নতুন বছরের প্রত্যাশা

player
নতুন বছরের প্রত্যাশা

রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা স্থিতিশীল অবস্থা দীর্ঘদিন ব্যবসা-বাণিজ্য কলকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রেখেছিল। করোনার থাবা না থাকলে দেশের অগ্রগতি আরও দ্রুত হতে পারত। কিন্তু বিগত বছরের মাঝামাঝি থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে রাজনৈতিক অঙ্গন যেভাবে সরগরম হয়ে উঠছে তাতে নতুন বছরে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটুক এটা অন্তত শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে আমরা কেউই চাই না। বেগম খালেদা জিয়ার বিষয়টি একদিকে যেমন আদালত ও বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে মানবিকতার প্রশ্ন তুললে সেটি পাল্টা প্রশ্নেরও সৃষ্টি করে।

শীতের পাতা ঝরার সঙ্গে সঙ্গে এই পৌষের হিমেল পরশে অতিক্রান্ত হয়ে গেল খ্রিস্টীয় বছর ২০২১। অতিক্রান্ত হয়ে গেল বাংলাদেশের ইতিহাসেরও এক অবিস্মরণীয় বছর। একইসঙ্গে অতিক্রান্ত হলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং সেই স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষের আয়োজনে বর্ণিল মুজিব বর্ষও! কালের প্রবাহে হারিয়ে গেছে খ্রিস্টীয় বছর ২০২১, কিন্তু তারপরও সবটুকু হারিয়ে যাবে না এই বছরটির!

অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে, ইতিহাসের উপাদান হয়েই বেঁচে থাকবে আমাদের জাতীয় জীবনে বিদায়ী বছর, ২০২১। অন্যান্য বছরের সঙ্গে এই বছরটির বিদায় এ কারণেই ব্যতিক্রমী। গিয়েও যেন গেল না সে, রয়ে গেল ইতিহাসের উপাদান হয়ে।

নতুন বছরকে আমরা বরণ করে নিয়েছি, বরণ করে নিয়েছে সারা পৃথিবী। কিন্তু নতুনের কাছে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে যখন সামনের দিকে তাকাই তখন সংগত কারণেই মনে পড়বে পেছনের কথাও। কী পেয়েছি, কী পাইনি, সে হিসাব মেলাতে গেলে প্রাপ্তির পাল্লাটাই যে ভারী হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ তার ইতিহাসের ৫০টি বছর অতিক্রম করেছে। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে এই দীর্ঘ পথ।

আজ ২০২২-এর এই আলোকোজ্জ্বল বাংলাদেশ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশ যেখানে এসে পৌঁছেছে তা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়। শিক্ষার হার, মাথাপিছু গড় আয়, জাতীয় প্রবৃদ্ধি, মানুষের গড় আয়ু, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান, সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি নানা দিকে দৃষ্টিপাত করলে মনে হয় না অতৃপ্তির হাহাকারে দগ্ধ হওয়ার মতো কিছু আছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই পঞ্চাশটি বছরের দীর্ঘ পথ, মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ, সেখানে অনেক অশ্রু, অনেক রক্ত আর অনেক গ্লানির কালিমাও আমাদের ইতিহাসকে কম কলঙ্কিত করেনি। ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি যখন বিভক্ত হয়ে সংঘাতের মধ্য দিয়ে যায় তখন সে দেশ এতখানি অগ্রসর হবার কথা নয়, যতখানি এগিয়েছে বাংলাদেশ।

অনৈক্যের সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পঁচাত্তরের কলঙ্কের কালিও কালক্রমে মোচন করেছেন বঙ্গবন্ধুরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী, দেশরত্ন শেখ হাসিনা এবং তার সরকার। একদিন যে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে বিরূপ সমালোচনা করেছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, আজ তারাই সমৃদ্ধির আলোয় উদ্ভাসিত বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এরই নাম ইতিহাসের শিক্ষা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে মানুষ ইতিহাস রচনা করে বটে, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা খুব কমই গ্রহণ করে। সেজন্যই সভ্যতার ইতিহাস হচ্ছে ইতিহাসের সত্যকে মেনে নিয়ে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যাওয়া।

সেই এগিয়ে যাওয়ার পথেই আজ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে খ্রিস্টীয় নতুন বছর ২০২২-এ। কিন্তু নতুন বছরেও বিগত বছরের রেশই থেকেই যাবে। সব কিছু ফেলে যেতে পারব না। হিসেবের খাতায় যেমন বিগত বছরের দেনা-পাওনা লিপিবদ্ধ থাকে, সময়ের খাতায়ও থেকে যায় বিগত বছরের আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তি, অর্জন আর হারানোরও অনেক স্মৃতি, অনেক অভিজ্ঞতা যা পথ দেখাবে আগামী দিনগুলোতে।

করোনার ছোবলে আমাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের যাপিত জীবনে অনেক দুঃখ কষ্ট সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে কর্মহীন হয়েছেন। আবার উঠে দাঁড়াবার জন্য লড়াই শুরু হয়েছে। আবার আমাদের সমাজজীবন থেকেও হারিয়ে গেছেন অনেক প্রিয়জন। যদি গত একটি বছর পিছনে ফিরে তাকাই, দেখব কত প্রিয় মুখই না চলে গেছেন চিরতরে না ফেরার দেশে। সেসব জাতীয় ব্যক্তিত্বের শূন্যতা বয়ে নিয়েই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

যা হারিয়েছি তা আর ফিরে পাব না, একথা সত্য, কিন্তু এসব মহৎ মানুষের জীবনের আদর্শ মনে রাখলেই আমরা অনেক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারি। শুধু মৃত্যুর নয়, বিগত বছরের অনেক কিছুর অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে আমরা পূর্ণতায় ভরিয়ে তুলতে সচেষ্ট হতে পারি আমাদের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা।

শুধরে নিতে পারি বিগত বছরের ভুলভ্রান্তিও। করোনার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়তো আমরা মুছে ফেলতে পারব না চাইলেই। এখন মড়ার উপর খাড়ার ঘা ওমিক্রণ ভাইরাস। কিন্তু সতর্ক হলে তা থেকেও প্রাণ রক্ষা করে চলা যায়। মহামারি ভাইরাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও এড়ানো কঠিন। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার মতো প্রাণঘাতী বিপর্যয় থেকে তো চাইলেই আমরা অনেকখানি পরিত্রাণ পেতে পারি।

গণপরিবহনসহ সড়কে যে অসংখ্য যানবাহন চলছে, সেসব যানবাহনের চালক এবং মালিকরা যদি সতর্ক থাকেন, তাহলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো যায়, ঠেকানো যায় অনেক অকাল মৃত্যুর হাহাকার। লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, এসব থেকে আমাদের সড়কগুলোকে নিরাপদ রাখা গেলে, আমরা অনেক বিপর্যয় সহজে এড়াতে পারি।

বছরের শেষপ্রান্তে এসে বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অভিযান চালিয়ে নৈরাজ্য কিছুটা হলেও কমাতে সক্রিয় হয়েছেন। নতুন বছরের প্রত্যাশা থাকবে সড়ক পরিবহনের জন্য একটা শৃঙ্খলার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকার আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করে।

সড়কে যেভাবে ঝরে যাচ্ছে অগণিত মানুষের প্রাণ তা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না। বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত সড়কে নজরদারি বাড়ানোর পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি আশা করা যাচ্ছে। কথা হচ্ছে আইন দিয়ে সব হয় না। পরিবহন মালিকসহ সংশ্লিষ্টদেরও সদিচ্ছা থাকতে হয়।

বিগত বছরে সড়কের নৈরাজ্য নিয়ে দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে সচেতনতা দেখা গিয়েছে তা একদিকে আশার, অন্যদিকে সড়ক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার চরম দৃষ্টান্ত। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজতে হবে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নগর পরিবহন পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে, আশা করতে চাই সুশৃঙ্খল একটি পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নতুন বছরেই আশাব্যঞ্জক উন্নতি ঘটবে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা স্থিতিশীল অবস্থা দীর্ঘদিন ব্যবসা-বাণিজ্য কলকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রেখেছিল। করোনার থাবা না থাকলে দেশের অগ্রগতি আরও দ্রুত হতে পারত। কিন্তু বিগত বছরের মাঝামাঝি থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে রাজনৈতিক অঙ্গন যেভাবে সরগরম হয়ে উঠছে তাতে নতুন বছরে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটুক এটা অন্তত শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে আমরা কেউই চাই না।

বেগম খালেদা জিয়ার বিষয়টি একদিকে যেমন আদালত ও বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে মানবিকতার প্রশ্ন তুললে সেটি পাল্টা প্রশ্নেরও সৃষ্টি করে। একহাতে তালি বাজে না। একটি কবিতা পড়েছিলাম অনেকদিন আগে, সম্ভবত কবি অরুণাভ সরকারের লেখা :‘ভালোবাসা দিলে ভালোবাসা পাবে /ঘৃণা দিলে পাবে ঘৃণা.../তুমি বিস্মরণও নিতে পারো/ শুধু আমি তা পারি না!’

প্রেমের ক্ষেত্রে শেষের চরণটুকু সত্য হলেও রাজনীতিতে তা সত্য নয়। এখানে বিস্মরণের সুযোগ খুব কম। তবু আশা করতে চাই আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বের করে নেবে সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দ।

শান্তির পথ ধরে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ নতুন বছরে আমজনতার প্রত্যাশা এটুকুই। কেননা শান্তি বিঘ্নিত হলে রুটিরুজি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা তো আমাদের আছে।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা), বাংলাদেশ টেলিভিশন।

আরও পড়ুন:
বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘২০২২’ নিয়ে যা আছে
বিদায়ী বছরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবনা
নতুন প্রত্যাশার যুবলীগ
যুবলীগের ৪৯ বছর: শেখ মনি থেকে শেখ পরশ
ফের চালু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

চাষাভুষা বনাম বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক

চাষাভুষা বনাম বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক

তারা তাদের ক্রিয়া-কর্মের দ্বারা নিজেদের সমাজের বৃহত্তর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে সদা সতর্ক থাকেন। যে চাষাভুষা সমাজ তাদের খাওয়ায়, এক দু প্রজন্ম আগে যে খেতের আইলে প্রকৃতিক কাজ সারত, সানকিতে খাওয়া পরিবারগুলো থেকে আমরা আসছি তাদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে জানার মধ্যেই আমাদের মর্যাদাবোধ নিহিত!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হীনন্মন্যতার দিকটা প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়েছে শাবিপ্রবির এক শিক্ষিকার ‘চাষাভুষা’র কথায়। আর গত কদিন আগে ঢাবির অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন স্যারের ‘আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক’ নামের ফেবু-পোস্ট পাঠে আমার মনে হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষকদের প্রেষণাই যেন হীনন্মন্যতার অবিনশ্বর এক বোধ।

‘আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক’। খেয়াল করুন, বাক্য হয়নি কিন্তু তাতে অহমিকার লেলিহান রূপে কিছু মাত্র আড়ালও তৈরি হয়নি!

