে থাকে বাংলাভাষীরা। তাদেরকে চিহ্নিত করা হয় ‘অনুপ্রবেশকারী বিদেশী’, ‘বহিরাগত’, ‘সন্দেহভাজন শরণার্থী ’ হিসেবে। অসমে বাংলা ভাষাভাষী ৪৩ লাখ মানুষ ছিল যেখানে, সেখানে ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে দেখানো হয় ১৭ লাখ। বিপরীতে ২০ লাখ অসমিয়াভাষী বাড়িয়ে করা হয় ৪৯ লাখ। এই অবিশ্বাস্য সংখ্যাবৃদ্ধিকে সে সময়ে অভিহিত করা হয়েছিল ‘জীবতাত্ত্বিক বিস্ময়’ (বায়োলজিক্যাল মিরাকল) হিসেবে। ষড়যন্ত্রের শিকার হলো বাংলাভাষীরা। সংখ্যাগুরু থেকে পরিণত হলো সংখ্যালঘুতে। এই বিভেদ জাতিগত দাঙ্গায় রূপ নেয়। ইতিহাসের পাতায় তাই দেখা যায়, ১৯৪৮ সালের মে মাসে গুয়াহাটিতে বাঙালি-অসমীয়া দাঙ্গা, ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুট ও অগ্নিসংযোগ এবং হতাহত অর্ধশত। এই দাঙ্গার প্রসারে আসামজুড়ে ‘বঙ্গাল খেদাও’ অভিযান শুরু হয়। ১৯৫০ সালে এই অভিযান গণহত্যায় পরিণত হয়।

বাংলাভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলে নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চলে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোয়ালপাড়া জেলার বাংলাভাষীরা। আতঙ্কিত বাংলাভাষীরা আত্মরক্ষার্থে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় পালিয়ে যায়। পরবর্তীকালে এদের শর্তসাপেক্ষে আসামে পুনর্বাসন করা হয় যে, তাদের মাতৃভাষা হবে অসমীয়া। বাংলা উচ্চারণ করা যাবে না। তারপরও বাংলাভাষীরা থেমে থাকেনি। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দাবি জানায় মাতৃভাষার অধিকারের জন্য। এতে ক্ষুব্ধ অসীময়ারা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের সরকারি ভাষা করার জন্য সরকারি মদদে নারকীয় কাণ্ড ঘটাতে থাকে। শুরু হয় বাংলাভাষী নিধন।

১৯৬০ সালের ২১ ও ২২ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি একতরফাভাবে প্রস্তাব নেয় যে, অসমীয়া ভাষাই হবে আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা। বাংলাভাষী অঞ্চল কাছাড় জেলার নির্বাচিত দশ সদস্য এর বিরোধিতা করে। প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ২ ও ৩ জুলাই কাছাড় জেলার শিলচর গান্ধীবাগে ‘নিখিল আসাম বাংলা ভাষা সম্মেলন’ করা হয়। প্রায় ২৫ হাজার বঙ্গভাষীর সমাবেশে বাংলা ভাষাকে আসামের অন্যতম রাজ্যভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার দাবি তোলা হয়। এই দাবির জবাব দেয়া হয় তিন জুলাই।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ দাঙ্গা । এতে বহু বঙ্গভাষী নিহত হয়। দশ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়। বাস্তুচ্যুত হয় পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ। বঙ্গভাষীর আহবানে হরতাল পালনও হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর শান্তি প্রক্রিয়াও ব্যর্থ হয়। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারের ওপর বলিষ্ঠ চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি। কারণ রাজ্য সরকার তো কংগ্রেসেরই। বাংলাভাষীদের ওপর এই নারকীয় হামলায় তাদের রক্ষায় তেমন কেউ এগিয়ে আসেননি। সব সচেতন ও কল্যাণকামী এবং মানবাধিকার সংগঠনের আহবান কোনো কাজে দেয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ১৯৬০ সালের ২৪ অক্টোবর রাত দশটায় আসাম বিধানসভায় অহমিয়া ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে অনুমোদন করা হয়। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বঙ্গভাষীরা। বাংলাভাষী জেলা কাছাড়ে মানুষ প্রতিবাদে রাজপথে নামে। করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, শিলচরে গণজাগরণ তৈরি হয়। আসামের সংখ্যালঘু অন্য ভাষাভাষীরাও এই আন্দোলনে শরিক হয়।

১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। এসময় সিলেটের অঙ্গ করিমগঞ্জে বৃহৎ জনসম্মেলনে গণসংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। অজস্র কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল সেদিন, ‘মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ।’ ১৪ এপ্রিল তথা পয়লা বৈশাখ সত্যাগ্রহী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘সংকল্প দিবস’ পালন করা হয়। অযুতকণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জান দেব তবু জবান দেব না, আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা।’ আন্দোলনে আতঙ্কিত আসাম সরকার। ১৯৬১ সালের ১৯ মে সারা আসামে ‘বন্ধ’ ও সত্যাগ্রহের কর্মসূচি দেয় আন্দোলনকারীরা। শিলচরসহ অন্যত্র সেনা টহল চালু ও ১৪৪ ধারা জারি হয়। কিন্তু এসব উপেক্ষা করে বঙ্গভাষীসহ অন্য ভাষাভাষীরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা এবং বরাক উপত্যকায় ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে তখন।

