নৌপথ কেন অরক্ষিত

player
নৌপথ কেন অরক্ষিত

অনিবন্ধিত বালুবাহী (বাল্কহেড) জাহাজ, ট্রলার ও স্পিডবোট মিলিয়ে অন্তত ২০ হাজার নৌযান চলাচল করে থাকে। আইনগতভাবে নিবন্ধনহীন ১৬ হর্স শক্তির বেশি ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ দাবড়ে বেড়ানো এসব নৌযানকে কোনোভাবেই আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।

ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চটি ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পৌঁছানোর পর চলন্ত অবস্থায় আগুন লাগে গত ২৩ ডিসেম্বর রাতে। এ ঘটনায় অন্তত ৪২ জনের প্রাণ গেছে। আহতের সংখ্যা কমপক্ষে দেড় শতাধিক। এখনও কয়েকজন নিখোঁজ থাকার দাবি স্বজনদের। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নারায়ণগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীতে আরেকটি নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। ডুবে যাওয়া ট্রলারটির ১০ যাত্রী আট ডিসেম্বর সকাল পর্যন্ত নিখোঁজ ছিল।

এসব ঘটনা কি প্রমাণ করে না দেশের নৌ-নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ? তা না হলে সবচেয়ে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা নৌপথে কেন বার বার দুর্ঘটনা ঘটবে? এর দায় সংশ্লিষ্টদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক সড়ক পথের স্বার্থকে বড় করে দেখার জন্যই কি নৌপথকে নিরাপদ করা হচ্ছে না? এ পথে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারলেই যাত্রী কমবে, সড়কপথে পকেট ভরবে পরিবহন মাফিয়াদের!

দেশে এ পর্যন্ত নৌদুর্ঘটনা কতটি হয়েছে? এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও নৌযানে আগুন লেগে এত হতাহতের ঘটনা এবারেই প্রথম। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তদন্ত দলও বলেছে, লঞ্চটির ইঞ্জিন থেকেই আগুনের সূত্রপাত। অর্থাৎ নৌযানটির ইঞ্জিনে ত্রুটি ছিল। ইতোমধ্যে নৌ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টও জমা হয়েছে। যদিও রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। অতীতে বেশিরভাগ তদন্ত প্রতিবেদনে নানা মহলকে ছাড় দেয়া বা স্পষ্ট না হওয়ায় এটির ক্ষেত্রেও ধূম্রজাল সৃষ্টি হতে পারে- এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

পর পর দুটি বড় নৌ দুর্ঘটনার পর দেশে নৌযানের প্রকৃত সংখ্যা কত, নৌযানের ফিটনেস আছে কি না ও নৌদুর্ঘটনার পর বিচার হওয়া না হওয়ার প্রশ্নটি আবারও সামনে এল। তেমনি নৌ-সেক্টরে প্রয়োজনীয় তদারকি হচ্ছে কি না এ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সর্বোপরি নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে আরও বেশি ভাবনার সময় এসেছে।

মোটা দাগে বললে, সারা দেশে কত নৌযান চলাচল করছে এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই। তেমনি ফিটনেসবিহীন নৌযানের সংখ্যা কত এ তথ্যও জানে না নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। এসব বিষয় যখন মুখ্য আলোচনায় তখন নৌযানের ফিটনেস, দুর্ঘটনার পর বিচারের প্রত্যাশায় বালি পড়তে পারে।

দেশে কত নৌযান চলাচল করবে, সরকারি দপ্তরে এর কোনো হিসাব থাকবে না, তা কাম্য নয়। এমন বাস্তবতা নৌ পরিবহন সেক্টরে প্রয়োজনীয় তদারকির যথেষ্ট অভাবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নৌপথ হলো যোগাযোগে সবচেয়ে নিরাপদ মাধ্যম। নদীমাতৃক বাংলাদেশে তিনভাগ জল। অথচ বিশাল জলপথকে পুরোপুরি সদব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো বিলীন হয়ে গেছে অন্তত ২০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ!

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদাহরণ আছে, সেখানে কৃত্রিমভাবে নৌপথ সৃষ্টি করা হয়। অথচ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া সম্পদ চোখের সামনে নষ্ট হচ্ছে। দখল-দূষণ, ভূমিদস্যুদের থাবাসহ ড্রেজিংয়ের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে নৌ-রুটগুলো। তিল তিল করে হত্যা করা হচ্ছে নদ-নদীগুলোকে। রাজনৈতিক প্রভাবে নদীর জমি ভূমিদস্যুদের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনা যাচ্ছে না। ফলে সামনের দিনগুলোতে বর্তমানে পাঁচ হাজার কিলোমিটারের কিছু বেশি নৌপথ হয়ত আরও সংকুচিত হয়ে যেতে পারে- এমন ধারণা অমূলক নয়।

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে যাত্রী ও পণ্যবাহী মিলিয়ে অনুমোদপ্রাপ্ত নৌযানের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। এর মধ্যে প্রতিবছর প্রায় আট হাজার নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়। সরকারি হিসাবের নিবন্ধন করা নৌযানের মধ্যে প্রায় ছয় হাজার অবৈধ থেকে যায়।

১৪ হাজার নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষা করা সম্ভব হবে না এই যুক্তি কি মেনে নেয়া যায়। তাহলে কি লোকবল কম, নাকি অন্য কোথাও গলদ? আসলে অনুমোদপ্রাপ্ত নৌযানের ফিটনেস পরীক্ষা যদি প্রতিবছর নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে নৌপথের বিষয়ে উদাসীনতা আছে। দ্রুতই এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

আরও দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, গত ৫০ বছরেও দেশে কোনো নৌ-শুমারি হয়নি। ফলে সারা দেশে প্রকৃত নৌযানের সংখ্যা কত? তা জানার সুযোগ নেই।

২০১০ সালে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরল বজলুর রহমান নৌ-সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠিতে সারা দেশে ৫০ হাজার নৌযানের কথা উল্লেখ করা হয়। তাহলে অবৈধ নৌযানগুলোকে কেন বন্ধ করা হচ্ছে না? বৈধ যানে ত্রুটির শেষ নেই। তাহলে অবৈধ যান কি সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ আছে?

নৌ-সেক্টর নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠনগুলোর দাবি, সারা দেশে নৌযানের সংখ্যা এক লাখের বেশি। এতেই বোঝা যায় নৌ-সেক্টর কতটুকু অবহেলিত। এতে যত্ন ও নজরদারির কত অভাব!

অথচ নৌযানের নিবন্ধন ও ফিটনেস দেখতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরে ১৮ জন পরিদর্শক আছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ২৫ জন পরিবহন পরিদর্শকও ফিটনেসসহ নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়গুলো দেখেন। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে এসব পরিদর্শকদের কাজ আসলে কী? তাদের দায়িত্ব কি শুধু রেজিস্ট্রেশন করা নৌযান দেখা? নাকি গোটা নৌ-সেক্টরকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা?

এর বাইরেও নৌযানের সার্বিক কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব সরকারের দুই সংস্থা- নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর।

অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশের ৮১ ধারা অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএর ৪৭ জন কর্মকর্তাকে অনিবন্ধিত ও ফিটনেসবিহীন নৌযানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আইনগত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা খুব কমই ওই আইনের প্রয়োগ করেন। অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধনহীন জাহাজ থেকে কনজারভেন্সি চার্জ আদায়ের মাধ্যমে তাদের বৈধতা দেন কোনো কর্মকর্তা।

নিয়ম অনুযায়ী, নৌযানগুলোর নিবন্ধন নেয়ার পাশাপাশি প্রতিবছর ফিটনেস সনদ হালনাগাদ করতে হয়। এ সনদ দিতে নৌযানের মাস্টার-ড্রাইভারের সনদ, জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ও অন্য আনুষঙ্গিক বিষয়সহ ৫১টি বিষয় দেখেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের সার্ভেয়াররা। সেদিক দেখভালের শিথিলতা চরমে। তাই দায়িত্বশীলদের দ্রুত সময়ের মধ্যে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

শীত মৌসুমে নৌ-রুটে যান চলাচলে বিভিন্ন রকম নির্দেশনা থাকে। তাও দেখভালের লোকবল অপ্রতুল। নিজেদের মতো করে গুরুত্বপূর্ণ এই সেক্টরকে যারা পরিচালনা করতে চান তাদের চিহ্নিত করা জরুরি। সেইসঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা করে, ঘুষ নিয়ে আপস করে নৌপথকে অরক্ষিত করে লাভ কাদের হবে? তাদেরও চিহ্নিত করা জরুরি দরকার।

অনিবন্ধিত বালুবাহী (বাল্কহেড) জাহাজ, ট্রলার ও স্পিডবোট মিলিয়ে অন্তত ২০ হাজার নৌযান চলাচল করে থাকে। আইনগতভাবে নিবন্ধনহীন ১৬ হর্স শক্তির বেশি ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ দাবড়ে বেড়ানো এসব নৌযানকে কোনোভাবেই আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি নৌ পুলিশও কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। তাহলে কীভাবে এসব যান প্রকাশ্যে চলে?

নিয়ম অনুযায়ী, নৌযানের নকশা নৌ পরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনুমোদনের পর সেই নকশা অনুযায়ী নৌযান নির্মাণ করতে হয়। নির্মিত নৌযান পরিদর্শন করে রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস-সনদ দেয় সার্ভেয়াররা। ওই সনদ দুটি দেখিয়ে বিআইডব্লিটিএ থেকে রুট পারমিট নিতে হয়। এরপরই নৌযানটি চলাচলের জন্য উপযুক্ত হয়।

বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ শুধু যাত্রীবাহী ৭৮০টি নৌযানের রুট পারমিট দিয়েছে। তবে ফি অনুমোদন না পাওয়ায় পণ্যবাহী নৌযানের রুট পারমিট দেয়া শুরু করেনি। প্রশ্ন তাহলে অন্য নৌযানগুলো কাদের অনুমতি নিয়ে চলাচল করছে? অথচ সারা দেশে ইচ্ছেমতো নৌযান বানিয়ে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করা হয়। বর্ষা মৌসুমে হাওর-অধ্যুষিত সাত জেলা পুরোপুরি অরক্ষিত থাকে। সেখানে দেখভালের অভাবে দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় যাত্রীদের। নৌ-রুটে সাইন সিগন্যাল সঠিক না থাকারও অভিযোগ বিস্তর। যারা কাজ করে না তাদের তো সিগন্যাল ঠিকঠাক রাখার প্রয়োজন নেই! নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোই হয়ত জরুরি।

এখন বাস্তবতা হলো যেকোনো নৌপথে ইচ্ছা করলেই নৌযান পরিচালনা করা সম্ভব। যেখানে বৈধ রুটগুলোতেই তদারকির ব্যাপক অভাবে সেখানে অবৈধ রুটে কোনো তদারকি থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। তাহলে কি নৌপথ অরক্ষিত হয়েই থাকবে?। সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চয়ই নৌপথকে নিরাপদ করার দৃশ্যমান পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাব। নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবার অন্তরালে গজিয়ে থাকা দেয়ালটি চিহ্নিত করতে হবে। সেসঙ্গে সবকিছু স্বচ্ছতা করতে হবে। আনতে হবে জবাবদিহির আওতায়। সঠিক পদক্ষেপে নিরাপদ নৌপথ গড়ে তোলা সম্ভব হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন বাড়বে, তেমনি নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
কাভার্ড ভ্যানে বাসের ধাক্কায় নিহত ১
ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২
বাসের ধাক্কায় অটোরিকশাচালক নিহত, আহত ৫
খুঁটির সঙ্গে বাইকের ধাক্কায় নিহত ২
বাস-সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে যাত্রী নিহত