সে যাহোক, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আমি একজন শিক্ষক’-এই পরিচয় কিছুতেই বিশেষ কিছু না, হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়। কোনো চাকরি, যার জন্য কেউ বেতন নেয়- সেটা চাকরিই মাত্র। কোনো শিক্ষক বা যে কাউকে বিশিষ্ট হয়ে ওঠার দরকার নেই। সম্মান মর্যাদা- এগুলো সব হীনন্মন্যতাজাত আকাঙ্ক্ষা।

আপনি বিশিষ্ট, আপনি সম্মানিত- এই কথার মানে হচ্ছে, আপনি আপনার সঙ্গীজনদের পিছনে ফেলছেন- এই পেছনে ফেলাটা আপনাকে যে তৃপ্তি দেয় সেটার একটা সার্বক্ষণিক স্বীকৃতি আপনি চাইছেন। মানুষকে পিছনে ফেলে বিশিষ্ট বা সম্মানিত বোধ করা অসুস্থতা, মানসিক বিকারগ্রস্ততা।

বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকরা আর সব চাকরিজীবীদের মতোই চাকরিগত প্রাণী। কিন্তু তারা নানা মধুর মধুর বাজে কথা বলে, নানান ভাব ও ভং ধরে সমাজে বিশিষ্ট হতে চান। বিশেষ সম্মান পেতে চান। এর আর একটা অর্থ হচ্ছে, তারা তাদের ক্রিয়া-কর্মের দ্বারা নিজেদের সমাজের বৃহত্তর অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে সদা সতর্ক থাকেন। যে চাষাভুষা সমাজ তাদের খাওয়ায়, এক দু প্রজন্ম আগে যে খেতের আইলে প্রকৃতিক কাজ সারত, সানকিতে খাওয়া পরিবারগুলো থেকে আমরা আসছি তাদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে জানার মধ্যেই আমাদের মর্যাদাবোধ নিহিত!

এ কারণেই শাবিপ্রবির অধ্যাপিকা নিজেকে ‘চাষাভুষা’ থেকে পৃথক করে শ্লাঘা বোধ করেন আর মামুন স্যাররা আশা করেন, বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক এমনতর ভাব অন্তরে লালন করবেন যেন তারে দেখলেই মানুষ বুঝতে পারেন, তিনি সামান্য কেউ নন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক! কী ভয়ানক হিটলারি ভাবনা! প্রতি পলে পলে নিজেকে বিশেষ ও বিশ্লিষ্ট জানার বিকারগ্রস্ত আকাঙ্ক্ষা ভয় ধরিয়ে দেয়ার মতো!

মানুষের বিশেষ হওয়া, অন্যদের থেকে বেশি সম্মান পাওয়ার কোনো দরকার নেই। এই সম্মান, মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে মানুষের মুক্তি যে নেই তা আজ প্রতিষ্ঠিত। মানুষের যদি কিছু হওয়ার থাকে তাহলে তা হচ্ছে, নিজেকে আর সবার সমান জানা, যেখানেই কাউকে বিশেষ, সম্মানিত করার আয়োজন চলে তাকে অস্বীকার করা, নিদেনপক্ষে এড়িয়ে যাওয়া, কারণ কাউকে সর্বক্ষণ সম্মান দেয়া, সদাসর্বদা বিশেষ জানা মানে তার চারপাশের আর সবাইকে সম্মান না দেয়া, অবিশেষ গণ্য করা। এটা কোনো জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের আরাধ্য হওয়ার কথা নয়।

রবি ঠাকুর থেকে ধার করে বলি, সকল অহংকারকে যদি চোখের জলে ডুবিয়ে না ফেলতে পারেন তাহলে আপনি কোনোদিনও আমজনতার কাতারভুক্ত হতে পারবেন না, মানে মানুষ থাকতে পারবেন না। নিজেকে গৌরবদান করার চেষ্টা নিজে যত করবেন তত বেশি নিজেকে আপনি অপমানই করবেন।

এসব শিক্ষিত-বাঙালি কেমন ভুলে যেতে পারে সেই অমিয় ঘোষণা-

“তারি পদরজ অঞ্জলি করি/ মাথায় লইব তুলি, সকলের সাথে পথে চলি/ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি।”

আপনি বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা ব্রহ্মাণ্ড বিদ্যালয়ের শিক্ষক হোন বা যা-ই হোন কেন আপনি একটা লিখিত-অলিখিত সামাজিক-রাষ্ট্রিক চুক্তির আওতায় চাকরি করেন। আপনার পাদ্রী হওয়ার দরকার নেই, আপনার রাজনীতিক বা সমাজের মাথা হওয়ার দায় নেই, আপনার দায় আছে যে কাজের জন্য আপনাকে বেতন দেয়া হয় সেই কাজটুকু ঠিকঠাক মতো করা। মাত্র দুইটা কাজ, শিক্ষার্থীদের চাহিদামতো পড়ানো, তাদের লেখাপড়ার পরিবেশ দেয়া। আর অন্যান্য কাজ করলে করবেন নিজের খায়েশে, না করলে কেউ দুষতে আসবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিশু-কিশোর পড়তে আসে না। তাদের অভিভাবক সাজার দরকার নেই। আপনাদের প্রিয় যে মর্যাদা, সম্মান ইত্যাদি তাদের সমান সমান দেয়ার চেষ্টা করেন, তাদের যা যা প্রাপ্য মিটিয়ে দেন। দেখবেন, চাকরিটা তৃপ্তি নিয়েই করতে পারছেন।

এই দেশের শিক্ষার্থীরা অবিবেচক নয়। আইন-বিধি-প্রথার বাইরে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা কোনোদিনও কিছু চায় না, চায়নি। যদি তাদের সঙ্গে নেমে দাঁড়াতে না পারেন তাহলে চুপ থাকা ভালো। দায়িত্বে থেকেও যদি তাদের প্রাপ্য মিটাতে না পারেন দায়িত্ব ছেড়ে দেন। কেউ আপনাদের পায়ে ধরে চাকরি দেয় না, চাকরি তো চাকরিই। সেবক হন। নইলে পথ দেখেন। কথায় কথায় উদোম সম্মান মর্যাদা চাইবেন না। এই চাওয়া বিকারগ্রস্ততা।

শিক্ষার্থী হিসেবে আমি সারাক্ষণ এই কথা আওড়াই, শিক্ষকদের সামনে মাথা নিচু করার কিছু নেই। মাথা নিচু করে কিছুই শেখা যায় না। কাউকে বড় জানা শিক্ষাগ্রহণের প্রধান অন্তরায়। সমানে সমানে লেনদেনই শিক্ষা। চোখে চোখ রেখে নিজের বস্তুগত-অবস্তুগত চাওয়া আদায় করতে পারাই শিক্ষার মূলমন্ত্র। লড়াই-সংগ্রাম জারি রাখার নামই শিক্ষা।

জয় হোক শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের!

লেখক: অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন:
বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘২০২২’ নিয়ে যা আছে
বিদায়ী বছরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবনা
নতুন প্রত্যাশার যুবলীগ
যুবলীগের ৪৯ বছর: শেখ মনি থেকে শেখ পরশ
ফের চালু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি

শেয়ার করুন

‘রানা’র চিরবিদায়!

‘রানা’র চিরবিদায়!

শুধু মাসুদ রানা নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন তার সেবা প্রকাশনী দিয়ে আমাদের আরও অনেক উপকার করেছেন। প্রথমত পেপারব্যাক হওয়ায় সস্তায় বই পাওয়া যেত। বাংলাদেশের বাকি প্রকাশনা শিল্পের পুরোটাই ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। কিন্তু সেবা প্রকাশনীর বই প্রকাশিত হয় বছরজুড়ে। সেবা প্রকাশনীর বই পাওয়া যেত রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনে, এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও।

সন্ধ্যায় হঠাৎ নিউজরুমে সাড়া পড়ে গেল- কাজী আনোয়ার হোসেন মারা গেছেন। রুটিন যা যা কাজ তাই করলাম। খবরটি কনফার্ম করে ব্রেকিং দেয়া হলো। কোন হাসপাতালে মারা গেছেন, সেটা নিশ্চিত করে একজন রিপোর্টার পাঠালাম সেখানে, আরেকজন বসে গেলেন তার জীবনী বানাতে। সবই হলো যন্ত্রের মতো। কিন্তু বুঝিনি, একজন অদেখা মানুষের মৃত্যু এতটা আচ্ছন্ন করে ফেলবে। আসলে শুধু আমাকে নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন যুগ যুগ ধরে আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছেন। এখন ফেসবুক প্রজন্ম হয়তো বুঝতেও পারবে না, কাজী আনোয়ার হোসেন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন আমাদের কাছে।

কাজী আনোয়ার হোসেনের অনেক পরিচয়। সেটি নিয়ে বিস্তারিত লেখা যাবে। তবে এটিএন নিউজের ব্রেকিং নিউজে লেখা হলো- ‘মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন আর নেই।’ সব পরিচয় ছাপিয়ে মাসুদ রানার স্রষ্টাই তার মূল পরিচয়। মাসুদ রানার লেখক কে, এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। শেখ আব্দুল হাকিম মাসুদ রানা সিরিজের অনেকগুলো বইয়ের লেখক হিসেবে আদালতের স্বীকৃতি পেয়েছেন। শুধু শেখ আব্দুল হাকিম নন, আমরা জানি আরও অনেকেই মাসুদ রানা লিখেছেন।

১৯৬৬ সালে প্রকাশিত মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম দুটি বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ আর ‘ভারতনাট্যম’ এবং পরে প্রকাশিত ‘পিশাচ দ্বীপ’ ছাড়া এই সিরিজের প্রায় ৪৫০ বইয়ের বাকি সবই বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে লেখা। কাজী আনোয়ার হোসেন নিজেও কখনও একে মৌলিক লেখা বলে দাবি করেননি। কাজী আনোয়ার হোসেনের নামে প্রকাশিত হলেও এর অনেক বই-ই তার লেখা নয়, তবুও কাজী আনোয়ার হোসেনই মাসুদ রানার স্রষ্টা।

কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর খবরে বছর পাঁচেক আগের একটি স্মৃতি মনে পড়ে গেল। ২০১৬ সালে মাসুদ রানার ৫০ বছরপূর্তি নিয়ে লেখালেখি হচ্ছিল। অফিসে বসে আমি আর মুন্নী (মুন্নী সাহা) মাসুদ রানা নিয়ে কথা বলছিলাম। স্মৃতির পুকুরে তোলপাড়। হঠাৎ মুন্নী বলল, চল মাসুদ রানার সঙ্গে দেখা করে আসি। মাসুদ রানার নাম শুনেই রক্তে শিহরণ লাগল, ভর করল রাজ্যের নস্টালজিয়া। আসলে মাসুদ রানা নয়, মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনের খোঁজে বের হতে চায় মুন্নী। আমি বললাম, আমি যতদূর জানি কাজী আনোয়ার হোসেন খুব প্রচারবিমুখ ও ঘরকুনো মানুষ। সাধারণত তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেন না, বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে তো নয়ই। মাসুদ রানার মতোই তার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনও নিজেকে রহস্যময়তার চাদরে আড়াল করে রাখেন। ইনফ্যাক্ট আমরা তো তার বাসাও চিনি না।

আমি বললাম, দাঁড়া, আমি একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার চেষ্টা করি। ফোন করলাম, কাজী আনোয়ার হোসেনের চাচাতো ভাই সারগাম সম্পাদক কাজী রওনাক হোসেনকে। তিনিও বললেন, বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে গিয়ে কোনো লাভ নেই। তিনি আশ্বাস দিলেন, আমাদের জন্য শিগগিরই একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু মুন্নী নাছোড়বান্দা, সে যাবেই। তাই বাধ্য হয়ে গুগল সার্চ দিয়ে সেবা প্রকাশনীর ঠিকানা বের করলাম, ২৪/৪ সেগুনবাগিচা। এটুকু ভরসা করে রওয়ানা দিলাম।

একদম শুরুর দিকে ঢাকায় আমার আস্তানা ছিল ৭৬ সেগুনবাগিচা, সাপ্তাহিক প্রিয় প্রজন্মের অফিস। তখন ছায়া ঢাকা, পাখি ঢাকা না হলেও নিরিবিলি সেগুনবাগিচার পুরোটাই চিনতাম। বাইরে থেকে সেবা প্রকাশনীর অফিসও দেখেছি। কিন্তু গত ২৫ বছরে সেগুনবাগিচা এতটাই বদলে গেছে, এখন গেলে সবকিছুই অচেনা মনে হয়। বাগানবাড়ির মতো বিশাল সব বাড়ির জায়গা নিয়েছে উঁচু ভবনগুলো। ২৪/৪ সম্বল করে সেগুনবাগিচায় চক্কর দিতে থাকলাম। ২৪ পাই, কিন্তু ২৪/৪ পাই না। শেষ পর্যন্ত মুন্নীকে গাড়িতে বসিয়ে নেমে জিজ্ঞাসা করে করে বের করলাম ২৪/৪ সেগুনবাগিচা। দেখলাম একটা চোখে না পড়ার মতো ছোট সাইনবোর্ডও আছে, ‘কাজী আনোয়ার হোসেন, ২৪/৪ সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০’। কাজী মোতাহার হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়ি আর নেই।

তার জায়গা নিয়েছে সুউচ্চ ভবন। গেটের কাছে গিয়ে মুন্নীকে বললাম, এবার আমার কাজ শেষ, তোর মাস্তানি শুরু। দেখ চেহারা বেচে কিছু করতে পারিস কি না। কাজ হলো। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন মুন্নীকে চিনল। খাতিরও করল। কিন্তু ‘স্যার’-এর অনুমতি ছাড়া তো আর ওপরে যাওয়া যাবে না। আমাদের সামনেই ফোন করলেন। ও প্রান্তের কিছু কথা আমরা আবছা আবছা শুনলামও। টেলিফোনের ওপাশে কাজী আনোয়ার হোসেন, সেবা প্রকাশনীর আরও অনেক নিয়মিত পাঠকের মতো আমার কাছে তিনি কাজীদা, এক ধরনের থ্রিল অনুভব করলাম। কিন্তু এত কাছে তবু কত দূর। অনুমতি মিলল না। বললেন, অসুস্থ। বুঝলাম, অজুহাত। আমাদের পীড়াপীড়িতে নিরাপত্তাকর্মীরা আবার ফোন করলেন।

বললেন, আমরা কোনো সাক্ষাৎকার নিতে আসিনি, সঙ্গে ক্যামেরাও নেই। জাস্ট দেখা করতে এসেছি। বাসায়ও ঢুকব না। বাইরে থেকে দেখা করে চলে যাব। কিন্তু লাভ হলো না। অনুমতি মিলল না। নিরাপত্তাকর্মীরা কথায় কথায় বললেন, আগের বছর স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনের মৃত্যু এবং মেয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার পর উনি অনেকটাই নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। কারো সঙ্গেই দেখা করেন না। অবশ্য দেখা উনি আগেও করতেন না। ওনার নেমপ্লেট পেছনে রেখে একটা সেলফি তুলে দুই বন্ধু ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলাম। দুধের স্বাদ ঘোলা পানিতে মেটানোর অপচেষ্টা।

মাসুদ রানাকে নিয়ে প্রায় পঞ্চাশের দুই বন্ধুর এই আদিখ্যেতা দেখে এই প্রজন্মের কেউ কেউ অবাক হতে পারেন। কিন্তু তারা বুঝতেই পারবে না, আমাদের প্রজন্মের কাছে মাসুদ রানা কতটা! শুনলাম মাসুদ রানা এখনও প্রকাশিত হয়। তবে আমি অন্তত ৩০ বছর ধরে মাসুদ রানা পড়ি না। কিন্তু তার আগ পর্যন্ত প্রায় সব মাসুদ রানাই পড়া ছিল। মাসুদ রানা ছিল নেশার মতো, তীব্র নেশা। পড়ার টেবিলে বইয়ের নিচে লুকিয়ে, এমনকি ক্লাসরুমে লুকিয়েও মাসুদ রানা পড়েছি। একবার হাতে নিলে শেষ না করে ওঠা যেত না। সামনে যত কাজই থাকুক। এমনকি পরীক্ষার আগের রাতে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়ার মতো ‘অপরাধ’ও করেছি। আসলে আমরা বেড়েই উঠেছি মাসুদ রানার সঙ্গে, মাসুদ রানার সময়ে। মাসুদ রানা আমাদের সমান বয়সী।

মাসুদ রানার বয়স যখন ৫০, আমার তখন ৪৭। তবে মাসুদ রানার বয়স বাড়ে না, আমরাই খালি বুড়িয়ে যাই। আমি ভাগ্যবান যে আমার ছেলেবেলা মোবাইল, ফেসবুকে অপচয় হয়নি। আনন্দময় শৈশবের রহমস্যময়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল মাসুদ রানা। প্রতিটি বইয়ের ভূমিকাতেই মাসুদ রানার পরিচিতি লেখা থাকত ‘বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টালিজেন্সের এক দুর্দান্ত, দুঃসাহসী স্পাই গোপন মিশন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ দেশান্তরে।... কোমলে কঠোরে মেশানো নিষ্ঠুর, সুন্দর এক অন্তর। একা। টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।’ কিন্তু আমরা জড়িয়ে যাই অচ্ছেদ্য এক বাঁধনে। আমাদের ছেলেবেলা কুয়াশা, ব্যোমকেশ, ফেলুদা, দস্যু বনহুরময়। তবে সত্যি বলতে কি মাসুদ রানার মতো আর কেউ এমন বাঁধনে জড়ায়নি।

সাহিত্যমূল্যে হয়তো মাসুদ রানা অনুল্লেখযোগ্যই থেকে যাবে। সাহিত্য ইতিহাসে মাসুদ রানা হয়তো পরিশিষ্ট। কিন্তু বোদ্ধারাই মূল্য বা ইতিহাস নিয়ে থাকুক। আমার তাতে আগ্রহ নেই। আমি জানি মাসুদ রানা আমার, আমাদের জন্য কতটা। কেউ কেউ আমার গদ্যের প্রশংসা করেন। করলে আমি সেই প্রশংসার পুরোটাই কাজী আনোয়ার হোসেনকে উৎসর্গ করি। ’৯৩ সালে আমি যখন বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি, তখন স্পোর্টসে কাজ করতেন শামসুল ইসলাম কবির।

এখন তিনি কানাডাপ্রবাসী। তো কবির এসে একদিন আমার কাছে দুঃখ করে বললেন, ভাই, বড় বিপদে আছি। আযম ভাই (শহীদুল আযম) তো সারাক্ষণ বকাবকি করেন। আমার লেখা ভালো না। কী করি বলেন তো। আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, আপনি মাসুদ রানা আর হুমায়ুন আহমেদ পড়েন। পড়তে ভালো লাগবে এবং আমি নিশ্চিত আপনার লেখারও অনেক উন্নতি হবে। শামসুল ইসলাম কবির ফল পেয়েছিলেন হাতে হাতে। কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি তিনি।

ঢাকায় আমার প্রথম কর্মক্ষেত্র সাপ্তাহিক বিচিন্তা, প্রথম বস মিনার মাহমুদ। তিনি মাসুদ রানায় প্রভাবিত ছিলেন দারুণভাবে। নিজেকে তিনি দাবি করতেন রাহাত খান। আর আমাদের সবাইকে বলতেন মাসুদ রানা। তিনি আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট দিতেন মাসুদ রানা স্টাইলে। মিনার মাহমুদ অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করতেন।

শুধু মিনার মাহমুদ নন; আমরা, আমাদের প্রজন্ম মাসুদ রানায় কতটা প্রভাবিত; কাগজে-কলমে কখনই তার পুরোটা ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবে না। হয়তো আমরা পুরোটা জানিও না; চেতনে-অবচেতনে মাসুদ রানা আমাদের কতটা জুড়ে আছে। লেখার কথা তো আগেই বলেছি। ছোট ছোট বাক্যে মাসুদ রানার ঝরঝরে গদ্য টেনে নেয় যে কাউকে। মাসুদ রানা পড়তে পড়তে একটা সহজবোধ্য স্মার্ট গদ্য পাঠকের মননে ছাপ ফেলে যায়। কাহিনির মতো গদ্যের ছিল যেন টানটান উত্তেজনা।