১৯৬১ সালের ১৯ মে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে খুব ভোরে সত্যাগ্রহী, স্বেচ্ছাসেবীরা শিলচর রেলওয়ে স্টেশন, বাস স্টেশন, অফিস-আদালতের সামনে সমবেত হতে থাকে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজপথজুড়ে নারী-পুরুষ; শিশুর পদভার বেড়ে ওঠে। বিপন্ন বাংলা ভাষা, বিপন্ন মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ সবার হৃদয়ে।

উত্তাল জনসমুদ্র। বাঁধভাঙা মানুষ। সবার কণ্ঠে স্লোগান, ‘আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা’। গ্রেপ্তার হয় অনেকে। রেললাইনজুড়ে মানুষের ঢল। প্রতিরোধে পুলিশ ও সেনাবাহিনী কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং বেপরোয়া লঠিচার্জ করে। কিন্তু আহতরা তবু স্থান ত্যাগ করেনি। শহরজুড়ে শুধু স্লোগান। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে নিরস্ত্র বঙ্গভাষীদের ওপর চালানো হলো গুলি। রেলওয়ে চত্বরে লুটিয়ে পড়ে ১১টি তাজা প্রাণ, যাদের জন্ম একদার সিলেটে। একাদশ শহীদের বুকের তাজা রক্তে শিলচর রেল স্টেশন রঞ্জিত হয়ে ওঠে।

বরাক উপত্যকার মাটি বঙ্গভাষীর রক্তের দাগে ফুটিয়েছে কৃষ্ণচূড়া। শহীদ কমলা ভট্টাচার্য, বয়স তার ষোলো, মিছিলের মুখ ছিল, তাকেও হতে হলো ভাষার বলি। আত্মদান করেছিল সেদিন হীতেশ বিশ্বাস, শচীন্দ্র পাল, সুকোমল পুরকায়স্থ, কুমুদ দেব, সত্যেন্দ্র দেব, কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডিচরণ সূত্রধর, ধীরেন্দ্র সূত্রধর, তরণী দেবনাথ ও সুনীল সরকার। এই আত্মদানেরও পাঁচ বছর পর ১৯৬৬ সালের ২২ মার্চ বরাক অঞ্চলে বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

‘বরাক উপত্যকার ভাষা সংগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থের ভূমিকায় আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যপক সুবীর কর উল্লেখ করেছেন-

“আমরা সবাই মিলেছিলাম মায়ের ডাকে। সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছে বাহান্নের ঢাকার ভাষা সংগ্রাম। রফিক, সালাম, বরকতেরা ছিলেন আদর্শ। পদ্মা মেঘনা যমুনার মধ্যে কুশিয়ারা, ধলেশ্বরী, সুরমা খুঁজে নিয়েছিল তার ঠিকানা। বুড়িগঙ্গা আর বরাক হয়ে উঠেছিল চেতনার সংগ্রাম”।

বরাক ভাষা আন্দোলনের উপর শিলচর থেকে ইমাদউদ্দিন বুলবুল রচিত ‘দেশী ভাষা বিদ্যা যার’ ও ‘ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার’ নামে দুটি গ্রন্থ রয়েছে যাতে পটভূমি বিধৃত রয়েছে। বাংলা ভাষা তথা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য আত্মবলিদানের দ্বিতীয় উদাহরণ শিলচর তথা বরাক উপত্যকা। যেখানে ভাষা সংগ্রাম জাতিসত্তার স্বতন্ত্র মর্যাদাকে সংরক্ষিত করেছে।

ভারতের আসাম রাজ্যে বঙ্গভাষীদের হাল এখনও করুণ। প্রায়শই বঙ্গভাষীদের ওপর নিপীড়ন নামে। কিন্তু অসমীয়দের এই আচরণ অবশ্য সাম্প্রতিক নয়। আরও প্রাচীন। ১৯৩৬ সালে শনিবারের চিঠি সম্পাদক সজনীকান্ত দাশ লিখেছিলেন-

“যে কারণেই হউক আসামের ভাষা ও কালচারকে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেবার জন্য যে সরকারি চেষ্টা আজকাল চলিতেছে, সংবাদপত্র পাঠক মাত্রেই তাহা অবগত রহিয়াছেন। কিন্তু এই চেষ্টা বহুদিন পূর্বে শুরু হইয়াছে।”