শেয়ার করুন

মন্তব্য

হারিছ চৌধুরীর রহস্যময়তা ও কিছু প্রশ্ন

হারিছ চৌধুরীর রহস্যময়তা ও কিছু প্রশ্ন

নিখোঁজের ৯ বছর পর বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মন্তব্য করে দলের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। তিনি ইলিয়াস আলীর ‘গুমের’ পেছনে দলের ভেতরে থাকা কজন নেতাকে দায়ী করেন।

চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে দোর্দণ্ড প্রতাপশালীদের একজন ছিলেন আবদুল হারিছ চৌধুরী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও খালেদা জিয়া তাকে তার বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হন। তিনি এতটাই ক্ষমতাধর ছিলেন যে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজ বাড়িতে ডাকঘর, স্কুল, পুলিশ ক্যাম্প ও ব্যাংকের শাখা বসিয়েছিলেন। সেখানে গড়ে তুলেছিলেন ব্যক্তিগত মিনি চিড়িয়াখানা। আয়ের বৈধ কোনো উৎস না থাকলেও রাতারাতি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যান হারিছ চৌধুরী। তার কানাইঘাটের বাড়িকে বলা হতো সিলেটের ‘হাওয়া ভবন’।

১/১১-এর পট পরিবর্তনের পর দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযান শুরু হলে আত্মগোপনে চলে যান হারিছ চৌধুরী। আড়ালে চলে গেলেও গণমাধ্যমে একের পর এক তার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। সম্প্রতি জানা গেল তিনি তিন মাস আগে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর সংবাদটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও হারিছ চৌধুরীর কন্যা ও লন্ডন বিএনপির শীর্ষনেতারা খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। প্রমাণ হলো- ইন্টারপোলের রেড নোটিশে থাকা কেউ চাইলে আত্মগোপনে থাকতে পারে। তিনি কবে, কীভাবে দেশ ছাড়লেন, কোথায় ছিলেন, কী করেছেন, কবে ও কীভাবে দেশে এলেন- এমন অনেক প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু এ রহস্যকে ছাড়িয়ে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে- বিএনপির গুম দাবি করা ব্যক্তিদের সন্ধানও কি একদিন এভাবে পাওয়া যাবে?

২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। দুমাস পর ১১ মে মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে ‘উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা’ করার সময় তাকে আটক করে শিলং পুলিশ। তার নামে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা হয়। বলা হয়েছিল, গোয়েন্দা পরিচয়ে তাকে তার উত্তরার বাসা থেকে তুলে একটি প্রাইভেট কারে শিলং নেয়া হয়েছে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে ছেড়ে দেয়ার দাবি হাস্যকর ও অবাস্তব একটি বিষয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হারিছ চৌধুরী ছিলেন আলোচিত-সমালোচিত এক ব্যক্তি। বিএনপির শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও তখনকার পাওয়ার হাউস হিসেবে পরিচিত ‘হাওয়া ভবন’- উভয় স্থানেই অবাধ বিচরণ ছিল তার। এছাড়া মোসাদ্দেক আলী ফালুর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় যৌথ ব্যবসা রয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়।

হারিছের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও শাহএএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা রয়েছে। এছাড়া দুদকের দুর্নীতি মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার যথাক্রমে তিন ও সাতবছরের জেল ও দশ লাখ টাকা জরিমানা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত। ২০১৮ সালে ইন্টারপোলে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ ইস্যু হয়। কিন্তু তিনি সফলভাবেই গা ঢাকা দিয়ে থাকতে সক্ষম হন।

জানা যায়, ২০০৭ সালে ২৯ জানুয়ারি সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতের করিমগঞ্জে পাড়ি জমান হারিছ চৌধুরী। সেখান থেকে পাকিস্তান হয়ে ইরানে তার ভাই আবদুল মুকিত চৌধুরীর কাছে যান। ইরানে থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা নেন বলেও গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়।

এর আগে যুদ্ধাপরাধী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ভারত হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া বিদেশে এসাইলামের জন্য পিনাকী ভট্টাচার্য নামের এক ইউটিউবার নাটক করে মিয়ানমার হয়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। তাই ধারণা করা অস্বাভাবিক নয় যে, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে চোরাচালানে জড়িত কোনো সিন্ডিকেট হয়তো তাদেরকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

খবরে জানা যায়, নিখোঁজের ৯ বছর পর বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মন্তব্য করে দলের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। তিনি ইলিয়াস আলীর ‘গুমের’ পেছনে দলের ভেতরে থাকা কজন নেতাকে দায়ী করেন।

গুম অবশ্যই নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতেও যে গুম নাটক হতে পারে তার নজির রয়েছে। ছাত্র অধিকার পরিষদ‌ নেতা তারেককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সংগঠনের নেতাকর্মীরাই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে লুকিয়ে থাকার তথ্য ফাঁস করে। বিএনপির পক্ষ থেকে গত ১২ বছরে প্রায় ছয়শ নেতাকর্মীকে গুম করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। কিন্তু তথ্য পাওয়া যায় ৮৭ জনের।

এদের মধ্যে কতজন ব্যক্তিগত কোন্দলের শিকার, কতজন স্বেচ্ছায় গা ঢাকা দিয়ে আছে- কে জানে! যেমন: একজন কাপড় বিক্রেতাকে কোনো রাজনৈতিক দল কেন প্রতিপক্ষ করবে- এর বিশ্বাসযোগ্য জবাব খুঁজে পাইনি। ব্যক্তিগত কোন্দলকে রাজনৈতিক মেরুকরণ করে পরোক্ষভাবে বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে কি না তাও বিবেচনার দাবি রাখে। তবে যেহেতু গুম ইস্যুতে সরকারকে টার্গেট করে প্রচারণা চলে আসছে, তাই সরকারের উচিত এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জনগণকে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরা।

লেখক: রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
কাভার্ড ভ্যানে বাসের ধাক্কায় নিহত ১
ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২
বাসের ধাক্কায় অটোরিকশাচালক নিহত, আহত ৫
খুঁটির সঙ্গে বাইকের ধাক্কায় নিহত ২
বাস-সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে যাত্রী নিহত

শেয়ার করুন

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

আন্দোলন যতক্ষণ পর্যন্ত স্লোগান, মিছিল, উত্তপ্ত বক্তৃতা এবং দেশাত্মবোধক গানের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে সেটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কিন্তু সেটি যদি শেষপর্যায়ে চলে যায়, যখন ছাত্রছাত্রীরা আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেটি খুবই বিপজ্জনক। তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ এবং ক্ষোভ তখন একটা গভীর দুঃখবোধ এবং অভিমানে পাল্টে যায়। হঠাৎ করে তারা টের পায় তারা আসলে একা, তাদের পাশে কেউ নেই।

এখন রাত দুইটা বাজে। একটু আগে টেলিফোন বেজে উঠেছে। গভীর রাতে টেলিফোন বেজে উঠলে বুকটা ধক করে ওঠে, তাই টেলিফোনটা ধরেছি। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ফোন করেছে। পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানি সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করছে। মোটামুটি নিরীহ আন্দোলন একটা বিপজ্জনক আন্দোলনে মোড় নিয়েছে। ছাত্রটি ফোনে আমাকে জানাল অনশন করা কয়েকজন ছাত্রকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, একজনের অবস্থা খুবই খারাপ, ডাক্তার বলেছে কিছু না খেলে ‘কোমায়’ চলে যেতে পারে। ফোন রেখে দেয়ার আগে ভাঙা গলায় বলেছে, ‘স্যার কিছু একটা করেন’।

আমি তখন থেকে চুপচাপ বসে আছি, আমি কী করব? আমার কি কিছু করার আছে?

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি অনেকবার অনেক ধরনের আন্দোলন হতে দেখেছি, কাজেই আমি একটি আন্দোলনের ধাপগুলো জানি। প্রথম ধাপে যখন হলের মেয়েরা তাদের দাবি- দাওয়া নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে গিয়েছে সেটি সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। আমি খুব ভালো করে জানি একটুখানি আন্তরিকতা দিয়ে ছাত্র্রছাত্রীদের কঠিন দাবি-দাওয়াকে শান্ত করে দেয়া যায়। কেউ একজন তাদের ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামায়, তারা শুধু এটুকু নিশ্চয়তা চায়।

সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন যদি একটুখানি জনপ্রিয়তা পায় তখন সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সেখানে ঢুকে পড়ে, সেটাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেটাকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে। সাধারণ ছাত্র্রছাত্রীরা যদি সতর্ক না থাকে তখন নেতৃত্ব তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আন্দোলন যদি থেমে না যায় তখন সরকারি ছাত্রদের সংগঠন (এখানে ছাত্রলীগ) তাদের ওপর হামলা করে। প্রায় সবসময়ই সেটা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তাদের শলাপরামর্শে। তারপরও যদি আন্দোলন চলতে থাকে তখন কর্তৃপক্ষকে পুলিশ ডাকতে হয়, পুলিশ এসে পিটানোর দায়িত্ব নেয়।

এই আন্দোলনে আমি এর প্রত্যেকটি ধাপ ঘটতে দেখেছি। প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে পুলিশের অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা। যতবড় পুলিশ বাহিনীই হোক তারা ছাত্রছাত্রীদের গায়ে হাত তোলার আগে একশবার চিন্তা করে। এখানে সেটা হয়নি, শটগান দিয়ে গুলি পর্যন্ত করা হয়েছে, বিষয়টি আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। পুলিশের চৌদ্দ পুরুষের সৌভাগ্য যে সেই গুলিতে কেউ মারা যায়নি। বোঝাই যাচ্ছে সিলেটের পুলিশ বাহিনীর তেজ এখনও কমেনি, তারা দুইশ থেকে তিনশ ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে রেখেছে। যখন প্রয়োজন হবে কোনো একজনের নাম ঢুকিয়ে তাকে শায়েস্তা করা যাবে!