মাসুদ রানাকে আমি বলি- আই ওপেনার। আমাদের জন্য পড়ার আনন্দের সিংহ দরজাটা খুলে দিয়েছিল মাসুদ রানা। মাসুদ রানা পড়তে পড়তেই ছেলেবেলায় ‘আউট বই’ পড়ার নেশাটা চেপেছিল, সেটা আর কাটেনি। আকাঙ্ক্ষা করি কখনও না কাটুক। বয়স হলে নিশ্চয়ই অনেক অসুখ-বিসুখ হবে, হচ্ছেও। কামনা করি যেন কখনও চোখের অসুখ না হয়। কারণ পড়ার আনন্দটাকে আমি বেঁচে থাকার আনন্দের সমার্থক ভাবি।

আমার ছেলেবেলা কেটেছে গ্রামে, একদম অজপাড়াগায়। হারিকেন বা কুপির আলোয় লুকিয়ে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়তে পড়তে আমরা ঘুড়ে বেড়াতাম বিশ্বজুড়ে। আহা, কী যে আনন্দময়, রোমাঞ্চকর শৈশব! এমনিতে আমি খুব আনস্মার্ট। এখনও আমার প্রিয় পোশাক লুঙ্গি। আমার স্ত্রী মুক্তি আর ছেলে প্রসূন আমাকে প্রায়শই ‘গেরাইম্যা’ বলে ঠাট্টা করে। আমি অবশ্য একে গালি হিসেবে নয়, প্রশংসা হিসেবেই নেই। তবুও অজপাড়াগা থেকে উঠে এসে যে শহরের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছি, তার অনেকটা অবদানই মাসুদ রানার। তার হার না মানা মানসিকতা, শেষ পর্যন্ত লেগে থাকার চিন্তা আমাদের লড়াইয়ে রসদ জুগিয়েছে।

মাসুদ রানার আরেকটা বড় অবদান, পাঠকের মনে অনায়াসে দেশপ্রেমের বীজ বুনে দেয়া। বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টালিজেন্সের স্পাই মাসুদ রানা বিশ্বসেরা। এখন অনেক কিছুতেই বাংলাদেশ সেরাদের কাতারে। কিন্তু ৪০/৪৫ বছর আগে বাংলাদেশ এমন ছিল না। দারিদ্র্য, সাইক্লোন, বৈদেশিক সাহায্য- এসবই ছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। হীনন্মন্যতার সেই সময়ে মাসুদ রানা আমাদের বুকের ছাতি ফুলিয়ে দিত।

শুধু মাসুদ রানা নয়, কাজী আনোয়ার হোসেন তার সেবা প্রকাশনী দিয়ে আমাদের আরও অনেক উপকার করেছেন। প্রথমত পেপারব্যাক হওয়ায় সস্তায় বই পাওয়া যেত। বাংলাদেশের বাকি প্রকাশনা শিল্পের পুরোটাই ফেব্রুয়ারিকেন্দ্রিক। কিন্তু সেবা প্রকাশনীর বই প্রকাশিত হয় বছরজুড়ে।

সেবা প্রকাশনীর বই পাওয়া যেত রেলস্টেশনে, বাসস্টেশনে, এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানেও। কিশোর পত্রিকা বা তিন গোয়েন্দা শিশু-কিশোরদের পাঠে আগ্রহী করেছে। এছাড়া ক্ল্যাসিক আর ওয়েস্টার্ন পড়েও অনেক সময় কাজে লাগিয়েছি। আহা আমার খুব আফসোস, এখন যদি ইন্টারনেট, ফেসবুক না থাকত; যদি আমাদের সন্তানেরা আমাদের মতোই বই পড়ার পেছনে অনেক সময় দিত! তারা যদি জানত, কত আনন্দময় সে জগৎ।

আমাদের সবার জীবন আনন্দময় করে কাজী আনোয়ার হোসেন যাপন করছেন নিঃসঙ্গ জীবন। তবুও তিনি ছিলেন, এটা একটা ভরসা ছিল। তার বিদায়ে অবসান ঘটল একটি যুগের।

লেখক: সাংবাদিক-কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘২০২২’ নিয়ে যা আছে
বিদায়ী বছরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবনা
নতুন প্রত্যাশার যুবলীগ
যুবলীগের ৪৯ বছর: শেখ মনি থেকে শেখ পরশ
ফের চালু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি

শেয়ার করুন

নির্বাচনব্যবস্থা যেন আস্থার সংকট সৃষ্টি না করে

নির্বাচনব্যবস্থা যেন আস্থার সংকট সৃষ্টি না করে

গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত হলেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষে এ নির্বাচন পরিচালনা করে মূলত মাঠপ্রশাসন। আরপিও ১৯৭২-এ সংসদ সদস্যদের নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাকে নিয়োগ দেয়া হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও কমিশন কর্তৃক জেলা প্রশাসককে রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রদান একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিধিত্ব আদেশে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে রিটার্নিং অফিসার মাঠপর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসার নিয়োগ দেন।

এ আদেশে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে একজন রিটার্নিং অফিসার তার কর্তৃত্বাধীন এলাকায় সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার স্বার্থে প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। নির্বাচন কমিশন কোনো শর্তারোপসাপেক্ষে সহকারী রিটার্নিং অফিসার রিটার্নিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণে থেকে রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা ভোগ ও কার্যাবলি সম্পন্ন করেন। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসিসহ পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ডিসি, ইউএনও, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসি- এসব কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ তাদের পদোন্নতি, বদলিসহ তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকায় ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে নির্বাচনে তাদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা অনেকটা সহজ হয়। বিগত দিনে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত যেকোনো সংসদ নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনে ক্ষমতাসীন দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের চিত্র দেখা গেছে। নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার জন্য রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের ব্যাপারে শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা না দিয়ে মাঠপর্যায়ে যেকোনো ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনী আবশ্যক।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে ৪৫ বছর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন হয়েছে নির্দলীয়ভাবে। আওয়ামী লীগ সরকারের ২০১৪-১৮ মেয়াদে স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ সংশোধিত আইন-২০১৫, উপজেলা পরিষদ সংশোধিত আইন-২০১৫, পৌরসভা সংশোধিত আইন-২০১৫ এবং সিটি করপোরেশন সংশোধিত আইন-২০১৫-এর মাধ্যমে কেবল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য ঘোষণা করা হয়।

এ নিয়ম এখনও বলবৎ রয়েছে। এতে শুধু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী পদে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যই লোপ পায়নি, বরং সমাজে, বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে হাজার বছরের সামাজিক বন্ধনে ফাটল ধরেছে। দলীয় আনুগত্যের কারণে একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সদ্ভাব নষ্ট হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন রাজনীতিকীকরণ, নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতা এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্য ও তোষণ নীতি ইত্যাদির কারণে বিগত সময়ের স্থানীয় ও সংসদ নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সিভিল সোসাইটির সদস্যদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। যা দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল। ২০১১ সালের ১০ মে বাংলাদেশে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় ঘোষণা করলে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করা হয়।

নির্বাচনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রধান বিরোধী দলের সীমাবদ্ধতা, সুশীল সমাজের সদিচ্ছা সর্বোপরি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নিরিখে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে আমাদেরকে একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকলেও বর্তমান জাতীয় সংসদ তথা সংসদীয় সরকার পদ্ধতির মধ্যেই আমরা মনে করি, একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব।

রাজনীতি-সৎ ও যোগ্য প্রার্থী, দুর্নীতি-সন্ত্রাস, কালো টাকার প্রভাব ইত্যাদি বিষয় আজ আলোচনায় উঠে এসেছে দেখে প্রধানমন্ত্রী কিন্তু অখুশি নন। যে কথাটা আজ পঞ্চাশ বছর পর সবাই উপলব্ধি করলেন সে কথাটা কিন্তু জীবদ্দশায় জাতির পিতা উপলব্ধি করেছিলেন। আর সে কারণেই সাময়িকভাবে একটা পরিবর্তনও এনেছিলেন। কিন্তু তখন তা কেউই দূরদর্শিতার অভাবে বুঝতে পারেনি। অথবা হতে পারে স্বাধীনতাকে অর্থহীন করার জন্য কোনো ঝড়যন্ত্র এর পেছনে ছিল, তাই তা করতে দেয়নি। নির্বাচনে যাতে কালো টাকা ও সন্ত্রাসীরা প্রভাব ফেলতে না পারে তার জন্যই নির্বাচনপদ্ধতিতে একটা পরিবর্তন আনা হয়।

তাহলো, প্রার্থী যারা হবেন তাদের পোস্টার সরকার করে দেবে। নির্বাচনের সব খরচ জাতীয় সরকার বহন করবে। প্রার্থী শুধু বাড়ি বাড়ি যেতে পারবে। সভা-সমাবেশ একসঙ্গে করতে পারবে। একই মঞ্চে দাঁড়াবে এর জন্য সরকার ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু যাবতীয় খরচ বহন করবে সরকার। নিরপেক্ষভাবে এভাবে দুটো উপনির্বাচন হয়েছিল। কিশোরগঞ্জে উপনির্বাচনে একজন স্কুল শিক্ষক জয়ী হন। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাই হেরে যান। ক্ষমতায় ছিলেন বলে তিনি ভাইকে জেতাতে কারচুপি করেননি খাটাননি ক্ষমতার প্রভাবও।

বর্তমান সমাজে আদর্শে বিশ্বাসী রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আর এ কারণে সুবিধাবাদী, তোষামোদী, খোষামোদীদের প্রাধান্য বাড়ছে। ত্যাগ নয়, ভোগের মানসিকতা নিয়ে রাজনীতিতে অবতরণ করেই জনগণকে শোষণ করা হচ্ছে। সে কারণেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ ধনী থেকে আরও ধনী হয়েছে, সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। যদি আদর্শবাদী রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় থাকতে পারত তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত অনেক আগেই মজবুত হতো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা যদি না ঘটত, বঙ্গবন্ধু যদি আর পাঁচটা বছর হাতে সময় পেতেন তাহলেই বাংলাদেশ পৃথিবীর জন্য উন্নয়নের রোল মডেল হতো অনেক আগেই। অর্থনৈতিক সমীক্ষা থেকেই এ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

নির্বাচনব্যবস্থা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে কার্যকর ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়নি। তাই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের। বিগত সময়ে ভোটারদের ভোট দিতে না পারাসহ নানা অনিয়মের কারণে মানুষ ভোট প্রদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। জাতীয় নির্বাচন, উপনির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে খুব স্বল্পসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। তাই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে ন্যূনতম ভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা দরকার হয়ে পড়েছে।

২০১৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুগান্তরে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, ওই বছরের ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের নির্বাচনে আসনভিত্তিক রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। কমিশন থেকে সে অনুযায়ী আরপিওতে সংশোধনী আনার প্রস্তাব সরকারের কাছে পেশ করার সিদ্ধান্ত হয়। পরে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি।