১৮৭০ সালে মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত জন মারডক রচিত ‘ক্যাটালগ অব দি ক্রিশ্চিয়ান ভার্ণাকুলার লিটারেচার অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে অহমীয়া ভাষা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-“বাঙ্গলার সঙ্গে অসমীয়া ভাষার সাদৃশ্য এত বেশী যে, স্বতন্ত্র ভাষা হিসাব অসমীয়াদের দাবি অনেকে স্বীকার করেন না। যদিও অনেক সরকারি কর্মচারী অসমীয়া ভাষার স্থলে বাঙ্গলার প্রবর্তনে প্রয়াসী। কিন্তু সরকার স্থানীয় ভাষায় শিক্ষার প্রশ্রয় দিচ্ছেন”। গৌহাটি প্রবাসী বাঙ্গালী ছাত্র সম্মিলন এর ১৯৩৬ সালের ১৪ অক্টোবর গৌহাটিতে আয়োজিত অষ্টম অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণে সজনীকান্ত দাশ বলেছিলেন- ‘‘কামরূপ-গৌহাটিতে বসে আপনারা আপনাদের সম্মিলনীর নাম ‘প্রবাসী বাঙ্গালী ছাত্র সম্মিলনী’ দিয়েছেন। মনে হইতেছে আপনারা পরাজিত এবং অভিমান ক্ষুব্ধ। অসমে বাঙ্গালীকে প্রবাসী করিবার জন্য রাজনৈতিক প্রচেষ্টা সম্প্রতি শুরু হইয়াছে। কিন্তু ইতিপূর্বে বাঙ্গালীরা প্রবাসী ছিল না। সংখ্যায়, শিক্ষায় জীবনের প্রায় সকল বিভাগেই বাঙ্গালীর প্রাধান্য ছিল এবং সর্বত্র বাঙ্গালীর স্বার্থ অসমের মাটি ও প্রকৃতির সহিত জড়িত ছিল। অসমের শিক্ষাকেন্দ্র ছিল কলিকাতা। চা বাগানগুলি বাদ দিলে আসাম বলিতে কামরূপ, শ্রীহট্ট, শিলচর, শিলংয়ের মত কয়েকটি শহর বুঝাইত এবং সকল স্থলেই ছিল বাঙ্গালীর কর্তৃত্ব্। প্রাগ ঐতিহাসিক যুগ হইতেই কামরূপ বাঙ্গলাদেশের অঙ্গ ছিল।” মহাভারতে যে এ অঞ্চলের বর্ণনা রয়েছে, তা পরবর্তীকালেও গবেষকরা উল্লেখ করেছেন। সজনীকান্ত দাশ বলেছেন,“ভাষার দিক দিয়া আসামী ভাষা বাঙ্গলার একটি উপভাষা বা ‘প্রভিন্সিয়াল ডায়ালেক্ট’ মাত্র। উপভাষাতে কোনো সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। এই কারণেই অহমীয়া ভাষার উল্লেখযোগ্য কোন সাহিত্য নাই। বাঙ্গলা সাহিত্যের উপরই আসামবাসীকে নির্ভর করিতে হইয়াছে। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অসমের সুবিখ্যাত হলিরাম ঠেকিয়াল ফুকন ও যজ্ঞরাম ফুকন বাঙ্গলা ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করিতেন। হলিরামের ‘আসাম বুরঞ্জী’ নামক অসমের প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ বাঙ্গলা ভাষাতেই রচিত হয়ে ১৮২৯-৩০ সালে কলকাতার সমাচার চন্দ্রিকা যন্ত্রালয়ে মুদ্রিত হয়।” আসাম বর্ণমালা মূলত বাংলা বর্ণমালা। দু’একটি অক্ষর ব্যতিক্রম রয়েছে।

সুরমা উপত্যকা তথা সিলেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাংলাভাষী অঞ্চলের মানুষ তাদের মাতৃভাষায় কথা বলবে সেটাই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথ সিলেট, আসাম সফর করেছেন। বাংলাভাষী মানুষজন তাদের আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের গানই গেয়েছিলেন। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে সেদিন বাংলাভাষার অধিকার রক্ষার দাবিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল যারা, প্রতিবেশী দেশের প্রতিবেশী রাজ্যে, তাদের আত্মদান বৃথা যায়নি। অন্য ভাষাভাষী যেমন বোড়ো, ককবরক ভাষীরাও তাদের মাতৃভাষার অধিকার পেয়েছে। ওরা ১১ জনও গেয়েছিল ‘আ-মরি বাংলাভাষা।’ আমরাও তা গাই।

লেখক: কবি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক। মহাপরিচালক প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

আরও পড়ুন:
স্ত্রী হত্যায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেপ্তার
বিজিবির কাছ থেকে ইয়াবাসহ মাদককারবারি ছিনতাই
এসআই-কনস্টেবলকে পিটিয়ে আটককে ছিনতাই
আদালতের হাজতখানা থেকে আসামি চম্পট
হ্যান্ডকাফসহ আসামি ছিনতাই

মন্তব্য

p
উপরে