হয়রানি কতপ্রকার ও কী কী শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম বয়সি ছাত্রছাত্রীরা সেটা এবারে টের পাবে। তবে একটি ব্যাপার আমি এখনও বুঝতে পারছি না। পুলিশের এই অবিশ্বাস্য আক্রমণটি ঘটার কারণ হচ্ছে ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়কে তালাবদ্ধ বিল্ডিং থেকে উদ্ধার করা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের জন্য একটা বিল্ডিংয়ে তালাবদ্ধ হয়ে আটকে পড়া এমন কোনো বড় ঘটনা নয়। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল কিংবা সিন্ডিকেট মিটিং চলার সময় দাবি আদায়ের জন্য বাইরে থেকে তালা মেরে বিশ্ববিদালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের আটকে রাখার ঘটনা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়েই একাধিকবার ঘটেছে। তারা তখন গল্প-গুজব করে সময় কাটিয়েছেন, সোফায় শুয়ে রাত কাটিয়েছেন, গোপনে কিছু খাবার আনিয়ে ভাগাভাগি করে খেয়ে হাসি তামাশা করেছেন কিন্তু পুলিশ ডাকিয়ে ছাত্রদের গায়ে হাত তুলে মুক্ত হওয়ার জন্য কখনও ব্যস্ত হননি।

এবার ভাইস চ্যান্সেলরকে উদ্ধার করার জন্যে ছাত্রছাত্র্রীর ওপর একটি অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা করা হলো, এর চাইতে বড় অমানবিক কাজ কী হতে পারে আমি জানি না। স্বাভাবিক নিয়মেই আন্দোলনটি এখন ভাইস চ্যান্সেলরের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটা এমন কিছু বিচিত্র দাবি নয়, আমরা প্রায়ই নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের পদত্যাগ দাবি শুনে আসছি।

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এবারেও সেই চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়নি। এটিও নতুন একটি ঘটনা— তারা এখন কোথায় থাকে, কী খায় আমি জানি না।

আন্দোলন যতক্ষণ পর্যন্ত স্লোগান, মিছিল, উত্তপ্ত বক্তৃতা এবং দেশাত্মবোধক গানের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে সেটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কিন্তু সেটি যদি শেষপর্যায়ে চলে যায়, যখন ছাত্রছাত্রীরা আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেটি খুবই বিপজ্জনক। তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ, এবং ক্ষোভ তখন একটা গভীর দুঃখবোধ এবং অভিমানে পাল্টে যায়।

হঠাৎ করে তারা টের পায় তারা আসলে একা, তাদের পাশে কেউ নেই। ‘আমরণ’ কথাটি থেকে ভয়ংকর কোনো কথা আমি জানি না, বড় মানুষেরা সেটাকে কৌশলী একটা শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন, কিন্তু এই বয়সি ছাত্রছাত্র্রীরা তাদের তীব্র আবেগের কারণে শব্দটাকে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর নামকরণ করা নিয়ে একবার বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল তখন আমাদের ছাত্রছাত্রীরা শহীদমিনারে অনশন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি খোলার ব্যবস্থা করেছিল।

অভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের দুর্বল শরীরে যখন খিঁচুনি হতে থাকে সেই দৃশ্য সহ্য করার মতো নয়। (পরে তারা আমাকে তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছে, দিনরাত তারা বোধ-শক্তিহীনভাবে পড়ে আছে, অন্য কোনো অনুভূতি নেই, শুধু এক প্লেট খাবারের স্বপ্ন দেখছে! আমি তাদের সেই কষ্টের কথাগুলো কখনও ভুলতে পারি না।) যে কারণেই হোক, আমার এককালীন ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীরা আবার সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বিষয়টি চিন্তা করে আমি খুবই অশান্তি অনুভব করছি।

২.

প্রায় তিন বছর আগে অবসর নিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার আগের মুহূর্তে আমি বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলরকে তিন পৃষ্ঠার একটি লম্বা চিঠি লিখে এসেছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে তাকে সেই চিঠিতে বেশ কয়েকটি উপদেশ দিয়েছিলাম। তিনি যদি আমার উপদেশগুলো শুনে সেভাবে কাজ করতেন তাহলে আজকে বিশ্ববিদ্যালয়টি এরকম বিপজ্জনক একটা জায়গায় পৌঁছাতো না।

তিনি আমার উপদেশগুলো সহজভাবে নেবেন আমি সেটা আশা করি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি করা শিক্ষকদের পুরস্কার হিসেবে ভাইস চ্যান্সেলর করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। যদিও অনেক দিক দিয়েই শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আধুনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপক তাদের উন্নাসিকতার কারণে সেটা মেনে নেন না। কাজেই প্রান্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের আমার মতো একজন শিক্ষকের উপদেশ ভালো লাগার কথা নয়।

কিছুদিন আগে আমার উপর জঙ্গি হামলার বিচারের শুনানিতে সাক্ষী দেয়ার জন্যে আমাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। আমি একদিনের জন্য সিলেটে গিয়েছিলাম এবং বহুদিন পরে ক্যাম্পাসে পা দিয়েছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা রীতিমতো অপরাধ তাই সবাই দূরে দূরে থাকলেও ছাত্রছাত্রীরা মন খুলে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আমি বেশ দুঃখের সঙ্গে আবিষ্কার করেছি আমার পরিচিত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রটি পাল্টে যাচ্ছে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া বিশেষ হয় না (এখানে শুধু পরীক্ষা হয়)।

কাজেই ভালো ছাত্রছাত্রীরা চেষ্টাচরিত্র করে নিজেরা যেটুকু পারে শিখে নেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈচিত্র্যময় পরিবেশে অন্য সবার সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাদের এক ধরনের মানসিক গঠন হয়, সেটার মূল্য কম নয়। সেজন্য আমি যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, সবসময় তাদের সব রকম সংগঠন করে নানা ধরনের কাজকর্মে উৎসাহ দিয়ে এসেছি। ছাত্রছাত্রীরা জানাল এখন তাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও বাধা নিষেধ। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় আমাদের ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসের রাস্তায় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে দীর্ঘ আলপনা এঁকেছিল। ছাত্রছাত্রীরা জানাল এখন তারা রাস্তায় আলপনাও আঁকতে পারে না। তাদের দুঃখের কাহিনি শোনা ছাড়া আমার কিছু করার ছিল না। আমি শুধু তাদের ভেতরকার চাপা ক্ষোভটি অনুভব করেছি।

সেই ক্ষোভটি এখন বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।

৩.

কিছুদিন আগে লন্ডনের একটি ওয়েবিনারে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেটি ছিল বাংলাদেশের শিক্ষা-সংক্রান্ত একটি ওয়েবিনার। আমি বক্তব্য দেয়ার পর সঞ্চালক উইকিপিডিয়া থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভয়ংকর দুরাবস্থার বর্ণনা পড়ে শোনালেন, তারপর এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘আমি এই ব্যাপারটি খুব ভালো করে জানি এবং চাইলে সেটি সম্পর্কে বলতেও পারব। কিন্তু নীতিগতভাবে আমি দেশের বাইরের কোনো অনুষ্ঠানে দেশ সম্পর্কে খারাপ কিছু বলি না।

কাজেই আমি এটা নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আপনি যদি সত্যিই জানতে চান ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করলে বলতে পারি।’ সঞ্চালক বললেন, ‘তাহলে অন্তত এর সমাধান কী হতে পারে সেটা বলেন।’ আমি বললাম, ‘সমাধান খুব কঠিন নয়। যেহেতেু বাংলাদেশে ভাইস চ্যান্সেলররা হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাই রাজনীতি করা শিক্ষকদের নিয়োগ না দিয়ে খাঁটি শিক্ষাবিদদের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দিলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেহারা পাল্টে যাবে।’

সেই ওয়েবিনারে আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। তিনি তার বক্তব্য দেয়ার সময় বললেন, একজন ভাইস চ্যান্সেলরকে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অনেক কাজ করতে হয় তাই শুধু শিক্ষাবিদ সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন না— তার ভেতর নেতৃত্ব দেয়ার গুণ থাকতে হয়। সেজন্য নেতৃত্ব দিতে পারেন সেরকম ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিতে হয়।

বলা যেতে পারে আমি তখন প্রথমবার বুঝতে পেরেছি আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন সবসময় দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়। এটি আকস্মিক ঘটনা নয়, সেটি একটি সুচিন্তিত কিন্তু বিপজ্জনক এবং ভুল সিদ্ধান্ত! একজন শিক্ষক যদি শিক্ষাবিদ হন তাহলে তার ভেতর নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলি থাকবে না সেটি মোটেও সত্যি নয়। তাছাড়া এই দেশে দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষক সবসময় আদর্শের জন্য রাজনীতি করেন সেটিও সত্যি নয়। যিনি এক সময় ‘জিয়া চেয়ার’ স্থাপনের প্রস্তাবক, সাদা দলের রাজনীতি করেছেন তিনি সময়ের প্রয়োজনে নীল দলের রাজনীতি করে অবলীলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হতে পারেন। সেরকম উদাহরণ কি আমাদের সামনে নেই?

৪.

কাজেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকেরা যদি আদর্শবাদী হতেন ভাইস চ্যান্সেলরদের স্বেচ্ছাচারী কিংবা একগুঁয়ে না হতে দিতেন, ভুল কিংবা অন্যায় করলে প্রতিবাদ করতেন তাহলেও একটা আশা ছিল। কিন্তু সেগুলো হয় না। ভাইস চ্যান্সেলর যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ‘জি হুজুর’ করার একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্দয় আক্রমণ শুরু করেছিল তখন একজন শিক্ষকও ছুটে গিয়ে পুলিশকে থামানোর চেষ্টা করেননি! ছাত্রছাত্রী এখন শিক্ষকদের শত্রুপক্ষ। আমাদের শিক্ষকেরা সব ধোয়া তুলসীপাতা এবং ছাত্র্রছাত্র্রীরা বেয়াদব এবং অশোভন আমি সেটা বিশ্বাস করি না।

শিক্ষক হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্মানবোধ থাকতে হবে, তাদের জন্য ভালোবাসা থাকতে হবে। সেটি এখন নেই। ভর্তিপরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয় সেটি সবাই জানে—সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সেটি চোখের পলকে দূর করে দেয়া যায়। বহুকাল আগে একবার তার উদ্যোগ নিয়ে সেই সময়কার শিক্ষামন্ত্রী সব ভাইস চ্যান্সেলরকে ডেকেছিলেন। আমি সেখানে প্রস্তাবটি ব্যাখ্যা করেছিলাম এবং তখন আবিষ্কার করেছিলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষকদের ভেতরে রয়েছে সর্বগ্রাসী লোভ! সেটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করতেও তারা সংকোচ অনুভব করেন না! সেই সভায় তারা এককথায় ছাত্রছাত্রীদের জীবনকে সহজ করার সেই উদ্যোগটিকে বাতিল করে দিয়েছিলেন!

এই মুহূর্তে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি খুবই জটিল অবস্থা। আমি একমাস দেশের বাইরে ছিলাম বলে পত্রপত্রিকার খবরের বাইরে কিছু জানি না। খবরের বাইরেও খবর থাকে এবং আজকাল সামাজিক নেটওয়ার্কে বিষ উগড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, আমি সেগুলোও জানি না। যখন একটি নিরীহ আন্দোলন একটি বিপজ্জনক আন্দোলনে পালটে যাচ্ছে আমি তখন প্লেনে বসে আছি, দেশে এসে প্রায় হঠাৎ করে জানতে পেরেছি আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই।

একদিকে ছাত্রছাত্রী অন্যদিকে ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে সকল শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের দাবি খুবই চাঁছাছোলা। এটাকে মোলায়েম করার কোনো উপায় নেই। যেহেতু নির্দয় পুলিশি হামলা করার লজ্জাটুকু কেটে গেছে তাই যদি দ্বিতীয়বার সেটাকে প্রয়োগ করে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন বন্ধ না করা যায় এটার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের কোনো উপায় নেই।

সরকারের নিয়োগ দেয়া ভাইস চ্যান্সেলরকে প্রত্যাহার করা সরকারের জন্য খুবই অপমানজনক একটা ব্যাপার তাই সরকার কখনই সেটা করবে না। ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের সঙ্গে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক আছেন, শুধু তাই নয় দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চ্যান্সেলররাও আছেন, কাজেই তার নিজ থেকে পদত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না।

মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অনির্দিষ্ট কাল হাড়কাঁপানো শীতে অনশন করে খোলা রাস্তায় শুয়ে থাকতে হবে, কেউ তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আাসবে না। যে ছাত্রজীবনটি তাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় হতে পারত সেই সময়টি তাদের জন্যে অপমান আর অবহেলার সময় হয়ে যাচ্ছে, সেই জন্য আমি তাদের কাছে ক্ষমা চাই।

ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় আমার এ লেখাটি পড়বেন কি না জানি না। যদি পড়েন তাকে বলব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শেষদিনটিতে আমি তাকে যে চিঠিটি লিখে এসেছিলাম সেটি যেন আরও একবার পড়েন, সম্ভব হলে তার আশেপাশে থাকা শিক্ষকদেরও পড়তে দেন। এখন যা ঘটছে সেটি যে একদিন ঘটবে, আমি সেটি তিন বছর আগে তাকে জানিয়ে রেখেছিলাম। তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি।

লেখক: শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন:
কাভার্ড ভ্যানে বাসের ধাক্কায় নিহত ১
ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২
বাসের ধাক্কায় অটোরিকশাচালক নিহত, আহত ৫
খুঁটির সঙ্গে বাইকের ধাক্কায় নিহত ২
বাস-সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে যাত্রী নিহত

শেয়ার করুন

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিত্যপণ্যের মূল্য কমানো জরুরি

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিত্যপণ্যের
মূল্য কমানো জরুরি

সরকার শহরাঞ্চলে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে কিছু পণ্য বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে বিক্রি করছে। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল হতদরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ খুব বেশি পাবে বলে মনে হয় না। এখানেও ডিলার-প্রশাসন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা কারসাজি রয়েছে। সরকার কেন ভ্রাম্যমাণ ট্রাক-দোকান দিয়ে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বজায় রাখছে তা বোধগম্য নয়।

করোনার অভিঘাত বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও সমাজ জীবনে যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে তা থেকে কোনো দেশই মুক্ত নেই। ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা অক্সফাম বিশ্ব দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করছে। সম্প্রতি তাদের প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে যে, করোনার ভয়াবহ প্রকোপে বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে, পক্ষান্তরে পৃথিবীর শীর্ষ ১০ ধনীর সম্পদ দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতি ২৬ ঘণ্টায় একজন করে বিলিয়নার তৈরি হচ্ছে। ১৬০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

সমাজে লিঙ্গ বৈষম্য বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশেও মুক্ত নয়। বিপুল জনগোষ্ঠীর আয়-উপার্জন যেমন কমে গেছে, তেমনিভাবে প্রান্তিক, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তের জীবনজীবিকাও দুই বছরের করোনা সংকটে বড় ধরনের অর্থনৈতিক টানাটানিতে পড়েছে। এ অবস্থায় নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী উৎপাদনের সক্ষমতা অনেকেরই হ্রাস পেয়েছে। আবার আমাদের সমাজেই মজুতদারি, নানা ধরনের সিন্ডিকেশন, ঘুষ-দুর্নীতির প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে একটি অংশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাজারে পণ্য সরবরাহের নানা কারসাজি, মধ্যস্বত্বভোগী এবং ক্ষমতার নানা ধরনের অপব্যবহারকারী গোষ্ঠী সর্বক্ষেত্রে মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছে। এর ফলে বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর মূল্য। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রান্তিক থেকে মধ্যম আয়ের মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহের ওপর। করোনার আগে যেখানে আমাদের দারিদ্র্যের হার ১৯ শতাংশে নেমে এসেছিল এখন তা বেড়ে ২৫ শতাংশের উপরে চলে গেছে। প্রান্তিক মানুষের আয় এবং ক্রমবর্ধমান বাজারমূল্যের যে দূরত্ব তৈরি করেছে তাতে নিম্ন আয়ের পরিবারের জীবনযাপনের ওপর বেশ চাপ পড়েছে।

চালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার শহরাঞ্চলে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে কিছু পণ্য বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে বিক্রি করছে। কিন্তু এর প্রকৃত সুফল হতদরিদ্র কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ খুব বেশি পাবে বলে মনে হয় না। এখানেও ডিলার-প্রশাসন, মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা কারসাজি রয়েছে। সরকার কেন ভ্রাম্যমাণ ট্রাক-দোকান দিয়ে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা বজায় রাখছে তা বোধগম্য নয়। প্রয়োজন ছিল বস্তি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের এলাকায় সুনির্দিষ্ট দোকানে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষদের সাপ্তাহিক, পাক্ষিক কিংবা মাসিক ভিত্তিতে ন্যায্যমূল্যে চাল-ডাল, তেল-লবণ, আটা-চিনি ক্রয়-বিক্রয়ের একটি বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা করা।

একইভাবে গ্রামাঞ্চলেও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো ন্যায্যমূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী ক্রয় করার সুবিধা লাভের আওতায় আসার সুযোগ পেলে দেশীয় এবং বৈশ্বিক বর্তমান সংকটকালে জাতীয়ভাবে আমাদের দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার গতি রোধ করা যেত। ২০ জানুয়ারি থেকে সরকার উপজেলাপর্যায়ে ১ হাজার ৭৬০ জন ডিলারের মাধ্যমে চাল-আটাসহ খাদ্যদ্রব্য বিক্রির ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে। এতে প্রতি কেজি চালের দাম ৩০ এবং আটার দাম ১৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এর সুবিধা দরিদ্র এবং স্বল্প আয়ের মানুষ কতটা নিতে পারবে সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধি কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। অথচ কৃষিমন্ত্রীর কথায় জানা গেছে যে, দেশে এই মুহূর্তে ২০ লাখ টন খাদ্যশস্য সরকারের গুদামে মজুদ আছে। এরপরেও বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী, চাতালের মালিক এবং খাদ্যপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মজুতদার ও ব্যবসায়ীরা কিছুতেই বাজারে স্বাভাবিক মূল্য বজায় রাখতে দিচ্ছে না। নানা অজুহাত তাদের রয়েছে। পরিবহন খরচ, চাঁদাবাজি ইত্যাদির অজুহাতে বাজারে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে বাধ্য করেছে।

এমনকি কৃষক এই শীত মৌসুমে যেসব শাকসবজি উৎপাদন করছে সেগুলোর বাজারমূল্য শহরে কৃষকের উৎপাদনমূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি হতে দেখা যাচ্ছে। এখানেও পরিবহন খরচ এবং চাঁদাবাজির অজুহাত দেখিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী এবং ব্যবসায়ীরা বাজারকে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। এর সুফল তারাই ভোগ করছে, উৎপাদনকারী এবং ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উৎপাদনকারী কৃষক কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে বার বার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হতে বাধ্য।

এর প্রতিক্রিয়ায় বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। সরকার এ পর্যন্ত কৃষিজ পণ্য উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং বাজারে মূল্য স্বাভাবিক রাখার জন্য কোনো যৌক্তিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারেনি। সরকারের স্থানীয় কোনো প্রশাসনই এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। এটি না পারার প্রধান কারণ হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাপনা পরিষদ এ পর্যন্ত গঠিত হয়নি। ফলে দেশের গোটা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে উৎপাদনকারী কৃষক এবং ক্রেতা ভোক্তারা কোনোভাবেই ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। উৎপাদনকারী এবং ভোক্তার মধ্যখানে যেসব গোষ্ঠী অবস্থান করছে তারাই এর সুফল ভোগ করছে। রাতারাতি এরাই অর্থবিত্ত ও প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

এরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। প্রশাসন, পরিবহন এবং সড়কপথে তদারককারী গোষ্ঠী চাঁদাবাজির নামে যা করছে তা তাদেরকেই পারস্পরিকভাবে লাভবান হতে সাহায্য করছে। অথচ এর দায় তারাই চাপিয়ে দিচ্ছে অন্যের ওপর এবং অন্যের বাজারমূল্য বৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে নিজেদের দুর্নীতি এবং চাঁদাবাজিকে পণ্যের মূল্য বাড়ার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এ ধরনের একটি অনৈতিক কারসাজি বৃত্তাকারে আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ে খেলা করছে। সরকার এই চক্রবৃত্তকে কখনই স্পর্শ করছে না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বণিকতান্ত্রিক নানা গোষ্ঠী রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠার মস্তবড় সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে কেউ হাত দিচ্ছে না।

বাংলাদেশে দ্রুত বিকাশমান বাজার অর্থনীতির মূলেই রয়েছে এমন লুম্পেন চরিত্রের নানা অসৃষ্টিশীল, দুর্নীতিপরায়ণ গোষ্ঠীর সংযুক্তি। এদের নাম বিভিন্ন দেশে মাফিয়া চক্র হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে এই চক্র এখন এতটাই প্রভাবশালী যে, সরকার এদের কাছে অসহায়, উৎপাদনকারী ও ভোক্তারা নিরুপায়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও সমাজ-অর্থনীতিতে যে বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে তার কেন্দ্রবিন্দু গোটা লুটপাটকারী অর্থনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ। সরকার এখানে কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রবেশ করতে পারবে তা নিয়ে কেউই সন্দেহমুক্ত নয়।

সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছিল সেটি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পরিবহন মালিক শ্রমিকগণ এক্ষেত্রে যেসব ওজর-আপত্তি, ছলচাতুরী ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে তা খোলা চোখেই দেখা গেছে। গ্যাসচালিত যানবাহনও ভাড়া বৃদ্ধি করে নিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের পরিবহন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এটি অনেকটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আরেকটি উদ্যোগের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

দেশের অন্যতম সরকারি তিতাস, বাখরাবাদ, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির একটি প্রস্তাব এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে পৃথকভাবে জমা দিয়েছে। বাকি আরও তিনটি কোম্পানি এই সপ্তাহে অনুরূপ প্রস্তাব জমা দিতে যাচ্ছে। এতে জ্বালানি গ্যাসের মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় যেসব মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে তা দেখে যে কারো ভিমড়ি খেয়ে মরার অবস্থা হয়েছে।

যেসব ব্যক্তি এসব মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন তারা সম্ভবত কোনো ভিন্ন গ্রহে বসবাস করেন। হয় তাদের গ্যাস ব্যবহার করতে হয় না, নতুবা তাদের অর্থকড়ির কোনো দরকার পড়ে না! তাদের প্রস্তাবমতো এখন বাসাবাড়িতে যারা দুই চুলায় ৯৭৫ টাকা ব্যয় করছেন তাদেরকে ২ হাজার ১০০ টাকা দিতে এবং এক চুলায় ৯২৫ টাকার জায়গায় ২ হাজার টাকা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। শিল্পে প্রতি ঘনমিটারে গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা, শিল্প কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম ১৩ টাকা ২৫ পয়সার জায়গায় ৩০ টাকা, বিদ্যুৎ ও সারে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা, হোটেল-রেস্টুরেন্টে ২৩ টাকা থেকে ৫০ টাকা, সিএনজিতে ৩৫ টাকা থেকে ৭৫-৭৬ টাকা এবং আবাসিক মিটারে ১২ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ২৭ টাকা ২৭ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। রেগুলেটরি বোর্ডই শেষ পর্যন্ত শুনানি শেষে মূল্য কোন খাতে কত বৃদ্ধি করবে সেটি জানা যাবে। কিন্তু গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির এমন প্রস্তাব হাঁকানোর খবর শুনে এখনই তো আমাদের কাঁপুনি লেগে যাওয়ার কথা।

গ্যাসের সহনীয় মূল্যবৃদ্ধি যেখানে এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে, সেখানে এমন অসহনীয় প্রস্তাব দেখে কোনো মন্তব্য মুখে আসার কথা নয়। বিষয়গুলো সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে এখনই গুরত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করোনার এমন অর্থনৈতিক সংকটকালে দেশের সকল মানুষকেই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিতে পারে। সেকারণে ব্যয় সংকোচন নীতি কার্যকর করা, গ্যাস নিয়ে যেসব অপচয় ও দুর্নীতি চলছে সেসবকে দৃঢ়ভাবে রোধ করার মাধ্যমে সরকার দেশের গ্যাস খাতকে জনবান্ধব করে তুলতে পারে। সেটিই হওয়া উচিত মূল্যবৃদ্ধির চাইতে স্থির রাখার যুক্তিসংগত উপায়।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
কাভার্ড ভ্যানে বাসের ধাক্কায় নিহত ১
ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২
বাসের ধাক্কায় অটোরিকশাচালক নিহত, আহত ৫
খুঁটির সঙ্গে বাইকের ধাক্কায় নিহত ২
বাস-সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে যাত্রী নিহত

শেয়ার করুন

শাবিপ্রবির চলমান বাস্তবতা অনাকাঙ্ক্ষিত

শাবিপ্রবির চলমান বাস্তবতা অনাকাঙ্ক্ষিত

ছাত্র আর শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরম সর্বনাশের পথে এগিয়ে চলেছে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ছিল: যে বিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যার চর্চা হয়। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ দাঁড়িয়েছে- যেখানে বিশ্ববিদ্যা লয়প্রাপ্ত হয়!

আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য মেনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী যৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়েই আন্দোলন শুরু করেছিল। এর মধ্যে প্রধান দাবি ছিল- নিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের প্রতি বিরূপ আচরণ শুরু করে। বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে আবাসিক ছাত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। এতে আন্দোলনকারীরা অন্যান্য দাবির সঙ্গে তার পদত্যাগ দাবিও জুড়ে দেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের উপেক্ষা দেখাতে থাকে, এদিকে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ ততই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে প্রথমে ছাত্রলীগ, পরে পুলিশ দিয়ে আন্দোলনকারীদের দমন করার চেষ্টা করা হয়। শক্তি প্রয়োগ করেও কোনো রকম কূলকিনারা করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে শিক্ষার্থীরা চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়। তারা হল এবং বিশ্ববিদ্যালয় না ছাড়ার ঘোষণা দেয়। তারা ভিসি ও প্রক্টরের বাড়িতে তালা লগিয়ে দেয় এবং ভিসির পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থান গ্রহণ করে।

এর মধ্যে ছাত্রীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অত্যন্ত নেতিবাচক ও আপত্তিকর মন্তব্যসংবলিত একটি অডিও ভাইরাল হওয়ার পর পরিস্থিতি একেবারেই বদলে যায়। দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিশেষ করে ভিসির ভূমিকা নিয়ে সবাই সমালোচনামুখর হয়। সবার অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করে শুরুতেই যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হতো, তাদের কথা শুনত, তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নিত, তাহলে পরিস্থিতি বর্তমান অবস্থায় উপনীত হতো না।

এখন রাজনৈতিক নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও প্রতিবাদকারীদের শান্ত করতে পারেননি। করোনা মহামারির কারণে এমনিতেই আমাদের দেশে প্রায় দুই বছর ধরে শিক্ষা কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এখন করোনাভাইরাসের চরম সংক্রমণের লগ্নে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অপরিণামদর্শী আচরণের কারণে যদি শিক্ষা কার্যক্রম আবার বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এর দায় কে বহন করবে?

বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতেই পারে। কিন্তু তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, দাবি-দাওয়াগুলো সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাজ। তা ছাড়া শিক্ষার্থীরা এমন কোনো কঠিন দাবি তোলেনি যা মানা যায় না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথম থেকেই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেছে। সবচেয়ে খারাপ কাজ করেছে ছাত্রলীগ এবং পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করার পথ অবলম্বন করে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকেই দায় নিতে হবে।

ভিসি হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ব্যক্তি। তিনি যদি তার শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে না পারেন, হলে এবং ক্লাসে ফিরিয়ে নিতে না পারেন, তাহলে বুঝতে হবে তার যোগ্যতা ও সক্ষমতায় ঘাটতি আছে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে গত দুই দশকে আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন, উপাচার্য আর পুলিশ একাকার হয়ে গেছে। সরকারি দলের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল-সন্ত্রাস, বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ছাত্রী নিপীড়নসহ নানা অপকর্মের সূতিকাগার হয়ে উঠেছে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়।

অপকর্মকারীরা সব সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়ে যায়। এর বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী হয়ে উঠলেই নেমে আসে দমন-পীড়ন-নির্যাতন। তখন পুলিশ এসে অপকর্মকারীদের প্রটেকশন দেয় আর প্রতিবাদীদের ঠেঙিয়ে শায়েস্তা করার চেষ্টা করে। আর উপাচার্য হয়ে ওঠেন এসব কু-নাট্যের নাট্যকার! সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করবেন। এটাই তার দায়িত্ব। অথচ এখনকার অধিকাংশ উপাচার্য সেই কাজটি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর শিক্ষকরাও কম সরেস নয়। তারাও উপাচার্যকে নানাভাবে মদত জুগিয়ে যান। উপাচার্যের পাশাপাশি শিক্ষকদের ভূমিকাও পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার সময় এসেছে।

সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, সমাজের অগ্রসর ও ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ’ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন। হিংসায় উন্মত্ত, ক্ষমতার নেশায় বিভোর, স্বার্থোদ্ধারের চেষ্টায় যখন সমাজের বেশির ভাগ মানুষ ব্যাকুল, তখন ক্ষুদ্রতামুক্ত লোভ-মোহ-সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রুখে দাঁড়াবেন। সাধারণ মানুষকে পথ দেখাবেন।

দেশের অন্যত্র যা-ই ঘটুক, অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে কোনো অন্যায়, পক্ষপাত, নীতিগর্হিত কাজ তারা হতে দেবে না। এ জন্য প্রয়োজনে তারা বুকের রক্ত দেবে। প্রাণ উৎসর্গ করবে। যুগে যুগে আমাদের সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাই করেছে। ন্যায়ের জন্য, অধিকারের জন্য, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে কখনও তারা কুণ্ঠিত হননি।

এখন দিন বদলে গেছে। সমাজের সার্বিক অধঃপতন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও গ্রাস করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই এখন আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই লোভী, ধান্দাবাজ ও হিংস্র হয়ে উঠছেন। স্বার্থোদ্ধার, সুবিধা আদায় আর ধান্দাবাজিতে তারা অনেকে এখন অধম হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মানে নির্লোভ-নির্মোহ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার জ্ঞানতাপস– এই ধারণা এখন আমূল বদলে গেছে। আর দশজন সুবিধাবাদী নষ্ট মানুষের সঙ্গে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পার্থক্য করা কঠিনতম বিষয়ে পরিণত হয়েছে!

অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধানও তেমনভাবেই তৈরি করা হয়েছে। এই বিধি অনুযায়ী দলবাজির মহড়ায় পাস না করলে নিয়োগ-বদলি, প্রমোশন ইত্যাদি পাওয়া যায় না। এ ব্যবস্থায় শিক্ষকরা অসন্তুষ্ট বলেও মনে হয় না। তারা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে পদ-পদবি, সামান্য একটু সুযোগ-সুবিধা এবং প্রমোশনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। এ জন্য তারা দলবাজিই শুধু নয়, ‘অশিক্ষিত’ ‘অর্ধশিক্ষিত’ রাজনৈতিক নেতাদের পা চাটতেও কুণ্ঠিত হন না। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা– অবশ্য সবাই নয়, তবে বেশির ভাগই দলবাজি নিয়ে মত্ত থাকেন, একটু সুযোগ-সুবিধা, পদ-পদবি, প্রমোশনের ধান্দায় সারাক্ষণ ব্যস্ত সময় কাটায়।

সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হচ্ছে, আত্মমর্যাদা-আত্মসম্মান, নীতিনৈতিকতা-আদর্শ ভুলে একশ্রেণির শিক্ষক অধ্যাপক-প্রক্টর, বিভাগের প্রধান, অনুষদের ডিন, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ইত্যাদি পদ বাগাতে রাজনৈতিক দলের প্রতি ‘লেজ নাড়তে’ থাকেন। তাদের অনেকে শাসক দলের ‘গৃহভৃত্য’ হতেও কোনো গ্লানি বা অনুশোচনা বোধ করে না। অধঃপতনের এ এক চূড়ান্ত অবস্থা! শিক্ষক রাজনীতির নামে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন এমন ‘বাঁদরের সার্কাসই’ চলছে।

এভাবে একটি দেশ, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। এখানে শিক্ষকদের কোনো জবাবদিহি আছে কি? বছরে কটা ক্লাস নেন, কটা বই লেখেন, কটা আর্টিকেল পাবলিশ করেন, বিদেশি জার্নালে তাদের কটা লেখা প্রকাশিত হয়– এসব নিয়েই একজন শিক্ষকের পরিচয়। এসবের হিসাব কি কেউ নেয়? সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, প্রশাসন– কেউ কি এসবের খবর নেয়?

ছাত্র আর শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরম সর্বনাশের পথে এগিয়ে চলেছে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ছিল: যে বিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যার চর্চা হয়। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ দাঁড়িয়েছে- যেখানে বিশ্ববিদ্যা লয়প্রাপ্ত হয়!

বেশ কয়েক বছর আগে একজন প্রবাসী গবেষক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুরবস্থা ঘোচানোর জন্য কিছু উপায় বাতলেছিলেন। এগুলো হচ্ছে:

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবেন অনির্বাচিত পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি কোনোক্রমে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারবেন না; উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করবেন সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সমর্থক হবেন না; সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্য বদল হবেন না। কাজ করবেন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য; ডিন হবেন এক বছরের জন্য, একেকটা বিভাগ থেকে রোটেশনের মাধ্যমে। নির্বাচন হবে না; বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র তিন-চারজন শিক্ষক রোটেশনের মাধ্যমে বিভাগের সভাপতি হবেন। প্ল্যানিং কমিটিতে থাকবেন তারাই। বিভাগের সম্প্রসারণ দরকার আছে কি না, তারাই তা ঠিক করবেন; বিভাগের শিক্ষকসংখ্যা এমন হবে, যাতে প্রত্যেক শিক্ষক সপ্তাহে গড়ে সাত-আটটি লেকচার দিতে বাধ্য হন এবং সমানসংখ্যক টিউটরিয়াল ক্লাসও নেন; শিক্ষকেরা যাতে গবেষণা করার সুযোগ পান, তার জন্য প্রতি তিন বছর পরে এক বছর গবেষণা-ছুটি পেতে পারেন; চাকরির উন্নতির ক্ষেত্রে সত্যিকার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। খবরের কাগজে প্রকাশিত লেখা গবেষণামূলক বলে গণ্য হবে না; দ্বিতীয় পরীক্ষক অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হতে হবে।

নম্বরে দশের বেশি পার্থক্য থাকলে তৃতীয় পরীক্ষক উত্তরপত্র পরীক্ষা করবেন; ব্যাঙের ছাতার মতো যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে, তাদের সংখ্যা কমাতে হবে; মান যাচাই করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দিতে হবে; বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার খাতার দ্বিতীয় পরীক্ষক হবেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকেরা; বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা থাকতে পারবে না।

এমন আরও অনেক সুপারিশই করা যায়। কিন্তু আপাতত উল্লিখিত সুপারিশগুলো পালন করলে কিছুটা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আমাদের দেশে এসব সুপারিশ কে বিবেচনায় নেবে, কে-ইবা বাস্তবায়ন করবে?