জেলাভিত্তিক নিয়োজিত রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় মিডিয়া ক্যুর নজির দেশে রয়েছে। তাই আসনভিত্তিক রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে সংসদ সদস্য নির্বাচন, অর্থাৎ যে রাজনৈতিক দল নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, সে দল জাতীয় সংসদে তত শতাংশ সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠাবে- ফর্মুলাটি বিবেচনার দাবি রাখে। মোটকথা, গত পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করতে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, নির্বাচনপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই সব দলের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। এ বিষয়ে সরকার, বিরোধী দল আন্তরিক ও দায়িত্বশীল হলেই নির্বাচনপদ্ধতি সংস্কার করা সম্ভব। আর নির্বাচনপদ্ধতির সংস্কারেই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হবে।

নির্বাচনব্যবস্থাকে অবাধ, সুষ্ঠু ও কার্যকর করা না হলে দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে না। অধিকন্তু প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনব্যবস্থা সরকার, রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ও আস্থার সংকট তৈরি করবে। নির্বাচনব্যবস্থায় ত্রুটি, বিচ্যুতি ও তার কাঠামোগত দিক সংস্কারপূর্বক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করে একটি অংশগ্রহণমূলক অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতিকে গৌরাবান্বিত ও মহিমান্বিত করে তোলা জরুরি।

লেখক: গবেষক-কলাম লেখক। সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি।

আরও পড়ুন:
বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘২০২২’ নিয়ে যা আছে
বিদায়ী বছরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবনা
নতুন প্রত্যাশার যুবলীগ
যুবলীগের ৪৯ বছর: শেখ মনি থেকে শেখ পরশ
ফের চালু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি

শেয়ার করুন

শাবির আন্দোলন ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক 

শাবির আন্দোলন ও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক 

কিছু শিক্ষক পুলিশদের এনেছে আসলে শিক্ষার্থীদের দমন করতে ও পিটাতে। এর চেয়ে লজ্জাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? পিতা তার সন্তানদের পিটানোর জন্য ভূমিকা নিয়ে এখন চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন! যোগ্য অভিভাবক বটে!

২০০২ সালের ঘটনা। আমরা হঠাৎ করেই জানতে পারলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আনোয়ার উল্লাহ শামসুন্নাহার হলে পুলিশ ঢুকিয়ে ছাত্রীদের পিটিয়েছে। সঙ্গে ছাত্রদলের নেত্রীদেরও ভূমিকা ছিল। বেশ কয়েকজন ছাত্রীকে রমনা থানায় গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। গণ-আন্দোলনের যে ঘটনাগুলো এখনও আমাকে নাড়া দেয় তাহলো- আমরা মিছিল করার প্রস্তুতি নিতে নিতে দেখলাম প্রবল বৃষ্টির মধ্যে আমাদের দেশের বরেণ্য একদল শিক্ষকরা বেরিয়ে এসেছিলেন মৌন মিছিল নিয়ে। তৎকালীন সরকারসমর্থিত ভিসি পুলিশ দিয়েও যখন আন্দোলন দমাতে পারছিলেন না তখন বিডিআর মোতায়েন করে।

আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশের হামলা যেমন ছিল তেমনি ছিল ছাত্রদল ক্যাডারদের হামলা। মধুর ক্যান্টিনের পাশে একদিন তারা সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায় ন্যক্কারজনকভাবে। ওইদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ছাত্রদলের ক্যাডাররা লাঞ্ছিত করে আনোয়ার ও মেজবাহ কামাল স্যারকে। তারা ছাত্র-ছাত্রীদের ক্যাডারদের পেটানো থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। একজন উপাচার্য শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কী না করতে পারে তা নিজে দেখেছি। সন্তানের মতো ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা চালাতে তারা কোনো দ্বিধা করে না। এমনকি তার সহকর্মীদের ওপরও। তাহলে শিক্ষকতার মহত্ত্ব কোথায় গেল?

একজন উপাচার্যের কত বড় সম্মানিত পদ! সেখানে বসে শিরদাঁড়া এত বাঁকা করে দলদাসবৃত্তি কেন? কী কারণে আমরা ভাবনার কূলকিনারা পাই না। একজন ভিসি ছাত্রলীগের কথায় চাকরি দেবেন, সাধারণ শিক্ষকরা তার প্রতিবাদ করলে, তাদের সঙ্গে ছাত্ররা দুর্বব্যবহার করলে, উপাচার্যের কিছু যায় আসে না। একজন উপাচার্য বলবেন তিনি পদ ছাড়তে রাজি যদি তাকে একটা যুব সংগঠনের চেয়ারম্যান করা হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে একটি সংগঠনের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক যায় চাঁদা ভাগাভাগি করতে। এমন ব্যক্তিত্ববোধের জায়গা কজন হয়? হঠাৎ করে হয় না। এমন দুর্বৃত্তকে শিক্ষকরা সুযোগ দেয় বলেই এসব ঘটনা ঘটে। এতসব কথা লেখার কারণ শুধু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ছবি দেখে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক আজ আমাকে ফোনে জানিয়েছেন এর পেছনে স্যারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান। সরকার দলের ঠিকাদাররা চায় লুটপাট করতে সেটা স্যার দেন না বলে এসব আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বাইরে থেকে তারা উসকে দিচ্ছে- সেই শিক্ষকের কথামতো, স্যারকে অবরুদ্ধ করা আন্দোলনকারীদের উচিত হয়েছে? আমি বললাম এটা তারা তাদের স্যারকে মেরে ফেলার জন্য করেনি।

এটা একটা প্রতীকী প্রতিবাদ। কিন্তু সেজন্য এই পরিমাণ শিক্ষার্থীকে আহত করে উদ্ধার করা কোন ধরনের মানসিকতা, এটা বললে তিনি বলেন, পত্রিকাগুলো এই মারই দেখে। দুর্নীতি দেখে না। আমি এতসব বুঝি না দুর্নীতির বিরুদ্ধে। আর প্রয়াত হুমায়ুন আাজাদ স্যার ছাত্রী হলে হামলার প্রতিবাদে নিজে রমনা হাজত খানায় গিয়ে মালা দিয়েছিলেন। তার গলায় তখন একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল আমার ছাত্রীদের পবিত্র পদভারে মুখরিত এই ক্যাম্পাস। (নিবন্ধকারের স্মৃতি থেকে)।

আমার মনে আছে হলের দ্যৈতিক সংযোগ, জলের লাইন কেটে দেয়া হলে আমরা ফ্লোরিং করে ছিলাম সৈয়দ আনোয়ার হোসেন স্যারের বাসায়। স্যার ও ম্যাডামের সেই যত্নের কথা ভোলার নয়। আবুল কাশেম ফজলুল হক স্যারের বাসাও ছিল থাকার জন্য উন্মুক্ত। আন্দোলনে ছাত্র-ছাত্রী মার খাচ্ছে- তখন শিক্ষকরা দেখছে ভিসি স্যারের সততার বিরোধিতা। যেসব ঠিকাদার এসব করে তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ভিসিদের। নতুবা একজন শিক্ষকের কাছে এসব দাবি করে কীভাবে আমাদের চিন্তায় আসে না।

সবকিছুর পরেও যে সত্যি তাহলো- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অচল। বহুদিন করোনার কারণে বন্ধ থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয় খুললেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীরা কথা বলার পরই প্রশাসন ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি-দাওয়ার প্রতি কর্ণপাত না করায় পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। বহুদিনের সঞ্চিত ক্ষোভ আজকের ঘটনার জন্ম দিয়েছে বলে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

গণমাধ্যমে এই আন্দোলনের কারণ হিসেবে প্রকাশ হয়েছে যে, হলের যাবতীয় অব্যবস্থাপনা দূর করে সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত এবং ছাত্রীবান্ধব ও দায়িত্বশীল প্রাধ্যক্ষ কমিটি নিয়োগের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাত থেকে আন্দোলন শুরু করে হলের কয়েকশ ছাত্রী। গত শনিবার সন্ধ্যায় ছাত্রীদের কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর পরিস্থিতি পুরোপুরি ঘোলাটে হয়ে যায়, বহুদিনের সঞ্চিত ক্ষোভ সংগ্রামে রূপ নেয়।

গত রোববার দিনভর আন্দোলনে উত্তাল ছিল শাবি। এর মধ্যে ওইদিন বিকালে ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে অবরুদ্ধ করে শিক্ষার্থীরা। তাকে উদ্ধারে অ্যাকশনে যায় পুলিশ। এসময় তাদের রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জে অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হয়। তখন ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী, পুলিশ সদস্যরাও আহত হয়। ফলে ঘটনা দাঁড়িয়েছে এই যে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) হল প্রভোস্টের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পুলিশের দফায় দফায় আক্রমণ ও সংঘর্ষের প্রতিবাদে এবার উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।

গত সোমবার (১৭ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের গোলচত্বরে আন্দোলন শুরু করে। এর আগে রোববার গভীর রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা শাবিপ্রবির ফটকে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীদের এখন একমাত্র দাবি বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমদের পদত্যাগ। এদিকে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় আট সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য জহির বিন আলম এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বলেছেন, গত রোববারের ঘটনা কীভাবে ঘটল, এতে কারা দোষী- সেটা আমরা খুঁজে বের করব। বিশ্ববিদ্যালয় শান্ত ছিল, হঠাৎ কেন এমন অশান্ত হলো তাও বের করা হবে। তবে শিক্ষার্থীদের কথা স্পষ্ট- সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে পুলিশের হামলা কেন তার জবাব দিতে হবে এবং ক্যাম্পাস পরিচালনায় ব্যর্থ হলে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদত্যাগ করতে হবে। একইসঙ্গে মুক্তমঞ্চের সমাবেশ থেকে উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করায় ক্যাম্পাস আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। স্লোগানে স্লোগানে ক্যাম্পাস এখন উত্তপ্ত। পাশপাশি উপাচার্যের বাসা, অফিসসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসমূহে তালা ও ক্যাম্পাসে যাতে আর পুলিশ ঢুকতে না পারে সেজন্য প্রধান ফটকে ব্যারিকেড তৈরি করেছে শিক্ষার্থীরা। মূলত আন্দোলনকারীদের পর ন্যক্কারজনক হামলার পরে শাবি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের হলত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা এই নির্দেশ মানেনি। বরং এই ঘোষণা আসায় পালটা উত্তাপ ছড়ায়। আন্দোলনকারীদের দাবি, পুলিশ ডেকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা নজিরবিহীন এবং এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষ করে উপাচার্য কুশীলবের ভূমিকা পালন করেছেন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছে, ‘এই উপাচার্যের দায়িত্বে থাকাকালে কোনো শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসে নিরাপদ বোধ করছে না। তার পদত্যাগ চাই।’ তারা বলেছে, ‘ক্যাম্পাসে মোতায়েন অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করতে হবে।’ এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবন, কন্ট্রোলার ভবন, অ্যাকাডেমিক ভবনসহ আরও কয়েকটি ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয় তারা। বিকালে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। গত সোমবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রোববার ক্যাম্পাসে সংঘটিত দুঃখজনক ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় বিশ্ববিদ্যালয় যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

এ উদ্যোগটি ভালো কিন্তু প্রশ্ন হলো কিছু শিক্ষক পুলিশদের এনেছে আসলে শিক্ষার্থীদের দমন করতে ও পিটাতে। এর চেয়ে লজ্জাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে? পিতা তার সন্তানদের পিটানোর জন্য ভূমিকা নিয়ে এখন চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন! যোগ্য অভিভাবক বটে!