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা-প্রবন্ধকার ও রম্য লেখক।

আরও পড়ুন:
কাভার্ড ভ্যানে বাসের ধাক্কায় নিহত ১
ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২
বাসের ধাক্কায় অটোরিকশাচালক নিহত, আহত ৫
খুঁটির সঙ্গে বাইকের ধাক্কায় নিহত ২
বাস-সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে যাত্রী নিহত

শেয়ার করুন

চাষাভুষা বনাম বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক

চাষাভুষা বনাম বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক

তারা তাদের ক্রিয়া-কর্মের দ্বারা নিজেদের সমাজের বৃহত্তর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে সদা সতর্ক থাকেন। যে চাষাভুষা সমাজ তাদের খাওয়ায়, এক দু প্রজন্ম আগে যে খেতের আইলে প্রকৃতিক কাজ সারত, সানকিতে খাওয়া পরিবারগুলো থেকে আমরা আসছি তাদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে জানার মধ্যেই আমাদের মর্যাদাবোধ নিহিত!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হীনন্মন্যতার দিকটা প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে শাবিপ্রবির এক শিক্ষিকার ‘চাষাভুষা’র কথায়। আর গত কদিন আগে ঢাবির অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন স্যারের ‘আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক’ নামের ফেবু-পোস্ট পাঠে আমার মনে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের প্রেষণাই যেন হীনন্মন্যতার অবিনশ্বর এক বোধ।

‘আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক’। খেয়াল করুন, বাক্য হয়নি কিন্তু তাতে অহমিকার লেলিহান রূপে কিছু মাত্র আড়ালও তৈরি হয়নি!

সে যাহোক, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি একজন শিক্ষক’-এই পরিচয় কিছুতেই বিশেষ কিছু না, হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়। কোনো চাকরি, যার জন্য কেউ বেতন নেয়- সেটা চাকরিই মাত্র। কোনো শিক্ষক বা যে কাউকে বিশিষ্ট হয়ে ওঠার দরকার নেই। সম্মান মর্যাদা- এগুলো সব হীনন্মন্যতাজাত আকাঙ্ক্ষা।

আপনি বিশিষ্ট, আপনি সম্মানিত- এই কথার মানে হচ্ছে, আপনি আপনার সঙ্গীজনদের পিছনে ফেলছেন- এই পেছনে ফেলাটা আপনাকে যে তৃপ্তি দেয় সেটার একটা সার্বক্ষণিক স্বীকৃতি আপনি চাইছেন। মানুষকে পিছনে ফেলে বিশিষ্ট বা সম্মানিত বোধ করা অসুস্থতা, মানসিক বিকারগ্রস্ততা।

বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকরা আর সব চাকরিজীবীদের মতোই চাকরিগত প্রাণী। কিন্তু তারা নানা মধুর মধুর বাজে কথা বলে, নানান ভাব ও ভং ধরে সমাজে বিশিষ্ট হতে চান। বিশেষ সম্মান পেতে চান। এর আর একটা অর্থ হচ্ছে, তারা তাদের ক্রিয়া-কর্মের দ্বারা নিজেদের সমাজের বৃহত্তর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে সদা সতর্ক থাকেন। যে চাষাভুষা সমাজ তাদের খাওয়ায়, এক দু প্রজন্ম আগে যে খেতের আইলে প্রকৃতিক কাজ সারত, সানকিতে খাওয়া পরিবারগুলো থেকে আমরা আসছি তাদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে জানার মধ্যেই আমাদের মর্যাদাবোধ নিহিত!

এ কারণেই শাবিপ্রবির অধ্যাপিকা নিজেকে ‘চাষাভুষা’ থেকে পৃথক করে শ্লাঘা বোধ করেন আর মামুন স্যাররা আশা করেন, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক এমনতর ভাব অন্তরে লালন করবেন যেন তারে দেখলেই মানুষ বুঝতে পারেন, তিনি সামান্য কেউ নন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! কী ভয়ানক হিটলারি ভাবনা! প্রতি পলে পলে নিজেকে বিশেষ ও বিশ্লিষ্ট জানার বিকারগ্রস্ত আকাঙ্ক্ষা ভয় ধরিয়ে দেয়ার মতো!

মানুষের বিশেষ হওয়া, অন্যদের থেকে বেশি সম্মান পাওয়ার কোনো দরকার নেই। এই সম্মান, মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মানুষের মুক্তি যে নেই তা আজ প্রতিষ্ঠিত। মানুষের যদি কিছু হওয়ার থাকে তাহলে তা হচ্ছে, নিজেকে আর সবার সমান জানা, যেখানেই কাউকে বিশেষ, সম্মানিত করার আয়োজন চলে তাকে অস্বীকার করা, নিদেনপক্ষে এড়িয়ে যাওয়া, কারণ কাউকে সর্বক্ষণ সম্মান দেয়া, সদাসর্বদা বিশেষ জানা মানে তার চারপাশের আর সবাইকে সম্মান না দেয়া, অবিশেষ গণ্য করা। এটা কোনো জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের আরাধ্য হওয়ার কথা নয়।

রবি ঠাকুর থেকে ধার করে বলি, সকল অহংকারকে যদি চোখের জলে ডুবিয়ে না ফেলতে পারেন তাহলে আপনি কোনোদিনও আমজনতার কাতারভুক্ত হতে পারবেন না, মানে মানুষ থাকতে পারবেন না। নিজেকে গৌরবদান করার চেষ্টা নিজে যত করবেন তত বেশি নিজেকে আপনি অপমানই করবেন।

এসব শিক্ষিত-বাঙালি কেমন ভুলে যেতে পারে সেই অমিয় ঘোষণা-

“তারি পদরজ অঞ্জলি করি/ মাথায় লইব তুলি, সকলের সাথে পথে চলি/ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি।”

আপনি বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা ব্রহ্মাণ্ড বিদ্যালয়ের শিক্ষক হোন বা যা-ই হোন কেন আপনি একটা লিখিত-অলিখিত সামাজিক-রাষ্ট্রিক চুক্তির আওতায় চাকরি করেন। আপনার পাদ্রী হওয়ার দরকার নেই, আপনার রাজনীতিক বা সমাজের মাথা হওয়ার দায় নেই, আপনার দায় আছে যে কাজের জন্য আপনাকে বেতন দেয়া হয় সেই কাজটুকু ঠিকঠাক মতো করা। মাত্র দুইটা কাজ, শিক্ষার্থীদের চাহিদামতো পড়ানো, তাদের লেখাপড়ার পরিবেশ দেয়া। আর অন্যান্য কাজ করলে করবেন নিজের খায়েশে, না করলে কেউ দুষতে আসবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিশু-কিশোর পড়তে আসে না। তাদের অভিভাবক সাজার দরকার নেই। আপনাদের প্রিয় যে মর্যাদা, সম্মান ইত্যাদি তাদের সমান সমান দেয়ার চেষ্টা করেন, তাদের যা যা প্রাপ্য মিটিয়ে দেন। দেখবেন, চাকরিটা তৃপ্তি নিয়েই করতে পারছেন।

এই দেশের শিক্ষার্থীরা অবিবেচক নয়। আইন-বিধি-প্রথার বাইরে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা কোনোদিনও কিছু চায় না, চায়নি। যদি তাদের সঙ্গে নেমে দাঁড়াতে না পারেন তাহলে চুপ থাকা ভালো। দায়িত্বে থেকেও যদি তাদের প্রাপ্য মিটাতে না পারেন দায়িত্ব ছেড়ে দেন। কেউ আপনাদের পায়ে ধরে চাকরি দেয় না, চাকরি তো চাকরিই। সেবক হন। নইলে পথ দেখেন। কথায় কথায় উদোম সম্মান মর্যাদা চাইবেন না। এই চাওয়া বিকারগ্রস্ততা।

শিক্ষার্থী হিসেবে আমি সারাক্ষণ এই কথা আওড়াই, শিক্ষকদের সামনে মাথা নিচু করার কিছু নেই। মাথা নিচু করে কিছুই শেখা যায় না। কাউকে বড় জানা শিক্ষাগ্রহণের প্রধান অন্তরায়। সমানে সমানে লেনদেনই শিক্ষা। চোখে চোখ রেখে নিজের বস্তুগত-অবস্তুগত চাওয়া আদায় করতে পারাই শিক্ষার মূলমন্ত্র। লড়াই-সংগ্রাম জারি রাখার নামই শিক্ষা।

জয় হোক শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের!

লেখক: অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
কাভার্ড ভ্যানে বাসের ধাক্কায় নিহত ১
ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২
বাসের ধাক্কায় অটোরিকশাচালক নিহত, আহত ৫
খুঁটির সঙ্গে বাইকের ধাক্কায় নিহত ২
বাস-সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে যাত্রী নিহত

শেয়ার করুন

‘রানা’র চিরবিদায়!

‘রানা’র চিরবিদায়!

শুধু মাসুদ রানা নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন তার সেবা প্রকাশনী দিয়ে আমাদের আরও অনেক উপকার করেছেন। প্রথমত পেপারব্যাক হওয়ায় সস্তায় বই পাওয়া যেত। বাংলাদেশের বাকি প্রকাশনা শিল্পের পুরোটাই ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। কিন্তু সেবা প্রকাশনীর বই প্রকাশিত হয় বছরজুড়ে। সেবা প্রকাশনীর বই পাওয়া যেত রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনে, এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও।

সন্ধ্যায় হঠাৎ নিউজরুমে সাড়া পড়ে গেল- কাজী আনোয়ার হোসেন মারা গেছেন। রুটিন যা যা কাজ তাই করলাম। খবরটি কনফার্ম করে ব্রেকিং দেয়া হলো। কোন হাসপাতালে মারা গেছেন, সেটা নিশ্চিত করে একজন রিপোর্টার পাঠালাম সেখানে, আরেকজন বসে গেলেন তার জীবনী বানাতে। সবই হলো যন্ত্রের মতো। কিন্তু বুঝিনি, একজন অদেখা মানুষের মৃত্যু এতটা আচ্ছন্ন করে ফেলবে। আসলে শুধু আমাকে নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন যুগ যুগ ধরে আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছেন। এখন ফেসবুক প্রজন্ম হয়তো বুঝতেও পারবে না, কাজী আনোয়ার হোসেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন আমাদের কাছে।

কাজী আনোয়ার হোসেনের অনেক পরিচয়। সেটি নিয়ে বিস্তারিত লেখা যাবে। তবে এটিএন নিউজের ব্রেকিং নিউজে লেখা হলো- ‘মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন আর নেই।’ সব পরিচয় ছাপিয়ে মাসুদ রানার স্রষ্টাই তার মূল পরিচয়। মাসুদ রানার লেখক কে, এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। শেখ আব্দুল হাকিম মাসুদ রানা সিরিজের অনেকগুলো বইয়ের লেখক হিসেবে আদালতের স্বীকৃতি পেয়েছেন। শুধু শেখ আব্দুল হাকিম নন, আমরা জানি আরও অনেকেই মাসুদ রানা লিখেছেন।

১৯৬৬ সালে প্রকাশিত মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম দুটি বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ আর ‘ভারতনাট্যম’ এবং পরে প্রকাশিত ‘পিশাচ দ্বীপ’ ছাড়া এই সিরিজের প্রায় ৪৫০ বইয়ের বাকি সবই বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে লেখা। কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও কখনও একে মৌলিক লেখা বলে দাবি করেননি। কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে প্রকাশিত হলেও এর অনেক বই-ই তার লেখা নয়, তবুও কাজী আনোয়ার হোসেনই মাসুদ রানার স্রষ্টা।

কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর খবরে বছর পাঁচেক আগের একটি স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ২০১৬ সালে মাসুদ রানার ৫০ বছরপূর্তি নিয়ে লেখালেখি হচ্ছিল। অফিসে বসে আমি আর মুন্নী (মুন্নী সাহা) মাসুদ রানা নিয়ে কথা বলছিলাম। স্মৃতির পুকুরে তোলপাড়। হঠাৎ মুন্নী বলল, চল মাসুদ রানার সঙ্গে দেখা করে আসি। মাসুদ রানার নাম শুনেই রক্তে শিহরণ লাগল, ভর করল রাজ্যের নস্টালজিয়া। আসলে মাসুদ রানা নয়, মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনের খোঁজে বের হতে চায় মুন্নী। আমি বললাম, আমি যতদূর জানি কাজী আনোয়ার হোসেন খুব প্রচারবিমুখ ও ঘরকুনো মানুষ। সাধারণত তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেন না, বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে তো নয়ই। মাসুদ রানার মতোই তার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনও নিজেকে রহস্যময়তার চাদরে আড়াল করে রাখেন। ইনফ্যাক্ট আমরা তো তার বাসাও চিনি না।

আমি বললাম, দাঁড়া, আমি একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার চেষ্টা করি। ফোন করলাম, কাজী আনোয়ার হোসেনের চাচাতো ভাই সারগাম সম্পাদক কাজী রওনাক হোসেনকে। তিনিও বললেন, বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে গিয়ে কোনো লাভ নেই। তিনি আশ্বাস দিলেন, আমাদের জন্য শিগগিরই একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু মুন্নী নাছোড়বান্দা, সে যাবেই। তাই বাধ্য হয়ে গুগল সার্চ দিয়ে সেবা প্রকাশনীর ঠিকানা বের করলাম, ২৪/৪ সেগুনবাগিচা। এটুকু ভরসা করে রওয়ানা দিলাম।

একদম শুরুর দিকে ঢাকায় আমার আস্তানা ছিল ৭৬ সেগুনবাগিচা, সাপ্তাহিক প্রিয় প্রজন্মের অফিস। তখন ছায়া ঢাকা, পাখি ঢাকা না হলেও নিরিবিলি সেগুনবাগিচার পুরোটাই চিনতাম। বাইরে থেকে সেবা প্রকাশনীর অফিসও দেখেছি। কিন্তু গত ২৫ বছরে সেগুনবাগিচা এতটাই বদলে গেছে, এখন গেলে সবকিছুই অচেনা মনে হয়। বাগানবাড়ির মতো বিশাল সব বাড়ির জায়গা নিয়েছে উঁচু ভবনগুলো। ২৪/৪ সম্বল করে সেগুনবাগিচায় চক্কর দিতে থাকলাম। ২৪ পাই, কিন্তু ২৪/৪ পাই না। শেষ পর্যন্ত মুন্নীকে গাড়িতে বসিয়ে নেমে জিজ্ঞাসা করে করে বের করলাম ২৪/৪ সেগুনবাগিচা। দেখলাম একটা চোখে না পড়ার মতো ছোট সাইনবোর্ডও আছে, ‘কাজী আনোয়ার হোসেন, ২৪/৪ সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০’। কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়ি আর নেই।

তার জায়গা নিয়েছে সুউচ্চ ভবন। গেটের কাছে গিয়ে মুন্নীকে বললাম, এবার আমার কাজ শেষ, তোর মাস্তানি শুরু। দেখ চেহারা বেচে কিছু করতে পারিস কি না। কাজ হলো। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন মুন্নীকে চিনল। খাতিরও করল। কিন্তু ‘স্যার’-এর অনুমতি ছাড়া তো আর ওপরে যাওয়া যাবে না। আমাদের সামনেই ফোন করলেন। ও প্রান্তের কিছু কথা আমরা আবছা আবছা শুনলামও। টেলিফোনের ওপাশে কাজী আনোয়ার হোসেন, সেবা প্রকাশনীর আরও অনেক নিয়মিত পাঠকের মতো আমার কাছে তিনি কাজীদা, এক ধরনের থ্রিল অনুভব করলাম। কিন্তু এত কাছে তবু কত দূর। অনুমতি মিলল না। বললেন, অসুস্থ। বুঝলাম, অজুহাত। আমাদের পীড়াপীড়িতে নিরাপত্তাকর্মীরা আবার ফোন করলেন।

বললেন, আমরা কোনো সাক্ষাৎকার নিতে আসিনি, সঙ্গে ক্যামেরাও নেই। জাস্ট দেখা করতে এসেছি। বাসায়ও ঢুকব না। বাইরে থেকে দেখা করে চলে যাব। কিন্তু লাভ হলো না। অনুমতি মিলল না। নিরাপত্তাকর্মীরা কথায় কথায় বললেন, আগের বছর স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনের মৃত্যু এবং মেয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার পর উনি অনেকটাই নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। কারো সঙ্গেই দেখা করেন না। অবশ্য দেখা উনি আগেও করতেন না। ওনার নেমপ্লেট পেছনে রেখে একটা সেলফি তুলে দুই বন্ধু ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাম। দুধের স্বাদ ঘোলা পানিতে মেটানোর অপচেষ্টা।

মাসুদ রানাকে নিয়ে প্রায় পঞ্চাশের দুই বন্ধুর এই আদিখ্যেতা দেখে এই প্রজন্মের কেউ কেউ অবাক হতে পারেন। কিন্তু তারা বুঝতেই পারবে না, আমাদের প্রজন্মের কাছে মাসুদ রানা কতটা! শুনলাম মাসুদ রানা এখনও প্রকাশিত হয়। তবে আমি অন্তত ৩০ বছর ধরে মাসুদ রানা পড়ি না। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত প্রায় সব মাসুদ রানাই পড়া ছিল। মাসুদ রানা ছিল নেশার মতো, তীব্র নেশা। পড়ার টেবিলে বইয়ের নিচে লুকিয়ে, এমনকি ক্লাসরুমে লুকিয়েও মাসুদ রানা পড়েছি। একবার হাতে নিলে শেষ না করে ওঠা যেত না। সামনে যত কাজই থাকুক। এমনকি পরীক্ষার আগের রাতে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়ার মতো ‘অপরাধ’ও করেছি। আসলে আমরা বেড়েই উঠেছি মাসুদ রানার সঙ্গে, মাসুদ রানার সময়ে। মাসুদ রানা আমাদের সমান বয়সী।

মাসুদ রানার বয়স যখন ৫০, আমার তখন ৪৭। তবে মাসুদ রানার বয়স বাড়ে না, আমরাই খালি বুড়িয়ে যাই। আমি ভাগ্যবান যে আমার ছেলেবেলা মোবাইল, ফেসবুকে অপচয় হয়নি। আনন্দময় শৈশবের রহমস্যময়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল মাসুদ রানা। প্রতিটি বইয়ের ভূমিকাতেই মাসুদ রানার পরিচিতি লেখা থাকত ‘বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টালিজেন্সের এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ দেশান্তরে।... কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর, সুন্দর এক অন্তর। একা। টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।’ কিন্তু আমরা জড়িয়ে যাই অচ্ছেদ্য এক বাঁধনে। আমাদের ছেলেবেলা কুয়াশা, ব্যোমকেশ, ফেলুদা, দস্যু বনহুরময়। তবে সত্যি বলতে কি মাসুদ রানার মতো আর কেউ এমন বাঁধনে জড়ায়নি।

সাহিত্যমূল্যে হয়তো মাসুদ রানা অনুল্লেখযোগ্যই থেকে যাবে। সাহিত্য ইতিহাসে মাসুদ রানা হয়তো পরিশিষ্ট। কিন্তু বোদ্ধারাই মূল্য বা ইতিহাস নিয়ে থাকুক। আমার তাতে আগ্রহ নেই। আমি জানি মাসুদ রানা আমার, আমাদের জন্য কতটা। কেউ কেউ আমার গদ্যের প্রশংসা করেন। করলে আমি সেই প্রশংসার পুরোটাই কাজী আনোয়ার হোসেনকে উৎসর্গ করি। ’৯৩ সালে আমি যখন বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি, তখন স্পোর্টসে কাজ করতেন শামসুল ইসলাম কবির।

এখন তিনি কানাডাপ্রবাসী। তো কবির এসে একদিন আমার কাছে দুঃখ করে বললেন, ভাই, বড় বিপদে আছি। আযম ভাই (শহীদুল আযম) তো সারাক্ষণ বকাবকি করেন। আমার লেখা ভালো না। কী করি বলেন তো। আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, আপনি মাসুদ রানা আর হুমায়ুন আহমেদ পড়েন। পড়তে ভালো লাগবে এবং আমি নিশ্চিত আপনার লেখারও অনেক উন্নতি হবে। শামসুল ইসলাম কবির ফল পেয়েছিলেন হাতে হাতে। কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি তিনি।

ঢাকায় আমার প্রথম কর্মক্ষেত্র সাপ্তাহিক বিচিন্তা, প্রথম বস মিনার মাহমুদ। তিনি মাসুদ রানায় প্রভাবিত ছিলেন দারুণভাবে। নিজেকে তিনি দাবি করতেন রাহাত খান। আর আমাদের সবাইকে বলতেন মাসুদ রানা। তিনি আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট দিতেন মাসুদ রানা স্টাইলে। মিনার মাহমুদ অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করতেন।

শুধু মিনার মাহমুদ নন; আমরা, আমাদের প্রজন্ম মাসুদ রানায় কতটা প্রভাবিত; কাগজে-কলমে কখনই তার পুরোটা ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবে না। হয়তো আমরা পুরোটা জানিও না; চেতনে-অবচেতনে মাসুদ রানা আমাদের কতটা জুড়ে আছে। লেখার কথা তো আগেই বলেছি। ছোট ছোট বাক্যে মাসুদ রানার ঝরঝরে গদ্য টেনে নেয় যে কাউকে। মাসুদ রানা পড়তে পড়তে একটা সহজবোধ্য স্মার্ট গদ্য পাঠকের মননে ছাপ ফেলে যায়। কাহিনির মতো গদ্যের ছিল যেন টানটান উত্তেজনা।

মাসুদ রানাকে আমি বলি- আই ওপেনার। আমাদের জন্য পড়ার আনন্দের সিংহ দরজাটা খুলে দিয়েছিল মাসুদ রানা। মাসুদ রানা পড়তে পড়তেই ছেলেবেলায় ‘আউট বই’ পড়ার নেশাটা চেপেছিল, সেটা আর কাটেনি। আকাঙ্ক্ষা করি কখনও না কাটুক। বয়স হলে নিশ্চয়ই অনেক অসুখ-বিসুখ হবে, হচ্ছেও। কামনা করি যেন কখনও চোখের অসুখ না হয়। কারণ পড়ার আনন্দটাকে আমি বেঁচে থাকার আনন্দের সমার্থক ভাবি।