এ কথা অবশ্যই বলা যায়, ছাত্রদের দাবি-দাওয়ার প্রতি শুরু থেকে কর্ণপাত করলে আজ বিশ্ববিদ্যালয় এভাবে ফুঁসে উঠত না। প্রশাসনের সব ধরনের অসহযোগিতা আজ এ পরিস্থিতির তৈরি করেছে। তবে অভিজ্ঞতা বলে, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। যেসব সংকট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে শেষ করা যায় সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ডেকে আন্দোলনকারীদের মারধর করে থামানোর চেষ্টা করা দুঃখজনক। পুলিশ দিয়ে ছাত্র পিটানোর এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে উদ্ভূত সংকটের সমাধান না করলে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেটা কারো কাঙ্ক্ষিত নয়।

লেখক: গবেষক-প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘২০২২’ নিয়ে যা আছে
বিদায়ী বছরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবনা
নতুন প্রত্যাশার যুবলীগ
যুবলীগের ৪৯ বছর: শেখ মনি থেকে শেখ পরশ
ফের চালু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি

শেয়ার করুন

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু

একপর্যায়ে করা হয় সশস্ত্র পন্থায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার অভিযোগে মামলা। কিন্তু তিনি নির্ভীক। তাকে ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। কোথায় তাকে নেয়া হয়েছে, সেটা কেউ জানতে পারেনি, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ছয় মাস পর জুনে পরিবারের সদস্যরা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়েরের কথা জানতে পারে।

তিনি কারাগারে গেলেন শেখ মুজিবুর রহমান হিসেবে, মুক্ত হলেন বঙ্গবন্ধু হিসেবে নন্দিত হয়ে- হ্যাঁ, এভাবেই বলা যায়। ১৯৬৬ সালের ৮ মে গভীর রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাসা থেকে। তিনি দুপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে ছিলেন ৬ দফার সমর্থনে আয়োজিত এক জনসভায় ভাষণ প্রদানের জন্য। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের এক সভার আয়োজন হয়েছিল।

উপস্থিত বেশিরভাগ নেতা পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন দলের। শেখ মুজিবুর রহমান কয়েকদিন আগে বন্দি হয়েছিলেন। তবে জামিনে মুক্তি পান। তার কাছে বন্দিজীবন নতুন নয়। বার বার তাকে আটক করা হয়। তিনি যেন বিরোধী নেতাদের সভায় যোগদানের জন্য লাহোর যান, সেটা পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা চেয়েছেন। তারা জানতেন যে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হলে আওয়ামী লীগকে দরকার, শেখ মুজিবুর রহমানকে দরকার। জনগণ তাকে মানে।

শেখ মুজিবুর রহমান লাহোর গেলেন, পকেটে তার স্বায়ত্তশাসনের ৬ দফা কর্মসূচি।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার সময় থেকে তিনি স্বায়ত্তশাসনের দাবি বার বার সামনে এনেছেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি বন্দি। তাকে আটক করা হয়েছিল ২৬ মাস আগে ১৯৫০ সালের প্রথম দিনে। বন্দি হওয়ার আগে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সংগঠিত করার জন্য লাহোর এবং অন্যান্য নগরীতে। ফেরার পরেই বন্দি।

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারির লাহোর যাত্রা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে ৬ দফার কারণে। এর আগেও তিনি এবং আরও অনেক নেতা স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেছেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২১ দফার ১৯ নম্বর দফা ছিল স্বায়ত্তশাসন। তবে এতে কেন্দ্রের হাতে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও অর্থ রাখার কথা ছিল।

৬ দফায় বলা হয় অর্থ থাকবে প্রদেশের হাতে। শুল্ক-কর ধার্য করবে প্রদেশ এবং আদায়ও করবে তারাই। কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার জন্য তা থেকে একটি অংশ দেয়া হবে। পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য থাকবে দুটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মিলিশিয়া বাহিনী গঠিত হবে এবং তা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে। নৌবাহিনীর সদর দপ্তর নিয়ে আসতে হবে পূর্ব পাকিস্তানে।

পশ্চিম পাকিস্তানের যেসব নেতা লাহোরে সভা ডেকেছিলেন, তাদের ইচ্ছে ছিল একটি এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা হবে- সর্বজনীন ভোটাধিকার। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের এজেন্ডাও থাকতে হবে আন্দোলনের কর্মসূচিতে। আর এই স্বায়ত্তশাসন হতে হবে ৬ দফার ভিত্তিতে।

পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় কোনো নেতাই কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা খর্ব করার এ কর্মসূচি গ্রহণ করতে রাজি হলেন না। কেউ কেউ তো বলেই দিলেন- এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র পরিণত হবে শিথিল ফেডারেশনে। পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে শেখ মুজিবুর রহমান লাহোর যাত্রার আগে ঢাকায় তার বাসায় ৬ দফা দেখিয়ে বলেছিলেন- ‘শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক নেই। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নেই। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী আইয়ুব খানকে বিব্রত না করার নীতি নিয়ে চলছেন। এখন আপনিই পূর্ব পাকিস্তানের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা। লাহোরের সভায় আপনিই স্বায়ত্তশাসনের এই দাবি উপস্থাপন করলে ভালো হবে।’

ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এবং এইচএম এরশাদের আমলে মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম (বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর বোনের ছেলে) আমাকে বলেছেন, ‘আতাউর রহমান খানকে ৬ দফা উত্থাপনের অনুরোধ করা হলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন- এটা করা হলে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। আমি এটা করব না। আপনিও করবেন না।’

লাহোরে বিরোধী নেতাদের বৈঠকে ৬ দফা নিয়ে আলোচনা করতে অন্য নেতারা রাজি না হওয়ায় শেখ মুজিবুর রহমান বৈঠক বর্জন করেন। পরের কয়েকটি দিন তিনি লাহোরে সংবাদকর্মী এবং আইনজীবীদের কাছে এ কর্মসূচি তুলে ধরেন। আইয়ুব খান এবং তার মন্ত্রীরা এ কর্মসূচির মর্মার্থ উপলব্ধি করতে মুহূর্ত দেরি করেননি। তাকে গ্রেপ্তার করা হবে, এমন শোনা যেতে থাকে। আবার কেউ কেউ বলেন, ঢাকায় গেলে গ্রেপ্তার করা হবে।

শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ফেরেন ১১ ফেব্রুয়ারি। বিমানবন্দরেই সংবাদকর্মীরা দলে দলে হাজির হন। পর দিন ৬ দফা নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্য ব্যাপক প্রচার পায়। তিনি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক আহ্বান করেন। কেউ কেউ বলেন, আগে কেন কমিটিতে এ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়নি? কেউবা বলেন, এ তো পাকিস্তান ভাঙার কর্মসূচি। শেরে বাংলা ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য লাহোর গিয়েছিলেন। আর আপনি সেই নগরীতেই এমন প্রস্তাব উত্থাপন করলেন, যা বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তান থাকবে না।

মার্চে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে ৬ দফা অনুমোদন পায়। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি এ কর্মসূচি মানতে সম্মত হননি। কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান বের হয়ে পড়েন জেলা ও মহকুমা সফরে।

সর্বত্র বিপুল সাড়া। পাশাপাশি চলে গ্রেপ্তার অভিযান। কয়েকটি জেলায় তাকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পান। মুক্ত হয়েই আবার জনসভা। কিন্তু ৮ মে (১৯৬৬) নারায়ণগঞ্জ চাষাঢ়া মাঠে জনসভার পর রাতে যে গ্রেপ্তার হলেন, মুক্তি পেলেন প্রায় তিন বছর পর ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তাকে মুক্ত করার জন্য ছাত্র-জনতা রাজপথে নামে। ১১ দফা কর্মসূচি প্রণীত হয়, যাতে ৬ দফা পুরোপুরি স্থান পায়। আরেকটি দাবি ছিল সব রাজবন্দির মুক্তি। হরতাল-অবরোধ-ঘেরাওয়ে উত্তাল ছিল সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তান।

৮ মে গভীর রাতে গ্রেপ্তারের পর তিনি বন্দি থাকেন বিনাবিচারে। পুরোনো মামলায় জেলও হয়। একপর্যায়ে করা হয় সশস্ত্র পন্থায় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার অভিযোগে মামলা। কিন্তু তিনি নির্ভীক। তাকে ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

কোথায় তাকে নেয়া হয়েছে, সেটা কেউ জানতে পারেনি, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ছয় মাস পর জুনে পরিবারের সদস্যরা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়েরের কথা জানতে পারে। ফজিলাতুন নেছা মুজিব ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে তাকে দেখতে পান। শুরু করেন মামলা মোকাবিলার নতুন পর্যায়ের সংগ্রাম। পাশাপাশি গড়ে তোলেন আন্দোলন। এর পরিণতিতেই ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ বন্দি মুক্তি পান। একইসঙ্গে পাকিস্তানের কারাগারে আটক সব রাজবন্দি মুক্তিলাভ করেন।

২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রজনতার বিশাল সমাবেশে তাকে বরণ করে নেয়া হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে। তিনি অঙ্গীকার করেন- ‘বাঙালির মুক্তি আনবই। এ জন্য আবার যদি কারাগারে যেতে হয়, এমনকি জীবন দিতে হয় আমি প্রস্তুত।’ তিনি কথা রেখেছেন।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, গবেষক-কলাম লেখক, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘২০২২’ নিয়ে যা আছে
বিদায়ী বছরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবনা
নতুন প্রত্যাশার যুবলীগ
যুবলীগের ৪৯ বছর: শেখ মনি থেকে শেখ পরশ
ফের চালু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি

শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্যেই আগরতলা মামলা

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্যেই আগরতলা মামলা

১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ আইন-আদালত ভঙ্গ করে সেনানিবাসে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে হত্যার উদ্দেশ্যেই কারাগার থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। একারণেই এই গ্রেপ্তার, মামলা এবং নিরুদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাবলি ইতিহাসের এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার গুরত্ব বহন করে।

আজ ১৮ জানুয়ারি। ১৯৬৮ সালের এই দিনের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্স আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার দেখিয়ে ঢাকা সেনানিবাসের উদ্দেশ্যে নেয়া হয় এবং সেখানেই তিনি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র কথা জানতে পারেন। ২২ জানুয়ারি ১৯৬৯-এ মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত সেখানেই তিনি বন্দি ছিলেন। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৪৭ উত্তরকাল থেকে সূচিত রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে বিভিন্ন মামলায় তাকে কারারুদ্ধ করা হয়।

সেসব মামলাকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সরকারের রোষানলের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। দেশের আইন-আদালতে মামলার বিরুদ্ধে লড়াই করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জামিনে মুক্তি নেন, কারাগারে বন্দি থেকেও মুক্ত হন। পাকিস্তানের শুরু থেকে শেখ মুজিবুর রহমান যেহেতু শাসকগোষ্ঠীর সব অনাচারের বিরুদ্ধে এবং পূর্ব বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে নিরবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন, নিয়েছিলেন উদ্যোগী ভূমিকা।

তাই পাকিস্তান সরকার তাকে সবসময়ই ‘বড় হুমকি’ হিসেবে মনে করত। এসব কারণে তার বিরুদ্ধে ১৯৪৮ ও ৪৯ সাল থেকে একের পর এক মামলা রুজু করা হতে থাকে। তিনি এসব মামলার বিরুদ্ধে আইন ও আদালতে লড়াই করে কখনও জামিন পেয়েছিলেন, আবার কখনও রুজু করা নতুন মামলায় কারাগারে আটক থেকেছেন। অবশেষে মুক্ত হয়ে আবার তিনি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যতদিন তিনি এই আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন ততদিন তিনি পাকিস্তান সরকারের রোষানল থেকে মুক্ত থাকতে পারেননি, মামলা তার পিছু ছাড়েনি।

সেকারণে আদালতে সবসময় তার বিরুদ্ধে কোনো না কোনো মামলা থাকতই । তিনি সেসব মামলায় লড়াই করেই রাজনীতিতে টিকে ছিলেন। মামলাকে বঙ্গবন্ধু কখনও ভয় করার বিষয় মনে করেননি। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা প্রদানের পর তাকে একের পর এক মামলায় নতুন করে জড়ানো হতে থাকে। ৯ মের প্রথম প্রহরে তাকে আবার বন্দি করে জেলে রুদ্ধ করা হয়। জেলে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে পুরাতন এবং নতুন মোট ১২টি মামলা একের পর এক চলছিল।

মূলত, ৬ দফার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্যই পাকিস্তানের সামরিক সরকার আইয়ুব খান শেখ মুজিবের ওপর এসব মামলায় তাকে কারারুদ্ধ করে রাখছিল। কিন্তু আইয়ুব সরকার যখন মামলার ভয় দেখিয়ে কিংবা সংখ্যা বাড়িয়েও শেখ মুজিব ও তার অনুসারীদের ৬ দফার আন্দোলন থেকে বিরত রাখতে পারছিল না কিংবা সেই আন্দোলনকে দুর্বলও করতে পারছিল না তখন প্রথমে আওয়ামী লীগের মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) নামের একটি জোট গঠন করে। জোটের ৮ দফা দাবিনামাও প্রণয়ন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল ৬ দফার আন্দোলনকে বিভক্ত করা এবং আওয়ামী লীগকে দুইভাগে ভাগ করা। ১৯৬৭ সালে পিডিএম সেই চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। তখনই আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সাধারণ সরকারবিরোধী কোনো মামলা নয় বরং রাষ্ট্রবিরোধী মামলা রুজু করে তাকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে প্রমাণিত করে হত্যা করার নতুন ষড়যন্ত্র আটতে থাকে। নতুন এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি গোপন রাখা হয়।

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে এক নম্বর আসামি করে অপর ৩৪ বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে একটি রাষ্ট্রোদ্রোহী মামলা গোপনে করে। ৬ জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে ২৮ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা প্রদান করে। এই মামলাতেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৭ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১২টার পর অর্থাৎ ১৮ জানুয়ারি রাত ১টায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গোপনে কাউকে না জানিয়ে ঢাকা সেনানিবাসের উদ্দেশে যাত্রা করা হয়। কোনো সাধারণ মামলায় কোনো আসামিকে এভাবে গ্রেপ্তার করা হয় না, নিরুদ্দেশেও নেয়া হয় না। কিন্তু ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারির প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ আইন-আদালত ভঙ্গ করে সেনানিবাসে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে হত্যার উদ্দেশ্যেই কারাগার থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। একারণেই এই গ্রেপ্তার, মামলা এবং নিরুদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাবলি ইতিহাসের এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার গুরত্ব বহন করে।

কী ঘটেছিল সেই রাতে কিংবা তার আগে যা অনেকেরই জানা ছিল না, এমনকি বন্দি শেখ মুজিবও জানতেন না। সেসম্পর্কে জানার একমাত্র উৎস হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থটি। এই গ্রন্থেই তিনি দিয়েছেন এর লোমহর্ষক বিবরণ। আমরা সেই সময়ের ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ বইয়ের ২৫২ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে ২৬৬ পর্যন্ত সবিস্তারে জানতে পারব। আমরা শুধু ১৭ জানুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৮ তারিখের প্রথম প্রহরে কী ঘটেছিল তার কিছু দিক সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরছি। গ্রন্থের লেখক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব লিখেছেন-

“১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি রাত্রে যথারীতি খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়ি। দেওয়ানি ওয়ার্ডে আমি থাকতাম। দেশরক্ষা আইনে বন্দি আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন এডভোকেট আমার কামরায় থাকতেন। ১৭ মাস একাকী থাকার পর তাকে আমার কাছে দেওয়া হয়। একজন সাথী পেয়ে কিছুটা আনন্দও হয়েছিল। হঠাৎ ১৭ই জানুয়ারি রাত্র ১২টার সময় আমার মাথার কাছে জানালা দিয়ে কে বা কারা আমাকে ডাকছিলেন। ঘুম থেকে উঠে দেখি নিরাপত্তা বিভাগের ডেপুটি জেলার তোজাম্মেল সাহেব দাঁড়াইয়া আছেন।

জিজ্ঞাসা করলাম, এত রাত্রে কি জন্য এসেছেন? তিনি বললেন, দরজা খুলে ভিতরে এসে বলব। ডিউটি জমাদার দরজা খুলে দিলে তিনি ভিতরে এসে বললেন, আপনার মুক্তির আদেশ দিয়েছে সরকার। এখনই আপনাকে মুক্ত করে দিতে হবে। মোমিন সাহেবও উঠে পড়েছেন। আমি বললাম, হতেই পারে না। ব্যাপার কি বলুন। তিনি বললেন, সত্যই বলছি আপনাকে ছেড়ে দিতে হবে- এখনই, কাপড় চোপড় নিয়ে চলুন। আমি আবার তাকে প্রশ্ন করলাম, আমার যে অনেকগুলো মামলা আছে তার জামানত নেওয়া হয় নাই। চট্টগ্রাম থেকে কাস্টডি ওয়ারেন্ট রয়েছে, আর যশোর, সিলেট, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, পাবনা থেকে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট রয়েছে। ছাড়বেন কি করে? এটাতো বেআইনি হবে। তিনি বললেন, সরকারের হুকুমে এগুলি থাকলেও ছাড়তে পারি। আমি তাকে হুকুমনামা দেখাতে বললাম। তিনি জেল গেটে ফিরে গেলেন হুকুমনামা আনতে।

আমি মোমিন সাহেবকে বললাম, মনে হয় কিছু একটা ষড়যন্ত্র আছে এর মধ্যে। হতে পারে এরা আমাকে এ জেল থেকে অন্য জেলে পাঠাবে। অন্য কিছু একটাও হতে পারে, কিছুদিন থেকে আমার কানে আসছিল আমাকে ‘ষড়যন্ত্র’ মামলায় জড়াইবার জন্য কোনো কোনো মহল থেকে চেষ্টা করা হতেছিলো। ডিসেম্বর মাস থেকে অনেক সামরিক, সিএসপি ও সাধারণ নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছে দেশরক্ষা আইনে- রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা উপলক্ষ্যে, সত্য মিথ্যা খোদাই জানে!” (পৃ-২৫২ )

এখানে স্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু তখনও জানতে পারেননি তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কী করতে যাচ্ছিল। তিনি সেই রাতে জেল কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থামতো রুম ত্যাগ করে জেলখানার গেটে আসার পর দেখতে পান-

“এলাহি কাণ্ড! সামরিক বাহিনীর লোকজন যথারীতি সামরিক পোষাকে সজ্জিত হয়ে দাঁড়াইয়া আছেন আমাকে ‘অভ্যর্থনা’ করার জন্য।” বঙ্গবন্ধু জেলারের কক্ষে বসা ছিলেন। সেখানেই একজন সামরিক বাহিনীর বড় কর্মকর্তা এসে তাকে জানালেন, “শেখ সাহেব আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো।” বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখতে চাইলেন। সাদা পোশাক পরিহিত একজন কর্মকর্তা পড়লেন, “আর্মি, নেভি ও এয়ারফোর্স আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হলো।” এরপর বঙ্গবন্ধু বললেন। ‘চলুন’। তাকে নিয়ে বসানো হলো তাদের গাড়িতে। কিন্তু কোথায় নেয়া হচ্ছে। সেই সম্পর্কে কিছুই জানানো হলো না।

তিনি দেখলেন তিন জাতীয় নেতার কবরের পাশ দিয়ে গাড়িটি শাহবাগ হোটেল পার হয়ে এয়ারপোর্টের দিকে চলছে। তারপর তেজগাঁও বিমানবন্দর অতিক্রম করে তেজগাঁও সেনানিবাসে প্রবেশের পর বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন যে তাকে সেনানিবাসেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাকে নেয়া হলো একটি সামরিক অফিসার মেসে। সেখানে ডাক্তারি পরীক্ষা শেষে একটি কক্ষে নেয়া হলো। কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সামরিক কর্মকর্তা চলে যাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ঘুমিয়ে পড়েন। সেই রাতেই শুরু হলো বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রুজু করা নতুন আরেক মামলার অধ্যায়।