আমার ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামে, একদম অজপাড়াগায়। হারিকেন বা কুপির আলোয় লুকিয়ে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়তে পড়তে আমরা ঘুড়ে বেড়াতাম বিশ্বজুড়ে। আহা, কী যে আনন্দময়, রোমাঞ্চকর শৈশব! এমনিতে আমি খুব আনস্মার্ট। এখনও আমার প্রিয় পোশাক লুঙ্গি। আমার স্ত্রী মুক্তি আর ছেলে প্রসূন আমাকে প্রায়শই ‘গেরাইম্যা’ বলে ঠাট্টা করে। আমি অবশ্য একে গালি হিসেবে নয়, প্রশংসা হিসেবেই নেই। তবুও অজপাড়াগা থেকে উঠে এসে যে শহরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছি, তার অনেকটা অবদানই মাসুদ রানার। তার হার না মানা মানসিকতা, শেষ পর্যন্ত লেগে থাকার চিন্তা আমাদের লড়াইয়ে রসদ জুগিয়েছে।

মাসুদ রানার আরেকটা বড় অবদান, পাঠকের মনে অনায়াসে দেশপ্রেমের বীজ বুনে দেয়া। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টালিজেন্সের স্পাই মাসুদ রানা বিশ্বসেরা। এখন অনেক কিছুতেই বাংলাদেশ সেরাদের কাতারে। কিন্তু ৪০/৪৫ বছর আগে বাংলাদেশ এমন ছিল না। দারিদ্র্য, সাইক্লোন, বৈদেশিক সাহায্য- এসবই ছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। হীনন্মন্যতার সেই সময়ে মাসুদ রানা আমাদের বুকের ছাতি ফুলিয়ে দিত।

শুধু মাসুদ রানা নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন তার সেবা প্রকাশনী দিয়ে আমাদের আরও অনেক উপকার করেছেন। প্রথমত পেপারব্যাক হওয়ায় সস্তায় বই পাওয়া যেত। বাংলাদেশের বাকি প্রকাশনা শিল্পের পুরোটাই ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। কিন্তু সেবা প্রকাশনীর বই প্রকাশিত হয় বছরজুড়ে।

সেবা প্রকাশনীর বই পাওয়া যেত রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনে, এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও। কিশোর পত্রিকা বা তিন গোয়েন্দা শিশু-কিশোরদের পাঠে আগ্রহী করেছে। এছাড়া ক্ল্যাসিক আর ওয়েস্টার্ন পড়েও অনেক সময় কাজে লাগিয়েছি। আহা আমার খুব আফসোস, এখন যদি ইন্টারনেট, ফেসবুক না থাকত; যদি আমাদের সন্তানেরা আমাদের মতোই বই পড়ার পেছনে অনেক সময় দিত! তারা যদি জানত, কত আনন্দময় সে জগৎ।

আমাদের সবার জীবন আনন্দময় করে কাজী আনোয়ার হোসেন যাপন করছেন নিঃসঙ্গ জীবন। তবুও তিনি ছিলেন, এটা একটা ভরসা ছিল। তার বিদায়ে অবসান ঘটল একটি যুগের।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কাভার্ড ভ্যানে বাসের ধাক্কায় নিহত ১
ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২
বাসের ধাক্কায় অটোরিকশাচালক নিহত, আহত ৫
খুঁটির সঙ্গে বাইকের ধাক্কায় নিহত ২
বাস-সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে যাত্রী নিহত

শেয়ার করুন

নির্বাচনব্যবস্থা যেন আস্থার সংকট সৃষ্টি না করে

নির্বাচনব্যবস্থা যেন আস্থার সংকট সৃষ্টি না করে

গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত হলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এ নির্বাচন পরিচালনা করে মূলত মাঠপ্রশাসন। আরপিও ১৯৭২-এ সংসদ সদস্যদের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাকে নিয়োগ দেয়া হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও কমিশন কর্তৃক জেলা প্রশাসককে রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রদান একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিধিত্ব আদেশে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে রিটার্নিং অফিসার মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার নিয়োগ দেন।

এ আদেশে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে একজন রিটার্নিং অফিসার তার কর্তৃত্বাধীন এলাকায় সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার স্বার্থে প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। নির্বাচন কমিশন কোনো শর্তারোপসাপেক্ষে সহকারী রিটার্নিং অফিসার রিটার্নিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণে থেকে রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা ভোগ ও কার্যাবলি সম্পন্ন করেন। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসিসহ পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ডিসি, ইউএনও, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসি- এসব কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ তাদের পদোন্নতি, বদলিসহ তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকায় ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে নির্বাচনে তাদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা অনেকটা সহজ হয়। বিগত দিনে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত যেকোনো সংসদ নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনে ক্ষমতাসীন দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের চিত্র দেখা গেছে। নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার জন্য রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের ব্যাপারে শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা না দিয়ে মাঠপর্যায়ে যেকোনো ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনী আবশ্যক।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে ৪৫ বছর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন হয়েছে নির্দলীয়ভাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৪-১৮ মেয়াদে স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ সংশোধিত আইন-২০১৫, উপজেলা পরিষদ সংশোধিত আইন-২০১৫, পৌরসভা সংশোধিত আইন-২০১৫ এবং সিটি করপোরেশন সংশোধিত আইন-২০১৫-এর মাধ্যমে কেবল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য ঘোষণা করা হয়।

এ নিয়ম এখনও বলবৎ রয়েছে। এতে শুধু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যই লোপ পায়নি, বরং সমাজে, বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে হাজার বছরের সামাজিক বন্ধনে ফাটল ধরেছে। দলীয় আনুগত্যের কারণে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সদ্ভাব নষ্ট হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন রাজনীতিকীকরণ, নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতা এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্য ও তোষণ নীতি ইত্যাদির কারণে বিগত সময়ের স্থানীয় ও সংসদ নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সিভিল সোসাইটির সদস্যদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। ২০১১ সালের ১০ মে বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় ঘোষণা করলে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করা হয়।

নির্বাচনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রধান বিরোধী দলের সীমাবদ্ধতা, সুশীল সমাজের সদিচ্ছা সর্বোপরি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নিরিখে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে আমাদেরকে একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকলেও বর্তমান জাতীয় সংসদ তথা সংসদীয় সরকার পদ্ধতির মধ্যেই আমরা মনে করি, একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব।

রাজনীতি-সৎ ও যোগ্য প্রার্থী, দুর্নীতি-সন্ত্রাস, কালো টাকার প্রভাব ইত্যাদি বিষয় আজ আলোচনায় উঠে এসেছে দেখে প্রধানমন্ত্রী কিন্তু অখুশি নন। যে কথাটা আজ পঞ্চাশ বছর পর সবাই উপলব্ধি করলেন সে কথাটা কিন্তু জীবদ্দশায় জাতির পিতা উপলব্ধি করেছিলেন। আর সে কারণেই সাময়িকভাবে একটা পরিবর্তনও এনেছিলেন। কিন্তু তখন তা কেউই দূরদর্শিতার অভাবে বুঝতে পারেনি। অথবা হতে পারে স্বাধীনতাকে অর্থহীন করার জন্য কোনো ঝড়যন্ত্র এর পেছনে ছিল, তাই তা করতে দেয়নি। নির্বাচনে যাতে কালো টাকা ও সন্ত্রাসীরা প্রভাব ফেলতে না পারে তার জন্যই নির্বাচনপদ্ধতিতে একটা পরিবর্তন আনা হয়।

তাহলো, প্রার্থী যারা হবেন তাদের পোস্টার সরকার করে দেবে। নির্বাচনের সব খরচ জাতীয় সরকার বহন করবে। প্রার্থী শুধু বাড়ি বাড়ি যেতে পারবে। সভা-সমাবেশ একসঙ্গে করতে পারবে। একই মঞ্চে দাঁড়াবে এর জন্য সরকার ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু যাবতীয় খরচ বহন করবে সরকার। নিরপেক্ষভাবে এভাবে দুটো উপনির্বাচন হয়েছিল। কিশোরগঞ্জে উপনির্বাচনে একজন স্কুল শিক্ষক জয়ী হন। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাই হেরে যান। ক্ষমতায় ছিলেন বলে তিনি ভাইকে জেতাতে কারচুপি করেননি খাটাননি ক্ষমতার প্রভাবও।

বর্তমান সমাজে আদর্শে বিশ্বাসী রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর এ কারণে সুবিধাবাদী, তোষামোদী, খোষামোদীদের প্রাধান্য বাড়ছে। ত্যাগ নয়, ভোগের মানসিকতা নিয়ে রাজনীতিতে অবতরণ করেই জনগণকে শোষণ করা হচ্ছে। সে কারণেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ধনী থেকে আরও ধনী হয়েছে, সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। যদি আদর্শবাদী রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় থাকতে পারত তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত অনেক আগেই মজবুত হতো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা যদি না ঘটত, বঙ্গবন্ধু যদি আর পাঁচটা বছর হাতে সময় পেতেন তাহলেই বাংলাদেশ পৃথিবীর জন্য উন্নয়নের রোল মডেল হতো অনেক আগেই। অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকেই এ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

নির্বাচনব্যবস্থা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়নি। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের। বিগত সময়ে ভোটারদের ভোট দিতে না পারাসহ নানা অনিয়মের কারণে মানুষ ভোট প্রদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। জাতীয় নির্বাচন, উপনির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে খুব স্বল্পসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। তাই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে ন্যূনতম ভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা দরকার হয়ে পড়েছে।

২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুগান্তরে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, ওই বছরের ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের নির্বাচনে আসনভিত্তিক রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। কমিশন থেকে সে অনুযায়ী আরপিওতে সংশোধনী আনার প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করার সিদ্ধান্ত হয়। পরে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি।

জেলাভিত্তিক নিয়োজিত রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় মিডিয়া ক্যুর নজির দেশে রয়েছে। তাই আসনভিত্তিক রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য নির্বাচন, অর্থাৎ যে রাজনৈতিক দল নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, সে দল জাতীয় সংসদে তত শতাংশ সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠাবে- ফর্মুলাটি বিবেচনার দাবি রাখে। মোটকথা, গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচনপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই সব দলের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এ বিষয়ে সরকার, বিরোধী দল আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হলেই নির্বাচনপদ্ধতি সংস্কার করা সম্ভব। আর নির্বাচনপদ্ধতির সংস্কারেই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

নির্বাচনব্যবস্থাকে অবাধ, সুষ্ঠু ও কার্যকর করা না হলে দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে না। অধিকন্তু প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনব্যবস্থা সরকার, রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ও আস্থার সংকট তৈরি করবে। নির্বাচনব্যবস্থায় ত্রুটি, বিচ্যুতি ও তার কাঠামোগত দিক সংস্কারপূর্বক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতিকে গৌরাবান্বিত ও মহিমান্বিত করে তোলা জরুরি।

লেখক: গবেষক-কলাম লেখক। সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি।

আরও পড়ুন:
কাভার্ড ভ্যানে বাসের ধাক্কায় নিহত ১
ট্রাক-ট্রাক্টর-অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত ২
বাসের ধাক্কায় অটোরিকশাচালক নিহত, আহত ৫
খুঁটির সঙ্গে বাইকের ধাক্কায় নিহত ২
বাস-সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে যাত্রী নিহত

শেয়ার করুন