ইতিহাসে এটিকে আমরা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ বলে জানি। তবে মামলাটির পুরো নাম হচ্ছে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’। এ মামলায় জড়িত করা হয়েছিল বেশ কজন বাঙালি আমলা, সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদকে। ভূতপূর্ব নৌবাহিনীর কর্মচারী কামালউদ্দিনকে ব্যাপকভাবে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন সেই স্বীকারোক্তি লিখিয়ে নিয়েছিল। বেশ কজন সিএসপি ও বাঙালি অফিসারকে এর সঙ্গে যুক্ত করা হলো। বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।

আসামির তালিকায় তিনি ছিলেন প্রধান। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধুর এক কারা জীবন থেকে আরেক কারা জীবনে স্থানান্তর এবং শুরু হয়। এটি ছিল নির্ঘাত তাকে হত্যা করার এক পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা। ১৮ তারিখ বঙ্গবন্ধু সেনানিবাসের সেই কঠোর বন্দি ও বিচারের জীবনে প্রবেশ করেছিলেন। পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করতেই এখানে এনেছিল। কিন্তু ষড়যন্ত্রের সেই প্রহসন একপর্যায়ে এসে বুমেরাং হয়ে গেল। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী গণ-অভ্যুত্থানে গদিচ্যুত হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে ফিরে এলেন তার প্রিয় জনগণের কাছে।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

আরও পড়ুন:
বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘২০২২’ নিয়ে যা আছে
বিদায়ী বছরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবনা
নতুন প্রত্যাশার যুবলীগ
যুবলীগের ৪৯ বছর: শেখ মনি থেকে শেখ পরশ
ফের চালু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি

শেয়ার করুন

তৈমূর কি এখন ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

তৈমূর কি এখন ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

প্রশ্ন হলো, তৈমূর আলম খন্দকার কি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন বা সেটি প্রমাণের কি কোনো পদ্ধতি আছে? যদি থাকে তাহলে তিনি কি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন? প্রশ্নটা জরুরি, কারণ নারায়ণগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিটির নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইভিএমকে ‘জালিয়াতির বাক্স’ বলে মন্তব্য করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী জিতবেন না বা হেরে যাবেন—এমনটি কি আপনি ভেবেছিলেন?

এই সিটির প্রথম মেয়র আইভী। ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন ঘোষিত হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনেই তিনি পরাজিত করেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানকে। ওই নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তৈমূর আলম খন্দকার—এবার যিনি আইভীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার পদও হারিয়েছেন তৈমূর আলম, যাকে ২০১১ সালের নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্তে (ভোটের আগের রাতে) মাঠ থেকে সরে যেতে হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালের নির্বাচনে আইভীর বিরুদ্ধে বিএনপির টিকিট পান সাখাওয়াত হোসেন খান। অর্থাৎ তৈমূর আলম খন্দকার মনোনয়ন পাননি।

সুতরাং বলা যায়, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের সঙ্গে তৈমূর আলম খন্দকারের পলিটিক্যাল ট্র্যাজেডির একটা সম্পর্ক আছে। তৈমূর আলমের এই ট্র্যাজেডির বিপরীতে সেলিনা হায়াৎ আইভীর মেয়র পদে এবার হ্যাটট্রিক জয়।

এবার নারায়ণগঞ্জ সিটিতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় নির্বাচনে আইভী পেয়েছেন ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৭টি ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৈমূর আলম পেয়েছেন ৯২ হাজার ১৬৬টি ভোট। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান ৬৬ হাজার ৯৩১।

প্রশ্ন হলো, এবার আইভীর পরাজয়ের কি কোনো আশঙ্কা ছিল?

চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহীদের কাছে নৌকা মার্কার প্রার্থীদের নাস্তানাবুদ হওয়া; রাজনীতিতে আইভীর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী (যদিও তারা একই দলের) এবং যার সমর্থনও আইভীর জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে, সেই শামীম ওসমানের নেপথ্য ভূমিকাও কি আইভীর হেরে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা তৈরি করেছিল?

স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার যদি বিএনপির মনোনয়ন বা সমর্থন পেতেন, অর্থাৎ বিএনপি যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনে অংশ নিত, তাহলে সারা দেশে ইউপি নির্বাচনের ক্ষমতাসীন দলের অসংখ্য প্রার্থীর পরাজিত হওয়ার ধারাবাহিকতায় নারায়গঞ্জ সিটি নির্বাচনেও কি নৌকার প্রার্থী হেরে যেতেন? হয়তো না।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আর সিটি করপোরেশন নির্বাচন এক নয়। যেসব ইউপিতে নৌকা হেরে গেছে, সেখানে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী। অর্থাৎ নৌকার বিরুদ্ধে নৌকা। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ। বিএনপি মাঠে নেই, অথচ আওয়ামী লীগ হেরে যাচ্ছে তাদের নিজেদের লোকদের কাছেই। এটা দলের গৃহদাহ।

ইউপি নির্বাচন হয় অনেকটাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। রাষ্ট্রের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের এই নির্বাচনে দল ও মার্কার বাইরে অনেক হিসাব-নিকাশ কাজ করে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে সেই হিসাব-নিকাশ ছিল না। এখানে আইভীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আওয়ামী লীগের কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন না। তৈমূর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী। মাঠের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি তাকে মনোনয়ন বা সমর্থন দেয়নি। উল্টো দল থেকে বহিষ্কার করেছে। ব্যক্তি আইভীরও একটা ভোটব্যাংক আছে।

কোনো একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে নানা কাজের কারণে জনগণের বিরাট অংশ ক্ষুব্ধ হয় বলে তাদের প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়— এটি রাজনীতির সরল সমীকরণ। কিন্তু সব ক্ষেত্রে এটি খাটে না। যেসব ক্ষেত্রে খাটে না— নারায়ণগঞ্জ সিটিতে আইভী তার অন্যতম। সুতরাং কোনো সমীকরণই সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রতিকূলে ছিল না। কিন্তু তার পরও সেখানে মূল ফ্যাক্টর হয়েছিলেন শামীম ওসমান, যিনি শুরুতে আইভীর পক্ষে না দাঁড়ালেও দলের চাপে অথবা সিদ্ধান্তে মন থেকে না হলেও মুখে আইভীর পক্ষে কথা বলেছেন।

দলীয় কারণেই আইভীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়ার অবস্থা শামীম ওসমানের ছিল না। আবার গোপনেও তিনি আইভীর বিরুদ্ধে কাজ করলে যে খুব বেশি সফল হতেন, সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সুতরাং নারায়ণগঞ্জ সিটিতে আইভী যে হ্যাটট্রিক জয় পাবেন, তা মোটামুটি ধারণা করাই যাচ্ছিল।

তবে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর প্রার্থীরা যে ধরনের মন্তব্য করেন বা নিজের পরাজয়কে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেন, তৈমূর আলম খন্দকারও তার ব্যতিক্রম নন। ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন তিনি। ব্যালট পেপারে ভোট হলেও তিনি হয়তো গণনায় কারচুপির অভিযোগ আনতেন।

আমাদের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে এখনও পরাজয় মেনে নিয়ে বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানানোর বিষয়টি সেভাবে চালু হয়নি। কালেভদ্রে দু-একটি ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরাজিত প্রার্থী মূলত বিজয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কারচুপি, অনিয়মসহ নানা অভিযোগ করেন। কিন্তু যিনি অভিযোগ করেন, তার দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগটি যে সত্য সেটি প্রমাণ করা। না হলে ওই অভিযোগটির ‍গুরুত্ব থাকে না। প্রশ্ন হলো, তৈমূর আলম খন্দকার কি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন বা সেটি প্রমাণের কি কোনো পদ্ধতি আছে? যদি থাকে তাহলে তিনি কি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে যাবেন?

প্রশ্নটা জরুরি, কারণ নারায়ণগঞ্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিটির নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইভিএমকে ‘জালিয়াতির বাক্স’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং দাবি করেছেন যে, পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে তাকে পরাজিত করেছে; ফলে তার এই অভিযোগটি হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।

ইভিএম নিয়ে অতীতেও অনেক প্রার্থীর তরফে অভিযোগ এসেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এই মেশিনে হবে। সুতরাং কোনো একটি মেশিন যদি সব প্রার্থীর আস্থা অর্জন করতে না পারে এবং প্রার্থীদের মধ্যে যদি এই ধারণা থেকেই যায় যে ইভিএমে কারচুপি করা যায়, তাহলে ভোট যত শান্তিপূর্ণই হোক না কেন, আখেরে এটি গ্রহণযোগ্য হবে না। আর ভোট যত শান্তিপূর্ণ হোক, ভোটার উপস্থিতি যতই হোক কিংবা ভোট যত অংশগ্রহণমূলক এবং উৎসবমুখরই হোক না কেন, যে মেশিনে মানুষ ভোট দেবে, সেই মেশিনটি যদি সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে সেই ভোটও বিশ্বাসযোগ্য হয় না।

সুতরাং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে, ইভিএম নিয়ে সর্বসাধারণের মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করা যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কোনো ধরনের কারচুপির সুযোগ নেই এবং এখানে প্রকৃতই জনরায়ের প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু ইভিএম চালুর পর থেকে এ নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের বিরাট অংশের মনে যে প্রশ্ন, যে সংশয়, তা দূর করতে নির্বাচন কমিশন ‍খুব বেশি পদক্ষেপ নিয়েছে বা নির্বাচনের বেশ কয়েক দিন আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের মধ্যে এই মেশিনটি নিয়ে খুব বেশি প্রচার করেছে এবং হাতে-কলমে এর ব্যবহার শিখেয়েছে, তা বলা যাবে না।

সর্বোপরি কথা হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পরাজয়ের তেমন কোনো কারণ ছিল না। নৌকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ মার্কার প্রার্থীও ছিলেন না। কিন্তু তার পরও পরাজিত প্রার্থী যদি সত্যিই এটি মনে করেন যে ইভিএম হচ্ছে ‘ভোট চুরির বাক্স’, তাহলে নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে তার এই বক্তব্যের জবাব দেয়া। আর তৈমুর আলমেরও উচিত হবে তার অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে জানানো। না হলে তার এই অভিযোগটিকে নিতান্তই রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর এবং পরাজিত প্রার্থীর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বিবেচনা করা হবে, আখেরে যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য নেই।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণীতে ‘২০২২’ নিয়ে যা আছে
বিদায়ী বছরের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবনা
নতুন প্রত্যাশার যুবলীগ
যুবলীগের ৪৯ বছর: শেখ মনি থেকে শেখ পরশ
ফের চালু হচ্ছে নতুন কুঁড়ি

শেয়ার করুন